X
রবিবার, ২৭ নভেম্বর ২০২২
১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৯
শামীম রেজার সাক্ষাৎকার

গল্প নিয়ে আমি খুবই উন্নাসিক

সাক্ষাৎকার গ্রহণ : হারুন পাশা
০৮ মার্চ ২০২২, ১০:৪৭আপডেট : ০৮ মার্চ ২০২২, ১২:৩৬

[জন্ম ৮ মার্চ ১৯৭১; ঝালকাঠি। বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, পিএইচডি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। পেশা শিক্ষকতা ও সম্পাদনা। প্রকাশিত বই : কবিতা—পাথরচিত্রে নদীকথা, নালন্দা দূর বিশ্বের মেয়ে, যখন রাত্তির নাইমা আসে সুবর্ণনগরে, ব্রহ্মাণ্ডের ইসকুল, শামীম রেজার কবিতা, হৃদয়লিপি, কবিতাসংগ্রহ, চর্যালোক, শ্রেষ্ঠ কবিতা ইত্যাদি। গল্প—ঋতুসংহারে জীবনানন্দ। উপন্যাস—ভারতবর্ষ [সমকাল ঈদসংখ্যা ২০০৮]। উল্লেখযোগ্য সম্পাদনা—শিবনারায়ণ রায়ের সঙ্গে যৌথভাবে, আফ্রিকার সাহিত্যসংগ্রহ (১ ও ২)।]


হারুন পাশা :
স্যার, আপনার আরাধ্য কবিতা নিয়ে কথা বলব কিছু সময় পর। এটা তো আমরা জানি, আপনি তো কেবল কবি নন কথাসাহিত্যিক নাট্যকার সর্বপরি একজন ভালো সংগঠক। সেগুলো নিয়েই আগে কথা বলব। তারপর কবিতায় ফিরব। আপনার সাংগঠনিক তৎপরতার বিশেষ একটি অংশ ঢাকা লিটফেস্ট ও পেন বাংলাদেশ। ঢাকা লিট ফেস্টের আয়োজনের পরিকল্পনাটা কীভাবে এলো?
শামীম রেজা : এটা মূলত সাদাফ সায্ সিদ্দিকী আর তাহমিমা আনাম—এরা দুজনে হে ফেস্টিবল নামে একটা লিটারারি ফেস্টিবল শুরু করেছিলেন। সেই ফেস্টিবলে কথাসাহিত্যিক কাজী আনিস আহমেদ, তিনিও লেখক হিসেবে যোগদান করলেন দ্বিতীয়বার। প্রথম শুরু হয়েছিল এটি ব্রিটিশ কাউন্সিলে। হে ফেস্টিবলের প্রবল বিরোধিতা করেছিলেন বাংলাদেশের প্রথম সারির কবিগণ। যে এটা একটি কলোনি, শহরের নামে কেন হবে? কেন বাংলাদেশের একটা শহরের নামে নয়। দ্বিতীয়বার সাদাফ সায্ সিদ্দিকী আমাকে নিজের ইচ্ছাতেই ফোন করে অংশগ্রহণ ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সহয়তা চান। সেখানে কবি শিহাব শাহরিয়ার এবং আমি ভিতর থেকে বাঙালি লেখকদের সঙ্গে ফেস্টিবলের সংযোগ স্থাপনের কাজ করি। পরে এটা নিয়ে যখন কাজী আনিস আহমেদের সাথে কথা হয় তিনি এই আয়োজনের সাথে সম্পৃক্ত হন ঘনিষ্ঠভাবে। এর আগে সার্ক লিটারেরি ফেস্ট কবি রুবানা আহমেদের মাধ্যমে সংঘটিত হয়েছিল ঢাকায়। সেখানে আমি ছিলাম। কাজী আনিস আহমেদের মূল উদ্দেশ্য হলো বাঙালি লেখকদের মূলত একটি আন্তর্জাতিক মঞ্চ তৈরি করে দেওয়া। তাহলে কি করা দরকার? আমরা ঠিক করলাম ‘ঢাকা’কে সামনে রেখে লিটফেস্টের নাম দেওয়া এবং অনেককিছুই বাংলাকেন্দ্রিক আয়োজন করা এবং গুরুত্ব দেওয়া। এর আগে তুমি দেখবে যে, আমাদের অনুবাদ সাহিত্যের অবস্থা, মনজুরে মওলার সময়, বাংলা একাডেমিতে প্রচুর অনুবাদের কাজ হয়েছিল। অনুবাদ নিয়ে আর তেমন কাজ হয়নি। ইউপিএলসহ দুই-একটা প্রকাশনা তাদের মতো অনুবাদ করত। এই প্রথম ঢাকা লিটফেস্ট হবে এবং তারা বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত লেখকদের বই কীভাবে অনুবাদ করা যায় এই চিন্তার মধ্য থেকে ঢাকা লিটফেস্টের সাথে সাথে আরও দুই-একটি প্রতিষ্ঠান তৈরি হলো। একটি হচ্ছে ঢাকা ট্রনসেলেশন সেন্টার, আরেকটা হলো বেঙ্গল লাইটস বুকস। এটি কাজী আনিস আহমেদের ব্যক্তিগত উদ্যোগ। তিনি এটার সাথে সম্পৃক্ত হয়ে গেলেন আত্মীকভাবে। পরে ঢাকা লিটফেস্ট থেকে তাহমিমা আনাম সম্ভবত সরে গেলেন। এটা চলে এল কাজী আনিস আহমেদ, আহসান আকবর এবং বিখ্যাত বিজ্ঞানী জামাল নজরুল ইসলামের মেয়ে সাদাফ সায্ সিদ্দিকীর হাতে। এখন যেরকম হচ্ছে ঢাকা লিট ফেস্ট, আমরা মনে করছি যে এই ফেস্ট কিশোর থেকে যৌবনে পদার্পণ করেছে। শতাধিক অনূদিত বই প্রকাশিত হয়েছে আমাদের প্রধান লেখকদের।
 
হারুন পাশা : লিটফেস্টের মধ্যদিয়ে বাইরের অনেক লেখক এদেশে আসেন। তাঁদের লেখা অনুবাদ হয়। আমরা পড়ি তাঁদের সম্পর্কে। পড়ি তাঁদের সাহিত্য নিয়ে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাহিত্যের কী বেনিফিট আসছে?
শামীম রেজা : লিটফেস্টের ধারাবাহিক আয়োজনের ফলে যেমন ধরো, হাসান আজিজুল হকের কোনো বই ইংরেজিতে অনুবাদ ছিল না। আমাদের প্রধান যে কয়েকজন লেখক, যেমন সৈয়দ শামসুল হক, শহীদ কাদরী, মোহাম্মদ রফিক, ইমদাদুল হক মিলন জনপ্রিয় লেখক কিন্তু তাঁর কোনো বই ইংরেজিতে অনুবাদ হয়নি। এদিক-সেদিক দুই-একটা গল্প অনুবাদ হয়েছে। কথাসাহিত্যিক মঈনুল আহসান সাবের থেকে শুরু করে শাহীন আখতার, রিজিয়া রহমান, এদের সবারই শ্রেষ্ঠ গ্রন্থগুলো ঢাকা ট্রনসেলেশনে সেন্টারের মধ্যদিয়ে প্রকাশ করেছে বেঙ্গল লাইটস বুকস। আমাদের ওই পরিমাণের সমৃদ্ধ অনুবাদক নেই কিংবা প্রফেশনালিজম নেই বলে আমরা ইন্ডিয়া থেকে অনুবাদকদের ধার করে এনে কাজ করাচ্ছি। এই উদ্যোগটা যদি চলমান থাকে তাহলে বাংলাদেশের সাহিত্য অনূদিত হয়ে বিদেশে পড়া হবে, এটাই ধারণা আমাদের। কারণ এর আগে এমন উদ্যোগ কেউ নেয়নি। যেটা সরকারের প্রতিষ্ঠানগুলোর নেওয়া উচিত ছিল।

হারুন পাশা : ইতোমধ্যে কী আমরা তেমন সাইন দেখতে পাচ্ছি?
শামীম রেজা : প্রায় শতাধিকের বেশি বই লিটফেস্টকে কেন্দ্র করে অনূদিত হয়েছে বিভিন্ন প্রকাশনী থেকে। বাংলাদেশের প্রধান লেখকদের বই অনূদিত হয়ে বিদেশে যাচ্ছে এর পূর্বে কখনো পরিকল্পিতভাবে গ্রন্থ অনুবাদ হয়নি এমন করে।

হারুন পাশা : জেমকন সাহিত্য পুরস্কারের সাথে আপনার সংশ্লিষ্টতা আছে। এই পুরস্কার ২০০০ সাল থেকে নিয়মিতই দেওয়া হচ্ছে। এর অর্থমূল্যও বাংলা ভাষাভাষী সমস্ত পুরস্কারের চেয়ে বেশি। পুরস্কার চালু করার বিষয়টা শুরুতে কেমন ছিল?
শামীম রেজা : মূলত জেমকন গ্রুপ ২০০০ সাল থেকে প্রবর্তন করে, প্রথমে শুধু তরুণদের পাণ্ডুলিপি পুরস্কার ছিল, যার মান ছিল দশ হাজার টাকা মাত্র। প্রথমে কাগজ সাহিত্য পুরস্কার নাম ছিল। আজকের কাগজ তো ২০০৭ বন্ধ হয়ে যায়। এর নাম ছিল কাগজ সাহিত্য পুরস্কার। এটা দশ হাজার টাকায় শুরু হয়েছিল। ২০০৩ সালে এক লাখ টাকা দেওয়া হতো এবং ২৫ হাজার তরুণদের জন্য। এখন যার নাম ‘জেমকন সাহিত্য পুরস্কার’। বর্তমান অর্থমূল্য আট লাখ। দুইভাগে, আট এবং দুই লাখ। আমি আজকের কাগজ পত্রিকায় চাকরি করতাম ছাত্রজীবন থেকেই, তখন থেকেই এই পুরস্কারের পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত। এখন এটার বিশ বছর পূর্তি হয়ে গেল। এখানে বাংলাদেশের প্রধান লেখকরা পুরস্কৃত হয়েছেন। বিশ বছর পূর্বে অনেক তরুণ লেখক এই পুরস্কার পেয়েছেন তিনি আজ পরিণত লেখক। তরুণ লেখক হিসেবে জাকির তালুকদার, সালমা বাণী, প্রশান্ত মৃধা পুরস্কৃত হয়েছেন পরবর্তী সময়ে মূল পুরস্কারটিও পেয়েছেন। এর সাথে তিন বছর ধরে আমরা দুই বাংলা, দুই বাংলা বললে ভুল হবে, বাংলা ভাষাভাষী সমৃদ্ধ তরুণ লেখকদের যাদের বয়স ৩৫ এর নিচে-তাদের কাছ থেকে পাণ্ডুলিপি আহ্বান করে আমরা তরুণ পুরস্কার দেই। এ বছর পশ্চিমবঙ্গের একজন লেখক পেয়েছেন তরুণ কথাসাহিত্য পুরস্কার। তার নাম অভিষেক সরকার দুর্দান্ত লেখকভঙ্গি তাঁর।

হারুন পাশা : তরুণ ক্যাটাগরিতে যারা পুরস্কার পায় তাদের অর্থমূল্য বাড়ানোর ব্যাপারে কোনো ভাবনা আছে? কেননা তরুণদেরও তো অর্থ প্রয়োজন।
শামীম রেজা : এটা জেমকন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত। আমাদের সময় ফিলিপস পুরস্কার বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরে একটিও বড় কোম্পানির পুরস্কার ছিল না। এমনকি লিটলম্যাগ পুরস্কারও ছিলো না। কাগজের দশ হাজার টাকার পুরস্কারটি একমাত্র পুরস্কার ছিল তখন ।

হারুন পাশা : আপনি তো আজকের কাগজ-এ সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেছেন ছাত্রাবস্থায় এবং শেষ করেছেন কালের কণ্ঠ পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদনার দায়িত্বের মধ্যদিয়ে। দীর্ঘ জার্নিটা সম্পর্কে জানতে চাই।
শামীম রেজা : মূলত কবিতা লিখতেই ঢাকা শহরে আসা এইচ এস সি পরীক্ষার পর ‘ধানসিড়ি’ পত্রিকা সম্পাদনা করতে প্রথম ঢাকা আসি পরবর্তী সময়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া। বাংলা বিভাগ অবশ্যই আমাকে সেই জায়গাটা করে দিতে পেরেছিল স্বাধীনভাবে চলতে, লিখতে। তখন এরকম ক্লাস করতে হতো না। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সেকেন্ড ইয়ারে আমরা মানে অনেকে ‘লাল-সবুজ’ পত্রিকায় যোগদান করি। প্রথম সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে যোগদান করি এই পত্রিকায়। বর্তমানে যিনি শেখ হাফিজুর রহমান তিনি সম্পাদনার দায়িত্বে ছিলেন। ওইখানেই ছড়াকার, কবি মারুফ চিনু, আশির দশকের বিখ্যাত বামপন্থি ছাত্র-আন্দোলনের নেতা তাঁর স্নেহধন্য হই। তিনি মূলত পলিটিক্যাল কলাম আর ছড়া লিখতেন। তাঁর মাধ্যমে যোগদান করেছিলাম আমরা যখন দ্বিতীয় বর্ষে পড়ি তখন কিছুদিন পর ওই পত্রিকা ছেড়ে দেই। আমরা বলতে তখন অনেকে গিয়েছিলাম জাহাঙ্গীরনগরের। হামীম কামরুল হক, আসাদ আহমেদ, রনজু রাইম, সাজেদুল ইসলাম ফাতেমি থেকে শুরু করে আরও অনেকেই যাদের নাম মনে পড়ছে না। ওখান থেকে চলে আসার প্রায় এক বছর পর মারুফ চিনু ভাই ডেকে পাঠালেন। তখন তিনি ‘আজকের কাগজ’-এর সহযোগী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে নাঈম ভাইয়ের সাথে এই কাগজে কাজ করতেন শুরুতে। একদিন অফিসে গেলে তিনি বললেন, এখানে সাহিত্য পাতায় তুমি কাজ করো। ওই সময় কাজী নাবিল আহমেদ ‘আজকের কাগজ’-এর নির্বাহী সম্পাদক ছিলেন। তাঁর কাছে নিয়ে যান চিনু ভাই। তখনো আমার অনার্সের রেজাল্ট হয় নাই কিংবা আমি পরীক্ষা দেবো ওইরকম সময়ে ‘আজকের কাগজ’-এ যোগদান করি। ‘আজকের কাগজ’-এ সহ-সম্পাদক হিসেবে যোগদানের এক বছর পর সাহিত্য সম্পাদক হই। মধ্যে একমাস চাকরি ছিল না সে এক দুর্দান্ত ইতিহাস ঐ মাসে বিসিএস এর ফরম কিনে জমা দিয়েছিলো বন্ধু আসাদ আহমেদ। তখনো আমার কোনো বই প্রকাশিত হয় নাই প্রকাশকদের দরজায় ঘোরাঘুরি করি। কিন্তু ভারতের বিভিন্ন স্বনামধন্য পত্রিকায় কবিতা ছাপা হয়। ‘জিজ্ঞাসা’ নামে শিবনারায়ণ রায়ের বিখ্যাত কাগজ ছিল, সেখানে কবিতা ছাপা হয় প্রথম বর্ষে। আরও কিছু পত্রিকায় কবিতা ছাপা হয়েছে। বই ছাপা আমাদের কাছে তখন মেজর মনে হতো না। তারপর সাহিত্য সম্পাদক থাকাবস্থায় বই প্রকাশ করার চেষ্টা করি। সিদ্ধান্ত ছিল নিজের টাকায় বই করব না। এজন্য অনেক প্রকাশকের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত ‘অনন্যা’র মুনির ভাইকে একবার বলায় তিনি রাজি হলেন ছাপাতে। এ দেশে ৯৮% ভাগ প্রকাশনার সম্পাদনা পর্ষদ নাই। প্রকাশিত হয় প্রথম বই ‘পাথরচিত্রে নদীরকথা’ ২০০১ সালে। তখন সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে বয়স তিন-চার বছর। এই তো সম্পাদনার শুরু। আর ইচ্ছাশক্তিটা ছিল পড়ালেখার প্রতি, ভীষণ। আমাদের সময় তো কম দামে রাশিয়ান লিটারেচারের বইগুলো পাওয়া যেত। সেগুলো খুব কম পয়সায় নীলক্ষেত থেকে কিনতে পেতাম। ‘উদয়ন’ গ্রামের বাড়ির ঠিকানায় পাঠাতো ফ্রি রেডিও বেইজিং থেকে ক্যালেন্ডার পেয়েছিলাম দুর্দান্ত একটি এখনও মনে আছে। এইসব এখন স্মৃতি।
ছাত্র অবস্থায় বই কেনা ও পড়ার একটা প্রতিযোগিতা ছিল আমাদের মধ্যে, প্রচুর বই পড়া হতো। আমি, হামীম, আসাদ, রনজু রাইমের মধ্যে একটা প্রতিযোগিতা ছিল। ‘আজকের কাগজ’-এ থাকার সময় আমার দশকের প্রায় সব লেখকই আসত। যেমন, প্রশান্ত মৃধা, জাঈদ আজীজ, আহমেদ শামীম, ফারুক ওয়াসিফ, মাহবুব মোর্শেদ, হামীম কামরুল হক, মাদল হাসান, মাহাবুব টিপু, অভী আহমেদ, মুম রহমান, সিডনি এরা সহকর্মী ছিলেন। শুরুতে জাহাঙ্গীরনগরের প্রায় ত্রিশ-চল্লিশজন চাকরি করতাম। এই চাকরির সাথে ঢাকাকেন্দ্রিক প্রজন্মের, যেমন, মজনু শাহ, মুজিব মেহেদী, তপন বাগচী, মাসুদ হাসান, সফেদ ফরাজী, মাহমুদ শাওন, জুয়েল মোস্তাফিজ, রিয়াজ মিল্টন প্রমুখ পর্যন্ত ‘আজকের কাগজ’-এ কাজ করতেন। এ সবের সূচনায় আমি ছিলাম। আমার এত নাম মনে নেই। আমারা প্রায় আশি-পঁচাশিজন বন্ধুরা, সমকালীন চঞ্চল আশরাফও চাকরি করতেন। ফলে আজকের কাগজের সাহিত্য পাতাটা ঋদ্ধ ছিল। বন্ধুত্ব, লেখালিখি, তুমুল তর্ক, আনন্দের মাঝে একটা সময় কেটেছে নব্বইয়ের শেষ দিকে। আমরা একটা বৈঠকি করতাম নিয়মিত। মনে আছে প্রতিমাসে দুইটা বৈঠকি করতাম। যেখানে সেলিম আল দীন, শামসুর রাহমান, সেলিনা হোসেন, ভারতের দেবেশ রায়, অভিজিৎ সেন, অরুণ সেন, কিন্নর রায়, আফসার আহমেদ, এঁদের অংশগ্রহণ ছিল। সাহিত্য পাতার প্রধান একটি বিষয় ছিল অনুবাদ। কারণ আমি তো সব ভাষা ভালো জানি না। একটা ভাষা ভালো জানি সেটা হলো বাংলা। এটাও কতটা ভালো জানি সেটা তো যারা পাঠক তারা বুঝতে পারবেন। যে ভাষাগুলো জানতাম না। যেমন, আমরা সরাসরি স্প্যানিশ থেকে অনুবাদ করেছি ‘দ্য মেলান কোলি হোর, ইংরেজি বলছি, রফিক-উম মুনির চৌধুরী এটা করেছে। আমাদের সাহিত্য পাতার নাম ছিল ‘সুবর্ণরেখা’।
পরে যখন ‘আজকের কাগজ’ বন্ধ হয়ে গেল তখন ‘কালের কণ্ঠ’-এ গেলাম আবেদ খান ভাইয়ের নেতৃত্বে। সেই পত্রিকায় সাহিত্য পাতার নাম ছিল ‘শিলালিপি’। প্রথমে ৬৮ পাতার সাহিত্যকর্ম প্রকাশিত হতো, সাহিত্য তো অবশ্যই। মূল লেখক ছিলেন তরুণরা। সেখানে সরাসরি স্প্যানিশ, ফারসি থেকে অনুবাদ ছেপেছি। শাকির সবুর তখন ফারসি বিভাগের প্রধান। তিনি লিখতেন। তবে বিভিন্ন ভাষার সাহিত্যকে বিশেষ করে আফ্রিকার সাহিত্য নিয়ে যে কাজটা করেছিলাম সেটা একটা অভাবনীয় কাজ। সেটা মনে হলে দুঃসাহসিক মনে হয় নিজেকে এখন। সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডটা আমার কবিতা লেখার পাশাপাশি একেবারে হাত ধরাধরি করেই বেড়ে উঠেছে। কলকাতা বইমেলায় কাগজ প্রকাশনের স্টল দিয়েছিলাম তখন। কারণ আমি দশম শ্রেণিতে থাকার সময় থেকেই গ্রামে সংগঠন করি। পরে থানা প্রোপারে। ‘ধানসিড়ি সাহিত্য সৈকত’। ‘ধানসিড়ি’ পত্রিকাটি এখনও প্রকাশিত হয়। এর সম্পাদক এখন আর আমি নই। আমি প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক। এখন সম্পাদক মুহম্মদ মুহসিন। প্রায় ৩০ বছর হতে চলল। এই সংগঠন থেকে জীবনানন্দ পুরস্কার দেওয়া হয় দুই বছর পরপর। লেখালিখির পাশাপাশি সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছি মনের আনন্দে।

হারুন পাশা : বঙ্গবন্ধু তুলনামূলক সাহিত্য ও সংস্কৃতি ইন্সটিউট চালু করেছেন। চালুটা কীভাবে?
শামীম রেজা : এটার মূল জায়গাটি ছিল আমরা যখন ২০০১ সালে প্রথম কলকাতায় যাই, আহমেদ শামীম ইংরেজিতে পড়াতো জাহাঙ্গীরনগরের ২৩ ব্যাচ ছিল। এখন আমেরিকার টেক্সাসের অস্টিন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ায়। শামীম আর আমি কলকাতায় যাই, প্রথমেই দেখা করি মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, দেবেশ রায়, শিবনারায়ণ রায়—এঁদের সাথে। তুমি জানো মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় বুদ্ধদেব বসুর সরাসরি ছাত্র। তিনি এশিয়ার তুলনামূলক সাহিত্যের প্রথম ব্যাচের ছাত্র। এছাড়া এশিয়ার কোথাও তুলনামূলক সাহিত্য তখনো খোলে নাই। ১৯৫৪ সালে যাদবপুর যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপ পায়। সেই ব্যাচে শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় পড়তেন। নবনিতা দেবসেনও পড়তেন। মানবেন্দ্রের সাথে দেখা করার মূল কারণ ছিল বাংলাদেশে তুলনামূলক সাহিত্যটা খোলা যায় কি না এই সম্পর্কে আলোচনা তখন তিনি যাদবপুরে তুলনামূলকের শিক্ষক। তুলনামূলক সাহিত্য ভারতে যেভাবে গড়ে উঠেছে সেটা ঔপনিবেশিকতার আদলে। ইউরোপ দিয়ে কীভাবে বাংলা সাহিত্য প্রভাবিত হয়েছে এটাই দেখান হয়েছে। আমাদের দার্শনিক দিকটা ভিন্ন, আমরা যে তুলনামূলক সাহিত্য ইনস্টিটিউট করছি বাংলা সাহিত্যেকে কেন্দ্রে রেখে। শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের কথাই ধরা যাক। উপন্যাস ‘কুবেরের বিষয়-আশয়’ তিনি যখন লিখেছেন তার কয়েক বছর পর ভিএস নাইপল লিখেছেন তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস দ্য হাউস অব ‘মিস্টার বিশ্বাস’। কাছাকাছি প্রায় এক ধরনের উৎস থেকে একই মানের লেখা। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ১৯৩৬ সালে লিখেছেন ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’। তুমি পড়ে থাকলে দেখবে ‘প্লেগ’ আর ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’র চিন্তা একই। অথচ ‘প্লেগ’ লেখা হলো ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’র ১০ বছর পরে। আলবেয়ার কামু প্লেগের জন্য নোবেলও পেলেন। আমাদের অনুবাদের দুর্বলতা বিশ্ব পাঠকের হাতে না পৌঁছানো বিদ্ব্যতজনে কাজ এসব হুমায়ুন কবির তাঁর ‘বাংলার কাব্য’ বইয়ে ‘বৈষ্ণবপদাবলী’ সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন, ওই সময় ভারতীয় অন্যান্য এমনকি পৃথিবীতে বৈঞ্চব পদাবলীর মতো এইরকমের সাহিত্যচর্চা কোথাও হয় নাই। বিশেষ করে সার্ভেন্তেজ এবং শেক্সপিয়রের পরে ইউরোপের এই যে সময়টা, সেই সময় এদেশে বৈষ্ণবচর্চাকাররা, চণ্ডীদাস, জ্ঞানদাস, বিদ্যাপতি যে পদগুলো নির্মাণ করেন, সেই মানের কাজ তখন পৃথিবীতে হয় নাই। সত্যি তাই। এগুলো আমরা এখন দেখতে পাচ্ছি। এগুলো পৃথিবীকে জানান দরকার এবং তুমি জেনে থাকবে যে এখন অনুবাদ হচ্ছে আমাদের ‘মঙ্গলকাব্য’। হার্বার্ড থেকে প্রকাশিত হয়েছে কায়সার হকের অনুবাদ। হার্বাটের কি এমন আগ্রহ বাড়ল মধ্যযুগের কাব্যে? নিশ্চয় সেই রকমের নতুন কিছু পেয়েছে যেগুলোকে আমরা বলি ফ্যান্টাস্টিক রিয়েলিজম। বিভিন্ন তত্ত্ব-উপাত্ত দিয়ে ইউরোপ আমাদেরকে সাহায্য করেছে। আমাদের মধ্যে কি তত্ত্ব ছিল না? দর্শন ছিল না? অবশ্যই ছিল। দর্শন ছাড়া কোনো জনগোষ্ঠী বাঁচতে পারে না। ইউরোপীয় মস্তিষ্কের কারণে, ইউরোপীয় মননের কারণে আমরা মনে করি যে সবকিছু ইউরোপ দ্বারা গ্রন্থিত। ইউরোপ ছাড়া আমাদের কোনো কিছুই ছিল না। ইউরোপ ছাড়া আমাদের দর্শন হয় নাই। এটা একেবারে ভুল কথা। রায়হান রাইনের যে বইটা পুরস্কার পেল ‘বাংলার দর্শন’ নিয়ে, এই কাজগুলো আরও আগে হওয়া উচিত ছিল হয়েছে দেবীপ্রসাদ করেছেন, কিন্তু আমাদের আকাদামিয়ার চর্চা নাই, উপনিবেশিক মনন দ্বারা আক্রান্ত আকাদামিয়াগুলো। আমাদের উচিত বাংলাকে বিশ্বের দরবারে উপস্থাপন করা জ্ঞানকাণ্ডের সকল শাখায়। এই প্রতিষ্ঠান গড়ার কারণে এখানে খুব মেধাবী স্টুডেন্টরা ভর্তি হয়। বাংলা অনূদিত হয়ে বাইরের পৃথিবীকে জানাতে হবে। আমাদের শিক্ষার্থীরা সেই জ্ঞানটাকেই আহরণ করে যে ম্যাকলের কথা অনুযায়ী দুই সেলফের বইয়ের মধ্যেই ভারতের সমস্ত জ্ঞান সীমিত এই ভুল বিশ্বাস থেকে বের হয়ে আসা। আমাদের এরকম একটা সমৃদ্ধ সাহিত্য আছে, ছিল, সংস্কৃতি আছে ছিল, তারই যাত্রাটাকে আমরা এখানে পাঠ করাচ্ছি। সমস্ত পৃথিবীর সাহিত্য অবশ্যই অনুবাদের মধ্যদিয়ে পাঠ করাচ্ছি। আমাদের শিক্ষার্থীরা যাতে পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়তে পারে যে বাংলা এ রকমের, এটা জানানোর জন্য। এটাই মূললক্ষ্য মূলমন্ত্র।
তারপর আমাদের সংস্কৃতির সবচাইতে বড় পাঠটা তো ধর্মকেন্দ্রিক। তুমি দেখবা যে, ‘মনসামঙ্গল’ বল, বা মধ্যযুগ বল, সব কিছুই একটা ধর্মীয় আবহের মধ্য থেকে। অক্সফোর্ড ধর্মকেন্দ্রিক বিদ্যালয়ই ছিল, আস্তে আস্তে সেটা বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপ নিল। আমাদের এখানে বুদ্ধদের যে বড় বড় বিহার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ব্যবস্থা সেখানে পৃথিবীর সমস্ত ভাষা জনগোষ্ঠীর লোকজন পড়তে আসত। অতীশ দীপঙ্করের লেখায় তুমি পাবে। সেইগুলো এখন আর আমাদের নাই আইরি শদের মতো নিঃস্ব করে দিয়েছে উপনিবেশিক শিক্ষা। আমরা ছুটছি ইউরোপে আমেরিকায়, ছুটতে দোষ নেই। আমাদের অর্থনীতির সমৃদ্ধি একদিন আসবে, সেই স্বপ্ন দেখি যখন সাংস্কৃতিক বিপ্লব ঘটবে। যখন ইউরোপিয়ানরা আমাদের দর্শন, আমাদের সাহিত্য, আমাদের ইতিহাস, আমাদের যাপিত জীবন জানতে চাইবে। ইয়েটসের লেখা পড়লে তুমি বুঝতে পারবে তিনি কতটা বুদ্ধ ফিলোসফি দ্বারা আক্রান্ত। এখন বুদ্ধের ফিলোসফিকে দর্শনের জায়গা থেকে দেখলে এক রকমের, আবার ধর্মীয় জায়গা থেকে দেখলে আরেক রকমের। ফলে আমরা ওই রকমের একটা ইনস্টিটিউট বা বিদ্যায়তন করে তুলতে চাইলাম যেখানে প্রাচ্যের সংস্কৃতিকে ধারণ করে বিশ্বজনীন হয়ে উঠবে। সেই স্বপ্নটা কেবল তো শুরু। আমরা কারও সাব-অর্ডিনেট নই, আমাদের যে একটা সমৃদ্ধ সাহিত্য ও সংস্কৃতি ইতিহাস-ঐতিহ্য আছে, হাজার বছরের পুরানো সেই ইতিহাস জানানোই হচ্ছে এই প্রতিষ্ঠান গড়ার মূল কারণ।

হারুন পাশা : শিক্ষার্থীরা কী সেভাবে গড়ে উঠছে?
শামীম রেজা : এখন তো শুরু। নিশ্চয় সেই স্বপ্নটাই দেখানো হচ্ছে, যদি স্বপ্নটা বাস্তবায়ন হয় সেটা শিক্ষার্থীদের মধ্যদিয়েই হবে।

হারুন পাশা : বরিশালের একটি গ্রামে জন্ম নেওয়া শিশুটি আজ ঢাকায় চমৎকারভাবে সাহিত্য করছে। সংগঠন করছে। ইনস্টিটিউট খুলেছে আন্তর্জাতিক সংগঠন পেন বাংলাদেশ এখন আপনাদের তত্ত্বাবধায়নে। এখানেও কীভাবে এসব সম্ভব হলো?
শামীম রেজা : মানুষ তো তার স্বপ্নের চেয়েও বড়। আমার তো তাই মনে হয়, আমাদের বঙ্গবন্ধুকে দেখো? ১২ বছর জেল খেটেছেন, মুক্তির জন্য, স্বাধীনতার জন্য। স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখিয়েছেন, আমি তো সামান্য কবি, কবি মাত্র স্বপ্ন দেখি শিক্ষার্থীদের মধ্যে মানবিক বীজ রোপণ করার। ‘পেন বাংলাদেশ’ সংগঠনটি ’৪৮ সালে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ পূর্ব বাংলায় প্রতিষ্ঠা করলেন ’৭২ সালে সৈয়দ আলী আহসানের হাতে নবনির্মিত-এর পরে একটা প্রতিক্রিয়াশীল অলেখক চক্রের হাতে বন্দি ছিল ২০১৮ পর্যন্ত।
সংগঠন কোনো লেখক তৈরি করে না। কিন্তু সংগঠন লেখককে পৃষ্ঠপোষকতা দিতে পারে। সংগঠনের মধ্যে না ঢুকলে সেই ব্যাপারটা বুঝতে পারা মুশকিল। কারণ পৃষ্ঠপোষক লাগবেই। যেমন পরিবারে, রাষ্ট্রে, জ্ঞানকাণ্ডের বিভিন্ন স্তরে গুরু শিষ্যের সম্পর্ক প্রাচ্যের ধর্ম। তুমি তো জানোই শাহনামা সম্পর্কে, ফেরদৌসী কীভাবে সুলতান মাহমুদের কাছ থেকে প্রতাড়িত হয়েছিলেন। সুতরাং, ভালো লেখকের পরিচর্যা করার দায়িত্বটা লেখকের। যদি সেই সংগঠন ভালো হয়। সংগঠন পরিচর্যা করতে পারে কিন্তু লেখক তৈরি করতে পারে না। সংগঠন পুরস্কার দিতে পারে। পরিচর্যা মানে অর্থনৈতিক এবং নৈতিক সাপোর্ট দুইটাই। তোমার প্রশ্নটা কী ছিল?  

হারুন পাশা : জীবনের জার্নি...
শামীম রেজা : ৪৮ বছর বয়সে অনেক কিছু করতে পেরেছি এটা আমার মনে হয় না। এটা মনে হবে তখনই যখন আমার প্রিয় শিক্ষার্থীরা আলো ছড়াবে পৃথিবীতে। আলো না ছড়ান পর্যন্ত বোঝা যাবে না আমরা কিছু করতে পেরেছি কি না।
ব্যক্তিজীবনে এগুলো আমার কাছে কোনো প্রতিষ্ঠা মনে হয় না। কারণ আমার একটা ভালো লেখা, একটু আগে তোমাদেরকে কবিতা শোনাচ্ছিলাম। কবিতা থেকে যদি দুটি লাইন কারও হৃদয়ে গেঁথে যায় সেটাই হলো মূল জায়গা। এই সকল সংগঠনের চেয়ে আরও মহৎ হয়ে উঠতে পারে দুটো পঙক্তি।

হারুন পাশা : আপনার ব্যক্তিগত জীবনের গল্প শুনতে চাচ্ছিলাম। যাইহোক, কবিতা লেখার শুরুটা কীভাবে হয়?
শামীম রেজা : শুরুতে একটা মজার ব্যাপার ঘটেছিল। তুমি যেটা জানতে চাচ্ছ সেটা এক দীর্ঘ গল্প। ব্যাপারটা হচ্ছে যে, মুহম্মদ মুহসিন আমাদের স্কুলের দুই ব্যাচ সিনিয়র, মুহম্মদ মুহসিন ইংরেজি প্রফেসর, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, ধানসিড়ি সম্পাদক, কবি আমার বন্ধু। পড়তে গিয়েছিল, বাইরের স্কুলে ও স্কুল ছেড়ে দেয় সপ্তম শ্রেণিতে। আবার চলে আসে ক্লাস নাইনে। আমার স্কুলের নাম রাজাপুর পাইলট হাই স্কুল, হেড মাস্টার বাংলায় অনার্স-মাস্টার্স করা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। তিনি কবি আবুল হাসানের রুমমেট ছিলেন। আমরা তো এইসব জানি না। আমরা ক্লাস নাইনে যখন উঠি তখন মুহম্মদ মুহসিন আমাদের সাথে ভর্তি হন। তখন আমাদের বয়স আর কত হবে, ১৪-১৫। মুহম্মদ মুহসিন আমাদের থেকে দুই বছরের বড়। মুহসিন আর আমাকে দায়িত্ব দেওয়া হয় সাহিত্য সম্পাদকের মানে আমি মুহসিনের সহকারী। আমাদের স্কুলে প্রথম ম্যাগাজিন বের হবে স্যার নাম দিয়েছিলেন ‘অন্বেষা’। সেই স্কুল ম্যাগাজিনের জন্য একটি কবিতা লিখতে হবে নিজের লেখাটা আমি লিখছি, কাটছি বারবার মুহসিনকে দেখাচ্ছিলাম। মুহসিনকে তো গুরু মানি তখন। মুহসিন বলত আবার একটু কারেকশন কর। আবার নিয়ে গেলে বলত আরেকটু কারেকশন কর। ওই বয়সে যা হয়, সবারই ছন্দের প্রতি এক ধরনের মোহ এবং ওইগুলিকে কবিতা ভাবে। তখন তো আমরা পাঠ্যবই আর লাইব্রেরিতে যে কবিতার বই আছে সেই বই পড়ি। তখন হয়তো সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের একটা বই আমার হাতে এসে পড়েছে। তখন একটা কবিতা লিখি। কবিতাটা দীর্ঘ ছিল। চপল পায়/ কে ঐ যায়/ নাঙা ঠোঁটে/ ধবল গায়/ ওড়না ওড়ে মৃত্তিকা ছোঁয়/ আকাশ যেন চুমুইখায় দীর্ঘ এক পদ্য। এরকম বিশাল কবিতা স্বরমাতৃক ছন্দে লেখা।
আমি যখন ছাপতে দেবো তখন কবিতাটা হেড স্যারের হাতে পড়ে। স্যার তার পিওন নূরু ভাইকে দিয়ে আমাকে ক্লাস থেকে ডেকে আনলেন। ছাত্র হিসেবে ভালো। স্যারের স্নেহধন্য। স্যারের বাসায়ও ছিলাম এক বছর, ক্লাস সিক্সের সময়। স্যার ডেকে এনে প্রথমেই বলছেন, নুর এসলাম বেত নিয়ে আয়। বেত আনতে বলছে কি কারণে আমি বুঝতে পারছিলাম না। স্যার চিৎকার দিয়ে বলছেন আমি আবুল হাসান, সেলিম আল দীন, নির্মলেন্দু গুণদের বন্ধু। নকল করে এনে তুমি আমাকে কবিতা শেখাচ্ছ? এ তো সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের কবিতা। বেত আনার সাথে সাথে আমি কান্না করে দেই। বললাম মুহসিনকে জিজ্ঞাসা করেন স্যার। বলেন, চোরের সাক্ষী গাঁটকাটা। আমার চিৎকার-চেঁচামেচি শুনে জব্বার স্যার ক্লাস থেকে বেরিয়ে চলে এলেন। হেড স্যার রাগ হচ্ছেন আর হুংকার দিচ্ছেন আমাকে কবিতা শেখাতে আসছে, উনি নকল করেন নাই। জব্বার স্যার আমাকে নিয়ে যায় এবং বলে তুই কবিতা লিখবি, আর তা হেড স্যারের হাতে দিবি। জব্বার স্যারকে সবাই ভয় করত, হেড মাস্টার স্যারও। জব্বার স্যার বললেন, তুই কবিতাই লিখবি এবং প্রথম কবিতাটা লিখে হেড মাস্টারকে দেখাবি, তাই করেছিলাম। কবিতা আমাদের কাছে স্বর্গীয় আরাধ্য বা দেবতার কোনো অর্ঘ্য। এরকম ঘটনা ঘটতে পারে জানা ছিল না। হেড স্যারকে আমরা ভাবতাম আমাদের এমপি সাহেবের থেকে বড়। আমি কান্নাকাটি করছিলাম। মুহসিন এসে বলল যে স্যার, ও এইটা নিজেই লিখেছে। দুই লাইন লিখত আর ঠিক করত। ঠিক করতে করতে শামীম ১৫ দিন ধরে এই অবস্থায় এনেছে। ভাব-টাব কিছুই হয় নাই। ছন্দ মিলায়ে মিলায়ে যেরকম হয়। সেটাই স্যারকে দেখাই।
এই অদ্ভুত ঘটনা জীবন পাল্টে দেয় আমার। এরপর আমার মাথায় ঢুকল আমি কবি হব, আর কিছু না। সায়েন্সের স্টুডেন্ট। ভালো স্টুডেন্টও মনে হয় ছিলাম। সব বাদ দিয়ে বিএম কলেজে যখন সায়েন্সে ভর্তি হলাম তখন ট্রাঙ্ক ভর্তি বই। নিষিদ্ধ বইগুলো, ইংরেজি বাংলায়। ইংরেজিতে মনে হয় তখন বেশ ভালোই ছিলাম। তিন মাসের ব্যবধানে দুই বছর বিজ্ঞানে পড়ে মানবিক ফরম ফিলাপ। অদ্ভুত সব ঘটনা।
এস এস সি পরীক্ষার পর। উঠে আমরা একটা পত্রিকা প্রকাশ করি। নাম দেই ‘সৈকত’। সেইসব পত্রিকাগুলো এখনও আছে। এরপর ইন্টারমিডিয়েডে এসে তো রীতিমতো কবিই। আসলে তখনো তো কবিতা লেখা বিষয়টা কী জেনে উঠিনি আসলে এখনও কৈ জানি? এই সূত্রে ইন্টারমেডিয়েডের পর এসে পড়লাম জাহাঙ্গীরনগরে। এখানে এসে প্রকৃতি এবং বন্ধুরা অবশ্যই বড় সাহায্য করেছে।

হারুন পাশা : প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ সম্পর্কে জানতে চাইব। নব্বইয়ে কবিতাচর্চা শুরু হলেও বই বেরোয় শূন্যে। প্রথম বই পাথরচিত্রে নদীকথা (২০০১)। এরপর নালন্দা দূর বিশ্বের মেয়ে (২০০৪)। যখন রাত্তির নাইমা আসে সুবর্ণনগরে (২০০৬), ব্রহ্মাণ্ডের স্কুল (২০০৯), হৃদয়লিপি (২০১৪), দেশহীন মানুষের দেশ (২০১৮), চর্যালোক (২০২০)।
শামীম রেজা : এরপর আরেকটি বের হয়েছে ইন্ডিয়া থেকে ‘দেশহীন মানুষের দেশ’, পুরাই পলিটিক্যাল কবিতা। এবারের যেটা ২০২০ বইমেলায় বের হলো তার নাম ‘চর্যালোক’। এটা আসলে আমি প্রথমে দুই লাইন দুই লাইন করে ‘চর্যাধুনিক’ নামে লিখেছিলাম প্রথম বইতেই। এগুলো আসলে এক ধরনের দোঁহা, শের চর্যা লেখার প্রাকট্রিস। যেমন, আমি তোমার বর্শিতে গাঁথা শামুক/ তুমি এক শিকারি ধীবর’। দুই লাইন দুই লাইন করে এরকম চারশত লাইনের কবিতা। এখনও নাম ঠিক হয় নাই। নাম দিয়েছিলাম চর্যালোক, মানে চর্যাযুগের সেই সান্ধ্যভাষার সন্ধানে। এখানে কিছু কথা বলি, চর্যাপদের সেই সান্ধ্যভাষা। আমরা যে তত্ত্ব? পাশ্চাত্য থেকে ধার করে পড়ি, কিন্তু আমাদের তত্ত্ব নিয়ে কেউ কাজ করল না। আমরা একটা বড় কাজ করছি সেটা হচ্ছে চর্যাকাররা যে সান্ধ্যভাষায় লিখলেন চর্যাপদ, সেটা তো ‘সান্ধ্যতত্ত্ব’ হতে পারত। বৈষ্ণব পদকাররা যে জীবাত্মা এবং পরমাত্মার কথা বলল, সেটা তো সুফিজম থেকে নিয়েছে।‘ জীবাত্মা, পরমাত্মা’ তো একটা তত্ত্ব হতে পারত। কারণ রবীন্দ্রনাথ থেকে এখন পর্যন্ত সাহিত্য এই সন্ধ্যাভাষা, জীবাত্মা পরমাত্মার ব্যবহার চলে।
আমরা সেগুলোকে কাজে লাগাচ্ছি, কবিতায়ও লাগাচ্ছি। আমরা শুধু সিম্বল-প্রতীকের জায়গাগুলো বলে আসছি। প্রতীকের জায়গাগুলোতে চর্যাকাররাই কাজ করে গেছেন কত কত রূপকে। আমরা কেন শুধু ম্যাজিল রিয়ালিজম, সুরালিয়াজম, স্ট্যাকচারালিজম, পাশ্চাত্যের ধার করা ইজমে নিজেদের সৃজনকর্ম বিচার করব, কেন? নারীবাদের বড় নারীবাদী হলেন আমাদের এখানের ‘খনা’। ‘খনাতত্ত্ব’ কেন হলো না? এই তত্ত্ব নিয়ে, তত্ত্ববিশ্ব নিয়ে, বাংলার তত্ত্ববিশ্ব নিয়ে, সাহিত্যের তত্ত্ববিশ্ব নিয়ে আমি ও মুহসিন একটা কাজ করছি দুই বাংলার সহযোগিতায়। এটার সূচনা বা মূল আগ্রহ আমারই। এগুলো নিয়ে দেবেশ রায়, চিন্ময় গুহ, জহর সেনমজুমদার, শঙ্খ ঘোষ—এঁদের সঙ্গে আলোচনা করেছি। তারা ভীষণ বিস্মিত হয়েছেন। হ্যাঁ, এই কাজগুলো কোনো তাত্ত্বিকের করা উচিত ছিল। যেমন সেলিম আল দীন করে গেছেন। তখন এসব নিয়ে সবাই হাসি-ঠাট্টা করেছেন দ্বৈতাদ্বৈতবাদ নিয়ে। এখন পড়াতে হয় বিশ্ববিদ্যালয়ে। কারও না কারও কাজটা করে যেতে হয়। হয়তো এখন আমি হাসির পাত্র হব। কিন্তু মানুষ দেখবে যে এইগুলো আমাদের ছিল, আছে, থাকবে। এইগুলো আমাদের তত্ত্বের মধ্যে ছিল। কবিতার মধ্যেই ছিল। এমন অনেক তত্ত্ব নিয়ে আমরা কাজ করছি।
বলছিলাম সর্বশেষ কবিতার বই নিয়ে। একেবারে দুই লাইনের কবিতা। এটা কবিতা কি না জানি না। নীতিবাক্য শ্লোক এটা জানি। তবে চেষ্টা করেছি একটা বোধে পৌঁছানোর। পাঠকই মূল বিচারক।

হারুন পাশা : কবিতার সাতটি বই লিখেছেন। একটা বই থেকে আরেকটা বইয়ে কীভাবে পরিবর্তন বা নতুনত্ব রেখেছেন?
শামীম রেজা : সব বিখ্যাত কবিই বলেন মানুষ একজীবনে একটাই কবিতা লেখে। আমার প্রথম কবিতার বই নিয়ে একজন দুর্দান্ত মন্তব্য করেছিলেন, একজন লেখক চলচ্চিত্রকার এখন তো মরমীবাদ কিংবা সুফিবাদ নাই, তোমার এই কবিতার বইয়ের পরতে পরতে এটা আছে। এই কবিতাকে আধুনিকরা কীভাবে নেবে সেটা দেখার বিষয় এইটা আমি বুঝেছিলাম তখন। আমি এখান থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করছিলাম পরের বই ‘নালন্দা দূর বিশ্বের মেয়ে’-তে। সেখানেও বেরুতে পারি নাই। ‘যখন রাত্তির নাইমা আসে সুবর্ণনগরে’-তে সমস্ত কিছু ভেঙেচুড়ে পড়ল। বিশেষ করে এর ভাষাটা আমাদের বরিশাল এবং ঢাকার মিশেলে। মৌখিক ভাষাটা ব্যবহার করেছি। তুমি যেমন বল, এই রিকশা যাবা? যাবেন তো নিশ্চয় বল না। বরিশাল আর ঢাকার ভাষাটা মিলে তৈরি হয় আমার কথ্যও লেখ্যভাষা ভাষা ‘যখন রাত্তির নাইমা আসে সুবর্ণনগরে’। এই কাব্যগ্রন্থের অনেক দুর্নাম যে পড়তে কষ্ট হয় অপ্রচল ভাষায় লেখা। আবার অনেক বিখ্যাত লোকের মন আকৃষ্ট হয়েছে। দেবেশ রায় অবশ্য লিখেছেন পরের বইটা ‘ব্রহ্মাণ্ডের স্কুল’ নিয়ে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের পছন্দ ছিল তিনি পুরস্কৃত করেছিলেন। এটা কবিতা, না গল্প, না উপন্যাস, এটা নিয়ে অনেক বড় লেখা লিখেছেন দেবেশ রায়। সুনীল দা তো ‘যখন রাত্তির নাইমা আসে সুবর্ণনগরে’, এই বইটা আনন্দ পুরস্কারের জন্য বিবেচনায় নিয়েছিলেন। তিনি নিজে বললেন যে দুই ইংরেজ বাঙালি লেখক হাসাহাসি করল যে, এই বাঙ্গালকে পুরস্কার দেওয়া যাবে না। এগুলো কবিতা কী-না নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী এবং সুনীলদা রাজি ছিলেন। পরে তিনি আনন্দ পুরস্কার না দিতে পেরে আমাকে ‘কৃত্তিবাস পুরস্কার’ দিয়েছেন। এমন মজার মজার গল্প আছে। এই বইটা আমার বন্ধুদের মধ্যে অনেকেই নিতে পারেন নাই। আবার এই বই আমাদের প্রজন্মের সবচেয়ে বড় ছান্দসিক কবি মন্দাক্রান্তা সেন এমন প্রশংসা করে এই বইটা নিয়ে লিখলেন, এটা একটা বিস্ময়কর বই তার কাছে।
এর পরে ‘ব্রহ্মাণ্ডের স্কুল’কে দেবেশ রায় দেখলেন অন্য মাত্রিকতায়। ‘ব্রহ্মাণ্ডের স্কুল’-এ আসলে সমস্ত পৃথিবীর ইতিহাসকে ধারণ করা দীর্ঘকবিতা। আর উপনিবেশটা ছিল একদম স্পষ্ট আজকের নব্য উপনিবেশ পর্যন্ত। ‘আমাদের চোখগুলো নিয়ে যারা মার্বেল খেলেছে পশ্চিমপাড়ায়’। আমাদের চোখগুলো নিয়ে তো এখনও মার্বেল খেলছে সবাই, পুঁজি, গণতন্ত্র, সবই ভেক। এইসব আরকি।
পরের বইটা একটু দেরিতে হলো, ‘হৃদয়লিপি’। এখানে যেটা চেষ্টা করলাম সেটা হলো না। আমি খুবই দুঃখিত যখন ছন্দ কিংবা পর্ব বিভাজনগুলো ঠিক করতে পারি নাই এই বইয়ে। এখনও চেষ্টা করছি এই বইটি পুনর্লিখনের। চতুর্দশপদী একটা চেষ্টা ছিল। কিন্তু আমি তো দক্ষ লোক নয়। ফলে  কাজ করছি যে হৃদয়লিপিগুলো চতুর্দশপদী বানানোর। ফলে পর্ব বিভাজনগুলো মারাত্মকভাবে ব্যাহত এখানে। কিন্তু কবিতা হয়ে উঠেছে মনে হওয়ার ছেপেছিলাম। কারণ ‘হৃদয়লিপি’র অনেকগুলো এডিশনও হত এতদিনে। আমার সংস্কার করে দেওয়া হয়নি। আমার এইসব ব্যাপারে কতগুলো জড়তা আছে। ছাপাছাপির ব্যাপারটা আমার কাছে খুব ভয়েরও ব্যাপার। তারপরও এইটা ছাপতে দিয়েছিলাম। ‘হৃদয়লিপি’র সবকটা কবিতাই চৌদ্দ লাইনের অন্ত্যমিলের কবিতা। এই বই নিয়ে শ্রদ্ধেয় শঙ্খ ঘোষের সাথে কথা বলেছিলাম। তিনি বললেন, কৃত্তিবাস পত্রিকায় সুনীলের মাথায় চাপল আমরা চতুর্দশপদী সংখ্যা করব। সবাইকে চিঠি দিলো, লিখল, আমরা কৃত্তিবাস চতুর্দশপদী সংখ্যা করব। সবাই যা লিখল একটাও চতুর্দশপদী হলো না, ঠিকই কিন্তু অনেক কালজয়ী কবিতা হলো। এ নিয়ে অনেক কথা হলো। তো আমার হৃদয়লিপির মধ্যে অনেক কাজ করার আছে। আরও কাজ করব। হয়তো একদিন চতুর্দশপদী কবিতা হিসেবে পাঠক পাবেন।
তারপর ‘দেশহীন মানুষের দেশ’ খুব ছোট একটা বই ছিল। সেটা আসলে ছিল রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু, পৃথিবীর রাজনীতি, ধ্বংসলীলা নিয়ে। এবারেরটা হচ্ছে অনেকটাই সুফিবাদী ঘরানার কিংবা। আত্মার আর মানবিক প্রেমের পদাবলি। এইবারে যে ছোট আকারে বের হচ্ছে। পরে এটাই বড় আকারে চারশত কবিতা নিয়ে প্রকাশিত একই নামে হবে।

হারুন পাশা : ‘যখন রত্তির নাইমা আসে’ কাব্যগ্রন্থটি পশ্চিমবঙ্গের উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চতর শ্রেণিতে পাঠ্য হয়েছে। জানতে চাই বইটি লেখার প্রেক্ষাপট প্রসঙ্গে...
শামীম রেজা : আমি মার্তিকের কবি এমে সেজেয়ারের-এর একটা বই পড়েছিলাম যেটা আফ্রিকানদের জাতীয় সংগীত বলে খ্যাত। ওই কবিতাটা অনেকটা নজরুলের ধরনের, মানে কোনো রকমের আড়াল ছাড়াই সেখানে একটা লাইন ছিল ‘যখন ভোর হয়ে আসে। ওই কবিতার শুরুটা ছিলো, ‘যখন ভোর হয়ে আসে’। এই কাব্যগ্রন্থ থেকে স্বাদেশিকতা, জাতীয়তাবোধ ও উপনিবেশিক শোষণের ফলে মানুষের মনস্তাত্ত্বিক বিপর্যয়ের দর্শন নিলাম আমার এই কাব্যগ্রন্থে। আমি এখানে চেষ্টা করলাম যে ‘যখন রাত্তির নাইমা আসে সুবর্ণনগরে’, এখানে সুবর্ণনগর হলো আমার এই ব-দ্বীপটা। ব-দ্বীপ মানে আমার এই পদ্মা, মেঘনা, যমুনা কিংবা আমার হাজারও নদীর যে অববাহিকা, এই ভূখণ্ডের সমস্ত কিছু। আমি এখানে উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়ে দেবো। এই কবিতার একটি চিত্রকল্পের মধ্যে আর একটি চিত্রকল্প প্রতিকায়িত। প্রথম কবিতাটাতেই দেখ, এই কবিতাটা প্রেমের কবিতা, সেখানেই দেখো, ‘অমরত্বের মৃত্যু হবে নালন্দা’। মানুষ যে অমরত্ব অমরত্ব করে তারও মৃত্যু আছে। আজকে আমরা যাকে অমর ভাবছি তাকে কয়েকদিন পর ভিলেন বানানো হচ্ছে। দেখো, আধুনিক তুরস্কের জনক কামাল আতাতুর্ক, সে এখন সেই দেশে ভিলেন। তাকে ভিলেন বানিয়েছে বর্তমান ডানপন্থি সরকার এর্দুয়ান। ফলে অমরত্বেরও মৃত্যু হয়। তারপরের লাইনে ‘অমরত্বের মৃত্যু হবে নালন্দা, জোছনার জলজ অন্ধকারে’। এখানে অন্য জায়গায় চলে গেল চিত্রকল্প। ‘সোমরস পান করে ঈশ্বর নামছেন সোমেশ্বরী জলে’। ঈশ্বর কি সোমরস পান করে? ঈশ্বরের জায়গায় আল্লাহ্ বললে খবরই ছিল। সোমরস পান করতে ঈশ্বর নামছেন  সোমেশ্বরী জলে। এখানে সোমেশ্বরী হলো আমাদেরই একটি নদী। ‘আমি দশমাস জাইগা থাকব সোমপুরে’। সোমপুর মানে বিহার। কোথায় সোমেশ্বরী আর কোথায় বিহার। ‘আমি দশমাস জাইগা থাকব সোমপুরে, সোমেশ্বরী থেকে দূরে/ তুমি আসবে তন্দ্রায় চন্দ্রা নদীর উপারে।/ আমি ঘুম মন্দিরায় সুর তুলব বাকি ক’মাস টেরাকাটায়/ শিল্পিত খোদাইয়ের মাঝে।’ এই টেরাকাটা, এই সোমপুর বিহারও হতে পারে। কিন্তু তুমি আসবে, সে প্রাচীন বনলতা সেনও হতে পারে, আমার কাব্যেশ্বরীও হতে পারে, আমার প্রেমিকা বা যে পাঠক তার প্রেমিকাও হতে পারে। এরকম করে কবিতাটা মৃত্যুর চিন্তা হয়ে শেষ পর্যন্ত একটা আশাবাদের জায়গায় দাঁড়ায়। এই কবিতাটা হচ্ছে ‘যখন রাত্রির নাইমা আসে’-র সূচনা কবিতা। তারপরই দেখবে সিরিজের প্রথম কবিতাটায়, ‘প্রিয়তমার সবকিছু কলকব্জা মনে হয়’। এই যে বাস্তবতা, রূঢ় বাস্তবতা। আধুনিকতার যে যন্ত্রসভ্যতা, তার যে সুফল, তার যে কুফল কতখানি বেশি, সেগুলো এখানে স্পষ্ট আছে। আর মহাকাব্যিক লেখা মানে হচ্ছে যে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একটা কবিতা। আমাকে ধরে ধরে অনেক জায়গাতে বলতে পারব। মূলত আমি এখান থেকে সরে যেতে চেয়েছিলাম এই কারণে, জীবনানন্দ থেকে বের হতে পারছিলাম না, না ভাষায়, না চিত্রকল্পে। সেটা সম্ভবত জীবনানন্দের মনোবীজ নিয়ে এই বইয়ে বেরিয়ে গেছি। কেউ আমায় জীবনানন্দময়ী কোনো কিছু বলে না। কবিতায় পূর্বপুরুষদের ছাপ তো থাকেই। তবে এই বই থেকে পুরো মুক্ত হয়ে যেতে পেরেছি মাইকেলের মতো পূর্বসূরীদের প্রচলিত ছন্দকে পাশ কাটিয়ে একাকার করে নতুন জগৎ তৈরি করতে পেরেছি এই কাব্যগ্রন্থে তাই জয় গোস্বামী এই কাব্যগ্রন্থের সাহসকে সৈয়দ হকের ‘পরানের গহীন ভিতর’ কিংবা ‘মানুষের মানচিত্র’ রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর বাইরে পশ্চিমবঙ্গীয় মানে প্রভাত বাবুর ছন্দ ও পশ্চিমবঙ্গীয় ছন্দ মননের ধারাবাহিকতা  বলেন—আর ‘যখন রাত্তির নাইমা আসে সুবর্ণনগরে’ কাব্যগ্রন্থকে বলেন বাংলা কবিতার নতুন সাহসী সংযোজনে। এই কারণেই পশ্চিমবঙ্গের উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ একাডেমিক কাউন্সিল সিন্ডিকেট শামসুর রাহমান, নির্মলেন্দু গুণের কবিতার সঙ্গে আমার বইটিও উচ্চতর শিক্ষা পাঠ্যক্রম পাঠ করেছে।

হারুন পাশা : ‘সুবর্ণনগর’ নামে নির্দিষ্ট কোনো নগর নেই?
শামীম রেজা : না, নগর নেই। এটা আমার নদীমাতৃক বাংলা। রূপসী বাংলা। সুবর্ণবাংলা।

হারুন পাশা : মুখের ভাষাটাকে ব্যবহার করেছেন এই কাব্যে। যেমন, নাইমা, থেইকা, খাইয়া, যাইয়া এমন অনেক শব্দ। এই ধরনের শব্দ ব্যবহারে তো অনেকের আপত্তি থাকে?
শামীম রেজা : হুম, আছে। অনেকেই তো গ্রহণ করে নাই। এখন মনে হয় মেনে নিয়েছেন, আমাকে অপমান করা হয়েছে, ডেকে। বিশাল আলোচনা হয়েছে সেখানে আমার কাছের লোকেরা তীব্র সমালোচনা করেছেন। তখন আমি আজকের কাগজে সাহিত্য পাতা সম্পাদনা করি ঢাকা কলেজে পড়াই। তারা এটা নিতে পারে নাই। সমকালে মধুসূদনকে এমনকি পরবর্তী সময়ে রবীন্দ্রনাথ ও বুদ্ধদেব বসু পর্যন্ত মধু কবিকে নিতে পারেননি। রবীন্দ্রনাথকে পর্যন্ত পঞ্চ পাণ্ডবরা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন কবিদের যে সবাই নিতে পারবে এমন কোনো কথা নাই।

হারুন পাশা : আপত্তিটা কেন, এটাও তো আমাদেরই ভাষা। বরং এই ভাষা আরও মানুষের কাছাকাছি।
শামীম রেজা : যে কথা পূর্বে বলেছি আমি জয় গোস্বামীর কথা বলব, জয় গোস্বামীকে আমি বলছিলাম যে আমাকে আপনার এত গুরুত্ব দেওয়ার কারণ নাই। আমার এটার আগে ‘পরানের গহীন ভেতর’ লেখা হয়েছে। তারও আগে লেখা হয়েছে ‘মানুষের মানচিত্র’। কাজী নাসির মামুনও সাথে ছিলেন। জয় গোস্বামী বললেন, শুনুন বাংলাদেশের যত লেখা, যে দুটোর নাম বলেছেন এর সবই আমাদের পশ্চিমবঙ্গীয় ছন্দে এবং বাংলা কবিতার ছন্দের মাত্রা মেনে, অনুশাসন মেনে লেখা। কিন্তু আপনি একমাত্র লোক যে অনুশাসন ছাড়া নিজস্ব একটা পথ নির্মাণ করেছেন। এটা কেউ করতে পারেনি। আপনি আমাকে কি অতি ভালোবাসেন তাই এমন কথা বলছেন? আপনার তো আমার কাছ থেকে পাওয়ার কিছু নাই। বলেন, দেখুন আপনার কবিতা পড়ে এইসব জায়গায় স্তব্ধ হই। এত সাহস একজন মানুষ কীভাবে পায়, সবকিছু ভেঙে একাকার করে নিজস্ব শক্তিতে ভিন্ন একটি ধারার জন্ম দেওয়া এটা সহজ কোনো বিষয় নয়। বাংলা ছন্দে রবীন্দ্রনাথের কাছে বারবার দেখায়ে দেখায়ে প্রবোধবাবু তিনটা-চারটা ছন্দের মধ্যে নিয়ে গেলেন। কিন্তু বাংলা ছন্দে অমিত্রাক্ষর ছন্দ বানায়ে দিলেন একজন মধুসূদন। তারে বাদ দিতে পারল না বাংলা কবিতা। ফলে আমার এটা কি ছন্দ হবে সেটা নির্মাণ করবে যারা ছান্দসিক ভবিষ্যতের, যদি কবিতায় দাঁড়ায় এটা। ফলে আমি কবিতাটা লেখারই চেষ্টা করেছি। ভাষাটা আমার বাহনমাত্র। উৎপলকুমার বসুকে খুব আক্ষেপ নিয়ে বলেছিলাম আমার এই নতুন ভাষা, নতুন ছন্দ নতুন চিন্তার প্রতি আক্রমণ চলছে নিয়ত, দগ্ধ হচ্ছি। উৎপলদা সুন্দর একটি কথা বললেন, বললেন দেখো শামীম, মেহিকোতে যখন মায়া সভ্যতার পিরামিড পাওয়া গেল তখন মিশরীয় সভ্যতার পিরামিড আবিষ্কারকগণ কোনো ভাবেই মেনে নিতে পারছিলেন না, তোমাকে ধৈর্য ধারণ করতে হবে এই কবিতার জন্য, সময় দরকার পড়বে এই কবিতা বুঝতে।

হারুন পাশা : আপনার সময়কার থাকা রাজনৈতিক অস্থিরতা কীভাবে দেখেন বা কবিতায় কীভাবে এসেছে? এনেছেন কী?
শামীম রেজা : আমাদের একটা সুবিধা-অসুবিধা হচ্ছে যে আমরা যখন আঠারো-উনিশ তখনো আমার বয়সের সাথে দেশের বয়সও আঠারো-উনিশ। একটা জিনিস ভাবতেই পারা যায় পুরো বিধ্বস্ত একটা দেশ আঠারো বছরে কতটুকুই-বা দাঁড়ায়। সেই সময়েই তো আমাদের দেখা আর পুরো স্বৈরশাসন। ’৭৫ এ বঙ্গবন্ধুর মতো এমন মহান নেতার মৃত্যু। তারপর দেশবিরোধী যারা তাদেরকে দিয়ে দেশ চালালেন সামরিক শাসকগণ। তারপর যে ঘটনাগুলো ঘটল সবার জানা। এই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তাকে আবার তাড়ান। তারপর আরেক সামরিক শাসক আসলেন। সেইসবের মধ্যে আমাদের জন্ম এবং বেড়ে ওঠা। ফলে আমাদের মনস্তত্ত্বের মধ্যে এই সামরিক উপনিবেশটা এমনভাবে ছিল যে আমরা এই খোলস থেকে বেরুতে যারা চাইলাম তারা কবিতায় অনেক ধরনের কাজ করার চেষ্টা করেছি। সেটা সম্ভবত বেশি হয়েছে আমাদের সময়ে, নব্বইয়ে। সময়টা বলছি এই কারণে সত্তরে খুবই দামামা, সেটি খুব প্রয়োজন ছিল। তাঁদের মধ্য থেকে অনেকেই কবিতা লিখেছেন, কবিতাও লেখেন। আশির দশকটা চেষ্টা করল তাঁরা দামামার থেকে বেরিয়ে পাশ্চাত্যঘরানার নিরীহ কবিতা লিখবেন। আমাদের সময়ে এসে মাটি, প্রকৃতি, ঐতিহ্য, পাশ্চাত্য-প্রাচ্য একাকার করে আমরা কবিতা লেখার চেষ্টা করলাম ভিন্ন রকমের। সেটার প্রতিফলন হয়তো আমার কবিতার মধ্যে থাকতে পারে। বিশেষ করে ‘যখন রাত্তির নাইমা আসে সুবর্ণনগরে’ কাব্যগ্রন্থে দেশ, রাজনীতি, সমাজ বর্তমান বাস্তবতা একাকার

হারুন পাশা : আপনি তো গবেষণা করেছেন দুই বাংলার কবিতা নিয়ে নিম্নবর্গ তত্ত্বের আলোকে। দুই বাংলার কবিতা নিয়েই কেন এই গবেষণাটা করতে হলো?
শামীম রেজা : আমাদের তো কৃষিভিত্তিক সমাজ। এ সমাজের কৃষকরা প্রায় সবাই নিম্নবর্গের মানুষ শ্রমজীবী মানুষ। তারাই আমাদের রাজদরবারে খাবারটা পৌঁছে দেয়। তাদের নিয়েই যাঁরা কাজ করেছেন। শিল্পের সবচেয়ে সমৃদ্ধ জায়গাটা কবিতাকে বলা হয়। এখন পর্যন্ত সেই সমৃদ্ধ জায়গায় যাঁরা নিম্নবর্গের এইসব মানুষ, শুধু কৃষক না, তাঁতি, কামার-কুমার, জেলে এরা সবাই নিম্নবর্গের মানুষ। যারা খেটে খাওয়া মানুষ তাদের উপরে কারা কাজ করেছেন, সেইসব জানার ইচ্ছা থেকেই আমার কাজের আগ্রহ হলো। কলকাতার মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় আর বাংলাদেশের সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ছিলেন আমার পরীক্ষক। তাঁরা থিসিস পেপার পড়ে খুবই বিস্মিত হয়েছিলেন। তাঁদের লেখাগুলো আছে আমার কাছে। তাঁদের মতো হলো এরকমের কাজ করা সম্ভব এবং এরকম কাজের মধ্য থেকে কবিদেরকে চিহ্নিত করা এটা প্রথম কাজ বাংলা গবেষণায়। এই কাজ করতে গিয়ে আমার সুবিধা হয়েছে আবার অসুবিধাও হয়েছে। আমার সুবিধা ছিল যে এঁদের সম্পর্কে আমার ব্যক্তিগত লাইব্রেরিতে সব বইপত্র ছিল। তারপরও অনেক কবিতা নয়, আমার চোখে কিন্তু সেগুলোকেও এখানে অন্তর্ভুক্ত করেছি। সঠিক কবিতা হলো কি না সেটা তো নির্ণায়ক না, আমার নির্ণায়ক হলো ওই কবি নিম্নবর্গের মানুষ নিয়ে কাজ করেছেন কি না? ফলে আমার কবিসত্তা এবং গবেষক সত্তার মধ্যে ভীষণ দ্যোদুল্যমানতা চলেছে। গবেষণা কর্মটি প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন পত্রিকায়। বাংলা একাডেমির পত্রিকাতেও প্রকাশিত হয়েছে। ছোট্ট একটা বইও প্রকাশিত হয়েছে ‘সময়-সময়ান্তরের গল্প’ শিরোনামে ২০১৯। পুরো বইটি করা হইনি।

হারুন পাশা : ‘ঋতুসংহারে জীবনানন্দ’ নামে লিখেছেন গল্পের বই। উপন্যাস ‘ভারতবর্ষ’। যা ঈদ সংখ্যায় প্রকাশিত।  নাটক ‘করোটির কথকতা’ কবিতার বাইরে কথাসাহিত্যে ঝোঁক কেন তৈরি হলো?
শামীম রেজা : গল্প নিয়ে আমি খুবই উন্নাসিক। এ ব্যাপারে নিজেকে খুব অন্যরকমের ভাবি। ছয়টা গল্প নিয়ে ‘ঋতুসংহারে জীবনানন্দ’। নামটা আসলে কালিদাসের কবিতা থেকে দিয়েছেন দেবেশ রায়। আমি দিয়েছিলাম  ‘জীবনানন্দ মায়োকোভস্কি জোছনা দেখতে চেয়েছিলেন’। তিনি বললেন, কোনোভাবেই এটা দেওয়া যাবে না। এগুলো সব পঞ্চাশের মার্কেজিও নাম, আপনার নিজস্বতা কোথায়? দেবেশ রায় পরে আমার বই বা একটা গল্প নিয়ে লিখেছেন, আমাকে ইউরোপমনস্ক বলেছেন। আমার বিপক্ষে লিখেছেন। যেটা বইতে আছে। গল্প এবং উপন্যাসে আমি ভীষণ উন্নাসিক। পাঠক হিসেবে আমার বন্ধুরাও জানে। আমার বন্ধু আহমাদ মোস্তফা কামাল কিংবা মোস্তফা তারিকুল আহসান কিংবা হামীম কামরুল হক কিংবা প্রশান্ত মৃধা সবাই জানে আমি তাদের কোন গল্পগুলোকে গল্প বলি। ধরা যাক পঞ্চাশটি গল্পের ভেতর একটা গল্পকে গল্প বলছি অন্যগুলো ঐ গল্পটি লেখার জন্য সহযোগী। এখন তো তারা গদ্যের প্রতিনিধিত্বকারী লেখক। কিন্তু আমার গল্পগুলো যারা পড়েছেন, আমার গল্পের দুইটা-তিনটা এডিশন হয়েছে, আমার ওই ছয়টা গল্প। এরপরে আরও কয়েকটা গল্প লিখেছি। এরকমের গল্প আসলে বেশি লেখা যায় না। এটা বেশি লেখা সম্ভব না। আর আমি খুব উন্নাসিক বারবার বলছি। দশ পাতা পড়ার পরে আর ওই বইটা পড়া লাগে না। আর পড়ার দরকার নাই। ওরহান পামুকের বই পড়লাম এবারের বিশ্ববিদ্যালয় ব্যাকেন্ডে সময় বেশকটি। পড়ার পর মনে হলো ইউরোপমনস্ক এই লেখক আমাদের চিন্তাকাঠামো বা লেখক ভঙ্গি থেকে এতটা আলাদা কিছু নয়। আখ্যান লেখার সময় দরকার। ওই সময়টা আমার নাই বলে আমার লেখা হয় না। আর যে গল্পগুলো আমার লেখার, আর চিন্তা করেছি তাতে সারা জীবনে ত্রিশটার বেশি গল্প লিখব না। হুয়ান রুলফোর সবমিলিয়ে একটা উপন্যাস, বারো-চৌদ্দটা গল্প, এই। তারপরও মার্কেজরা তাঁকে গুরুই মানতেন। ফলে উপন্যাসে কাজ করেছি ২০০৭ সাল থেকে। ছেপে বসে আশি পৃষ্ঠা সমকাল পত্রিকায়। নিজের মধ্যে লেখকসত্তার থেকে সমালোচক সত্তা বড় হয়ে দেখা দেয়। ফলে নিজের লেখাটা এত ভালোভাবে কাটতে পারি, অন্যের লেখাটার অবস্থা কি হয় বুঝ তাহলে? বেঁচে থাকার ব্যাপারটা হলো এখন তো মহাকাব্যের যুগ নাই। ফলে ব্যাপারটা হলো এখনো উপন্যাসটা লিখছি, লিখব আমার গল্প পড়েছ?

হারুন পাশা : জি।
শামীম রেজা : আমার গল্পের বই নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ কিংবা বাংলাদেশে কেউই কোনো কথা বলে না। কি দেবেশ রায়, হাসান আজিজুল হক তো এখন পড়েন না কিংবা এখনই এই বয়সে পড়তে পারেন না। হাসান ভাইও গল্পের বইটাকে ফার্স্ট বানিয়েছিলেন, একটা বা দুইটা গল্প পড়েছিলেন হয়তো। হাসান আজিজুল হক, বিশ্বজিৎ ঘোষ, ইমদাদুল হক মিলন এসে বললেন যে তোমাকে ফার্স্ট বানিয়েছি, একটি পুরস্কার কমিটির বোর্ড থেকে বের হয়ে এসে। বিশ্বজিৎ ঘোষ তো আপনি আপনি বলেন। এবার আপনি একটা পুরস্কার পাবেন। পেলাম না এটা ২০১১ সালের ঘটনা। আমার বন্ধু পেয়েছে। সে আবার আমাদের নিয়ে যে উপন্যাস লিখেছে সেই উপন্যাসের জন্য পেয়েছে। গল্প বিষয়ে নিজেকে দাবি করি বিশ্বমানের পাঠক আমি। আমি যা লিখেছি এবং লিখব ভীষণ অন্যরকমের, কারণ এখানে খুব উন্নাসিক, চুজি।
আমি কিন্তু নাটক লিখেছিলাম ১৯৯৭। রাতারাতি আমার বিখ্যাত হওয়ার জায়গা ছিল নাটক। মঞ্চস্থ হয়েছিল মুক্তমঞ্চে। শহীদ সালাম বরকত হলের নাটক। আজকের ঢাকা অ্যাটাকের পরিচালক ছিল মূল প্রোটাগনিস্ট, নাট্যকার, গল্পকার রুবাইয়াৎ আহমেদ ছিলেন অন্যতম। সেলিম আল দীন স্যার নাটক শেষে মঞ্চে জড়িয়ে ধরে বললেন ‘বাপ তুই আর নাটক লিখিস না, তুই কবিতায় নোবেল পাবি। আমি তাকে গালি দিয়েছিলাম। আশ্চর্য-সত্য হলো পরবর্তী সময়ে ‘নাট নালন্দা’ নামে নাটকের দল করলাম কিন্তু নাটক লেখা হলো না আর।  

হারুন পাশা : শেষ করব একটা বিষয় জানার ইচ্ছা প্রকাশ করে। সেটা হলো আপনি দুটি পুরস্কার পেয়েছেন, তাও কলকাতা থেকে। বাংলাদেশ থেকে নেই। কারণ কী?
শামীম রেজা : আমি বেসরকারি পুরস্কার দেওয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, ফলে এখানে কোনো পুরস্কারই আমি পাব না, এটা নির্ধারিত জেনেই আমি এই কাজটি করেছি। এখানে কিছু করার নাই। এই নিয়তি মেনেই নিতে হবে।

তথ্যসূত্র : পাতাদের সংসার, সম্পাদক-হারুন পাশা, ২০২০।

/জেডএস/
ঋণ খেলাপের অভিযোগে গ্রেফতার ১২ কৃষক জামিন পেয়েছেন
ঋণ খেলাপের অভিযোগে গ্রেফতার ১২ কৃষক জামিন পেয়েছেন
‘আগামী অক্টোবরে চালু হবে শাহজালালের থার্ড টার্মিনাল’
‘আগামী অক্টোবরে চালু হবে শাহজালালের থার্ড টার্মিনাল’
আগুন-লাঠি নিয়ে খেলতে এলেই সমুচিত জবাব: ওবায়দুল কাদের
আগুন-লাঠি নিয়ে খেলতে এলেই সমুচিত জবাব: ওবায়দুল কাদের
সেনাবাহিনীর অবস্থা নিয়ে মুখ খুললেন জাতীয়তাবাদী রুশ রাজনীতিক
সেনাবাহিনীর অবস্থা নিয়ে মুখ খুললেন জাতীয়তাবাদী রুশ রাজনীতিক
সর্বাধিক পঠিত
পোল্যান্ডের জয়ে আরও চাপে মেসিরা
পোল্যান্ডের জয়ে আরও চাপে মেসিরা
ইউক্রেন ইস্যুতে অবস্থান স্পষ্ট করলো ন্যাটো
ইউক্রেন ইস্যুতে অবস্থান স্পষ্ট করলো ন্যাটো
আবারও নাসিমের অনুসারীদের পেটালো বিএনপির সমর্থকরা
আবারও নাসিমের অনুসারীদের পেটালো বিএনপির সমর্থকরা
মেসি-ফের্নান্দেজের গোলে আর্জেন্টিনার জয়
মেসি-ফের্নান্দেজের গোলে আর্জেন্টিনার জয়
ম্যাজিস্ট্রেটের মামলায় কারাগারে স্বামী
ম্যাজিস্ট্রেটের মামলায় কারাগারে স্বামী