সাকিরা পারভীনের জন্ম ৬ জুলাই সাতক্ষীরার শ্যামনগরে। শ্যামনগরে যার জন্ম তাকে তাকে অঙ্গে-ভঙ্গে রাধাই হতে হয়। শ্যামনগরের রাধার পোশাকি নাম সাকিরা পারভীন সুমা। শেখ মাসুম আলী আর মাসুদা বেগমের দ্বিতীয় কন্যা সাকিরা বসবাস করেন ঢাকার বাসাবোতে আর কবিতার কল্পলোকে। মননে-বলনে কবি হলেও তার জীবন গাথা আছে কথাকার মুম রহমানের সাথে।
প্রশ্ন : এখন কী লিখছেন?
উত্তর : কবিতা লিখছি। কবিতা লেখা আমার কাছে আরাধনার মতো। পাশাপাশি অন্যান্য কাজ করছি।
প্রশ্ন : অন্যান্য কাজ কি চলচ্চিত্র নিয়ে?
উত্তর : হ্যাঁ। দুটো পাণ্ডুলিপি নিয়ে কাজ করছি—একটি সম্পাদনা এবং অন্যটি মৌলিক। মার্লন ব্র্যান্ডোকে নিয়ে কাজ করছি অনেকদিন ধরেই—অন্যটি জঁ-লুক গদারকে নিয়ে একটি সংকলন সম্পাদনা।
প্রশ্ন : মার্লন ব্র্যান্ডোর কাজটি কেমন?
উত্তর : মার্লন ব্র্যান্ডো বিশ্বসেরা অভিনেতাদের একজন। স্তানিস্লাভস্কি মেথডকে তিনি জনপ্রিয় করেছিলেন। অনেক অভিনেতা আছেন তবুও এক-দুজনকে একটু আলাদাভাবে চেনাজানা দরকার—তারা চলচ্চিত্রের জন্য নিজেকে কতটা নিবেদন করেছেন বা তাদের জীবন কেমন ছিলো এসব বিষয় জানা আরকি।
অভিনয়ের ক্ষেত্রে একটা চরিত্র থেকে আরেকটা চরিত্র ফুটিয়ে তোলা এবং নিজেকে নিজেই ছাপিয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা অর্থাৎ নিজেই নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়া—এমন একজন অভিনেতাকে নিয়ে কাজ করার আগ্রহ তৈরি হয়েছিল, মার্লন ব্র্যান্ডোকে নিয়ে কাজ করার মূল কারণ বা উদ্দেশ্য এটাই।
প্রশ্ন : বইটি কবে প্রকাশ হতে পারে?
উত্তর : আশা করছি আগামী বইমেলায়। যদি কোনো প্রকাশক পাণ্ডুলিপি নেন—‘নেন’ বলতে সসম্মানে নেন।
প্রশ্ন : ‘জঁ-লুক গদার’ সংকলনটি করার পিছনে বিশেষ কোনো কারণ আছে?
উত্তর : গতবছর উনি ৯১ বছর বয়সে স্বেচ্ছামৃত্যু গ্রহণ করলেন। যিনি চলচ্চিত্রের সমস্ত তথাকথিত বা প্রচলিত নিয়ম ভেঙে চলচ্চিত্রকে একটি ভাঙচুরের মধ্যে দিয়ে নতুন করে নিজের মতো করে গড়ে তুলেছেন। এছাড়াও বিবিধ কাজ করেছেন, সফল হয়েছেন—আলোচিত, সমালোচিত, স্বীকৃত হয়েছেন। তাকে নিয়ে আমাদের এখানে তুলনামূলকভাবে কম কাজ হয়েছে।
আমি মনে করি এরকম যারা কিংবদন্তি তাদের নিয়ে যত বেশি কাজ হবে তত ভালো হবে। তত আমাদের ছেলেমেয়েরা, নতুন প্রজন্মরা জানতে পারবে এবং তাদেরকে বিবিধ চোখ দিয়ে দেখার চেষ্টাটুকু করবে।
প্রশ্ন : বর্তমান বাংলা চলচ্চিত্র নিয়ে আপনার ব্যক্তিগত অভিমত জানতে চাচ্ছি?
উত্তর : সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি বলতে সে অর্থে আমাদের দেশে কিছু নেই। আমাদের দেশে পেশাদারিত্ব এখনো গড়ে ওঠেনি। কিন্তু সে জায়গায় দাঁড়িয়ে কিছু স্বপ্নবাজ তরুণ ছেলেমেয়েরা কাজ করছে এবং দেশে বিদেশে স্বীকৃতি পাচ্ছে। সেটাও কিন্তু একটা আশার কথা। তবে আমরা তো আরো বেশি চাই, ১৮ কোটি মানুষের দেশে আমরা আরো বেশি চাই। আরো বড় করে আমরা শুধুমাত্র দেশটাকে না বলে সামগ্রিক অর্থে একটা পৃথিবীর কথা ভাবি, সুস্থ একটা সমাজ, রাষ্ট্র বা পৃথিবীর কথা ভাবি সেখানে সকল মাধ্যমে অর্থাৎ মিডিয়া, সাহিত্য, শিল্প-সংস্কৃতি, ইতিহাস সকল পর্যায়ে সুস্থতা দরকার এবং সমন্বিত কাজ করা দরকার বলে আমি মনে করি।
প্রশ্ন : কবি সাকিরা পারভীনের কবিতা-যাপন সম্পর্কে বলুন?
উত্তর : নিজের কবিতা সম্পর্কে বলা একটু কঠিন। মানুষ কবিতা লেখে অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যতের দৃষ্টিকোণ থেকে—নিজের মধ্যে থেকে—একটা কিছু লিখে চলে বা লেখার চেষ্টা করে। আমিও হয়ত সেরকমই চেষ্টা করছি। কতটুকু কী হচ্ছে না হচ্ছে সেটা তো সময়ের কাছে ছেড়ে দেওয়ার ব্যাপার। এছাড়াও সাম্প্রতিক সময়ে আমি গান লিখছি ও সুর করছি। এসব কাজ নিজের সঙ্গে নিজেরই একটা জার্নি—নিজেকে নানাভাবে প্রকাশের মাধ্যম তো এসবই।
প্রশ্ন : নারী-জীবনটাকে কীভাবে আপনার লেখায় আনেন?
উত্তর : আমার অনেক লেখার মধ্যেই নারী-জীবনের কথা আছে। খুন্তি নিয়ে আমার একটা কবিতা আছে। এই খুন্তির সাথে নিজেকে তুলনা করেছি—যে রান্নার সময় কত টক, ঝাল, মিষ্টি, গরম, তাপ সবকিছু সহ্য করে নিচ্ছে। এখানে খুন্তির ক্ষমতা আছে। আমি নিজেকে বা একটা মেয়ে বা নারীকে ওইভাবেই তুলনা করেছি। আমার প্রথম বই ‘কাঠগড়া’—যেটা আমাদের বিয়ের পরে সতীচ্ছেদ প্রথা নিয়ে লেখা। এই প্রথা যে কতটা ভয়ংকর যে আপনার বিয়ের রাতে আপনাকে সতীত্বের পরীক্ষা দিতে হচ্ছে। আমার দ্বিতীয় বই ‘শ্যামনগরের রাধা’ বইটিতে ‘চিঠি’ শিরোনামে লেখা দ্বাদশ শ্রেণিতে অধ্যায়নরত বীথি বসুনিয়া অকালে মৃত্যুবরণ করলো—তার মৃত্যুতে হোস্টেল কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকলো না। একটা মেয়ে দুইদিনের ছুটি নিয়ে বাড়িতে গেলো এবং তাকে জোর করে বিয়ে দেওয়া হলো। এরকম নানারকম ঘটনা নিয়ে লেখা হয়। এছাড়াও মুনিয়ার মৃত্যু, কুমিল্লার তনু হত্যা, সোনাগাজীর মাদ্রাসা ছাত্রী নুসরাত জাহান আগুনে পুড়ে মারা গেলো এসব নিয়ে লেখা হয়েছে ‘সর্বশান্ত যোনি’। ‘সূচের সিংহাসন’ নামে একটি পাণ্ডলিপি গোছানো শুরু করেছি আগামী বছর বইমেলার জন্য। নারীদেরকে নিয়ে নির্দিষ্ট আরো কিছু কাজ করার ইচ্ছে আছে।
প্রশ্ন : আজকাল কী পড়ছেন?
উত্তর : আমি একসাথে অনেক বই পড়তে থাকি। রবীন্দ্রসংখ্যা মানে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে যতগুলো আর্টিকেল সবগুলো পড়লাম দু-একটা বাদে। নতুন কিছু বিষয়, দৃষ্টিভঙ্গি সেখানে পেলাম। জাপানি কবি Yoko Ono-এর Grapefruit গুরুত্বপূর্ণ এবং অসাধারণ বইটি পড়ছি এবং অনুবাদ করছি। হাসনাত শোয়েবের ‘সন্ধ্যায় ভুল পথে আহীর ভৈরব’ বইটি পড়ছি। চিন্ময় গুহের ‘হে অনন্য নক্ষত্রবীথি’ থেকে কিছু প্রবন্ধ পড়ছিলাম। স্বরাজ মননের তত্ত্বচিন্তায় দাসত্বের বিকল্প বই, ‘জয়ের শক্তি’ নামে একটি বই পড়ছিলাম। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বাংলার ব্রত’ বইটিও দেখছিলাম। পড়ার যাদের নেশা তারা তো বই পড়েই থাকে। এছাড়া লেখার জন্যও বই পড়তে হয়।
পড়ছি ইতিহাস, লিখছি মুক্তিযুদ্ধের গল্প-উপন্যাস ।। ইমতিয়ার শামীম









