আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি শামসুর রাহমানের ২০তম প্রয়াণদিবস আজ। ২০০৬ সালের ১৭ আগস্ট তিনি ঢাকার পিজি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর প্রয়াণদিবসে কবি জুয়েল মাজহার কবির সুদীর্ঘ সাহিত্যিক জীবন ও কবিসত্তাকে দেখেছেন নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও মূল্যায়নের মধ্য দিয়ে।
কেমন আছেন? বাংলা ট্রিবিউনের পক্ষ থেকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। একজন কবি হিসেবে আপনার কাছে শামসুর রাহমানের কবিতার কোন দিকটি সবচেয়ে ভালো লাগে?
শামসুর রাহমানের কবিসত্তা আর ব্যক্তিসত্তা অভিন্ন। উদার আধুনিক বিশ্বজনীন আর সর্বমাঙ্গলিক এক বোধ ছড়িয়ে আছে তাঁর কবিতায়। যা তাঁর ব্যক্তিসত্তারই প্রতিভূ। কোনো ধরনের পশ্চাৎপদ চিন্তা ও বিশ্বাসের শেকলে বন্দি ছিল না তাঁর মন। তিনি করেননি বিশেষ কোনো মতবাদের দাসত্ব। কোনো গোত্র-বন্দনা বা বিশেষ কোনো গোত্র-প্রীতির লেশমাত্র নেই তাঁর রচিত বাক্যে বা উচ্চারিত কথায়। বর্ণবাদের কোনো চোরাস্রোতের দেখা মিলবে না তাঁর কবিতায়। এমনকি কোনো মানবসম্প্রদায়ের প্রতি অমূলক রাগ অথবা বিরাগ। আমার ভালো লাগে তাঁর এই উদার আধুনিক মনোভঙ্গি।
আধুনিকতার সবচেয়ে বড়ো পরিচয়চিহ্নগুলোর একটি হচ্ছে, কোনও অতিলৌকিক বা অলৌকিকের আবেশ থেকে মুক্তি। শামসুর রাহমানের কবিতা পূর্ববঙ্গের কবিতায় এনেছিল সেই বন্ধনমুক্তির দিশা। তিনি যে-সময়ে কবিতা লিখতে এসেছিলেন তখন বাংলাদেশের কবিতা ছিল অতীতমুখিতা ও ভাবালুতাদুষ্ট। এই ভাবালুতা ও অতীতচারিতা ছিল ধর্ম ও ধর্মসম্প্রদায়কে ঘিরে। বিষয় ছিল ফেলে আসা মধ্যযুগের; বলা যায়, ‘মধ্যপ্রাচ্যভরপুর’ পদ্যপুঞ্জকেই কবিতা বলে চালানো হতো তখন। আর ভাষাও ছিল পুথির ভাষার মতোই একরৈখিক, সরল, অতিউচ্ছ্বাসময় আর আবেগে কাতর। এমনকি সৈয়দ আলী আহসানের মতো কবিও তখন ‘চাহার দরবেশ’ লিখে ভাবালুতার স্বর্গ রচনা করেছিলেন। পরে অবশ্য সে-ভুল বুঝতে পেরেছিলেন আলী আহসান, আর অস্বীকারও করেছিলেন তার সূচনাপর্বের কবিতাবলিকে।
হুমায়ুন আজাদ ‘নিঃসঙ্গ শেরপা’-র যে অভিধাটি দিয়েছিলেন শামসুর রাহমানকে, আমি মনে করি তা ছিল যথার্থ। আর্তুর র্যাঁবো বলেছিলেন, ‘কবিতা গোত্রের ভাষাকে পরিশুদ্ধ করে এবং তাতে নতুন রক্ত সংবহন করে।’ শামসুর রাহমান পূর্ববঙ্গের ভাষায় নতুন রক্ত-সংবহনই শুধু করেননি, সেইসঙ্গে একাই তৈরি করেছিলেন পূর্ববঙ্গের আধুনিক কবিতার ভাষা।
শামসুর রাহমানের কবিতার বিষয়, ভাব, ভাষা, আঙ্গিক ও উপমারূপক কত কিছুই না ভালো লাগে আমার! তবে সবচেয়ে ভালো লাগে তাঁর প্রাগ্রসর চিন্তা, উদার অসাম্প্রদায়িক বিশ্বজনীন মন আর সর্বমাঙ্গলিক বোধ; যা তাঁর কবিতাকে সকল ক্ষুদ্রতা থেকে, সকল তুচ্ছতা থেকে, সকল প্রাদেশিকতা আর সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত রেখেছে।
আপনি বললেন, শামসুর রাহমান সেই সময়ে মধ্যযুগের পুঁথির ভাষার মতো অতিউচ্ছ্বাসময় ভাবালুতাকে বর্জন করে কবিতায় সর্বমাঙ্গলিক বোধে অসাম্প্রদায়িক চেতনার বীজ রোপণ করতে পেরেছিলেন। এর পাশাপাশি, তাঁর কবিতায় যে নাগরিক জীবন ও মধ্যবিত্তের দৈনন্দিনতা এত জীবন্তভাবে উঠে এসেছে, সেটিকে আপনি কীভাবে দেখেন?
শামসুর রাহমানের কবিতা প্রতিদিনের জীবনকল্লোলমথিত। যে-নগরের বাসিন্দা তিনি, সে-নগরকে তিনি তুলে এনেছেন নানাভাবে, নানা লাবণ্যে-গরিমায়। তবে তা কোনো উঁচকপালে ব্যক্তির দৃষ্টিতে নয়, বরং এক ছাপোষা মধ্যবিত্তের আয়নায়। বেড়ে উঠেছেন, বড়ো হয়েছেন পুরান ঢাকায়। পুরান ঢাকার জীবন, সেখানকার বিভিন্ন পাড়া-মহল্লার উৎসব-পার্বণের কথা, সেখানকার আদব-লেহাজ, রীতিনীতি, সেখানকার বাসিন্দাদের কর্মমুখরতার কথা, মুরুব্বি ও মাতব্বরদের কথা, কাজিয়া ফ্যাসাদের কথা----সবই উঠে এসেছে তাঁর কবিতার বিপুল ক্যানভাসে।
ঢাকাইয়া কুট্টিদের কথোপকথনের পুরোটা জুড়ে থাকে প্রচুর খিস্তি-খেউড়। কিন্তু তা কখনোই খিস্তি বলে গণ্য নয়, বরং জীবনঘন ভাষার স্বাভাবিক প্রকাশমাত্র। ‘এই মাতোয়ালা রাইত’ নামের একটি দীর্ঘ মাস্টারপিস কবিতাও তিনি রচনা করে গেছেন পুরান ঢাকার আদি বাসিন্দা ঢাকাইয়া কুট্টিদের ভাষায়। অসামান্য সেই কবিতায় পুরান ঢাকা প্রতিদিনের জীবনকল্লোলসহ মহাকাব্যিক ব্যাপ্তি ও ব্যঞ্জনাসহ ধরা দিয়েছে। দীর্ঘ এই কবিতাটিকে কিছুকাল আগে আমি ইংরেজিতে অনুবাদও করেছি। যা প্রকাশিত হয়েছে সুমন গুণ সম্পাদিত ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ‘বান্ধবনগর’ পত্রিকায়।
তাঁর কবিতায় ভিস্তিওয়ালাদের দেখা মেলে, দেখা মেলে সহিসের, গাড়োয়ানের, জহরিলাদের, বেহায়াগলির মেয়েছেলেদের, কারখানার কারিগর ও ঘোড়ার গাড়ির চালকদের, মুটে-মজুর ও ধাঙ্গড়দের; দেখা মেলে উকিল মোক্তার, অফিসের কেরানিদের। সার্কাসের আহত ক্লাউন, অলিগলিতে খেলনার দোকানের সামনে ভিখিরি ও দর্শকেরা, অন্ধ বেহালাবাদক, বেশ্যার দালাল ও খদ্দের, লাশঘরের পাশে জড়ো হওয়া মানুষজন, পার্কের নিঃসঙ্গ খঞ্জ, ভণ্ড ফকির, পুরো ঢাকার নগর নিসর্গ আর বিবিধ পেশা ও কর্মে সদাব্যস্ত মানুষজন----সবাই তার কবিতায় নানাভাবে উপস্থিত নিজস্ব স্বরে ও অবয়বে। অকপট তার বর্ণনাভঙ্গি ও ভাষা। এবং তা এক অনুকরণীয় ভাষায় প্রকাশিত। পূর্ববঙ্গ বা বাংলাদেশের কবিতায় নাগরিক চেতনার একক উদ্গাতা ও অধীশ্বর তিনি। এদিকটায় তিনি একমেবাদ্বিতীয়ম; নতুন একটি ধারার নির্মাতা ও পথপ্রদর্শক।
এবার একটু ভিন্ন প্রসঙ্গে আসি। শামসুর রাহমানের প্রেমের কবিতাগুলো পড়লে তাঁর কবিসত্তার কোনো দিকটি আপনার কাছে ধরা পড়ে?
প্রেম শামসুর রাহমানের কবিতার গোপন ফল্গু ও প্রেরণা। তাঁর কবিতায় প্রেমের পৌনঃপুনিক উপস্থিতি দেখতে পাই। তবে এ-প্রেম নিবীর্য-নিষ্কাম নয়; প্লেটোনিকতার মেকি ছদ্মবেশ সরিয়ে দিয়ে সংরক্ত ও শরীরী প্রেম উঠে আসে তার কবিতায়। ‘হেলেনের স্তন চোষা ঠোঁট’—এহেন পঙ্ক্তি রচনার দুঃসাহস তাঁর ছিল শুরুর পর্যায়েই। এই অতি-নিরীহ পঙ্ক্তিটি তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজে এবং বাংলা কবিতাপাড়ায় তুলেছিল তীব্র আলোড়ন। প্রেমকে শামসুর রাহমান বিচিত্ররূপে ও সুষমায় প্রকাশ করেছেন। শরীরকে অবলম্বন করেও তা শরীরকে অতিক্রম করে গেছে অবলীলায়। তাতে কবিতা পেয়েছে নতুন মাত্রা; যেমন, একটি ছোট্ট মিনিমালিস্ট কবিতা আছে (নাম ভুলে গেছি কবিতাটির):
ভালোবাসা যদি পুনরায় ফুল্ল মুখ তুলে চায়
ভালোবেসে, তবে আমি সাইকেল চালিয়ে দিগন্তে যাবো
বকুল শেফালি আর জুঁই নীল দীর্ঘ পথে ছড়াতে ছড়াতে
ভালোবাসার অমল পরশ পেলে সাইকেল চালিয়ে দিগন্তে যাওয়ার ঘোষণাটি অভিনব। সেইসঙ্গে তা প্রচল চিন্তার একঘেয়েমি থেকে মুক্তির বরাভয় আনে। তার কবিতায় শরীর আসে সুন্দরের প্রতিনিধি হয়ে, আবেগের সহচররূপে। শরীর মূল কাম্যবস্তু নয় তাঁর, বরং শরীরের মধ্য দিয়ে দয়িতার হৃদয়কে স্পর্শ করার আকুতিতেই তা প্রবল সুন্দর।
প্রেমের কবিতাকে যে উঁচু মহলের কুলীন ভাষায় রচিত হতে হবে, তেমন শর্ত মানতে নারাজ শামসুর রাহমান। তাই কবিতার বাঁধা ছক ভেঙে অন্ত্যজ মানুষ, দেহাতি মানুষের ভাষায়ও ব্যক্ত করেছেন প্রেমানুভূতি। এক নারী ঢাকাইয়া কুট্টির ভাষায় তার মদোমাতাল প্রেমিক-খদ্দেরের মন রাঙাতে বলে: ‘তুমি বেপারি আমার মনের মানু, দিলের হকদার’।
তবে প্রেমের কবিতার শিল্পসফলতার কথা যদি মাথায় রাখি তাহলে আমি এখানে তাঁর বহুস্তর, অর্থময় আর গ্রন্থিল একটি কবিতার কথা বলব; যা আদতে একটি সনেট। গতি-ভাব-বিন্যাসের অভিনবতার কারণে আমার বিবেচনায় বাংলা সাহিত্যে এরকম সনেট দ্বিতীয়টি নেই। সনেটটি নাম ‘রেনেসাঁস’। কবিতাটিতে রেনেসাঁ বা উজ্জীবনের কথা আছে, যা এক তেজী দীপ্র ঘোড়ার মতন গরিমাময়। পাশাপাশি যুদ্ধ, রৌদ্রস্নাত রণপোত, মারী মন্বন্তর, আগুনে পোড়া গমক্ষেত---এসবের বর্ণনা পাই। কিন্তু কবিতায় মাঝপথে হঠাৎ উদিত হয় এক আবছা নারীমুখ, যা কবিতায় ক্রমশ-ব্যাপ্ত-হতে-থাকা ভয়াবহ বোধের রিলিফ দেয়, উত্তেজিত স্নায়ুকে শান্ত করে। এ-পর্যায়ে দয়িতাকে উদ্দেশ্য করে কবিতার শেষ স্তবকে এসে কবি ঘোষণা করেন প্রেমের সার্বভৌমত্ব; ঘোষণা করেন, প্রেমিকার উদ্দেশে কতিপয় চতুর্দশপদী লিখবেন তিনি। আকণ্ঠ পান করবেন শুভ্র সূর্যোদয়। মড়কের প্রতি উদাসীন হয়ে ছুটবেন অশ্বারূঢ় নাইটের মতো। প্রকৃতিতে তখন ছড়িয়ে পড়বে জ্যোৎস্নার আলো, সে-আলোতে জ্বলজ্বল করবে তার টগবগে তেজি ঘোড়াটির গ্রীবা।
এই সনেটটির কথা ১৯৯৩ সালের এক সকালবেলায় আমি বলেছিলাম কবিকে। ব্যাখ্যা করেছিলাম বাংলাসাহিত্যে এই সনেটের অভিনবতা ও বহুস্তরতার কথা। কবি মনোযোগী শ্রোতা হয়ে শুনেছিলেন আমার সেই দীর্ঘ বয়ান। বলেছিলেন, তুমি এত বিস্তৃতভাবে বললে, পারলে এর লিখিত রূপ দাও। আমার স্বভাব-আলস্যের কারণে সে-লেখাটি এখনও লিখে উঠতে পারিনি। তবে আমি এই সনেটটিকে অনুবাদ করেছিলাম এর ছন্দ-আঙ্গিক অবিকল রেখে; যা ছাপা হয়েছিল ‘পোয়েটিক ডেল্টা’ নামে কবি-অনুবাদক নঈম ফিরোজ সম্পাদিত একটি ইংরেজি সংকলনে। কয়েক বছর আগে সংকলনটি প্রকাশিত হয়েছিল ইংল্যান্ড থেকে। কৌতূহলী পাঠকের জন্য পুরো কবিতাটি তুলে দিলাম নিচে:
রেনেসাঁস
শামসুর রাহমান
চকচকে তেজী এক ঘোড়ার মতন রেনেসাঁস
প্রবল ঝলসে ওঠে চেতনায়, ক্ষিপ্ত তরবারি
রৌদ্রস্নাত রণতরী, তরঙ্গে তরঙ্গে নৃত্যপর
জ্বলন্ত গমের ক্ষেত, আদিগন্ত কালো মহামারী
অলিন্দে রহস্যময়ী কেউ, দিকে দিকে প্রতিদিন
ভ্রাম্যমাণ অশ্বারোহী মাঝিমাল্লা স্মৃতিতে ভাস্বর
জেল্লাদার ট্রফি, অসিচালনা অথবা বল্লমের
খেলা—কোনো কিছু নয়, সেকালের মেধার উল্লাস
এখনো আমাকে টানে, তোমার উদ্দেশে কতিপয়
চতুর্দশপদী লিখে নিশীথের শেষ প্রহরের
ক্ষয়িষ্ণু বাতির দিকে চোখ রেখে শুভ্র সূর্যোদয়
আকণ্ঠ করবো পান, মড়কের প্রতি উদাসীন
অশ্বারূঢ় নাইটের মতো যাবো, সভ্যতার বিভা
উঠবে চমকে জ্যোৎস্নালোকে, জ্বলবে ঘোড়ার গ্রীবা
শামসুর রাহমানের কবিসত্তাজুড়ে প্রেমের উপস্থিতি নানারূপে মুখর, বাঙ্ময়। প্রচলের আগল ভেঙে প্রেমকে তিনি লীলায়িত করেছেন তাঁর মেধাবী শব্দপুঞ্জে, অভিনব রূপকে, মনমোহন চিত্রকল্পে আর নতুন বিন্যাসে ও ভাবে। বৌদ্ধিক ঝলকের পাশাপাশি প্রেমের সংরাগদীপিত শোভাময়তা তাঁর কবিতাকে করেছে লাবণ্যময় ও গরিমাময়। তাঁর প্রেমের কবিতাগুলো আমাদের ভাষার সম্পদ।
হুমায়ুন আজাদ একবার তাঁকে প্রশ্ন করেছিলেন, আপনার প্রেমের কবিতা কি শুধুই কল্পনার সৃষ্টি? না ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতালব্ধ? তখন শামসুর রাহমান বলেছিলেন, আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতালব্ধই অধিকাংশ প্রেমের কবিতা। তিনি নাকি তাঁর ড্রয়ারে প্রেমিকাদের চিঠি-ছবি লুকিয়ে রাখতেন। আচ্ছা, এবারে, আমরা তাঁর কবিতার ভাষা ও নির্মাণশৈলী নিয়ে কথা বলি। এ বিষয়ে আপনার নিজের পাঠ-অভিজ্ঞতা কী বলে? তার কবিতার কোন বৈশিষ্ট্যটি পরবর্তী প্রজন্মের কবিদের সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছে বলে মনে করেন?
আমার বিবেচনায়, জীবনানন্দের পর সর্ববাংলা মিলিয়ে শামসুর রাহমান হাতেগোনা সবচেয়ে বড়ো কবিদের একজন। তাঁর ভাষা, তাঁর প্রকরণ, তার ছন্দশোভা, তাঁর আঙ্গিক-নিরীক্ষা, তাঁর কল্পনাপ্রতিভা ও তাঁর নিজস্ব চারু ভঙ্গি বাংলা কবিতায় তাঁকে সম্রাটের আসন দিয়েছে। আগেই বলেছি, বাংলাদেশের আধুনিক কবিতার ভাষার পুরোটাই তৈরি করেছেন তিনি একা। বাংলাদেশে আমরা আজ যে-ভাষায় কবিতা লিখছি, তা শামসুর রাহমানের একার হাতে তৈরি করা ভাষারই কিছুটা অদল-বদল-করে-নেওয়া রূপ। পূর্বপুরুষের রেখে যাওয়া আসবাবকে একটুখানি সংস্কার করে উত্তর-পুরুষেরা যেভাবে ব্যবহার করে আর কি!
নজরুল, রবীন্দ্রনাথের (কিছুটা জীবনানন্দের) বাইরে যে আধুনিক কবিতাবলয় তৈরি হয়েছিল বাংলাভাষায়, তার ঢেউ খুব একটা তখনো পৌঁছে নি পূর্ববাংলার সিংহভাগ সাহিত্যমোদী পাঠকের কাছে। পূর্ববঙ্গের কবিতাবলয়টি ছিল পুরাতন ভাষার মোহপাশে বন্দি। তাছাড়া পাঠ্যপুস্তকে সাবেকি ভাষায় রচিত পদ্যকেই কবিতা বলে সাব্যস্ত করা হতো তখন। পূর্ববঙ্গের বাঙালিকে, বিশেষ করে কবিতা ও শিল্পবিমুখ বাঙালি মুসলমানকে, আধুনিক কবিতা পড়িয়ে ছাড়লেন শামসুর রাহমান। সেজন্য দরকার ছিল উপযুক্ত ক্ষেত্র প্রস্তুত করা, উপযুক্ত এক ভাষা তৈরি করে নেওয়া। তিনি তা করলেনও বিপুল সফলতাসহ। আস্তাবলে জমে-থাকা গাঁদ পরিষ্কার করে যেভাবে তার ভেতর দিয়ে নদী বইয়ে দিয়েছিলেন হারকিউলিস। নিঃসঙ্গ শেরপারূপী শামসুর রাহমান একাই সেই কাজটি করলেন।
আজ উল্লম্ফনবাদীরা ভাবে, এসব কিছুই, এই ঝকমকে আধুনিকতা, কবিতার এই মসৃণ পথচলা বুঝিবা হঠাৎই আকাশ থেকে টুপ করে পড়েছে। ক্রিসমাসের সময় বাচ্চারা যেমন গিফট পেয়ে এরকম কত কিছুই না ভাবে!
শামসুর রাহমানের মতো প্রকৃত অর্থে বড়ো কবিরা কেবল কবিতা রচনা করেই ক্ষান্ত হন না; বরং তাঁরা ভবিষ্যকালের জন্য, অনাগত প্রজন্মের জন্য ক্ষেত্র প্রস্তুত করেন, করে যান নতুন পথরচনা; তাঁরা পশ্চাৎপদ জনপদে শিল্পে-আগ্রহী মানুষকে শেখান কবিতা ও ভাষার নানামুখী লীলা ও সন্তরণ। যেমনটি করেছিলেন মাইকেল; একাই বন-জঙ্গল কুপিয়ে, ঢেলা ভেঙে মসৃণ করে, বীজ রোপণের উপযোগী করে। যেমন করেছিলেন পরে রবীন্দ্রনাথ। জীবনানন্দ দাশও করেছিলেন অনাস্বাদিতপূর্ব এক জগতের পথরচনা—তার নিজের ‘আপন মুদ্রাদোষে’। এই কবিরা একইসঙ্গে কবি, পথপ্রদর্শক ও দ্রষ্টা।
শামসুর রাহমান চকিত ঝলক-সর্বস্বতার কবি নন। ছোট দৌড়ের উসাইন বোল্ট নন। বরং তিনি এক ম্যারাথন রেসার। ইথিওপিয়ার ম্যারাথন রেসার আবিবি বিকিলার মতো। যিনি জুতাহীন খালি পায়ে অলিম্পিকে ম্যারাথন রেস জিতে দুনিয়াকে চিনিয়েছিলেন নিজের জাত। শামসুর রাহমানও বাংলাদেশের কবিতায় খালি পায়ে দৌড় শুরু করে মুকুটজয়ী এক আবিবি বিকিলা।
শামসুর রাহমানের মতো বড়ো কবিদেরও অপচয় আছে। সব বড়ো কবিরই তা থাকে। তাই বলে অপচয়টাকেই বড়ো করে দেখে বদনাম করে যায় অনেকে। রবীন্দ্রনাথও এহেন অপবাদের শিকার কম হননি। কিন্তু অপচয়কে সরিয়ে নিলে এই মহাজন কবিদের সমগ্র কাজের ভেতর যে পরিমাণ স্বর্ণশস্য পাওয়া যায়, তার তুল্য কাজ গৌণকবিরা হাজার বছর আয়ু পেলেও রেখে যেতে পারবে না।
আমাদের চারপাশে শামসুর রাহমানের মতো বড়ো কবিকে ছোটো করে দেখানোর জন্য কবিনামধেয় অনেকের লাঙ্গুল-তাড়না দেখতে পাই আজকাল। অথচ এরা জানে না, সূর্যের এক নিমেষের আলোকপাতের সমান নয় কোটি মশালের আলো। উপকূলের অদূরে ধীরগতির কোনো সমুদ্রগামী জাহাজের পাশ দিয়ে চলা দ্রুতগামী ডিঙি নৌকার মাঝির মনে হতেই পারে, ‘এতবড় জাহাজও তো আমার ডিঙির সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে না।’ এটা তার দোষ নয়; ক্ষুদ্র জলসীমার মাঝি বলেই সে এমনটা ভাবে। বিশাল উন্মুক্ত সদানির্ঘোষময় সাগরের বিশালতা সে দেখতে পায় না বলেই তার দেখার দিগন্ত এত ছোট। কেননা, দূর থেকে আকাশের চাঁদকেও নিজের ভাতের থালাটির চেয়ে ছোটো বলেই মনে হয়। নজরুল যেমন বলেছিলেন একদা:
‘তিন্তিরি গাছে জোনাকির দল
চাঁদের নিন্দা করে কেবল’
আবার অনেক পাঠকের কাছে কিন্তু শামসুর রাহমান মূলত ‘স্বাধীনতা ও স্বদেশের কবি’। এই পরিচয়ের বাইরে একজন কবি হিসেবে তাঁকে নতুন করে পড়তে হলে কোন কবিতা বা কোন পর্যায় থেকে শুরু করা উচিত বলে আপনি মনে করেন?
প্রকৃত কবিকে, বিশেষ করে আধুনিককালে এসে কোনো কবিকে কোনো একটি বিশেষ তকমায় চিহ্নিত করা তাঁর বহুমাত্রিকতাকে অস্বীকার করা। তাঁকে একটি নির্দিষ্ট গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ করে ফেলা। যেমনটা একদা করা হয়েছিল কাজী নজরুলের নামের পাশে ‘বিদ্রোহী কবি’ তকমা জুড়ে দিয়ে। স্বদেশ ও স্বজাতিকে নিয়ে কবিরা কলম ধরবেন এটাই স্বাভাবিক। শামসুর রাহমানও তাঁর স্বদেশের কথা, জীবন ও সমষ্টির সংগ্রামের নিবিড় আলেখ্য রচনা করেছেন তাঁর কবিতায়। আসাদের শার্ট, স্বাধীনতা তুমি, গেরিলা, টেলিমেকাস, চাঁদ সদাগর—এরকম বহু কবিতায় স্বদেশ ও স্বজাতির কথা বলেছেন রাহমান। এটা তাঁর কবিতার বহুগামিতা ও বহুস্তরতার একটি বিশেষ দিকমাত্র। এর বাইরেও বিচিত্র বিষয়ের, ভাবের দোলা ও বিস্ময় ছড়িয়ে আছে তাঁর কবিতার ম্যারাথন-যাত্রায়। আধুনিক ব্যক্তিমানুষের একাকিত্ব, ব্যক্তির মনের নানা আলো ও অন্ধকার, প্রেমের মধুরতা ও বিষাদ, আত্মপীড়ন ও আমোদ, আর্তি ও ক্ষোভের কথাও তো আছে শামসুর রাহমানের কবিতায়। সেইসব বহুচারিতা ও বহুবৈচিত্রকে ভুলে গিয়ে শুধু একটি দিককে বিশেষ করে তোলার যে প্রবণতা, তাকে আমি অযথার্থ বলেই মনে করি। এই প্রবণতা অন্ধের হাতি দেখার মতোই। বরং শামসুর রাহমানের মতো একজন প্রকৃত অর্থে বড়ো কবিকে দেখতে হবে তার সমগ্রতায়; তাকাতে হবে তাঁর কবিতার বিপুল আয়নায়।
কোনো বিশেষ কবিতাবলি বা বিশেষ পর্যায়কে মাথায় রেখে তাঁকে নতুনভাবে পড়ার চেয়ে বরং তাঁকে পড়তে হবে বিভিন্ন পর্যায়ে লেখা স্মরণযোগ্য কবিতাগুলোকে মাথায় রেখে। যদিও মনে রাখা ভালো যে, শিল্পগতভাবে দুর্বল কবিতাও অনেক সময় নিবিড়, উদ্দীপক ও সংক্রামক বাক্যের কারণে হয়ে উঠতে পারে ‘স্মরণযোগ্য’। বিভ্রান্তি এড়ানোর জন্য কথাটা তাই বলতেই হলো।
আমি তাঁর সেইসব কবিতাকে পড়তে বলব, যেগুলো শিল্পগতভাবে চূড়ান্ত সিদ্ধির পরিচয় বহন করে। যেগুলোতে শামসুর রাহমান যোজন করেছেন নতুন ভাবকল্পনা, অভিনব উপমা-রূপক, নতুন অর্থসৌন্দর্য, শব্দার্থের অতিরিক্ত ব্যঞ্জনা। যেগুলোতে পাই উজ্জ্বল বাক্প্রতিমা, নতুন চিত্র ও দৃশ্যকল্প। স্বাভাবিকভাবেই, গড়পড়তা পাঠকের সুদৃষ্টি ও পক্ষপাত থাকে কেবল জননন্দিত বিষয়ের দিকে। কী কী বলা হলো, কোন কোন জনগণমনোচিত বিষয় নিয়ে কবিতা লেখা হলো, গড় পাঠকের পক্ষপাত থাকে সেদিকেই। কিন্তু শিল্পে তা তেমন কোনও মূল্য বহন করে না। কী বলা হলো বা কি বিষয়ে বলা হলো, তারও চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে কীভাবে বলা হলো। যদি তা মানি, তবে শামসুর রাহমানকে নতুন করে পড়তে হলে পড়তে হবে তাঁর কম জনপ্রিয় অথচ সাহিত্যমূল্যে উত্তীর্ণ কবিতাগুলো।
শামসুর রাহমানের প্রথম কবিতাবই থেকে শেষ কবিতাবই অব্দি----সবখানেই ছড়িয়ে রয়েছে তার প্রতিভার সিগনেচার, তার নিজের ভাষা ও ভঙ্গি, তার পাগমার্ক বা ‘বাঘের পায়ের ছাপ’। এর মানে, তাঁর সব পর্যায়ের কবিতাবলি থেকে ছেঁকে নিতে হবে, শনাক্ত করতে হবে সবচেয়ে উজ্জ্বল, সবচেয়ে কল্পনাপ্রতিভাঘন কবিতাগুলোকে। যেসব কবিতায় রয়েছে নিজস্ব ভাষাভঙ্গির নানা রকমের উদ্ভাস, নানা রকমের বাক্প্রতিমা, রূপক ও প্রতীক।
‘প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’—তাঁর প্রথম কবিতাবই। এই বইয়ের ‘রুপোলি স্নান’ কবিতায় দেখি—‘এখনো যে শুই ভীরু-খরগোশ-ব্যবহৃত ঘাসে’। এই পঙ্ক্তির আলো ও ম্যাজিক দেখতে পাই ‘ভীরু-খরগোশ-ব্যবহৃত ঘাসে’— এই শব্দবন্ধটিতে; যা স্বপ্নজড়ানো এক দৃশ্যকল্প সাজিয়ে রাখে পাঠকের মন ও দৃষ্টির সামনে।
আবার ‘এই মাতোয়ালা রাইত’ কবিতায় দেখি, মৃত্যুর অনিবার্যতাকে তিনি তুলে তুলে এনেছেন এক মদোমাতাল ঢাকাইয়া কুট্টির জবানে—‘আমার জেবের লোটের লাহান হাচা মৌত’। তাঁর কল্পনাপ্রতিভার দৌড় কত দূরগামী তা বোঝা যায়, যখন মাতাল শ্রমজীবী লোকটি নিজের গালের গোল ক্ষতচিহ্নটির সাদৃশ্য খুঁজে পায় দূর অতীতের একটি সুগোল ধাতবমুদ্রার সঙ্গে—‘...গালে দাগ, যেমুন আধুলি একখান বহুত দূর জমানার’।
অন্যদিকে ‘রেনেসাঁস’ কবিতায় ‘রেনেসাঁ’-কে তিনি দেখেন এক তেজী ঘোড়ার রূপে—‘চকচকে তেজী এক ঘোড়ার মতন রেনেসাঁস...’
শামসুর রাহমানের প্রতিভার রশ্মি ছড়ানো আছে যেসব কবিতায়, সেসব কবিতাই কবি হিসেবে তাঁকে দিয়েছে উচ্চাসন; তাঁকে করেছে তাঁর ভাষার মহারথী কবিদের পঙ্ক্তিভুক্ত। শামসুর রাহমানের কবিতাযাপন যেন এক দীর্ঘ ম্যারাথন। ভাষা ও কবিতার ভেতর দিয়ে বহু-বহু মাইলফলক পেরিয়ে গেছেন তিনি অবলীলায়। আবার ভবিষ্যকালের কবিতার জন্য রেখে গেছেন তার নিজের রচিত বহু উঁচু মাইলফলক। বাংলাদেশের সাহিত্যে আধুনিক-কবিতার-উপযুক্ত ভাষার আদি রূপকার, একক কারিগর ও ত্রাতার নাম শামসুর রাহমান।
অনেক ধন্যবাদ, জুয়েল মাজহার ভাই। একজন কবির চোখে বাংলা ভাষার আরেক বিশিষ্ট কবির পাঠমূল্যায়ন হলো আজ। পাঠক, নিশ্চয়ই কবি শামসুর রহমানকে আরও নিবিড়ভাবে আবিষ্কার করতে সক্ষম হবেন। ভালো থাকবেন।
ধন্যবাদ আপনাকেও।










