জুলাই আন্দোলনে নারীরা পুরুষের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রাজপথে থাকলেও, পরবর্তী সময়ে তাদের সামাজিক অবস্থানে প্রত্যাশিত পরিবর্তন আসেনি বলে মনে করেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের চেয়ারম্যান শিরীন পারভিন হক। তার ভাষ্য, ‘এখন অনেক পুরুষই নিজেকে নারীর অভিভাবক মনে করেন এবং নারীর পোশাক, চলাফেরা ও ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য করার প্রবণতা বেড়েছে।’ এই বাস্তবতা নারী-পুরুষের সমতা ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার পথে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করছে বলেও মনে করেন তিনি। বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন।
বাংলা ট্রিবিউন: নারী সংস্কার কমিশন গঠনের প্রয়োজনীয়তা কেন অনুভূত হয়েছিল? কমিশন কোন বাস্তবতা সামনে রেখে কাজ শুরু করেছিল?
শিরীন পারভিন হক: চব্বিশের ৫ আগস্টের পর ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়। অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের অধীনে একটি উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করা হয়। এরপর সেপ্টেম্বরে প্রথম ধাপে ছয়টি সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়। তখন নারী সংস্কার কমিশন ছিল না। পরবর্তী সময়ে সরকার উপলব্ধি করে যে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে, যেগুলোর জন্য আলাদা কমিশন প্রয়োজন। সেই উপলব্ধি থেকেই ডিসেম্বরে নারী, স্বাস্থ্য, শ্রম, গণমাধ্যম ও স্থানীয় সরকার—এই পাঁচটি কমিশন গঠন করা হয়।
আমাকে কমিশনের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। বিভিন্ন খাতের প্রতিনিধিদের নিয়ে ১০ সদস্যের কমিশন গঠন হয়। এরপর আমরা প্রথমেই ঠিক করি, আমাদের কাজের একটি সুস্পষ্ট ফ্রেমওয়ার্ক থাকবে। সেগুলো হলো- সংবিধান ও আইন; নীতি ও নীতির বাস্তবায়ন; বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও তাদের কার্যক্রম; এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো। এই কাঠামোর ভিত্তিতে আমরা নির্ধারণ করি, কোন কোন বিষয় কাজ করবো।
আমরা আমাদের সুপারিশগুলো ১৫টি বিষয়ভিত্তিক খাতে ভাগ করেছিলাম। সেগুলো তিনটি মেয়াদে ভাগ করি। প্রথম মেয়াদে ছিল—অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কী কী পদক্ষেপ অবিলম্বে নিতে পারে, অথবা অন্তত বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া শুরু করতে পারে। দ্বিতীয় মেয়াদে ছিল—পরবর্তী নির্বাচিত সরকার কোন বিষয়গুলো বিবেচনা করতে পারে এবং কীভাবে সেগুলো বাস্তবায়ন করতে পারে। তৃতীয় মেয়াদে আমরা স্থান দিয়েছি নারীদের স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা ও দীর্ঘদিনের দাবিগুলোকে। অনেকেই বলেছেন, এগুলো অবাস্তব। আমরা বলেছি, এই দলিল এমন ধারণা থেকে তৈরি করা হয়নি যে সবকিছু রাতারাতি বাস্তবায়ন হবে। আমরা জানতাম, তা সম্ভব নয়। কিন্তু আমরা চেয়েছি মানুষ জানুক—বাংলাদেশের নারীরা কী চায়, তাদের স্বপ্ন কী, তাদের আকাঙ্ক্ষা কী। এগুলো নিয়ে জনপরিসরে আলোচনা হোক, সমালোচনা হোক, তর্ক-বিতর্ক হোক। আমরা চাইনি—নারী অধিকারের প্রশ্নটি একপাশে পড়ে থাকুক। বরং এটি জনআলোচনার কেন্দ্রে আসুক, এই দর্শনের ভিত্তিতেই আমরা কমিশনের কাজ পরিচালনা করেছি।
আমরা চেষ্টা করেছি একজন নারীর জীবনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রকে বিবেচনায় আনতে। একজন মানুষ হিসেবে তার মর্যাদা নিশ্চিত করা, একজন নাগরিক হিসেবে তার অধিকার প্রতিষ্ঠা করা, কোথায় কোথায় ঘাটতি আছে তা শনাক্ত করা এবং সেই ঘাটতি দূর করার জন্য কী ধরনের পদক্ষেপ দরকার—এসব বিষয়ই আমাদের সুপারিশের ভিত্তি ছিল। আমাদের প্রতিবেদনে ৪০০-এর বেশি সুপারিশ রয়েছে। আমরা কখনও ভাবিনি, সব সুপারিশ একসঙ্গে বাস্তবায়ন হবে। এমনকি সব সুপারিশ কোনো দিনই বাস্তবায়িত হবে—এমন প্রত্যাশাও করিনি। কিন্তু আমরা মনে করেছি, নারীদের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষার বিষয়গুলো মানুষের জানা দরকার। সেই চিন্তা থেকেই আমরা এই দলিল তৈরি করেছি।
বাংলা ট্রিবিউন: কমিশনে কাজ করতে গিয়ে নারীর অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় কাঠামোগত সমস্যাগুলো কী দেখেছেন?
শিরীন পারভিন হক: আমরা দেখেছি, স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সরকার নারীর অগ্রগতির জন্য নানা উদ্যোগ নিয়েছে। চাকরিতে কোটা, সংসদে সংরক্ষিত আসন—এ ধরনের অনেক উদ্যোগই নেওয়া হয়েছে। কিন্তু সমস্যা হয়েছে বাস্তবায়নে। অনেক উদ্যোগ কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। আবার কিছু ক্ষেত্রে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, কিন্ত এক ধরনের আমলাতান্ত্রিকতার মধ্যে যে উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছিল, সেদিকে আর এগোয়নি।
বাংলা ট্রিবিউন: নারীর অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আর কী কী বড় চ্যালেঞ্জ দেখেছেন?
শিরীন পারভিন হক: একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা কিছু সামাজিক চর্চা, রীতি ও প্রথা, যেগুলো নারীর জন্য ক্ষতিকর এবং নারীকে মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে বাধা দেয়। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ বাল্যবিবাহ।
এখনও বাল্যবিবাহ বাংলাদেশের অন্যতম বড় সমস্যা। বিশ্বের যেসব দেশে বাল্যবিবাহের হার সবচেয়ে বেশি, বাংলাদেশ তাদের অন্যতম। আমরা এখনো বাল্যবিবাহ কার্যকরভাবে কমাতে পারিনি।এর আগে আওয়ামী লীগ সরকার বাল্যবিবাহ আইন করেছে। সেখানে ১৮ বছরের নিচে বিয়েকে বাল্যবিবাহ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। একে ‘কিশোরী বিবাহ’ বললে হয়তো আরও উপযুক্ত হতো। তবে নাম যাই হোক, বাল্যবিবাহ বা কিশোরী বিবাহ—কোনোটিই গ্রহণযোগ্য নয়। এত প্রচার-প্রচারণা ও উদ্যোগের পরও আমরা এ সমস্যার সমাধান করতে পারিনি। ফলে এটি এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ।আরেকটি বড় বিষয় হলো নারীর প্রতি বৈষম্য, পারিবারিক আইন-সংক্রান্ত বিষয়। বিয়ে, বিবাহবিচ্ছেদ, সন্তানের অভিভাবকত্ব—এসব ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমান অধিকারের বিষয়টি এগোয়নি।
বাংলা ট্রিবিউন: প্রতিবেদনে এমন কোন সুপারিশ রয়েছে, যেগুলো আপনি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন এবং কেন?
শিরীন পারভিন হক: প্রথমেই বলবো, একটি স্থায়ী নারী কমিশন গঠন।
আমরা এই সুপারিশ করেছি, কারণ গোটা সরকারকে নারী-সংবেদনশীল করতে হলে ছোট, মাঝারি ও বড়—সব ধরনের উদ্যোগ নিয়মিতভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। কোন উদ্যোগ বাস্তবায়িত হচ্ছে, কোনটি হচ্ছে না, কোথায় ঘাটতি রয়েছে, কোথায় নতুন পদক্ষেপ দরকার—এসব বিষয় দেখার জন্য একটি স্বাধীন ও স্থায়ী কমিশন প্রয়োজন।
একই সঙ্গে নারীর অধিকার ও সমঅধিকার প্রতিষ্ঠায় যেসব ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে, সেগুলো চিহ্নিত করে সরকারের কাছে সুপারিশ দেওয়া এবং বাস্তবায়নের জন্য চাপ সৃষ্টি করার কাজও একটি স্থায়ী কমিশন করতে পারবে। আমাদের কাছে তাই মনে হয়েছে, এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ।
বাংলা ট্রিবিউন: আর কোন সুপারিশগুলোকে আপনি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন?
শিরীন পারভিন হক: আমাদের প্রতিবেদনে চারশোর বেশি সুপারিশ রয়েছে। তবে আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—নারী ও মেয়ে শিশুর জন্য সহিংসতামুক্ত সমাজ গড়ে তোলা।আমরা শুধু নীতিগত কথা বলিনি। নারী বা মেয়ে শিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতা, তা ঘরে হোক বা বাইরে; সেটি প্রতিরোধে কী ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা প্রয়োজন, তা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছি। উদাহরণ হিসেবে বলি, একজন নারী যদি নির্যাতনের শিকার হন, তাহলে থানায় অভিযোগ দায়েরের পর কী হবে, আলামত কীভাবে সংগ্রহ করা হবে, কীভাবে সংরক্ষণ করা হবে, আদালতে কীভাবে উপস্থাপন করা হবে—এসব বিষয় নিয়ে আমরা সুস্পষ্ট সুপারিশ দিয়েছি।একইভাবে বিচারকদের কী ধরনের সংবেদনশীলতা ও প্রশিক্ষণ প্রয়োজন, সেটিও আমরা উল্লেখ করেছি। আমাদের কাছে মনে হয়েছে, শুধু আইন করলেই হবে না; পুরো বিচারপ্রক্রিয়াকে নারী-সংবেদনশীল করতে হবে। আমরা চেষ্টা করেছি, একজন নারী নির্যাতনের শিকার হওয়ার পর অভিযোগ দায়ের থেকে শুরু করে বিচার শেষ হওয়া পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটি কীভাবে আরও কার্যকর ও নারী-সংবেদনশীল করা যায়, সেই রূপরেখা দিতে।
বাংলা ট্রিবিউন: সংবিধানে নারী-পুরুষের সমতার কথা বলা হলেও বাস্তবে সবচেয়ে বড় বৈষম্য কোথায় দেখেন?
শিরীন পারভিন হক: এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। অনেকে বলেন, সংবিধানে নারী-পুরুষের সমতা নিশ্চিত করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সংবিধানে মূলত জনজীবনে নারী-পুরুষের সমতার কথা বলা হয়েছে। পারিবারিক জীবন পরিচালিত হয় ধর্মভিত্তিক পারিবারিক আইন অনুযায়ী।
মুসলিম, হিন্দুসহ বিভিন্ন ধর্মের পারিবারিক আইন—কোনোটিতেই নারী ও পুরুষকে সম্পূর্ণ সমান অধিকার দেওয়া হয়নি। ফলে পারিবারিক আইন এখনো বৈষম্যের একটি বড় ক্ষেত্র। এই জায়গায় পরিবর্তন আনা জরুরি। দ্বিতীয়ত, মজুরিতে বৈষম্য রয়েছে। আরেকটি বড় বিষয় হলো নিরাপদ কর্মপরিবেশ। আমার মনে হয়, এমন খুব কম কর্মক্ষেত্রই আছে, যেখানে নারীরা যৌন হয়রানির শিকার হন না। সেটি মাঠের কাজ হোক, কারখানা, অফিস-আদালত, স্কুল, কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়— সব ক্ষেত্রেই যৌন হয়রানি একটি বড় সমস্যা। আমি এটিকে প্রায় অতিমারির মতো একটি বাস্তবতা মনে করি।
বাংলা ট্রিবিউন: আপনি বলছিলেন, জুলাই অভ্যুত্থান আপনাদের মধ্যে অনেক আশা তৈরি করেছিল। পরে কেন সেই আশা কিছুটা কমে গেলো?
শিরীন পারভিন হক: আন্দোলনের সময় যে দৃশ্যগুলো আমরা দেখেছি, সেগুলো আমাদের ভীষণভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল। বিশেষ করে শিক্ষার্থীরা যেভাবে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া ‘রাজাকারের বাচ্চা’ অপবাদকে উল্টো আন্দোলনের শক্তি ও স্পিরিটে পরিণত করেছিল, সেটা ছিল অসাধারণ।
স্লোগান ছিল, ‘আমি কে, তুমি কে—রাজাকার, রাজাকার’। ‘পরে যুক্ত হলো, কে বলেছে, কে বলেছে...’। একটি গালিকেই তারা আন্দোলনের শক্তি ও অস্ত্রে পরিণত করেছিল। আমার কাছে এটি একটি অসাধারণ ঘটনা।
এর সঙ্গে ইডেন কলেজের শিক্ষার্থীরাও যুক্ত হলো। আবু সাঈদ হত্যার পরের ঘটনাগুলো আমাদের সবাইকে ভীষণভাবে নাড়া দিয়েছিল। আমি সত্যিই আপ্লুত হয়েছিলাম। আমার মনে হয়েছিল, আমার প্রজন্ম যা পারেনি, আমার পরের প্রজন্মও যা পারেনি, সেটি এই প্রজন্ম করে দেখাচ্ছে। তাই তাদের প্রতি আমাদের অনেক প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল।
কিন্তু পরে কিছুটা আশাহত হয়েছি। কারণ আন্দোলনটি যখন ধীরে ধীরে একটি রাজনৈতিক কাঠামোর দিকে গেল, তখন নারীরা আস্তে আস্তে দৃশ্যমানতা হারিয়ে ফেলল। আমি আমার পরিচিত কয়েকজন মেয়েকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘তোমরা রাস্তা ছেড়ে দিলে কেন? তোমাদের জায়গাটা ছেড়ে দিলে কেন?’
কেউ কেউ বলেছে, ‘আমরা তো শিক্ষার্থী। লেখাপড়ায় ফিরে গেছি।’ আবার অনেকে বলেছে, ‘আমাদের তো থাকতে দেওয়া হয়নি। আমাদেরকে রীতিমতো সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।’ এই কথাগুলো শুনে আমার মনে হয়েছে, পুরুষ-আধিপত্যের যে বাস্তবতা, সেখানে কোনো মৌলিক পরিবর্তন ঘটেনি।
বাংলা ট্রিবিউন: আপনার মতে, পরিবার, কর্মক্ষেত্র এবং রাষ্ট্র—এই তিন স্তরের মধ্যে কোথায় সংস্কার সবচেয়ে বেশি জরুরি?
শিরীন পারভিন হক: আমার মতে, পরিবার এবং রাষ্ট্র—দুই জায়গাতেই।
পরিবারের মধ্যে সাংস্কৃতিক বৈষম্য সবচেয়ে বেশি কাজ করে। স্টেরিওটাইপ তৈরি হয় পরিবারে, আবার সেই স্টেরিওটাইপ পরিবারই যত্ন করে লালন-পালন করে এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পুনরুৎপাদন করে।
অর্থাৎ, মেয়েদের ‘মেয়ে’ হিসেবে এবং ছেলেদের ‘পুরুষালি’ হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে পরিবারের বড় ভূমিকা রয়েছে।
অন্যদিকে রাষ্ট্রের ক্ষমতা আছে এই বৈষম্যমূলক কাঠামো ভেঙে দেওয়ার। কিন্তু তার জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা দরকার।কিন্তু সেই সদিচ্ছা কী কোণ দলের আছে? আমরা আশা করেছিলাম, নতুন যে রাজনৈতিক দল গড়ে উঠেছে, তাদের সেটা থাকবে। কারন নতুন দল গঠন করেছে এই প্রজন্মের বাচ্চারা।
এখন আমার মনে হয়, সেই আশা কিছুটা বেশি করে ফেলেছিলাম। কারণ তাদের সেই রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাও নাই। রাজনৈতিক দল গড়ে তোলা, রাজনৈতিক শিক্ষা এবং অভিজ্ঞতা অর্জন—এসব সময়সাপেক্ষ বিষয়। হঠাৎ করে এগুলো হয় না। সে জায়গায় আমাদের কাছে মনে হয়েছিল ওদের এবার নির্বাচনে যাওয়াই উচিত নাই। নির্বাচনে যেতে গিয়ে কী করলো...জামায়াতের সঙ্গে যুক্ত হলো। এটা ছিলো আমাদের আশাহত হওয়ার আরেকটি বড় জায়গা।
বাংলা ট্রিবিউন: আপনি কি এনসিপির (জাতীয় নাগরিক পার্টি) কথা বলছেন?
শিরীন পারভিন হক: হ্যাঁ, এনসিপির কথাই বলছি। আমরা তাদের কাছ থেকে অনেক আশা করেছিলাম। কারণ তারাই তো আন্দোলন করেছে, তারাই গুলি খেয়েছে। তাদের প্রধান তিনজন আমাদের হাসপাতালে ভর্তি ছিল। তখন আমার সুযোগ হয়েছিল তাদের সঙ্গে অনেক কথা বলার। সত্যি বলতে, তখন আমার মনে হয়েছিল, এই নাহিদের (নাহিদ ইসলাম) মতো ছেলেরা যদি একদিন দেশ চালায়, তাহলে দেশ হয়তো একটি ভালো দিকে পথে যাবে। কিন্তু পরে বুঝতে পারলাম যে এরা আমাদের থেকে অনেক বেশি রক্ষণশীল। আমি এখানে শুধু ধর্মের কথা বলবো না, সামাজিকভাবেও রক্ষণশীল। ওই দলের শুধু পুরুষ না নারীরাও রক্ষণশীল, বেশ রক্ষণশীল।
বাংলা ট্রিবিউন: কোন বিষয়টি আপনাকে সবচেয়ে বেশি বিস্মিত করেছে?
শিরীন পারভিন হক: রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন একশ বছর আগে নারীশিক্ষার পক্ষে দাঁড়িয়েছেন, পর্দা-প্রথার এবং মুসলিম মেয়েদের শিক্ষার জন্য কলকাতায় সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছেন। সেই জায়গায় এত বছর পর এসে পর্দার পক্ষে এসে দাঁড়াবে... কারা দাঁড়াবে বুড়া মানুষরা না, বাচ্চা ছেলে-মেয়েগুলো ! সেটি আমার কাছে একেবারে অনাহুত ছিল।
বাংলা ট্রিবিউন: নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের সবচেয়ে বড় বাধা কী? এক্ষেত্রে কমিশনের প্রধান সুপারিশগুলো কী ছিল?
শিরীন পারভিন হক: অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রেও আবার বৈষম্যের বিষয়টি চলে আসে। মজুরি বৈষম্য, বেতন বৈষম্য এবং সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে বৈষম্য এখনো রয়েছে। একটি বিষয় দেখতে ছোট মনে হলেও আসলে এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেটি হলো শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র (ডে-কেয়ার সেন্টার)।
এটি শুধু নারী কর্মীদের জন্য নয়, পুরুষ কর্মীরাও তাদের সন্তানকে সেখানে রাখতে পারেন। কিন্তু নারীদের জন্য এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ছোট সন্তান থাকলে সেই সন্তানকে কার কাছে রেখে তিনি কাজে যাবেন—এটি একটি বড় প্রশ্ন। এমন একটি নিরাপদ জায়গা দরকার, যেখানে বাবা-মা নিশ্চিন্তে সন্তানকে রেখে কাজে যেতে পারবেন। তাহলে তারা কাজেও মনোযোগ দিতে পারবেন। সারাক্ষণ সন্তানকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকতে হবে না। আমার মনে হয়, নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে এবং পুরুষের জন্যও সন্তানদের দেখাশোনার সুবিধা নিশ্চিত করতে দিবাযত্ন কেন্দ্র একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।আরেকটি বড় বিষয় হলো গণপরিবহনে নারীর নিরাপত্তা। এই বিষয়টি শুধু বাসেই নয়, ট্রেনেও প্রযোজ্য।
বাংলা ট্রিবিউন: এই সমস্যাগুলো সমাধানে কমিশনের সুপারিশ কী ছিল?
শিরীন পারভিন হক: আমাদের অন্যতম সুপারিশ ছিল মজুরি বৈষম্য দূর করা। এ ছাড়া কর্মজীবী নারী-পুরুষের সন্তানদের জন্য শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র (ডে-কেয়ার সেন্টার) স্থাপন, পাশাপাশি নারীদের জন্য নিরাপদ গণপরিবহন নিশ্চিত করার প্রস্তাবও দিয়েছি। এগুলো ছাড়াও আরও কিছু সুপারিশ ছিল।
বাংলা ট্রিবিউন: রাজনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনায় নারীর কার্যকর অংশগ্রহণ বাড়াতে কমিশন কী ধরনের সংস্কার প্রস্তাব করেছে?
শিরীন পারভিন হক: আমরা প্রথমে রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরের সংস্কারের কথা বলেছি।
নির্বাচনে মনোনয়নের ক্ষেত্রে আমরা ‘জিপার সিস্টেম’ চালুর প্রস্তাব দিয়েছি। অর্থাৎ, একজন পুরুষ, একজন নারী—এভাবে পর্যায়ক্রমে প্রার্থী মনোনয়ন দিতে হবে।
এতে এমন হবে না যে, ৩০০ জন পুরুষের পর গিয়ে কয়েকজন নারীর নাম যুক্ত করা হলো। শুরু থেকেই নারী-পুরুষ সমানভাবে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত থাকবেন। ফলে পুরো দলই তাদের পক্ষে কাজ করবে এবং নির্বাচনের আগে ইশতেহার প্রচার, ভোটারদের কাছে যাওয়া—সব কর্মকাণ্ডে নারী প্রার্থীরাও সমানভাবে অংশ নিতে পারবেন।
এটি ছিল আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ।
বাংলা ট্রিবিউন: আর কী কী প্রস্তাব ছিল?
শিরীন পারভিন হক: আমরা বলেছি, রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত তৃণমূল থেকে নারীদের নেতৃত্বে নিয়ে আসার জন্য একটি সুপরিকল্পিত ও কার্যকর প্রক্রিয়া তৈরি করা।
আমরা দেখেছি, অনেক রাজনৈতিক দলের সভা-সমাবেশ রাতের বেলায় হয়। অনেক নারী আমাদের বলেছেন, তারা সেখানে যেতে পারেন না।একদিকে রাতের বেলায় রাস্তাঘাট নিরাপদ নয়। অন্যদিকে বাড়ির কাজের দায়িত্বও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নারীকেই পালন করতে হয়। তাই আমরা বলেছি, ঘরের কাজের দায়িত্ব নারী-পুরুষ উভয়কেই সমানভাবে ভাগ করে নিতে হবে।এটা না হলে নারীর পক্ষে জনজীবন বা রাজনৈতিক জীবনে সক্রিয় হওয়া কঠিন।
অনেক পরিবার চাকরি করতে দেয়, কারণ নারী পরিবারের জন্য উপার্জন করেন। কিন্তু রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে সেই সমর্থন অনেক সময় থাকে না।এই বাস্তবতাগুলো বিবেচনায় নিয়েই আমরা আমাদের সুপারিশগুলো করেছি।তবে আমাদের মূল প্রস্তাব ছিল নারীর কার্যকর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা।
বাংলা ট্রিবিউন: প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর বাস্তবায়ন নিয়ে সরকারের সঙ্গে কী ধরনের আলোচনা হয়েছে? আপনার মূল্যায়নে সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের সম্ভাবনা কতটা?
শিরীন পারভিন হক: শুরুতে আমাদের মনে হয়েছিল, বাস্তবায়নের সম্ভাবনা অনেক বেশি।
তখন দেশের পরিস্থিতি ভিন্ন ছিল। এত বড় একটি আন্দোলন ও অভ্যুত্থানের পর মনে হয়েছিল, অনেক নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে গেছে। সেই সুযোগে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারগুলোও বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে। কিন্তু পরে মনে হয়েছে, বাস্তবে সেই দরজাগুলো তেমনভাবে খোলেনি।এ কারণে কিছুটা আশাহত হয়েছি। তবে আমি এটাও মনে করি, আমাদের কাজ পুরোপুরি বিফলে যায়নি। অন্তত একটি গুরুত্বপূর্ণ পাবলিক ডকুমেন্ট তৈরি হয়েছে।
বাংলা ট্রিবিউন: বর্তমান সরকার কমিশনের কোনো সুপারিশ বাস্তবায়ন করেছে কি?
শিরীন পারভিন হক: আমরা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে সেভাবে মূল্যায়ন করিনি।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) একটি রিফর্ম ট্র্যাকার তৈরি করেছে।আমরা কমিশনের চার শতাধিক সুপারিশ থেকে অগ্রাধিকারভিত্তিতে ৮৩টি সুপারিশ নির্বাচন করে তাদের দিয়েছি। তারা সময়ে সময়ে জানাবে—কোনটি বাস্তবায়িত হয়েছে, কোনটি হয়নি এবং কোনটির কতটুকু অগ্রগতি হয়েছে। আমার মনে হয়, এটি জানতে আরও কিছু সময় লাগবে। কারণ বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অনেক বড় বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। এই মুহূর্তে সব সংস্কারের দিকে সমানভাবে মনোযোগ দেওয়া তাদের জন্য কঠিন। তবে কয়েক মাস পর আমরা বিষয়টি আবার পর্যালোচনা করবো।
বাংলা ট্রিবিউন: এ বিষয়ে সরকারের সঙ্গে কি আপনাদের কোনো আলোচনা হয়েছে?
শিরীন পারভিন হক: আমরা ইতোমধ্যে সাক্ষাতের জন্য সময় চেয়েছি।এখনো সময় পাইনি। তবে আশা করি, তারা আমাদের অনেক সুপারিশ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেবে।
বাংলা ট্রিবিউন: অভিন্ন পারিবারিক আইন এবং উত্তরাধিকার আইনে সব ধর্মের নারীর সমান অধিকার নিশ্চিত করার সুপারিশ নিয়ে একটি পক্ষ বিরোধিতা করেছে। আপনার মতে, এটি বাস্তবায়ন কতটা জরুরি?
শিরীন পারভিন হক: এটি অত্যন্ত জরুরি। স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও যদি নারীরা সমান অধিকার না পান, তাহলে স্বাধীনতার প্রকৃত সুফল তারা কতটা পেলেন—সেই প্রশ্ন থেকেই যায়। আমরা কি সত্যিই স্বাধীনতার স্বাদ পেয়েছি? যদি একজন নারী নিরাপদে শহীদ মিনারে যেতে না পারেন, বাংলা একাডেমির বইমেলায় যেতে সংকোচ বোধ করেন, তাহলে সেটিও আমাদের ভাবতে হবে।
বাংলা ট্রিবিউন: যদি আজ আপনাকে কমিশনের তিনটি সুপারিশ অবিলম্বে বাস্তবায়নের সুযোগ দেওয়া হয়, তাহলে কোন তিনটিকে অগ্রাধিকার দেবেন?
শিরীন পারভিন হক: প্রথমত, স্থায়ী নারী কমিশন গঠন। দ্বিতীয়ত, বাল্যবিবাহ রোধে জাতীয় পর্যায় থেকে ইউনিয়ন পরিষদ পর্যন্ত সর্বাত্মক উদ্যোগ ও অভিযান। তৃতীয়ত, নারীর প্রতি সব ধরনের সহিংসতা থেকে মুক্ত জীবন নিশ্চিত করার কার্যকর ব্যবস্থা।
বাংলা ট্রিবিউন: আপনার দৃষ্টিতে আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশের নারীর সমঅধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় করণীয় কী?
শিরীন পারভিন হক: সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রতিটি পর্যায়ে নারীর অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে হবে এবং নারীদের দৃশ্যমান ভূমিকায় নিয়ে আসতে হবে। দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের নারী ফুটবল দল আজ অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেছে। কিন্তু এই খেলোয়াড়দের কীভাবে মূল্যায়ন করা হয়, সেটিও আমাদের দেখতে হবে। শুধু তা-ই নয়, নারী ও পুরুষ খেলোয়াড়দের ভাতা ও সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও বৈষম্য রয়েছে। আমার মনে হয়, এখানে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো রাজনৈতিক সদিচ্ছা। রাষ্ট্র যদি সত্যিই সিদ্ধান্ত নেয় যে নারী-পুরুষ সমান মর্যাদার অধিকারী, তাহলে সেই পরিবর্তন বাস্তবায়ন করা সম্ভব।
বাংলা ট্রিবিউন: সে ক্ষেত্রে আগামী পাঁচ বছরে সরকার কী করতে পারে?
শিরীন পারভিন হক: প্রথমেই একটি বড় রাজনৈতিক ঘোষণা দিতে হবে। রাষ্ট্রকে স্পষ্টভাবে বলতে হবে—এই দেশের নারী ও পুরুষ উভয়েই সমান মর্যাদাসম্পন্ন মানুষ এবং নাগরিক হিসেবে সমান আইনি অধিকারের অধিকারী।
বাংলা ট্রিবিউন: জুলাই অভ্যুত্থানের আগে এবং পরে—সার্বিকভাবে বাংলাদেশের নারীদের অবস্থান আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
শিরীন পারভিন হক: আমি আগেই বলেছি, আমরা হয়তো কয়েক ধাপ এগিয়েছি। কিন্তু সেই অগ্রগতি প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম। আমার নিজের অভিজ্ঞতার পাশাপাশি বিশেষ করে তরুণীদের অভিজ্ঞতা থেকেও আমি বিষয়টি বুঝেছি।
এখন অনেক মেয়ে বলছে, রাস্তায় হাঁটলে তাদের উদ্দেশে মন্তব্য করা হয় ‘মাথায় কাপড় দাও’; এ ধরনের কথা আগের তুলনায় অনেক বেশি শুনতে হয়। এখন এটি অনেক বেশি দৃশ্যমান এবং অনেক বেশি প্রকাশ্যে বলা হচ্ছে।
এখন রাস্তায় হাঁটা অনেক পুরুষই নিজেকে নারীর অভিভাবক মনে করেন। একজন নারী কী পোশাক পরবেন, কীভাবে হাঁটবেন, কীভাবে কথা বলবেন; এসব নিয়েও প্রকাশ্যে মন্তব্য করেন। একজন নারীর চলাফেরা, পোশাক ও আচরণ যেন জনসমক্ষে বিচার-বিশ্লেষণের বিষয় হয়ে উঠেছে। আমার মনে হয়, জুলাই অভ্যুত্থানের পর এমনটি হওয়ার কথা ছিল না। কারণ আন্দোলনের সময় নারীরা পুরুষদের সঙ্গে সমানভাবে রাস্তায় ছিলেন।
আমার মনে হয়, একটি বড় ভুল হয়েছে। যখন আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের সরাসরি ক্ষমতার দায়িত্ব দেওয়া হলো, তখন তাদের অনেকের মধ্যেই ক্ষমতার আকর্ষণ তৈরি হলো। ক্ষমতার প্রতি আকর্ষণ মানুষকে নানা ধরনের ঝুঁকির দিকে নিয়ে যেতে পারে। এখন তাদের সম্পর্কে বিভিন্ন ধরনের কথা শোনা যায়। সেগুলোর সব সত্য কি না, আমি জানি না। কিন্তু শুনলে কষ্ট লাগে। কারণ তাদের অনেকের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। তখন মনে হয়েছিল, এই তরুণরাই একদিন দেশকে ভালো পথে নিয়ে যাবে।









