নাজি জেনারেলের মুখে শোনা গণহত্যার কাহিনি নিয়ে লেখা বই

রহমান শাফি
১৭ আগস্ট ২০২৬, ১৭:৩২আপডেট : ১৭ আগস্ট ২০২৬, ১৭:৩২

পোলিশ প্রতিরোধ আন্দোলনের নেতা কাজিমিয়ের্জ মোচাস্কি ১৯৪৯ সালে ওয়ারশর মোকোতভ কারাগারে দুই নাজির সঙ্গে একই কক্ষে বন্দী ছিলেন। তাদের একজন ছিলেন এসএস জেনারেল ইয়ুর্গেন স্ট্রুপ। ১৯৪৩ সালে ওয়ারশ গেটো ধ্বংসের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তিনি। তার বাহিনীর হাতে ৫৬ হাজারের বেশি ইহুদি নিহত বা বন্দী হন।

মোচাস্কি ও স্ট্রুপ টানা ২৫৫ দিন একই কক্ষে ছিলেন। এই সময় মোচাস্কি স্ট্রুপের সঙ্গে কথা বলে বোঝার চেষ্টা করেন, কীভাবে একজন মানুষ গণহত্যার সঙ্গে যুক্ত হয়ে উঠতে পারে।

এই অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে মোচাস্কি লেখেন ‘কনভারসেশনস উইথ অ্যান এক্সিকিউশনার’। ১৯৭৭ সালে বইটি প্রকাশিত হয়। একই বছর এটি আন্দ্রেই ভাইদার পরিচালনায় মঞ্চনাটকেও রূপ পায়। প্রায় ৫০ বছর পর বইটির প্রথম পূর্ণাঙ্গ ও সেন্সরবিহীন ইংরেজি অনুবাদ যুক্তরাজ্যে প্রকাশিত হচ্ছে। অনুবাদ করেছেন শন গ্যাসপার বাই।

প্রকাশক ক্লেয়ার বুলক প্রায় ১০ বছর আগে পোলিশ ভাষা শেখার সময় বইটির কথা জানতে পারেন। পরে ২০২৪ সালে ডাকওয়ার্থ বুকসে যোগ দেওয়ার পর তিনি বইটি প্রকাশের সুযোগ পান।

কাজিমিয়ের্জ মোচারস্কি, ১৯৫৬। ছবি: এলজবিয়েতা মোচারস্কির আর্কাইভ/ফোটোনোভা

স্ট্রুপ ছিলেন একজন অনুতাপহীন ফ্যাসিস্ট। দাখাউয়ের মার্কিন সামরিক ট্রাইব্যুনাল তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল। পরে তাকে পোল্যান্ডে বিচারের জন্য পাঠানো হয়। ১৯৫২ সালে পোল্যান্ডে তাঁ মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়।

অন্যদিকে মোচাস্কি ছিলেন পোলিশ হোম আর্মির সদস্য। স্ট্রুপকে হত্যার পরিকল্পনাতেও তিনি অংশ নিয়েছিলেন। কিন্তু কারাগারে তাকেই স্ট্রুপের সঙ্গে একই কক্ষে থাকতে হয়। মোচাস্কি জার্মান ভাষা জানতেন। তাই তিনি স্ট্রুপের কাছ থেকে যুদ্ধের নানা ঘটনা জানতে পারেন।

তৃতীয় বন্দী ছিলেন গুস্তাভ শিলকে। তিনি ছিলেন নিম্নপদস্থ এসএস কর্মকর্তা। নাৎসি মতাদর্শের প্রতি তার আনুগত্য ছিল সীমিত। তিনিও মোচাস্কির সঙ্গে মিলে স্ট্রুপকে যুদ্ধের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন করতেন।

স্ট্রুপ নিজের অতীত সম্পর্কে প্রায় অবলীলায় কথা বলতেন। তিনি এসএসে তার উত্থান এবং ওয়ারশ গেটো ধ্বংসের ঘটনা বর্ণনা করেন। নিজের অপরাধের বিবরণ দিতেও তাকে খুব একটা দ্বিধাগ্রস্ত হতে দেখা যায়নি।

মোচাস্কি কারাগারে কোনো নোট নিতে পারেননি। স্মৃতির ওপর নির্ভর করেই পরে বইটি লেখেন। তার মেয়ে এলজবিয়েতা মচাস্কির ভাষ্য, দীর্ঘদিনের বন্দিত্ব তাকে অসাধারণ স্মৃতিশক্তি তৈরি করতে সাহায্য করেছিল। মোচাস্কি বলতেন, তিনি স্ট্রুপের সঙ্গে কথোপকথনগুলো যেন টেপ রেকর্ডিংয়ের মতো মনে মনে আবার শুনতে পারতেন।

কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর মোচাস্কি সাংবাদিক হিসেবে কাজ করেন এবং স্ট্রুপের বক্তব্যের তথ্য যাচাই করেন। তার বইটি প্রথমে প্রকাশে বাধার মুখে পড়ে। ১৯৭০-এর দশকের শুরুতে একটি সাহিত্য পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। পরে কমিউনিস্ট সরকারের অনুমতিতে সেন্সর করা সংস্করণ প্রকাশিত হয়।

মোচাস্কির মৃত্যুর পর বইটি পূর্ণাঙ্গভাবে প্রকাশের উদ্যোগ আরও জোরালো হয়। তার মেয়ে এলজবিয়েতা প্রায় ৪০ বছর ধরে বইটির সম্পূর্ণ ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশের চেষ্টা করেন।

প্রকাশক ক্লেয়ার বুলকের মতে, ইয়ুর্গেন স্ট্রুপের মধ্যে হান্না আরেন্টের আলোচিত ‘ব্যানালিটি অব ইভিল’-এর একটি বাস্তব রূপ দেখা যায়। নিজের কথার মধ্যেই স্ট্রুপ তার অপরাধ, বিশ্বাস ও মানসিকতার অনেক কিছু প্রকাশ করে ফেলেছিলেন।

/জেড-এস/
সম্পর্কিত
মাটি, মানুষ ও মিথের আখ্যান ‘রায়টপুরের উপকথা’
 গৌরাঙ্গ মোহান্তের নতুন কাব্যগ্রন্থ ‘এনট্রপি’
লাতিন আমেরিকার কথাসাহিত্য নিয়ে পাঠ ও মূল্যায়নের নতুন সংকলন
সর্বশেষ খবর
লোডশেডিং ও গ্যাস সংকট নিয়ে মিছিল শুরুর আগেই বৈষম্যবিরোধী ৩ নেতা আটক
লোডশেডিং ও গ্যাস সংকট নিয়ে মিছিল শুরুর আগেই বৈষম্যবিরোধী ৩ নেতা আটক
হরমুজের পর আর্কটিকের পথে চীন, ‘বরফ সিল্ক রোডে’ সম্ভাবনা ও ঝুঁকি
হরমুজের পর আর্কটিকের পথে চীন, ‘বরফ সিল্ক রোডে’ সম্ভাবনা ও ঝুঁকি
প্রধানমন্ত্রীকে সৌদি আরব সফরের আমন্ত্রণ
প্রধানমন্ত্রীকে সৌদি আরব সফরের আমন্ত্রণ
জুলাইয়ের ডকুমেন্টারিতে ভুল ছবি, ‘শহীদ’ দেখানো সাংবাদিক বললেন ‘আমি মরি নাই’
জুলাইয়ের ডকুমেন্টারিতে ভুল ছবি, ‘শহীদ’ দেখানো সাংবাদিক বললেন ‘আমি মরি নাই’
সর্বাধিক পঠিত
‘লিভ ইন সন্দেহে’ বিবাহিত দম্পতির ফ্ল্যাটে বিশ্ববিদ্যালয় ৪ ছাত্রের হামলাচেষ্টা
‘লিভ ইন সন্দেহে’ বিবাহিত দম্পতির ফ্ল্যাটে বিশ্ববিদ্যালয় ৪ ছাত্রের হামলাচেষ্টা
এক সিনেমার সম্মানী দিয়ে পাকিস্তানে বাড়ি কেনেন শবনম
এক সিনেমার সম্মানী দিয়ে পাকিস্তানে বাড়ি কেনেন শবনম
‘২৪ ঘণ্টার মধ্যে এই এমরানকে ট্রান্সফার করবেন’, ফোন দিয়ে বললেন মন্ত্রী
‘২৪ ঘণ্টার মধ্যে এই এমরানকে ট্রান্সফার করবেন’, ফোন দিয়ে বললেন মন্ত্রী
মেয়ের বিয়ের বাজারের টাকা হারিয়ে ফেললেন বাবা, পেয়ে ফিরিয়ে দিলেন পুলিশ
মেয়ের বিয়ের বাজারের টাকা হারিয়ে ফেললেন বাবা, পেয়ে ফিরিয়ে দিলেন পুলিশ
২৬ দিন ধরে বন্ধ সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র, পরিচালক বললেন ‘ড. ইউনূসের দোষ’
২৬ দিন ধরে বন্ধ সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র, পরিচালক বললেন ‘ড. ইউনূসের দোষ’