আন্দামান ভ্রমণকালাপানির কেচ্ছা ।। পর্ব ১১

Send
মুহম্মদ মুহসিন
প্রকাশিত : ১৮:১৯, ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:২২, ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০১৯

১৯৪৭ এর পরে স্বাধীন ভারতের যুগেও জারোয়াদের প্রতি সভ্য দুনিয়ার অত্যাচার অব্যাহত থাকা একটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক ঘটনা। স্বাধীন ভারত আন্দামানে কয়েদি উপনিবেশে গড়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসলেও, নতুন করে শুরু করলো উদ্বাস্তু উপনিবেশ স্থাপন। ১৯৫২, ১৯৫৪, ১৯৬২, ১৯৬৯ ইত্যাদি সময়ের সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে উদ্বাস্তু পুনর্বাসনের আয়োজনে আন্দামানে চলতে থাকে জারোয়াদের ভূখণ্ড দখলের কার্যক্রম। জারোয়াদের প্রতি অত্যাচার বাড়াতে বুশ পুলিশের সংখ্যা এবং তাদের ক্যাম্পের সংখ্যাও বেড়ে চললো। ১৯৫২ সালে উদ্বাস্ত পুনর্বাসন কার্যক্রমের মহাশত্রু হিসেবে চিহ্নিত জারোয়াদের মারমুখি আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে প্রশাসনের এক উচ্চপদস্থ আমলা বলেই বসলেন—‘তোমরা আমাকে একটি ফাইটার প্লেন দাও, আমি জারোয়াদের এলাকায় বোমা বর্ষণ করে আসি’।

১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত চলে জারোয়াদের সাথে স্বাধীন ভারত সরকার ও তার প্রশাসনের রক্তারক্তি সব কাণ্ড। তীর ধনুকের জোর ধীরে ধীরে বন্দুকের নলের কাছে ঠুনকো থেকে ঠুনকোতর প্রমাণিত হতে থাকে। ফলে ধীরে ধীরে  জারোয়াদের বিশাল ভূখণ্ড চলে যায় সরকারি মদদে পুনর্বাসনপ্রাপ্ত মেইনল্যান্ডের মানুষদের কাছে। ফলে এক সময়ের ৫০০০ বর্গ কিলোমিটারের চেয়ে বৃহত্তর জারোয়া-ভূখণ্ড হারাতে হারাতে মধ্য আন্দামানের পশ্চিম সমুদ্রতট সংলগ্ন অরণ্যে মাত্র ১০২ বর্গ কিলোমিটারে সীমিত হয়ে গিয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত ১৯৯৮ সালে অলিখিত দীর্ঘ যুদ্ধের পর জারোয়ারা বাধ্য হয় সরকারের নিকট আত্মসমর্পণ করতে।

ইংরেজদের পরে স্বাধীন ভারতের প্রশাসনের সাথে অর্ধশতাব্দী কাল জারোয়াদের যে যুদ্ধ চলে সে যুদ্ধের মাত্র দুটি ঘটনা এখানে উল্লেখ করছি। প্রথম ঘটনাটি  ১৯৬৭ সালের। ঘটনাস্থল মধ্য আন্দামানের কদমতলা গ্রাম। কদমতলা থেকে আধঘন্টার হাঁটার দূরত্বে জারোয়াদের কুটির ‘ওলে চাড্ডা’। ওলে চাড্ডা থেকে এক রাতে জারোয়ারা আসে কদমতলার এ্যাটারজিক জনবসতিতে চুরি করতে। চুরির জন্য তাদের প্রিয় দ্রব্য হলো গৃহাস্থলির লোহার জিনিসপত্র ও বাগানের নারকেল-কলা। চুরির দ্রব্য নিয়ে  সবাই পালিয়ে গেলেও এক জারোয়া পুরুষ ও তার দুই ছেলে ঘন কুয়াশায় পথ হারিয়ে ফেলে। গৃহস্বামী কদমতলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক প্রফুল্ল ঘরামি তাদেরকে ধরে ফেলেন।  প্রফুল্ল ঘরামি অবশ্য জারোয়ার ছুরিকাঘাতে সামান্য আহতও হন। তিনজন জারোয়াকে গ্রামবাসীররা পুলিশের হাতে তুলে দেয়। কদমতালার পুলিশ তাদেরকে  পোর্টব্লেয়ারে পাঠিয়ে দেয়। কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নেয় যে,  এই জারোয়াদেরকে যদি পুরো আন্দামান সম্পর্কে জানানো যায়, পোর্টব্লেয়ারসহ সমগ্র সভ্য বসতি সম্পর্কে ধারণা দেয়া যায় তাহলে তারা হয়তো তাদের সম্প্রদায়ের কাছে সভ্য দুনিয়া সম্পর্কে চমৎকার সব গল্প বলবে এবং সেই গল্পের সুবাদে জারোয়ারা সভ্যতার প্রতি আকৃষ্ট হবে। এই সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন স্বরূপ কর্তৃপক্ষ তিনজন জারোয়াকে ফাইটার প্লেনে করে দুই ঘণ্টা ঘুরিয়ে পুরো আন্দামান ও আন্দামানের সভ্যজগৎ দেখায়। এরপর তাদেরকে কদমতলা পুলিস স্টেশনে কিছুদিন রাখা হয়। তারপর জারোয়াদের উপযোগী এক ডিঙ্গি খাঁদ সামগ্রী সহ তাদেরকে নিয়ে তাদের কুটির সংলগ্ন এলাকায় ছেড়ে দিয়ে আসা হয়। কিন্তু দুঃখের কথা হলো কর্তৃপক্ষ এই সব করে যে ফলাফল অর্জিত হবে মর্মে ভেবে ছিল তার কিছুই অর্জিত হয়নি। এই তিন জারোয়া এর পর আর কোনোদিন লোকালয়ে আসেনি এবং তাদের গল্পে জারোয়াদের মধ্যে কী প্রতিক্রিয়া হয়েছিল তা-ও আর কোনোদিন জানা  যায়নি।

দ্বিতীয় ঘটনাটি ১৯৬৯ সালের। এই বছরই জারোয়ারা প্রথম মধ্য আন্দামানের লোকালয়ে এসে পুনর্বাসিত মানুষ হত্যা করে। জারোয়াদের হাতে নিহত হয় গণেশ হালদার ও তার স্ত্রী। গণেশ হালদার প্রায়ই জারোয়া এলাকা লাকরালুংটা ও আশপাশের জঙ্গলে শিকার করতো। ক্ষুব্ধ জারোয়ারা তাদের  প্রথামাফিক ঢঙে গণেশ হালদারকে সতর্ক করে দেয়। বহিরাগত শত্রুকে ভয়াবহভাবে সতর্কীকরণে জারোয়া প্রথা হলো একটি কাঠের গুঁড়ির ওপর আরেকটি কাঠ দ্বারা জোরে আঘাতের মাধ্যমে আওয়াজ সৃষ্টি করা, যে আওয়াজ সমুদ্রের মধ্যে এক-দুই কিলোমিটার পর্যন্ত পৌঁছে যায়। ভাষার আদান প্রদান না থাকায় এই ছিল বহিরাগতদেরকে সতর্ক করার জন্য জারোয়াদের প্রথা। এই আওয়াজ শোনার পর তখনকার দিনে সব শিকারীর হৃদকম্পন বেড়ে যেত।  কিন্তু গণেশ হালদার তোয়াক্কা না করে যথারীতি জারোয়া এলাকায় শিকার চালিয়ে যেতে থাকে।

একদিন গণেশ হালদার শিকার করে ফেরার পথে লক্ষ্য করে যে, কয়েকজন জারোয়া যুবক তাকে অনুসরণ করছে। ঘরে ফিরে গনেশ তার বন্ধু এক বুশ পুলিশকে বিষয়টি জানায় এবং উক্ত পুলিশকে রাতভর তার বাড়িতে থাকতে অনুরোধ করে। রাত দশটার দিকে গণেশ হালদার ঘুমাতে যাবার আগে বাইরে নেমে বাঁশের তৈরি পাটাতনের উপর দাঁড়িয়ে চারিদিকটা একটু নিরীক্ষণের চেষ্টা করে। মুহূর্তে বাঁশের তৈরি পাটাতনের নিচে লুকিয়ে থাকা এক জারোয়া নির্ভুল নিশানায় গণেশ হালদারকে তীরবিদ্ধ করে। স্বামীর চিৎকার শুনে গণেশ হালদারের স্ত্রী ঘরের বাইরে ছুটে আসলে জারোয়া যুবক তাকেও অব্যর্থ নিশানায় তীর ছুঁড়ে হত্যা করে।  তারপর জারোয়ারা সরাসরি কুটির আক্রমণ করে। বুশ পুলিশ ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে লাঠি দিয়ে দুই তিন ঘণ্টা লড়াই করে শেষ পর্যন্ত জারোয়াদের তাড়ায় এবং নিজের প্রাণ বাঁচায়।

কয়েদি পুনর্বাসন এবং উদ্বাস্তু পুনর্বাসনের মধ্য দিয়ে জারোয়াদের ভূমি দখল করা হয়েছে, তাদের ওপর অত্যাচার করা হয়েছে, তাদেরকে মেরে ফেলা হয়েছে—একথা যেমন সত্য ও বেদনাদায়ক; তেমনি উদ্বাস্তু পুনর্বাসন যুগে সবকিছু হারানো উদ্বাস্তু মানুষজন মেইনল্যান্ড থেকে এসে আন্দামানে পুনর্বাসিত হওয়ার পর উদ্বাস্তু হয়ে সব হারানোর শেষে জারোয়াদের তীরে বিদ্ধ হয়ে শেষ পর্যন্ত প্রাণটুকুও হারিয়েছে—এমন ঘটনাও সমপরিমাণ বেদনাদায়ক। প্রিয়জন হারিয়ে দিশেহারা অনেক উদ্বাস্তু পরিবার আন্দামান ছেড়ে মুখ্যভূমিতে আবার ফিরে পর্যন্ত গিয়েছে।

সরকারের ভূমিকা মাঝে মাঝে নেতিবাচক হলেও এই অবস্থা থেকে মুক্তির জন্য এবং জারোয়া ও সভ্যজগতের মধ্যে বন্ধুত্ব স্থাপনের জন্য অনেক নিবেদিতপ্রাণ মানুষ কাজ করেছে। তাদের মধ্যে বিশিষ্ট একজন ছিলেন ভক্তোয়ার সিং। ১৯৭৪ সালে জারোয়াদের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য আন্দামান প্রশাসন জারোয়াদের সাথে দূতিয়ালির জন্য একটি কন্ট্যাক্ট টিম গঠন করেছিল। ভক্তোয়ার সিং এই টিমের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন। কণ্ট্যাক্ট টিমটি ‘মিলানে’ নামক জাহাজে করে ঘুরে বেড়াতো গভীর অরণ্যে জারোয়াদেরকে বিভিন্নভাবে সাহায্য করার জন্য। এছাড়াও তৈরি হয় আন্দামান জনজাতি বিকাশ সমিতি। এই সমিতির সেক্রেটারী ছিলেন ভক্তোয়ার সিং। অতীতে ভক্তোয়ার সিং ছিলেন বুশ পুলিশের ডেপুটি সুপারইনটেনডেন্ট। আন্দামআন জনজাতি বিকাশ সমিতিতে এমন নিবেদিতপ্রাণ ব্যক্তির মধ্যে আরো ছিলেন—টি. এন. পন্ডিত ও এ. জাস্টিন। আন্দামান জনজাতি সমিতি ও সরকার গঠিত কন্ট্যাক্ট টিম ২২ বছর ধরে যে বন্ধুত্ব রচনা করতে পারেনি সেই অসাধ্য সাধনের ভিত্তিপর্ব সূচিত হয়েছিল ১৯৯৬ সালের এক দুর্ঘটনার মাধ্যমে।

এটি ছিল ১৯৯৬ সালের ১৫ এপ্রিলের একটি রোমাঞ্চকর দুর্ঘটনা। ‘আন্দামানের আদিম জনজাতি জারোয়া’ নামক গ্রন্থের লেখক ড. রতন চন্দ্র কর ঘটনাটির এক গল্পরূপ বর্ণনা দিয়েছেন:

‘১৯৯৬ সাল, ১৫ এপ্রিল। সকাল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মিষ্টি রোদে গ্রামে ভেসে গেছে। মধ্য আন্দামানের বাঙালি-অধ্যুষিত গ্রাম কদমতলা। . . . সকালের আলোয় কদমতলা  গ্রামের কুটিরে বিজয় বাবু বসে আছেন। পূর্ববঙ্গ তথা পূর্ব পাকিস্তান থেকে আসা বাঙালি বিজয় বারুইয়ের ঠিাকানা এটাই। গৃহপালিত কুকুরটি কুটির সংলগ্ন নালার কাছে বার বার যাচ্ছে ও ফিরে আসছে। তার চিৎকারে গৃহকর্তা কৌতূহলবশত একবার গেলেন সেই নালার কাছে। বিস্ময়ে হতবাক হয়ে দেখলেন এক জারোয়া তরুণ নালার মধ্যে পড়ে আছে। করুণভাবে হাত তুলে সাহায্য প্রার্থনা করছে।...যে দুর্ধর্ষ জারোয়ার ভয়ে মানুষজন রাতে ঘরের বাইরে বেরোত না, সেদিন তাদেরই  একজনকে ওই ভাবে দেখে তার বিস্ময়ের সীমা রইল না।

‘করুণ মুখ,  ভয়ে কুঁকড়ে গেছে। বয়স বছর চৌদ্দর মত হবে। তার করুণ মুখ দেখে ছুটে আসা গ্রামবাসীই সহানুভূতি দেখালো।...যন্ত্রণায় কাতর জারোয়া তরুণ। ডান পায়ের দুটো হাড়ই ভেঙ্গে গেছে। গ্রামবাসী যুবকরা কিছু খাবার ও জল দিতে গেল। সে নিল না। গ্রামবাসিদের ভিড়ের মধ্যে এক তামিল যুবক ছিল।  গায়ের রং ঘন কালো। তাকে ইশারা করে জারোয়া তরুণ কাছে ডাকলো। সেই তামিল যুবক খাবার ও জল দেয়ার পর সে তা খেল।

‘এই জারোয়া তরুণই আজকের বহু আলোচিত ইনমেই, যে কিনা সভ্য জগৎ ও আদিম জগতের মধ্যে মিলন সেতু রচনা করেছে।

‘মূলত এটি ছিল একটি চুরির ঘটনা। আগের রাতে অর্থাৎ ১৯৯৬ সালের ১৪ এপ্রিলে জারোয়ারা দল বেধে কদমতলা গ্রামে কলা  নারকেল, কাঁঠাল ও গৃহস্থালির সামগ্রি চুরি করতে আসে। কলা বাগানে গাছ কাটার আওয়াজে গৃহকর্তা বিজয় বারুই ঘরের বাইরে আলো জ্বালায়  এবং চারদিক পরীক্ষণ করে। আলো দেখে সব জারোয়া পালিয়ে যায়। একটা গাছের শিকড়ে পা আটকে গিয়ে ডান পায়ের দুটো হাড়ই ভেঙ্গে যাওয়ায় ভাঙ্গা পা নিয়ে নালার মধ্যে পড়ে থাকে ইনমেই। চারদিক খবর ছড়িয়ে পড়ে। পুলিশ ইনমেইকে কদমতলা প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যায়। প্রাথমিক চিকিৎসার পর ইনমেইকে পোর্টব্লেয়ারের গোবিন্দ বল্লভ পন্থ হাসপাতালে নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

মধ্য আন্দামানের কদমতলা থেকে দক্ষিণ আন্দামানের পোর্টব্লেয়ার পর্যন্ত আন্দামান ট্রাঙ্ক রোডের সমস্ত পুলিস স্টেশন ও ওয়ারলেস স্টেশনকে সচেতন করা হলো। রাস্তার আশেপাশের জঙ্গলে জারোয়াদের গতিবিধি আছে কিনা খবর নেয়া হলে। এক জন জারোয়াকে গাড়ী করে তার এলাকা থেকে অন্য কোথাও নিয়ে  যাওয়া হবে, এ ব্যাপারটা জারোয়াদের নজরে এলে তারা গাড়িটাই আক্রমণ করতে পারে। এই ছিল তখন প্রশাসনের আশঙ্কা।

পুলিস প্রহরায় জারোয়া তরুণ ইনমেইকে পোর্টব্লেয়ারের কেন্দ্রীয় হাসপাতালে পৌঁছানো হলো এবং একটি  ভি. আই. পি. রুমে তাকে রাখা হলো। বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে ইনমেইয়ের রুমে রেডিও ও টেলিভিশন সেটও দেয়া হলো।  তবুও ইনমেই অনুভব করছে সে যেন চারদিক থেকে অবরুদ্ধ হয়ে আছে। যে উলঙ্গ শিশু প্রকৃতির কোলে মুক্ত জীবন যাপন করে তার কাছে পোর্টব্লেয়ারের গোবিন্দ বল্লভ হাসপাতাল বদ্ধ কারাগার ছাড়া আর কী?

প্রথম প্রথম ইনমেই হাসপাতালেও উলঙ্গ থাকতো। হাসপাতালের বিছানা থেকে নেমে মেঝেতে শুয়ে থাকতো। পায়ের প্লাস্টার নষ্ট করে দিত। হাসপাতালের খাবার খেতো না। অবশেষে একদিন তাকে একটি আস্ত মাছ এনে দেয়া হয়। আস্ত মাছ দেখে ইনমেই খুশি হয়। সেই মাছ পরিস্কার করে সিদ্ধ করে তাকে খেতে দেয়া হয়। সে তৃপ্তির সাথে উক্ত মাছ খায়। এরপর ধীরে ধীরে হাসপাতালের ডাল, ভাত, রুটির প্রতি তার ভাললাগা জন্মায়। হাসপাতালের কর্মীদের সহায়তায় সে বাথরুম ও টয়লেটের ব্যবহারও শিখে ফেলে। রেডিও ও টিভি তার বিনোদনের মাধ্যম হয়ে ওঠে। পেন্সিল দিয়ে কাগজে ছবি  একে সকলকে দেখায়। পরনের প্যান্ট প্রথমে খুলে ফেললেও পরে সে নিজেই তা পরতে শুরু করে। গোবিন্দ বল্লভ পন্থ হাসপাতালে অর্থোপেডিক্সের ডা. এন. সদাশিবের দক্ষ চিকিৎসায় ইনমেই পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠে। প্রশাসনের উপরাজ্যপাল, এম. পি. প্রমুখ কর্তাব্যক্তিরাও ইনমেইয়ের চিকিৎসার খোজ খবর নিতে থাকেন। ইতোমধ্যে কিছু হিন্দি শব্দও ইনমেই বলতে শেখে এবং বুঝতে পারে প্রায় ল হিন্দি কথাই। অবশেষে ৫ মাসের হাসপাতাল জীবন শেষে সম্পূর্ণ সুস্থ হলে ৩ অক্টোবর ১৯৯৬ তারিখে তাকে একটি জীপে করে মধ্য আন্দামানের কদমতলায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে ডিঙ্গি করে মধ্য আন্দামানের জারোয়া কুটির লাকরালুংটায় তাকে নিয়ে যাওয়া হয়। পুলিসের ডিঙ্গি থেকে নেমেই কুটিরের কাছে গিয়ে সমবেত জারোয়াদেরকে বললো- ‘মি ইনমেই’ অর্থাৎ আমি ইনমেই।  ইনমেইর  বাবা ও অন্যান্যরা ইনমেইকে ফিরে পেয়ে বিস্ময়ে হতবাক। তারা ধরেই নিয়েছিল যে, সভ্যজগতের মানুষ যাদেরকে জারোয়ারা বলে ‘ইনেন’ তারা ইনমেইকে হত্যা করেছে। ইনমেই কুটিরে ফিরে শুরু করলো সভ্য জগৎ বিষয়ে তার রঙ্গিন সব গল্প। মহা বিস্ময়ে জারোয়ারা সেদিন ইনমেইয়ের কাছে সভ্য জগতের গল্প শুনতে লাগলো।

এক বছর পরে সভ্য জগতের এ্যামবাসেডর হিসেবে ইনমেইয়ের নেতৃত্বে ঘটে সভ্য সজতের সাথে জারোয়াদের বন্ধুত্বের প্রথম ঐতিহাসিক ঘটনাটি। দিনটি ছিল ১৯৯৭ সালের ২৮শে সেপ্টেম্বর। পড়ন্ত বেলা। মধ্য আন্দামানের কদমতলা জেটিতে  গ্রামবাসীরা বেড়াতে এসেছে। কয়েকজন গ্রামবাসী দেখতে পেল নদীর অপর পারের গান্ধীঘাট জেটির কাছে খাঁড়ি গাছের কয়েকটা ডাল ক্রমাগত নড়ছে। অথচ কোনো বাতাস নেই। কৌতূহলবশত একজন জেলে ডিঙ্গি নিয়ে খাঁড়ি গাছের কাছে যায় এবং দেখামাত্রই জেলেটি গাছে বসা ইনমেইকে চিনে ফেলে। ইনমেই হাসছে আর হাত নাড়ছে। তার সাথে আরও ৬জন তরুণ তরুণী।  রোমাঞ্চকর অনুভূতি নিয়ে ডিঙ্গিওয়াল কদমতলা জেটিতে ফিরে আসেন। এই ডিঙ্গিওয়ালা আন্দামান জনজাতি বিকাশ সমিতির জনপ্রিয় কর্মী দেবব্রত মন্ডল।

ডিঙ্গি ওয়ালার কাছ থেকে খবর পেয়ে পুলিশ গান্ধী ঘাট জেটিতে যায়। ইতোমধ্যে ইনমেই ও তার সাথের জারোয়া তরুণ-তরুণীরা গাছ থেকে নেমে এসে গান্ধীঘাটের যাত্রী ছাউনিতে আশ্রয় নেয়। সাতজন তরুণ-তরুণীকে পুলিশ ডিঙ্গিতে করে কদমতলা জেটিতে নিয়ে আসে। ইনমেই ছাড়া অন্য তরুণরা আশঙ্কিত। সভ্য জগতের মানুষেরা হয়তো তাদের ওপর ভালো আচরণ করবে না। কিন্তু কিছুক্ষণেই তাদের সেই আশঙ্কা দূর হলো যখন গ্রামবাসীরা তাদের হাতে কলা আর নারকেল উপহারস্বরূপ তুলে দিল। জারোয়া তরুণ-তরুণীদের মুখে তখন হাসি ছিল। সম্প্রদায়গতভাবে জনজতি জারোয়া ও সভ্যজগতের মাঝে শুভেচ্ছা বিনিময়ের  সে ছিল এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। সভ্য জগতে বেড়াতে আসা এই সাত জারোয়া অতিথিকে অনেক কলা ও নারকেলের উপঢৌকনসহ সেদিন পুলিশ ডিঙ্গি করে আবার পৌঁছে দিয়ে আসে তাদের লাকরালুংটা কুটিরে। ইনমেইয়ের সাথে বেড়াতে আসা সেই ছয় জারোয়া আজ সকলের পরিচিত ওহামে (মৃত), টিঙ্গালাম, এডভুসি, তাহেরি, থেঙ্গা ও আচারোয়া । প্রতমোক্ত তিনজন তরুণ, শেষোক্ত তিনজন তরুণী। ইনমেইয়ের পরে এই ছয় জারোয়াই হলো জারোয়া জনজাতি ও সভ্য জগতের মানুষের মাঝে স্থায়ী এক সেতুবন্ধন।

এই ঘটনার পনেরো দিনের মাথায় অক্টোবর মাসে লাকরালুংটা এলাকা থেকে ৭০ জন জারোয়া সাঁতার কেটে কদমতলা জেটিতে চলে আসলো।  গ্রামবাসী সাদরে গ্রহণ করলো সেই উলঙ্গ মানুষদের। এবারও পুলিশ বেশ কয়েকটা ডিঙ্গিতে নারকেল ও কলা বোঝাই করে ৭০ জন জারোয়াকে লাকরালুংটার কুটিরে পৌঁছে দিয়ে আসলো। এই দুই ঘটনার পর থেকে পুলিশের বন্দুক ও জারোয়ার তীর ধনুকের সহাবস্থান শুরু হলো। এরপর আর কোনোদিন পুলিসের বন্দুক গর্জে ওঠেনি জারোয়াদের দিকে। আর জারোয়াদের তীরও ছুটে আসেনি পুলিস বা সভ্য জগতের মানুষের দিকে। এই অগ্রগতিতে ১৯৯৭ সালেই জারোয়া দমনের বুশ পুলিস বাহিনীর নতুন নাম হয় জে.পি.পি. (জারোয়া প্রোটেকশন পুলিস)।

জারোয়ারা এবার ভরসা পেতে শুরু করে সভ্য জগতের ওপর। ১৯৯৯ সাল থেকে জারোয়া পুরুষ মহিলারা কদমতলা হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিতে শুরু করে। তবে তার আগে কদমতলা হাসপাতালের ডাক্তাররা জারোয়াদের কুটিরে কুটিরে গিয়ে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতো। সেই সকল ডাক্তারদের মধ্যে ডা. রতনচন্দ্র কর একটি বিশিষ্ট নাম। পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম মেদিনীপুরের বাসিন্দা ডা. রতনচন্দ্র কর ১৯৮৮ সালে আন্দামান ও নিকোবর প্রশাসনে স্বাস্থ্যদপ্তরে যোগদান করেছিলেন। এরপর ১৯৮৯ সাল থেকে অদ্যাবধি জারোয়া জনজাতির স্বাস্থ্য সেবা ও কল্যাণার্থে নিয়োজিত আছেন। তাঁর লিখিত ‘আন্দামানের জনজাতি জারোয়া’ জারোয়াদের জীবন ও সমাজ নিয়ে লিখিত এ যাবৎকালের সবচেয়ে তথ্যমূলক গ্রন্থ। চলবে

আরো পড়ুন : কালাপানির কেচ্ছা ।। পর্ব ১০

//জেডএস//

লাইভ

টপ