রেমিটেন্স ম্যান

Send
জাকির হোসেন
প্রকাশিত : ১৭:৪০, এপ্রিল ২১, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:৪০, এপ্রিল ২১, ২০২০

করোনায় আমরা ভীত নই। বরং মোকাবেলা করছি গৃহে অন্তরীণ থেকে। এতে হয়ত কিছুটা বাড়তেও পারে মানসিক চাপ। তাই আসুন, খুলে দেই মনঘরের জানালা। নিজেকে চালিত করি সৃজনশীলতায়। আপনি নিয়মিত লিখছেন, বা এটাই হতে পারে আপনার প্রথম গল্প। লিখুন ফেসবুকে। চটজলদি ৫০০ শব্দের গল্প, বাংলা ট্রিবিউনের জন্য। একইসঙ্গে নমিনেট করুন আপনার পছন্দের আরও ১০ জন লেখককে। সেরা ১০ জন লেখক পাচ্ছেন কাগজ প্রকাশনের বই। আর অবশ্যই হ্যাশট্যাগ দিন #বাংলাট্রিবিউনসাহিত্যবিদেশের অবস্থা তো ভালোই না।দেশের অবস্থাও দিন দিন ভয়াবহ হয়ে উঠছে।আমিন সাহেব সস্ত্রীক কিছুক্ষণ পরপর টিভির সামনে বসে আপডেট দেখার জন্য।ছোট্ট লুবাইসাও আব্বু-আম্মুর সঙ্গে বসে থাকে আপডেট দেখতে।কাজের মেয়ে রাজিয়া আমিন সাহেবের বাসাতেই থাকে।এখানে থেকে-খেয়ে মাস শেষে বাড়িতে টাকা পাঠায়।আপডেট দেখার সময় রাজিয়া কতক্ষণ পরপর এসে জিজ্ঞেস করে—‘মামা আইজ কইজন আক্রান্ত হৈছে? লুবাইসা আইজ কইজন মরছে? সৌদি আরবের কী অবস্থা মামি? আমার ভাইটা জানি কোনখানে আছে? সৌদি সরকার কি বাংলাদেশিগো পাঠায়া দিব?’আমিন সাহেব, স্ত্রী ও মেয়ে লুবাইসা যে যার মতো করে রাজিয়ার প্রশ্নের উত্তর দেয়।কখনো আমিন সাহেব কখনোবা তাঁর স্ত্রী ধমক দিয়ে বলে—‘খবর দেখতে আসছিস না? রাজিয়া,আজ তরকারিতে লবণ বেশি দিয়েছিস তো দেখবি,তোর একদিন কী আমার একদিন ‘

দুমাস হলো ড্রাইভিং ভিসায় রাজিয়ার ছোট ভাই সৌদিআরব গিয়েছে।যে মাসে গিয়েছে সেই মাসেই সৌদিআরব লকডাউন হয়ে গেছে।ভাই বাড়িতে ফোন করে।রাজিয়া বাড়িতে কল করলে ভাইয়ের কথা জানতে পারে।শেষবার গত সপ্তাহে বাড়িতে কথা বলার পর রাজিয়া জানতে পারে,বাংলাদেশি যে লোক ভিসা দিয়ে সৌদি নিয়ে গেছে।ওর ভাই তার কাছেই আছে।ভাইয়ের সঙ্গে মালিক এখনও দেখা করেনি।মোবাইলেও যোগাযোগ হয়নি।এমন মহামারির দিনে মালিক ওর ভাইকে নিয়োগ দেবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ আছে।এই সংবাদটি শোনার পর থেকে রাজিয়া রীতিমতো চিন্তায় পড়ে গেছে।ভাইকে বিদেশ পাঠাতে ছয় লাখ টাকা খরচ হয়েছে।যার মধ্যে আছে সাড়ে তিন লাখ টাকার ঋণ।রাজিয়া বাসায় কাজ করে ওর বিয়ের জন্য সত্তর হাজার টাকা জমিয়েছিল।বিদেশ যাওয়ার জন্য টাকাগুলো ভাইকে দিয়েছে।এমতাবস্থায় ভাই যদি দেশে ফেরত আসে।তাহলে মরণ ছাড়া তাদের আর কোনো পথ খোলা থাকবে না! রাজিয়া এই বিষয়টা নিয়ে খুব বেশি ভাবে।আর ভাবলেই যেন আকাশটা ওর মাথায় ভেঙে পড়তে চায়।

সবাই তো চাল-ডাল-তেল দিচ্ছে।আমিন সাহেব তার স্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তারা অর্থ সহায়তা করবে।সহায়তার অর্থ বিকাশের মাধ্যমে পাঠিয়ে দেবে।এই নিয়ে তারা ডাইনিং টেবিলে বসে বিশজনের একটি তালিকা তৈরি করছিল।দারোয়ান,কাজের বুয়া,আমিন সাহেবের পরিচিত,স্ত্রীর পরিচিত,গ্রামের চেনা দরিদ্র।এসবের মধ্য থেকে সতেরোজন হয়ে গেছে।আর বাকি তিনজন।আমিন সাহেব ও তাঁর স্ত্রী বাকি তিনজনকে খুঁজে পাচ্ছে না।আমিন সাহেব লুবাইসাকে বলল—‘মামনি তোমার চোখে পড়ে এমন কেউ আছে যাকে হেল্প করা যায়?’লুবাইসা গালে হাত দিয়ে ভাবতে থাকে।মুহূর্তমাত্র পরে মাথা নেড়ে বলে—‘নো,পাপা নেই।’ পাপা মেয়ের কথায় আচ্ছা বলে সাড়া দিতেই লুবাইসা বলল—‘পাপা,আছে।দুজন আছে।একজন আমাদের স্কুলের আয়া এবং আরেকজন ফুসকাওয়ালা!’ পাপা মেয়ের কথায় উত্তর দিল—‘মামনি,ফুসকাওয়ালাকে কোথায় পাব? তার তো নম্বর লাগবে। কারণ আমরা মোবাইল নম্বরের বিকাশ অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠাব।’

পাপার কথা শেষ হলে মাম বলল—‘তোমার কাছে আয়ার নম্বর আছে?’

লুবাইসা মাথা নেড়ে বলল—‘হ্যাঁ,মাম।স্কুল ডায়েরিতে আয়ার নম্বর আছে।’

লুবাইসা ডায়েরি এনে মামকে দিল।পাপা ডায়েরি থেকে আয়ার নম্বরটি লিস্টে নামের পাশে লিখে রাখল।

আয়াসহ মোট আঠারোজন হয়েছে। আরও দুজন লাগবে।আমিন সাহেবকে স্ত্রী বলল—‘আর দুইটা নাম রাজিয়ার কাছ থেকে নিতে পারো।’ কথাটির সমর্থন জানিয়ে আমিন সাহেব রাজিয়াকে ডাকল—‘রাজিয়া...রাজিয়া...রাজিয়া...।’

রাজিয়া শুনছিল না।

—‘মেয়েটা বয়রা নাকি!’

স্ত্রী বলল—‘বদমাশটা টিভি দেখছে।মেয়েটার এত্তো নেশা টিভির প্রতি!’

লুবাইসা দৌড়ে গিয়ে রাজিয়াকে ডাকল—‘এ্যাই,রাজিপু।তোকে পাপা ডাকছে না!’

রাজিয়া টিভি বন্ধ না করে ডাইনিং রুমে গেল।

—‘মামা ডাকছেন?’

—‘এদিকে আয় শয়তান কোথাকার।কয়বার ডাকছি তোকে,হুঁ?’

রাজিয়া তোতলিয়ে তোতলিয়ে বলল—‘মামা,টিভি দ্যাখতেছিলাম।তাই আপনি যে ডাকছেন হুনছি না।’

—‘বেততমিজ,তুই কি টিভি দেখে সংলাপ মুখস্ত করিস? এত ডাকলাম শুনলি না!’

রাজিয়া বোকার মতো হাসল কিন্তু কিছু বলল না।

আমিন সাহেব শক্ত গলায় বলল—‘এই বল তো তুই কী দেখতেছিলি?’

—‘মামা,আমি টিভিতে একটা রিপোর্ট দেখতেছিলাম।’

দাঁতে দাঁত চেপে আমিন সাহেব বলল—‘রিপোর্ট দেখতেছিলি? বল রিপোর্টে কী বলছিল? যদি বলতে না পারিস তবে তোর কপালে আজ দুঃখ আছে।’

রাজিয়া চোখ বন্ধ করল। কিন্তু কেন করল কে জানে! আমিন সাহেবের ভয়ে নাকি টিভিতে যা দেখেছে তা মনে করার জন্য? চোখ বন্ধ করে রাজিয়া রিপোর্টে যা শুনেছিল তাই অবিকল বলছে—‘করোনায় গার্মেন্টস সেক্টর প্রণোদনা পেল,ভারী শিল্প প্রণোদনা পেল,কৃষি খাতে প্রণোদনা পেল কিন্তু প্রবাসীরা কী দোষ করল? অথচ বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎসটি হলো প্রবাসীদের রেমিট্যান্স।এই মহামারির সময়ে অন্যান্যখাতের মতো চাকরিহারা বিদেশফেরত এবং যে সকল প্রবাসী বাঙালি বিদেশে অর্থাভাবে আছে।দূতাবাসগুলোর মাধ্যমে সরকারের কি উচিত নয় রেমিট্যান্স ম্যানদের পাশে দাঁড়ানো?’

/জেড-এস/

লাইভ

টপ