লকডাউন

Send
সোলায়মান সুমন
প্রকাশিত : ১৬:৫১, মে ০৩, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:২২, মে ০৪, ২০২০

জনির বউ এতটা লক্ষ্মী যে তাদের দুজনের মধ্যে কোনোদিন ঝগড়া হয়নি। আসলেই অবিশ্বাস্য একটা বিষয়। অন্তত জনির এমনটাই মনে হয়। বিয়ের এক বছর হতে চলল তবু জনির কোনো সিদ্ধান্তে মনা কোনো দিন আপত্তি তোলেনি। জনি যা বলে তাতেই মনা হ্যাঁ, হুম, বলে সায় দিয়ে যায়। বিয়ের আগে মনা কখনো শাড়ি পরেনি। বিয়ের পর সে সালোয়ার কামিজ পরত কিন্তু জনি একদিন বলে, তুমি শাড়ি পরার অভ্যাস করলে আমি খুশি হবো। জনির আর কিছু বলার প্রয়োজনই হয়নি। মনা তার সব শটস্, জিন্স, টি শার্ট, সালোয়ার কামিজ কবাটে উঠিয়ে রেখেছে। এখন সর্বক্ষণ সে শাড়ি পরে থাকে। জনি চাকরি করে একটি পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানে। খুবই ব্যস্ততা তার। কখনো নারায়ণগঞ্জে, কখনো আশুলিয়ায় দৌঁড়ের ওপর থাকতে হয় তাকে। ভালোই চলছিল তাদের জীবন। হঠাৎ করে এলো করোনার কাল। আস্তে আস্তে দেশের অবস্থা এমন দিকে গড়ালো সারা দেশে লকডাউন ঘোষণা হল। জনি এখন সারাদিন বাড়িতে। দুজনে গল্প করে, চা খায় বারান্দায় বসে। এটা ওটা নিয়ে গল্প করে। মনার একটা খারাপ অভ্যাস ছিলো। সে মোবাইল নিয়ে পড়ে থাকে। ফেসবুক, ইনস্ট্রাগ্রাম, হটস্অ্যাপ, টিকটক সব ধরনের একাউন্ট আছে তার। জনি বলে, দেখছি মোবাইলটা তোমার হাসবেন্ড হয়ে গেছে।

মনা বলে, কী করব বলো। তুমি সারা দিন বাইরে। সময় কাটে না। এসব করে সময় কাটাই।

—আমি তাই তো বলছি একটা বাচ্চা নাও।

—ঠিক আছে আর কিছুদিন যাক।

জনির বউ অপরূপ সুন্দরী তাই জনি বাইরে চাকরির জন্য পাঠাতে চায় না। বলা তো যায় না। রাস্তা-ঘাটে কোথায় কোন দুর্ঘটনা ঘটে যায়। নারায়ণগঞ্জে বখাটেদের তো অভাব নেই। একদিন গোসল সেরে জনি গামছা দিয়ে চুল মুছতে মুছতে রুমে ঢোকে। অন্যদিন এই সময় তার ভীষণ ব্যস্ততা থাকে। কীভাবে অল্প সময়ের মধ্যে নাস্তা সেরে অফিসের উদ্দেশ্যে বের হওয়া যায় সেই চেষ্টা চলে। আজ বেলা করে ঘুম থেকে উঠে নাস্তাটা সেরে গোসলে গেছিল। এরপর হাতে কোনো কাজ নেই। বই-পেপার পড়া, টিভি দেখা এসবে তার তেমন কোনো আগ্রহ নাই। কথায় আছে, অলস মস্তিষ্ক শয়তানের আড্ডাখানা। জনির মাথায় কী যে শয়তানি চাপলো সে ভাবলো বউয়ের সাথে একটু মজা করা যাক। জনি বলল, এই তুমি সারা দিন ফেসবুকে কার কার সঙ্গে কথা বলো?

মনা ফোনটা বন্ধ করে জনির দিকে তাকালো। দুঃখিত। তুমি কখন এলে খেয়াল করিনি। চা খাবে? চা করে দেই?

—লাগবে না।

—তাহলে এখানে এসে বসো। জনির ভেজা মাথায় হাত বুলিয়ে শুকিয়ে দিচ্ছি। তোমাকে বললাম এই সময় নাড়া হয়ে যাও। সবসময় বাড়িতে থাকছো। আরাম পেতে।

—না ঠিক আছে।

মনা জোর করে বিছানায় বসিয়ে দিয়ে জনির মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। জনি ভাবে, এই মেয়ে কী দিয়ে তৈরি—রাগ বলতে কি তার কিছু নেই। জনির মনে জেদ চেপে গেল। সে যেভাবেই হোক মনাকে খেপিয়ে তুলবে তারপর ক্ষমা চেয়ে নেবে।

তার কয়েকদিন পরের কথা। মনা বারান্দায় গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে কার সাথে যেন ফোনে কথা বলছিল। জনি বারান্দায় গিয়ে হুট করে মনার হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নিয়ে বন্ধ করে দিল। ফোনে নম্বরটা ছোট বোন শিল্পীর নামে সেভ করা। তবু জনি বলল—বারান্দায় এসে লুকিয়ে লুকিয়ে কার সাথে কথা বলছ? মনে করেছ আমি বুঝি না!

—কী বলছ এসব বাজে কথা? আমি আমার ছোট বোন শিল্পীর সাথে কথা বলছিলাম। আমি শুনেছিলাম ছেলে মানুষ বেকার হয়ে বাড়িতে বসে থাকলে মাথা ঠিক থাকে না। সেই হয়েছে তোমার দশা।

—আমাকে উল্টা-পাল্টা বলে পার পাবা না? তোমার মতো সুন্দরী মেয়ে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে একটাও প্রেম করেনি সেটা আমাকে বিশ্বাস করতে হবে?

—তুমিও তাহলে প্রেম করেছো অনেক?

জনি কী উত্তর দিবে বুঝে উঠতে পারে না। দুয়েকটা প্রেম সে যে করেনি সেটা বললে ঠিক হবে না। কিন্তু ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবতে গিয়ে ওসব আর কন্টিনিউ করা সম্ভব হয়নি। এম.এ. করার দশ বছর পর সে বিয়ে করেছে। নিজের পায়ে না দাঁড়িয়ে বিয়ে করবে কীভাবে। দীর্ঘদিন অল্প বেতনে ছোটখাটো চাকরি করেছে তারপর এই চাকরি এবং বিয়ে। মনার সঙ্গে বিয়েটা তার পারিবারিকভাবেই হয়েছে। তবে বিয়ের আগে তারা মাসখানেক নিজের মতো করে ঘুরেছে। একে অপরের মনের কথা শেয়ার করেছে বিয়ের বাজার তারা দুজনে মিলে করেছিলো। জনি বলে, সে সময় পেলাম কই। পড়াশোনা, ক্যারিয়ার এই করতে বরতে তো অর্ধেকটা জীবন পার হয়ে গেল।

—আমার জীবনটা তোমার কাছে উন্মুক্ত বইয়ের মতো। সবই তো তোমাকে বলেছি বিয়ের আগে। আমি একটা রক্ষণশীল পরিবারের মেয়ে। মাথায় কাপড় না দিয়ে বাইরে কখনো বের হইনি। কোনো ছেলে বন্ধু তো দূরের কথা—কোনো বান্ধবীর বাড়িতে পর্যন্ত যাওয়া নিষেধ ছিল।

—ও তো কথা জানি না। আমি সারা দিন অফিস করে মরি আর তুমি কার সাথে মারিয়ে বেড়াও। এসব চলবে না। যদি আমার সাথে সংসার করতে চাও তো যেভাবে বলছি সেভাবে চলবে। না তো বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দিব।

—বিয়ে এক বছরও হলো না। এরই মধ্যে আমাকে তোমার আর ভালো লাগছে না?

—এই সব বলে সিমপ্যাথি নেবার চেষ্টা করবে না।

—তুমি বলার পর থেকে আমি ফেসবুক বন্ধ করে রেখেছি আর খুলিনি। ফোনটাও কি ব্যবহার করতে পারব না?

—নাহ। পারবা না। বোনের সাথে কথা বলছি বলে আড়ালে প্রেমিকের সাথে কথা বলবে সে চলবে না।

—তোমার মুখে কি কোনো কথা আটকায় না। মনা চোখের জল মুছতে মুছতে ঘরে চলে গেল। রাতে খাবার টেবিলে মনা কোনো কথা বলল না। মায়াভরা কাজল চোখের মেয়েটির জন্য জনির খুব মায়া হল। কী যে সে করছে। অহেতুক মেয়েটাকে কষ্ট দিচ্ছে। না এটা ঠিক হচ্ছে না। রাতে অস্থির মন নিয়ে জনি ছাদে একা একা হাঁটাহাঁটি করছিল। হাঁটতে হাঁটতে সে ভীষণ একাকিত্ব বোধ করতে শুরু করে। নিঃসঙ্গ চাঁদটাকে তার অসহ্য মনে হয়। দ্রুত সে নিচে নেমে আসে। শোবার ঘরে গিয়ে দেখে মনা একা একা বসে কাঁদছে। জনি তাকে জড়িয়ে ধরে চুমু খায়। তারপর বিছানায় শুইয়ে দিয়ে বুকে মাথা রাখে। মনার হাত দুটোকে টেনে এনে নিজের মাথার উপর রাখে। মনা হাত দুটো সরিয়ে নেয়। জনি আবার মনার হাত দুটোকে তার মাথার উপর রাখে। মনা আবার হাত সরিয়ে নেয়। তৃতীয়বারে মনা নিজেই জনিকে বুকের সাথে আঁকড়ে ধরে। জনির ঠোঁটে চুমু খায়। মনা বলে, তুমি বাচ্চা নিতে চাইলে আমার কোনো আপত্তি নেই।

—তাহলে আজ থেকেই সে চেষ্টা শুরু করা যাক।

—ওরে বদমাশ। সুড়সুড়ি। সে জনির কোমরে সুড়সুড়ি দেয়। মনা ভালা করেই জানে জনির কোমরে অনেক সুড়সুড়ি। জনি ছিটকে দূরে সরে যায়।

পরের দিন সকালে জনি ভাবে, নাহ আর নাহ। এই খেলা বাদ দিতে হবে। খুব রিক্সি হয়ে যাচ্ছে গেইমটা। কিন্তু ঠিক তখনই মাথার মধ্যে পোকা কিলবিল করে ওঠে। মনা বিছানা ঠিক করতে করতে বলে, কবে যে লকডাউন অবস্থা থেকে মুক্তি পাবো। নারায়ণগঞ্জের অবস্থা দিন দিন খারাপের দিকে যাচ্ছে।

—কেন? যদি সমস্যা হয় আমার হবে। অফিস আর ক’মাস বেতন দিতে পারবে? বেতন বন্ধ হলে সংসার চালাব কীভাবে? এসব তো আমার ভাবনা। তুমি তো বিন্দাস আছো।

—তারপরও।

—তারপরও কী? প্রেমিকের সঙ্গে কথা বলতে পারছ না।

—কী বলছ এসব! অবাক হয়ে মনা জনির দিকে তাকায়।

জনি জানে, মনা সে ধরনের নারী যাদের জীবনের উদ্দেশ্য স্বামী সেবা—পতিব্রতা যাদের কাছে পরম ধর্ম। জনি তার মুখে একটা কৃত্রিম উষ্ণতা ধরে রাখে।

মনা এবার সত্যি ভয় পেয়ে যায়। সে বলে, তোমার সাথে আজকাল কথা বলতে ভয় হয়। মনা ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।

—ধুর। জনি ভীষণ বিরক্ত। এ মেয়ে কী দিয়ে গড়া এত কিছুর পরও উত্তেজিত হয় না।

তবে একটা প্রতিক্রিয়া মনা দেখায়—জনির সাথে সে একেবারে কথা বন্ধ করে দেয়। জনি আবার এমন গুমোট পরিবেশ সহ্য করতে পারে না। বাড়িতে তারা দুইজন প্রাণী। লোকডাউন চলছে। বাইরে যাওয়া একেবারে বন্ধ। এখন যদি মনার সাথে সে কথা বলতে না পারে তো দম বন্ধ হয়ে মারা যাবে! জনি সিদ্ধান্ত নেয়—এই খেলা শেষ করতে হবে। এভাবে দুই দিন কেটে গেছে। আজ ছিল পহেলা বৈশাখ। লকডাউন শুরু হবার আগে জনি একটা শাড়ি কিনে এনেছিল। ভেবেছিল মনা সেটা পরবে। বাড়িতে যা কিছু আছে তা দিয়েই ভালো-মন্দ রান্না করবে। কিন্তু সেটা করে না মনা। জনি ভাবে, নাহ। এবার সত্যি সত্যি এই খেলা শেষ করবে। রাত তখন ১১টা। মনা শোবার ঘরে আর আসে না। ব্যালকুনির অন্ধকারে একা দাঁড়িয়ে থাকে। বিকেল থেকে আকাশে মেঘ ছিলো, কোথাও না কোথাও কালবৈশাখী ঝড় হচ্ছে। জনি বিছানায় না গিয়ে চেয়ারে বসে থাকে। বরোটা বেজে যায় তবু মনা ঘরে আসে না। বাইরে ঠান্ডা বাতাস বইছে। মাঝে মাঝে আকাশ রূপালি আলোয় ভরে যাচ্ছে। সে আলোয় মনার তন্বী তনু জানালার ওপারে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। জনির মাথায় কী যে ভূত চাপল সে ব্যালকুনির আঁধারে মনার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। এখানে কী করছ?

—কী বলবা না কোন সেই প্রেমিক? কার জন্য মন খারাপ করে এখানে দাঁড়িয়ে আছো? এই তোমার শেষ সুযোগ। মনা অবাক হয়ে জনির দিকে তাকায়। তার চোখে মুখে ভয়ের রেখা। বিজলির আলোয় মনার ঠোঁট দুটো কেঁপে কেঁপে ওঠে। জনি আবার বলে, কী বলবা না, কে সে?

—তুমি যেদিন বলেছিলে ফেসবুক বন্ধ করে দিতে সেদিন থেকে ওর সাথে কথা বন্ধ করেছি।  

হঠাৎ ঝড় উঠল। সাথে এলোমেলো বৃষ্টি। বজ্রপাতের শব্দে জনির কান যেন ঝালা-ফালা হয়ে গেল। মাঝে মাঝে লকডাউন ভেঙে বাজার করার জন্য জনিকে বাইরে যেতে হয়েছে। শরীরে ঘাম দিয়ে যেন জ্বর আসছে তার। করোনায় আক্রান্ত হয়েছে নাকি সে?

//জেডএস//

লাইভ

টপ