ছায়াকাল

Send
কুসুম সিকদার
প্রকাশিত : ২৩:২৪, জুলাই ৩০, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২৩:৩৭, জুলাই ৩০, ২০২০

তিন বন্ধু পূজার ছুটিতে কক্সবাজার যাওয়ার প্ল্যান করল, শুক্র-শনি মিলিয়ে প্রায় সাতদিন কলেজ বন্ধ। রিংকি, পিকলু, জ্যাকি––বলতে গেলে প্রায় দশ-বারো বছরের বন্ধুত্ব ওদের। বন্ধুত্ব বললে অনেক অল্প বলা হবে হয়তো, বন্ধুত্বের চেয়েও গভীর ওদের বোঝাপড়া। রাতে শুধু যে যার বাড়িতে ঘুমাতে যায়, তাছাড়া সর্বক্ষণই ওরা একসঙ্গে থাকে ওদের তিনজনের কারও না কারও বাড়িতে। প্রায় সব ছুটিতেই ওরা কোথাও না কোথাও ঘুরতে যাওয়ার প্ল্যান করে। পিকলুর মামা-মামি থাকেন কক্সবাজার, বিশাল কাঠের দুইতলা বাংলো বাড়ি তাদের। মামা-মামির একমাত্র মেয়ে জেসি কানাডায় থাকে। তাই পিকলুরা বেড়াতে গেলে মামা-মামি বেজায় খুশি হন। এর আগেও দুইবার গেছে ওরা তিনজন মামা-মামির বাড়িতে বেড়াতে। 

শীতটা এখনও পুরোপুরি পড়েনি কিন্তু শীত শীত আমেজটা মনে করিয়ে দিচ্ছে যে সঙ্গে কিছু গরম কাপড় রাখলে মন্দ হয় না। এখনও কুয়াশা পড়া শুরু হয়নি তবে ধোঁয়াটে একটা হালকা স্তর যেন ঢেকে রেখেছে সকালটাকে। সকাল সাড়ে নয়টায় ওদের ফ্লাইট। ঢাকা টু কক্সবাজার। সবার আগে এয়ারপোর্টে পৌঁছাল রিংকি, তারপর পিকলু আর সবশেষে জ্যাকি। সবচেয়ে পাংচুয়াল পিকলু কিন্তু রিংকির বাসা এয়ারপোর্টের কাছে হওয়াতে পিকলুর আগে রিংকি পৌঁছে গেছে। তবে জ্যাকি সারাজীবনই খুব ধীরস্থির, সময়ের কাজ সময়ের মধ্যেই করে কিন্তু সবার শেষে করে। অস্থির বলতে যা বোঝায় সেটা হলো রিংকি, যে কোনো ছোটখাটো বিষয়ে রিংকির উত্তেজনা সামলাতে বাকি দুজনের হিমশিম খেতে হয়। এয়ারপোর্টে লাগেজ চেক ইন করিয়ে বোর্ডিংয়ের জন্য অপেক্ষা করছে ওরা। রিংকি ওর ছোট হ্যাঁন্ডব্যাগটা পিকলুকে দেখতে বলে ওয়াশরুমে গেল। বেশ ভালোই ভিড় আজকে ডমেস্টিকে। অনেকগুলো ফ্লাইট পর পর ছাড়বে। বসার জায়গারও একটু অভাব। চারদিক কাচে ঘেরা ছোট একটা স্মোকিং রুমের পাশে পাশাপাশি চারটা চেয়ার খালি দেখতে পেয়ে গিয়ে বসে পড়ল পিকলু আর জ্যাকি। তিন-চার মিনিট পর তামাটে সোনালি চুল আর মার্বেলের মতো সবুজ চোখের দুইজন মোটামুটি ওদেরই বয়সের মেয়ে এসে পাশের বাকি দুটো খালি চেয়ারে বসার অনুমতি চাইল। পিকলু আর জ্যাকি জানে রিংকি এই দৃশ্য দেখলে কী হতে পারে এবং তার রেশ পুরো কক্সবাজার সফরে কী প্রভাব ফেলতে পারে। তাও রেশমি সোনালি চুল এবং স্বচ্ছ সবুজ চোখের স্বর্গীয় ঘোরে আচ্ছন্ন হয়ে তারা ওদের দুজনকে পাশে বসতে বলল। দুজন মেয়েরই কাপড়চোপড়, জুতা, হ্যাঁন্ডব্যাগ একটু যেন অন্য ধরনের। এখনকার ট্রেন্ডে এই ধরনের গেটআপ কেউ নেয় না। সাদাকালো মুভিতে এই ধরনের গেটআপ নিতে দেখা যেত। জ্যাকি আর পিকলুর ধারণা মেয়ে দুটো যে দেশ থেকে এসেছে সেখানে হয়তো এই ফ্যাশন চলছে এখন। আজকাল তো পুরনো ফ্যাশন আর নতুন ফ্যাশনের মিক্সড অ্যান্ড ম্যাচ চলে সব দেশে। কিন্তু যাই হোক না কেন, মেয়ে দুটো ভয়ংকর সুন্দরী আর এমন সৌন্দর্য সহসা চোখে পড়ে না আজকাল বিদেশি সিনেমাতেও। একটু যেন প্রাচীন রোমান চেহারা আর দেহবল্লরি। পরনে ঢিলেঢালা গাউনের মতো কিছু একটা, একজনের ওপরের গাউনের কাপড়টার রং লাল আর ভেতরে সাদা শার্ট বা ব্লাউজের মতো একটা অংশ রয়েছে, আরেকজনেরও একই ধরনের সাদা ঢিলেঢালা শার্টের ওপর হালকা বাদামি গাউন। একজনের চুল একদম সোজা, আরেকজনের ভীষণ কোকড়ানো, ওদের স্যান্ডেল দেখে মনে হচ্ছে লেদার আর ভেড়ার পশম দিয়ে তৈরি। অ্যাঙ্কেল বোন, পায়ের তলাটা ঢাকা আর পায়ের ওপরে চারদিকে চিকন চিকন ফিতার মতো জড়ানো। হাতে চুড়ির মতো কিছু একটা পরা, দেখে মনে হয় একসঙ্গে পঞ্চাশটা রুপালি রঙের চুড়ি, আসলে একটাই চুড়ি বেশ লম্বা। রিংকি দেখলে হয়তো বলতে পারত এসবের নাম। পিকলুর জন্মের আগে ওর মা-বাবা দুজনেই চাকরির সুবাদে বেশ কয়েকবছর ইতালিতে ছিল, মা-বাবার কাছ থেকে পিকলু টুকটাক ইতালি ভাষা শিখেছে যা কথা চালিয়ে যাবার জন্য যথেষ্ট। পিকলুর মনে হচ্ছে মেয়ে দুজন খুব সম্ভবত প্রাচীন ল্যাটিন ভাষায় কথা বলছে, ইতালি ভাষা আর প্রাচীন ল্যাটিন ভাষা খুব কাছাকাছি হওয়ায় পিকলু কিছুটা আন্দাজ করতে পারছে ওরা কী ভাষায় কথা বলছে।

দূর থেকে দেখা যাচ্ছে রিংকি বিস্ময়ের অভিব্যক্তি দিয়ে হাত নাড়তে নাড়তে ওদের দিকে এগিয়ে আসছে। ঈশ্বরের অশেষ কৃপা রিংকি কাছে এসে কিছু বলার আগেই অ্যানাউন্সমেন্ট করতে শোনা গেল কক্সবাজার ফ্লাইটের যাত্রীদের বোর্ডিং করার জন্য। পিকলু, জ্যাকি পরিস্থিতি বুঝে সঙ্গে সঙ্গে চেয়ার থেকে উঠে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকা রিংকির দুই হাত ধরে, দুজন রিংকিকে উল্টো ঘুরিয়ে বোর্ডিং বাসের দিকে নিয়ে গেল যত দ্রুত সম্ভব। যে বাসে করে যাত্রীদের প্লেনের কাছে নিয়ে যাওয়া হবে তার কিউ-এ দাঁড়াল ওরা তিনজন। পিকলু এবং জ্যাকির চোখ খুব সতর্কতার সঙ্গে ওই মেয়ে দুজনকে খুঁজতে লাগল। কিউ-এর একদম পেছনের দিকে দেখা গেল ওরা দাঁড়িয়ে আছে। যেন অকারণেই ভীষণ আনন্দ বয়ে গেল পিকলু আর জ্যাকির মনে, বোঝা গেল ওই দুজন সুন্দরীও একই ফ্লাইটে কক্সবাজার যাচ্ছে। প্লেনে উঠে যার যার বোর্ডিং কার্ডের সিট নম্বর দেখে নিজ নিজ সিটে বসে পড়ল ওরা। একেবারে সামনের ডানদিকে জানালার ধারে সিট পড়েছে রিংকির, তার পাশে জ্যাকি। অন্যদিকের আইল সিটে বসেছে পিকলু, তার পাশে জানালার সিটটা এখনও খালি। যাত্রীরা এখনও উঠছে উড়োজাহাজে। কিছুক্ষণ পর দুই বিদেশি সুন্দরীকে উঠতে দেখা গেল জাহাজে। পিকলু আর জ্যাকির কৌতূহলী চোখ নিমিষে চক চক করে উঠল। লাল গাউন পরা মেয়েটি বোর্ডিং কার্ড দেখে পিকলুর পাশে খালি সিটটায় গিয়ে বসল আর পিকলুর দিকে তাকিয়ে ভ্রু উঁচিয়ে মিষ্টি একটা ছোট হাসি দিল, যার অর্থ দাঁড়ায় ‘আবার দেখা হয়ে গেল’। বাদামি গাউন পরা কোকড়া চুলের মেয়েটি জ্যাকি ও রিংকির পেছনে আইল সিটে বসল। পিকলু সিট বেল্ট পরতে পরতে পাশে বসা মেয়েটিকে ইতালি ভাষায় হ্যাঁলো বলল, মেয়েটিও খুব বিনয়ের ভঙ্গিতে উত্তর দিল। কিছুটা সময় পার হলো। ফ্লাইট স্টুয়ার্ডেস অ্যানাউন্স করল আর অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে বিমান উড্ডয়ন করবে এবং চল্লিশ মিনিটের মধ্যে কক্সবাজার বিমানবন্দরে অবতরণ করবে। উড্ডয়নের কিছুক্ষণের মধ্যে সিট বেল্ট পরার সংকেত বন্ধ হয়ে গেলে যাত্রীদেরকে প্যাকেট জুস এবং হালকা স্ন্যাক খেতে দেয়া হলো রিফ্রেশমেন্টের জন্য। রিংকি জুসের প্যাকেটে স্ট্র ঢুকিয়ে চোখ বন্ধ করে খেতে লাগল। যে কোনো ফলের রসই ওর ভীষণ প্রিয়, জ্যাকি পেট ভরে নাশতা করে এসেছে বাড়ি থেকে তাই ও কিচ্ছু খাচ্ছে না। কানে হেডফোন লাগিয়ে গান শুনছে আর মাঝে মাঝে পিকলুর পাশে বসা মেয়েটাকে দেখার চেষ্টা করছে। পিকলুই প্রথমে কথা শুরু করল। চিকেন স্যান্ডউইচে ছোট একটা কামড় বসিয়ে পাশে বসা মেয়েটিকে ইতালি ভাষায় জিজ্ঞেস করল, সে কি ওর নাম জানতে পারে কিনা, মেয়েটি হেসে বলল, ‘নিশ্চয়ই, আমার নাম এইলিয়া, তোমার?’ পিকলু হ্যাঁন্ডশেক করার জন্য মেয়েটির দিকে ওর ডান হাত বাড়িয়ে বলল, ‘আমার নাম পিকলু, তোমার সঙ্গে পরিচিত হতে পেরে খুব ভালো লাগল, তুমি নজরকাড়া একজন সুন্দরী।’ এইলিয়া প্রচণ্ড মিষ্টি করে হেসে হ্যাঁন্ডশেক করে ধন্যবাদ জানাল পিকলুকে। পিকলুর যেন মনে হলো এইলিয়ার এই হাসি আর একবার দেখার জন্য ও যে কোনো কিছু করতে প্রস্তুত। পিকলু কথা বলতে শুরু করল এইলিয়ার সঙ্গে, স্যান্ডউইচ খেতে খেতেই জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি কিছু খাচ্ছ না যে এইলিয়া?’ মুখটা খরগোশের মতো মিষ্টি করে কিছুটা অপরাধীর কণ্ঠে বলল, ‘এই খাবারগুলোর সঙ্গে আমি খুব একটা পরিচিত নই।’ পিকলু কাগজের তৈরি স্ন্যাকের বক্সটা খুলে ভালো করে দেখল ভেতরে কী কী রয়েছে। স্যান্ডউইচ ছাড়াও একটা ছোট কাপ কেক, চানাচুরের ছোট একটা প্যাকেট, অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল দিয়ে মোড়ানো একটা লাড্ডু আছে। পিকলু ঠিক বুঝতে পারল না অন্তত স্যান্ডউইচ আর কাপ কেক না চেনার অর্থ কী, চানাচুর লাড্ডু এগুলো না হয় এদেশীয় খাদ্য, যদিও সারা পৃথিবীতে এগুলো পাওয়া যায় এবং বিদেশিরাও খায়। পিকলুর মনে হলো এইলিয়া বোধহয় একটু নাক উঁচু স্বভাবের মেয়ে। পিকলু অতি কৌতূহলবশত আবার নিজে থেকে জিজ্ঞেস করল, ‘যদি কিছু মনে না করো জানতে পারি তোমরা কোথা থেকে এসেছ?’ এইলিয়া বলল, এক্স। পিকলু ভূগোলে বরাবরই খুব ভালো, এমনকি রিংকি জ্যাকির তুলনায় শুধু নয়, ওর বয়সি যে কোনো ছেলেমেয়ের তুলনায় পিকলুর ভৌগোলিক জ্ঞান ভালো। কিন্তু তা সত্ত্বেও এইলিয়া যে দেশের নাম বলল পিকলু ঠিক চিনতে পারল না। খুবই লজ্জা এবং বিরক্ত লাগছে ওর। এত পড়াশোনা করে কী লাভ হলো যদি এইলিয়ার দেশই না চিনতে পারে, মোবাইলে নেটওয়ার্ক থাকলে চট করে দেখে নেয়া যেত কিন্তু সেটাও সম্ভব নয়। ১৭ হাজার ফুট উচ্চতায় বাংলাদেশের উড়োজাহাজে মোবাইল নেটওয়ার্ক সার্ভিস দেয়া হয় না। জ্যাকি বা রিংকিকে জিজ্ঞেস করার প্রশ্নই আসে না। ওদের কেউ যদি চিনতে পারে দেশটা তাহলে খোঁচা খেতে খেতে মরতে হবে। এবার এইলিয়া পিকলুকে নিজ থেকে জিজ্ঞেস করল, ‘ফ্লাইটটা যেখানে যাচ্ছে সেখানে থাকো তুমি?’ পিকলু বলল, ‘না না আমরা ঢাকা থাকি, বেড়াতে যাচ্ছি কক্সবাজার। আমার মামা...’ পিকলুর কথা শেষ হওয়ার আগেই এইলিয়াকে দেখে মনে হলো ওর বমি পাচ্ছে। পিকলু জিজ্ঞেস করল, ‘এইলিয়া তুমি ঠিক আছ? কোনো সাহায্য লাগবে? ফ্লাইট স্টুয়ার্ডকে ডাকব?’ এইলিয়া বলল, ‘না ঠিক আছি, এই নিয়ে দ্বিতীয়বার উড়োজাহাজে চড়লাম, আমরা তো এর সঙ্গে পরিচিত নই, তাই গা-টা গুলিয়ে আসছে।’ পিকলুর কাছে অবিশ্বাস্য লাগল এই কথাটা একজন বিদেশি রমণীর মুখে। হয়তো মোশন সিকনেস আছে কিন্তু বলতে চাইছে না লজ্জায়। পিকলু আবার জানতে চাইল, ‘তোমরা দুবন্ধু কি বাংলাদেশে এসেছ শুধু কক্সবাজার যাওয়ার জন্য?’ এইলিয়া বলল, ‘ও আমার বোন, এলবা।’ এতটুকু বলে বাকি প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল আর বিড়বিড় করতে লাগল, ‘বাংলাদেশ, কক্সবাজার, বাংলাদেশ, কক্সবাজার।’

পিকলু ভাবল নিশ্চিত মেয়েটার মাথায় গণ্ডগোল আছে। এত সুন্দর একজন মেয়ের মাথায় একটু গণ্ডগোল থাকলে কী-বা যায় আসে। পিকলু আর কথা না বলে চুপচাপ চোখ বন্ধ করে বসে থাকল। মিনিট পাঁচেক পর উড়োজাহাজ অবতরণের অ্যানাউন্সমেন্ট হলো, সবাই সিট বেল্ট পরে প্রস্তুত হলো। ফ্লাইট স্টুয়ার্ড এসে সবার সামনে থেকে খাবারের বক্স, জুসের খালি প্যাকেট সব নিয়ে সামনের টেবিলটা পরিষ্কার করে আবার যার যার সিটের পাশে ভাঁজ করে রেখে দিল। উড়োজাহাজ ধীরে ধীরে নিচে নামা শুরু করল।

পিকলু, রিংকি জ্যাকি উড়োজাহাজ থেকে নেমে লাগেজের বেল্ট থেকে নিজেদের লাগেজ বুঝে নিল। হঠাৎ করে কোথা থেকে একটা দমকা হাওয়া এসে রিংকির চুলগুলো এক নিমিষে এলোমেলো করে দিল। ভীষণ ধুলো উড়তে লাগল চারদিকে। ওরা তিনজনই চট করে চোখে সানগ্লাস পরে নিল। লাগেজ নিয়ে বাইরে থেকে একতলা দালানের ভেতরে ঢুকল ওরা দ্রুত পা চালিয়ে। পিকলু বলল, ‘তোরা অপেক্ষা কর আমি মামাকে একটা ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করি গাড়ি পাঠিয়েছে কিনা?’ রিংকি বলল, ‘মামাকে ফোন দেয়ার দরকার কী, মতিন ড্রাইভারকে ফোন দে, ও-ই তো আমাদের ডিউটি করবে, মামা তো আগেই বলেছেন। এর আগেও তো মতিন ভাই-ই আমাদের এয়ারপোর্ট থেকে নিয়ে গেছে আবার এয়ারপোর্টে দিয়ে গেছে।’ পিকলু মোবাইল হাতে নিয়ে ফোন করতে গিয়ে দেখে ফ্রিকোয়েন্সি কম। হেঁটে রুমের অন্যপ্রান্তে গেল বেশি ফ্রিকোয়েন্সি পাওয়া যাবে এই আশায়। মোবাইল চাপতে চাপতে পিকলু লক্ষ করল––সেই দুই বিদেশি রমণী এয়ারপোর্টের দুজন কর্মচারীর সঙ্গে খুবই উদ্বিগ্নভাবে অস্থির হয়ে কথা বলছে, দেখে মনে হচ্ছে খুবই চিন্তিত। যে দুজন কর্মচারীর সঙ্গে কথা বলছে তাদের একজন পিকলুদের পরিচিত। দূর সম্পর্কের আত্মীয় তাছাড়া গত দুবার যখন ওরা কক্সবাজার এসেছিল তখনও দেখা হয়েছিল। মেয়ে দুজনকে ভিআইপি রুমে যেতে বলে তানিম আর আরেকজন কর্মচারী কথা বলতে বলতে অন্যদিকে যাচ্ছিল, পিকলু একটু জোরগলায় ‘তানিম ভাই’ বলে ডাক দিল। ডাক শুনে তানিম পিকলুর দিকে তাকিয়ে হাত উঁচিয়ে একগাল হেসে সামনে আসতে থাকল। ‘কিরে পিকলু, কেমন আছিস ভাই, খেয়ালই করিনি তোকে, তুই একাই এসেছিস এবার?’ বলল তানিম, ‘না, রিংকি জ্যাকিও এসেছে, ভেতরের দিকে বসা ওরা, তোমরা সবাই ভালো তো?’ বলল পিকলু। ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ আমরা সবাই আছি ভালোই, এবার আসিস কিন্তু আমাদের বাড়িতে ঘুরতে, আগে একটা ফোন দিয়ে আসবি ভাই, নইলে দেখা যাবে আমি এখানে ডিউটিতে রয়েছি আর তোরা গিয়ে আমার মায়ের সঙ্গে গল্প করছিস।’ পিকলু বলল, ‘না তোমাকে ফোন দিয়ে জানিয়েই যাব, আচ্ছা তানিম ভাই, তুমি যেভাবে ওই দুজন ভদ্রমহিলার সঙ্গে কথা বললে মনে হলো কোনো ঝামেলা হয়েছে, কিছু মনে না করলে জানতে পারি কী হয়েছে? আমরা পাশাপাশি সিটে বসে এসেছি তাই একটু কৌতূহল আর কী।’ ‘আর বলিস না, ভীষণ ঝামেলায় পড়েছি আমরা ওনাদের দুইজনের জন্য, ওনারা বলছেন ওনাদের লাগেজ মিসিং, কক্সবাজার নাকি কানেকটিং ফ্লাইটে এসেছে ঢাকা হয়ে। কিন্তু যে দেশ থেকে এসেছে সেই দেশের ফ্লাইট ঢাকায় আসা তো দূরে, এরকম কোনো দেশের নামই আগে শুনেছি বলে তো মনে হয় না। তার ওপর, কক্সবাজার যেখানে যাবে বলছে, সেই জায়গার নামও আমি শুনিনি, জন্ম হলো এখানে আমার বড় হলাম এখানে, আমার তো মনে হয় না, এমন কোনো জায়গা আছে এখানে। তাছাড়া ওনাদের কথা বুঝতেও সমস্যা হচ্ছে, আমাদের ইন্টারপ্রেটার কিছুটা বুঝতে পারছে ওদের কথা, কী জানি একটা অদ্ভুত ভাষায় কথা বলছে। কী জানি, একটু ঝামেলাজনক বিষয় মনে হচ্ছে, গুপ্তচর বা সন্ত্রাসী হতে পারে, কক্সবাজার এয়ারপোর্ট সিকিউরিটি ফোর্সকে খবর দেয়া হয়েছে, ওরা এসে একটা ব্যবস্থা নিলে আমরা নিশ্চিন্ত।’ একনাগাড়ে বলে শেষ করল তানিম। তারপর আবার খুব দ্রুতগতিতে বলল, ‘যাইরে পিকলু, অনেক কাজ পড়ে রয়েছে, শোন অবশ্যই ফোন দিয়ে তোর বন্ধুদের নিয়ে চলে আসবি, রাতের বেলা বাড়িতেই থাকি।’ চলে গেল তানিম। পিকলু ভাবল, তার মানে এইলিয়ার দেশের নাম কেউই চিনতে পারছে না। কোনো একটা বড় রহস্য যে আছে এটা তো প্রথমেই বোঝা গিয়েছিল। এইলিয়া আর ওর বোন এলবার হাবভাব কথাবার্তায়। পিকলু মোবাইলে মতিন ড্রাইভারের নম্বর ডায়াল করল। মতিন ড্রাইভার বলল যে, এয়ারপোর্টের বাইরেই গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করছে ওদের জন্য অনেকক্ষণ ধরে। যেখানে রিংকি জ্যাকি বসা ওখানে গেল পিকলু ওদের ডাক দিতে কারণ ওদের বসার ওই জায়গাটিতেই মোবাইল ফ্রিকোয়েন্সি পর্যাপ্ত নেই। পিকলু রিংকি জ্যাকি লাগেজ নিয়ে এয়ারপোর্টের বাইরের গেটে রাখা মামার গাড়িতে উঠে মামার বাংলোর উদ্দেশ্যে রওনা দিল। বাইরে তখন আর ধূলিঝড়টা নেই। খুব অল্প সময়ের জন্য বাতাসটা বয়েছিল। এত ক্ষণস্থায়ী ধূলিঝড় সচরাচর হয় না শীতের শুরুতে বাংলাদেশে। গাড়িতে যেতে যেতে ঘটে যাওয়া পুরো ঘটনাটা বলল পিকলু––রিংকি আর জ্যাকিকে। এয়ারপোর্ট থেকে মামার বাংলো যেতে দেড় ঘণ্টার মতো লাগে। ওরা গাড়ির এসি বন্ধ করে জানালার কাচ নামিয়ে নির্মল ঠান্ডা বাতাস গায়ে মেখে আনন্দ করতে করতে যেতে থাকল।

নীলাভ সমুদ্রের একদম কাছে, সবুজ গাছগাছালিতে ঘেরা পিকলুর মামার কাঠের দুইতলা বাড়ি। নানারকম ফুলের তীক্ষ্ণ মিষ্টি গন্ধ আর পাখির কিচিরমিচির বাড়িটার বিশেষ বৈশিষ্ট্য। দুইতলার একদম পশ্চিমদিকের ঘরটায় পিকলু আর জ্যাকি থাকে প্রতিবার এখানে আসলে। আর রিংকিকে দেয়া হয় পূর্বদিকে জেসির ঘরের পাশের ঘরটা। দুইতলায় মোট চারটা শোবার ঘর। বিশাল প্রশস্ত সিঁড়ি দিয়ে উঠেই মাঝখানে পাশাপাশি দুটো ঘর। ডানদিকেরটা মামা-মামির আর বামেরটা জেসির। একদম ডান আর বামের ঘর দুটো খালি থাকে, যে দুটোতে ওদের তিনজনকে থাকতে দেয়া হয়েছে। নিচতলায় বিশাল ড্রইং, ডাইনিং, লিভিং রুম আর রয়েছে রান্নাঘর। ওরা বেড়াতে এলে সব ঘরগুলো গমগম করে, বাকি সময় সব খালিই পড়ে থাকে। দুপুর একটা বেজে গেছে, মামিকে ওরা বলেছে, একবারে দুপুরের খাওয়া খেয়ে নিয়ে একটু বিশ্রাম নেবে তারপর বিকেলের দিকে ঘুরতে বের হবে। ফ্রেশ হয়ে তিনজনই নিচে ডাইনিং রুমে খেতে নামল। মামির তত্ত্বাবধানে তার পারদর্শী রাঁধুনী সালেহা দারুণ রান্না করেছে। খিচুড়ি, তেঁতুলের চাটনি দিয়ে বেগুন ভাজা, আলুর দম, মুরগির মাংস আর নারকেল দিয়ে চিংড়ির মালাইকারি। ভীষণ মজা করে গোগ্রাসে খেলো ওরা সুস্বাদু খাবারগুলো। নীরবে তৃপ্তির ঢেকুর তুলল এক-একজন। মামিকে ধন্যবাদ জানিয়ে ঠান্ডা স্প্রাইটের ক্যান হাতে নিয়ে লিভিং রুমে গিয়ে বসল সবাই। লিভিং রুমের কাঠের ফ্রেমে কাচের দরজাগুলো সব খোলা। ফুলের গন্ধের সঙ্গে কিছুটা সমুদ্রের নোনা গন্ধও ঘিরে রয়েছে বাংলোটাকে। উপরের ঘরগুলোর তুলনায় নিচের ঘরগুলোতে একটু যেন বেশিই পাওয়া যায় নোনা গন্ধটা। লিভিং রুমের সোফায় গা এলিয়ে বসে স্প্রাইটের ক্যানে চুমুক দিয়ে রিল্যাক্সভাবে জ্যাকি বলল, ‘তো, আজকের প্ল্যান কী তোদের বল?’ রিংকি বলল, ‘আমি ড্রাইভ করে তোদের লং ড্রাইভে নিয়ে যাব সমুদ্র আর পাহাড়ের মধ্যকার স্বর্গীয় রাস্তা ধরে ঠিক গোধূলিবেলায়। আহা হালকা নীল আকাশ আর স্বচ্ছ নীল সমুদ্র যখন সোনালি গোধূলির সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে কালচে নীলাভ রং ধারণ করে, দেখতে কেমন মোহনীয় জাদুর মতো লাগে।’ ‘ঠিক আছে, আমরা তাহলে একটু বিশ্রাম নিয়ে সাড়ে চারটার দিকে বের হবো।’––বলল জ্যাকি ‘কিরে পিকলু কথা বলিস না কেন?’ জ্যাকির প্রশ্নে পিকলু যেন সম্বিৎ ফিরে পেল। ‘কী ভাবছিস তুই?’ জিজ্ঞেস করল রিংকি। ‘না, ভাবছি একবার তানিম ভাইকে ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করব কী হলো শেষ পর্যন্ত ওই মেয়ে দুজনার, খুব জানতে ইচ্ছা করছে।’ জ্যাকি আর রিংকি মাথা নাড়িয়ে পিকলুর কথায় সম্মতি জানাল। সাদা ও ছাইরঙা চেক চেক শর্টস-এর পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে তানিমের নম্বরে ডায়াল করল, অপরপ্রান্ত থেকে তানিম ফোন ধরেই বলল, ‘হ্যাঁরে পিকলু বল।’ পিকলু বলল, ‘হ্যাঁ তানিম ভাই শোনো না বলছি কী, খুব আগ্রহ হচ্ছিল জানতে, তাই ফোন দিয়ে বিরক্ত করলাম তোমার কাজের সময়, আচ্ছা ওই মেয়ে দুজনের শেষ পর্যন্ত কী হলো, বলো তো।’ তানিম বলল, ‘আর বলিস না ভাই, কিছুই বুঝতে পারলাম না, এমন অদ্ভুত ঘটনা দেখিনি জীবনে আমরা কেউ, পুরোই ভূতুড়ে কাণ্ড!’ পিকলু আর সহ্য করতে না পেরে বলে উঠল, ‘কী হয়েছে বলবে তো!’ তানিম বলতে থাকল, ‘আরে তোরা চলে যাবার খানিক বাদে এয়ারপোর্ট সিকিউরিটি ফোর্স এসেছিল। বিশ্বাস করবি না তন্ন তন্ন করে খুঁজেও ওই দুজনকে পাওয়া যায়নি...।’ পিকলু তানিমের কথা শেষ না করতে দিয়ে আবার ওর কথার ওপর বলে বসল, ‘খুঁজে পাওয়া যায়নি মানে?’ পিকলুর এই কথাটার মানে বোধহয় কিছুটা আঁচ করতে পেরে জ্যাকি সামনের দিকে ঝুঁকে বসে আগের চেয়ে বেশি মন দিয়ে পিকলুর কথা শুনতে লাগল।

তানিম পিকলুর প্রশ্নের উত্তরে বলল, ‘হ্যাঁ ভাই এয়ারপোর্টের ভেতরে-বাইরে সম্ভাব্য সব জায়গায় তাদের খোঁজা হয়েছে, কিন্তু কোথাও পাওয়া যায়নি। আর সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, ওরা যেখানটায় বসা ছিল সেখানকার সিসিটিভি ফুটেজে ওদের কোনো ছবি আসেনি, ফুটেজ দেখে মনে হয় ওরা ওই ভিআইপি রুমে ঢোকেইনি, অথচ আমি নিজে ভিআইপি রুমের দরজা পর্যন্ত ওদের নিয়ে গিয়েছিলাম। আর ভিআইপি রুমে আর কোনো দরজাও নেই যে বাইরে চলে যাবে। ওদের উড়োজাহাজ থেকে নামা বা আমাদের দুজনের সঙ্গে কথা বলার সিসিটিভি ফুটেজ আছে কিন্তু ভিআইপি রুমের ভেতরে ওদের ঢোকার বা বসার কোনো ফুটেজ নেই, আমরা কিছুই বুঝতে পারছি না। যাই হোক এয়ারপোর্টে বাড়তি সিকিউরিটি নিয়োগ দিয়েছে এএসএফ আগামী দুদিনের জন্য, ওরা অবজার্ভ করবে, সন্দেহজনক কিছু দেখলে অ্যাকশন নেবে।’ কথা শেষ করে পিকলু ফোন রেখে জ্যাকি আর রিংকিকে জানাল ওরা আসার পর কী ঘটেছে এয়ারপোর্টে। তিনজনের কাছেই ব্যাপারটা ভূতুড়েই মনে হলো, যদিও ওরা কেউ ভূত-প্রেত বিশ্বাস করে না।

খানিকক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে কড়া রোদটা কমে গেলে মামার দ্বিতীয় গাড়িটা নিয়ে চারটার দিকে বের হলো ওরা। আগের কথামতো রিংকি ড্রাইভ করছে, ওর পাশে বসা জ্যাকি আর পেছনে পিকলু। মামার বাংলো থেকে বের হয়ে ওরা বা দিকের রাস্তা ধরে চলতে থাকল। খুব প্রিয় একটা মন্দির আছে ওদের, যেটার ঠিক উল্টোদিকে রাস্তার অন্যপাশে সমুদ্রের তীরে অনেক বড় বড় পাথর লাইন ধরে সাজানো। একটা বিশাল গোছের গুড়ির মতো বানিয়ে তার চারপাশে ছোট ছোট চেয়ার বসিয়ে ওই মন্দিরের এক কর্মচারী পবন ছোট একটা খোলা রেস্টুরেন্টের মতো বানিয়েছে নিজের নামে। ওই মন্দিরের অদূরেই বড় পাথরে বসে সামনের সমুদ্রের অফুরন্ত ঢেউ দেখতে আর কাছেই ওই রেস্টুরেন্টে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সমুদ্রের গর্জন শুনে আড্ডা দিতে ওদের ভীষণ ভালো লাগে। বলতে গেলে কোনো এক নেশা পেয়ে বসে ওদের, ওই জায়গাটায় গেলে ওরা সহজে আর উঠতে চায় না। একটা নির্মল ঠান্ডা বাতাসের মোহ আচ্ছন্ন করে রাখে ওদের। মামার বাংলো থেকে প্রায় এক ঘণ্টার পথ। সব সময়ের মতো গাড়ির কাচ নামিয়ে হালকা ভলিউমে গান ছেড়ে গল্প করতে করতে চলতে থাকল ওরা। রাস্তার বাঁ দিকে ঘন সবুজ ঝাউ বন আর ডানে বেশ কিছুটা দূরে নীল সমুদ্র আর আকাশটা যেন গভীর প্রণয়ে একে অন্যের সঙ্গে মিশে এক হয়ে আছে। মন্দিরটার কাছাকাছি পৌঁছাতে প্রায় পাঁচটা বেজে গেল। মন্দিরের পাশে গাছের ছাউনীর তলে গাড়ি পার্ক করে পবনের মোবাইলে ফোন দিল রিংকি। পবন মন্দিরের ভেতর থেকে বের হয়ে ওদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করল আর বলল––গাড়ি পাহারা দেবার জন্য একটা ছেলেকে পাঠাচ্ছে। কোনো চিন্তা না করতে। আয়েশি ভঙ্গিতে আস্তে ধীরে হেঁটে ওরা সমুদ্রের কাছে গিয়ে সমুদ্রের দিকে মুখ করে দাঁড়াল। চোখ বন্ধ করে প্রশ্বাস নিল প্রাণ খুলে। কিছুক্ষণ সমুদ্রের তীরের উষ্ণ পানিতে পা ভিজিয়ে বড় বড় পাথরগুলোতে গিয়ে বসল। চুপচাপ কোনো কথা না বলে সাগরের কেমন একটা রহস্যময় বাতাস মেখে চলল ওরা। প্রায় আধাঘণ্টা পার হলো এভাবেই। জ্যাকি বলল, ‘চল পবনে গিয়ে বসি।’ বাকি দুজনও সায় দিল। শীতল ঝিকিমিকি বালিতে খালি পা ঢুকিয়ে ঢুকিয়ে হাঁটছে ওরা, ওদের পা সরছে সঙ্গে বালিগুলোও চিকচিক করতে করতে উড়ে গিয়ে পাশের ঘুমন্ত বালির ওপর পড়ছে। পবনে পৌঁছে তিনটা কফি অর্ডার করল ওরা। গল্প করতে করতে কখন যে প্রায় সাতটা বেজে গেল খেয়াল করল না কেউ, হঠাৎ রেস্টুরেন্টের মালিক আর মন্দিরের কর্মচারী পবন দৌড়াতে দৌড়াতে এলো ওদের কাছে। জ্যাকির সঙ্গে পবনের বেশি খাতির। দৌড়ে এসে জ্যাকিকে বলল, ‘জ্যাকি দা, আমার মেয়েটার শরীর খুব খারাপ গো, সকাল থেকে খুব জ্বর, আমার গিন্নি ফোন দিয়ে মাত্র বলল, আরও বেড়েছে জ্বর, এক্ষুনি বাড়ি যেতে হবে আমাকে।’ বলে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলল। জ্যাকি দ্রুত পবনকে বলল, ‘এক্ষুনি তুমি তোমার লোকদের রেস্টুরেন্ট বন্ধ করে দিতে বলো আর আমাদের সঙ্গে চলো, গাড়ি দিয়ে তোমার বাড়িতে নিয়ে যাই, প্রয়োজন হলে তোমার মেয়েকে হাসপাতালে নিয়ে যাব আমরা।’ পবন সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে ওর কর্মচারীদের রেস্টুরেন্ট বন্ধ করতে বলে একটুও দেরি না করে জ্যাকির পিছু পিছু ছুটল গাড়ির দিকে। পবনের বাড়িতে পৌঁছতে সাড়ে সাতটার মতো বেজে গেল। ওরা বাড়িতে ঢুকে দেখল কেউ নেই। পবন তার স্ত্রীকে মোবাইলে ফোন দিয়ে জানতে পারল, পবনের ছোট ভাই পার্বন আর তার স্ত্রী মিলে পবনের মেয়েকে কাছের হাসপাতালে নিয়ে গেছে। মেয়ে ঘুমাচ্ছে, আগের চেয়ে একটু ভালো। পবন বলল ওদের, ‘জ্যাকি দা, পিকলু দা, রিংকি দি, অনেক করলেন আমার জন্য, এখান থেকে হাসপাতাল একদম কাছে, আমি চলে যাব, আপনারা চলে যান, অনেক লম্বা পথ আপনাদের, বাড়ির লোকেরা চিন্তা করবে।’ পবনের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ওরা গাড়ি ঘুরিয়ে বাংলোর পথে যাত্রা শুরু করল রাত পৌনে আটটার দিকে। নির্জন রাতে চাঁদের আলোতে রাস্তার ডানদিকে একটু দূরের উঁচু উঁচু পাহাড়গুলোকে কালো দানবের মতো লাগছে। বামদিকে সমুদ্রের কালো ঢেউগুলো তীরে প্রবল বেগে আছড়ে পড়ে কিছুক্ষণ নিশীথিনী বালুর সঙ্গে আলিঙ্গন করে সাদা ফেনার রূপ নিয়ে আবার নিজ স্থানে ফিরে যাচ্ছে। ওদের গাড়ি এগিয়ে চলল কেমন একটা অজাগতিক সৌন্দর্যের সাক্ষী হয়ে। রাত সোয়া আটটার দিকে ওরা পবন রেস্টুরেন্ট আর মন্দির পার হলো, আরও এক ঘণ্টার পথ। মামির ফোন এলো পিকলুর মোবাইলে, ‘কিরে তোরা কখন আসবি? তোর মামা তো নয়টার মধ্যে খেয়ে ফেলে রাতের খাবার, তোদের জন্য অপেক্ষা করছে, তাড়াতাড়ি আয়।’ ‘হ্যাঁ মামি আমরা নয়টার মধ্যে পৌঁছে যাব আশা করি, একটু দেরি হলে তুমি আর মামা খেয়ে নিও, আমরা এসে খেয়ে নেব, চিন্তা করো না।’ কথা শেষ করে পিকলু মোবাইল রেখে দিল। রিংকি ঘণ্টায় ৬০ কিলোমিটার গতিতে গাড়ি চালাচ্ছে। প্রায় আধাঘণ্টা পার হয়ে গেল, গাড়ির জানালা খুলে দিয়ে নির্মল ঠান্ডা বাতাসে চুল উড়িয়ে নিশ্চিন্তে চলছে ওরা। একদম হঠাৎ করে একটা ভীষণ অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। কষে গাড়ি ব্রেক করল রিংকি। তিনজনই এক সেকেন্ডে গাড়ি থেকে নেমে বাইরে গিয়ে দাঁড়াল গাড়ির পেছনের দিকে মুখ করে। ‘এটা কী হলো?’ বলল রিংকি। পিকলু ডান হাত দিয়ে অর্ধেক মুখ ঢেকে, বাঁ হাত মাথায় দিয়ে খুবই অবাক হয়ে বলল, ‘এটা কী করে সম্ভব?’ জ্যাকি দুই কাঁধ উঁচিয়ে হাত নাড়িয়ে ভয়ে চোখ গোল গোল করে বলল, ‘আমরা তিনজনই কি এর আগে ভুল দেখলাম নাকি?’ ওরা প্রায় তিরিশ মিনিট আগে যে মন্দির আর পবন রেস্টুরেন্ট পার করে এসেছিল, মাত্র কয়েক সেকেন্ড আগে অদ্ভুতভাবে একই রাস্তা পার হলো। একই রাস্তা তিরিশ মিনিট পর আবার! খুবই চিন্তিত হয়ে পড়ল ওরা। তিনজনই তো আর একসঙ্গে ভুল দেখেনি আগে বা এখনও ভুল দেখছে না। এই ঘটনার অর্থ তারা কিছুতেই বুঝতে পারল না। এরকম ভূতুড়ে কাণ্ড কী করে মেনে নেবে ওরা বুঝতে চেষ্টা করছে। এরকম কোনো কিছু অতীতে ওদের কারও সঙ্গেই ঘটেনি। বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা ওরা দেয়ার চেষ্টা করল কিন্তু ব্যর্থ হলো। সেই একই রাস্তা ধরে আবার ওরা যেতে শুরু করল যা ওরা কিছুক্ষণ আগেই পার করে এসেছে। কিছুটা ভয়ও পাচ্ছে ওরা। কোনো অদ্ভুত ঘটনার যথাযথ ব্যাখ্যা না পেলে ভয় লাগাই স্বাভাবিক।

সাড়ে নয়টার দিকে মামার বাংলো বাড়িতে পৌঁছল ওরা। আসার পথে চোখে পড়ার মতো আর কোনো অদ্ভুত ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু প্রায় আধঘণ্টার মতো সময় ওরা হারিয়েছে আজকে। একই পথ দুবার পার করেছে পরপর। ঘরে ঢুকে দেখল মামা-মামি খাচ্ছে। মামা সবাইকে দেখে উনার স্বভাবজাত ভারী গলায় জোরে বলে উঠলেন, ‘কিরে মামার কথা তো ভুলেই গেলি তোরা, এসেই নিশ্চয়ই পবনে যাওয়া হয়েছিল, হা হা হা নে বসে পড়, গল্প করতে করতে চারটা খেয়ে নে আমার সঙ্গে।’ ওদের আসার আওয়াজ পেয়ে সারাদিন মামার সঙ্গে থাকা পোষা কুকুর কাউবয় ঘেউ ঘেউ করতে করতে এসে রিংকির সঙ্গে ঘেঁষতে লাগল। তিনজনের সঙ্গেই কাউবয়ের দারুণ খাতির, কিন্তু রিংকির সঙ্গে একটু বেশিই। রিংকিও কাউবয় কাউবয় বলে ওর নাম ধরে ডেকে ডেকে ওর সঙ্গে আহ্লাদ করতে লাগল। রাতের খাবার শেষ করে মামা-মামি যে যে যার যার মতো চলে গেল। ডাইনিং রুমের পাশে লিভিং রুমে গিয়ে বসল ওরা। রিংকির সঙ্গে সঙ্গে কাউবয়ও গেল, ঠিক রিংকির পাশে গিয়ে বসল সোফার ওপর। রিংকি, জ্যাকি সোফায় বসা, পিকলু লিভিং রুমের বিশাল দরজার বাইরে ব্যালকনিতে পায়চারি করছে। কাউবয় ঘেউ ঘেউ করে কথা বলা শুরু করল রিংকির সঙ্গে। পিকলু ঘুরে কাউবয়ের দিকে তাকাল। বলতে গেলে কাউবয়ের জন্মের পর থেকেই ওকে চেনে পিকলু। কেন যেন পিকলুর মনে হলো কাউবয়ের এই ঘেউ ঘেউটা কোথাও যেন একটু ভিন্ন। পরে ভাবল––হয়তো মনের ভুল, যা ঘটে গেছে কিছুক্ষণ আগে তার জন্য হয়তো এরকম মনে হচ্ছে। হয়তো ভয় থেকেই এরকম অনুভূতি হচ্ছে। পিকলু যখন দেখল যে জ্যাকি, রিংকিও কাউবয়ের ডাকের ধরন নিয়ে কিছুই লক্ষ করেনি, তখন আরও নিশ্চিন্ত হলো যে, ওর যা মনে হয়েছে, তা নিছকই ওর নিজের কল্পনা। পিকলু এসে রিংকি আর কাউবয়ের পাশে বসল। সঙ্গে সঙ্গে কাউবয় খুশিতে পিকলুর কোলে মাথা রাখল। জ্যাকি সোফার পাশের সাইড টেবিলে রাখা রিমোটটা নিয়ে টেলিভিশন ছাড়ল। আয়েশ করে সোফায় হেলান দিয়ে ঘুম ঘুম চোখে ওরা টেলিভিশন দেখতে লাগল। কিছুক্ষণ পর মামি এসে কাউবয়কে নিয়ে যেতে চাইল, ‘কাউবয় ওঠো ওঠো চলো, নিজের ঘরে গিয়ে ঘুমাবে।’––বলল মামি। রিংকি বলল, ‘কেন মামি থাক না, আমার সঙ্গে ঘুমাক কাউবয়।’ ‘তোমরা জানো না কী পরিমাণ দুষ্টুমি বেড়েছে ওর, আগের মতো লক্ষ্মী নেই, রোজ রাতে নানা ধরনের অপকর্ম ঘটাত আমরা সবাই ঘুমিয়ে গেলে। একদিন উঠে দেখতাম ফুলদানি ভাঙা, একদিন দেখতাম ডাইনিং টেবিলের রানার মাটিতে, আরেকদিন দেখতাম টিভির রিমোট থেকে ব্যাটারি খুলে গিয়ে নিচে গড়াগড়ি খাচ্ছে, রিমোটের খবর নেই, আরও যে কতকিছু করেছে––বলে শেষ করা যাবে না। তাই কয়েকদিন ধরে ওকে শাস্তি দিচ্ছি, বাইরে বাগানে ওর ঘরে ঘুমায়, আপাতত ঘরে ঢোকা নিষেধ ওর রাতে আমরা শুয়ে পড়লে, আবার সকালে ঢোকানো হয়।’––বলল মামি। নিজের নামে ঢাকার প্রিয় মেহমানদের সামনে এত বদনাম শুনে কু কু আওয়াজ করতে করতে লজ্জায় সোফা থেকে নেমে মামির পায়ের কাছে গিয়ে আহ্লাদ করতে লাগল। মামি আবার ওকে ধমকের সুরে বলল, ‘হয়েছে আর নাটক করতে হবে না, যাও নিজের ঘরে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ো।’ লক্ষ্মী ছেলের মতো কাউবয় মামির কথামতো দরজা দিয়ে বের হয়ে গেল মাথা নীচু করে লেজ উঁচিয়ে। সবাই হেসে উঠল ওরা কাউবয়ের কাণ্ড দেখে। মামি বলল, ‘দেরি করো না, তোমরা অনেক ক্লান্ত, যাও শুয়ে পড়ো রুমে গিয়ে, আবার তো ভোরে নিশ্চয়ই সূর্য ওঠা দেখতে বের হয়ে যাবে। পারও তোমরা।’ শুভ রাত্রী বলে হাসতে হাসতে চলে গেলো মামি। দশ-পনেরো মিনিট টিভি দেখে দুতলায় উঠে শুতে চলে গেল ওরা। বাড়ির কেয়ারটেকাররা সব দরজা জানালা বন্ধ করে সব ঘরের বাতি নিভিয়ে যে যে যার যার মতো ঘুমাতে চলে গেল। শুধু সিঁড়ির উপরের ঝাড়বাতিটা জ্বলতে থাকল। রাতে অন্ধকারে দূরের আকাশের চকচকে চাঁদ তারার নিচে অবস্থিত কাঠের বাংলো বাড়িটাকে প্রকৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ মনে হচ্ছে। খুব কাছ থেকে পাওয়া যাচ্ছে বিনিদ্র সাগরের ছন্দময় গর্জন। সাগর যেন তার এই গর্জন দিয়ে আপন মনে কিছু একটা বলে চলেছে যা হয়তো এই বাংলোর কেউ এখনও বুঝতে পারেনি। ঘুমে অচেতন বাংলোর প্রতিটি প্রাণ। কাউবয় কিছুক্ষণ বাগানের ঘুমন্ত রঙিন প্রজাপতি আর ওর ছোট ঘরের পাশে লাগানো সারি সারি ছোট ছোট ফুল গাছ নিয়ে খেলল। তারপর ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ল ওর ঘরের ভেতর গিয়ে।

হঠাৎ রিংকির ঘুম ভেঙে গেল, হয়তো কোনো কিছুর শব্দে। চোখ খুলে দেখল রাত তিনটা বাজে। একটু ক্ষুধাও লেগেছে মনে হলো তার। রিংকির অভ্যাস, রাতের বেলা ঘুম ভেঙে গেলে এক মগ দুধ খেয়ে আবার শুয়ে পড়া। কিছু খাওয়ার জন্য গা থেকে কম্বল সরিয়ে বিছানা থেকে নামতে গিয়ে রিংকি দেখল বিছানার পাশে মাটিতে কাউবয় একদম চুপচাপ হয়ে বসে আছে। বড় বড় চোখে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। রিংকি বলল, ‘দুষ্টু কাউবয়, নিজের ঘর থেকে ঠিকই লুকিয়ে বেরিয়ে পড়েছে, চল কাউবয় কিছু খেয়ে আসি, বড্ড ক্ষুধা পেয়েছে। নিচে ফ্রিজে নিশ্চয়ই দুধ আছে।’ কাউবয় এমন ভাবে কু কু করে উত্তর দিল, মনে হলো সেও জানে যে, নিচে ফ্রিজে দুধ আছে। রিংকি ফিসফিস করে বলল, ‘আস্তে কাউবয়, কোনো শব্দ করিস না, তাহলে তুইও বকা খাবি আমিও বকা খাব।’ রিংকি খুব আস্তে করে ওর ঘরের দরজা খুলে কাউবয়কে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে গেল। রান্না ঘরে ঢুকে বাতি জ্বালিয়ে ফ্রিজ থেকে দুধের টেটরা প্যাক বের করে, গ্লাসে দুধ ঢেলে খেয়ে নিল চটপট, কাউবয়কে জিজ্ঞেস করল, ‘কিছু খাবি?’ কাউবয় সম্মতি জানাল, সেও কিছু খেতে চায়। রিংকি হাসতে হাসতে কাউবয়ের খাবার রাখা হয় যে শেল্ফে সেখান থেকে ওর বাটি বের করে তাতে কিছু স্ন্যাক ঢালল আর বলল, ‘চল কাউবয় আমরা লিভিং রুমে গিয়ে বসি কিছুক্ষণ।’ রিংকি হাতে কাউবয়ের বাটিটা নিয়ে রান্নাঘরের বাতিটা বন্ধ করে লিভিং রুমের দিকে গেল। সারা বাড়িতে শুধু সিঁড়ির উপরের বড় ঝাড়বাতিটা জ্বলছে। ঝাড়বাতিটা বেশ বড় হওয়াতে মোটামুটি সারাবাড়ির সব ঘরেই একটু একটু করে আলো ছড়াচ্ছে। লিভিং রুমে ঢুকে সোফার ওপর বাটিটা রেখে বাইরের ব্যালকনি আর লিভিং রুমের মাঝের বিশাল কাচের দরজার সামনের পর্দা সরিয়ে দিল। চাঁদ তারার আলোতে আলোকিত আকাশের রশ্মি কিছুটা ঘরে ঢুকে গেল পর্দা সরানোর সঙ্গে সঙ্গে। ঝাড়বাতির কিছুটা আলোর রেখা আর বাইরের ঝাপসা আলো-আঁধারির ছায়া মিলে ঘরের ভেতর কেমন একটা ভৌতিক হলদেটে নীলাভ আবহ তৈরি হলো, কেমন একটা বেদনার্ত সুর যেন বেজে চলেছে এই আবহে। রিংকি বন্ধ কাচের দরজার সামনে দাঁড়াল বাইরের দিকে তাকিয়ে। হঠাৎ ওর মনে পড়ল আজকে মন্দিরের সামনে ঘটে যাওয়া অদ্ভুত ঘটনাটার কথা, কী করে হলো এমন একটা ঘটনা, এর অর্থই বা কী। রিংকির কেমন যেন একটা অনুভূতি হলো, ওর মনে হলো কাউবয় আর ও ছাড়াও কিছু একটা আছে এই ঘরে। বাইরে তাকিয়েই এক পা এক পা করে রিংকি পেছাতে লাগল, পেছানোর সময় ওর বা দিক থেকে কাউবয়ের খুবই গম্ভীর বিকট ভয়ংকর একটা আওয়াজ পেল। এক নিমিষে কিছু বুঝে ওঠার আগেই কাউবয় হিংস্র গতিতে এগিয়ে এসে রিংকির পায়ে ভীষণ জোরে কামড়ে দিল। রিংকি ভয়ে ব্যথায় চিৎকার করে উঠল। রিংকির চিৎকারে নিচে যে তিনজন বাড়ির কেয়ারটেকার, রাঁধুনী আর ড্রাইভার ঘুমিয়ে ছিল––সবাই ঘুম থেকে লাফ দিয়ে উঠে লিভিং রুমে আসল। বাতি জ্বালিয়ে ওরা জিজ্ঞেস করল––কী হয়েছে ওর, আর এত রাতে এখানে কী করছে ও একা একা। ততক্ষণে মামা, মামি আর পিকলু, জ্যাকি, সবাই নিচে নেমে এসেছে। সবারই একই প্রশ্ন, কী দেখে ও এভাবে চিৎকার দিল আর এত রাতে ও কেন এসেছে এখানে! রিংকি পুরো ঘটনাটা বলল সংক্ষেপে, কিন্তু সবাই ওর কথা শুনে খুবই অবাক হলো, কারণ সব বাইরের দরজা ভেতর থেকে আটকানো, কোনো উপায় নেই কাউবয়ের ভেতরে ঢোকার। আর সারা ঘর খুঁজেও কাউবয়কে কোথাও পাওয়া গেল না। কিন্তু সবাই খুব চিন্তিত হলো রিংকির পায়ের সদ্য ক্ষত দাগটা থেকে, দাগ দেখে শুধু রিংকির মনে হচ্ছে কুকুরের দাঁতের কামড়। বাকি সবাই বলছে কুকুরের কামড় না এটা। মামা, মামি আর রাঁধুনী সালেহা মিলে দ্রুত রিংকির ক্ষতটা পরিষ্কার করে ওষুধ লাগিয়ে দিল। মতিন ড্রাইভার ভেতরের দরজা খুলে বাইরে বের হয়ে বিশাল বাগান পার হয়ে মেইন ফটকের এক কোণায় কাউবয়ের ছোট ঘরে ঢুকে দেখল বেঘোরে ঘুমাচ্ছে কাউবয়। কাউবয়ের ঘরটা বাংলো থেকে বেশ দূরে আর বাংলোর দরজা জানালা সব বন্ধ থাকায় কাউবয় হয়তো রিংকির চিৎকারের শব্দ পায়নি, না হয় ঠিকই দৌড়ে চলে যেত ঘেউ ঘেউ করতে করতে।

মতিন ড্রাইভার ফিরে এসে জানাল কাউবয় ওর ঘরে ঘুমাচ্ছে আর বাড়ির সব দরজা জানালাই বন্ধ ছিল, ভালো করে পরীক্ষা করে দেখেছে সে। কেয়ারটেকার রহমতও জানাল, সারা বাড়ি খুঁজে সন্দেহ করার মতো কিছুই  চোখে পড়েনি। মতিন, রহমান, সালেহা শুতে চলে গেল। মামা-মামি রিংকিকে নিয়ে সোফায় বসে রয়েছে। পিকলু আর জ্যাকি দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে চিন্তা করছে। মামি জিজ্ঞেস করলেন, ‘ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করে বল তো মা, স্লিপ-ওয়াক করছিলে তুমি? নাকি সত্যিই কিছু খেতে নেমেছিলে?’ রিংকি বলল, ‘না না মামি সত্যিই আমি ফ্রিজ খুলে দুধ খেয়েছি, কাউবয়ের জন্যও এই খাবারগুলো তখন বের করেছি, ওর আলাদা যে শেল্ফটা আছে ওখান থেকে, কারণ আমাকে দুধ খেতে দেখে ও কিছু খেতে চাইছিল।’ কাউবয়ের খাবার ভর্তি বাটিটা দেখাল রিংকি মামিকে। ‘কিন্তু কাউবয় যদি না ঢুকে থাকে ঘরে তাহলে আমি কী দেখলাম আর কার সঙ্গে কথা বললাম! আর এই কামড় দিল কীসে তাহলে! মামি আমার কিন্তু একটু একটু ভয় করছে। এখানে ভূতটুত নেই তো না! যদিও আমি ভূত মানি না তাও একটু ভয় হচ্ছে আমার, পিকলু, জ্যাকি কীসে কামড় দিল বল তো তোরা?’ বলে রিংকি মামির কাঁধে মাথা রেখে মামির হাতটা ধরে বসল। মামিও নিজের মেয়ের মতো ভালোবেসে পাশ থেকে জড়িয়ে ধরে রাখল রিংকিকে। মামি বুঝতে পারছে, সাহসি মেয়ে রিংকি এখন বেশ ভালোই ভয় পাচ্ছে। কিছুক্ষণ পর পিকলু বলল, ‘মামি প্রায় সাড়ে চারটা বাজে তোমরা শুতে যাও প্লিজ। রিংকিকে আমরা উপরে নিয়ে গিয়ে শুইয়ে দেব, চিন্তা করো না।’ ‘চলো তাহলে একসঙ্গেই যাই’––বলল মামি। ওরা চারজন আস্তে আস্তে রিংকিকে উপরে নিয়ে গেল। মামা-মামি বিদায় নিয়ে রিংকিকে আদর করে শুতে চলে গেল। পিকলু, রিংকি, জ্যাকি রিংকির ঘরে বসে কথা বলছে। রিংকি বিছানায় বসা, ওর ডান পায়ের ছোট কামড়টার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কী হচ্ছে এসব আমাদের সঙ্গে, আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।’ জ্যাকি বলল, ‘হুম, আজকে সন্ধ্যায় যা হলো, আবার এখন এই ঘটনা! আমার কাছে খুবই ভৌতিক লাগছে ব্যাপারগুলো, মনে হচ্ছে খারাপ স্বপ্ন দেখছি, কোনো যুক্তি তো খুঁজে পাচ্ছি না। এই বাংলোতে আমরা আগেও এসেছি। কক্সবাজারেও এসেছি, এমন তো কিছু কোনো দিনই ঘটেনি। তাছাড়া এমন কেন হচ্ছে, নিশ্চয়ই কোনো কারণ আছে। কারণটা কী?’ রিংকি আবার বলল, ‘মামা-মামি নিশ্চয়ই ভাবল আমি স্লিপ-ওয়াক করার সময় কোথাও পড়ে টড়ে গেছি, আমি বলেছি কামড়টা দেখতে কুকুরের কামড়ের মতো, তাই মামা-মামিও আমার হ্যাঁতে হ্যাঁ মিলিয়েছেন, কারণ তারা ভাবছেন আমি পাগল, এমনিতেই ব্যথা পেয়েছি তার ওপর এত হুলস্থূল তাই আর তর্ক করে ঝামেলা বাড়াতে চাননি।’ পিকলু এতক্ষণ বিছানার পাশের ডিভানটায়ে বসেছিল। উঠে এসে রিংকির পায়ের কাছে বসে ওর কাটা দাগটা ভালো করে দেখার চেষ্টা করল। যদিও মামি আর সালেহা কাটার ওপর মলম লাগিয়ে দিয়েছে, তবুও কিছুটা দেখা যাচ্ছে পাশ থেকে। পিকলু বলল, ‘এটা কুকুরের কামড় না আমি একদম শিউর, কিন্তু প্রশ্ন হলো কাটল কী করে।’ রিংকি কিছু বলতে যাচ্ছিল, ওকে থামিয়ে দিয়ে পিকলু আবার বলল, ‘মাথা ঠান্ডা করে যা দেখেছিস তখন, সেটা ভুলে গিয়ে কাটাটা ভালো করে দেখ, তুই নিজেই বুঝতে পারবি এটা কামড় না।’ রিংকি আর কিছু বলল না, কারণ পিকলু অনেক ভেবেচিন্তে কথা বলে আর ওর কথা কখনোই ভুল হয় না। তাছাড়া যুক্তি দিয়ে চিন্তা করলে কুকুর আসবে কোথা থেকে ঘরের ভেতরে যেখানে কাউবয় ঘুমে আর দরজা সব বন্ধ ভেতর থেকে। জ্যাকি বলল, ‘তাহলে কী হয়েছিল আসলে? রিংকি কি হেলুসিনেট করেছে পুরোটা? পড়ে গিয়ে কেটেছে?’ পিকলু কোনো কথা না বলে রিংকির বিছানার পাশের জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল, দোতলার ঘরটা থেকে সমুদ্রটা ঠিক দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু চুপচাপ খুব লক্ষ করলে, একটু পরপর যে একেকটা ঢেউ এসে তীরে আছড়ে পড়ছে সেই শব্দটা পাওয়া যাচ্ছে। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে পিকলু বলল, ‘রিংকি হেলুসিনেট করেনি, কাটাটা কোনো কিছুর আঘাতে হয়নি, এমনিই হয়েছে।’ পিকলুর কথা শুনে জ্যাকি আর রিংকি কিছুটা সোজা হয়ে বসল, ওরা বোঝার চেষ্টা করল পিকলু কী বোঝাতে চাচ্ছে। পিকলু আবার বলল, ‘এইলিয়া আর এলবা’ জ্যাকি আর রিংকি বুঝতে পারল না পিকলু কী বলছে। রিংকি এবার আর না পেরে জিজ্ঞেস করেই ফেলল, ‘প্লিজ পিকলু তুই কী বলতে চাচ্ছিস একটু বুঝিয়ে বল, আমার কিন্তু গা ছমছম করছে। প্লিজ আর ভয় দেখাস না।’ জ্যাকি জানতে চাইল, ‘এইলিয়া, এলবা কী জিনিস?’ পিকলু বলল, ‘ওই যে দুই বিদেশি সুন্দরী, যারা আমাদের সঙ্গে একই ফ্লাইটে এলো, ওদের একজনের নাম এইলিয়া আরেকজনের নাম এলবা, ওরা দুই বোন।’ রিংকি কিছু যেন আঁচ করতে পেরে কিছুটা সামনের দিকে ঝুঁকে পিকলুর মুখের কাছে মুখ নিয়ে খুব ভয়ে ভয়ে আস্তে করে বলল, ‘তুই বলতে চাচ্ছিস ওই দুজন মেয়ের কোনো না কোনো ভূমিকা আছে যা ঘটছে তার পেছনে?’ পিকলু বলল, ‘কী ভূমিকা আছে জানি না, কিন্তু ওদের ওই অদ্ভুত পোশাক পরিচ্ছদ, ব্যবহার, হঠাৎ করে সবার সামনে থেকে উধাও হয়ে যাওয়া তারপর একই দিনে মন্দিরের ঘটনাটা, রিংকির এই হেলুসিনেশন, সঙ্গে আবার পায়ে ক্ষত এসব কিছুর কোথাও যেন একটা সম্পর্ক আছে বলে মনে হচ্ছে।’ জ্যাকি জিজ্ঞেস করল, ‘কী সম্পর্ক আছে কিছু কি অনুমান করতে পারছিস?’ পিকলু একেবারে নিশ্চিত না হয়ে অনুমান থেকে তেমন কিছু বলতে চায় না কখনোই। তাই এখনও সে তেমন কিছু বলল না। শুধু বলল, ‘সম্পর্ক কিছু একটা আছে সেটা আমাদের বের করতে হবে।’ জানালার বাইরে আরেকবার তাকিয়ে দেখল পিকলু আর বলল, ‘ভোরের আলো দেখা যাচ্ছে অল্প অল্প, চল সবাই দুঘণ্টা ঘুমিয়ে নিই। বিশ্রাম নেয়া দরকার।’ রিংকির পাশে ওর মোবাইলটা রেখে, কোনো প্রয়োজন হলে ওদের ফোন দিতে বলে জ্যাকি আর পিকলু রিংকির ঘর থেকে বের হয়ে লম্বা বারান্দা দিয়ে হেঁটে বাড়ির অপর প্রান্তে নিজেদের ঘরে চলে গেল। ভোরের স্নিগ্ধ আলো, বাগানের ফুলের তাজা গন্ধ, আর নতুন আগত শীতের চঞ্চল বাতাস বাংলো বাড়িটাকে যেন নিকট ভবিষ্যতের কোনো এক আগাম বার্তা থেকে সযত্নে ভুলিয়ে রাখল।

সকাল নয়টার দিকে তিনজন ফ্রেশ হয়ে নিচে নামল নাশতা করতে। ডাইনিং টেবিলে মামা বসে পেপার পড়ছে আর কফি খাচ্ছে। ওদেরকে দেখে মামা বলল, ‘গুড় মর্নিং! কী অবস্থা তোমাদের? রিংকি, পায়ে ব্যথা আছে মা?’ ওরা উত্তর দেয়ার আগেই মামি রান্নাঘর থেকে ডাইনিং রুমে ঢুকে বলল, ‘রিংকি মা, চলো নাশতা করে তোমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাই।’ রিংকি বলল, ‘না না মামি তার কোনো দরকার নেই, একদমই হালকা কাটা, দু-তিন দিনে এমনিই সেরে যাবে, সকালে আবার মলমটা লাগিয়েছি যেটা রাতে দিয়েছিলেন।’ পিকলু সঙ্গে সঙ্গে বলল, ‘হ্যাঁ মামি কোনো চিন্তা করো না, ডাক্তারের কাছে নেয়ার দরকার হলে আমরাই নিয়ে যাব রিংকিকে।’ ‘ঠিক আছে এখন তাহলে বসে পড়ো, তোমাদের মামার সঙ্গে খেয়ে নাও কিছু। সালেহা, পিকলুদের জন্য নাশতা নিয়ে এসো টেবিলে।’ পরোটা, মুরগির মাংস ভুনা, আলু ভাজি, ডিম ভাজি আর ডাবের জল দিয়ে নাশতা শুরু করল ওরা। মামি সবার গ্লাসে বড় কাচের জাগ থেকে ডাবের জল ঢালতে ঢালতে জিজ্ঞেস করল, ‘আজকে কী প্ল্যানরে তোদের পিকলু? কখন বের হবি?’ পিকলু ছোট এক টুকরো পরোটা দিয়ে ডিম ভাজি ছিঁড়তে ছিঁড়তে বলল, ‘মামি প্রথমে একটু শপিংয়ে যাব, রিংকির কিছু কেনাকাটা আছে, দুপুরে জ্যাকির এক বন্ধুর বাড়িতে দাওয়াতে যাব, সন্ধ্যায় সমুদ্র দেখতে যাব, ফিরতে ফিরতে আটটা-সাড়ে আটটা।’ মামি বলল, ‘ঠিক আছে বেশি দেরি করিস না, রাতের খাবারটা আমাদের সঙ্গে খাস, তোর মামা খুশি হয়।’ মামা বলল, ‘ওরা জানে সেটা, দেখো না ছুটি পেলেই আমার কাছে চলে আসে, আর সারাদিন টো টো করলেও ঠিকই রাতে আমার সঙ্গে বসে খায়।’ মামার কথা শেষ হওয়ার আগেই রান্নাঘরের ওই পাশ থেকে ঘেউ ঘেউ করতে করতে কাউবয় এসে রিংকির চেয়ারের পাশে গেল, রিংকি ডাবের জল খাচ্ছিল, হঠাৎ করে ভয় পেয়ে উঠে দাঁড়াতে গিয়ে টেবিলে গ্লাসটা ঠিকমতো না রেখেই ওই হাত দিয়ে টেবিলের বাইরের প্রান্তটা ধরতে গিয়ে কেমন একটা বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা হলো, গ্লাসটা টেবিলের ওপরেই কাত হয়ে পড়ে সমস্ত ডাবের জল রিংকির দিকে টেবিলে গড়িয়ে প্রায় ওর গায়ের ওপর পড়ে গেল, দ্রুত উঠতে গিয়ে হাঁটুর পেছনে লেগে চেয়ারটা উলটে পেছনের দিকে পড়ে গেল। ছোটখাটো একটা ঝড়ের মতো হয়ে গেল খাবার টেবিলে। কাউবয় ভীষণ ঘাবড়ে গেল এসব দেখে, ওর চোখে এক ধরনের কৌতূহল মিশ্রিত বিস্ময় খেলে গেল। বুঝতে পারল না যে তার প্রিয় রিংকি কী কারণে তাকে দেখে এরকম আচরণ করল, টেবিলের সবাই একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল, রিংকির বাঁ দিকে জ্যাকি বসা ছিল, ও সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি বুঝতে পেরে গ্লাসটা সোজা করে দিল, ওর কোলে রাখা ন্যাপকিনটা টেবিলে পড়া ডাবের জলের ওপর চেপে ধরল যাতে আর জল টেবিল গড়িয়ে নিচে না পড়ে, রিংকির চেয়ারটা মাটি থেকে তুলে দিল, রিংকি খুবই লজ্জা পেয়েছে ওর মাত্র ঘটানো কাণ্ডতে। সম্বিৎ ফিরে পেয়ে বলল, ‘মামা-মামি আমি খুবই দুঃখিত, ছি! কী করলাম আমি।’ মামি সঙ্গে সঙ্গে বলল, ‘কিছু হয়নি মা, সব ঠিক আছে, তোমার জায়গায় আমি হলেও ভয় পেয়ে এমনটা করতাম হয়তো। তুমি অন্য চেয়ারে বসো, এসো এই জায়গাটা ভিজে গেছে।’ রিংকির প্লেটটা মামি সরিয়ে অন্য চেয়ারের সামনে টেবিলের ওপরে রাখল, রিংকিকে ওই চেয়ারে নিয়ে বসাল। সালেহা এসে দুই মিনিটের মধ্যে চেয়ার, টেবিল আর মেঝেতে পড়া ডাবের জল মুছে দিয়ে গেল, আর অন্য গ্লাসে রিংকির জন্য ডাবের জল ঢেলে দিল। মামা বলল, ‘নাও খাওয়া শুরু করো রিংকি, এমনভাবে মুখ গোমড়া করে বসে থাকলে হবে! তোমাদের তো বের হতে হবে।’ রিংকি খাওয়া শুরু করার আগে কাউবয়কে ডেকে ওর কাছে এনে আদর করে দিল আর স্যরি চাইল ওর কাছে, কাউবয়ও সঙ্গে সঙ্গে গলে গিয়ে আবারও রিংকির পায়ের কাছে গিয়ে ঘেঁষে বসল। সবাই খুব হাসল ওদের দুজনের কাজকর্ম দেখে। সবাই আবার খাওয়া শুরু করল। পিকলু আর রিংকি শুধু একবার পরস্পরের দিকে তাকাল। পিকলু চোখের ইশারায় ওকে বোঝাল, কোনো সমস্যা নেই, যা হয়েছে, কোনো ব্যাপার না।

পিকলু, জ্যাকি, রিংকি নিজেদের জন্য কিছু আর বন্ধুবান্ধবদের জন্য কিছু টুকটাক কেনাকাটা শেষ করে, সমুদ্র সৈকতের পাশে একটা জুস অ্যান্ড কফি শপে গিয়ে তিনজন তিনটা জুস অর্ডার করল। এই দোকানটার ভেতরে বসার ব্যবস্থা নেই। জুস নিয়ে বের হয়ে ওরা হেঁটে গিয়ে কিছুটা দূরে পার্ক করা গাড়িতে গিয়ে বসল, জ্যাকি ড্রাইভিং সিটে, পাশে রিংকি। পেছনে পিকলু। জুসে ডোবানো স্ট্রতে একটা টান দিয়ে পিকলু জ্ঞিজ্ঞেস করল, ‘রিংকি পায়ের অবস্থা কেমন তোর?’ রিংকি থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট পরা। বাম পাশের পা-টা একটু উঁচু করে দেখে বলল, ‘হুম ভালোর দিকে, সেরে যাবে দ্রুত, ব্যান্ডএইড লাগানো, কাটাটা দেখা তো যাচ্ছে না, কিন্তু যেহেতু কোনো ব্যথা-ট্যথা নেই, তার মানেই ঝামেলা নেই।’ পিকলু বলল, ‘গুড, মলম লাগানোর পাশাপাশি বেশি করে ভিটামিন সি খেতে হবে তোকে পরপর কয়েকদিন, কাটা সারবে দ্রুত তাহলে।’ জ্যাকি বলল, ‘তাহলে কি রওনা  দেই আমরা নাকি?’ পিকলু উত্তর দিল, ‘হ্যাঁ চল।’ জ্যাকি গাড়ি স্টার্ট দিতে দিতে বলল, ‘বাবলু আসলেই ভালো বন্ধু, সেই ছোট কালে একই বিল্ডিংয়ে থাকতাম অথচ দেখ এখনও ঠিকই যোগাযোগ করে সব সময়, আমরা কক্সবাজার আসলে প্রতিবার যেতে বলে ওর বাসায়।’ রিংকি বলল, ‘হুম, বাবলু শুধু না, ওর মা বাবা আর বোনটাও খুব ভালো।’ শীতের দুপুরের মিষ্টি রোদে নীল ঝকঝকে সমুদ্রের তীরের পাশের রাস্তা দিয়ে ওরা চলছে, সমুদ্র তীরের রাস্তা পার হয়ে ওরা আবার লোকালয়ে ঢুকে পড়ল, তাদের গাড়ির সামনে বেশ কিছুক্ষণ ধরেই একটা গাড়ি চলছে প্রায় দশ মিনিট ধরে। একটা  বেশ সরু রাস্তায় ঢুকল ওরা। ওই গাড়িটা বাঁ দিকে ঢুকে গেল। জ্যাকি বলল, ‘আমরা ঠিক যাচ্ছি তো না? এভাবেই তো এসেছিলাম গত দুবার?’ পিকলু বলল, ‘হ্যাঁ, কিন্তু এই রাস্তাটা কি এত সরু ছিল নাকি আগে?’ কথা বলতে বলতে ওদের গাড়িও বাঁ দিকে ঢুকল কারণ ওই সরু রাস্তাটায় আর কোনো যাওয়ার দিক নেই, বাঁ দিক দিয়েই যেতে হবে, কিন্তু ওরা কয়েক মিনিটের মধ্যেই খেয়াল করল যে, রাস্তাটা একটা মৃত রাস্তা, সামনে গিয়ে এক পর্যায়ে কোনো রাস্তা নেই, শুধু বন-জঙ্গল এবং তাও কাটা তার দিয়ে চারদিকে ঘেরাও করা। গাড়ি থামাল ওরা, তিনজন গাড়িতেই বসা, চুপচাপ, কোনো কথাই কেউ বলছে না। রিংকি একটু পর বলল, ‘আমাদের সামনের গাড়িটা কোথায়?’ কেউ ওর কথায় কোনো উত্তর দিল না। চুপচাপ বসে থাকল। গাড়ি ঘোরানোর মতো পর্যাপ্ত জায়গা ওখানে নেই। জ্যাকি গাড়িটা ব্যাক গিয়ারে দিয়ে পুরো সরু রাস্তাটা পার হয়ে আবার বড় রাস্তায় উঠল। এখানে আবার গাড়ি থামাল জ্যাকি। ‘কোন দিক দিয়ে যাব? আবার ব্যাক করব যেদিক দিয়ে এসেছি ওই দিকে? কারণ আর তো কোনো রাস্তা নেই।’ বলল জ্যাকি। পিকলু উত্তরে বলল, ‘পেছনের দিকে দেখ।’ সঙ্গে সঙ্গে জ্যাকি, রিংকি দুজনেই সামনের রিয়ার ভিউ মিরর দিয়ে পেছনের দিকে দেখল। রিংকি অবাক হয়ে বলে উঠল, ‘পেছনে তো রাস্তা আছে! এই রাস্তা তো পেছনের দিকে চলে গেছে, যতদূর দেখা যায়! আমরা তাহলে বাঁ দিকে ঢুকলাম কেন? এই রাস্তাটা দেখলাম না কেন?’ পিকলু বলল, ‘ওই তো একই কারণ, আমরা হঠাৎ হঠাৎ অস্বাভাবিক জিনিস দেখছি, যার কোনো অস্তিত্ব নেই।’ একটু থেমে আবার বলল, ‘অস্তিত্ব এখন নেই, কোনো একসময় হয়তো ছিল।’ রিংকি বলল, ‘মানে?’ পিকলু আবার বলল, ‘যে রোডে আমরা মাত্র ঢুকলাম সেই রোডের গাছ, ঘাস, কাঁটাতার, কাঠের খাম্বাগুলো দেখেছিস? আমার তো মনে হয় গাছ আর ঘাস খুঁজে পাওয়া গেলেও ওই রকম তার আর খাম্বা কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না।’ জ্যাকি জিজ্ঞেস করল, ‘তুই কী বলতে চাচ্ছিস?’ পিকলু আবার বলল, ‘এখনও কিছু বলতে চাচ্ছি না, দেখি কালকে কী হয়, তারপর বোঝা যাবে, চল গাড়ি ঘুরিয়ে রওনা দিই।’ জ্যাকি গাড়ি ঘুরিয়ে ফেলল এবং ঘোরানোর সময় দেখল ওই রাস্তাটা নেই। রিংকি বলল, ‘ওই গাড়িটা গতকাল রাতের কাউবয়ের মতো গায়েব হয়ে গেল।’ ওরা চলতে থাকল প্রচণ্ড ভারী দুশ্চিন্তা মাথায় নিয়ে। বাবলুদের বাসা থেকে বিকেলে খাওয়া-দাওয়া আড্ডাবাজি শেষ করে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিল ওরা, সন্ধ্যায় সমুদ্র সৈকতে যাবার পরিকল্পনা বাতিল করল। রাতে ভালো ঘুম হয়নি কারোরই, তাছাড়া যা হচ্ছে একের পর এক ওদের সঙ্গে, সেগুলো নিয়ে চিন্তাও কাজ করছে ওদের ভেতরে, তাই ওরা বাড়ি ফেরার সিদ্ধান্ত নিল, সাবধানেই বাড়ি ফিরল, ফেরার পথে আর কোনো ঘটনা ঘটেনি চোখে পড়ার মতো। এত আগে ওদেরকে বাড়িতে ঢুকতে দেখে মামি খুব অবাক হলো। ‘কিরে কী ব্যাপার, ঘোরাঘুরি শেষ?’ জিজ্ঞেস করল মামি। ‘জি মামি, আজকে আমরা সবাই একটু ক্লান্ত বোধ করছি তাই আর সমুদ্র তীরে যাইনি, ভাবলাম বাড়িতে বসেই আড্ডা দিই আর টিভি দেখি আরাম করে।’ বলল রিংকি। ‘ঠিক আছে ঠিক আছে খুব ভালো করেছ, যাও তোমরা ফ্রেশ হয়ে নাও, সাড়ে আটটার দিকে নিচে নেমে যেও খাবার খেতে।’ বলল মামি। পিকলু জিজ্ঞেস করল, ‘মামি কাউবয় কোথায়? মামার সঙ্গে?’ মামি বলল, ‘হ্যাঁ কাউবয় তো তোর মামার সঙ্গেই বাইরে বাইরে থাকে সারাদিন।’ ঠিক আছে মামি আমরা উপরে যাচ্ছি––বলে সিঁড়ি দিয়ে উঠে উপরে চলে গেল, যার যার ঘর থেকে ফ্রেশ হয়ে ওরা দোতলার বারান্দায় রাখা ডিভানে গিয়ে বসল। রিংকি উঠে ডিভানের পাশে রাখা দোলনাটায় বসল, ‘দোলনাটাতে আজকাল কেউ বসে না মনে হচ্ছে।’ বলল রিংকি। বাড়ির অন্য সব জিনিসের মতো দোলনাটাও ঝকঝক করছে কিন্তু দোল খাওয়ার সময় শিকলে কিছুটা ঘটঘট আওয়াজ হচ্ছে। শিকলের আওয়াজের ছন্দে ছন্দে দোল খেতে খেতে রিংকি বলল, ‘কিছু কি ভেবেছিস পিকলু, কী করবি এখন?’ পিকলু বলল, ‘আজকের রাতটা আমরা পর্যবেক্ষণ করব, যদি কিছু ঘটে, কেউ ভয় পাব না, চিৎকার দেব না, বোঝার চেষ্টা করব ওই মুহূর্তে যে কী হচ্ছে, ঠিক আছে?’ মনে মনে ওরা প্রস্তুতি নিয়ে রাখল আবার কিছু ঘটলে তার মুখোমুখি হবার এবং বোঝার যে ঠিক কীভাবে কী হচ্ছে। তাদের ধারণা ওরা হয়তো ঘটনা ঘটার সময় বুঝতে পারে না, একটু পরে খেয়াল করে, সেই কারণেই হয়তোবা প্রতিবারই কোনো গুরুত্বপূর্ণ কিছু ওরা মিস করেছে। জেসির ঘর থেকে ওর গিটারটা বের করে এনে জ্যাকি গিটার বাজানো শুরু করল, আর রিংকি দোলনায় দোল খেতে খেতে গিটারের তালে তাল মেলাতে লাগল। পিকলু ডিভান থেকে উঠে গিয়ে পুরো লম্বা বারান্দাটায়ে হাঁটাহাঁটি করতে লাগল। বারান্দার এক কোণায় দাঁড়িয়ে পিকলু আকাশের দিকে তাকাল। আকাশে পূর্ণিমা, আকাশ ভরা আলো। বারান্দায় সব মিলিয়ে চারটা মাঝারি পাওয়ারের বাতি জ্বলছে সিলিঙে, ল্যাম্পশেইড লাগানো থাকায়ে বাতিগুলোর আলো একটু কম ছড়াচ্ছে। একটা আলো ছায়ার খেলা চলছে গোটা বারান্দাজুড়ে, কারণ হালকা বাতাসে ল্যাম্পশেইডগুলো আলতোভাবে দুলছে সারাক্ষণ। বারান্দার এক প্রান্তে পিকলু আর অন্য প্রান্তে রিংকি আর জ্যাকি। রিংকি অন্য প্রান্ত থেকে বলে উঠল, ‘পিকলু তোর প্রিয় ফুল মুন আজকে।’ পিকলু বলল, ‘হ্যাঁ আমাদের সবার প্রিয়।’ দুজনেই হেসে উঠল, জ্যাকি গান থামাল না, গান চলতে থাকল। কিছুক্ষণ পর কেয়ারটেকার রহমত ওদেরকে খেতে ডাকতে এলো। রিংকি বলল, ‘এখন কেন? মামি তো বলল সাড়ে আটটায়ে নিচে নামতে।’ রহমত বলল, ‘কী জানি তা তো বলতে পারব না আপু, আমাকে ম্যাডাম পাঠাল বলার জন্য, আমি শুধু বলে গেলাম।’ রিংকি বলল, ‘ঠিক আছে মামিকে গিয়ে বলো আমরা আর একটু পর যাচ্ছি নিচে।’ রহমত চলে গেল। জ্যাকি বলল, ‘এত দারুণ একটা পরিবেশ, উফ নিচে যেতেই ইচ্ছা করছে না এখন।’ রিংকি বলল, ‘আমরা সাড়ে আটটার দিকে নিচে নামব, মামাও তো ফেরেনি এখনও, তাহলে তো কাউবয় দৌড়ে চলে আসত আমাদের কাছে। রহমত বুঝতে পারেনি, মামি হয়তো অন্যকিছু বলতে পাঠিয়েছিল ওকে। জ্যাকি আরেকটা সুর তোল, এই গানটা শেষ করে নিচে যাব।’ পিকলু সারা বারান্দায় হাঁটাহাঁটি করছে। পূর্ণিমা পিকলুর প্রচণ্ড প্রিয়। চাঁদের রশ্মি আর রাতের হালকা ঠান্ডা বাতাস গুলে সেই পরত যেন গায়ে মাখছে পিকলু। জ্যাকি গান শেষ করে, জেসির রুমে গিটারটা জায়গামতো রেখে দিয়ে ওয়াশরুমে গেল। রাত বাড়তে লাগল। তার সঙ্গে সঙ্গে চাঁদের হলদেটে সোনালি আলো যেন প্রখর থেকে প্রখরতর হলো। রিংকি দেখল পিকলু নিষ্পলকভাবে চাঁদের দিকে তাকিয়ে আছে। ‘পিকলু, আজকের পূর্ণিমাটা একটু অন্যরকম লাগছে আমার, তোরও কি আমার মতো মনে হচ্ছে?’ পিকলু রিংকির কথা যেন একদমই শুনতে পেল না, ধ্যানমগ্ন হয়ে আছে সে। রিংকি একটু জোরে আবার ডাকল, ‘পিকলু?’ সঙ্গে সঙ্গে এমনভাবে ঘাড় ঘুরিয়ে তীব্র দৃষ্টি দিয়ে রিংকির চোখের দিকে তাকাল পিকলু যেন চোখ ঠিকরে বের হয়ে আসবে। রিংকি একটু ঘাবড়ে গেল, আস্তে আস্তে বলল, ‘কী হলো তোর?’ তখনই সিঁড়িতে কারও উপরে ওঠার আওয়াজ পাওয়া গেল। রহমত আবার এসেছে ডাকতে, ‘আপনাদের নিচে খেতে ডাকছে, স্যার পাঁচ মিনিটের মধ্যে পৌঁছাবেন বাসায়, ম্যাডাম নিচে যেতে বলেছেন আপনাদের।’ জ্যাকি ওয়াশরুম থেকে ফিরেই দেখে রহমত দাঁড়িয়ে আছে দোতলা থেকে নিচে নামার প্রথম সিঁড়িটায়। ‘কী ব্যাপার রহমত! আবার এসেছ ডাকতে! বললাম না আমরা সাড়ে আটটায় নামব, একটু পর পর আসছ কেন? অন্য কোনো কাজ নেই নাকি তোমার!’ এক নিঃশ্বাসে রহমতকে বলল জ্যাকি। রহমত প্রথমে অবাক হলো, এক সেকেন্ডেই নিজেকে সামলে নিয়ে হাসি হাসি মুখ করে বলল, ‘ভাইয়া আমার সঙ্গে সবসময় মজা করেন, অসুবিধা নাই করেন, আমারও মজা লাগে।’ জ্যাকি এবার আরেকটু বেশি ক্ষেপে গিয়ে বলল, ‘উফ রহমত যাও তো, আমরা সময়মতো নিচে নামব, আর একবারও তুমি আসবে না ডাকতে। এই নিয়ে পনেরো মিনিটের ব্যবধানে তুমি দুইবার এলে!’ রিংকি কলল, ‘আহ থাক না জ্যাকি, এত ক্ষেপছিস কেন?’ জ্যাকি বলল, ‘কেন তুই জানিস না, একবারের বেশি কেউ খামোখা এক কথা বললে আমার খুব বিরক্ত লাগে।’ এইবার রহমত কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে বলে উঠল, ‘না ভাইয়া আমি তো এই প্রথম ডাকতে আসলাম, বাড়িতেই তো ছিলাম না আমি, মাত্র বাজার থেকে ফিরলাম, ম্যাডাম আমাকে দেখেই বলল, যা পিকলুদের তাড়াতাড়ি ডেকে নিয়ে আয়, তোর স্যার ফোন করেছিল, চলে আসবে পাঁচ মিনিটের মধ্যে।’ অনেকক্ষণ পর এবার পিকলু কথা বলল, ‘তার মানে তুমি আগে ডাকতে আসোনি, বাজারে ছিলে?’ ‘জি ভাইয়া’––বলল রহমত। ‘ঠিক আছে তুমি যাও, মামিকে বলো এখনই নামছি আমরা’ যোগ করল পিকলু। রহমত চলে গেল, তিনজন যার যার জায়গায় চুপচাপ নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। প্রশ্বাস নিতে নিঃশ্বাস ছাড়তে যেন ভুলে গেছে ওরা। পিকলু কিঞ্চিৎ ঘাড় ঘুরিয়ে জ্যাকি রিংকির পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকা ভৌতিক বিশাল কালো ছায়া দুটোর দিকে তাকাল, সঙ্গে সঙ্গে জ্যাকি রিংকিও পিকলুর চোখ অনুসরণ করে দেখল যে পিকলু কী দেখছে, ওরা বুঝতে পারল পিকলু ওদের দুজনের ছায়ার দিকে তাকিয়ে আছে। কিছুক্ষণ পর পিকলু বলল, ‘চল, নিচে চল।’ রিংকি আর জ্যাকি আড়চোখে পরস্পরের দিকে তাকাল, ওরা বুঝতে পারল পিকলু এখন আর কোনো কিছু বলবে না। অগত্যা পিকলুর পিছু পিছু নিচে নামতে শুরু করল। ওদের গতির সঙ্গে সঙ্গে সরে যেতে থাকল আলো ছায়ার তৈরি তিনটা কালো ছায়া।

নৈশভোজ শেষ করে বহু কষ্টে মামিকে রাজি করিয়ে সাড়ে নয়টার দিকে গাড়ি নিয়ে বের হলো ওরা। গেট থেকে বের হতেই রিংকি বলল, ‘মামি তো শর্ত জুড়ে দিয়েছেন এগারোটার মধ্যে ফিরতে হবে।’ পিকলু বলল, ‘সেটা  কোনো বিষয় না, বের হওয়াটা দরকার ছিল এখন আমাদের, প্রশ্নের উত্তরগুলো ঘরে বসে বসে খুঁজে বের করা সহজ হবে না।’ জ্যাকি এখনও কিছুটা উত্তেজিত, কেন যেন গান গাওয়া শেষ হওয়ার পর থেকেই একটু খিটখিটে হয়ে আছে জ্যাকি। কোনো কথা বললে সেটা কিছুটা বিরক্তি নিয়ে উচ্চৈঃস্বরে বলছে। ‘তো এখন আমরা কোথায় যাচ্ছি?’ একই রকম বিরক্তি নিয়ে দুই ঘাড় উঁচু করে দুই হাত উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল সে। ‘জ্যাকি মেজাজ ঠিক কর আর পারলে পিকলুকে কো-অপারেট কর।’ সঙ্গে সঙ্গে ব্যাক সিট থেকে বলে উঠল রিংকি। ‘কোথায় যাচ্ছি এটা জানতে চাইলাম, মেজাজ করলাম কই!’ বলল জ্যাকি। ‘বোকার মতো কথা বলিস না তো জ্যাকি, মাথার এন্টেনা কি বাসায় রেখে এসেছিস? আমার ধারণা যেই জায়গাগুলোতে অস্বাভাবিক ঘটনাগুলো ঘটেছে, আমরা সেসব জায়গাতে যাচ্ছি।’ বলল রিংকি। পিকলু কিছু বলল না, তার মানে রিংকি যা বলেছে ঠিক বলেছে। ‘তো এই কথাটা প্রথমে বললেই তো হতো।’ বলে গজ গজ করল কিছুক্ষণ জ্যাকি। কিছু একটা হয়েছে ওর। ড্রাইভ করতে করতে রিয়ার ভিউ মিরর দিয়ে রিংকির দিকে একবার তাকাল পিকলু। রিংকিও তাকাল আর বুঝতে পারল, জ্যাকির দিকে নজর রাখতে বলল পিকলু চোখের ইশারায়। রিংকিও হালকা মাথা নাড়িয়ে অভয় জানাল। রাস্তার পাশের সারি সারি সবুজ গাছগুলোকে পেছনে ফেলে গাড়ি চলতে থাকল চেনা অথচ অজানা গন্তব্যের উদ্দেশ্যে।

বাবলুদের বাসায়ে যাওয়ার রাস্তাটা আর মন্দিরের সামনের রাস্তাটা দিয়ে ওরা গাড়ি চালিয়ে গেল। কিন্তু অস্বাভাবিক কিছুই চোখে পড়ল না। রাত প্রায় এগারোটা বাজে, এজন্যই হয়তো রিংকির মোবাইল বেজে উঠল। রিংকি বলল, ‘মামি কল দিয়েছে, কী বলব?’ ‘বল দেরি হবে, চিন্তা না করতে, আমার কাছে চাবি আছে দরজার, ভেতরের লক যাতে না করে এটাও বলে দে।’ বলল পিকলু। কথামতো কাজ করল রিংকি। মামি সামান্য চিল্লাচিল্লি করে সাবধানে থাকতে বলে ফোন রেখে দিল। ‘এখন কী করব আমরা?’ রিংকি জিজ্ঞেস করল। জ্যাকি হঠাৎ বলে উঠল, ‘এখান থেকে তো পবনের বাসা দূরে না, এই সময়ে যেতে সর্বোচ্চ কুড়ি মিনিটের বেশি লাগবে না, আমার টয়লেটে যেতে হবে, তাড়াতাড়ি চল, একটু দ্রুত চালাবি প্লিজ।’ পিকলু  বলল, ‘যাচ্ছি, কিন্তু পবনকে আগে একটা কল দে। ওরা তো এত রাতে জেগে থাকে না, তাছাড়া ওর মেয়েটা অসুস্থ।’ আবারও জ্যাকি বলল, জেগে না থাকলে জাগাব, তুই তাড়াতাড়ি চল।’ রিংকি হাত ঘড়িতে দেখল রাত এগারোটা দশমতো বাজে। মোবাইলটা নিয়ে পবনকে কল দিল রিংকি। চার পাঁচটা রিং হতেই ওপাশ থেকে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে পবন বলে উঠল, ‘রিংকি দি, কী হয়েছে গো! সব ঠিক আছে তো?’ রিংকি বলল, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ পবনদা সব ঠিক আছে, শোনো না, তোমরা কি ঘুমিয়ে পড়েছ? আমরা তোমার বাড়ির দিকে আসছি। একটু টয়লেটটা ব্যবহার করব। আর হ্যাঁ তোমার মেয়ের শরীর কেমন এখন?’ পবন বলল, ‘হ্যাঁ গো দিদি তোমাদের আশীর্বাদে মেয়ে এখন অনেকটা ভালো। এসো এসো দিদি, তোমরা আমার বাড়িতে আসছ এ তো বিরাট সৌভাগ্যের ব্যাপার। সেদিন তো একটু জলও সাধতে পারিনি তোমাদের, আজ চারটা ডাল ভাত খেয়ে যেও।’ ‘একদম না পবন দা, আমরা পাঁচ মিনিটও বসব না, তুমি একদম ঝামেলা করবে না, বাড়ি থেকে খেয়েই বের হয়েছি সবাই, আসছি, দেখা হবে।’ বলে রিংকি ফোন রেখে দিল।

রাত সাড়ে এগারটার দিকে ওরা পবনের বাড়িতে পৌঁছাল। রাস্তার বাঁ দিকে লম্বা খালের মতো কিছু একটা আছে, চাঁদের আলোটা কেমন যেন বেশ ম্লান হয়ে এসেছে, সেই আলোতে খালের পানি খুব অল্পই দেখা যাচ্ছে। রাস্তার ডান দিকে গ্রিলের তৈরি বিশাল গেট খুলে দাঁড়িয়ে আছে পবন। গাড়ি ঢুকিয়ে পার্ক করল ওরা। জায়গাটা বেশ ভালোই অন্ধকার আর সুনশান, গাড়ির লাইট আর ইঞ্জিন বন্ধ করতেই একটা গভীর নীরবতা যেন গ্রাস করল ওদেরকে। এটা প্রায় দুইশ বছর আগের পুরনো একটা জমিদার বাড়ি। বংশীয়ভাবে এর মালিক দুই ভাই, যারা দুজনই দেশের বাইরে থাকে। বছরে একবার ওদের কেউ না কেউ বেড়াতে আসে পরিবার নিয়ে। মূলত হোটেলেই থাকে, এক বা দুই রাত হয়তো এখানে কাটায়। কোনো ছোটখাটো মেরামতের কাজ থাকলে তখন করে দিয়ে যায়। পবন আর পার্বন বহু বছর ধরেই মন্দিরে কাজের পাশাপাশি এই বাড়িতে বসবাস করে আর বাড়ি দেখাশোনা করে। এই বাড়িতেই পবনের বিয়ে হয়েছে, বাচ্চাটাও হয়েছে এখানেই। গাড়ি থেকে নেমে বাঁ দিকের একতলা দালানের ভেতর ঢুকে পড়ল ওরা, একটা সরু সুড়ঙ্গের মতো করিডরের ভেতর দিয়ে হাঁটতে থাকল, করিডরের ভেতরে খুব অল্প পাওয়ারের একটা হলুদ বাল্ব জ্বলছিল। কিছুক্ষণ হেঁটে একটা খোলা উঠানের মতো স্থানে পৌঁছাল, উঠানের সোজাসুজি ঘন গাছগাছালিতে ভরা একটা বিশাল বাগান আর উঠানের বাঁ দিকে পাশাপাশি তিনটা বহু পুরনো ধাচের একতলা দালান। একটাতে পবনরা সবাই থাকে, অন্য দুইটা তালা মারা থাকে। সপ্তাহে দু-তিনবার খুলে পরিষ্কার করা হয় আর বাড়ির মালিকেরা এলে এই দুই দালানেই থাকে। প্রথম দালানের পেছনে বড় রান্নাঘর। পুরো জায়গাটাতে সব মিলিয়ে আট-নয়টা ছোট হলুদ বাল্ব জ্বলছে, যেগুলোর আলো বিশাল জায়গাটার তুলনায় প্রায় অদৃশ্য। প্রতিটা বাল্ব তার চারদিকে আংশিক আলো ছড়াচ্ছে। এই অঞ্চলটায় ভোল্টেজ কম থাকায় বাল্বগুলো পর্যাপ্ত পরিমাণে আলো জ্বালাতে পারছে না। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে পেছনের রান্নাঘর থেকে একটা স্টিলের ট্রেতে করে তিন গ্লাস লেবুর শরবত নিয়ে এলো পবনের বউ। উঠানে আগে থেকেই পাঁচটা বেতের মোড়া পাতানো ছিল। রিংকি আর পিকলু মোড়ায় বসে হাসিমুখে পবনের বউকে ধন্যবাদ দিয়ে শরবতের গ্লাস হাতে নিয়ে চুমুক দিল। জ্যাকি দাঁড়িয়েই বলল, ‘পবনদা টয়লেটটা কোন দিকে?’ পবন বলল, ‘চলো চলো আমি তোমাকে আমার বড়দার ঘরটা খুলে দিচ্ছি।’ পবনের হাতে আগে থেকেই দালানের দাবি ছিল। পবনের দেখানো পথে সামনে বাঁয়ের দিকে একটু দূরেই তৃতীয় দালানটার দিকে হাঁটতে শুরু করল জ্যাকি। রিংকির চোখ হঠাৎ চাঁদটার দিকে পড়ল। অদ্ভুত রকমের একটা রং ধারণ করেছে চাঁদটা। জ্যাকি গান গাওয়ার সময়ও চাঁদটা একটু যেন অন্যরকম লাগছিল। কিন্তু এখন তো একদমই লালচে লাগছে। এরকম কেন লাগছে নিজের মনেই ভাবল সে। এর আগে একবার পিকলুকে জিজ্ঞেস করায় কিছুটা অদ্ভুত চাহনি দিয়েছিল পিকলু, তাই কিছু বলল না এখন আর। পবনের বউ ওদের পাশেই দাঁড়িয়ে আছে। চারদিকে একটু যেন বেশিই নীরবতা, এমনকি কোথাও কোনো ঝিঁঝি পোকার ডাক বা বাতাসে পাতা নড়ার শব্দও নেই। প্রকৃতি কেমন যেন নিস্তব্ধ হয়ে গেছে। মোড়ার ওপর হাতের ট্রেটা রাখতে রাখতে পবনের বউ বলল, ‘দিদি, দাদা কিছু মনে না করলে একটা কথা বলতাম।’ রিংকি সঙ্গে সঙ্গে বলল, ‘নিশ্চয়ই কী? বলুন না।’ ‘বলছি কি এমনিতেই বাইরে ঠান্ডা বেড়েছে, তার ওপর আজ রাত চন্দ্রগ্রহণ, এই সময়ে বাইরে উঠানে না বসে ভেতরে বসলে ভালো হতো, আপনাদের পবনদা এসব একটু কম মানা-ছিনা করেন, কিন্তু আমার মনে হয় কি ভেতরে বসলেই ভালো, এই সময়ে নাকি বাইরে বেশিক্ষণ থাকতে  নেই।’ শেষের কথাটা গলাটা অনেক নামিয়ে প্রায় ফিসফিস করে চারদিকে একটু চোখটা বুলিয়ে নিয়ে বলল পবনের বউ। রিংকি সঙ্গে সঙ্গে মনে মনে বলল, ‘তাই তো কক্সবাজার আসার আগে আামি তো পড়েছিলাম  কোথাও যে, কয়েকদিন পর চন্দ্রগ্রহণ! কী করে ভুলে গেলাম! আশ্চর্য! ভুললাম কেন? তাছাড়া চাঁদের এই লালচে রং দেখেও মনে পড়ল না আমার!’ নিজের ওপরই বিরক্ত হলো সে। ‘পিকলু, যাবি ভেতরে নাকি থাকবি?’ জিজ্ঞেস করল রিংকি। পবনের বউ আবার অনুরোধের সুরে ভয়ে ভয়ে বলল, ‘দাদা চলুন ভেতরে যাই, রাত বারোটা বাজতে চলল, মেয়েটার শরীরটাও পুরোপুরি সারেনি। কোনো অমঙ্গল না ঘটে যায়...।’ কথাটা শেষ করতে পারল না পুরোপুরি পবনের বউ, নীরবতাকে চিরে দিয়ে বিকট চিৎকার ভেসে এলো কোথাও থেকে। বুঝতে সময় লাগল না কারোরই যে ওটা জ্যাকির চিৎকার! বিদ্যুতের গতিতে হাতের গ্লাসগুলো পবনের বউয়ের হাতে ধরিয়ে দিয়ে, জ্যাকির চিৎকার যেদিক থেকে আসছে সেদিকে ছুটে গেল ওরা। কাছে থেকে এই তৃতীয় দালানটা দেখতে দুইশ বছরের চেয়ে বেশি পুরনো মনে হয়। দালানের ছাদের ওপর প্রচুর গাছ, লতা, গুল্ম জন্মেছে, যেগুলো দেয়াল বেয়ে ঝুলে আছে। হয়তো এই দালানটাতে, দুই মালিকের মধ্যে যে মালিক থাকে তার ঝোপঝাড় পছন্দ, তাই এই দালানটার গা ঘেঁষে একটু যেন বেশি জঙ্গল রয়েছে যা উঠান থেকে পরিষ্কার বোঝা বা দেখা যাচ্ছিল না পর্যাপ্ত আলোর অভাবে। দালানের ভেতর ঢুকে পড়ল রিংকি আর পিকলু। বাইরের দিকের বিশাল একটা হল ঘরের মতো পার হতেই দেখল জ্যাকি দুই হাত দিয়ে দুই হাঁটুর ওপর ভর দিয়ে নিচু হয়ে হাঁপাচ্ছে। রিংকি আর পিকলুকে দেখা মাত্রই ওইভাবে নিচু হয়ে থেকেই শুধু মাথাটা তুলে তাকাল। চোখে ভয় এবং বিস্ময়। পেছনের কোনো এক ঘর থেকে পবন দৌড়াতে দৌড়াতে এলো, রিংকি আর পবন জ্যাকিকে ধরে ওই ঘরে রাখা একটা সোফার ওপর বসাল। পবন চিন্তিত হয়ে বলল, ‘জ্যাকিদা, ওই বাথরুমে তো কোনো কিছুই নেই গো।’ পিকলু জিজ্ঞেস করল, ‘কী হয়েছে জ্যাকি? কী ছিল বাথরুমে?’ জ্যাকি বলতে শুরু করল তোতলাতে তোতলাতে। ‘আমি যখন বাথরুম থেকে বের হতে যাচ্ছি, দরজার বাঁ পাশের দেয়ালে লাগানো আয়নার দিকে চোখ পড়ে। আয়নার একটু কাছে যেতেই আমার মনে হলো, পেছনের দেয়ালে কিছু একটা নড়ছে? আমি পেছনে তাকাতেই দেখি বিশাল এক সাপ বাথরুমের দেয়াল বেয়ে সিলিং থেকে নিচের দিকে নামছে, প্রায় আমার মুখোমুখি পৌঁছে গেছে। দ্রুতগতিতে দরজা দিয়ে বের হতে গিয়ে আবার আয়নায় চোখ পড়তেই দেখি আয়নাটাতে সাপটা দেখা যাচ্ছে না। দেয়াল বেয়ে আরও নিচে নেমে গিয়েছে কিনা দেখার জন্য আবার আমার পেছনে তাকাতে দেখি একটা ছেলে দাঁড়ানো, মুখের মাংসে মনে হয় পচন ধরেছে। খুবই বীভৎস! সরাসরি আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি নিজের অজান্তেই চিৎকার দিয়ে দৌড়ে বের হই। পবনদা আমার দৌড়ে বের হওয়া দেখে ছুটে বাথরুমে চলে যায় কী হয়েছে দেখতে। এরপর তো তোরা ঢুকলি।’ রিংকি বলল, ‘পিকলু, বাথরুমে গিয়ে একবার দেখবি নাকি?’ পিকলু বলল, ‘নাহ পবনদা তো দেখেই এলো, এখন আর কিছু থাকবে বলে মনে হয় না।’ জ্যাকি একটু স্বাভাবিক হয়ে বলল, ‘চল এখন এখান থেকে বের হই।’ সবাই বের হয়ে গেল ওই দালান থেকে, পবন একদম শেষে বের হয়ে মেইন দরজা তালা দিয়ে দিল।

জ্যাকির চিৎকার শুনতে পেয়ে পার্বন উঠানে বের হয়ে এসেছে ঘরের ভেতর থেকে। উঠানে এসে সবাই মোড়াতে বসল গোল হয়ে। পবনের বউ ভেতরে চলে গেছে অসুস্থ বাচ্চার কাছে। পার্বন জিজ্ঞেস করল, ‘কী হয়েছে গো দাদা?’ পবন সদ্য ঘটে যাওয়া ঘটনাটা বলল ওকে। পার্বন সব শুনে পবনকে খুব নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল, ‘পিকলু দাদারা কি ওই সাপের ঘটনাটা সম্পর্কে জানে?’ খুব আস্তে বললেও চারদিক একদম নিস্তব্ধ থাকাতে ওরা তিনজনই কথাটা পরিষ্কার শুনতে পেল। ‘কোন ঘটনা পবনদা?’ পিকলু সঙ্গে সঙ্গে জিজ্ঞেস করল। পবন বলল, ‘আমাদের দুই স্যারের একমাত্র চাচা খুব অল্প বয়সে সাপের কামড়ে মারা যান, শুনেছি চন্দ্রবোরা সাপ ছিল ওটা। এখন খুব একটা দেখতে পাওয়া যায় না ওই চন্দ্রবোরা সাপ।’ জ্যাকি সঙ্গে সঙ্গে পকেট থেকে মোবাইল বের করে ‘চন্দ্রবোরা সাপ’ লিখে সার্চ দিল। ‘চন্দ্রবোরার আরও নাম RussellÕs Viper বা উলুবোড়া। বৈজ্ঞানিক নাম Daboia Russelii, এই সাপ বাংলাদেশে মহা বিপন্ন প্রাণীর তালিকায় রয়েছে। ভয়ংকর বিষধর, বিরল প্রজাতির সাপ এই রাসেলস ভাইপার ভারত, চীন, থাইল্যান্ডসহ এশিয়ার কয়েকটি দেশে আছে। এরা স্থলে জলে দুই জায়গাতেই বাস করে। এই সাপ সরাসরি বাচ্চা দেয়, ডিম দেয় না, আক্রমণের ক্ষিপ্র গতি ও বিষের তীব্রতার কারণে একে কিলিংমেশিন বলা হয়। এদের বিষ দাঁত বিশ্বে দ্বিতীয় সর্ববৃহৎ, বিষের তীব্রতার দিক দিয়ে বিশ্বের পাঁচ নম্বর ভয়ংকর বিষধর সাপ। এই সাপের বিষের এন্টি ভেনম এই দেশে পাওয়া যায় না। ভাগ্যক্রমে কেউ কামড় খেয়ে  বেঁচে গেলেও, বিষ হেমোটক্সিন হওয়ায় মাংস পঁচে আক্রান্ত ব্যক্তি মারা যায়।’ জ্যাকি জোরে জোরে পড়ে শোনাল সবাইকে। একটু থেমে দম নিয়ে আবার বলল, ‘সবচেয়ে বড় কথা, আমি বাথরুমে যে সাপ দেখেছি, সেটা দেখতে এই সাপের ছবিগুলোর মতোই।’ পিকলু পবনকে জিজ্ঞেস করল, ‘যিনি সাপের কামড়ে মারা গিয়েছিলেন তার কোনো ছবি কি আছে তোমাদের কারও কাছে?’ পার্বন সঙ্গে সঙ্গেই বলল, ‘হ্যাঁ, আমাদের বড় স্যারের বসার ঘরেই তো আছে।’ পিকলু আবার বলল, ‘একটু দেখতে পারব?’ পার্বন বলল, ‘দাদা একটু যদি কষ্ট করে দেখে আসতেন আমার সঙ্গে গিয়ে, অনেক বড় ছবি তো, দেয়াল থেকে খোলা হয় না বহু বছর।’ জ্যাকি বলল, ‘ওরে বাবা! আবার ওই ঘরে ঢুকতে হবে!’ পিকলু সঙ্গে সঙ্গে বলল, ‘ভয় নেই, সবাই থাকব, কিছু হবে না চল।’ সবাই উঠে দাঁড়াল মোড়া থেকে। সবার আগে হাঁটা শুরু করল পার্বন, তার পেছনে পিকলু আর রিংকি, তারপর জ্যাকি, একদম শেষে পবন। দালানে পৌঁছে পবন চাবি দিয়ে তালা খুলে ভেতরে ঢুকল আগে। ভেতরে বাতি জ্বালিয়ে সবাইকে ডাকল, বিশাল হল ঘরের মতো বসার ঘরের দেয়ালে বেশ কয়েকটা সাদাকালো ছবি ঝুলছে কালো ফ্রেমে। পবন একটা ছবির দিকে ইশারা করতেই জ্যাকি কিছুটা ভয় পেয়ে অস্ফুট স্বরে বলে উঠল, ‘আমি ওনাকেই দেখেছি।’

খুব আস্তে বাড়ির গেট খুলে দিল কেয়ারটেকার রহমত। বেশি শব্দ না করে গাড়ি পার্ক করে, গাড়ি থেকে বের হয়ে ঘরের দরজা চাবি দিয়ে খুলে ভেতরে ঢুকে নিচের বসার ঘরের সোফায় বসে পড়ল তিনজন। বেশ কিছুক্ষণ পর রিংকি কথা শুরু করল, ‘পিকলু ঠিকই বলেছিলি, আসলে আমরা যা দেখছি, সেটা আমাদের দেখানো হচ্ছে।’ মনে হলো কিছু বলার জন্য পিকলু একদম প্রস্তুত হয়েছিল। রিংকি কথা শুরু করতেই, সে দুটো শব্দ বলে উঠল eclipse এবং multiverse। জ্যাকির আর রিংকির আর কিছু বুঝতে অসুবিধা হলো না। জ্যাকি বলল, ‘তার মানে lunar eclipse-এ আমরা multiverse interact করছি।’ রিংকি বলল, ‘হ্যাঁ আমরা এমন কিছু দেখতে পাচ্ছি যা অতীতে ঠিক এই সময়ে বা এই জায়গাতে ঘটেছিল।’ পিকলু যোগ করল, ‘বা ভবিষ্যতে ঘটবে।’ পিকলু আরও বলল, ‘চন্দ্রগ্রহণ অর্থাৎ চাঁদ পৃথিবী সূর্য একই রেখায় চলে আসে নিজেদের কক্ষপথে ঘুরতে ঘুরতে। একপাশে সূর্য অন্যপাশে চন্দ্র মাঝে পৃথিবী। পৃথিবীর ছায়া চাঁদের ওপর পড়ে, চাঁদ অন্ধকার হয়ে পড়ে সূর্যের আলো হারিয়ে। এরকমই কোনো গ্রহণকালে কিছু মহাজাগতিক ঘটনা ঘটতে থাকে, যা হয়তো সবাই দেখতে পায় না। বা সবার পক্ষে দেখা সম্ভব হয় না। এইলিয়া এলবা অন্যকালের, ওরা ওদের সময়কে ছেদ করে আমাদের সময়ে চলে এসেছিল। একইভাবে রিংকি হয়তো অন্য কোনো সময়ে চলে গিয়েছিল কাউবয়ের সঙ্গে। রিংকি যা বলেছে আমাদের, সেটা ঘটেছে ঠিকই কিন্তু অন্য কোনো সময়ে, অন্য কোনো লোকে।’ জ্যাকি বলল এইবার, তার মানে আমরা যে রাস্তায়ে ঢুকে পড়েছিলাম সেটারও অস্তিত্ব ছিল কখনো।’ রিংকি বলল, ‘না, অস্তিত্ব ছিল না, এখনও আছে, আমরা সময়কে ছেদ করে ওই সময়ে অর্থাৎ আমাদের অতীতে চলে গিয়েছিলাম। এটা আমাদের কাছে অতীত কিন্তু অন্য কোনো লোকে এটা ঘটমান বা বর্তমান।’ রিংকির কথা শেষ হতে না হতেই পেছন থেকে একটা হালকা শব্দ হলো। তিনজন একসঙ্গে তাকিয়েই দেখল রাঁধুনি সালেহা হাতে তিনটা ছোট ছোট টেটরা দুধের প্যাকেট নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, বলল, ‘আপনাদের জন্য আনছিলাম, কথার মধ্যে বিরক্ত করতে চাই নাই তাই এখানে দাঁড়ায়ে কথা শুনতেছিলাম, কিছু মনে কইরেন না আপা ভাইয়ারা’––বলে তিনজনের সামনে রাখা টেবিলে স্ট্র লাগানো প্যাকেটগুলো রেখে দিল। পিকলু আবার কথা শুরু করল, ‘আমরা তো জানি যে, ধারণা করা হয়, আমাদের এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড ছাড়াও আরও অনেক বিশ্বের অস্তিত্ব রয়েছে আশেপাশে। যাকে বলা হয় multiverse বা multiple universe বা parallel universe বা alternative universe। শুধু বৈজ্ঞানিক গবেষণাই নয়, বিভিন্ন ধর্ম, সৃষ্টিতত্ত্ব, পদার্থবিদ্যা, জ্যোতির্বিদ্যা, transpersonal মনোবিজ্ঞান, সাহিত্য এবং সংগীতে এই অজস্র parallel universe-এর কথা উল্লেখ রয়েছে। এই সমস্ত multiple universe-এ রয়েছে অসংখ্য cosmic patch যেগুলো একদমই আমাদের বিশ্বের cosmic patch-গুলোর মতো, এবং এই cosmic patch-গুলোর মধ্যে আমি বা তোদের দুজনের মতো অনেকেই রয়েছে। এক universe থেকে অন্য universe-এর দূরত্ব হয়তো মাত্র কয়েক মিলিমিটার কিন্তু আমরা দেখতে পাই না, কারণ এই মিলিমিটার মাপা হয় 4 dimension-এ, আমাদের উপরেই হয়তো অন্য কোনো universe আছে আর মাঝখানে আছে আলো আর সেই কারণেও উপরে ঝুলে থাকা multiple universe-এর মধ্যকার ছায়াপথ বা galaxy আমরা দেখতে পাই না। দৈর্ঘ্য প্রস্থ উচ্চতা ছাড়াও ‘সময়’কে চতুর্থ ডাইমেনশন হিসেবে ধরা হয়, কিন্তু এই ‘সময়’-এর গাণিতিক মূল্যায়ণ থাকলেও পদার্থ বিদ্যায় খুব একটা নতুন মোড় নিতে পারেনি। সুতরাং কিছু বিষয় রয়েই যায় যা আমরা প্রমাণ করতে পারি না বা উড়িয়েও দিতে পারি না, শুধুই বিশ্বাস করে যেতে হয়।’ সালেহা তখনও ওদের পাশে দাঁড়িয়ে কথা শুনছিল, পিকলুর কথা শেষ হওয়ার পর বলল, ‘ভাইয়া, একটা কথা বলি, আমি তো অনেকক্ষণ ধইরা কথা শুনতেছি আপনাদের, ভাইয়া আরেকটা পৃথিবী থাকলে আমরা দেখি না কেন?’ রিংকি সালেহার দিকে মাথা ঘুরিয়ে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘সালেহা আপা আপনি কি পড়ালেখা করেছেন?’ সালেহা বলল, ‘জি আপা আমি ক্লাস নাইন পর্যন্ত পড়ছি, এসএসসি পরীক্ষা দেয়া হয় নাই।’ রিংকি আবার বলল, ‘বাহ! তাহলে তোমাকে বোঝাই, আরেকটা পৃথিবী না, আস্ত বিশ্বব্রহ্মাণ্ডই আছে আরও অনেকগুলো, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মধ্যেই থাকে পৃথিবী, গ্রহ, উপগ্রহ, তারা, চাঁদ, ধুলা, ছায়াপথ, ধূমকেতু আরও অনেক কিছু।’ সালেহা আবার বলল, জি, স্কুলে পড়ছি, পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে, কিন্তু আপা ওই অন্য বিশ্বটা দেখতে কেন পাই না? চাঁদ, তারা, সূর্য সবই তো দেখতে পাই।’ এবার জ্যাকি পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে, মোবাইলের টর্চ লাইটটা জ্বালিয়ে বলল, ‘দেখো, এই মোবাইলের লাইটটা আমি যদি এই টেবিলের ওপর রাখা খয়েরি রঙের চারকোণা ছাইদানিটার ওপর ফেলি এবং মোবাইলটা দিয়ে চারকোণা ছাইদানির মুখ উপর থেকে প্রায় আটকে দেই, আর এই লাইটের নিচে রাখা ছাইদানিটার ভেতরে যদি মাত্র জন্মানো কয়েকটা পিঁপড়া রাখি, ওরা ভাববে ওই ছাইদানির ভেতরটায় যতটুকু লাইটের আলো দেখতে পাচ্ছে এবং ডানে বামে সামনে পেছনে উপরে নিচে যতটুকু ওরা যেতে পারছে, ওইটুকুই ওদের দুনিয়া, উপরে টর্চ লাইটের অন্য পাশে যে আরও অনেক বড় দুনিয়া আছে এটা কিন্তু ওরা দেখতে পারছে না আর তাই বুঝতেও পারছে না। ঠিক একইভাবে আমরাও একটা পর্যায় পর্যন্ত দেখতে পাই, তার বাইরে দেখতেও পারছি না, যেতেও পারছি না। কিন্তু আমরা তো আর পিঁপড়া না। বিজ্ঞানীদের গবেষণা প্রায়ই বলে যে, আরও বিশ্বব্রহ্মাণ্ড বা  universe-এর অস্তিত্ব আছে।’ হঠাৎ মামি ডাকল উপর থেকে সালেহাকে, ‘ভাইয়া আমারে পরে আরেকটু বুঝায়ে বইলেন’––বলে একটা বিভ্রান্ত চেহারা নিয়ে চলে গেল।

জ্যাকি পিকলুকে জিজ্ঞেস করল, ‘মন্দিরের সামনে যা ঘটল, সেটা কী?’ পিকলু বলল, ‘আমরা তখন কিছু সময় হারিয়েছি। সেই রাতে প্রথম যখন আমরা মন্দির পার হলাম এবং তারপর কিছুক্ষণ পর আবার যখন দেখলাম আমরা একই মন্দির পার করছি––এই দুই মন্দিরের মাঝের সময়টা আমরা হারিয়েছি। যেহেতু আমরা কিছুই মনে করতে পারিনি, সুতরাং বলতে পারছি না ওই মাঝের সময়টা কোথায় গেল বা আমরা কোথায় ছিলাম নাকি আসলে থমকে ছিলাম, কারণ ঘড়ির কাঁটা পরিষ্কার বলছিল আমরা কিছু সময় হারিয়েছি।’ পিকলু আরও বলল, ‘হঠাৎ করে যখন কোনো অতি অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটে যায়, সেটা ভালো হোক কিংবা মন্দ, সেটা ওই মুহূর্তে একদম নতুন বা সদ্য বা সতেজ। ধীরে ধীরে ঘটনা পুরনো হতে শুরু করলেও ওই massive ঘটনার energy রয়ে যায় মহাবিশ্বের পরিমণ্ডলে। মহাকালের ঘূর্ণনে কখনো কখনো কারও কারও সামনে সেই ঘটনার স্ফুলিঙ্গ হয়তো ধরা দেয় ক্ষণিকের জন্য। রিংকি, জ্যাকি, বুঝল পিকলু একটু আগে পবনের বাড়িতে ঘটে যাওয়া ঘটনার কথা বোঝাল। রাত জুড়ে ওদের আলোচনা চলতে থাকল। আর কয়দিন পরেই চলে যাবে ওরা নিজ নিজ গৃহে। ওদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া এই বর্তমান গল্পটা মহাবিশ্বের কোথাও না কোথাও হয়তো রয়ে যাবে বুদবুদের মতো হয়ে। হয়তো অন্য কোনো সময়ে বা অন্য কোনো লোকে, অন্য কোনো পিকলু, রিংকি, জ্যাকির সামনে এসে ফেটে পড়বে সেই বায়বীয় বুদবুদগুলো, যার ভেতরে আটকে রয়েছে এই গ্রহণকালে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো।  

//জেডএস//

লাইভ

টপ