কীভাবে ‘দ্য ম্যাজিক মাউন্টেন’ লিখেছিলেন

অনুবাদ : মৃত্তিকা তৃণ
০১ জানুয়ারি ২০২৬, ২০:৩১আপডেট : ০১ জানুয়ারি ২০২৬, ২০:৪৫

১৯২৪ সালে আঁদ্রে জিদের কাছে লেখা এক চিঠিতে টমাস মান জানান, খুব শিগ্‌গিরই তিনি তার নতুন উপন্যাস ‘দ্য ম্যাজিক মাউন্টেন’-এর একটি কপি পাঠাবেন। আরো যোগ করেন, “কিন্তু আমি একটুও আশা করি না যে আপনি পড়বেন। উপন্যাসটি অত্যন্ত সমস্যাজনক ও ‘জার্মান’ ধাঁচের কাজ। এছাড়া আকারেও এতটাই দানবীয় যে আমি ভালো করেই জানি, ইউরোপের বাকি অংশের জন্য তা মোটেও উপযোগী নয়।”

মর্টেন হই ইয়েনসেনের সহজবোধ্য ও তথ্যবহুল গবেষণাগ্রন্থ টমাস মানকে একেবারে অন্তর্গতভাবে পরস্পরবিরোধী এক মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করে। একজন শিল্পী, যিনি পোশাক-আশাক ও আচরণে যেন একজন ব্যবসায়ী। প্রচলিত পারিবারিক কাঠামোর ভেতরে ছয় সন্তানের পিতা হয়েও সমকামী। সমাজে সম্মানিত হয়েও মৃত্যু ভাবনায় আচ্ছন্ন।

জিদের কাছে নিজের সন্দেহ প্রকাশ করলেও ‘দ্য ম্যাজিক মাউন্টেন’ অদ্ভুত ও দীর্ঘ উপন্যাস। ইউরোপজুড়ে বিপুলভাবে সমাদৃত হয়, প্রকাশের তিন বছর পর আমেরিকাতেও। সেখানে প্রকাশক উপন্যাসটির অদ্ভুত তকমা উপেক্ষা করে “আধুনিক মানুষের ব্যবহারিক জীবনের জন্য উপযোগী” বলেন। শুনতে এতে জর্ডান পিটারসন-ধাঁচের অগভীর নীতিকথার গন্ধ থাকলেও, বাস্তবে উপন্যাসটি ‘ইন সার্চ অব লস্ট টাইম’, ‘ইউলিসিস’, ‘দ্য ম্যান উইথআউট কোয়ালিটিস’ এবং ‘দ্য লাইট হাউজ’ উপন্যাসগুলোর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সাহিত্যিক আধুনিকতার সর্বোচ্চ শিখরগুলোর একটি (এই উপমার জন্য ক্ষমাপ্রার্থী)।

কীভাবে ‘দ্য ম্যাজিক মাউন্টেন’ লিখেছিলেন

উপন্যাসটির কাহিনি আবর্তিত হয় তরুণ নায়ক হান্স ক্যাস্টর্পকে ঘিরে, যে দাভোসের এক যক্ষ্মা স্যানাটোরিয়ামে তার অসুস্থ কাজিনকে দেখতে আসে। কয়েক দিনের বেশি থাকার ইচ্ছে না থাকলেও, সে সেখানে আটকে পড়ে সাত বছর। উপন্যাসের কাহিনির সঙ্গে এর রচনাপ্রক্রিয়ার এক আশ্চর্য সাযুজ্য আছে। শুরুতে পরিকল্পনা ছিল ‘ডেথ ইন ভেনিস’-এর গাঢ় বিষণ্ণতার বিপরীতে একটি হালকা ধরনের নভেলা লেখার। কিন্তু মান লেখা শুরু করেন ১৯১৩ সালে, আর শেষ করতে লেগে যায় এক দশকেরও বেশি সময়। এই সময়ের মাঝখানে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ উপন্যাসটির আকার, ব্যাপ্তি ও স্বভাব আমূল বদলে দেয়, কারণ যুদ্ধ মানের রাজনৈতিক ও নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিকেও আমূল বদলে দিয়েছিল।

যুদ্ধের শুরুতে মান ছিলেন একনিষ্ঠ রক্ষণশীল। কিন্তু ১৯২০-এর দশকের শুরুতেই তিনি বিতর্কিত ভায়মার প্রজাতন্ত্রের পক্ষে প্রকাশ্যে বক্তৃতা দিতে শুরু করেন। পরবর্তীকালে নির্বাসনে গিয়ে তিনি নাৎসি তৃতীয় রাইখের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জার্মান বিরোধী কণ্ঠে পরিণত হন।

এই রাজনৈতিক টানাপোড়েন ‘দ্য ম্যাজিক মাউন্টেন-এ প্রবলভাবে প্রতিফলিত হয়েছে, বিশেষ করে লোদোভিকো সেত্তেমব্রিনি (মানবতাবাদী) ও লিও নাফটা (ডানপন্থী উগ্রবাদী) চরিত্রদ্বয়ের মধ্য দিয়ে, যারা ক্যাস্টর্পের আত্মার দখল নিতে চায়। তাদের তর্ক-বিতর্ক অসাধারণ দীপ্তিময়—উপন্যাস লেখার সময় মান নিজে যে রাজনৈতিক বাকযুদ্ধে জড়িয়েছিলেন, তার চেয়েও অনেক বেশি। যদিও ইয়েনসেনের উদ্দেশ্য এমন নয়, তবু মানের পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে তার একনিষ্ঠ বিবরণ এই ধারণাকে জোরালো করে যে, কখনো কখনো একটি উপন্যাস তার স্রষ্টার চেয়েও বেশি কিছু জানে।

তবে অতীত সংশোধনের চেষ্টায় ইয়েনসেন মাঝে মাঝে হোঁচট খান। তিনি বলেন, মান “উদাসীন বা নিষ্ঠুর অভিভাবক ছিলেন”—এই বহুল প্রচলিত দাবি নাকি সঠিক নয়। কিন্তু এর পক্ষে তিনি কেবল মানের পুত্র ক্লাউস মানের আত্মজীবনী থেকে একটি উদ্ধৃতিই দেন, যদিও ক্লাউস ছিলেন গভীরভাবে বিপর্যস্ত এক ব্যক্তি, যার জীবন ছিল তুলনামূলকভাবে সংক্ষিপ্ত। এর বিপরীতে প্রচুর প্রমাণ রয়েছে।

কীভাবে ‘দ্য ম্যাজিক মাউন্টেন’ লিখেছিলেন

ইয়েনসেন আরও আপত্তি তোলেন রোনাল্ড হেইম্যানের ১৯৯৫ সালের জীবনীতে করা “নির্দয়” মন্তব্যের বিরুদ্ধে, যেখানে বলা হয়েছিল মান তার স্ত্রীকে পছন্দ ও সম্মান করতেন, কিন্তু ভালোবাসতেন না। হেইম্যান এই দাবির পক্ষে মানের নিজেরই লেখা এক চিঠির উদ্ধৃতি দেন। হেইম্যানের সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক করা যেতে পারে, কিন্তু ইয়েনসেনের প্রশ্ন—“সে কীভাবে এটা জানতে পারে?”—শুনতে কিছুটা ভণ্ডামির মতো লাগে, বিশেষ করে যখন তিনিও একই ধরনের ব্যাখ্যামূলক বিশ্লেষণের কাজে যুক্ত। তাছাড়া মান সম্পর্কে এমন এক মূল্যায়নের ক্ষেত্রে—যাকে কোলম তোইবিনের ভাষায় বলা যায় “বেশির ভাগ সময়ই সমকামী”—তা মোটেই বিতর্কিত নয়।

যাই হোক, সত্য যা-ই হোক না কেন, তাতে ‘দ্য ম্যাজিক মাউন্টেন’ মানুষের অবস্থার এক মোহময় অনুসন্ধান হিসেবে বা এক মহান সাহিত্যিক কীর্তি হিসেবে কোনো অংশে কম আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে না। ইয়েনসেন উপন্যাসটির গভীর রহস্যে প্রবেশ করার চেষ্টা করেন না, এবং সেটাই তার লক্ষ্যও নয়। বরং তিনি এই অত্যন্ত ঘন ও জটিল শিল্পকর্মটির একটি সংক্ষিপ্ত, আত্মবিশ্বাসী সারসংক্ষেপ দেন যা নিঃসন্দেহে ছোট কৃতিত্ব নয়, এবং যে যুগে এটি রচিত হয়েছিল, তার প্রেক্ষাপট স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন। উপন্যাসের ভূমিকায় মান লিখেছিলেন, “শুধু পূর্ণাঙ্গতাই সত্যিকার অর্থে বিনোদন দিতে পারে”; কিন্তু সারসংক্ষেপেরও যে নিজস্ব আনন্দ আছে, ইয়েনসেনের বই সেটাই প্রমাণ করে।

মূল: ক্রিস পাওয়ার (দ্য মাস্টার অব কনট্রাডিকশনস: থমাস মান অ্যান্ড দ্য মেকিং অব দ্য ম্যাজিক মাউন্টেন, লেখক: মর্টেন হই ইয়েনসেন, ইয়েল ইউনিভার্সিটি প্রেস)

/জেড-এস/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
তীব্র গ্যাস সংকট, কী বলছে তিতাস
তীব্র গ্যাস সংকট, কী বলছে তিতাস
প্রতারণার মামলায়ও তৌহিদ আফ্রিদির জামিন, মুক্তিতে বাধা নেই
প্রতারণার মামলায়ও তৌহিদ আফ্রিদির জামিন, মুক্তিতে বাধা নেই
ট্রাকের নিচে অটোরিকশা চাপা পড়ে প্রাণ গেলো ৩ জনের
ট্রাকের নিচে অটোরিকশা চাপা পড়ে প্রাণ গেলো ৩ জনের
‘আর্জেন্টিনা জিতেছে’ বলে রসিকতা: বিমানের ভেতরেই চরম ক্ষোভের মুখে পাইলট
‘আর্জেন্টিনা জিতেছে’ বলে রসিকতা: বিমানের ভেতরেই চরম ক্ষোভের মুখে পাইলট
সর্বাধিক পঠিত
সাবান-আইসক্রিমসহ চার প্রতিষ্ঠানের ৮ পণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ 
সাবান-আইসক্রিমসহ চার প্রতিষ্ঠানের ৮ পণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ 
জামায়াত এমপির ভিডিও ভাইরাল, জানা গেলো আসল ঘটনা 
জামায়াত এমপির ভিডিও ভাইরাল, জানা গেলো আসল ঘটনা 
মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানো ৪৯ রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স প্রত্যাহার
মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানো ৪৯ রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স প্রত্যাহার
এবার কাশিমপুর মহিলা কারাগারের জেল সুপার বদলি, জেলার বরখাস্ত
এবার কাশিমপুর মহিলা কারাগারের জেল সুপার বদলি, জেলার বরখাস্ত
সচিবালয়ে চাকরিতে যোগ দিতে এসে ৪ জন কারাগারে, কারণ কী   
সচিবালয়ে চাকরিতে যোগ দিতে এসে ৪ জন কারাগারে, কারণ কী