‘সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি’ কবি এবং কবিতা নিয়ে এই বিখ্যাত লাইন আমাদের সকলের কমবেশি জানা। লাইনটি জীবনানন্দ দাশের। তাঁর মতে, কবি হওয়ার জন্য কেবল বুদ্ধি নয়, বরং কল্পনা, চিন্তা ও অভিজ্ঞতার স্বতন্ত্র রূপ থাকা প্রয়োজন। সবাই লিখতে পারলেও, সবার কল্পনায় সেই গভীরতা ও অভিজ্ঞতার সারবত্তা থাকে না, তাই নির্দিষ্ট কিছু মানুষই কবি। সেই সূত্র ধরেই কবি পিয়াস মজিদকে আমি বলি, সত্যিকারের কবি। কবিতা তো অনেকেই লিখে। কিন্তু সবাই কবি না, কেউ কেউ কবি। সত্যি বলতে, জীবিতদের মাঝে হাতেগোনা যে দুই-চারজনের কবিতা পড়ে হতবাক হয়ে যাই, কবি পিয়াস মজিদ তাদের মাঝে অন্যতম। এবং আমার এই কথাটা প্রমাণ করার জন্যই হয়তো এই বছরে চলে এলো পিয়াস মজিদের ‘নির্বাচিত কবিতা’।
বইয়ের ভেতরে যাবার আগে, এর সূচিপত্র দেখেই কোনো কোনো পাঠকের ভ্রূ কুঞ্চিত হতে পারে। তারা প্রথমেই দেখবে— ২০০৯ থেকে ২০২৫, এই পনেরো বছরে কবি পিয়াস মজিদের বের হয়েছে উনিশটি কবিতার বই। ভাবা যায়! আবার কবির ছবি দেখে, তার ফেসবুক প্রোফাইলে একটু ঘুরে এলে অনেকের মনে হতে পারে (যারা তার এবং তার কবিতার সাথে এখনো পরিচিত নন), এই কবির বয়স তো বেশি না, দেখতে কেমন ছোকরা ছোকরা লাগে। হাসিখুশি প্রাণবন্ত এক মানুষ। আবার ঘোরাঘুরি করেন শার্ট-প্যান্ট-জ্যাকেট-সানগ্লাস পড়ে। প্রশ্ন করতে পারেন কেউ কেউ, এত যে কবিতা লিখেন তিনি, কবিতাগুলো কি কবিতা হয় আসলেও? হলেও কি সেই কবিতায় কি ডুব দেয়া যায়, ডুব দিয়ে হারিয়ে যাওয়া যায়? প্রশ্ন এমন থাকতেই পারে। মজার কথা হলো, এই একই প্রশ্ন কিন্তু করা যায় রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে, জীবনানন্দকে নিয়ে, নজরুলকে নিয়ে, নেরুদাকে নিয়ে। বিস্তর লিখেছেন তারা। আসল কথা হলো, কবিতা পিয়াস মজিদের কাছে নিশ্বাস-প্রশ্বাসের মতো। কবিতা নিয়েই তার সংসার, তার নিত্যদিনের উঠাবসা। তবে চলুন, কবি পিয়াস মজিদের সংসারে, তার নিশ্বাস-প্রশ্বাসের ভেতর হানা দেয়া যাক একটু।
‘নাচপ্রতিমার লাশ’ হলো কবির প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ। এই গ্রন্থ থেকে যখন নির্বাচিত কবিতাগুলো পড়তে শুরু করব, প্রথমেই আমাদের থমকে দিবে এর ভাষা, এর থিম, এর আবহ। এরপর ধীরে ধীরে আমরা ঢুকে পড়ব এক গভীর দার্শনিক উপলব্ধির ভেতর। যেমন, যিশুকে নিয়ে তার বিখ্যাত এক কবিতা আছে এতে। শুরু হয়েছে এভাবে: ‘আমি আনন্দম্, ক্রুশের মিনার। আকাশেরও মগডালে থেকে দেখি কোথায় তুমি— চোরাগোপ্তা ফুল।’ এর ভাষা, এর থিম, এর আবহ দেখে থমকে যাই। পড়তে থাকি আমরা, ধীরে ধীরে। কিছু কিছু বুঝি, অনেক কিছুই ধরা দিতে চায় না, তবে ঠিকই আমরা অনুভব করি বিষয়টা। শেষে গিয়ে পড়ি: ‘এই পথ কাঁটাশোভা, এই পথ যিশু। আজ ঝরে পড়ে সব সিডারের গাছ। তবে তুমি নবরূপে রোপিত বিষাদ। তার ছায়ামূলে আমি সংগীতের রিমঝিম জলসা বসাই। সেথা দ্যাখো কেমনে অসুর ঘনায়।’
যিশুর কথা, যিশুর ক্রুশবিদ্ধ হবার ঘটনা আমরা সকলেই জানি। এর ভেতরের দর্শনটাও আমরা অনেক ক্ষেত্রে বুঝতে পারি। কিন্তু এভাবে যিশুকে কতজন স্পর্শ করতে পারে? কবিতার জন্য, একটা কবিতা হয়ে উঠার জন্য এই বিষয়টা খুবই জরুরি।
কবি পিয়াস মজিদ তার কবিতাগুলো দিয়ে আমাদের চারপাশকে, আমার চেনাজানা জগৎকে, আমাদের প্রেমকে, আমার বিরহকে, আমাদের বিষাদকে, আমাদের এই শূন্যতাকে, আমাদের মৃত্যুকে নানানভাবে দেখতে, বুঝতে এবং অনুভব করতে সাহায্য করেন। আমাদের চেনা জগৎ কখনো অচেনা হয়ে পড়ে, আবার খুব অচেনা কিছু বড় আপন বলে বোধ হয়। এর সবথেকে উৎকৃষ্ট উদাহরণ হলো তার দীর্ঘকবিতা ‘এইসব মকারি’।
‘এইসব মকারি’ যারা যারা ঠিকমতো পড়বে, তারা মূলত একধরনের স্পিরিচুয়াল জার্নির ভেতর দিয়ে যাবে। সেই যাত্রার শেষটা হয় এক কাপ কফিতে, কিন্তু মাঝখানে কত কী যে ঘটে যায়! আমরা টের পাই, সত্যিই, এই পৃথিবীতে আমরা যে বেঁচে থাকি—এই থাকাটাই কি আমাদের সবচেয়ে বড়ো মকারি নয়? একে মকারি ছাড়া আর কী-ই বা বলা যায়!
যেমন, আমরা পড়ি: ‘মানুষ তুমি মৃত্তিকাসুন্দর/আয়ুর আস্তানায় আর কতকাল বন্দি!/জিন্দেগি যদিও এক মওতের মহল্লা/প্রতিটি শ্বাসে তৈরি করে চলেছে/আমাদেরই কবরকাঠামো।’
আমরা পড়ি এবং বিস্মিত হয়ে যাই, থমকে যাই। মৃত্যুকে এইভাবে নিত্যদিন বহন করে চলা তার কবিতার নানান জায়গায় নানানভাবে, নানান স্টাইলে এসেছে। সেইসবে একটু পরেই আসছি। আপাতত এই দীর্ঘকবিতায় থাকা যাক। আমরা আগাই, আমাদের সেই যাত্রা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘ হয়। আমরা পড়ি, পড়তে থাকি, আর পড়তে গিয়ে দেখি, এই কবিতায় কবি কোনো কিছু তোয়াক্কা না করে, কোনো রাখঢাক না রেখে জীবনটাকে নগ্নভাবে, এর চিরচেনা সত্যিকারের রূপে কেবলই লিখে গেছেন। সেই লেখা পড়ে আমাদের অস্বস্তি হতে গিয়েও হয় না, আমরা কেবলই তা আহরণ করতে থাকি মগ্নভাবে। যেমন: ‘দোলাচলের মন/তুমি এবার লিঙ্গসর্বস্ব হও/যেহেতু আমাদের সব ধনের আলাপ থেকেই/এক সময় ধান হয়।/ শস্য ছাড়া আর কার হয় শুমার?' এরপর একটু পরেই পড়ি: 'রুমির জন্মদিনে মওলানার শানে/ফর্টি রুলস অব সেক্সের/দূরত্ব ঘুচি।/পপকর্ন খেতে খেতে/এক একজন পর্নস্টার সব্বাই।/চলে যায় বিফল শরতের দিন, অনন্তের শেফালি বলো,/বেশি কাকে ভালোবাসি/ঝরাপাতার ক্বাসিদা নাকি প্রস্ফুটনের মহিমা!’
কবিতার ভেতরে এই যে ডাইগ্রেশনগুলো—প্রথমে পড়লে মনে হয়, কই থেকে কী এসে পড়ল! কিন্তু একটু মনোযোগ দিলেই বোঝা যায়, এগুলো আসলে স্তরে স্তরে নামার সিঁড়ি। গভীরে নামলে টের পাওয়া যায় আমাদের জীবন, আমাকে, আমাদের চারপাশের মানুষজনকে, এই নিত্যদিনের কুৎসিত পৃথিবীটাকে কী নিখুঁতভাবে ধরেছেন কবি। আমরা সন্তের মতো কথা বলি, অথচ শয়তানের মতো নিশ্বাস নিই—এই দ্বিচারিতাই যেন কবিতার রক্তে মিশে আছে।
এই জায়গায় আমার মনে পড়ে রবার্ট ফ্রস্টের সেই তির্যক পঙ্ক্তি, ‘Forgive, O Lord, my little jokes on thee / And I’ll forgive Thy great big one on me.’ কী ভয়ংকরভাবে সোজাসাপটা একটা কথা! কবি বলছেন, হে ঈশ্বর, তোমাকে নিয়ে আমি যে সামান্য মশকরা করেছি, তার জন্য আমাকে ক্ষমা করো—আর বিনিময়ে আমি আমার জীবন নামের যে মহা মশকরাটা তুমি আমার ওপর করেছ, সেটাকে ক্ষমা করে দেব। ভাবুন তো, কত সাংঘাতিক এই কথা! আমাদের জীবন ঈশ্বরের করা এক বিশাল কৌতুক ছাড়া আর কিছু কি? আমরা কি ঈশ্বরকে ক্ষমা করতে পারি? তিনি কি আমাদের ক্ষমা করবেন? প্রশ্নগুলো অদ্ভুত, অনুভূতিটা আরও অদ্ভুত।
বইটির পৃষ্ঠা উলটালে দেখব, জীবন নিয়ে, এবং এই জীবনের থেকে পাওয়া এক মাত্র নিশ্চয়তা, অর্থাৎ মৃত্যু নিয়ে কবি লিখে গেছেন লাইনের পর লাইন। 'নির্বাচিত কবিতা'র বিভিন্ন পৃষ্ঠার আনাচে-কানাচে আমরা সেসবের দেখা পাব। জীবন আর মৃত্যু তার কবিতায় কেমন জায়গায় জায়গায় মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছে। যেমন, ‘লং ওয়াক টু ফ্রিডম’ কবিতায় আমরা পড়ি: ‘জন্মাই এবং ফুরাই/খাইদাই-ঘুমাই/জীবন থেকে পদোন্নতি পেয়ে/মৃত্যুর দিকে আগাই।’
‘স্টারি নাইট’ কবিতায় লিখছেন: ‘মানুষের পিছে/অতীত আর বেঁচে থাকা,/সামনে/আগামী আর মরে যাওয়া।’
এক জায়গায় রীতিমতো জীবন আর মৃত্যু মিলেমিশে এক গুজবের জন্ম দেয় এভাবে: ‘মৃত্যু আর মৃত্যুর গুজবে/এখন কতটুকু পার্থক্য!/বেঁচে যে আছি আজও/এটা আসলে/বেঁচে থাকার গুজব নয়তো?’
আবার ‘ভাবো’ কবিতায় লিখছেন বিরহকাতর প্রেমিকের মতো, যেন বাংলায় লিখছে শায়েরি: ‘ভাবো আমি মরে গেছি,/মরার আগে/তোমাকে জানিয়ে যাওয়ার মতো/জীবন পাইনি’।
‘শ্বাসমহল’ কবিতায় লিখেছেন: ‘একটি মৃত শ্বাসের/জানাজায় শরিক হতে না হতে/পরবর্তী শ্বাসের জন্ম,/পলকা পৃথিবী বহন করবে/আমার কত আর/শ্বাসের ভার!’
‘হয়তো এইরকম’ কবিতায় লিখছেন: ‘যাকে তুমি বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছ এ শহরে/সে আসলে তোমার কবর।’
আবার আমাদের সমাজের অসংগতিও খুব তীর্যকভাবে, খুব সূক্ষ্মভাবে বলছেন তার ‘মালিকানা’ কবিতায়: ‘০১ জন ভূমিহীন মানুষও তো/বয়ে নিয়ে চলে/আস্ত ০১টা কবরের মানচিত্র।’
এভাবে প্রচুর প্রচুর উদাহরণ দেয়া যাবে। আর জীবন ও মৃত্যু নিয়ে, এইরকম ফান্ডামেন্টাল এক বিষয় নিয়ে আলাপ করতে করতে তার কবিতায় ঘুরেফিরে আসে শহর, গ্রাম, অরণ্য, সমুদ্র, জ্যোৎস্না, পাখি, গাছ আরও কত কিছু। হঠাৎ, পড়তে পড়তে আমরা এক সময় আবিষ্কার করি, আমরা কবি পিয়াস মজিদের তৈরি করা এক জগতে হারিয়ে গিয়েছি।
যেমন ‘অহেতু’ কবিতায় লিখছেন: ‘তোমার শহরের দিকে/হাঁটতে শুরু করলে/রাস্তা হয়ে যায় বন।/বনের মধ্যে হাঁটতে হয় না,/হারিয়ে যেতে হয়।’ আবার এই জগতে আমরা দেখি: ‘নিজেকে দেখতে গিয়ে/দেখে ফেলি/আয়নার অসুখ।’ (দৃষ্টিবাহার) কী দামি এক কথা! এই যে মানুষ, মানুষের তৈরি করা সমাজ, এই মানুষের সমাজের তৈরি করা আয়না দিয়ে যে আমরা নিজেদের দেখি, সেই আয়নাটা কি ঠিক? আমাদের ভাবতেই হয়, থামতেই হয়। আমরা বুঝি, যারা কবি, যারা লেখক, যারা শিল্পী, তার সেই আয়নার অসুখ ঠিকই ধরতে পারে, আর সেই অসুখের কথা জানিয়ে নেয় অন্যদের, এবং শুধু জানিয়েই দেয় না, অন্যদের দেখার সুযোগ পর্যন্ত করে দেয়। তখন আমরা বুঝতে পারি, তিনি ‘চোখচুক্তি’ কবিতায় এমন করে কেন লিখেছেন: ‘আমাদের পেট ভরে গেলেও/আমাদের ছায়ারা ক্ষুধার্ত ছিল।’
আমরা বুঝি, কেন: ‘জাগ্রত জগৎ তো মূলত/এক নিদ্রানিকেতন।’ (নিদ্রা, জাগৃতি, এইসব চুমকি) আমরা ঠিকই বুঝি, কিংবা বুঝি না, কেন তিনি এক জায়গায় লিখছেন এমন: ‘বলিভিয়ার জঙ্গলে/খুব ঠান্ডা পড়েছে তো/তাই চুরুটটা নিভে গেছে/দাও না কেউ আগুনটা ধরিয়ে/তারপর দ্যাখো,/কী কান্ডটাই না হয়!’ (আসন্ন), আবার পরেই এক কবিতায় লিখছেন: ‘ফরিদা পারভীনে ভর করে/লালন এসে বলল হঠাৎ—/খাঁচা ছেড়ে বেরিয়ে আয় বোকা/ আমি ভয় পেয়ে আরো বেশি/সেঁধিয়ে যাই খাঁচায়।’
আমরা হয়তো ধীরে ধীরে বুঝি, কেন এই পৃথিবী এমনই, যেমনটা ‘এইসব মকারিতে’ বলেছেন কিছুটা এবং ‘মিখাইল গর্বাচেভের ০১টা ব্যর্থতা’ সহ আরো অনেক কবিতায়, কথায়।
শেষ করি তার ‘কনফেশন’ কবিতার শেষ দুটি লাইন দিয়ে: ‘কথা ও নীরবতার মাঝখানে/কবিতা তো এক প্রকার ধরা খাওয়ার নাম।’









