কবি জসীম উদ্দীনের সাহিত্যিক সত্তার এক অনন্য এবং চিরভাস্বর স্মারক তাঁর রচিত ভ্রমণকাহিনিগুলো। গ্রামীণ জীবনের সুখ-দুঃখ, মেঠো পথ আর সহজ-সরল মানুষের আবেগ-অনুভূতিকে যিনি তাঁর কবিতার মূল উপজীব্য করেছিলেন, সেই কবি যখন দূরদেশের সীমানায় পা রাখলেন, তখন তাঁর দেখার চোখটি কিন্তু নাগরিক বা যান্ত্রিক হয়ে ওঠেনি—জনমানবের প্রতিচ্ছবি তিনি খুঁজে বেড়িয়েছেন পৃথিবীর অন্য প্রান্তে। বাংলা ভ্রমণ সাহিত্যে তাঁর ‘চলে মুসাফির’, ‘হলদে পরীর দেশে’, ‘যে দেশে মানুষ বড়’ এবং ‘জার্মানির শহরে বন্দরে’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
কবি জসীম উদ্দীনের অনুসন্ধিৎসু ও মানবিক ভাবনার এক অনবদ্য দলিল তাঁর বিখ্যাত ভ্রমণকাহিনি ‘যে দেশে মানুষ বড়’। বইটি মূলত বিগত শতাব্দীর ষাটের দশকের শেষের দিকে কবির তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন ভ্রমণের এক জীবন্ত ইতিবৃত্ত। এই গ্রন্থে কবি কেবল একটি ভৌগোলিক অঞ্চলের বিবরণ দেননি, তৎকালীন সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত রাশিয়ার রাষ্ট্রব্যবস্থা, শিল্প-সংস্কৃতি, সাধারণ মানুষের জীবনধারা এবং সর্বোপরি মানুষের মানবিক মর্যাদার এক গভীর ও মনস্তাত্ত্বিক রূপরেখা অঙ্কন করেছেন।
বইটির শিরোনাম ‘যে দেশে মানুষ বড়’ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও গভীর ব্যঞ্জনাময়। কবি এখানে কোনো বিশাল অট্টালিকা, উন্নত প্রযুক্তি কিংবা সামরিক পরাশক্তির বড়ত্ব প্রকাশ করেননি। তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে একটি রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থা তার সাধারণ জনগণকে, বিশেষ করে মেহনতি মানুষকে সবচেয়ে উচ্চ আসন দিতে পারে। সোভিয়েত ইউনিয়নে পা রাখার পর থেকেই কবির কবিমন সেখানকার মানুষের আচরণ, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং রাষ্ট্রের চোখে নাগরিকের সমমর্যাদা দেখে গভীরভাবে আলোড়িত হয়েছিল। একজন রুশ বেতার কর্মী যখন কবিকে জিজ্ঞেস করেছিলেন যে সোভিয়েত দেশের কোন বিষয়টি তাঁকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছে, তখন কবি অকপটে উত্তর দিয়েছিলেন যে, এ দেশে এসে তাঁর সবচেয়ে ভালো লেগেছে যে তারা তাদের জনগণকে সবচেয়ে উচ্চ আসন দিয়েছে। এই একটি বাক্যই আসলে বইটির মূল সুরকে ধারণ করে।
কবির এই ভ্রমণের ইতিবৃত্ত শুরু হয় মস্কো শহর দিয়ে। মস্কোর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, রাস্তাঘাট আর তৎকালীন সোভিয়েত জীবনের কর্মচঞ্চলতা কবিকে প্রথম থেকেই মুগ্ধ করে। সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শের কেন্দ্রভূমি হিসেবে রুশ বিপ্লব এবং তার মহান নেতা ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিনের প্রতি কবির এক ধরনের গভীর কৌতূহল ও শ্রদ্ধা ছিল। সেই আগ্রহ থেকেই তিনি ভ্রমণ করেন লেনিনগ্রাদের ঐতিহাসিক স্থানসমূহ এবং লেনিন স্মৃতি-মিউজিয়াম। মিউজিয়ামে লেনিনের ব্যবহৃত অত্যন্ত সাধারণ আসবাবপত্র, তাঁর কাগজ-কলম, বিছানা এবং সহজ-সরল জীবনযাপনের চিত্র দেখে কবি বিস্মিত হন। যে মানুষের একটি আঙুলের ইশারায় লক্ষ লক্ষ মানুষ জীবন উৎসর্গ করতে পারত, তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের এই অনড় সাধারণত্ব কবিকে এতটাই আপ্লুত করে যে তিনি লেনিনকে ‘মহামানুষ’ বলে আখ্যায়িত করেন। বিপ্লবের তীর্থভূমিতে দাঁড়িয়ে কবি কল্পনার চোখে দেখতে পান সেই মায়েদের, যারা তাদের সন্তানদের দেশের জন্য হাসিমুখে বিদায় দিয়েছিলেন। দেখতে পান সেই বীরদের যারা মরণযজ্ঞে শামিল হয়েছিলেন। এই যে মানুষের জন্য মানুষের আত্মত্যাগ, একেই কবি বড় মানুষ হওয়ার লক্ষণ হিসেবে দেখিয়েছেন।
জসীম উদ্দীনের এই ভ্রমণকাহিনির অন্যতম একটি মায়াময় ও সংবেদনশীল দিক হলো শিশুদের প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসা। মস্কো থেকে দূরবর্তী কৃষ্ণসাগর বা ভূমধ্যসাগরের উপকূলবর্তী অঞ্চল এবং পরবর্তীতে তাসখন্দের বিভিন্ন শিশুকেন্দ্র বা ‘পায়নিয়ার সেন্টার’ পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা কবি অত্যন্ত চমৎকারভাবে বর্ণনা করেছেন। শিশুদের তিনি আখ্যা দিয়েছেন ‘নন্দনের দেবশিশু’ হিসেবে। তাদের নিষ্পাপ হাসিমুখ, কবির কাছে এসে ছোঁয়াছুঁয়ি খেলা করা এবং তাসখন্দের ঘুমন্ত শিশুদের দেখে কবির মনে হয়েছে যেন ছোট ছোট বিছানায় কতগুলো ফুল ফুটে আছে। শিশুদের প্রতি কবির এই অপরিসীম বাৎসল্য কেবল তাঁর ব্যক্তিগত কোমল চরিত্রের পরিচয় দেয় না, সোভিয়েত রাষ্ট্র যেভাবে শিশুদের ভবিষ্যৎ নাগরিক হিসেবে পরম যত্নে ও সুষম সুবিধায় গড়ে তুলছিল, তার একটি প্রাতিষ্ঠানিক চিত্রও ফুটিয়ে তোলে। কবি দেখিয়েছেন, যে সমাজে শিশুদের জন্য সর্বাধুনিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হয়, সে সমাজের মানুষ যে বড় হবে—তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
এই আলোচনায় ‘সাতলানা’ নামক চরিত্রটির উল্লেখ না করলে তা অপূর্ণ থেকে যাবে। মস্কোর ইউক্রেন হোটেলে কর্মরত এই তরুণী অনুবাদক ছিলেন কবির সোভিয়েত ভ্রমণের অন্যতম আকর্ষণীয় চরিত্র। সাতলানার সৌন্দর্য, বুদ্ধিমত্তা এবং স্পষ্টবাদিতা কবিকে গভীরভাবে মুগ্ধ করেছিল। কবির বর্ণনায় সাতলানার প্রতি তাঁর এক ধরনের স্নিগ্ধ ও সূক্ষ্ম অনুরাগের আভাস পাওয়া যায়। বহু নারীর ভিড়ে সাতলানাকে খোঁজার আকুলতা বা তার চলে যাওয়ার পর আশার প্রদীপ নিভে যাওয়ার মতো রোমান্টিক বয়ান ভ্রমণকাহিনিটিকে এক অসাধারণ মানবিক ও সাহিত্যিক মাত্রা দিয়েছে। একই সাথে কবির ব্যক্তিগত অনুবাদক মি. বারানভের সেই কৌতুকপূর্ণ মন্তব্য— "আপনারা কবিরা সবসময়ই এরকম ভুল করিয়া থাকেন"—পাঠককে দারুণ আনন্দ দেয়। তবে সাতলানা কেবল রোমান্টিকতার প্রতীক ছিল না; সে ছিল তৎকালীন প্রগতিশীল রুশ নারীর প্রতিচ্ছবি। নারীর অধিকার এবং সমাজ গঠনে ও দেশের সুরক্ষায় নারীদের সমান অংশগ্রহণ ও বীরত্বের কথা সাতলানা যেভাবে কবির সামনে তুলে ধরেছিল, তা জসীম উদ্দীনকে অভিভূত করে। পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার বাইরে গিয়ে নারী ও পুরুষের এই যে পরম সমতা, তা কবির চোখে সেই দেশের মানুষকে আরও বড় করে তুলেছে।
জসীম উদ্দীনের এই ভ্রমণের পরিধি কেবল মস্কো বা লেনিনগ্রাদের মতো রুশ প্রধান শহরেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি ভ্রমণ করেছেন মধ্য এশিয়ার মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চল যেমন তাসখন্দ, সমরকন্দ এবং দুশানবে। তাসখন্দ ও সমরকন্দের ঐতিহাসিক মসজিদ, বিশেষ করে বিবি খানুমের মসজিদ এবং সেখানকার ঐতিহ্যবাহী বাজারগুলোর বিবরণ বইটিতে এক ভিন্ন রং যোগ করেছে। এশীয় সংস্কৃতির সাথে এই অঞ্চলের মানুষের যে আত্মিক যোগাযোগ, তা কবি খুব নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন। এই অঞ্চলের প্রাচীন স্থাপত্য, ইসলামি ঐতিহ্য এবং আধুনিক সোভিয়েত সভ্যতার যে মেলবন্ধন, তা কবির বর্ণনায় অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ফুটে উঠেছে।
একজন খাঁটি শিল্পী হিসেবে জসীম উদ্দীন সোভিয়েত ইউনিয়নের বিভিন্ন থিয়েটারে নৃত্যনাট্য (যেমন সালবেগ নৃত্যনাট্য) ও মঞ্চনাটক উপভোগ করেছেন, ঘুরে দেখেছেন বিখ্যাত সব চিত্র গ্যালারি ও জাদুঘর। সোভিয়েত রাষ্ট্র যেভাবে শিল্প ও সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতা করত এবং সাধারণ মানুষ যেভাবে শিল্পীদের সম্মান জানাত, তা দেখে কবির মনে এক ধরনের হাহাকার তৈরি হয়েছিল। তাজিকিস্তানের বিখ্যাত লেখক সদরউদ্দীন আইনির মাজার পরিদর্শনের সময় কবির এই হাহাকার ও হতাশা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি অত্যন্ত দুঃখের সাথে তুলনা করেছেন নিজের দেশের বাস্তবতার সাথে। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, আমাদের দেশের মীর মশাররফ হোসেন, সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী, কায়কোবাদ কিংবা গোলাম মোস্তফাদের কবরগুলো কি আমরা এভাবে সংরক্ষণ করতে পেরেছি? গুণিজনদের প্রতি এই রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক অবহেলার যে আক্ষেপ কবি প্রকাশ করেছেন, তা আজ এত বছর পরেও আমাদের সমাজব্যবস্থার দিকে এক বড় প্রশ্নচিহ্ন ছুঁড়ে দেয়।
সোভিয়েত ভ্রমণকালে আর্থসামাজিক বাস্তবতা সচেতন কবি বারবার সেখানকার সমবায় খামার বা ‘কোলখোজ’ পরিদর্শনে গিয়েছেন। গ্রামীণ জীবনের সাথে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত হওয়ার সুবাদে সেখানকার কৃষি ব্যবস্থা, আধুনিক চাষাবাদ এবং কৃষকদের উন্নত জীবনমান তাঁকে বিশেষভাবে আকর্ষণ করেছিল। চাষি ও মজুরদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নই যে একটি দেশের প্রকৃত উন্নতির মাপকাঠি, তা তিনি চাষি ইউনিয়নের খামারগুলো দেখে উপলব্ধি করেছিলেন। সেখানে মালিক ও শ্রমিকের কোনো ভেদাভেদ ছিল না, ছিল না কোনো শ্রেণি বৈষম্য।
শেষে বলা যায়, জসীম উদ্দীনের ‘যে দেশে মানুষ বড়’ কেবল একটি দেশের ভ্রমণবৃত্তান্ত নয়, এটি একটি মানবিক ও সমতাভিত্তিক সমাজের স্বপ্ন দেখার দলিল। কবি তাঁর সরল, সাবলীল ও প্রাঞ্জল ভাষায় তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের ইতিবৃত্ত এমনভাবে তুলে ধরেছেন, যা পাঠককে সেই সময়ের রুশ সমাজে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। বইটিতে কোনো রাজনৈতিক তত্ত্বের জটিলতা নেই। বরং আছে মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা এবং একটি মানবিক রাষ্ট্রের জয়গান। যেখানে মানুষের আত্মিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের সর্বোচ্চ সুযোগ দেওয়া হয়। যেখানে কর্মের ভিত্তিতে মানুষকে ছোট-বড় করা হয় না, যেখানে নারী-পুরুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দেশ গঠনে অংশ নেয়—সেই দেশের মানুষ যে সত্যিই বড়, কবি তাঁর অসাধারণ লেখনীর মাধ্যমে তা প্রমাণ করেছেন। বর্তমানের পুঁজিবাদী ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক বিশ্বে পল্লিকবি জসীম উদ্দীনের এই গ্রন্থটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, বস্তুগত উন্নয়নের চেয়েও মানুষের মানবিক ও আত্মিক বড়ত্বই একটি সভ্যতার আসল পরিচয়। এটি বাংলা ভ্রমণ সাহিত্যের ইতিহাসে একটি অবশ্য পাঠ্য এবং চিরকালীন প্রাসঙ্গিক গ্রন্থ।









