X
মঙ্গলবার, ১৮ জুন ২০২৪
৪ আষাঢ় ১৪৩১

ক্ষতচিহ্নিত হাড়মাংস অথবা নিছকই আত্মজনের কথা

গৌতম গুহ রায়
১১ জুন ২০২৪, ১৫:১৫আপডেট : ১১ জুন ২০২৪, ১৫:১৮

১৯ পর্ব

ভাতফল, কাঁটাতার ও চামড়ার মাংস

“...অতঃপর জীবনের মধ্যে ঢুকে গেছি।
বেড়েছে বয়স, পোড় খেয়ে হয়েছে কঠিন
চষেছি শহরতলীর দয়াময়াহীন সব গলিঘুঁজি ভয়াবহ...”
(পাবলো নেরুদা/পথের বন্ধুরা)

কালো শ্লেটে লেগে থাকা রক্তের চিহ্ন মুছে মুছে আমাদের শৈশবের পাঠ্য অক্ষর ও সংখ্যা খুঁজতে হয়েছে। রক্ত ও বারুদের গন্ধ আচ্ছন্ন রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আমার কৈশোর ডানা মেলছিল। উদ্বাস্তু কলোনির স্কুলের আমরা প্রায় সবাই নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের ‘ছেলেপুলে’। স্কুলে আমাদের টিফিন পিরিয়ড ছিল, কিন্তু কোনো টিফিন বক্স ছিল না। মধ্যবেলার সেই আধঘণ্টা আমাদের হই হই করার সময়। আমাদের কারো কারো কাছে দশ পনেরো পয়সা থাকলেই সে ‘নবাব’। স্কুলের সামনের ফেরিওয়ালার থেকে চানা ঘুগনি, ‘কাঠি বরফ’ অথবা ছোলা কাবলি খেতাম। কিন্তু পকেটে সেই পয়সাটা অধিকাংশ দিন থাকত না, আমরা কয়েক বন্ধু তখন হই হই করে বেরিয়ে পড়তাম। সীমানাপ্রাচীর-বিহীন আমাদের ওই স্কুল, আমাদের মুক্তির আনন্দ। আমাদের টিফিন তখন ‘ভাতফল’ আর পেয়ারা, জাম ও লিচু। সংখ্যাটা ৪/৫ জন থাকলে যেকোনো বাড়িতেই প্রবেশ অবাধ। সেই সময় আমাদের স্কুলের মুখোমুখি গলি, কলোনির দুই নম্বর গলির মাথায় ছিল ‘কাকাতুয়া বাড়ি’। ওই বাড়ির বারান্দায় দাঁড়ে পিতলের শেকলে বাঁধা ছিল একটা মালয়দেশিয় সাদা কাকাতুয়া। দাঁড়ের দুদিকে ছিল ছোলার ও জলের বাটি। মানুষের কথা নকল করে কাকাতুয়াটা সারাদিন গলা ছেড়ে ডেকে যেত। সেই কাকাতুয়া বাড়ির গেটের দুদিকে এক ধরনের পাম ফলের গাছ ছিল আর ছিল গোটা উঠান জুড়ে বড় বড় গন্ধরাজ ফুলের গাছ। এই পাম গাছগুলোকে ‘ভাতফল’ বা ‘ভাতসুপাড়ি’র গাছ বলে সবাই, কিছুটা সরু ও মূল থেকে একসাথে অনেকগুলো গাছ উঠত আর ঝিরিঝিরি পাতার সেই গাছে সুপারির মতো ঝোকা নামতো, থোকা থোকা ‘ভাতফল’। সুপাড়ির থেকে অনেক ছোট ছোট, ধানের থেকে কিছুটা বড় আমাদের ‘ভাতফল’। সবুজ আঁশ খুললে বেড়িয়ে আসত সাদা তালশাসের মতো মোটাসোটা চালের আকারের ভাতফল। ওই বাড়ির ছোটো ছেলে আমাদের থেকে বছর পাঁচেকের বড় নীল দাদা মাঝেমাঝে ভাতফল পেরে দিতেন। ‘স্পোর্টস ম্যান’ নীল দাদা অনেকদিন তাদের বারান্দায় আমাদের ডেকে নিয়ে শরীর চর্চার গুরুত্ব বোঝাতেন, খেলাধুলার কথা বলতেন। আমরা তার কাছে ব্রাজিলের ফুটবল, রাশিয়ার দাবারুদের গল্প শুনতাম। তাঁর কাছে রূপকথার নায়ক ছিলেন কেসিয়াস ক্লে বা মহম্মদ আলি। সেই বাস্তবের রূপকথার গল্প বলেছিলেন নীল দা, ভিয়েতনামে অন্যায় যুদ্ধের প্রতিবাদে দেশের বিরুদ্ধে মেরুদণ্ড সোজা রাখা নায়কের গল্প। যুদ্ধে অংশ না নেওয়ায় বিশ্বজয়ীর খেতাব কেড়ে নেওয়া, আবার ফিরে এসে ১৯৭৪-এ মুষ্টিযুদ্ধে বিশ্ব খেতাব ফিরে পাওয়া ক্ল্যাসিয়াস ক্লে থেকে মহম্মদ আলি হয়ে ওঠার রোমহর্ষক কাহিনি। আর একজন ছিলেন নীল দাদার নায়ক, সাঁতারের নায়ক ডোল্যান্ড অর্থার স্কোল্ল্যান্ডার, ১৯৬৪ থেকে টানা চারবারের অলম্পিক চ্যাম্পিয়ান।

কোনো কোনোদিন আমরা সেই সবুজ ভাতফল গোছা করে নিয়ে এসে স্কুলের লাস্ট বেঞ্চে বসে খুলে খুঁটে খেতাম। আর স্কুলের পেছনে ঘোষ পাড়ার নয়ন ঘোষের বাড়িতে কুল গাছ ও পেয়ারা গাছ, ফল ধরলে আমাদের হানাদারিতে কোনো বাঁধা ছিল না। একদিন স্কুলের টিফিন পিরিয়ডে কাকাতুয়া বাড়িতে ভাতফল আনতে গিয়ে দেখি বাড়ির সামনে প্রচুর লোকজন। ভেতর থেকে বুক কাঁপানো কান্নার শব্দ ভেসে আসছে। মনে হচ্ছে কেউ মরণকান্না কাঁদছে। সামনের বাড়ির তপন কাকু বললেন, ‘নীল নদীতে ভেসে গেছে, এই বর্ষার করলায় সাঁতার দিতে গিয়ে জলের স্রোতে ভেসে গেছে’। দুপুর থেকেই ফায়ার ব্রিগেড ও পাড়ার বড়রা নদী তোলপাড় করে খুঁজেছে তাঁকে, কিন্তু তাঁর খোঁজ পাওয়া যায়নি। পরদিন ভোরে করলা তিস্তার সংযোগস্থল মন্ডলঘাটে তাঁকে পাওয়া গেলো। জলে ফুলে সাদা হয়ে যাওয়া নীলের মৃতদেহ উদ্ধার করে স্থানীয় জেলেরা। পোস্টমর্টেম করে দেহ বাসায় যখন আনা হলো তখন আর এক দুপুর গড়িয়ে যাচ্ছে। মৃতদেহের সঙ্গে তাঁর ‘স্পোর্টস স্যু’টা শব বহনের মাচায় রেখে দেওয়া হয়েছিল, আমাদেরকে সাঁতারের নায়ক অর্থার স্কোল্ল্যান্ডারের গল্প বলা নীল দাদা সাদা কাপড়ে ঢাকা দেহ হয়ে চারজনের কাঁধে শ্মশানের পথে যাত্রা করছে। মায়ের কান্নার চিৎকার ভেদ করে, উঠান জুড়ে থাকা গন্ধরাজের ঝোপের মধ্য দিয়ে যখন বন্ধুদের কাঁধে করে নীল চক্রবর্তীর শবদেহ অন্তিম যাত্রায় তখনো গন্ধরাজ ফুলের গন্ধ মেখে বাতাস তেমনি বইছিল। শুধু চুপ করেছিল সাড়া দিন ধরে ডেকে যাওয়া কাকাতুয়া পাখিটি। ফুলেদের মতোই মরণের জীবন একই ভাবে ঝরে যায় মাটির দিকে।

শৈশব অচেতন থেকে যখন চেতনের দিকে বাড়ে তখন সে সত্তা বা বেঁচে থাকার নানা ঘটনা দুর্ঘটনা নিয়েই বাড়তে থাকে। শৈশব থেকে কৈশোরে আসা সেই বয়সতার কাছে নিশ্চেতন বা সত্তাহীনের কোনো অস্তিত্ব থাকে না। তার সেই শিশুর, সদ্য কিশোরের শোনা ও দেখা সবকিছুতেই সত্তা আরোপিত হয়।

আমার শৈশব, কৈশোর লালিত সত্তায় তিস্তা ঢুকে দখলদারি করার আগের পর্বটায় অনেকটা জুড়ে আমাদের উদ্বাস্তু কলোনির সুখ দুঃখ, আমার স্কুল ও পুকুরপাড়, সোনার কাঠি পাঠাগার আর নকশালবাড়ি, আগুন ও মৃত্যু, হত্যা ও কয়েদখানার গল্প। নিশ্চয়ই শব্দগুলো তখন আমার জানা ছিল না। আমার সেই শৈশব-কৈশোরের অসঙ্গগঠিত চৈতন্যকে আমি আমার এখনকার ভাষায় পুনঃনির্মাণ করতে চাইছি, আপনাদের সামনে রাখতে চাইছি। এই পুনঃনির্মাণ করতে গিয়ে বুঝছি শব্দ কতটা শারীরিক। দেবেশ রায় যেমন লিখেছিলেন, ‘...যে বয়সে চৈতন্যে শব্দ জন্মায়ননি কিন্তু অনুভব বা বোধ জন্মে গেছে, সেই বয়সকে কি আমন শব্দ দিয়ে ছোঁয়া যায়, যে শব্দগুলো সারা জীবন ধরে মাথায় জন্মে-জন্মে ব্যবহারের সঞ্চয় হিয়ে উঠেছে।’ (জলের মিনার জাগাও) আমার সেই কৈশোরের উদ্বাস্তু কলোনির মানুষজন, আমার সেই নকশালবাড়ি সেই অসঞ্চয় সময়ে আমাকে ঘিরে ধরেছিল কত মানুষের মুখের কত শব্দ দিয়ে। সেই শব্দ, সেই সময়ের চিহ্নগুলোর কোনো মুখ ছিল না। সাবালক হয়ে, জীবনের প্রায় গোটা পরিক্রমাঅন্তে সেই ফিরে শোনার চেষ্টা করি সেই সেই মুখহীন শব্দ, সেই আলোছায়ায় গাঁথা সময়ের প্রকৃত মুখ খুঁজে দেখার।

১৫ আগস্ট, বড় স্কুলে আমাদের প্রথম স্বাধীনতা দিবস। তখন আমার ক্লাস সিক্স, সাত সকালেই রেডিওতে কোথাও দেশাত্মবোধক গান বাজছে। সেদিন স্কুলে একটু আগে আসতে বলা হয়েছিল আমাদের। দশটার আগেই গিয়ে দেখি আমাদের স্কুলের উঠানে ত্রিরঙা জাতীয় পতাকা তোলার আয়োজন হচ্ছে। ঠিক ১০টায় ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ধূর্জটিপ্রসাদ ভট্টাচার্য পতাকা তুলবেন। আমরা সেই পতাকাকে ঘিরে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে। উত্তর দিকে একটা টেবিলে হারমোনিয়াম নিয়ে ক্লাস নাইনের মেয়েদের একটা দল জাতীয় সংগীত গাইবে বলে প্রস্তুত, তদারকি করছেন রীতা দিদিমণি। জীব বিজ্ঞানের শিক্ষক সঞ্জিত সেন প্রথমে স্বাধীনতা দিবসের গুরুত্ব বুঝিয়ে কিছু বলছেন। এমন সময় আমাদের কলোনির ৭ নম্বর গলির হীরা চক্রবর্তী, নরেশ দাসসহ চার পাঁচ জন দ্রুত স্কুলে ঢুকে আমাদের মধ্যখানে, পতাকার কাছে এসে দাঁড়ালেন। হীরাদার ভাই শীতল আমাদের ক্লাসে পড়ে, আমার বন্ধু, ফিসফিস করে বললো– ‘জানতাম একটা গোলমাল হবে, তবে ভয় পাস না, আমাদের কিছু করবে না’। হীরা দা ধূর্জটি স্যারকে বললেন, ‘মাস্টারমশাই আপনাকে অনুরোধ, এই পতাকা তুলবেন না। এই স্বাধীনতা আমরা মানি না। শ্রেণিমুক্ত সমাজের জন্য আমাদের লড়াই। বুর্জোয়া ব্যবস্থা নিপাত যাক।’ শব্দগুলো বোঝবার মতো চেতনা তখনো আসেনি আমাদের। দেখলাম স্তম্ভিত শিক্ষকদের সামনেই নরেশ দা তখন রঙিন কাগজে সাজানো বাঁশ থেকে একটানে পতাকাটা খুলে ফেলেছেন। তাঁরা স্লোগান দিচ্ছিলেন– ‘নকশালবাড়ি জিন্দাবাদ, মাও সে তুং জিন্দাবাদ, চারু মজুমদার জিন্দাবাদ’। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে উসখুস করতে থাকা শিক্ষকদের সামনেই একজন সেই পতাকাটায় আগুন ধরিয়ে দিলো। স্তম্ভিত শিক্ষকরা, আমরা। আজন্ম মার্ক্সবাদী ধূর্জটি বাবু তার হাইপাওয়ার চশমা মুছতে মুছতে বললেন– ‘তোমরা আমার ছাত্র, এ তোমাদের ভুল অথবা আমাদেরই ভুল।’ এর কিছুক্ষণের মধ্যে কয়েক ভ্যান পুলিশ চলে এলো। অনেক জিজ্ঞাসাবাদ করার পরেও ধুর্জুটি বাবু বা কোনো শিক্ষক সেই যুবকদের কারো নাম বলেননি। ধূর্জটি বাবুকে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়, সেখানেও তাঁকে দিয়ে কারো নাম বলানো যায়নি। বেশ কয়েকজন ছাত্রকে পুলিশ ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করে, কিন্তু তারাও কারো নাম বলেনি সেদিন। এই ঘটনার পর কদিন ধরে সি আর পি এফ আবার গোটা এলাকা তোলপাড় করে বেড়ায়। কিন্তু কিছু হেরফের হয়নি তাতে। তবে বেশ কিছুদিন বাদে অন্য মামলায় নরেশ, হীরাসহ কলোনির বেশ কয়েকজন নকশাল যুবক গ্রেপ্তার হন। তাঁদের জেলের মধ্যে অকথ্য অত্যাচার করা হয়। নকশালদের ‘শায়েস্তা’ করার জন্য জেলে ‘পেটি কেস’ দিয়ে কংগ্রেসের ‘গুন্ডা’ ঢুকিয়ে জেলের মধ্যে তাঁদের পেটানো হয়। সবকিছুই ছিল খোলামেলা, সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ করার সাহস ছিল না, পুলিশ আর সি আর পি-র ভয় সামাজিক মানুষের শিরায় শিরায়। নরেশদার কাছে জেনেছি যে তাঁদের পায়ু দ্বার দিয়ে কাঠের রোলার ঢুকিয়ে দেওয়া থেকে উলটো করে ঝুলিয়ে রাখা– যাবতীয় পাশবিক অত্যাচারের করা হয়েছিল থানায়। এই অত্যাচারে অনেকেই জীবনের মতো পঙ্গু হয়ে যায়, বাকি জীবন এক একটা মৃতপ্রায় রুগ্ন দেহ হয়ে বেঁচে থাকে সেই সব আদর্শ সামনে রাখা যুবকেরা। চলবে

/জেড-এস/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
আছাদুজ্জামান মিয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতির তেমন অভিযোগ আসেনি: ওবায়দুল কাদের
আছাদুজ্জামান মিয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতির তেমন অভিযোগ আসেনি: ওবায়দুল কাদের
গাজায় শরণার্থী শিবিরে ইসরায়েলি বিমান হামলায় নিহত ১৭
গাজায় শরণার্থী শিবিরে ইসরায়েলি বিমান হামলায় নিহত ১৭
সেন্টমার্টিন সরকারের নিয়ন্ত্রণেই আছে: বাহাউদ্দিন নাছিম
সেন্টমার্টিন সরকারের নিয়ন্ত্রণেই আছে: বাহাউদ্দিন নাছিম
আড়তদার সিন্ডিকেটে জিম্মি কাঁচা চামড়ার বাজার
আড়তদার সিন্ডিকেটে জিম্মি কাঁচা চামড়ার বাজার
সর্বাধিক পঠিত
তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ দ্বারপ্রান্তে, ভারতীয় জ্যোতিষের ভবিষ্যদ্বাণী
তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ দ্বারপ্রান্তে, ভারতীয় জ্যোতিষের ভবিষ্যদ্বাণী
মাংস কেনা-বেচার ঈদ মোহাম্মদপুরে
মাংস কেনা-বেচার ঈদ মোহাম্মদপুরে
বাড়ি ফিরে পেতে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে ফুটপাতে দিদারুল
ঈদের দিনে অনশনবাড়ি ফিরে পেতে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে ফুটপাতে দিদারুল
থমথমে ‘তুফান’, অন্তর্জালে ‘দরদ’ মুগ্ধতা
থমথমে ‘তুফান’, অন্তর্জালে ‘দরদ’ মুগ্ধতা
২৪ বছর পর রাষ্ট্রীয় সফরে উত্তর কোরিয়ায় পুতিন
২৪ বছর পর রাষ্ট্রীয় সফরে উত্তর কোরিয়ায় পুতিন