ধারাবাহিক উপন্যাস ।। পর্ব—১২

অভিনয়

শামীম রফিক
১৪ অক্টোবর ২০২৫, ১৪:৩৮আপডেট : ১৪ অক্টোবর ২০২৫, ১৪:৩৮

আর কোনো কষ্ট আমাকে টাচ করছে না। বুকটা খুব হালকা লাগছে। আমি হাওয়ায় উড়ে বেড়াচ্ছি। সংবিৎ ফিরে এলে দেখি আমি সীমার বুকে দুই হাতের বন্ধনে শুয়ে আছি। আমার আর কোনো কষ্টবোধ নেই। হতাশা নেই। আমি খুব স্বস্তি বোধ করতে থাকি। তাহলে সময় নষ্ট করা কেন? আমি ঠোঁট রাখি সীমার ঠোঁটে। দু’হাতে জড়িয়ে ধরি। ও আমাকে বাঁধা দেয় না। আর ও আমাকে আবার ভাসিয়ে নিয়ে যায় স্বপ্নলোকে। সেখানে আমি পুরুষ হয়ে ওঠি। ওর মধুময় আলিঙ্গন আর উষ্ণতায় আমরা ভেঙেচুরে খানখান হয়ে যাই। আমাদের ঘাম বিদ্যুৎ স্ফুলিঙ্গের মতো আলোকিত করে দেয় সৌরলোক আর বায়ুমণ্ডল। আমরা ক্রমান্বয়ে এক বৃত্ত ভেঙে আরেক বৃত্ত, আরেক বৃত্ত ভেঙে আরেক বৃত্ত এবং এইভাবে ভেঙে ভেঙে অসীমতাকে আলিঙ্গন করি। সীমা আমার ঠোঁটে মোচর দিয়ে বলে— দেখলেন তো বিজয় আর পরাজয়ের পার্থক্য? তাহলে কেন ভেঙে যান? কোনটা বিজয়, কোনটা পরাজয় তা বোঝা অনেক কঠিন। যারা নিজেদেরকে বিজয়ী বলে মনে করে, আসলে তারা বিজয়ী কিনা তা নিয়ে দ্বিধান্বিত হয়ে পড়ি। আসলে বিজয় নিজের কাছে, বিজয় বিবেকের, বিজয় ভালোবাসার, বিজয় সুস্থতার। আমি বিজয়ের আসল অর্থ বুঝে অন্যদেরকে পরাজিত মনে করতে থাকি।

ছুটির দিন আমরা দু’জনে মিলে বাজারে যাই। বাজারের পাশে রাস্তায় দাঁড়িয়ে চা খাই। তারপর আমরা ঘুরে ঘুরে বাজার করি। সীমা লিস্ট দেখে দেখে বাজারের কথা বলে। বাজার শেষ করে আমরা বাসায় ফিরে আসি। বাসায় ফিরে বাজারগুলো রান্নাঘরে পৌঁছে দিয়েই আমার ছুটি। সীমা একটা একটা করে বাজারগুলো গুছিয়ে রাখে। গুছানো শেষ হলে বাজার থেকে কাটিয়ে আনা তাজা তাজা মাছ এবং মাংস বেছে নিয়ে রান্না করা হয়। রান্নার ঘ্রাণে বাড়িঘর মৌ মৌ করে ওঠে। তখন আমার ছেলেবেলার কথা মনে পড়ে। ছোটবেলায় আম্মাকে দেখেছি বাজার আসার পর এভাবে তাজা তাজা মাছ বেছে নিয়ে রান্না করতো। তারপর সবাই মিলে একসাথে হল্লা করে খাওয়া হতো। আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম এভাবে রান্না করে খাওয়ার কথা। এভাবে বাজার থেকে কিনে এনেই রান্না করার কথা। কতদিন বাজার করেছি এবং মনে হয়েছে তাজা তাজা একটু রান্না করা হোক কিন্তু তা কখনো হয়নি। বরং সকালে বাজার করা হলো কেন, দুপুরে বাজার করা হলো কেন, বিকেলে বাজার করা হলো কেন, রাতে বাজার করা হলো কেন? আমরা যে ব্যস্ত জীবন যাপন করি তাতে যখন একটু সুযোগ হয় তখনই বাজার করতে হয়। তাতে এত সকাল দুপুর রাত ভাবলে হয়? তাছাড়া বাজার গোছাতে তো সব রকম সহযোগিতা করতাম। কাজ বলতে মাছ ধোয়া, প্যাকেট করা আর ফ্রিজে রাখা। যেকোনো মাছই তো বাজার থেকে কাটিয়ে আনা হয়। আসল ঝামেলাই তো নেই। তাছাড়া মাছ তো বাজার থেকেই ধুয়ে নিয়ে আসি। আজকাল তো কষ্ট প্রায় নেই বললেই চলে।

আজ আবার সেই ছোটবেলাকে দেখতে পাচ্ছি। মায়ের কথা খুব মনে পড়ছে। বাবাকেও খুব মনে পড়ছে। আমাদেরকে ছেড়ে সেই কবে উনারা চলে গেছেন ঐ আকাশে। ঝকঝকে ঐ আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকি। কাকে যেনো খুঁজতে থাকি। বাবা-মা, তোমাদেরকে খুব মনে পড়ছে। চোখের জল ধরে রাখতে পারছি না। কত কথা আর কত স্মৃতি চোখের সামনে ভেসে ওঠে। কিছুতেই ভুলতে পারছি না উনাদেরকে। উনারা কেমন আছেন? আমরা কেমন আছি তা কী উনারা দেখতে পাচ্ছেন? আমাদের ভেতর কত উলট-পালট হয়ে গেছে। আমাদের মাঝে কোনো সম্পর্ক নেই। আমরা সবাই ভেঙেচুরে খান খান হয়ে গেছি। এখন আমাদের মাঝে যোজন যোজন দূরত্ব। কেন এমন হলো, কীভাবে এমন হলো তা ভেবে পাই না। শুধুই কী লোভ আর স্বার্থপরতা? আর কোনোদিন কী সেই দিনগুলো ফিরে আসবে? আসা সম্ভব? কী জবাব দেব তোমাদের প্রশ্নের? কিন্তু কী করব বা কী করার ছিল আমাদের? তোমরা কেমন আছো ঐ আকাশে?

আমার দু’চোখ জলে ভরে ওঠে। অশ্রুসিক্ত আমাকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা খুঁজে পায় না সীমা। সে মাথায় হাত বুলাতে থাকে। ওর চোখ দুটোও জলে ভিজে ওঠে। এক সময় ও রান্নাঘরে ফিরে যায়। কিছুক্ষণ পর রান্না শেষ হয়ে যায়। রান্না শেষ করে সীমা আমাকে ডাকতে আসে। আমরা গোসল করে তারপর খাব। ছুটির দিনের গোসল। সীমা আজ আমাকে পিঠ ঘষে গোসল করিয়ে দিবে। প্রতি ছুটির দিন তাই করে। সে আমার চারিদিকে ঘুরঘুর করছে। আমি প্রথম তার ঘোরাফেরার কারণ বুঝতে পারিনি। বুঝতে সময় লাগে। আমাকে কাছে এসে সে ডাকছে আর বলছে, কারো কী কিছু ইচ্ছে আছে? ইচ্ছে থাকলে বলতে পারেন। ইচ্ছে থাকলে এখনই পূরণ করতে হবে, আমি কিন্তু গোসল করতে চলে যাব। পরে বললে কিন্তু সম্ভব হবে না। হাতে অনেক কাজ। অবশেষে আমি বুঝতে পারি এবং সে ইচ্ছে পূরণ করি। ইচ্ছে পূরণ শেষে আমরা একসাথে গোসলে যাই। সীমা আমাকে গোসল করিয়ে দেয়। খাবার টেবিলে আমাদের অনেক খুনসুটি হয়। অনেক মজার খাবার আমরা মজা করে খাই। খাওয়া শেষ করে আমরা একটু রেস্ট নেই। শুয়ে শুয়ে আমরা অনেক গল্প করি। সন্ধ্যায় আমরা বেড়াতে যেতে চাই। তারপর রাতের শো’তে মুভি দেখতে চাই।

আমার সব কথায় সীমা রাজি হয়ে যায়। কোনো কথায় এবং কোনোকিছুতে আপত্তি করে না। কিন্তু কেন? আমার কোনো কথা বা ইচ্ছা কী ওর অপছন্দ হতে পারে না? তবে দ্বিমত করে না কেন? ছোটবেলা থেকেই জানতাম আমি খুব বিবেচক। খুব ভেবে কথা বলি, খুব ভেবে কাজ করি। কিন্তু বিয়ের পর থেকে আমার সে ভাবনা উল্টে যায়। আমার কোনো কথাই সঠিক হয় না, আমার কোনো ভাবনাই ঠিক থাকে না। সব কথায় আপত্তি থাকে। আমি সঠিক কিনা সে বিষয়ে আমি কনফিউজড হয়ে যাই। মাঝে মাঝে মনে হতো আমার ছোটবেলা থেকে নিজের বিষয়ে ভাবা বিষয়গুলো হয়তো সঠিক নয়। নিজের সম্পর্কে তেমন ধারণাই আমার জন্ম নিয়েছিল। আমি দেখতাম জগৎ সংসারের যত জায়গায় যাই, কোথাও আমার ভাবনার সাথে অমিল হচ্ছে না কিন্তু শুধু ঘরেই অমিল হয়ে যেতো। সকল বিষয়েই অমিল হয়ে যেতো। কোনটা ঠিক, কোনটা বেঠিক সে আমার মাঝে এলোমেলো হয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু এখন দেখছি সব জায়গায় আমার আবার মিলে যাচ্ছে। সীমার সাথেও সব মিলে যায়। তবে কী আমিই সঠিক ছিলাম? অমিলগুলো অন্য কোনো কারণে হতো? আগে যে আমি পরিবর্তনের চেষ্টা করতাম সেসব তো ভুল ছিল। শুধু শুধু সময় নষ্ট হয়েছে। অকারণেই কষ্ট পেয়েছি এবং সময়গুলো নষ্ট হয়েছে।

আমি ওকে জিজ্ঞেস করি, তোমার নিজের কোনো ইচ্ছে নেই? আমার সব কথায় রাজি হয়ে যাও কেন?

আপনার ইচ্ছেগুলো আমার ইচ্ছের সাথে মিলে যায়।      

কীভাবে সবকিছু মিলে যায়?

তার আমি কী জানি? তবে মিলে যায়। তাছাড়া আপনার সুখটাও তো আমি চিস্তা করি। আপনি কীভাবে ভালো থাকবেন তা আমি সব সময়ই ভাবি।

জীবনে সুখ পাওয়ার চেয়ে বড় জয় আর কিছু হতে পারে না। আমার এখন তাই মনে হয়। আমরা যত জিনিস জীবনে পাই এবং পাওয়ার ইচ্ছে রাখি সেসবের মধ্যে সেরা হলো সুখ পাওয়া। জীবনে সুখ পাওয়া এবং সুস্থ থাকার চেয়ে বড় পাওয়া আর কিছু নেই। সুখ জিনিসটা নির্ভর দু’জনের আন্তরিকতার উপর। উদার ও উন্নত মানসিকতা হলো আন্তরিকতার প্রধানতম শর্ত। ক্ষুদ্র জীবনটাকে সাজাতে গেলে সুখী হবার বিকল্প আর কিছু নেই। মানুষ যে কেন অসুখী হয়? সুখী হওয়ার চেয়ে অসুখী হওয়া অনেক বেশি কঠিন। মানুষ সুখী হলে, তার অসুখ-বিসুখ কমে যায়, মানসিক শান্তি ফিরে আসে, পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্ক বৃদ্ধি পায়, আত্মীয়তার বন্ধন বৃদ্ধি পায়, মানুষের অর্থ সম্পদ বৃদ্ধি পায়। আগে আমাকে সারাক্ষণ কীভাবে হারানো যায়, কীভাবে ছোট করা যায়, কীভাবে মিথ্যেবাদী বানানো যায় সেসব চেষ্টা করা হতো। বাসায় যত মানুষ আসতো সবার কাছে দোষ বলতো, বানিয়ে বানিয়ে দোষ বলতো। আজগুবি কথার শেষ ছিল না। অনেক কথা শুনে আমি অবাক হয়ে যেতাম। ওকে কাছে পাবার জন্য আমি ব্যাকুল থাকতাম। ওকে কাছে না পেলে আমার কষ্ট হতো। ওর তেমন হতো না। আমাকে পাবার জন্য ওর ব্যাকুলতা থাকতো না। আমার জন্য ওর কষ্ট হতো না। আমি সেগুলোর প্রতিবাদটুকুও ঠিকমত করতে পারতাম না। করার সুযোগও ছিল না। কোথাও বেড়াতে গেলে সারাক্ষণ আমার দোষ বলতো। আমি ঘরের কোনো কাজ করি না, খাই আর ঘুমাই, আরও কত দোষ। বাসা আর বাসার বাইরে সারাক্ষণ বদনাম বলে বেড়াত। চারিদিকে শুধু ওর আপনজনরা ছিল। তাদের আসা যাওয়া ছিল। চারপাশে আমার কোনো আপনজন থাকতো না। ওকে সবাই উল্টোটাই বুঝাতো। যারা ছিল সবাই ওর নিজের মানুষ তাই তারা সেগুলোকে আরও বড় করে বলে বেড়াতো। দিনে দিনে আমি মনের দিক থেকে আরও দুর্বল হয়ে পড়ছিলাম। নিঃসঙ্গ আর অসহায় হয়ে পড়েছিলাম। আমি ভালো কী মন্দ তা প্রমাণ করার কোনো সুযোগ বা পরিবেশ আমার ছিল না। আমি যা নই তা হয়েই আমাকে থাকতে হতো, মেনে নিতে হতো, বেঁচে থাকতে হতো। এখন আমি আমার মহত্ব দেখাতে পারছি, আদর্শ দেখাতে পারছি, সততা দেখাতে পারছি, ভালোবাসা দেখাতে পারছি। সত্যিকারের আমাকে প্রমাণের সব সুযোগ আমার হয়েছে। সত্যি বলতে, তখন আমি অনেক কষ্টে থাকতাম। কষ্টে থাকতাম বলেই মন বর্হিমুখী হয়ে থাকতো। কারো একটু মায়া পেলেই মন গলে যেতো। কাউকে সব কষ্টের কথা বলতে ইচ্ছে করতো। মানুষের যা কিছুর অভাব থাকে, তা পাবার জন্যই তার ব্যাকুলতা বেশি থাকে। তখন মনে হতো, এমন কাউকে যদি পেতাম যাকে মনের সব দুঃখ ইনিয়ে বিনিয়ে বলতে পারতাম, তার ভালোবাসা পেতে পারতাম। আমি নিজে কী এবং কেমন তা প্রকাশ করতে পেতাম। আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতাম ওরা যা বলে এবং বলছে সেসব কী সত্যি? আমি কী সত্যিই ওরকম? আমার সত্যিটা প্রকাশ করতে ইচ্ছে করতো। ইচ্ছে করতো আমি সত্যিকারের কেমন তা প্রকাশের সুযোগ যদি একদিন হতো। ঐ সংসারে আমি স্থির থাকতে পারতাম না। ওটাকে আমার নিজের সংসার বলে মনে হতো না। সারাক্ষণ পালাই পালাই করতাম।

/জেড-এস/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
দিল্লীতে আগুনে ৮ বাংলাদেশি আহত, গুরুতর অবস্থা তিন জনের
দিল্লীতে আগুনে ৮ বাংলাদেশি আহত, গুরুতর অবস্থা তিন জনের
ফুল দিয়ে ড. খলিলুর রহমানকে বরণ
ফুল দিয়ে ড. খলিলুর রহমানকে বরণ
প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে বন্ধ কলকারখানা চালু ও ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত সভা
প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে বন্ধ কলকারখানা চালু ও ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত সভা
ত্রিমুখী তদন্তের ‍মুখে বেবিচকের প্রকৌশলী শরিফুল
ত্রিমুখী তদন্তের ‍মুখে বেবিচকের প্রকৌশলী শরিফুল
সর্বাধিক পঠিত
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
তৃতীয় বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাচ্ছেন আমির খান
তৃতীয় বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাচ্ছেন আমির খান