ধারাবাহিক উপন্যাস ।। পর্ব—৭

হিমপ্রহরী

আলম শাইন
০৭ এপ্রিল ২০২৬, ০০:০০আপডেট : ০৭ এপ্রিল ২০২৬, ০০:০০

তাঁবুর ভেতরে শুয়ে এপাশ-ওপাশ করছেন ইখতিয়ার হামিম। চোখে ঘুম নেই। অভিযাত্রীদের নাকডাকার শব্দ ভেসে আসছে পাশের তাঁবু থেকে। কেউ নড়াচড়াও করছে না, সবাই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।

ইখতিয়ার হামিম নিঃসঙ্গ বোধ করছেন। বাইরে ঠান্ডা হাওয়া বইছে, ভেতরে নাকডাকার শব্দÑসব মিলিয়ে তৈরি হলো এক অদ্ভুত পরিবেশ। ফলে চোখ বন্ধ করেও ঘুমাতে পারছেন না ইখতিয়ার। অজানা ভয় আর আগামী দিনের অনিশ্চয়তা তাকে তাড়া করে ফিরছে।

অবশেষে বিরক্ত হয়ে সব ভাবনা সরিয়ে তাঁবুর কাপড় ঠেলে বাইরে বেরিয়ে এলেন তিনি। বাইরে তখন প্রচণ্ড ঠান্ডা। নিঃশ্বাস ফেলতেই মুখের সামনে ধোঁয়ার মতো কুয়াশা ভেসে উঠল।

মিনিটখানেক দাঁড়াতেই ইখতিয়ারের শরীর ঠকঠক করে কাঁপতে শুরু করল। আঙুলগুলো জমে আসছিল, তবুও তিনি বিচলিত হননি।

তিনি জানেন, পর্বতের ওপরের দিকের আবহাওয়া সবসময়ই এমনই থাকে। বরং আজকের দিনটা অন্য সময়ের তুলনায় কিছুটা সহনীয়। আকাশে তুষারের মেঘ নেই, দূরের বরফঢাকা শৃঙ্গগুলোও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।

ইখতিয়ার তীব্র ঠান্ডায় বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারেননি। তিনি শেরপাদের তাঁবুর দিকে এগোলেন। ভাবলেন যদি কেউ জেগে থাকে, তবে বসে গল্প করে সময় কাটাতে পারবেন। অথবা আগামী দিনের পরিকল্পনাটা শেয়ার করে ঠিক করতে পারবেন। তাতে সময়ও কেটে যাবে, মনটাও হালকা হবে। শেরপাদের তাঁবুর কাছে পৌঁছে ইখতিয়ার ডাক দিলেন, ‘কেউ জেগে আছো?’

একটা তাঁবুর ভেতর থেকে তিলক লিম্বুর কণ্ঠস্বর শোনা গেল, ‘হ্যাঁ, আসুন। ঘুম আসছে না। লাকপা ঘুমিয়ে গেছে, একা একা বসে আছি।’

ইখতিয়ার বললেন, ‘তাকে বিরক্ত করার দরকার নাই, তুমি বরং চলে এসো আমার তাঁবুতে। দুজন বসে গল্প করব।’

তিলক লিম্বু নিজের তাঁবু ছেড়ে তৎক্ষণাৎ ইখতিয়ারের তাঁবুতে চলে এলো। ভেতরে প্রবেশ করতেই ইখতিয়ার বললেন, ‘শোনো তিলক, আগামীকাল আমরা বরফের দেওয়াল বেয়ে উপরে উঠব, তারপর আবার নেমে আসব, এই পর্যন্ত সব ঠিক আছে। প্রশ্ন হচ্ছে যদি আরও উপরে উঠতে চাই, তাহলে তো সেখানে তাঁবু খাটাতেই হবে। এখন বলো, অসমতল জায়গায় কি তাঁবু খাটানো সম্ভব হবে?’

তিলক কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, ‘যতটা বুঝতে পেরেছি, উপরে তাঁবু খাটানোর জন্য তেমন উপযোগী জায়গা নেই। তবে আমরা যদি বরফ কেটে সামান্য জায়গা তৈরি করি, আর দড়ি দিয়ে তাঁবু শক্ত করে বেঁধে দেই, তাহলে সম্ভব হতে পারে। শেরপারা এ কাজে অভ্যস্ত, তারা সাহায্য করবে। তুমি চিন্তা করো না দাই, সব ঠিক করে ফেলব। আমার উপরে ভরসা রাখতে পারো।’

ইখতিয়ার মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন তিলকের পরামর্শ। তিলকের কথায় এক ধরনের আশ্বাস পেলেন, তাতে ইখতিয়ারের মনে নতুনভাবে সাহস জেগে উঠল। এবার ইখতিয়ার হালকা হাসি দিয়ে বললেন, ‘ঠিক আছে, তাহলে আমরা সেভাবেই প্রস্তুতি নেব। যতই কঠিন হোক, আশা করি তাতে সফল হবোই আমরা।’

তিলক মাথা নাড়ল। দুজনই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলো আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করবে বুদ্ধি খাটিয়ে। তারপর আরও কিছুক্ষণ আলাপ-আলোচনা করে তিলক লিম্বু বলল, ‘তাহলে এই কথাই রইল, আবহাওয়া ভালো থাকলে আগামীকাল যথাসময়ে রওয়ানা দেব। এখন তাঁবুতে ফিরে যাচ্ছি, ঘুমাতে চেষ্টা করব।’

ইখতিয়ার হামিম মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়ে বললেন, ‘যাও, শুয়ে পড়ো। আমিও ঘুমানোর চেষ্টা করছি। যদিও শেষ বিকেলে ঘুমাতে পারি না, তবে আজ শরীরটা ক্লান্ত ...।

তিলক লিম্বু ইখতিয়ারের তাঁবু থেকে বেরিয়ে নিজের তাঁবুর দিকে এগোচ্ছিলেন। তখনই তার চোখ আটকে গেল দূরের পর্বতশৃঙ্গে। অস্তমিত সূর্যের রক্তিম আভা বরফে ঢাকা শৃঙ্গের গায়ে পড়তেই শৃঙ্গটা আগুনের মতো জ্বলে উঠল। সাদা বরফ মুহূর্তেই লালচে আলোয় ঝলমল করে উঠল।

তিলক থমকে দাঁড়াল। নিঃশ্বাস বন্ধ করে সে তাকিয়ে রইল অপূর্ব দৃশ্যের দিকে। শৃঙ্গটা জীবন্ত হয়ে উঠল। শৃঙ্গের লাল আভা তাকে অদ্ভুতভাবে আকর্ষণ করল। ঠান্ডার কাঁপুনি ভুলে তিলক মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল সেদিকে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই লাল আভাটা বদলে বেগুনি রং ধারণ করল। মুহূর্তেই পর্বতের গায়ে শুরু হলো এক অদ্ভুত রঙের খেলা—লাল থেকে বেগুনি, আর বেগুনি থেকে হঠাৎ কালো ছায়ায় ঢেকে গেল চারদিক। তারপর দেখতে দেখতেই শৃঙ্গ সম্পূর্ণ অন্ধকারে নিমজ্জিত হলো।

ঘটনাটা এত দ্রুত ঘটল যেন কেউ অদৃশ্য হাত বাড়িয়ে সূর্যের আলো টেনে নিয়ে গেছে, আর মুহূর্তেই পর্বতটাকে অন্ধকারে ডুবিয়ে দিয়েছে। আলো-আঁধারের এই খেলায় তিলক যেমন মুগ্ধ হলো, তেমনি হতবাকও হলো।

তিলকের কাছে বিষয়টা এবার রহস্যময় হয়ে উঠল। সে ভাবছে, যদি আরেকটু সামনে এগোনো যায়, তবে রহস্যময় দৃশ্যটা আরও কাছ থেকে দেখতে পাবে। তিলক সামনের দিকে পা বাড়াল। কয়েক পা এগোতেই অনুভব করল বাতাসে কোনো অদৃশ্য বস্তু ভেসে বেড়াচ্ছে। প্রথমে ভেবেছ হয়ত তুষারের আস্তরণ, আসলে তা নয়। সে ভালোমতো চারপাশে তাকাল; বারবার চেষ্টা করল বস্তুটাকে চিহ্নিত করতে। পারেনি; ব্যর্থ হলো তিলক।

তবে বুঝতে পারল বিষয়টা স্বাভাবিক কিছু নয়। তিলকের মনে প্রশ্ন জাগল, আজও কি ঝড় আসছে? ঝড়ের আড়াল থেকে কি আবারও কোনো অজানা বাণী ভেসে আসবে? তার বুকের ভেতর হালকা শিহরন জাগল। প্রকৃতি তাকে কোনো গোপন সংকেত দিচ্ছে নিশ্চয়ই?

দুই দিন আগের শোনা সেই সতর্কবাণী এখনো তার কানে বাজছে। অদৃশ্য কোনো শক্তি তাকে বিপদের ইঙ্গিত দিয়েছিল সেদিন, বিষয়টা নিশ্চিতও হয়েছে সে।

তিলক কয়েক সেকেন্ড থমকে দাঁড়াল। তারপর সাহস সঞ্চয় করে আবার সামনে এগোতে লাগল। বরফের উপর পা ফেলতেই সে টের পেল, বরফ কেঁপে উঠছে। তার ধারণা পর্বতের বুকের ভেতরে লুকিয়ে থাকা কোনো শক্তি তার প্রতিটি পদক্ষেপ শুনে প্রতিধ্বনি তুলছে।

কিছুদূর অগ্রসর হতেই তিলকের চোখে পড়ল পর্বতের গভীর ফাটল থেকে ধোঁয়ার কুণ্ডলি পাকিয়ে পাকিয়ে উপরে উঠছে। ধোঁয়াটা অচেনা কোনো প্রাণীর অবয়ব ধারণ করে আকাশের দিকে ছুটে যাচ্ছে। তিলক স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। তার মনে অস্বস্তি বাড়তে লাগল।

দৃষ্টি ফেরাতে না ফেরাতেই তিলকের কানে ভেসে এলো এক বিকট আওয়াজ। আওয়াজটা প্রচলিত কোনো শব্দের মতো নয়; না বাতাসের গর্জন, না বরফ ভেঙে পড়ার শব্দ। সম্পূর্ণ ভিন্ন একটা শব্দ তার কানে ভেসে এলো। তিলকের ধারণা অদৃশ্য কেউ একজন তাকে শাসিয়ে দিচ্ছে।

এবার তিলক লিম্বুর মনে প্রশ্ন জাগল, তবে কি পর্বতের চূড়ায় ধ্যানমগ্ন কোনো দেবতা বসে আছেন, যিনি এই অভিযান থামিয়ে দিতে চাইছেন?

কথাটা মনে পড়তেই তিলকের বুক কেঁপে উঠল। ভেতরে ধড়ফড়ানি এতই তীব্র হয়ে উঠল যেন হৃৎপিণ্ডটা এখুনি ছিঁড়ে বেরিয়ে আসবে। আতঙ্কে তার নিঃশ্বাস ঘন হয়ে উঠল, শ্বাস নিতে গিয়ে বুকের ভেতর চাপ বাড়তে লাগল।

দুই দিন আগের ঘটনাটা আবারও মনে পড়ল। তখনো তাকে সতর্ক করা হয়েছিল, পর্বতের উপর থেকে দ্রুত নিচে নেমে যেতে। সতর্কবার্তাটা তিলক লিম্বু মানতে পারেনি। মানতে চাইলেও অভিযাত্রীদের কঠিন চাপে পড়ে তা রক্ষা করতে পারেনি। সেই ব্যর্থতার কথা মনে পড়তেই তিলক ভীষণ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ল। নিজকে অপরাধী হিসেবে ভাবতে লাগল।

প্রচণ্ড ঠান্ডার মাঝেও তার শরীরের ভেতর অদ্ভুত উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ল। আর সেই উত্তাপে শরীরটা জ্বলতে লাগল। তিলক লিম্বু চিৎকার করে কাউকে ডাকতে চাইছে; পারছে না। গলা থেকে কোনো শব্দই বেরোচ্ছে না। ঠোঁট কাঁপছে, অথচ আওয়াজ নেই। যেন কোনো একটা শক্তি তাকে ঘিরে ধরেছে।

তিলক লিম্বু অনুভব করল, পর্বতের বুকের গভীর থেকে কেউ তাকে টেনে নিতে চাইছে। বরফের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা অদৃশ্য একটা হাত তার শরীর আঁকড়ে ধরেছে। সে মরিয়া হয়ে মুক্ত হতে চাইছে, কিন্তু পারছে না, বরং হাত-পা অবশ হয়ে আসছে, শরীরের ওপর থেকে তার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যাচ্ছে।

তিলক বুঝতে পেরেছে যদি এখনই মুক্তি না পায়, তবে সে অন্ধকারের অতল গহ্বরে হারিয়ে যাবে। আতঙ্কে তিলক আবারও চেষ্টা করল চিৎকার করতে। অথচ গলা থেকে কোনো শব্দ বের হলো না তার, শূন্যে মিলিয়ে গেল সমস্ত শক্তি। পেছনে ফিরতে চাইলেও পারেনি; তার দুই পা শক্ত হয়ে বরফের সঙ্গে আটকে গেছে। যতই চেষ্টা করছে, শরীরটাকে একবিন্দুও নড়াতে পারছে না তিলক। এমনকি চোখও সরাতে পারছে না কালো ছায়ার উপর থেকে। এবার তিলক নিশ্চিত হয়েছে, অদৃশ্য শক্তি তার দৃষ্টি টেনে ধরে রেখেছে, তাই চোখ ফেরাতে পারছে না।

এদিকে পর্বতের ফাটল থেকে ধোঁয়ার কুণ্ডলি ঝড়ের বেগে ছুটে আসছে তিলকের দিকে। ধোঁয়া পাক খেতে খেতে জীবন্ত কোনো শিকারি প্রাণীর মতো তেড়ে আসছে। কুণ্ডলির সঙ্গে ভেসে আসছে ধূপ-ধুনোর গন্ধও। গন্ধটা একদিকে মনে অদ্ভুত শান্তি জাগাচ্ছে, অন্যদিকে কোনো অশুভ ইঙ্গিত বহন করছে।

তিলক লিম্বু বুঝতে পারল, যদি ধোঁয়ার কুণ্ডলির গতি থেমে না যায়, তবে মিনিটখানেকের মধ্যেই কুণ্ডলিটা তার কাছে পৌঁছে যাবে। আর একবার যদি কাছে পৌঁছে যায়, তাহলে ভয়ংকর কিছু ঘটবেই, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

তিলক বহু বছর ধরে পর্বতে পর্বতে ঘুরে বেড়িয়েছে, নানা বিপদের মুখোমুখি হয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই তিলক জানে, পর্বতের বুক থেকে বেরিয়ে আসা ধোঁয়া কখনোই আগুনের ধোঁয়া নয়। এই ধোঁয়া পর্বতের ভেতরে লুকিয়ে থাকা রহস্যময় শক্তির ইঙ্গিত।

অলৌকিক কিছু না হলেও, পর্বতের ফাটল থেকে ধোঁয়া বেরোনোর মানে হচ্ছে ভেতরে খনিজ পদার্থের চাপ জমে আছে। সেই চাপ যদি হঠাৎ বিস্ফোরণ ঘটে, তাহলে আশেপাশের কারোই বেঁচে থাকার সম্ভাবনা নেই।

কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে, বুঝতে পেরে তিলক লিম্বুর হাত-পা কাঁপছে। এতদিন এতটা উচ্চতায় থেকেও সে কখনো অক্সিজেন মাক্স ব্যবহার করেনি। তার ফুসফুস এতটাই শক্তিশালী যে, অতিরিক্ত অক্সিজেনের দরকারই হয়নি। অথচ এ মুহূর্তে সবকিছু বদলে যাচ্ছে। হঠাৎ করেই রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা কমে গেছে, বুকের ভেতর চাপ বাড়ছে, মাথা ঘুরছে।

তিলক জানে, তাঁবুর ভেতরে অক্সিজেন মাক্স রাখা আছে। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর শক্তি তার নেই। শরীরের প্রতিটি স্নায়ু ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়ছে, চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। দৃষ্টি শক্তিও ধীরে ধীরে অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে।

অক্সিজেন সংকট যদি আরও বেড়ে যায়, তবে তার পক্ষে এক মুহূর্তও দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব হবে না। বরফের ওপর কাত হয়ে পড়ে যাবে, আর একবার যদি পড়ে যায় তবে কখনোই উঠে দাঁড়াতে পারবে না। এই নির্মম সত্যটা তিলক লিম্বু ভালো করেই জানে।

তিলক জানে, যদি এই মুহূর্তে মুক্তি না পায় তবে মাছাপুচ্ছ্রের বুকেই হবে তার শেষ ঠিকানা। এই পর্বতের বরফের ভেতরেই মিলিয়ে যাবে তার অস্তিত্ব।

তিলক লিম্বু দাঁড়িয়ে থাকার চেষ্টা করছে। এদিকে ধোঁয়ার গতি আরও বেড়ে গেছে, ঝড়ের গতিতে সামনে এগিয়ে আসছে। ধোঁয়ার কুণ্ডলি কাছাকাছি আসতেই, এক ধরনের ফিসফিস শব্দ শুনতে পেল তিলক লিম্বু। শব্দটা অনেকটাই মন্ত্রোচ্চারণের মতো কানে লাগছে; এরই সঙ্গে ভেসে আসছে ধূপ-ধুনোর গন্ধও।

ধোঁয়া তিলক লিম্বুকে স্পর্শ করবে, এমনি সময় সেই লক্ষ্য করল কুণ্ডলির ভেতর থেকে একটা ছায়া ভেসে উঠছে। ছায়াটার আকৃতি সাধারণ কোনো মানুষের মতো নয়; ভিন্ন রকম।

ছায়ার একটা অংশ তিলকের দিকে হাত বাড়িয়ে দেওয়ার মতো করে এগিয়ে দিলো। তিলক লিম্বু সরে যেতে চাইলেও পারছে না। মনে হচ্ছে কাত হয়ে পড়ে যাচ্ছে বরফের ওপর। তথাপিও সে আপ্রাণ চেষ্টা করছে দাঁড়িয়ে থাকার।

ধোঁয়ার কুণ্ডলি যখন তিলক লিম্বুকে ঘিরে ধরেছে, ঠিক তখনই অদূরে বজ্রপাতের মতো প্রখর আলো ঝলসে উঠল। সেই আলোয় কুণ্ডলির ভেতরের ছায়া ভালোভাবে দেখতে পেল তিলক। অস্বাভাবিক ভয়ানক একটা ছায়ার অবয়ব দেখে তিলক আর স্থির থাকতে পারল না, হাঁসফাঁস করতে লাগল। এবার সে পরিষ্কার বুঝতে পারল সময় আর বেশি নেই, বিস্তৃত বরফের তলে হারিয়ে যাবে কয়েক মিনিটের মধ্যেই।

ধোঁয়ার কুণ্ডলির ভেতর দরজার মতো কী যেন একটা নড়ছে। দেখতে দেখতে সেই দরজার পাল্লা খুলে গেল। এবার শুনতে পেল দরজার ওপাশ থেকেই ভেসে আসছে মন্ত্রোচ্চারণের মতো শব্দ। শব্দটা অচেনা ভাষায় হলেও সুর মন্ত্রোচ্চারণের মতোই কানে লাগছে।

ধোঁয়ার ভেতরের মুখটাও এখন পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। অদ্ভুত এক পশুর প্রতিচ্ছবি ভেসে উঠল। প্রতিচ্ছবির দুচোখ জ্বলছে আগুনের মতো, অথচ সেই আগুনে কোনো উত্তাপ নেই; বরং শীতল হাওয়া ভেসে আসছে চোখের কঠোর থেকে।

তিলকের মনে পড়ল, শৈশবে গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠরা বলেছিলেন, ‘পর্বতের দেবতা কখনো কখনো ধূপ-ধুনোর গন্ধে আবির্ভূত হয়। সেই গন্ধ শান্তি বয়ে আনে, কেউ যদি দেবতার সতর্কবার্তা অমান্য করে, তবে সেই গন্ধই হয়ে ওঠে প্রাণহানির কারণ।’

তিলক নড়তে পারছে না। ধোঁয়ার ভেতর থেকে একটা শব্দ কানে এলো, ‘তুমি লোভী। লোভকে জয় করতে পারোনি। সতর্কবার্তা পেয়েও পর্বত থেকে নেমে যাওনি, অমান্য করেছ। ক্ষমার যোগ্য নও তুমি।’

ইতোমধ্যে তিলক লিম্বুর শরীর নিজের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। নিজের ইচ্ছায় আর কিছুই করতে পারছে না। চারপাশে শুধু ধূপ-ধুনোর গন্ধ আর অচেনা মন্ত্রের প্রতিধ্বনি শুনতে পাচ্ছে সে। এমনি সময় লক্ষ্য করল বরফের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা হাতের ছায়াটা ওকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। তিলক শেষবারের মতো চোখ তুলে তাকাল; দেখল ধোঁয়ার দরজা ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে আসছে। তিলক লিম্বুর শরীর শক্ত হয়ে গেল, পা বরফের সঙ্গে গেঁথে গেল। মুহূর্তের মধ্যেই ধোঁয়ার কুণ্ডলি তাকে পুরোপুরি গ্রাস করে ফেলল।

তারপর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই পর্বতের পরিবেশ শান্ত হয়ে গেল। চারপাশে যে ধোঁয়ার কুণ্ডলি ছড়িয়ে ছিল, সেগুলো মিলিয়ে গেল। যেন কিছুই ঘটেনি, সবকিছু আবার আগের মতো স্বাভাবিক হয়ে গেছে। বাতাসও স্বাভাবিকভাবে বইতে শুরু করল, আকাশও পরিষ্কার হয়ে গেল।

তাঁবুর ভেতরে তখনো সবাই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। দিনের ক্লান্তি তাদের শরীরকে অবশ করে দিয়েছে। ইখতিয়ার হামিমও একসময় ঘুমিয়ে পড়লেন। তাই কেউই টের পেল না বাইরে কী ভয়ংকর ঘটনা ঘটে গেছে।

/জেড-এস/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
তীব্র গ্যাস সংকট, কী বলছে তিতাস
তীব্র গ্যাস সংকট, কী বলছে তিতাস
প্রতারণার মামলায়ও তৌহিদ আফ্রিদির জামিন, মুক্তিতে বাধা নেই
প্রতারণার মামলায়ও তৌহিদ আফ্রিদির জামিন, মুক্তিতে বাধা নেই
ট্রাকের নিচে অটোরিকশা চাপা পড়ে প্রাণ গেলো ৩ জনের
ট্রাকের নিচে অটোরিকশা চাপা পড়ে প্রাণ গেলো ৩ জনের
‘আর্জেন্টিনা জিতেছে’ বলে রসিকতা: বিমানের ভেতরেই চরম ক্ষোভের মুখে পাইলট
‘আর্জেন্টিনা জিতেছে’ বলে রসিকতা: বিমানের ভেতরেই চরম ক্ষোভের মুখে পাইলট
সর্বাধিক পঠিত
সাবান-আইসক্রিমসহ চার প্রতিষ্ঠানের ৮ পণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ 
সাবান-আইসক্রিমসহ চার প্রতিষ্ঠানের ৮ পণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ 
জামায়াত এমপির ভিডিও ভাইরাল, জানা গেলো আসল ঘটনা 
জামায়াত এমপির ভিডিও ভাইরাল, জানা গেলো আসল ঘটনা 
মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানো ৪৯ রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স প্রত্যাহার
মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানো ৪৯ রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স প্রত্যাহার
এবার কাশিমপুর মহিলা কারাগারের জেল সুপার বদলি, জেলার বরখাস্ত
এবার কাশিমপুর মহিলা কারাগারের জেল সুপার বদলি, জেলার বরখাস্ত
সচিবালয়ে চাকরিতে যোগ দিতে এসে ৪ জন কারাগারে, কারণ কী   
সচিবালয়ে চাকরিতে যোগ দিতে এসে ৪ জন কারাগারে, কারণ কী