ঘরে ঢুকে মাহির আর নিলেশ হাঁপাতে লাগলেন। অন্যদিকে দরজায় আঁচড়ের শব্দ শুনে দলের সবাই আতঙ্কিত হয়ে উঠল।
মাহির সবার উদ্দেশে কাঁপা গলায় বললেন, ‘হিংস্র জানোয়ার আমাদেরকে তাড়া করছে, বাইরে দাঁড়িয়ে আছে এখনো।’
জানোয়ার তাড়া করেছে শুনে দলের সবাই ভয়ে কেঁপে উঠল। আতঙ্কে তারা স্থির হয়ে আছে, ঠিক তখনই কাঠের দরজায় হালকা টান পড়ল। শব্দ শুনে সবাই চমকে গেল। মনে হলো কেউ দরজা খুলতে চাইছে। জিগমে শেরপা বলল, ‘তাশি দাই এসেছেন...’
শেরপার মুখের কথা শেষ হওয়ার আগেই প্রদীপের শিখা দপ করে নিভে গেল। পুরো ঘরটা অন্ধকারে ডুবে গেল। সবাই এবার নড়েচড়ে বসল। শেরপাদের একজন তড়িঘড়ি করে টর্চ জ্বালাল।
বাইরে তখন প্রচণ্ড বেগে বাতাস বইতে শুরু করল। বাতাসের শব্দের সঙ্গে ভেসে আসছে অজানা কোনো আওয়াজ। দলের সবাই শুনতে চেষ্টা করছে, কেউ নিশ্চিত হতে পারছে না, ওটা কি শুধু বাতাসের শব্দ, নাকি কোনো হিংস্র পশুর গর্জন।
আবারও দরজায় আঁচড়ের শব্দ শোনা গেল। অনেকটাই নখ দিয়ে আঁচড় কাটার মতো শব্দ। শব্দটা শুনে ভয়ে সবার হৃৎস্পন্দন বেড়ে গেল।
সাহস করে সন্দীপ থাপা বললেন, ‘দরজাটা খুলে দেখি। জানোয়ার হলে লাঠিপেটা করে তাড়িয়ে দেব, এটা নিয়ে তোমরা কেউ টেনশন করো না। জানোয়ার তো ভালো, আমি ভূতও তাড়াতে জানি।’
জিগমে শেরপা প্রশ্ন করলেন, ‘এটা যে জানোয়ার, তা তুমি নিশ্চিত হলে কীভাবে?’
সন্দীপ থাপা জোর দিয়ে বললেন, ‘দরজায় আঁচড় কাটার শব্দ শুনেই তো বুঝা যাচ্ছে, এটা জানোয়ারের কাজ। হতে পারে হিমালয়ান ভালুক। এখানকার ভালুকগুলো খুব পাজি, শিকারের গন্ধ ফেলে সহজে পিছু ছাড়ে না।’
সন্দীপ থাপার কথায় কেউ কোনো উত্তর দিলো না। সে সময় দরজায় আবার জোরে টান পড়ল। কাঠের কপাট কেঁপে উঠল, যেন বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা কেউ ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করছে।
সবার বুক ধড়ফড় করছে; টর্চের আলোয় মুখ ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে। কিছুক্ষণ পর আঁচড়ের শব্দও থেমে গেল। মাহির বললেন, ‘শব্দটা হঠাৎ থেমে গেল কেন, জানোয়ারটা পালিয়েছে নাকি?’
নিলেশ বললেন, ‘হয়তো ওত পেতে আছে, সুযোগ পেলেই ঝাঁপিয়ে পড়বে।’
ঠিক সেই মুহূর্তে দরজার ফাঁক দিয়ে ঠান্ডা বাতাস ঢুকে পড়ল। বাতাসের সঙ্গে ভেসে এলো এক অস্বস্তিকর গন্ধ। গন্ধটা পচে যাওয়া কোনো প্রাণীর দেহ থেকে ছড়িয়ে পড়ছে—তীব্র আর ভীষণ অস্বস্তিকর। সবাই নিশ্বাস আটকে তাকিয়ে রইল দরজার দিকে।
জিগমে শেরপা টর্চের আলো দরজার উপর ফেলতেই দেখা গেল কপাটের নিচে কিছু একটা নড়ছে। আলো কাঁপতে কাঁপতে সেই অদৃশ্য বস্তুটিকে ছুঁয়ে গেল, কিন্তু ঠিক কী সেটা বোঝা গেল না।
সন্দীপ থাপা বললেন, ‘এটা জানোয়ারের ছায়া নয়... মানুষের মতো লাগছে।’
মাহির বললেন, ‘যদি মানুষ হয়, তাহলে নিশ্চয়ই তাশি দাই? এছাড়া অন্ধকারে এখানে কারো আসার কথা নয়!’
সবাই চুপচাপ রইল, কারো সাহস হলো না আর দরজা খোলার। সেই মুহূর্তে দরজার ওপাশ থেকে পরিচিত কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, ‘দরজাটা খোলো।’
সবার বুক ধড়ফড় করে উঠল। তাশি থাকালির কণ্ঠস্বর শুনেও কেউ দরজা খুলতে চাইছে না। জিগমে শেরপা তো বলেই ফেলল, ‘এখন দরজা খোলা যাবে না। এটা তাশি দাই না। তার কণ্ঠস্বর নকল করে অশরীরা প্রতারণা করার চেষ্টা করছে।’
মাহির বললেন, ‘অশরীরী! সেই কথা আসছে কেন আবার। কিছুক্ষণ আগে স্পষ্ট শুনলাম হিংস্র প্রাণীর গর্জন আর এখন তাশি দাইর কণ্ঠস্বর আর তুমি বলছ ভূত-প্রেত। এসব বাদ দিয়ে দরজাটা খোল, তাশি দাইকে ঘরে আসতে দাও।’
নিশ্চিত হয়েও দরজা খোলার সাহস হয়নি কারোই। সবাই পাঠাতনের উপর বসে রইল। দরজার বাইরে থেকে আবারও সেই কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, ‘দরজাটা খোল, আমি তাশি থাকালি। তোমাদের ভয় নেই আমি এসে গেছি।’
দরজা খুলতে ইতস্তত করছিলেন শেরপারাও। হঠাৎ করেই দরজায় কড়কড় শব্দ হলো, মনে হলো কেউ বাইরে থেকে জোরে চাপ দিচ্ছে। মুহূর্তেই দরজাটা এক ঝটকায় খুলে গেল। সবাই হতবাক হয়ে দেখল তাশি থাকালি নিজেই দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকেছেন।
তাদের বিস্ময় আরও বেড়ে গেল, কারণ দরজায় শক্ত করে খিড়কি লাগানো ছিল। অথচ তিনি প্রচণ্ড শক্তি প্রয়োগ করে এক ঝটকায় তা খুলে ফেললেন।
তাশি থাকালি ভেতরে ঢুকতেই দলের সবাই হাঁ করে তাকিয়ে রইল। টর্চের আলো তার মুখে পড়তেই আর কোনো সন্দেহ রইল না—সত্যিই তিনি তাশি থাকালি।
সন্দীপ থাপা কাঁপা গলায় বললেন, ‘তুমি সত্যিই তাশি দাই?’
তাশি থাকালি এগিয়ে এসে বললেন, ‘হ্যাঁ, আমি তাশি থাকালি। জানোয়ারের গর্জন শুনে দ্রুত চলে এসেছি। তোমরা দরজা খুলতে চাইছিলে না, তাই নিজেই ঠেলে ঢুকলাম।’
সবার বুকের ধড়ফড় কমে এলো। নিলেশ জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি একা এসেছো দাই? আর কেউ নেই সঙ্গে?’
তাশি থাকালি মাথা নেড়ে বললেন, ‘সঙ্গে কেউ নেই, একাই এসেছি। এতক্ষণ পর্বতের ঢালে দাঁড়িয়ে ছিলাম, তাই দ্রুত চলে আসতে পেরেছি। আরেকটু দেরি হলে তোমরা বিপদে পড়তে।’
ঘরে ঢুকেই তাশি থাকালি নিজের হাতে প্রদীপটা জ্বালালেন। প্রদীপের ক্ষীণ আলোয় ঘরটা আলোকিত হয়ে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে শেরপারা তাদের টর্চ নিভিয়ে ফেলল। কারণ সবাই জানে মাছাপুচ্ছ্রের গন্তব্যে পৌঁছানো পর্যন্ত কোনো ধরনের অপচয় করা যাবে না। আলো, খাবার, অক্সিজেন—সবকিছুই সীমিত। তাই অভিযাত্রীরা প্রতিটি জিনিস খুব হিসাব করে ব্যবহার করছে।
পর্বতারোহণের জগতে একটি অলিখিত নিয়ম আছে, যা সবাই মেনে চলে; মিতব্যয়ী হতে হবে। কারণ পকেট ভর্তি টাকা থাকলেও কোনো কিছু কেনার সুযোগ নেই উপরে। মূলত বেসক্যাম্প থেকেই প্রতিটি জিনিস অমূল্য হয়ে ওঠে। সামান্য অসতর্কতা বা অপচয়ও বড় বিপদের কারণ হতে পারে। তাই সবাই একে অপরকে বারবার মনে করিয়ে দেয়, সবকিছু যত্ন করে ব্যবহার করতে।
কেউ যদি অযথা টর্চ জ্বালিয়ে রাখে, সঙ্গে সঙ্গে অন্যরা তাকে সতর্ক করে দেয়। কারণ টর্চের ব্যাটারি শেষ হয়ে গেলে অন্ধকারে পথ চলা অসম্ভব হয়ে পড়বে। খাবারের সময়ও সবাই খুব সাবধানে থাকে। একটুও নষ্ট না করে বাড়তি খাবার সবাই ভাগ করে খেয়ে ফেলে। পর্বতের চূড়ায় খাবার পাওয়া যায় না, তাই সামান্য খাবারও সেখানে জীবন বাঁচানোর মতো মূল্যবান হয়ে ওঠে।
সবচেয়ে বেশি সতর্কতা থাকে অক্সিজেনের বোতল নিয়ে। শেরপারা বোতল খোলার সময় বিশেষভাবে নজর রাখে, যাতে একটুও অপচয় না হয়। কারণ অক্সিজেনই সেখানে বেঁচে থাকার একমাত্র ভরসা। একফোঁটা অপচয় মানে জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলা।
এই ভাবেই পর্বতারোহীরা একে অপরকে সতর্ক করে মিতব্যয়ী হতে। এই নিয়ম মানা শুধু দায়িত্ব নয়, বেঁচে থাকার একমাত্র উপায়। পর্বতের চূড়ায় প্রকৃতি এতটাই কঠিন যে, সামান্য ভুলেও প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। তাই অভিযাত্রীরা জানে শৃঙ্খলা আর মিতব্যয়িতা ছাড়া তারা কখনোই গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবে না।
তাশি থাকালি বললেন, ‘পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করো। আমি তোমাদের জন্য ফলের জুস নিয়ে আসছি।’
মাহির কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, তার আগেই তিনি দরজা ঠেলে বাইরে চলে গেলেন।
তামাং শেরপা বলল, ‘কী ঝামেলায় পড়লাম! খাবার তো দিচ্ছে না, মানুষটাও সামনে থাকছেন না।’
সন্দীপ থাপা সন্দেহ প্রকাশ করলেন, ‘পর্বতে অনেক সময় তান্ত্রিকরা ঘোরাফেরা করে। এই বৃদ্ধও তেমন কেউ কিনা কে জানে! তার আচরণ আমার ভালো লাগছে না। আমি তাকে অনুসরণ করব। তোমাদের মধ্যে কারো সাহস থাকলে আমার সঙ্গে চলো। না হলে আমি একাই যাচ্ছি। কেউ যাবে? গেলে দেরি করো না। দ্রুত চলো পিটিয়ে সব সোজা করে দেব। আমাকে চেনে না কেউ। আমি ধমক দিয়ে পাথরও গলিয়ে দিতে পারি।’
তামাং শেরপাও মোটামুটি সাহসী। সে বলল, ‘আমি যাবো। একটু দাঁড়াও, সঙ্গে টর্চ আর ছুরি নিতে হবে।’
প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে সাহস করে দুজন দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ল। রাগ আর উত্তেজনায় তারা ভুলে গেল যে অন্ধকারে অচেনা একজন মানুষকে অনুসরণ করা কতটা বিপজ্জনক হতে পারে।
বাইরে এসে তারা এদিক-ওদিক তাকিয়ে বৃদ্ধকে খুঁজল। বৃদ্ধ আশে পাশে কোথাও নেই, মুহূর্তেই তিনি হাওয়া হয়ে গেছেন। দুজন কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর তারা ঘর ছেড়ে সামনে এগোতে শুরু করল। হাঁটতে হাঁটতে তারা অনুভব করল, চারপাশের অন্ধকার আরও ঘন হয়ে উঠছে। টর্চের আলোয় পথ দেখা যাচ্ছে বটে, তবে সেই আলোয় অন্ধকারকে আরও ভয়ানক করে তুলছে।
একসময় সন্দীপ থাপা লক্ষ্য করল টর্চের আলোয় দুজনের ছায়া লম্বা হয়ে নিজের মতো করে নড়ছে। কখনো সামনে এগোচ্ছে, কখনো আবার পিছিয়ে যাচ্ছে। তা দেখেই দুজন চমকে উঠলেন। নিয়ম হচ্ছে, বিপরীত থেকে আলো পড়লে ছায়া দেখা যাবে অথচ এখন উলটো দেখছে। বিষয়টা খেয়াল করেও তারা থামল না। আঁকাবাঁকা পথ ধরে অন্ধকারে এগিয়ে চলল।
তামাং শেরপা বলল, ‘সবকিছু কেমন জানি অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে দাই।’
সন্দীপ থাপা উত্তর দিলেন, ‘ভয় পেও না। থেমে গেলে বিপদ আরও বাড়বে। এই অবস্থায় কথা বলতে নেই; বিপদ বাড়ে।’
দুজন এগোতে লাগল। বাতাসে ভেসে আসছে পশুর গর্জন। সন্দীপ থাপা ফিসফিস করে বললেন, ‘জানোয়ারটা বোধহয় আমাদের পিছু নিয়েছে! পায়ের শব্দ শুনতে পাচ্ছি। তুমি কি শুনতে পাচ্ছ?’
তামাং জবাব দিলো, ‘হ্যাঁ, শুনতে পাচ্ছি।’
সন্দীপ থাপা টর্চ ঘুরিয়ে ডানে বামে দেখলেন। কিছুই দেখতে পায়নি আর। তখনই দূর থেকে ধাতব শব্দের মতো এক ধরনের শব্দ তাদের কানে ভেসে এলো। অনেকটাই পুরোনো দরজা খোলার মতো কড়কড় আওয়াজ হলো। তার ওপর জঙ্গল থেকে ভেসে আসতে লাগল হিমালয়ান প্যাঁচা ‘ব্রাউন উড আউল’-এর ডাক। দুয়ের দুই ধরনের আওয়াজ শুনে তাদের বুক ধড়ফড় করে উঠল।
সন্দীপ থাপা ভয়ে ভয়ে বললেন, ‘এখানে বোধহয় আরেকটা বাড়ি আছে। তাশি দাই মনে হচ্ছে ওখানেই আছেন। নিশ্চয়ই তার সঙ্গে অন্য কেউ আছে, যার জন্যই বলেছেন, তোমাদের জন্য জুস নিয়ে আসছি।’
তামাং শেরপা কথা বলছে না। তার হাত-পা কাঁপছে, সেই সঙ্গে কাঁপছে টর্চের আলোটাও। তবে রহস্যজনক হলেও সত্য, আলোটা অন্ধকার ভেদ করতে পারছে না। তার ওপর মনে হচ্ছে কয়েক জোড়া চোখ তাদের দিকে তাকিয়ে আছে। কথাটা তামাং শেরপা নিচুস্বরে সন্দীপ থাপাকে জানিয়েছেও।
এদিকে হঠাৎ বাতাস যেন উন্মত্ত হয়ে উঠল। প্রবল ঝাপটায় চারপাশ কেঁপে উঠছে। টর্চের আলো একবার ডানে ছুটে যাচ্ছে, আবার বামে দুলে উঠছে, মনে হচ্ছে অদৃশ্য কোনো হাত আলোটাকে নিয়ন্ত্রণ করছে।
সন্দীপ থাপা বললেন, ‘এখান থেকে দ্রুত সরে যেতে হবে। জায়গাটা নিরাপদ নয়।’
তামাং শেরপা কাঁপা গলায় উত্তর দিলো, ‘শব্দটা তো স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি, পুরোনো দরজা খোলার মতো। যদি এখানে কোনো বাড়ি-ঘর থাকে, সেখানে হয়তো আশ্রয় পাওয়া যাবে। তাশি থাকালির বাড়ির চেয়ে উত্তম হতে পারে।’
কয়েক কদম অগ্রসর হতেই ক্ষীণ একটা আলোর রেখা তাদের নজরে পড়ল। আলোটা স্থির নয়, প্রদীপের শিখার মতো কাঁপছে।
সন্দীপ থাপা বললেন, ‘চলো, আলোটার কাছাকাছি যাই, দেখে আসি কে আছে ওখানে। হয়তো তাশি দাই থাকতে পারেন।’
তারা যতই কাছে এগোচ্ছে, আলো ততই স্পষ্ট হচ্ছে। আলোটা স্থির হয়ে আছে। তার মানে এটা কারো জ্বালানো প্রদীপ।
তামাং শেরপা বলল, ‘আমি নিশ্চিত ওখানে কেউ আছে, চলো সামনে এগিয়ে যাই।’
তারা কয়েক পা সামনে ফেলতেই অন্ধকারের ভেতর থেকে ভেসে এলো তাশি থাকালির কণ্ঠস্বর ‘তোমরা কেন এসেছো? আমি তো বলেছিলাম, জুস নিয়ে আসব।’
কণ্ঠস্বর শুনে দুজন চমকে উঠল। সন্দীপ থাপা সাহস করে বললেন, ‘কে ওখানে, তাশি দাই?’
‘হ্যাঁ, কাছে এসো।’
এরই মধ্যে প্রদীপের আলোটা দূরে সরে যেতে লাগল, মনে হচ্ছে কেউ আলো হাতে নিয়ে তাদের সামনে দিয়ে হেঁটে চলে যাচ্ছে।
তামাং শেরপা জিজ্ঞেস করল, ‘দাই, আমরা কী আলোটাকে অনুসরণ করব?’
সন্দীপ থাপা বললেন, ‘হ্যাঁ, তবে সাবধানে। যদি এটা ফাঁদজাতীয় কিছু হয়, তাহলে দুজনই বিপদে পড়ব।’
তাশি থাকালি আবার তাড়া দিলেন, ‘এসো, আমার আরেকটা হোমস্টে আছে। সেখানে থাকতে পারবে তোমরা। যদি ভালো লাগে, সবাইকে এখানে নিয়ে আসব।’
কয়েক মিনিট হাঁটার পর তারা পৌঁছল একটি পুরোনো কাঠের ঘরের সামনে। এই ঘরটাও পরিত্যক্ত, দরজাটা সামান্য ভেড়ানো। ঘরের ভেতর থেকে অদ্ভুত নীলাভ আলো বেরিয়ে আসছে।
সন্দীপ থাপা দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলেন। তামাং শেরপা তার পেছন পেছন এলো। ভেতরে ঢুকেই তারা থমকে গেল। চোখ কপালে উঠল, একি তাশি থাকালি এখানে বসে আছেন! কিছুক্ষণ আগেই তো তিনি তাদের সামনে দিয়েই হেঁটেছেন।
প্রদীপের আলোয় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে তাশি থাকালি শান্তভাবে বসে আছেন। তার চারপাশে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকটি মানুষাকৃতি ছায়া। ওদের শরীর অস্পষ্ট, মুখগুলো অন্ধকারে ঢাকা, শরীরের কোনো অবয়ব বোঝা যাচ্ছে না। শুধু চোখ—অস্বাভাবিকভাবে জ্বলজ্বল করছে।
সন্দীপ থাপা বললেন, ‘এরা কারা? মানুষ, না কী অন্য কিছু?’
তামাং শেরপা বলল, ‘আমি চোখ ছাড়া কিছুই দেখতে পাচ্ছি না। মনে হচ্ছে অন্ধকারের ভেতর থেকে আমাদের দিকে কেউ তাকিয়ে আছে।’
এমন সময় বৃদ্ধ তাদের দিকে রহস্যময় ভঙ্গিতে তাকিয়ে বললেন, ‘এসে ভালোই করেছ। তোমরা এখন থেকে এই ঘরেই থাকবে।’
কথা শুনে সন্দীপ থাপা ভড়কে গেলেন। তামাং শেরপা চারপাশে তাকাতে লাগল। সে দেখতে পেল মানুষগুলো নড়ছে না, তবে নীরবে তাদের দিকে তাকিয়ে আছে।
সন্দীপ থাপা পরিষ্কার বুঝতে পারলেন, এই ঘরটা সাধারণ কোনো ঘর নয়। এখানে এমন কিছু আছে যা চোখে পরিষ্কার দেখা যায় না, তবে অনুভব করা যায়। দুজন উপলব্ধি করছে অশরীরী কোনো শক্তি তাদের ঘিরে রেখেছে। তারা বুঝতে পেরেছে এখন শুধু জানোয়ারের ভয় নয়, বরং রহস্যময় কিছুর ভেতরে ঢুকে পড়েছে।
ছায়াকৃতির মানুষগুলো কাছে এগিয়ে আসছে। ওদের চোখের জ্বলজ্বলে আলো আরও তীব্র হয়ে উঠল। সন্দীপ থাপা আর তামাং শেরপা চোখে চোখ রেখে বুঝাল এখান থেকে পালিয়ে যেতে হবে।
সন্দীপ থাপা বললেন, ‘তাশি দাই আমরা এই ঘরে থাকতে পারব না। ওখানেই সবাই একসাথে থাকব।’
তাশি থাকালি উচ্চৈঃস্বরে হেসে উঠলেন। সেই হাসির শব্দ এতটাই উচ্চৈঃস্বরে ছিল যে, তাতে কারোই মনে হয়নি এটা আশি বছরের একজন বৃদ্ধের হাসি। অনেকটাই অস্বাভাবিক হাসি হাসছেন তিনি। বৃদ্ধ প্রদীপ উঁচু করে বললেন, ‘ফিরে যাওয়ার পথ নেই। এটাই এখন তোমাদের ঠিকানা।’
তার কথা শেষ হতেই ছায়াকৃতির মানুষগুলো নিঃশব্দে দুজনকে ঘিরে ফেলল। মুহূর্তেই চারপাশে প্রচণ্ড বেগে দমকা হাওয়া বইতে শুরু করল। বাতাসের তীব্রতায় ঘর কেঁপে উঠল, আর প্রদীপের ক্ষীণ শিখা নিভু নিভু করে অন্ধকারের ইঙ্গিত দিলো।
তামাং শেরপা কাঁপা গলায় বললেন, ‘সন্দীপ দাই, দেরি করো না, পিছনে দৌড়াও।’
এমনি সময় বাইরে থেকে ভেসে এলো পরিচিত কণ্ঠস্বর, ‘তোমরা দ্রুত বেরিয়ে এসো!’
দুজন চমকে উঠল। এটাও তো তাশি থাকালি কণ্ঠস্বর! এবার বুঝতে পারল, ভেতরে যে বৃদ্ধ বসে আছে, তিনি আসল তাশি থাকালি নয়। মুহূর্তের মধ্যে সাহস সঞ্চয় করে তারা দরজার দিকে ছুটল। ছায়াকৃতির মানুষগুলো তাদের আটকে দিতে চাচ্ছে; পারছে না টর্চের আলোর ছড়িয়ে পড়ায়। ফলে পথ ফাঁকা হয়ে গেছে খানিকটা।
দুজন দরজা ঠেলে বাইরে বেরিয়ে এলো। বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন আসল তাশি থাকালি। তিনি দ্রুত দরজাটা টেনে বন্ধ করে দিলেন। দরজা টানার মুহূর্তে ভেতর থেকে ভেসে এলো পশুর গর্জন। শব্দটা এতই জোরে ভেসে এলো যে তাতে দরজার কপাটও কেঁপে উঠল।
তাশি থাকালি হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, ‘এটা কোনো সাধারণ ঘর নয়। বহু বছর আগে এখানে এক তান্ত্রিকের মৃত্যু হয়েছিল। তার আত্মা এখনো ঘরটাকে আঁকড়ে আছে। তোমরা ভাগ্যবান যে বেঁচে ফিরেছো। আমি যথা সময়ে না এলে চিরকাল এই ঘরে বন্দি থাকতে হতো তোমাদেরকে।’
সন্দীপ থাপা হতবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কে! তুমিও কী...’
অন্ধকারে তার দিকে তাকিয়ে তাশি থাকালি বললেন, ‘সে কথা পরে হবে। এখন সময় নেই। আগে এখান থেকে তাড়াতাড়ি চলে এসো।’









