লামার্ক : ভুল তত্ত্বের কবি, বিবর্তনের অকালপ্রসূ ভবিষ্যদ্রষ্টা 

রিটন খান 
রিটন খান 
১৬ এপ্রিল ২০২৬, ১৫:০৪আপডেট : ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ১৫:৫৪

এক সময় জীববিজ্ঞানের ইতিহাসে জাঁ-বাতিস্ত লামার্কের নাম উচ্চারিত হতো খানিক ভুল করা কিন্তু দূরদর্শী এক মানুষের মতো। তিনি অজ্ঞ ছিলেন না। বরং অনেকের আগে তিনি বুঝেছিলেন, জীবজগৎ স্থির নয়, বদলায়। আজ এই কথা সাধারণ সত্য মনে হয়। কিন্তু আঠারো ও উনিশ শতকের সন্ধিক্ষণে এটি মোটেই সহজ কথা ছিল না। তখন প্রকৃতিকে অনেকে ঈশ্বরের তৈরি এক অপরিবর্তনীয় ব্যবস্থা বলে ভাবতেন। জীবদেরও দেখা হতো তৈরি করা সত্তা হিসেবে, যাদের নিজস্ব ভূমিকা খুব সীমিত। লামার্ক এই ধারণার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে বললেন, জীবন নিজে সক্রিয়। তা পরিবেশের সঙ্গে সংঘাতে জড়ায়, নিজেকে বদলায়, এবং নিজের রূপও নতুন করে গড়ে তোলে। এই ভাবনার মধ্যেই ছিল বড় ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক ঝাঁকুনি।

সমস্যা হলো, বিজ্ঞান কল্পনার জন্য পুরস্কার দেয় না। শেষ পর্যন্ত সে দেখে, যুক্তি কাজ করছে কিনা। লামার্কের প্রধান ধারণা ছিল, জীবদেহ জীবনের মধ্যে যা অর্জন করে, তার কিছু সন্তানের মধ্যে চলে যেতে পারে। যেমন, জিরাফ বারবার উঁচু পাতায় পৌঁছাতে গলা বাড়াতে বাড়াতে লম্বা গলা তৈরি করেছে, এবং সেটাই পরের প্রজন্মে গেছে। এখন আমরা জানি, বিষয়টি এভাবে ঘটে না। জিরাফের গলা লম্বা হয়েছে জন্মগত পার্থক্যের কারণে। যাদের গলা একটু বড় ছিল, তারা বেশি খাবার পেয়েছে, বেশি টিকে থেকেছে, এবং বেশি বংশবিস্তার করেছে। এখানেই চার্লস ডারউইনের গুরুত্ব। তিনি পরিবর্তনের ধারণাকে ব্যাখ্যা করেছেন একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। প্রকৃতি কীভাবে নির্বাচন করে, সেটি তিনি স্পষ্টভাবে দেখিয়েছেন। লামার্ক পরিবর্তনের কথা বলেছিলেন। ডারউইন দেখিয়েছেন, সেই পরিবর্তন কীভাবে ঘটে।

প্রখ্যাত ফরাসি সৈনিক, প্রকৃতিবিদ ও শিক্ষাবিদ জাঁ-বাতিস্ত লামার্ক

তবু লামার্ককে পুরোপুরি বাতিল করা ঠিক নয়। কারণ ভুল ব্যাখ্যা দিয়েও তিনি সঠিক প্রশ্ন তুলেছিলেন। তাঁর মূল কথা ছিল, বেঁচে থাকা মানেই সক্রিয় থাকা। জীবন শুধু টিকে থাকা নয়। তা প্রতিক্রিয়া জানায়, নতুন কিছু গড়ে তোলে, এবং নিজের অবস্থাও বদলায়। আজকের ভাষায় বললে, তিনি জীবকে স্থির কোনো কাঠামো হিসেবে দেখেননি। বরং এমন এক সিস্টেম হিসেবে দেখেছেন, যা পরিবেশের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ায় নিজেকেও পরিবর্তন করে। আঠারো শতকের প্রেক্ষাপটে এই ধারণা সাধারণ ছিল না। তখন ইউরোপে বিপ্লব, সাম্রাজ্য, যুক্তিবাদ, এবং প্রাকৃতিক ইতিহাস নিয়ে এক জটিল বৌদ্ধিক পরিবেশ তৈরি হচ্ছিল। এই অবস্থায় লামার্ক বললেন, জীবনের ভেতরেই পরিবর্তনের শক্তি আছে। এই কথা ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গিকে অস্বস্তিতে ফেলেছিল। একই সঙ্গে কঠোর যান্ত্রিক ব্যাখ্যাতেও প্রশ্ন তুলেছিল।

এখানেই ক্যাথরিন রিসকিনের বইটির আকর্ষণ। তিনি লামার্ককে শুধু ভুল প্রমাণিত এক তাত্ত্বিক হিসেবে দেখেন না। বরং তাঁকে তাঁর সময়ের বৌদ্ধিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে বসান। বইটিতে আসে বোটানিক্যাল গার্ডেন, শুরুর দিকের চিড়িয়াখানা, ফরাসি বিজ্ঞানীদের পারস্পরিক দ্বন্দ্ব, প্রাণী ও উদ্ভিদ নিয়ে নতুন কৌতূহল। উদ্ভিদের যৌনতা, হাতির আবেগ, জিরাফের আচরণ—এসব বিষয় আলোচনায় যুক্ত হয়। ফলে বইটি নিছক তথ্যভিত্তিক বিবরণে আটকে থাকে না। এখানে ইতিহাসকে গল্পের মতো করে দেখা হয়েছে। যেন একজন গবেষক অতীতের বিজ্ঞানচর্চার ভেতরের উত্তেজনা দেখাচ্ছেন। তাঁর লেখায় হালকা রসিকতা আছে। কিছুটা শৈল্পিক ভঙ্গিও আছে। এতে বোঝা যায়, কোনো সময়কে বুঝতে শুধু তথ্য জানলেই হয় না। তার ভাব ও ভাষাও ধরতে হয়।

অধ্যাপক জেসিকা জি. রিসকিন

রিসকিনের বড় অবদান, তিনি দেখান লামার্কের চিন্তা আলাদা করে তৈরি হয়নি। সেটি তাঁর সময়ের পরিবর্তনশীল প্রাকৃতিক ইতিহাসের ভেতর থেকেই এসেছে। এর আগে প্রাণীদেরকে দেখা হত প্রায় নিষ্ক্রিয় বস্তু হিসেবে। তারা আছে, কিন্তু নিজেরা কিছু করে না। ঈশ্বর বা কোনো বৃহৎ পরিকল্পনা তাদের চালায়। প্রাণীরা যেন শুধু দেহ, নিজস্ব উদ্যোগ নেই। লামার্ক এই ধারণা বদলে দেন। তিনি বলেন, ক্ষুদ্রতম জীবও সক্রিয়। জীবন নিজেই এক ধরনের এজেন্সি বহন করে। আজ এই কথা সাধারণ মনে হতে পারে। কিন্তু তখন এটি প্রচলিত চিন্তায় বড় ধাক্কা দিয়েছিল। যেমন এক সময় বলা হত, ইতিহাস তৈরি হয় উপরের শক্তি থেকে। পরে বোঝা গেল, সাধারণ মানুষও ইতিহাস গড়ে। প্রকৃতির ক্ষেত্রেও লামার্ক একই কথা বলেছিলেন।

তাঁর ব্যক্তিগত জীবনও কম জটিল নয়। নাম শুনলে এক আরামপ্রিয় ফরাসি অভিজাতের ছবি ভেসে ওঠে। কিন্তু বাস্তব ছিল ভিন্ন। ছিল সংগ্রাম, পেশাগত অনিশ্চয়তা, এবং বয়সের পরে নিজেকে নতুন করে গড়ে নেওয়ার চেষ্টা। প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতির চেয়ে তাঁর জীবনে ছিল বেশি পরিশ্রম। তিনি উদ্ভিদবিদ্যা ছেড়ে এমন এক বিষয় নিলেন, যা তখন তেমন গুরুত্ব পেত না। পোকামাকড় ও কৃমি নিয়ে অধ্যাপনা। অনেকের চোখে এটি ছিল অবহেলিত ক্ষেত্র। কিন্তু সেখানেই তিনি ‘অমেরুদণ্ডী’ ধারণাটি সামনে আনেন। এই কাজ থেকেই তাঁর জীবনের ধারণা নতুন দিক পায়। এখানে একটি সাধারণ শিক্ষা হলো, যে বিষয়কে আমরা তুচ্ছ ভাবি, সেটিই পরে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। আজও দেখা যায়, যেসব গবেষণা শুরুতে গুরুত্ব পায় না, সেখান থেকেই নতুন চিন্তার পথ খুলে যায়।

এখন আসা যাক সেইস্থানে, যেখানে বইটি একটু বাড়তি আগ্রহ দেখায়। রিসকিন লামার্কের ‘অর্জিত বৈশিষ্ট্যের উত্তরাধিকার’ ধারণাকে আধুনিক এপিজেনেটিক্সের সঙ্গে মিলিয়ে দেখেন। এখানে আংশিক সত্য আছে, আবার কিছু বাড়াবাড়িও আছে। সত্যিটা হলো, আধুনিক জীববিজ্ঞান দেখিয়েছে কিছু অভিজ্ঞতা পরবর্তী প্রজন্মকে প্রভাবিত করতে পারে। বিশেষ করে গর্ভাবস্থার পরিবেশ, রাসায়নিক প্রভাব, পুষ্টি, বা ট্রমা জিনের কাজকর্মে প্রভাব ফেলে। ডিএনএ-র গঠন বদলায় না, কিন্তু কোন জিন সক্রিয় হবে বা নিষ্ক্রিয় থাকবে, সেটি বদলাতে পারে। ধরা যাক, এক প্রজন্মের ইঁদুর চাপের মধ্যে ছিল। তার প্রভাব পরের প্রজন্মের শরীরেও দেখা যেতে পারে। এখানেই অনেকেই ভাবেন, লামার্কের ধারণা কি আবার ফিরে এলো?

না, তিনি ফিরে আসেননি। যতটা মিল আছে, তা নামের মিলের মতো, মূল ধারণার নয়। এপিজেনেটিক্স দেখায়, কিছু অভিজ্ঞতা পরবর্তী প্রজন্মে সামান্য প্রভাব ফেলতে পারে। কিন্তু তা ডারউইনের কাঠামো ভেঙে দেয় না। জিনের ভাষা দীর্ঘ সময়ে বিবর্তনের প্রধান নকশা তৈরি করেছে। এপিজেনেটিক্স সেই নকশার পাশে ছোট কিছু পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয় মাত্র। এর গুরুত্ব আছে, বিশেষ করে চিকিৎসাবিদ্যা ও বিকাশজীববিদ্যায়। কিন্তু জীববৈচিত্র্যের বড় প্রশ্নগুলো ব্যাখ্যা করতে এখনও ডারউইনীয় নির্বাচন, জিনগত মিউটেশন, জেনেটিক ড্রিফট, এবং অন্যান্য বিবর্তনীয় প্রক্রিয়াই প্রধান ভরসা। লামার্কের ধারণা এখানে মূল ব্যাখ্যা নয়, বরং সীমিত এক প্রাসঙ্গিকতা।

বইয়ের সমর্থকেরা অনেক সময় এমনভাবে কথা বলেন যেন ডারউইন কেবল ঠান্ডা যুক্তির মানুষ, আর লামার্ক প্রাণের কণ্ঠস্বর। এতে গল্প তৈরি হয়, কিন্তু বাস্তবতা সহজ নয়। বিজ্ঞানের ইতিহাস নৈতিক গল্প নয়, যেখানে ভালো আর খারাপ দিয়ে বিচার হয়। লামার্ক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছিলেন। তিনি জীবকে সক্রিয় সত্তা হিসেবে দেখেছিলেন। পরিবর্তনের গুরুত্বও ধরেছিলেন। এতে তাঁর সাহস বোঝা যায়। কিন্তু সাহস মানেই সঠিকতা নয়। কোনো ধারণার এক অংশ ঠিক হতে পারে, আরেক অংশ ভুল। প্রথমটির জন্য কৃতিত্ব দেওয়া যায়। দ্বিতীয়টির ক্ষেত্রে আপত্তি জানাতেই হয়। বিজ্ঞান এভাবেই এগোয়।

লামার্ক : ভুল তত্ত্বের কবি, বিবর্তনের অকালপ্রসূ ভবিষ্যদ্রষ্টা 

রিসকিনের বইয়ের বড় শক্তি হলো, তিনি লামার্ককে তাঁর সময়ের কেন্দ্রে এনে দেখান। কিন্তু এখানেই সীমাবদ্ধতাও আছে। অনেক সময় মনে হয়, তিনি ঐতিহাসিক গুরুত্ব আর তাত্ত্বিক সঠিকতাকে এক করে দেখছেন। বাস্তবে এই দুই এক নয়। ইতিহাসে কেউ গুরুত্বপূর্ণ হন কারণ তিনি ঠিক ছিলেন। আবার কেউ গুরুত্বপূর্ণ হন কারণ তাঁর ভুল ভবিষ্যতের সঠিক পথ খুলে দেয়। লামার্ক এই দ্বিতীয় দলে পড়েন। তাঁকে ছোট করে দেখা ঠিক নয়। তাঁর কাজকে হালকাভাবে উড়িয়ে দিলে তা অজ্ঞতার লক্ষণ। আবার তাঁকে সম্পূর্ণ সঠিক বলা আরও বড় সরলীকরণ। তাই তাঁকে বুঝতে হলে এই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়াতে হয়।

এই কারণে লামার্ককে ডারউইনের পাশে রাখা যুক্তিসংগত। তবে সেই অবস্থানকে শেষ পরিণতি ভাবা ঠিক নয়। ইতিহাসে ছায়া মানেই অনুপস্থিতি নয়। অনেক সময় ছায়াই মূল দৃশ্যকে স্পষ্ট করে। লামার্ককে ছাড়া ডারউইনের কাজও পুরো বোঝা যায় না। লামার্ক মনে করিয়ে দেন, বিজ্ঞান শুধু প্রতিষ্ঠিত সত্যের তালিকা নয়। এটি তর্ক, ভুল, এবং সংশোধনের ধারাবাহিকতা। তিনি দেখিয়েছিলেন, জীবন পরিবর্তনশীল। এটিই তাঁর বড় অবদান। কিন্তু সেই পরিবর্তন কীভাবে ঘটে, তা তিনি ঠিকভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেননি। এটিই তাঁর সীমাবদ্ধতা। এই দুই দিক একসঙ্গে স্বীকার করলেই বিজ্ঞান ও ইতিহাসকে সঠিকভাবে বোঝা যায়।

লামার্ককে নিয়ে ঠাট্টা করার সময় শেষ। আবার তাঁকে অতিরিক্ত সম্মান দিয়ে সঠিক বলে মানাও ঠিক নয়। তিনি পথ শুরু করেছিলেন, কিন্তু পথ শেষ করেননি। তিনি বুঝেছিলেন, জীবন বদলায়। কিন্তু সেই বদলের পথ স্পষ্টভাবে ধরতে পারেননি। এই সীমাবদ্ধতা তাঁর কাজেরই অংশ। বিজ্ঞানের ইতিহাসে এমন অনেক উদাহরণ আছে। শুরুতে ধারণা আসে আংশিকভাবে সঠিক, আংশিকভাবে ভুল। পরে অন্যরা সেটিকে সংশোধন করে। লামার্ক সেই ধারারই একজন। তাঁকে বাদ দিলে বিজ্ঞান এগোতই। কিন্তু তাঁর উপস্থিতি এই ইতিহাসকে আরও জটিল, মানবিক, এবং বোঝার মতো করে তোলে।

/জেড-এস/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
অতিরিক্ত আইজিপি হলেন ৫ ডিআইজি
অতিরিক্ত আইজিপি হলেন ৫ ডিআইজি
পুষ্টিগুণে ভরপুর পাঁচমিশালি সবজি ঘণ্ট
পুষ্টিগুণে ভরপুর পাঁচমিশালি সবজি ঘণ্ট
একদিনে হামে আরও ৪ মৃত্যু
একদিনে হামে আরও ৪ মৃত্যু
ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্নে মার্কিন চাপ মানছে না ওমান
ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্নে মার্কিন চাপ মানছে না ওমান
সর্বাধিক পঠিত
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী