ঘুমাতে যাবার আগেই আমার ক্ষুধা পেয়ে গেল। নিজের গাছের টমেটো সাজিয়ে রেখেছেন ক্যাতারজিনা রান্নাঘরে থরে থরে। সেখান থেকে দুটো তুলে নিলাম। ফ্রিজ থেকে অ্যাভোকাডো বের করে তার অর্ধেকটা আর দুটো টমেটো ছোটো ছোটো করে কেটে নিলাম। কিচেনের একপাশে বেশ কয়েক প্রকার পাউরুটি সাজানো। তার থেকে দুই পিস নিয়ে সামান্য বাটার মাখিয়ে সালাদ আর রুটি সহকারে ডিনার হয়ে গেল। আজ আর চা খেলাম না যদিও ঘুমানোর আগেও চা খেলে আমার কোনো অসুবিধা হয় না। কিন্তু যেমন মেসিডোনিয়ায় তেমন পোল্যান্ডে এসে ঘুম আমাকে পরিত্যাগ করেছে। জানি সময় একটা বড়ো ফ্যাকটর। কারণ, ঘুম যখন আসে তখন আমি থাকি চরম ব্যস্ত কাব্যজগতের নানা আয়োজন নিয়ে, বিশেষত কবিতা উৎসবের পুরো দুটো দিন বলতে গেলে সকাল সাতটা থেকে রাত এগারোটা পর্যন্ত নানাভাবে ব্যস্ত থাকতে হয়েছে। প্রথম দিন একাধারে চারটি অনুষ্ঠান! সকালটা শুরু হয়েছিল স্থানীয় পাবলিক লাইব্রেরিতে উদ্বোধনীর ভেতর দিয়ে, যদিও সেখানে কবিদের কিছুই করতে হয়নি, পরিচয় করিয়ে দেওয়ার পর দাঁড়িয়ে শুভেচ্ছা বিনিময় ছাড়া। তার পর-পরেই আমাদের বারো দলে ভাগ করে বারোটি স্কুলে পাঠানো হয়। আমাকে ও ক্যাতারজিনাকে মূল আয়োজক কবি টেরেসা কাজোরোভস্কা হোটেলের কাছেই একটি স্কুলে নামিয়ে দিয়ে যান। স্কুলের নাম: ক্রাসিনিস্কেগো হাইস্কুল। এই স্কুলের সামনেই পেয়ে যাই বিখ্যাত কবি সিকমান্ড ক্রাসিনিস্কির ভাস্কর্য, কারণ তাঁর নামেই এই প্রতিষ্ঠান—ফেরার সময় যার দুই পাশে দাঁড়িয়ে আমি ও ক্যাতারজিনা ছবিবন্দি হয়ে যাই। এখানে বলে রাখা ভালো যে ক্রাসিনিস্কি হলেন ঊনবিংশ শতাব্দীর বিখ্যাত রোমান্টিক কবি, যাকে পোল্যান্ডের জাতীয় কবি এডাম মিস্কোভিচের পরেই স্থান দেয়া হয়। অনেক সময় ইয়েলিয়াস স্লোভাস্কির নাম যুক্ত করে এদেরকে রোমান্টি ট্রায়ো বলে সম্বোধনও করা হয়। ক্রাসিনিস্কির সবচেয়ে বিখ্যাত বইয়ের নাম ‘দ্য আনডিভাইন কমেডি’—এবং বলে রাখা ভালো যে তিনি ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে যখন রয়াল ইউনিভার্সিটি অব ওয়ারশ থেকে বহিস্কৃত হন, তখন চলে যান জেনেভাতে এবং সেখানেই এডাম মিস্কোভিচের সাথে পরিচয় হয় এবং মিস্কোভিচ তাঁকে নানাভাবে কবি হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করেন।
স্কুলে আমরা যখন প্রবেশ করি, তখন চারিদিকে সুনসান নীরবতা। অর্থ হলো ইতোমধ্যে স্কুল শুরু হয়ে গেছে। ক্যাতারজিনা তাৎক্ষণিকভাবে কোনো চিন্তা না করে প্রিন্সিপালের রুমে ঢুকে যান। সেখানে পাওয়া যায় সেক্রেটারিকে, যিনি আমাদের ক্লাসরুম দেখিয়ে দেন। আমাদেরকে ইতোমধ্যে কোনো ইনস্ট্রাকশন না দিলেও বুঝতে বাঁকি থাকে না কি করতে হবে। দীর্ঘদিনের শিক্ষকতা ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইতোপূর্বে প্রচুর স্কুলে এই ধরনের প্রোগ্রামের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাই। বলার অপেক্ষা রাখে না যে আমাদের জন্যে ছাত্রছাত্রীরা অপেক্ষা করছিল। নির্ধারিত দুইজন শিক্ষকই এক কোণে বসে ছিলেন। কিন্তু আমরা ঢুকতেই অবস্থাটা পালটে যায়। আমি নিজের পরিচয় দিয়ে বলি যে আজ কবি ও কবিতা নিয়ে তাদের সাথে কথা বলবো। বলি আমার সাথে আমার অনুবাদক, তোমাদের দেশের কবি ক্যাতারজিনা জর্জিও আছেন, তিনিও তাঁর কবিতা পড়বেন এবং আমার কবিতার পোলিশ অনুবাদ পড়ে শোনাবেন। তোমাদের নানান প্রশ্নের উত্তরও দেব। আমি ক্যাতারজিনাকে আহ্বান জানাই নিজের পরিচয় তুলে ধরতে। তিনি পোলিশ ভাষায় নিজের পরিচয় তুলে ধরার পাশাপাশি আমার কবিতা কিভাবে অনুবাদ শুরু করলেন সেই গল্পটাও বলে দিলেন। এবং আমাকে আহ্বান করলেন প্রথমেই কবিতা পড়তে। এ সব ক্ষেত্রে শুরুতেই ছাত্রছাত্রীদের মনোযোগ ধরে ফেলতে পারলে পুরো সময়টাই স্বাচ্ছন্দ্যে কেটে যায়। ফলত, আমি প্রথম কবিতাটি পড়ি ‘আমি খাব’—একেবারে বাংলায়। সাথে তাদেরকে ‘আমি খাব’ উচ্চারণ শিখিয়ে দেই এবং আমার সাথে থেকে থেকে কোরাস করতে বলি। ছাত্রছাত্রীরা খুব অনায়াসে সাড়া দেয় এবং যথেষ্ট আনন্দ পায়। ‘আমি খাব’ পোলিশে জিয়াম। আমি সেটাও শুরুতে বলি। এরপর ক্যাতারজিনা পোলিশ ভাষায় কবিতাটি পড়েন। হইহই রইরই করে আলোচনার ঝড় বয়ে যায় তাদের ভেতরে। তাদের নানা প্রশ্ন নানা মন্তব্য। যেমন, সারা পৃথিবী জুড়ে যেসব মানুষ অন্য মানুষকে হত্যা করছে তাদের সবাইকে খেয়ে ফেলতে পারলে পৃথিবীতে শান্তি আসবে। যে ছেলেটি এই ব্যাখ্যা দেয় আমি তাকে ধন্যবাদ জানাই। অন্য একটি ছেলে বলে যে এটা তো বোঝাই যাচ্ছে এই কবি খুব ক্ষুধার্থ। আমরা সবাই তার কথায় হাসি। আমি বলি, “তাতো ঠিকই, আমি তুমি আমরা সবাই-ই নানা ভাবে ক্ষুধার্থ থাকি। টাকা, জমি, ক্ষমতা, রক্ত কত কিছুর ক্ষুধাই তো পায়। কিন্তু যারা রক্ত খেতে থাকে তাদেরকে প্রতিহত করার ভেতর দিয়ে আমরা এগিয়ে যেতে চাই। এবং আমরা যদি সেটা করে উঠতে পারি তবেই তো পৃথিবীতে শান্তি আসবে, আর শান্তি আসলে আমরা কি করবো তাই নিয়ে শোনোই পরের কবিতা। ক্যাতারজিনা অবশ্যই কবিতাটি জানেন । তাঁর অনূদিত পোলিশ ভাষায় আমার দ্বিতীয় গ্রন্থের প্রথম কবিতা “ও ডধরঃ ভড়ৎ ঝড়সবঃযরহম ইবঃঃবৎ.” আমরা বেশ মজা করে বছরের পর বছর এই কবিতাটি পড়ে আসছি যদিও তিনি প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে এটির অনুবাদ করলেন, কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে বেশ কিছু অনুষ্ঠানে অনুবাদ করেছেন। আমি প্রথম লাইন পড়ি, তিনি তার অনুবাদ শোনান, আমি দ্বিতীয় লাইন পড়ি, তিনি তার অনুবাদ শোনান; এ ভাবে কথোপকথনের মতো কবিতা এগিয়ে যায়। আর শেষ হলে করতালির কোনো অভাব হয় না।
আমার পরেই কবিতা পড়েন ক্যাতারজিনা। তিনিও নানাভাবে ছেলেমেয়েদের উদ্বুদ্ধ করতে সক্ষম হন। পালাক্রমে এইভাবে আমরা কবিতা পড়ি এবং শিক্ষার্থীদের নানান প্রশ্নের উত্তর দেই। কবি হওয়া কতটা কঠিন, একটি কবিতা লিখতে কতটা সময় লাগে, নিউইয়র্ক কীভাবে পোল্যান্ডের থেকে আলাদা, ইত্যাদি অনেকগুলো প্রশ্ন আসে এবং আমরা সেগুলোর যথাযথ হাস্যরস মাখা উত্তর দিয়ে ওদেরকে ধরে রাখার চেষ্টা করি। এরই মাঝে একজন ছাত্র প্রশ্ন করে বসে, “পৃথিবীর ভবিষ্যৎ কী?” আমি উত্তরে বলি, “তোমরাই পৃথিবীর ভবিষ্যৎ। দেশে দেশে তোমার মতো তরুণরাই ঠিক করে নেমে কেমন পৃথিবীতে তারা বাস করতে চায়। তবে আমার আর্জি থাকবে যে তোমরা সব মানুষকেই নিজের মানুষ বলে মনে করবে। মানুষ আদতে একজন থেকে অন্যজন আলাদা নয়। এমন চিন্তা যদি মাথায় আসে যে আমরা পৃথিবীর যে প্রান্তেই বসবাস করি না কেনো আমরা ভাই ভাই। তাহলে কিন্তু হানাহানি মারামারি কাটাকাটি থাকা সম্ভব নয়!”
এক ঘণ্টা কবিতা পড়ার পর ওদের ভেতরে একটু উসখুস ভাব দেখতে পাই। তাই ওদের ধরে রাখতে একটি অ্যাক্টিভিটি দেই। বলি, “তোমরা কাগজ কলম বের করো। এবং দশ মিনিট কবিতা লেখো। যা মনে আসে তাই লেখো। কোনো চিন্তা না করেই লেখো।”
অধিকাংশ ছেলে-মেয়ে বলে যে তাদের কাছে কোনো কাগজ কলম নেই। আমি বলি, “প্রত্যেকের কাছে ফোন আছে। ফোনের নোট ওপেন করে নাও, সেখানেই লেখো।”
কাজ হয়। ওরা নিজেদের মধ্যে কথা বলতে থাকলেও নোটবুকে যে লেখা চালিয়ে যায় সেটাও ঘুরে ঘুরে পরখ করি।
এক সময়ে আমি বলে উঠি, “আর পাঁচ মিনিট আছে।” এর পরে প্রতি মিনিটে সংকেত দেই। “এক মিনিট,” এরপর “তিরিশ সেকেন্ড”, “পনেরো সেকেন্ড,” “দশ, নয়, আট, সাত, ছয়, পাঁচ, চার, তিন, দুই, এক।” সাথে সাথে ঘোষণা দেই, “সময় শেষ। আমি তোমাদের মধ্য থেকে পাঁচজনকে বেছে নেবো তাদের কবিতা শেয়ার করার জন্যে। যারা যারা রাজি হাত তোলো!”
খুব সহজেই পাঁচজন পাওয়া যায়। আমাদের কথা মতো ক্লাসের সামনে এসে দাঁড়িয়ে তারা একে একে তাদের কবিতা পড়তে থাকে। আমি ভিডিয়ো করি। তাদের ছবি তুলি। উৎসাহ দেই। এরপর বলি, “তোমরা সবাই ভালো করেছ। কিন্তু পুরস্কার দেবো একজনকে।”
ক্যাতারজিনা বললেন, “তোমাদের ভোটেই আমরা প্রথম স্থান নির্ধারণ করবো।”
এই প্রক্রিয়ায় ছাত্রছাত্রীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ আমাকে যথেষ্ট আপ্লুত করে। এবং দুজন খুদে কবির ভেতরে কম্পিটিশন হয়। শেষ পর্যন্ত যে ছাত্রটি জয়ী হয় আমি তার হাতে শব্দগুচ্ছ পত্রিকার পোলিশ কবিতা সংখ্যাটি তুলে দেই। সাথে সাথে স্কুলের জন্যে উপহার হিসেবে রেখে যাওয়া আমার পোলিশ ভাষায় অনূদিত কবিতার বই দুটোতে প্রত্যেকে স্বাক্ষর করে। এইভাবে আমাদের একটি সফল কাব্যিক আয়োজন শেষ হয়।
লাঞ্চের পরে আমাদের নিয়ে যাওয়া হয় পার্শ্ববর্তী শহর প্রোসনেজ-এ। সেখানে মেয়রের উপস্থিতিতে আমাদের হাতে তুলে দেয়া হয় ফেস্টিভাল এন্থোলজি। এই সংকলনের বিদেশি কবি অংশ আমাকে দিয়ে শুরু হওয়ায় আমিই প্রথম মঞ্চে উঠে গ্রন্থখানা গ্রহণ করি। এর আগে কবি লুসিনা কট্রোবিন্সকা, যাকে এই সংকলনটি উৎসর্গ করা হয়েছে, তাঁর উপরে একটি প্রামাণ্য চিত্র ও তাঁর কিছু কবিতার অংশ পড়ে শোনানো হয়। মজার ব্যাপার হলো এই কবি ছিলেন রবীন্দ্রনাথের সমসাময়িক, জন্ম ১৮৫৮ সালে আর মৃত্যু ১৯৪১, ঠিক যে বছর রবীন্দ্রনাথ মারা যান। আমি আমার নাতিদীর্ঘ বক্তৃতায় সেকথা তুলে ধরি।
রাতে আমরা হোটেলে ফিরে আসি এবং ডিনার শেষে হয় পোয়েট্রি নাইট। তার মানে ঘুমাতে যেতে রাত বারোটা পেরিয়ে যায়। কিন্তু সারারাত এপাশ ওপাশ করেও এক ফোঁটা ঘুমের দেখা পাওয়া যায় না। ফলে সকাল পৌনে পাঁচটায় শাওয়ার নিয়ে কাত হয়ে পড়ে থাকি। এবং দুঘণ্টা ঘুমিয়ে উঠে নাস্তা করে দ্বিতীয় দিনের অনুষ্ঠানে যোগ দেই।
এই যখন অবস্থা, ক্যাতারজিনার বাড়িতে তার দেয়া ওষুধ খেয়েই ঘুমাতে যাই। ঘণ্টা ছয়েক ঘুমিয়ে সকালে বেশ ফ্রেশ লাগে।









