পোলিশ আন্তর্জাতিক কবিতা উৎসব

কবিতায় হেমন্তের ঘ্রাণ ।। পর্ব—৮

হাসানআল আব্দুল্লাহ
০৯ জুলাই ২০২৬, ০০:০০আপডেট : ০৯ জুলাই ২০২৬, ০০:০০

চেহানোভ কবিতা উৎসবের প্রথম দিনে সবচেয়ে বড়ো প্রাপ্তি হলো নবম শ্রেণির একটি মেয়ের কবিতা। হ্যাঁ, আমি ও ক্যাতারজিনা যে ক্লাসটিতে কবিতা পড়াতে বা কবিতা পড়তে বা কবিতা বিষয়ে কথা বলতে গিয়েছিলাম সেটি ছিল নবম শ্রেণির একটি ক্লাস। সেখানে আমাদের প্রশ্নের উত্তরে একটি মেয়ে, যার নাম নিকোলা কুকিলেস্কা, বলেছিল যে সে কবিতা লেখে। কিন্তু তাকে পড়ে শোনাতে বললে জানিয়ে ছিল তার কাছে ওই মুহূর্তে নেই, পরে আমাদের পাঠিয়ে দেবে। বিকেলে যখন আমরা বাসে করে চেহানোভ মনুমেন্টস, যা আদতে পুরোনো একটি ক্যাসেল, যেখানে প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নানারকম স্মৃতি ধরে রাখা আছে, দেখতে যাচ্ছিলাম, ক্যাতারজিনা আমাকে জানিয়ে ছিলেন যে নিকোলা তাঁকে কবিতা পাঠিয়েছে। তিনি আমাকে কবিতাগুলো ফরোয়ার্ড করে দিলেন হোয়াটসঅ্যাপে। আমি পড়ে বললাম, “বেশ ভালো কবিতা। মনে হচ্ছে পত্রিকায় ওর কবিতা ছাপতে পারবো।” আমি এর আগেও নবম/দশম শ্রেণির দুই একজন ছাত্রছাত্রীর কবিতা ছেপেছি। কিছুক্ষণের ভেতরেই মেয়েটিও আমার ম্যাসেঞ্জারে কবিতা পাঠিয়ে দিলে আমি তাকে আরো দুই তিনটি কবিতা পাঠাতে অনুরোধ করলে সে জানালো যে তার কাছে আর কোনো কবিতা নেই। আমি বললাম, “আগামী ফেব্রুয়ারির ভেতরে অন্তত তুমি দুটি নতুন কবিতা লিখে আমাকে পাঠবে। এগুলোর ভেতর থেকে আমি একটি বেছে নেবো ছাপার জন্যে।” ইতোমধ্যে পাঠানো তিনটির ভেতর থেকে একটি অবশ্যই ছাপা যেতো, হয়ত আমি তাই-ই করবো কিন্তু আমি এই সুযোগে তাকে দিয়ে আরো কবিতা লিখিয়ে নিতে চাই। অন্তত, আমি নিজের চর্চা থেকে জানি যে লেখাটা নিয়মিত সচল রাখাটা জরুরি, প্রকারান্তরে আমি মেয়েটিকে সেই প্রক্রিয়ার ভেতরে প্রবেশ করাতে চাই।

দুপুরের খাবারের পর সবাই মিলে মনুমেন্ট দর্শনে যাবার পথে বেশ কিছুটা হেঁটে হোটেল চত্বরটি পার হচ্ছিলাম। এ সময় ক্যাতারজিনা দৌড়ে গিয়ে সামনে থেকে প্রফেসর ব্রানজেক-এর সাথে আমার ছবি তুললেন। সকালেই বুঝতে পেরেছি ওয়ারশ থেকে আসা এই প্রফেসর বেশ বিখ্যাত। তাঁর বহু ছাত্রছাত্রী দূর দূরান্ত থেকে ছুটে আসেছেন তাঁকে দেখার জন্যে। আমি বাসে ওঠার সময় তাঁর হাতে আমার পোলিশ ভাষায় নতুন বইটি দিয়েছিলাম। মনুমেন্টে পৌঁছানোর আগেই তেরেসা, যিনি সামনের দিকে প্রফেসর ব্রানজেকের সাথে বসেছিলেন, পিছনে এসে আমাকে আর ক্যতারজিনাকে বলে গেলেন যে ইতোমধ্যে প্রফেসর আমার বইটি উল্টে পাল্টে দেখেছেন এবং তিনটি কবিতা তার খুব ভালো লেগেছে। বাস থেকে নেমে চেহানোভ মনুমেন্টে হেঁটে যেতে যেতে প্রফেসর বললেন পিঁপড়ে নিয়ে কবিতাটি অন্যরকম, “বৃষ্টি এসে ডোবায় যদি ডোবে, জাগে না বিক্ষোভে/ রৌদ্র এসে পুড়িয়ে গেলে পোড়ে/ থাকলে বেঁচে আবার মাটি খোঁড়ে।/ পিঁপড়েগুলো ভয় পেয়েছে/ ঘরে যায় না।”

আমি হাসতে হাসতে বলি, “আমরা মানুষেরা সবাই-ই পিঁপড়ের মতো, ভয়ে সিঁধিয়ে থাকি। আমাদের প্রতিপালকেরা, বড়ো  বড়ো সুপারপাওয়ার আমাদের যেভাবে ব্যবহার করে আমরা তেমনি ব্যবহৃত হই।”

প্রফেসর ব্রানজেক বলেন, “এখানেই কবিতাটির সার্থকতা! আমরা ঝাঁকে ঝাঁকে মরি, ওরা ঝাঁকে ঝাঁকে মারে।”

কথা বলতে বলতে হাঁটতে হাঁটতে আমরা ক্যাসেলের সামনে এসে দাঁড়াই। একজন গাইড বক্তৃতা দিতে থাকেন। এটি নির্মিত হয়েছিল রাজা ডিউক সিমোভিট দ্যা থার্ড-এর কালে পঞ্চদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে। প্রথমে কাঠের তৈরি হলেও পরে এটাকে ইটের দুর্গ বানানো হয়। তিনি আরো বলেন এই শহর পোল্যান্ডের পুরোনো শহরের একটি, ১০৬৫ সালে এর গোড়াপত্তন হয়।

আমরা দলে দলে ছবি তুলি, পায়ে পায়ে ইটের রাস্তা দিয়ে এগিয়ে ক্যাসেলের অর্ধভাঙা বিশাল গেট দিয়ে প্রবেশ করি। গাইডের বক্তৃতা চলতেই থাকে। স্থানীয় একজন অধ্যাপক গাইডের মুখ থেকে কথা কেড়ে নিয়ে ক্যাসেল সম্পর্কে বেশ বড়োসড়ো বক্তৃতা দেন। তিনি বলেন, “একজন আর্কিওলজিস্ট হিসেবে এই ক্যাসেলে ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আমার রিসার্চ করার সুযোগ হয়েছে। আমি এখান থেকে মানুষের খুলিও উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছি।”

প্রায় আধাঘণ্টা ক্যাসেলে কাটানোর পর, সামনে দাঁড়িয়ে একটি গ্রুপ ছবি তুলে আমরা আবার বাসে উঠি পাশের শহরের উদ্দেশ্যে যেখানে মেয়রের উপস্থিতিতে কবি কুর্টোবিন্সকাকে নিয়ে প্রামাণ্য চিত্র প্রদর্শন করা হয়, এবং আমাদের হাতে তুলে দেওয়া হয় উৎসব সংকলন যাতে আমার তিনটি কবিতা পোলিশ ভাষায় প্রকাশ করা হয়েছে। আমি ক্যাতারজিনাকে বলি, “কবিতার থেকে আমার পরিচিতি বেশি বড়ো হয়ে গেছে।” তিনি বলেন, “আমি তো বইয়ে যে পরিচিতি ছিল তাই পাঠিয়ে দিয়েছি। এটি সম্পাদকের নির্বুদ্ধিতা, তিনি কেটে ছোটো করে নিতে পারতেন।” যাহোক এই অনুষ্ঠানের সবচেয়ে’ আকর্ষণীয় ছিল এরেস চাদনিকোলইয়ের পিয়ানো। তাঁকে উপস্থিত ক্ষেত্রে অনুরোধ করা হলেও তিনি এমন একটি তরঙ্গ তুলে দিলেন যা তাঁর নিজস্ব, মনে হলো ওই অবস্থাতেই তিনি তা সৃষ্টি করলেন। ফেরার পথে তিনি বললেন, “অত্যন্ত বাজে পিয়ানো, আমি শুধু তাৎক্ষণিকভাবে চেষ্টা করেছি।”

“তোমার চেষ্টা মানেই নতুন কিছু তৈরি করা। তুমি ন্যাচারাল পিয়ানো বাদক।” আমি মন্তব্য করি। ক্যাতারজিনাও আমার সুরে সুর মিলান।

রাতে ডিনারের পরে হোটেল বলরুমে ম্যারাথন কবিতা পাঠের আয়োজন করা হয়। স্থানীয় শিল্পী পিটার রেজকভক্সি গিটার বাজিয়ে কবিতার ফাঁকে ফাঁকে গান গেয়ে শোনায়। বেশ কয়েকটি গান তিনি অনুষ্ঠানের মূল আয়োজক তেরেসার লেখা কবিতা থেকে তৈরি করেছেন বলেও জানান।

আমার ডাক পড়লে, আমি বলি যে পঞ্চমবারের মতো পোল্যান্ডে এসে আমার অনেক ভালো লাগছে। এই দেশটিকে আমি দ্বিতীয় বাসস্থান বলে মনে করি। এখানে এলে অনেকগুলো ভাইবোনকে পাশে পাই। এবং কবিতা পড়ার আগে আমি অডিয়েন্সে বসা ডারিউস টোমাস লেবিয়ডার পাশে দাঁড়িয়ে বলি যে আন্তর্জাতিক কাব্য ফোরামে তিনিই আমাকে প্রথম টেনে আনেন। নিউইয়র্কের জাতিসংঘে পোলিশ কবিতাপাঠের আসরে সেই ২০০২ সালে যে তাঁর সাথে পরিচয় হয়েছিল, তারপর থেকে তিনি আর আমাকে ভোলেননি। আমি তাঁকে ধন্যবাদ জানিয়ে দুটি কবিতা পড়ি। অবশ্যই সুললিত কণ্ঠে কবিতা দু’টির অনুবাদ পড়ে শোনান ক্যাতারজিনা।

দ্বিতীয় দিনে সকালে সকালে কুয়াশার জাল কাটতে না কাটতেই আমাদের নিয়ে যাওয়া হয় মিউজিয়াম অব রোমান্টিসিজম-এ কবি সিগমন্ড কারসিনেস্কির কবরে ফুল দেবার জন্যে। মিউজিয়াম ও কবরখানা, একই চত্বরে অবস্থিত। এই বিশাল জমিদারি চত্বরটি ছিল কারসিনিস্কির বাপ-দাদার এবং এক পর্যায়ে এটা জাতীয়করণের মাধ্যমে মিউজিয়ামে পরিণত করা হয়েছে। পুরো চত্বর জুড়েই নানারকম ফুলের সাজি, এক কোণে কবি নরবিদ-এর স্কালপচারও পাওয়া গেলো। পড়ন্ত হেমন্তের বিশাল গোলপ ফুল আমাদের মুগ্ধ করে দিলো। চত্বরের চার্চ-এর বেসমেন্টে কারসিনিস্কি, তাঁর বাবা মা ও অন্যান্যদের কবর একের পর এক সাজানো। পিছনের দরজা দিয়ে তাই আমাদের মাটির নিচে ঢুকতে হলো। কবরকেও রোমান্টিক মিউজিয়ামের এমন অংশ করে তোলা যায় তা চোখে না দেখলে বিশ্বাস হবার কথা নয়। এই কবরের গুহায় ঢুকতে ঢুকতে ক্যাতারজিনা আমাকে স্মরণ করিয়ে দিলেন আমার নিজের কবিতা “কবির অভিজ্ঞতা”। আমি সাথে সাথে বলে ফেললাম, ‘I have been in other peoplesÕ grave too.’ অতএব সবাই যখন লাইন ধরে দাঁড়িয়ে কারসিনিস্কির কবরে পুষ্পস্তবক অর্পণ করছিলেন, আর গাইডের বক্তৃতা শুনছিলেন, আমি তখন আমার ফোনে কবিতা লিখতে ব্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম। কবিতার নাম দেওয়া হলো গ্রেভ টক।

I have been in other peoples’ grave too,

some of them were bigger than mine.

At times, my friends and I  lined up

to get to the grave, followed by

a well known guide, and once inside,

we stood against a wall

and listened attentively

as if we were a group of newly trained

soldiers ready to get to the war zone.

মাত্র কয়েক মিনিটে তরতর করে ফোনের নোটবুকে কবিতাটি লেখা হয়ে গেলো। আমি খুশি মনে রোমান্টিকতার কবি কারসিনিস্কিকে ধন্যবাদ জানিয়ে তার কবরের গহ্বর থেকে বেরিয়ে এলাম। ফেরার পথে চার্চের ভেতরটা না দেখলেই নয় বলে হাতিফ আমাকে টেনে নিয়ে গেলেন এবং ভেতরে কারসিনিস্কির মায়ের ভাস্কর্যের সামনে আমার ছবি তুলে দিলেন। এটা দেখে ক্যাতারজিনও হাজির হলেন এবং তিনিও বেশ কয়েকটি ছবি তুললেন। এরপর পাহারচূড়ায় একটি ছোট্ট মিউজিয়াম ঘরে নিয়ে যাওয়া হলো যেখানে তখনকার ব্যবহৃত আসবাবপত্র রাখা। আমি একটি চেয়ারে বসতে গেলে কবিরা সমস্বরে নিষেধ করলেন। ওগুলো দেখার জন্যে, বসা বা স্পর্শ করার জন্যে নয়। কারসিনিস্কির দাদীর একটি ছবির দিকে আমার দৃষ্টি আটকে গেলো। আমি বললাম, “এত সুন্দরী দাদিকে আমি কখনো দেখিনি।”

পাশ থেকে হুসেন হাবেশ বলে উঠলেন, “তখন তরুণীকালে দাদিদের ছবি হয়ত তোলা হতো না। এটা দাদীর উঠতি বয়সের ছবি।”

আমি বললাম, “ধন্যবাদ, ষোড়শী দাদি!” এ পর্যায়ে কারসিনিস্কির পালক বোনের সাথে তার প্লেটোনিক প্রেমের কথা বর্ণনা করলেন গাইড গোলাপ বাগানের সামনে দাঁড়িয়ে, এবং ঠিক কোথায় তাঁরা চুপিচুপি কথা বলতেন সেই জায়গাটিও আমাদের নির্দিষ্ট করে দেখা হলো। এমনভাবে গাইড বলে গেলেন যে রাতে ওদের অভিসারের সময় তিনি পিছন পিছন এসে সব দেখে ফেলেছিলেন। আমি কিছু একটা বলতে চাইলে ক্যাতারজিনা আমাকে চুপ করিয়ে দিয়ে বললেন, “ওটা ওর পেশা। এই বিষয়ে ডিগ্রি নিয়েছেন। ওকে তো কথা বলেই উপার্জন করতে হবে।”

সকালে সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও মিউজিয়াম দেখতে যাবার আগে আমরা এই চত্বরের ভেতর অবস্থিত বিশাল কালচারাল হাউজে ব্যাগ রেখে গিয়েছিলাম। শেষ পর্যন্ত ফিরে এসে যে যার ব্যাগ ফিরিয়ে নিয়ে, শীতের জ্যাকেট সেখানে রেখে দোতলার অডিটরিয়ামে জায়গা করে নিলাম। অডিটরিয়ামের সামনে কেক-পেস্টি ও চা-কফি খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। হাতে সময় থাকায় কেউ কেউ ওগুলোর সদ্‌ব্যবহার করলেন। ইতোমধ্যে ওয়ারশ থেকে আসা এক কবি দেখলাম পুরো প্লেট ভর্তি কেক-পেস্টি নিয়ে এক কোণে বসে হাপুস-হুপুস খাচ্ছেন; মনে হলো হায়রে তিনি বোধ হয় কতকাল খান না। আজ সকালে মিউজিয়ামে তিনিই ক্যাতারজিনাকে রিকুয়েস্ট করেছিলেন আমার সাথে কথা বলিয়ে দিতে যাতে আমি তার কবিতা শব্দগুচ্ছ পত্রিকায় ছাপি। ক্যাতারজিনা বলেছেন, আপনি আগে অনুবাদ পাঠান, সম্পাদকের পছন্দ হলে ছাপার জন্যে অনুরোধ করতে হবে না; তিনিই আপনার সাথে যোগাযোগ করবেন। পরে অবশ্য চেক রিপাবলিক কবিতা উৎসবেও এমন একটি ঘটনা ঘটে। এমন প্রস্তাব নিয়ে যে কবি এসেছিলেন তিনিও পোলিশ, আমি লক্ষ্য করেছিলাম যে বাথরুমের সামনে ক্যাতারজিনার সাথে তাঁর উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হচ্ছে। কবির হাতে ছিল তিনটি গ্লাস। ভাবলাম, আমি তাঁদের সাথে মদ্যপানে অংশ নেবো কিনা তিনি ক্যাতারজিনাকে জিজ্ঞেস করলে, ভর দুপুরে আমি সেখানে যাবো না, এবং এমন সময় সেকথা তিনি বলার সাহস করলেন কেনো সেই বিষয়ে বাক্য বিনিময়। কিন্তু পরে ব্যাপারটি শুনে বেশ মজাই পেলাম। ক্যাতারজিনা বললেন, “তিনি আমাকে তাঁর কবিতা অনুবাদ করে তোমার পত্রিকায় পাঠাতে বলেছেন।” আমি বলি, “তাতে সমস্যা কী?” ক্যাতারজিনা বললেন, “আমি কারো অনুরোধে কবিতা অনুবাদ করি না। যদি অনুবাদযোগ্য হয় নিজের থেকেই কাজটি করি!” আমি বললাম, “এ ব্যাপারে আমার নীতিও একই। অনুবাদযোগ্য না হলে সময় নষ্ট করে লাভ কী!” ক্যাতারজিনা বললেন, “তাছাড়া আমি বলে দিয়েছি, তুমি আগে হাসানআলকে কবিতা পাঠাও। তিনি যদি মনে করেন তোমার কবিতা ছাপবেন, তবেই আমি অনুবাদ করবো।” আমি বললাম, “তাতেও সমস্যার কিছু তো দেখি না।” ক্যাতারজিনা একটু তেরসাভাবে বললেন, “তাঁর কাছে নাকি সম্পাদকের ইমেল অ্যাড্রেস নেই। তা আমি বললাম, চেয়ে নাও।”

আমি বলি, “তা এই কথা নিয়ে উত্তপ্ত হবার কী আছে?”

তিনি বললেন, “আরে বলো না, বাথরুমে যাবার পথে কেনো এই কথা আমাকে বলতে হবে! বলার তো আরো সময় আছে।”

আমি বলি, “কী যে বলো, তুমি ব্যস্ত মানুষ। তোমার সাথে কথা বলার আর কোনো সুযোগ হয়ত পায়নি।”

যাহোক, ফিরে আসা যাক মিউজিয়াম অব রোমান্টিসিজমের কালচারাল হাউজে। দশ অক্টোবর, ২০২৪, দুপুরে সেখানে একজন বিখ্যাত(!) পোলিশ কবিকে নিয়ে অনেক আয়োজন। কবি নাকি একজন ধর্মযাজকও বটে। আমি চা খেতে খেতে উপস্থিত কবিদেরকে ইতঃপূর্বে লেখা আমার একটি কবিতা শুনিয়ে দেই।

“A poet and a priest

are almost the same.

The only difference is

one believes in god

and the other thinks

that he is one.”

 

ক্যাতারজিনা বলেন, “হি-এর জায়গায় সি বসিয়ে দিলেও চলে।”

আমি বলি, “অবশ্যই। কিন্তু হি অর সি একসাথে বললে কবিতা হারিয়ে যায়। এই জন্যেই এভাবে লেখা হয়েছে।”

 “তাছাড়া,” ক্যাতারজিনা বলেন, “আজকের এই বিখ্যাত পোলিশ কবির নামও আমি কখনো শুনিনি।”

চেহানব কবিতা উৎসবে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তৃতা তথাপি এই ধরনের অনুষ্ঠানে এমনটি অহরহ ঘটে। হয়ত, অনুষ্ঠান পরিচালনায় যিনি টাকা দিয়েছেন তার নিজের গেস্ট, ফলত সেই অনুরোধ রক্ষা করতে হয়। নতুবা যারা কমিটিতে আছে তাদের কারো পরিচিত ইত্যাদি অনেক কারণেই এমনটি ঘটে। কিন্তু মঞ্চে কবির সাথে টেরেসার কথোপকথন কিছুক্ষণ শোনার পর অধৈর্য হয়ে হুসেন হাবেশ বেরিয়ে গেলেন। আমিও কিছুক্ষণ পর ক্যাতারজিনার পাশ থেকে উঠে যাবার আগে কানে কানে বলে গেলাম যে বাথরুমে যাবো।  বাথরুম থেকে ফিরে দেখি বাইরে তখনো চায়ের আয়োজনটি শেষ হয়ে যায় নাই। আমি সেখানেই বসে রসিয়ে রসিয়ে আরেকবার চা খেতে থাকি। ইতোমধ্যে সেখানে আজকের অনুষ্ঠানের পরের পর্বের উপস্থাপক যোফিয়া সারনিকা, যিনি একজন সাংবাদিক, উপস্থিত হলে আমি ফিসফিস করে তাঁর সাথে কথা বলছিলাম। জানতে পারলাম যে তিনি ন্যাসনাল টেলিভিশনের উপস্থাপিকার পদ থেকে কয়েক বছর আগে অবসর নিয়েছেন। এখন ইন্ডিপেন্ডেন্ট সাংবাদিকতা করেন। তিনি উপস্থাপনার জন্যে বিশ্বের নানা দেশ ভ্রমণ করেছেন। বলেনও ভালো। কিছুক্ষণ কথা বলার পর তিনি বললেন পরের অনুষ্ঠানের জন্যে তাকে রিহারসেল করতে প্রোগ্রাম রুমে যেতে হবে। ওদিকে আমিও আবার হলরুমে ফিরে গেলাম। তখনও চলছিল সেই বিখ্যাত কবির সাক্ষাৎকার। মাঝে মাঝে ক্যাতারজিনা আমাকে কিছু কিছু প্রয়োজনীয় বিষয় অনুবাদ করিয়ে শোনালেন। এবং একপর্যায়ে সেই অত্যন্ত বোরিং, দীর্ঘ, অনভিপ্রেত সাক্ষাৎকারটি শেষ হলে ছাত্রছাত্রীদের কবিতা কম্পিটিশনে পুরস্কার দেওয়া হলো। পুরস্কৃত কবিদের কেউ কেউ কবিতাও শোনালেন, তবে সবই পোলিশ ভাষায়। একজন কবির কবিতার সাথে সবাই হাততালি দিলেন। কবিতাটি বেশ ছন্দবদ্ধ, ক্যাতারজিনা আমাকে ইংরেজি করেও শোনালেন। যদিও এই কবি প্রতিযোগিতায় তৃতীয় হয়েছিল, তিনি বললেন যে ওরই প্রথম হওয়া উচিত ছিল। স্থানীয় কয়েকজন কবিকেও সান্ত্বনা পুরস্কার দেওয়া হলো। আমরা সানন্দে হাততালি দিলাম।

একপর্যায়ে আমাদের সবাইকে মঞ্চে ডেকে এই অনুষ্ঠানে অংশ নেবার জন্যে সার্টিফিকেট দেওয়া হলো। আমরা আট/দশজন বিদেশি কবিসহ প্রায় চল্লিশজন একসাথে মঞ্চে দাঁড়িয়ে ছবি তুললাম। এরপর হলো নাচ আর গান। অপেরা গেয়ে শোনালেন ভিয়েনার সোপঅপেরা শিল্পী উরসুলা রোজেক আর পিয়ানো বাজালেন জাপানের পিয়ানিস্ট মিগুমি অটসুকা। পুরোদিনের এই একটি মাত্র অনুষ্ঠান খুবই মানসম্মত ছিল, যদিও ক্যতারজিনা বললেন যে অপেরা শিল্পী জোরে টান দিলে গলা ভেঙে যাচ্ছে। তবে তিনি পিয়ানোইস্টের যথেষ্ট প্রশংসা করলেন। বললেন, “এইভাবে পিয়ানো বাজাতে হলে প্রতিদিন অন্তত আট ঘণ্টা প্রাকটিস থাকতে হয়।”

অনুষ্ঠান শেষ হতে বিকাল সাড়ে চারটা বেজে গেলো। হলরুমের পিছনে, বিশেষত ড্রেসিং এরিয়ার পাটাতন সরিয়ে খাবার পরিবেশনের আয়োজন করা হলো। আমি ও ক্যাতারজিনা দুপুরের আধাঘণ্টা ব্রেকের সময় এই চত্বরের ভেতরে অবস্থিত একটি রেস্টুরেন্ট থেকে খেয়ে নিয়েছিলাম, নতুবা এতক্ষণ না খেয়ে থাকা আমাদের পক্ষে সম্ভব হতো না। পরে জানলাম দেরিতে খাবার দেবার কারণ হলো রাতের খাবার স্কিপ করা। কারণ গান ও পিয়ানোই ছিল আজকের শেষ অনুষ্ঠান। আয়োজকরা যদিও আমাদের জন্যে হোটেলে থাকার ব্যবস্থা রেখেছিলেন, কিন্তু কারো জন্যেই আর ডিনারের আয়োজন করেননি।

অনেকটা বিধ্বস্ত হয়ে হোটেলে ফিরে এলে ক্যাতারজিনা তাঁর রুম থেকে আমাকে ম্যাসেজ পাঠিয়ে জানালেন যে তেরেসা সন্ধ্যা সাতটায় ফরেন পোয়েটসদের সাথে দেখা করতে আসতে চান। আমি মনে মনে ঢোক গিলি, এত পরিশ্রমের পরও যদি সামান্যতম রেস্ট না নিয়ে তেরেসা বা অন্যদের সাথে কথা বলতে যেতে হয় তাহলে আমাকে আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। এমনিতেই মনে হচ্ছে প্রেসার ভীষণ হাই, ক’দিন দুই/তিন ঘণ্টার উপরে ঘুমের দেখা মেলেনি। যাহোক, সাড়ে সাতটায় আবার ম্যাসেজ এলো, “আমরা সবাই ডাইনিং রুমে আছি। তোমার জন্যে অপেক্ষা করছি।”

আমি কোনো রকম নিজেকে সামলিয়ে সেখানে হাজির হলাম। তেরেসা শ্যাম্পেন নিয়ে এসেছিলেন। আমি বললাম, “মাথা খুব ধরে আছে আমি শুধু চা খাবো।” অতএব চা ও এক বোতল পানির অর্ডার দিয়ে সবার সাথে যোগ দিলাম। তেরেসা এক এক করে সবার থেকে ফিডব্যাক জানতে চাইলেন। যে যার মতো আলোচনা সমালোচনা করেন, কেউ কেউ বললেন সব ভালো, সব ভালো। আমি বললাম, “দুই দিনের প্রোগ্রামে এত কিছু রাখা হয়েছে যে অনায়াসে চার দিনে টেনে নেওয়া যেতো। তবে সেখানেও বাজেটের কথা হবে, হবে লোকবলের কথাও। তাছাড়া, আমার মতো যারা ছয় ঘণ্টার টাইম ডিফারেন্স জোন থেকে আসছেন তাদের জন্যে বিশ্রামের ব্যবস্থা যদি থাকে ভালো হয়।”

নিজের শারীরিক অসুস্থতার কথা বলে সবার থেকে বিদায় নিয়ে রুমে ফিরে এলাম।

 

/জেড-এস/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
ফিফার তদন্তে মিসর জয়ী হলে আর্জেন্টিনার কপালে কী ঘটবে?
ফিফার তদন্তে মিসর জয়ী হলে আর্জেন্টিনার কপালে কী ঘটবে?
ভারতে যাওয়ার সময় স্বেচ্ছাসেবকলীগ নেতা আটক
ভারতে যাওয়ার সময় স্বেচ্ছাসেবকলীগ নেতা আটক
রেল স্টেশনে হারিয়ে ফেলা সন্তানকে ফিরে পেলেন বাবা
রেল স্টেশনে হারিয়ে ফেলা সন্তানকে ফিরে পেলেন বাবা
আলোচিত সেই সংঘবদ্ধ ধর্ষণ মামলার যুক্তিতর্ক শেষ, রায় ১৪ জুলাই
আলোচিত সেই সংঘবদ্ধ ধর্ষণ মামলার যুক্তিতর্ক শেষ, রায় ১৪ জুলাই
সর্বাধিক পঠিত
কোয়ার্টার ফাইনালের সূচি চূড়ান্ত, কোন কোন দল মুখোমুখি
কোয়ার্টার ফাইনালের সূচি চূড়ান্ত, কোন কোন দল মুখোমুখি
৫ জনকে জীবিত উদ্ধার, মাটির নিচে চাপা পড়েছে আরও ২০ জন
৫ জনকে জীবিত উদ্ধার, মাটির নিচে চাপা পড়েছে আরও ২০ জন
শাপলা চত্বর ঘটনার তদন্ত শেষ, আসামির তালিকায় যারা 
শাপলা চত্বর ঘটনার তদন্ত শেষ, আসামির তালিকায় যারা 
যে কারণে নিরাপত্তা কর্মীকে উপহার পাঠালেন প্রধানমন্ত্রী
যে কারণে নিরাপত্তা কর্মীকে উপহার পাঠালেন প্রধানমন্ত্রী
পুরোনো স্মার্টফোনকে বানিয়ে ফেলুন ঘরের সিসিটিভি ক্যামেরা
পুরোনো স্মার্টফোনকে বানিয়ে ফেলুন ঘরের সিসিটিভি ক্যামেরা