ধারাবাহিক উপন্যাস।। পর্ব—৮

অপ্রিয় হওয়ার সাহসিকতা ।। ইচিরো কিশিমি এবং ফুমিটাকি কোগা

অনুবাদ: মঈনউল ইসলাম
১০ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ আপডেট : ১০ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০

জীবন কোনো প্রতিযোগিতা নয়

যুবক: কিন্তু মনে হয় এখনও সব বুঝতে পারিনি।

দার্শনিক: ঠিক আছে—যেকোনো প্রশ্ন করতে পার।

যুবক: অ্যাডলার স্বীকার করেন যে, শ্রেষ্ঠত্বের সাধনা—অর্থাৎ কারও অধিকতর শ্রেষ্ঠ মানুষ হওয়ার প্রচেষ্টা—একটি সর্বজনীন আকাঙ্ক্ষা, তাই নয় কি? অপরদিকে, তিনি আবার অতিরিক্ত মাত্রার শ্রেষ্ঠত্ব এবং হীনম্মন্যতার অনুভূতি সম্পর্কে সতর্কতার বার্তা দিচ্ছেন। তিনি শ্রেষ্ঠত্বের সাধনার সঙ্গে এর সম্পর্ক না থাকার কথা বললে সহজেই বোঝা যেত—আমিও এটি গ্রহণ করতাম। তাহলে, এ ক্ষেত্রে করণীয় কী?

দার্শনিক: এভাবে চিন্তা কর —যখন আমরা শ্রেষ্ঠত্বের সাধনার কথা বলি, তখন মূলত অন্যের চেয়ে উত্তম হওয়ার প্রবণতার কথাই ভাবি। ভাবি আরও অধিক উচ্চতায় আরোহণ করা—এমনকি প্রয়োজন হলে সামনের মানুষকে লাত্থি মেরে নিচে ফেলে দিয়ে হলেও। একটি দৃশ্য কল্পনা কর যেখানে, সিঁড়ি দিয়ে চূড়ায় ওঠার পথে ধাক্কা মেরে অন্যদের সরিয়ে পথ পরিষ্কার করে নেওয়া হয়। অ্যাডলার নিশ্চয়ই এমন মনোভাবকে সমর্থন করেন না। বরং তিনি বলেছেন, এমন একটি চিত্র কল্পনা কর—একই সমতল জায়গায় কিছু মানুষ সামনের সারিতে এগিয়ে চলেছে, আর কিছু মানুষ তাঁদের পিছনে এগিয়ে যাচ্ছে। তাঁদের চলার গতি ও অতিক্রান্ত দূরত্ব ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু তাঁরা সবাই একই সমতল স্থানে সমানভাবে হাঁটছে। অর্থাৎ শ্রেষ্ঠত্বের সাধনা হলো আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সামনের দিকে পা বাড়ানোর মানসিকতা; প্রতিযোগিতার সেই মানসিকতা নয়, যা কেবল যেকোনো উপায়ে অন্যদের চেয়ে বড় হওয়াতে লক্ষ্য স্থির করে।

যুবক: অর্থাৎ জীবন কোনো প্রতিযোগিতা নয়।

দার্শনিক: হ্যাঁ, একদম তাই। অন্যদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় না গিয়ে আপন গতিতে সামনের দিকে এগিয়ে চলাই যথেষ্ট। এবং অবশ্যই, একজনের সঙ্গে অন্যজনের তুলনা করার কোনো প্রয়োজন নেই।

যুবক: না, তা অসম্ভব। যেকোনো বিষয়ই হোক না কেন—সবসময় অন্যদের সঙ্গে নিজেদের তুলনা করি। আর সেখান থেকেই আসলে হীনম্মন্যতার অনুভূতি সৃষ্টি হয়, তাই নয় কি?

দার্শনিক: একটি সুষ্ঠু হীনম্মন্যতার অনুভূতি অন্যদের সঙ্গে নিজেদের তুলনা থেকে আসে না বরং ‘আমার আদর্শ সত্তা’র সঙ্গে ‘আমার বিদ্যমান সত্তা’র তুলনা থেকে আসে।

যুবক: কিন্তু…

দার্শনিক: দেখ, আমরা প্রত্যেকেই অন্যজন থেকে আলাদা। অর্থাৎ লিঙ্গ, বয়স, জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, চেহারা—যেকোনো দিক বিবেচনায় কোনো দু’জনই অবিকল একরকম নয়। ইতিবাচকভাবেই এটি স্বীকার করে নেওয়া যাক যে, অন্যরা আমাদের থেকে ভিন্ন অথবা উল্টোটা। আমরা একই নই তবে, নিঃসন্দেহে সমান।

যুবক: একই নয়, তবে সমান; সেটা আবার কী?

দার্শনিক: হ্যাঁ, সত্য। প্রত্যেকেই আলাদা। তবে, সেই পার্থক্যকে ভালো ও মন্দ কিংবা উত্তম ও অধমের সঙ্গে গুলিয়ে ফেল না। আমাদের মধ্যে পার্থক্য যা কিছুই থাকুক না কেন, আমরা সবাই সমান।

যুবক: মানুষের মধ্যে কোনো শ্রেণিবিভেদ নেই—আদর্শগতভাবে বললে, আমি তাই বিশ্বাস করি। কিন্তু আমরা কি এখন বাস্তবতা সম্পর্কে একটি সৎ আলোচনার চেষ্টা করছি না? উদাহরণস্বরূপ, আপনি কি সত্যিই বলবেন—আমি, অর্থাৎ একজন প্রাপ্তবয়স্ক, আর যে শিশু এখনও তাঁর গণিতের সমস্যা নিয়ে খাবি খাচ্ছে, এই দুজন সমান?

দার্শনিক: অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান এবং দায়িত্বের প্রসঙ্গ বিবেচনায় এই দুয়ের মধ্যে পার্থক্য থাকবেই। শিশুরা হয়তো তাঁর জুতার ফিতা ঠিক মতো বাঁধতে, জটিল গাণিতিক সমীকরণের সমাধান করতে অথবা সমস্যার মুখে প্রাপ্তবয়স্কদের মতো সমপরিমাণ দায়িত্ব নিতে পারে না; কিন্তু এগুলোর সঙ্গে মানবিক মূল্যবোধের কোনো সম্পর্ক নেই। আমার বক্তব্য একই থাকছে—অর্থাৎ সকল মানুষই সমান কিন্তু একইরকম নয়।

যুবক: তাহলে আপনি বলছেন, শিশুর সঙ্গেও প্রাপ্তবয়স্ক একজন মানুষের মতোই আচরণ করা উচিত?

দার্শনিক: না, ঠিক তা নয়। তবে, একজন শিশুকে শিশু বা পূর্ণবয়স্ক হিসেবে নয় বরং মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন করা উচিত। একজন মানুষ যেভাবে নিজেকে মূল্যায়ন করে, একজন শিশুর সঙ্গে মিথস্ক্রিয়াতেও ঠিক একই আন্তরিকতা দেখানো উচিত।

যুবক: প্রশ্নটি একটু পাল্টে দেই। সকল মানুষই সমান। তাঁরা একই সমতলে অবস্থান করছে। কিন্তু সেক্ষেত্রেও কিছু বৈষম্য থেকে যায়, তাই নয় কি? যারা সামনের সারিতে থেকে এগিয়ে চলে তাঁরা উত্তম এবং যারা তাঁদের অনুগামী হয় তাঁরা অধম। তাহলে, ঘুরেফিরে আবার সেই উত্তম-অধম সমস্যাতেই নিপতিত হচ্ছি, তাই নয় কি?

দার্শনিক: না, তা নয়। সামনে বা পিছনে হাঁটা কোনো ব্যাপার নয়। এটি এমন একটি বিষয় যেন মনে হয় আমরা কোনো সমতল জায়গার ভিতর দিয়ে যাচ্ছি এবং এর কোনো উল্লম্ব অক্ষ নেই। অন্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার জন্যই আমরা হাঁটি না; বরং নিজের বর্তমানকে ছাপিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টার মধ্যেই প্রকৃত মূল্যবোধ নিহিত।

যুবক: আপনি কি সব ধরনের প্রতিযোগিতা থেকে মুক্ত হতে পেরেছেন?

দার্শনিক: অবশ্যই। আমি সামাজিক মর্যাদা বা সম্মানের কথা চিন্তা করি না। এমনকি অন্য গ্রহ থেকে আগত এবং ইহ-জাগতিক কোনো প্রকার প্রতিযোগিতার সঙ্গে যোগসূত্রহীন একজন দার্শনিক হিসেবে আমার জীবনযাপন করি।

যুবক: এর অর্থ কি আপনি প্রতিযোগিতা থেকে বাদ পড়ে গেছেন? নাকি অনিবার্য জেনে পরাজয় মেনে নিয়েছেন?

দার্শনিক: না, কোনোটিই নয়। আমি সেই সমস্ত জায়গা থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছি যেখানে সবাই কেবল জয়-পরাজয় নিয়ে ব্যস্ত। যখন কেউ তাঁর নিজের আদর্শ সত্তার মতো হতে চায় তখন সেই অভিযাত্রায় আপনা থেকেই প্রতিযোগিতা এসে যায়।

যুবক: অসম্ভব। এ হলো এক ক্লান্ত-বিধ্বস্ত বৃদ্ধের যুক্তি। আমার মতো তরুণ-যুবাদের প্রতিযোগিতার চাপের মধ্য দিয়ে এবং নিজেদের সামর্থ্যের ওপর ভর করে এগিয়ে যেতে হয়। এটি এজন্য যে, আমার পাশে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায়, আমি নিজেকে ছাড়িয়ে যেতে পারছি না। পারস্পরিক সম্পর্ককে প্রতিযোগিতামূলক ভাবায় দোষ কোথায়?

দার্শনিক: যদি সেই প্রতিদ্বন্দ্বীকে তুমি সহযোদ্ধা বলতে পারো, তাহলে তা আত্মউন্নয়নের পথ দেখাতে পারে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই সে তোমার সহযোদ্ধা হবে না।

যুবক: প্রকৃতপক্ষে, এর অর্থ কী তাহলে?


কেবল তুমিই তোমার অবয়ব নিয়ে উদ্বিগ্ন

দার্শনিক: দুর্বল জায়গাগুলোকে স্পষ্ট করে নেওয়া যাক। একেবারেই শুরুর দিকে তুমি অ্যাডলারের তত্ত্ব—‘সকল সমস্যার মূলেই রয়েছে আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্কের সমস্যা’ বিষয়ে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছিলে, তাই না? সেটাই ছিল হীনম্মন্যতার অনুভূতি সম্পর্কিত আমাদের আলোচনার মূল বিষয়বস্তু।

যুবক: হ্যাঁ, ঠিক বলেছেন। হীনম্মন্যতার অনুভূতি সম্পর্কিত আলোচনাটি খুবই গভীর ছিল। আর হ্যাঁ! আমি তা প্রায় ভুলতে বসেছিলাম। আপনি শুরুতেই এমন একটি আলোচনার সূত্রপাত করেছিলেন কেন?

দার্শনিক: মনে রেখ, এর সঙ্গে প্রতিযোগিতার যোগসূত্র রয়েছে। কোনো ব্যক্তির আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্কের মজ্জাতেই যদি প্রতিযোগিতা থাকে, সে কখনও আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্কের সমস্যা কিংবা দুর্ভাগ্য থেকে মুক্তি পাবে না।

যুবক: কেন নয়?

দার্শনিক: কারণ প্রতিযোগিতা শেষে বিজয়ী এবং বিজিত থাকবেই।

যুবক: বিজয়ী এবং বিজিত থাকা তো খুবই ভালো ব্যাপার!

দার্শনিক: এটি যদি তোমার ক্ষেত্রে হয়—যে কিনা নিজের চারপাশের মানুষের সঙ্গে প্রতিযোগিতার বিষয়ে সচেতন —তাহলে বিষয়টি নিয়ে আরেকটু ভেবে দেখ। তাঁদের সঙ্গে তোমার সম্পর্কের মধ্যে কখনই তুমি জয় বা পরাজয় ব্যতীত অন্য কিছু চিন্তাই করতে পারবে না। তোমার মাথার মধ্যে সারাক্ষণ থাকবে জনাব ‘ক’ অমুক বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে, জনাব ‘খ’ বিরাট বড় কোম্পানিতে চাকরি পেয়েছে, আর জনাব ‘গ’ একজন অসাধারণ আকর্ষণীয় নারীর সঙ্গে ডেটিং করছে—তাঁদের সঙ্গে নিজেকে তুলনা করবে এবং ভাববে, ‘আমার প্রাপ্তি তো এই এতটুকুই’।

যুবক: হাহ্‌…হা! একদম ঠিক বলেছেন।

দার্শনিক: কেউ যদি প্রতিযোগিতা এবং জয়-পরাজয় সম্পর্কে অতিমাত্রায় সচেতন হয়, তবে হীনম্মন্যতার অনুভূতি হবেই, এটি অবধারিত। কারণ সে নিজেকে সারাক্ষণ অন্যের সঙ্গে তুলনা করতে থাকে এবং ভাবতে থাকে—আমি ঐ লোকটাকে হারিয়েছি অথবা তাঁর কাছে হেরে গেছি। হীনম্মন্যতা-জটিলতা এবং শ্রেষ্ঠত্ব-জটিলতা এই ধরনের চিন্তারই উপজাত। এই অবস্থায় অন্য মানুষটিকে তোমার নিকট কী রকমের সত্তা বলে মনে হয়?

যুবক: আমি জানি না, তবে…ধারণা করি—একজন প্রতিদ্বন্দ্বী?

দার্শনিক: না, কেবল একজন প্রতিদ্বন্দ্বীই নয়। নিজের অজান্তেই তুমি প্রত্যেককে…পৃথিবীর সকল মানুষকেই তোমার শত্রু হিসেবে দেখতে শুরু করে দাও।

যুবক: আমার শত্রু?

দার্শনিক: তুমি ভাবতে শুরু কর যে, মানুষ সবসময় তোমাকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করছে এবং অবজ্ঞার চোখে দেখছে। তাঁরা সবাই যেন তোমার শত্রু এবং কখনই তাঁদের হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়। তাঁরা যেন অপেক্ষায় রয়েছে এবং সুযোগ পেলেই মুহূর্তের মধ্যে আক্রমণ করবে। সংক্ষেপে বলতে হয়—এই পৃথিবী যেন একটি ভীতিকর স্থান।

যুবক: শত্রু—যাদের কখনও হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়… এবং সেই তাঁদের সঙ্গেই আমি প্রতিযোগিতা করছি?

দার্শনিক: এটিই হলো প্রতিযোগিতার ভীতিকর দিক। যদি কখনও পরাজিত না হও, কেবল জিততেই থাক, তবুও শুধু প্রতিযোগিতায় যোগ দেওয়ার কারণেই তুমি ক্ষণিকের জন্যেও শান্তি পাবে না। তুমি পরাজিত হতে চাও না…যদি তা না চাও তাহলে সবসময় জিততে হবে। তুমি অন্য কাউকে বিশ্বাস করতে পার না। কারণ এমন অনেক মানুষ রয়েছে যারা সামাজিক দৃষ্টিতে সফলতা লাভ করতে থাকলেও সারাক্ষণ প্রতিযোগিতার মধ্যে থাকার ফলে সেই আনন্দটা অনুভব করতে পারে না। তাঁদের নিকট পৃথিবী হলো শত্রুতে ভরপুর একটি ভয়ঙ্কর জায়গা।

যুবক: আমিও তাই মনে করি, কিন্তু…

দার্শনিক: কিন্তু আসলেই কি তোমার দিকে তাকিয়ে অন্যরা এত বেশি পরিমাণ সময় নষ্ট করে? তাঁরা কি চব্বিশ ঘণ্টা তোমাকে পর্যবেক্ষণ করে এবং আক্রমণ করার উপযুক্ত সময়ের অপেক্ষায় থাকে? এটা খুবই অস্বাভাবিক বলে মনে হয়। আমার একজন বন্ধু আছে; সে কৈশোরে আয়নার সামনে বসে কেশ বিন্যাসে যথেষ্ট সময় ব্যয় করত। একদিন সে যখন এমনটা করছিল তখন তাঁর দাদী বলেন, ‘তুমিই একমাত্র ব্যক্তি যে নিজের চেহারা নিয়ে উদ্বিগ্ন’। তাঁর ভাষ্যমতে এ ঘটনার পর থেকেই তাঁর জীবন চলার পথ অনেক সহজ হয়ে গেছে।

যুবক: আপনি নিশ্চয়ই আমাকে ব্যঙ্গ করছেন, তাই না? অবশ্যই, হতে পারে আমি আশেপাশের মানুষদের শত্রু হিসেবে দেখি। সবসময় আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে থাকি; মনে হয় যেকোনো মুহূর্তে একটি তীর উড়ে এসে আমাকে আঘাত করতে পারে। সবসময় মনে হয় অন্যরা আমার ওপর নজরদারি করছে, চুলচেরা বিচার-বিশ্লেষণ করছে, এবং আমি আক্রান্ত হতে যাচ্ছি। এই বিষয়টি সম্ভবত আয়নায় নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকা কিশোরের মতো আত্মসচেতনতার প্রতিক্রিয়া। পৃথিবীর মানুষ আমার দিকে মনোযোগ দেয় না। এমনকি তাঁদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য যদি হাতের ওপর ভর দিয়ে উল্টোভাবে রাস্তায় হেঁটে যাই, তাও তাঁরা লক্ষ্য করবে না! কিন্তু আমি আসলে জানি না… সর্বোপরি আপনি কি বলছেন, আমার হীনম্মন্যতার অনুভূতি নিজেই বেছে নিয়েছি? এবং, এর কোনো লক্ষ্য আছে? এই কথাগুলো আমার নিকট অর্থবহ কিছু মনে হয় না।

দার্শনিক: এ কথা কেন বলছ?

যুবক: আমার চেয়ে তিন বছরের বড় আমার একটি ভাই আছে। সে হলো বড় ভাইয়ের পরিচিত চিত্রের একেবারে আদর্শ প্রতিরূপ। সবসময় বাবা-মায়ের একান্ত বাধ্যগত, পড়াশোনা ও খেলাধুলায় চমৎকার ফলাফল করে, এবং অধ্যবসায়ের জ্বলন্ত উদাহরণ। ছোটবেলা থেকেই আমাকে সবসময় তাঁর সঙ্গে তুলনা করা হয়। সে বয়সে বড় এবং অধিকতর অগ্রগামী হওয়ায় আমি কোনো ক্ষেত্রেই তাঁকে কখনও হারাতে পারিনি। বাবা-মা এই পরিস্থিতিকে একেবারেই বুঝতে চাননি এবং আমার কোনো কিছুকেই কখনও স্বীকৃতি দেননি। আমি যা-ই করতাম না কেন, আমাকে নিতান্তই শিশু হিসেবে গণ্য করা হতো, প্রতিটি সুযোগে তিরস্কার করা হতো এবং চুপ থাকতে বলা হতো। সেই থেকেই আমার অনুভূতিগুলো নিজের মধ্যে চেপে রাখতে শিখেছি। সহজভাবে বলতে হয়, আমি হীনম্মন্যতার অনুভূতির কূপের মধ্যে জীবন কাটিয়েছি। এজন্য বড় ভাইয়ের সঙ্গে সবসময় একটি প্রতিযোগিতা-প্রতিযোগিতা আবহে থাকা ছাড়া আমার পক্ষে অন্য কোনোভাবে জীবনযাপনের সুযোগ ছিল না।

দার্শনিক: আচ্ছা…

যুবক: কখনও মনে হয়—আমি যেন পর্যাপ্ত সূর্যালোক না পেয়ে বেড়ে ওঠা একটি লাউ। অর্থাৎ এটি খুবই স্বাভাবিক যে, আমি হীনম্মন্যতার অনুভূতি দ্বারা চরমভাবে প্রভাবিত। যদি এমন কাউকে পাওয়া যায় যিনি বর্ণিত পরিস্থিতিতে সোজা হয়ে সঠিকভাবে বেড়ে উঠেছেন, তাহলে সত্যিই আমি তাঁর সঙ্গে আন্তরিকভাবে দেখা করতে চাই।

দার্শনিক: তোমার বিষয়টি বুঝতে পারছি। হ্যাঁ, সত্যিকার অর্থেই তোমার অনুভূতি বুঝতে পারছি। তোমার ভাইয়ের সঙ্গে তোমার সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে ‘প্রতিযোগিতা’ সম্পর্কে আলোচনা করা যাক। যদি তুমি তোমার ভাই এবং অন্যান্য আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতার মনোভাব নিয়ে না ভাবতে, তাহলে মানুষ তোমার কাছে কেমন মনে হতো?

যুবক: হ্যাঁ, সেক্ষেত্রে ভাই তো ভাই, এবং অন্য মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের গল্প নিশ্চয়ই অন্য কিছু হতো।

দার্শনিক: না, তাঁরা অধিকতর ইতিবাচক সহযোদ্ধা হতে পারতেন।

যুবক: সহযোদ্ধা?

দার্শনিক: ‘আমি অন্যদের সুখ পুরোপুরি মন থেকে উদ্‌যাপন করতে পারি না’—তুমি কি ইতোপূর্বে একথা বলনি? তুমি আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্কগুলোকে প্রতিযোগিতা হিসেবে ভাবো; অন্যদের সুখকে তোমার পরাজয় হিসেবে দেখো, এবং এ কারণেই তা উদযাপন করতে পারো না। তবে, একবার এই প্রতিযোগিতার ধারণা থেকে বের হতে পারলে অন্যকে হারানোর উপযোগিতা আর থাকে না। সেইসঙ্গে ‘আমি হয়তো হেরে যেতে পারি’—এই ভীতির নাগপাশ থেকেও মুক্তি পাওয়া যায়। তখন একজন পুরোপুরি অন্তর থেকে অন্যদের সুখ উদ্‌যাপন করতে পারে। এমনকি অন্যদের সুখে সক্রিয়ভাবে অবদান রাখতে সক্ষম হয়। প্রয়োজনের সময় অন্যকে সাহায্য করার মানসিকতা যার মধ্যে রয়েছে, তাঁকেই প্রকৃতপক্ষে ‘সহযোদ্ধা’ বলা যেতে পারে।

যুবক: হুম্‌ম…বুঝতে পারছি।

দার্শনিক: এবার আমরা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশে এসে পৌঁছেছি। যখন সত্যিকার অর্থে অনুভব করতে পারবে যে, ‘মানুষ মাত্রই আমার সহযোদ্ধা’—তখন পৃথিবীর প্রতি তোমার দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণরূপে পরিবর্তন হয়ে যাবে। পৃথিবীকে আর ভয়ঙ্কর কোনো স্থান মনে হবে না এবং অনর্থক সন্দেহের বাতিকগ্রস্ততায় আক্রান্ত হবে না। পৃথিবী তোমার নিকট একটি নিরাপদ ও আনন্দদায়ক স্থান হিসেবে আবির্ভূত হবে। একইসঙ্গে তোমার আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্কের সমস্যাগুলো নাটকীয়ভাবে হ্রাস পাবে।

যুবক: আহ্‌, আপনি কী সুখেই না আছেন! কিন্তু আপনি জানেন—এগুলো সবই সূর্যমুখী তত্ত্বের মতো। প্রতিদিন সূর্যের আলোতে পরিপূর্ণ স্নান এবং পর্যাপ্ত পানির পরিচর্যায় লালিত বলেই সূর্যমুখীর সৌন্দর্য পূর্ণমাত্রায় বিকশিত হয়। অন্যদিকে, মৃদু আলোর ছায়াযুক্ত স্থানে বেড়ে ওঠা লাউ ততটা ভালো করতে পারে না।

দার্শনিক: তুমি আবার ঈটিওলজি’র (কারণ নির্ধারণ) দিকে ফিরে যাচ্ছো।

যুবক: হ্যাঁ, অবশ্যই!

কঠোর বাবা-মায়ের শাসনে বেড়ে ওঠা সেই যুবক শৈশব থেকেই নিপীড়িত ছিল এবং সবসময় তাঁর বড় ভাইয়ের সঙ্গে তাঁর তুলনা করা হতো। তাঁর কোনো মতামত কখনও ঠিকভাবে শোনা হতো না, বরং তাঁকে কঠোর ভাষায় একজন ‘অযোগ্য ছোট ভাই’ হিসেবে তিরস্কার করা হতো। স্কুলেও সে বন্ধু তৈরি করতে ব্যর্থ হয়, ফলে বিরতির সমস্ত সময়টা স্কুলে তাঁর একমাত্র ভরসার স্থল হয়ে ওঠা গ্রন্থাগারে একা একা কাটিয়ে দিত। শৈশবে এমন রুক্ষ, নীরস পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাওয়া সেই যুবক সত্যিকার অর্থে ‘ঈটিওলজি’র বাসিন্দা ছিল। যদি সে অমন বাবা-মায়ের কঠোর শাসনে বেড়ে না উঠত; যদি ওই রকম একজন বড় ভাই কখনও না থাকত; এবং যদি সে ওই স্কুলে না পড়ত, তাহলে তাঁর জীবন আরও উজ্জ্বল হতে পারত। যুবকটি যতটা সম্ভব ঠান্ডা মাথায় আলোচনায় অংশ নেওয়ার চেষ্টা করছিল, কিন্তু বুকের মধ্যে পাথর চাপা দিয়ে রাখা তাঁর বহু বছরের অনুভূতি হঠাৎ বিস্ফোরিত হয়ে বেরিয়ে এলো।

/জেড-এস/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
দ্রুতই জাতীয় গ্রিডে রূপপুরের প্রথম ইউনিটের বিদ্যুৎ সরবরাহের আশ্বাস রোসাটমের
দ্রুতই জাতীয় গ্রিডে রূপপুরের প্রথম ইউনিটের বিদ্যুৎ সরবরাহের আশ্বাস রোসাটমের
ভারতের ২৪৯ রান টপকে ওয়েস্ট ইন্ডিজের অবিশ্বাস্য জয়
ভারতের ২৪৯ রান টপকে ওয়েস্ট ইন্ডিজের অবিশ্বাস্য জয়
স্তন ক্যানসার সচেতনতা দিবস আজ
স্তন ক্যানসার সচেতনতা দিবস আজ
অপরাধ চক্রের ‘রাঘববোয়ালেরা’ থেকে যাচ্ছে ধরা-ছোঁয়ার বাইরে
অপরাধ চক্রের ‘রাঘববোয়ালেরা’ থেকে যাচ্ছে ধরা-ছোঁয়ার বাইরে
সর্বাধিক পঠিত
ভিআইপি লাউঞ্জে ‘ডিআইজি’ পরিচয় দেওয়া অতিরিক্ত ডিআইজি বরখাস্ত
ভিআইপি লাউঞ্জে ‘ডিআইজি’ পরিচয় দেওয়া অতিরিক্ত ডিআইজি বরখাস্ত
শাবনূরের অনুরোধে সিডনির রাস্তায় গান গাইলেন রবি চৌধুরী
শাবনূরের অনুরোধে সিডনির রাস্তায় গান গাইলেন রবি চৌধুরী
এক বড় দলের সা. সম্পাদকের নাকি ৭০০ অটোরিকশা: ডিএনসিসি প্রশাসক  
এক বড় দলের সা. সম্পাদকের নাকি ৭০০ অটোরিকশা: ডিএনসিসি প্রশাসক  
ইলিশ বিক্রি করায় তিন হোটেলকে ৬০ হাজার টাকা জরিমানা
ইলিশ বিক্রি করায় তিন হোটেলকে ৬০ হাজার টাকা জরিমানা
১ কোটি ৬২ লাখ টাকায় ৪০ হাজার ইউনিফর্ম তৈরি কেএনএফের, ৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা
১ কোটি ৬২ লাখ টাকায় ৪০ হাজার ইউনিফর্ম তৈরি কেএনএফের, ৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা