ক্ষমতার লড়াই থেকে প্রতিশোধ পর্যন্ত
যুবক: আচ্ছা। টেলিওলজি সম্পর্কিত এই সব আলোচনা, খাঁটি সুফিবাদ এবং ট্রমার অস্তিত্ব অবশ্যই বিদ্যমান। আর মানুষ কোনোভাবেই তাঁর অতীত থেকে নিজেকে আলাদা করতে পারে না। নিশ্চয়ই আপনি তা বুঝতে পারছেন? আমরা তো সময়-যন্ত্রে বসে অতীতে ফিরে যেতে পারি না। অতীত যতক্ষণ অতীত হিসেবে বিদ্যমান থাকে, ততক্ষণ আমরা অতীতের চৌহদ্দিতেই অবস্থান করি। অতীতকে ‘অস্তিত্বহীন’ কোনোকিছু হিসেবে গণ্য করা হলে তা নিতান্তই নিজের যাপিত জীবনকে অস্বীকার করা বৈ অন্য কিছু হবে না। আপনি কি আমাকে এমন এক দায়-দায়িত্বহীন জীবন বেছে নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন?
দার্শনিক: এ কথা সত্য যে আমরা সময়-যন্ত্রে ভ্রমণ করতে অথবা হারিয়ে যাওয়া সময়কে ফিরিয়ে আনতে পারি না। কিন্তু অতীতের ঘটে যাওয়া ঘটনায় নতুন করে কোনো অর্থ সংযোজনের সুযোগ আছে কি? এটি হলো সেই কাজ যা ‘তোমাকে এখন’ অর্থাৎ বর্তমানকে নিয়ে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে।
যুবক: ঠিক আছে। তাহলে এখন আমরা ‘বর্তমান’ নিয়ে আলোচনা করি। গতবারে বলেছিলেন মানুষ রাগের অনুভূতিকে ইচ্ছাকৃতভাবে তৈরি করে, তাই না? আর সেটাই হলো টেলিওলজির মূল ভিত্তি। আমি অদ্যাবধি এই বিবৃতিকে গ্রহণ করতে পারিনি। উদাহরণ হিসেবে—সমাজ অথবা সরকারের প্রতি রাগের অনুভূতিকে আপনি কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন? তারপরও কি আপনি বলবেন যে, নিজের ইচ্ছাকে অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার জন্য মানুষ পরিকল্পিতভাবে আবেগকে ব্যবহার করে?
দার্শনিক: অবশ্যই; মাঝেমধ্যে আমি সামাজিক সমস্যাগুলোর বিষয়ে তীব্র ক্ষোভ অনুভব করি। তবে আমি বলব, এটি হঠাৎ অনুভূত আবেগের চেয়ে বরং যুক্তির ভিত্তিতে তৈরি হওয়া ক্ষোভ। ব্যক্তিগত ক্রোধ (অতীতের ক্ষত বা অপমানের প্রতিশোধ স্পৃহা) এবং সমাজের অসংগতি ও অবিচারের প্রতি ক্ষোভ (ন্যায়সংগত ক্ষোভ)-এর মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। ব্যক্তিগত ক্রোধ দ্রুতই স্তিমিত হয়ে যায়; অন্যদিকে, ন্যায়সংগত ক্ষোভ দীর্ঘস্থায়ী হয়। অতীতের ক্ষত বা অপমানের প্রতিশোধ স্পৃহা হিসেবে প্রকাশিত ক্রোধ আসলে অন্যদের বশে আনার একটি কৌশল মাত্র।
যুবক: আপনি বলছেন অতীতের ক্ষত বা অপমানের প্রতিশোধ নেওয়ার ব্যক্তিগত ক্রোধ এবং সমাজের অসংগতি ও অবিচারের প্রতি ন্যায়সংগত ক্ষোভ সম্পূর্ণ আলাদা?
দার্শনিক: এই দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। কারণ ন্যায়সংগত ক্ষোভ কারও ব্যক্তিগত বিষয়কে ছাপিয়ে সমাজের কথা বলে।
যুবক: সেক্ষেত্রে আমি কেবল ব্যক্তিগত ক্রোধের বিষয়ে কথা বলব। উদাহরণ হিসেবে ধরুন কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই কেউ একজন আপনাকে গালি দিল, তখন নিশ্চয়ই আপনিও রাগান্বিত হন, তাই না?
দার্শনিক: না, আমি রেগে যাই না।
যুবক: সততার সঙ্গে বলুন!
দার্শনিক: যদি কেউ সামনাসামনি আমাকে গালি দেয়, তবে ধরে নেব তাঁর অন্য কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে। মুখোমুখি সাক্ষাতে গালি না দিলেও কারও কথায় বা আচরণে যদি তুমি সত্যিকারের অপমান বা ক্রোধ অনুভব কর, তাহলে ধরে নাও যে ঐ ব্যক্তি তোমাকে ক্ষমতার লড়াইয়ে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে।
যুবক: ক্ষমতার দ্বন্দ্ব?
দার্শনিক: উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে—একজন শিশু তাঁর নানাবিধ বালখিল্য বা অশোভন আচরণের দ্বারা একজন বয়োজ্যেষ্ঠকে ত্যক্তবিরক্ত করে। অনেক ক্ষেত্রেই এটি করা হয় মনোযোগ আকর্ষণের লক্ষ্যে এবং প্রকৃতপক্ষে রাগান্বিত হওয়ার পূর্বমুহূর্তেই কেবল সে থামে। কিন্তু যদি বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি খেপে যাওয়ার পূর্বমুহূর্তে শিশুটি না থামে তার অর্থ হলো সে সত্যিকারই ঐ ব্যক্তির সঙ্গে লড়াইয়ে লিপ্ত হতে চাচ্ছে।
যুবক: সে লড়াইয়ে লিপ্ত হতে চাইবে কেন?
দার্শনিক: কারণ সে জিততে চায়। বিজয়ের মাধ্যমে সে তাঁর ক্ষমতাকে জাহির করতে চায়।
যুবক: আমি আসলে বুঝতে পারছি না। আপনি আরও কিছু সুনির্দিষ্ট উদাহরণ দিতে পারেন কী?
দার্শনিক: ধরো, তুমি আর তোমার বন্ধু বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করছিলে। কিছুক্ষণের মধ্যে তা উত্তপ্ত তর্কযুদ্ধে পরিণত হলো। তোমাদের কেউই নিজ নিজ মতামতের বাইরের ভিন্ন কিছু গ্রহণ করতে সম্মত নও যতক্ষণ পর্যন্ত না সে ‘তুমি একটা গাধা, তোমার মতো মানুষদের কারণেই দেশের কোনো পরিবর্তন সম্ভব হচ্ছে না, এবং এমন আরও অনেক কিছু’ বলে তোমাকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ শুরু করে।
যুবক: কিন্তু আসলেই যদি কেউ আমাকে এমন কিছু বলে তবে, আমি তা সহ্য করতে পারব না।
দার্শনিক: এই ক্ষেত্রে অন্য লোকটির উদ্দেশ্য কী? সে কি কেবল রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করতে চায়? না, আসলে তা নয়। বরং এজন্য যে, তুমি তাঁর নিকট তখন অসহনীয় হয়ে উঠেছ; সে তোমাকে সমালোচনা ও প্ররোচিত করতে চায়। আর এভাবে ক্ষমতার লড়াইয়ে দক্ষতা প্রদর্শনের মাধ্যমে তোমাকে বশে আনতে চায়। এই মুহূর্তে তোমার রেগে যাওয়ার অর্থ হলো তাঁর প্রত্যাশিত সেই মাহেন্দ্রক্ষণ এসে যাওয়া এবং হঠাৎ করে তোমাদের সম্পর্কটি ক্ষমতার দ্বন্দ্বে রূপান্তরিত হবে। প্রলুব্ধক যাই হোক না কেন সে ফাঁদে তোমার পা দেওয়া চলবে না।
যুবক: না, এখান থেকে পালানোর কোনো প্রয়োজন নেই। যদি কেউ লড়াই শুরু করতে চায় তাহলে তা গ্রহণ করে নেওয়াই উত্তম। কারণ এটি হলো অপর ব্যক্তির সমস্যা। আপনি সেই নির্বোধ গাধার নাকে আচমকা প্রচণ্ড আঘাত করতে পারেন; অবশ্যই কেবল কথার দ্বারা।
দার্শনিক: এখন, ধরো ঝগড়ার নিয়ন্ত্রণ তুমি নিজের হাতে নিয়ে নিলে। আর সেই লোকটি, যে তোমাকে হারাতে চেয়েছিল, খেলোয়াড়সুলভ মনোভাব দেখিয়ে সে লড়াই থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নিল। বিষয়টি হলো ক্ষমতার সে লড়াই এখানেই সমাপ্ত হবে না। বিতর্কে হেরে গিয়ে সে তাঁর পরবর্তী চালে প্রবেশ করবে।
যুবক: পরবর্তী চাল?
দার্শনিক: হ্যাঁ, এটি হলো প্রতিশোধ স্তর। যদিও সে সাময়িকভাবে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেয়, সে অন্যত্র অন্য কোনো পরিকল্পনা নিয়ে প্রতিশোধ নেওয়ার চেষ্টা করে। সর্বোপরি প্রত্যাঘাত করার ইচ্ছা নিয়ে পুনরাবির্ভূত হয়।
যুবক: যেমন? একটি উদাহরণ দিন।
দার্শনিক: বাবা-মা কর্তৃক নির্যাতিত সেই শিশুটি এ পর্যায়ে ছোটো-খাটো অপরাধ করতে শুরু করবে। সে স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দেবে কিংবা হাতের কবজি কাটার চেষ্টা করবে। অর্থাৎ নিজের জন্য ক্ষতিকর কোনো কর্মকাণ্ড সম্পাদনের প্রয়াস চালাবে। ফ্রয়েডের ঈটিওলজি অনুযায়ী এই আচরণকে বলা হয় সাধারণ কারণ ও তার প্রভাব: বাবা-মা এভাবেই তাঁকে লালন করেছেন এবং সে-কারণেই শিশুটি এই আচরণ নিয়ে বেড়ে উঠেছে। একটি চারা গাছে পানি না দেওয়ায় গাছটি শুকিয়ে যাওয়ার ঘটনার দিকেই বিষয়টি অঙ্গুলি নির্দেশ করে। এটি অবশ্যই সহজবোধ্য একটি উদাহরণ। কিন্তু অ্যাডলারের টেলিওলজি শিশুটির আচরণের অন্তর্নিহিত লক্ষ্য অর্থাৎ বাবা-মার ওপর প্রতিশোধ গ্রহণের বিষয়টি অনুধাবন করতে পারে না তা নয়। যদি সে অপরাধী হয়, স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দেয়, হাতের কবজি কাটে কিংবা এমন ধরনের অন্যান্য অপরাধের দ্বারা নিজের ক্ষতি করে, তাহলে তাঁর বাবা-মা বিচলিত হয়ে পড়বেন। তাঁরা সন্তানকে নিয়ে আতঙ্ক ও উদ্বেগে অসুস্থ হয়ে পড়বেন। অতীতের কারণ (পারিবারিক পরিবেশ) দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে নয় বরং উক্ত বিষয়টি জেনে সচেতনভাবেই শিশুটি সমস্যাযুক্ত আচরণে লিপ্ত হয়; যাতে তাঁর বর্তমান লক্ষ্য (বাবা-মার ওপর প্রতিশোধ গ্রহণ) অর্জিত হয়।
যুবক: বাবা-মাকে বিচলিত করার নিমিত্ত শিশুটি সমস্যাযুক্ত আচরণে (problematic behaviour) লিপ্ত হয়?
দার্শনিক: একদম ঠিক। সম্ভবত অনেকেই একটি শিশুকে নিজের কবজি কাটতে দেখে বিভ্রান্ত বোধ করেন এবং ভাবেন, ‘সে কেন এমন কিছু করবে’? কিন্তু ভাবতে চেষ্টা করুন, শিশুটির চারপাশের মানুষ —যেমন: বাবা-মা—শিশুটির কবজি কাটার মতো এই জঘন্য আচরণের ফলে তাঁদের অনুভূতি কী হতে পারে। তুমি যদি তা অনুধাবন করতে পার, তবে শিশুর এমন আচরণের পিছনের উদ্দেশ্যটাও আপনা থেকেই পরিষ্কার হয়ে যাবে।
যুবক: প্রতিশোধ নেওয়াই লক্ষ্য?
দার্শনিক: হ্যাঁ। আর যখন আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্ক প্রতিশোধের পর্যায়ে পৌঁছে যায়, তখন উভয় পক্ষের জন্যই একটি সুষ্ঠু সমাধান খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। এমনটি যাতে না ঘটে, সে জন্য কেউ ক্ষমতার লড়াইয়ে আমন্ত্রণ জানালে নিজেকে কখনও এর ফাঁদে পড়তে দেওয়া উচিত নয়।