X
সকল বিভাগ
সেকশনস
সকল বিভাগ
সাম্প্রতিক ফিলিস্তিনি গল্প

দুটি অন্ধকার রাত এবং অভীষ্ট সুখের চেষ্টা ।। বারাহ কানদীল

আপডেট : ২১ মে ২০২১, ০০:৩১

সময় সকাল ৩টা ৫০ মিনিট
আমি আমার বিছানায় বসে আছি এবং আমার একমাত্র বোন পাশেই ঘুমিয়ে আছে। আমরা আমাদের বিছানা পাশাপাশি রেখেছি এবং সমস্ত ঘরের মধ্যে সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা হিসেবে চিহ্নিত করেছি।

সময় সকাল ৩টা ৫৫ মিনিট

আমি একটা সিনেমা দেখছিলাম, যার নাম ‘দ্য প্যারসিউট অব হ্যাপিনেস’। ঘরের বাইরে প্রায় অবিরাম বোমা হামলা থেকে নিজেদের বিভ্রান্ত করার জন্য আমার বোন এবং আমি সিনেমা দেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। আমাদের সিদ্ধান্ত মোটামুটি কাজ করেছে, অন্তত আমার বোনের জন্য। কেননা সিনেমাটি শেষ হওয়ার আগেই সে ঘুমের অতলে তলিয়ে যায়। আমি ঘুমাইনি। বাইরে যা ঘটছে, তা ভুলে যাওয়ার একটি আশাহীন প্রচেষ্টা হিসাবে আমি সিনেমা দেখতে থাকি, কিন্তু আমি কাকে বোকা বানাচ্ছি? আমি ভাবতে পারি না! সিনেমা শেষ হওয়ার পাঁচ মিনিট আগে আসল বিষয়টি আমার মস্তিষ্কে এসে হাজির হয়। সেই মুহূর্তে আমি বিরতি টানি এবং মনে হয় আমার মস্তিষ্কও থেমে গেছে। আমার গাল বেয়ে অঝোর ধারায় অশ্রুর ঢল বয়ে যায়, কিন্তু আমি হেঁচকি থেকে নিজেকে সংযত রাখি। কারণ আমি চাই না সে সময় আমার বোন জেগে উঠুক এবং দেখুক আমি কতটা ভঙ্গুর।
আমার মনের মধ্যে আজেবাজে চিন্তা ভেঙে চুরমার হচ্ছিল। আমি কি সকালে নিরাপদে এবং অক্ষত শরীরে জেগে উঠবো? নাকি আমি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের শহিদদের ঘোষিত পরবর্তী দীর্ঘ এবং ক্রমাগত হালনাগাদ করা তালিকায় নতুন নাম হতে যাচ্ছি? আমার নাম কি আমার পরিবারের অন্যান্য সদস্যের নামের সঙ্গে থাকবে? নাকি আমাকে পুনরায় জীবন এবং ‘সুখ’ অনুসরণ করার আরেকটি সুযোগ দেওয়া হবে– ক্রিস গার্ডেনার (চরিত্রে অভিনয় করেছেন উইল স্মিথ) সিনেমায় যেমন করেছেন?
খারাপ স্মৃতিরাও ত্রস্তব্যস্ত হয়ে আমার মনের মধ্যে এসে জমা হচ্ছিল। আমি যে সমস্ত ভয় ও আতঙ্ক অনুভব করেছি, যে সব বিকট আওয়াজ যা আমার মাথায় ক্রমাগত কড়া নাড়ছে, সেই সব আমাকে মনে করিয়ে দিচ্ছে যে সেদিন মৃত্যু আমাদের থেকে খুব বেশি দূরে ছিল না। সাত বছর আগে আলশুজায়া জেলায় অবস্থিত আমাদের পুরানো বাড়ির সরু বারান্দায় আমরা একসঙ্গে জড়াজড়ি করে লুকিয়ে থেকেছি। সাত বছর আগের সেই নির্দিষ্ট রাতে ফিরে যাওয়ার জন্য যেন ক্রিস গার্ডেনার আমাকে তার বিশেষ টাইম মেশিন ধার দিয়েছে। তখন সময় ছিল দিনের বেলা। আমি নিশ্চিত নই যে, সেটা কোন দিন ছিল। কারণ গাজায় তৃতীয় যুদ্ধের দশ দিনের পরে আমি গণনা বন্ধ করে দিয়েছি। পরিস্থিতি আরও গুরুতর হয়ে উঠেছিল এবং গুরুত্ব বোঝাতে গেলে আমাকে বলতে হয় যে, আমি বিপজ্জনক বোঝাতে চাইছি!
আমার বাবা আতঙ্কিত ছিলেন। তার তত্ত্বাবধানে ছয় জন ছিল। আমাদের চারপাশে অনেকবার বিমান হামলা এবং কয়েক ডজন বোমা এলোপাথারি নিক্ষেপ করা হয়েছিল। আমরা সবাই আমাদের ছোট বাড়ির সেই সরু বারান্দার মেঝেতে শুয়েছিলাম। বোমা বর্ষণ থামেনি, তাই আমরা ঘুমাতে পারিনি। হে সৃষ্টিকর্তা, তারা চায়নি আমরা বিশ্রাম গ্রহণ করি! তখন ছিল আমাদের পবিত্র রমজান মাস এবং সেহেরির সময়। কিন্তু আমরা কেউই এক গ্লাস পানি পান করার জন্য উঠে দাঁড়ানোর সাহস দেখাইনি। আমার বাবা আমাদের খাবারের জন্য একগুচ্ছ টমেটো আনতে ফ্রিজের দিকে আক্ষরিক অর্থে হামাগুড়ি দিয়ে গিয়েছিলেন।
সকাল হওয়ার পরে আমরা কয়েকজন প্রায় এক ঘণ্টা ঘুমিয়েছিলাম। বাবার কথা শুনে আমরা জেগে উঠি, ‘জলদি ওঠো এবং কিছু কাপড়চোপড় নিয়ে নাও। আমরা বাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছি!’ একবার কল্পনা করুন বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য পাঁচ মিনিটেরও কম সময়ের মধ্যে তৈরি হওয়ার সঙ্গে আমাদের শরীরে কতটুকু বৃক্করস জমেছে। কেননা এক সেকেন্ডের জন্য দ্বিধার দোলাচলে দুললে যে কেউ মারা যেতে পারে। জবাব হলো : প্রচুর এবং অনেক! আমার মনে আছে, প্রয়োজনীয় সবকিছু জড়ো করার এবং রাস্তায় হিজাব পরার মতো পর্যাপ্ত সময় আমার ছিল না।
আজকের এই রাত এবং সাত বছর আগের সেই রাত একই ধরনের। উভয় রাতই উদ্ভট অন্ধকার এবং অত্যন্ত ভয়ঙ্কর। তবে পার্থক্য একটাই যে, আজ আমি আরও ছয় জনের সঙ্গে একটি সংকীর্ণ বারান্দায় আটকে নেই। তার বদলে আমি এখানে আমার আজেবাজে চিন্তা, অন্ধকার স্মৃতি এবং একটি সিনেমা নিয়ে আমার ঘরের মধ্যে আছি। আমার চতুর্দিকে কাপড়চোপড় এবং প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র দিয়ে ভরা ব্যাকপ্যাক ও প্লাস্টিকের থলি– কেননা পরিস্থিতি যদি হঠাৎ আমাদের বাড়ি থেকে বেরোতে বাধ্য করে। বারো ঘণ্টার ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর আমি ঘরের মধ্যে একই জায়গায় আছি। গোটা দুনিয়া থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। আমার পরিচিত এবং যাদের প্রতি আমি দায়িত্বশীল, তাদের সম্পর্কে কোনো হালনাগাদ খবর নেই, বিশেষ করে তারা নিরাপদ আছে কিংবা নেই।

সময় সকাল ৪টা ৫৫ মিনিট

আমি তখনও ঘুমাতে পারিনি। এই গল্পের শেষ কয়েক লাইন লিখছি এবং ভাবছি আমি কি একই শরীরে জেগে উঠবো? আমি কি লেখার মাধ্যমে আমার গল্প প্রকাশ করার এবং আমার জানা মতে শ্রেষ্ঠ উপায়ে জীবনকে অতিবাহিত করার সুযোগ পাবো? নাকি গল্পের খসড়া আমার বর্তমান বাড়ির মধ্যে আমার সঙ্গে ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়বে (পুরানো খসড়াটি ২০১৪ সালে যুদ্ধের সময় ধ্বংস হয়েছে)?
আমি ‘প্লে’ বোতামে চাপ দেই এবং সঙ্গে সঙ্গে ভেসে ওঠে ক্রিস গার্ডেনারের ছবি। অবশেষে তার মুখে উজ্জ্বল হাসি এবং দু’চোখে অশ্রু দেখে আমার ভেতর এক ধরনের সুখানুভূতি অনুভব করি। আমি পুনরায় ভাবতে থাকি। আমি কি তার মতো এই হাস্যোজ্জ্বল মুখ এবং অশ্রুসিক্ত চোখ, এমনকি উষ্ণ হৃদয়ও পেতে সক্ষম হবো?
হয়তো শীঘ্রই হবে?


লেখক পরিচিতি : ফিলিস্তিনি লেখক বারাহ কানদীলের জন্ম গাজায়, ১৯৯৯ সালে। তিনি গাজার আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনুবাদ বিষয়ে পড়াশুনা করেন। ‘সোস্যাল ডেভেলাপমেন্ট ফোরাম’-এর সক্রিয় সদস্য তিনি। শৈশবেই লেখালেখির সূচনা। তিনি একাধারে ছোটগল্প লেখক এবং অনুবাদক। আরবি এবং ইংরেজিতে সাহিত্যকর্ম– বিশেষ করে ছোটগল্প লেখেন। তিনি ‘Mostaql.com’-এর ফ্রিল্যান্স অনুবাদক এবং বিষয়বস্তু লেখক। বর্তমানে গাজা শহরে বসবাস করছেন।
গল্পসূত্র : ‘দুটি অন্ধকার রাত এবং অভীষ্ট সুখের চেষ্টা’ গল্পটি বারাহ কানদীলের ‘টু ডার্ক নাইটস্ অ্যান্ড দ্য প্যারসিউট অব হ্যাপিনেস’ ছোটগল্পের অনুবাদ। গল্পটি ‘উই আর নট নাম্বার্স’ ওয়েবম্যাগে (https://wearenotnumbers.org) ২০২১ সালের ১৭ মে প্রকাশিত হয়।

/জেডএস/
বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রীর ৪ প্রস্তাব
গ্লোবাল ক্রাইসিস রেসপন্স গ্রুপ-এর প্রথম উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকবৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রীর ৪ প্রস্তাব
ডিম ছাড়ছে না হালদার মা মাছ, ভারী বৃষ্টির অপেক্ষা
ডিম ছাড়ছে না হালদার মা মাছ, ভারী বৃষ্টির অপেক্ষা
নরসিংদী রেল স্টেশনে সেদিন কি ঘটেছিল?
নরসিংদী রেল স্টেশনে সেদিন কি ঘটেছিল?
মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের সহ-সভাপতিকে কুপিয়েছে দুর্বৃত্তরা
মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের সহ-সভাপতিকে কুপিয়েছে দুর্বৃত্তরা
এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত