X
বৃহস্পতিবার, ২০ জুন ২০২৪
৬ আষাঢ় ১৪৩১

ক্ষতচিহ্নিত হাড়মাংস অথবা নিছকই আত্মজনের কথা

গৌতম গুহ রায়
২৮ মে ২০২৪, ১৫:৩২আপডেট : ২৮ মে ২০২৪, ১৫:৩২

১৭তম পর্ব


‘এক অদ্ভুত অন্ধকার ঢেকে দিয়েছে সমস্ত আলোপথ

চাপড়ামারির বনবাংলো, প্রকৃতেশ বড়ুয়া বা লালজীর আড্ডা থেকে আবার ফিরে যাই আমার সেই গল্পে, জলদাপাড়ার সেই বন আবাসনের রাত ও দিনগুলোর কথায়। ফুলকুমারীর সঙ্গেই হলং আনা হয়েছিল আর এক হস্তিনী বাসন্তীকে। বসন্তীকে আলাদা গুরুত্ব দিয়ে রাখা হয়েছিল। তার জন্য আনা হয়েছিল পর্যাপ্ত খাবার, পুন্ডি ফল। এই পুন্ডি ফল হাতির খুব প্রিয়। ইংরেজিতে বলে Wild Cardamom, পুন্ডি ফলের ভেতর ছোট ছোট দানা থাকে, অনেকটা এলাচের মতো। হঠাৎ ভোররাতে রামুদা আমাকে ডেকে তুলল— ‘চল চল, বাসন্তীর বাচ্চা হয়েছে, দেখবে চল।’ আমি তো স্তম্ভিত। হাতির প্রসব! তখনো ভোরের আলো পুরোপুরি ফোটেনি। আধো আলো আধো ছায়ায় দেখি পিলখানার একটা দিকে বাসন্তী দাঁড়িয়ে। তার পেটের নিচে মাটিতে তালগোল পাকানো একটা হস্তী শাবক। সার্চ লাইটের আলোতে দেখা যাচ্ছে হালকা বাদামি রঙের শাবকটি উঠে দাঁড়াতে চাইছে, কিন্তু বারেবারে টলে পড়ে যাচ্ছে আর মা হাতি তাকে শুঁড় দিয়ে ঠেলে দাঁড় করাতে চাইছে। অনেকক্ষণ পরে পেছনের পায়ে ঠেস দিয়ে উঠে দাঁড়াল সে। সতর্ক মাহুত তখনো খুব কাছে যাওয়ার সাহস পাচ্ছে না। যখন শাবকটি উঠে দাঁড়াল তখন দেখলাম হালকা বাদামি রং তার, ছোট্টো ও সরু সুরটা ওঠানামা করছে। গোরুর বাছুরের থেকেও তুলতুলে লাগছিল। মা ও সন্তানকে চারদিকে পাহারা দেওয়া হচ্ছিল যাতে অন্য বন্যপ্রাণী বা মদ্দা হাতি এসে হামলা না করে। মাহুতদের থাকার জায়গায় মাটিতে বড় উনুন বানিয়ে সেখানে একটা বিরাট কড়াইয়ে খিচুড়ির মতো কিছু একটা রান্না হচ্ছিল। রামুদা জানালেন নানা ধরনের দানা শস্যের, বিশেষত অড়হর ডালের জাবরা খিচুড়ি। এই ডাল খিচুড়ি বাসন্তীর জন্য। প্রসূতি হাতির জন্য বিশেষ ঔষধি খাদ্য। সদ্যোজাত হস্তী শাবকের প্রতি চিতা সহ নানা মাংসাশী জন্তুর লোভ মারাত্মক, তাই বেশ কিছুদিন বিশেষ পাহারার ব্যবস্থা করতে হয়। মনে পড়ছিল লালজীর কথা, হাতিকেও বড় হতে হয় অনেক আঘাতের ক্ষত নিয়ে। শৈশব থেকে কৈশোর তার মাংস বন্য জন্তুর কাছে লোভনীয়, এরপর বড় হলে তার হাড়, দাঁত চোরা শিকারির লক্ষ্য হয়ে ওঠে। বন্য জানোয়ারের লোভ থেকে বেঁচে গেলেও তাকে বাকী জীবন সতর্ক থাকতে হয় মানুষের লোভ থেকে। বন্য আইন বর্ম দিয়েছে, এখন হাতি ধরা ও পালন নিয়ন্ত্রিত হয়েছে। কিন্তু বনটাই তো ক্ষয়ে আসছে, খাদ্য ও বাসস্থান লুপ্ত হয়ে গেলে বন্যপ্রাণ তো নেমে আসবে লোকালয়ে। বাড়বে মানুষ ও বন্য প্রাণের সংঘাত। গত বছর যেমন জলপাইগুড়ি জেলার ডুয়ার্সে দলে দলে ভালুক নেমে এলো। অথচ এই অঞ্চলের জঙ্গলে ভালুক ছিল না, ভুটান পাহাড় থেকে খাদ্যাভাবে তারা নেমে এসেছে ডুয়ার্সে, জঙ্গল থেকে শহরে। প্রায় নিয়মিত হাতি এসে দলবল নিয়ে হামলা করছে জনপদগুলোয়। দেখতে দেখতে আমার অরণ্যযাপনের এক সপ্তাহ কীভাবে শেষ হয়ে গেল। আমার ফিরে যাওয়ার সময় হয়ে এলো। রাতে খেতে বসে বিমল কাকু বললেন পরদিন ভোরবেলা আমাকে তৈরি থাকতে। আমাকে হাতিতে চাড়াবেন। সারারাত আমার ঘুম নাই। হাতির পিঠে আমি, এই হাতি— আমাদের পুরাণে, ইতিহাসে যে প্রাণীটি মহা গৌরবে আধিপত্য নিয়ে ‘বিরাজমান’। নিজেকে এই সময় দেবরাজ ইন্দ্রের মত মনে হচ্ছিল। ইন্দ্রের বাহন তো গজরাজ ঐরাবত বা হাতির মতো মেঘপুঞ্জ। সমুদ্র মন্থন জাত মহা হস্তী সে। গণেশের মুখটাই তো হাতির, হাতি তো বিরাটত্ব ও বিজ্ঞতার প্রতীক। পার্বতীর দশ মহাবিদ্যার এক রূপ মাতঙ্গী, সে তো হস্তিনিই। মহাভারতের মালবরাজ ইন্দ্রবর্মার হাতি অশ্বত্থমাকে নিয়ে কত কাণ্ড! পুরাণে আমাদের এই অঞ্চলের নাম প্রাগজ্যোতিষপুর বা কামরূপ। কামরূপ অধিপতি ভগদত্তকে বারবার হাতিতে চড়েই মহাভারতের যুদ্ধে দেখা গেছে। আমার প্রথম হাতিতে আরোহণে চোখের সামনে পুরাণের দ্বার খুলে যাচ্ছিল। ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, ঘুমের মধ্যে মা এসে শোনালেন বুদ্ধের জন্ম কাহিনি, সেই শ্বেত হাতির গল্প।

পর্যটকদের জন্য বরাদ্দ এই হাতিটি, কৃষ্ণকলি নাম তার, তরুণ মাহুতের নাম সোমরা ওড়াও। কৃষ্ণকলি সামনের পা-দুটো সামনে ছড়িয়ে নীচু হয়ে থাকল। একটা ছোট মই তার গায়ে হেলান দিয়ে রাখা। প্রথমে মাহুত সোমরা ওড়াও, এরপর আমি, দুদিকে পা ছড়িয়ে, তারপর হাতে বন্দুক নিয়ে রামুদা। হেলে-দুলে হাতি উঠে দাঁড়াল। সে এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা। জঙ্গলের ভেতর অনেকটাই উঁচু উঁচু ঘাস, লতানো গাছ ও নলখাগড়ার মাঝে হাতির চলার পথ। পথে ছোট ছোট নদী বা ঝোড়া কাটা ঝোপ ও খয়ের গাছ। ঝোড়ার কাছে এক জায়গায় মাটির ঢিবি। রামুদা বললেন, এটা ‘নুনখোলা’। প্রাকৃতিক ভাবে রক্ষিত লবণের ঢিবি। এখানে হাতি, গন্ডার প্রমুখ লবণ খেতে আসে। ইংরেজিতে একে বলে Salt lick আর নেপালিতে ‘মাটিখোলা’। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই সৌভাগ্য হল আমাদের। মাহুত সোমরা আমাদের একদম চুপ করতে বললেন। একটা নলখাগড়ার ঝোপের আড়ালে হাতিটিকে দাঁড় করালেন। দূর থেকে দেখলাম একটা গন্ডার নুন খেতে এসেছে। সারা শরীর তার মাটি মাখা, নাকের উপর ইঞ্চি দুয়েকের খড়্গ, তাতে ঘাস মাটি লেগে আছে। আমাদের উপস্থিতি বুঝতে পারল কিনা জানি না। হঠাৎ দ্রুত সেই বড় দেহটা নিয়ে দুলকি চালে উলটো দিকের জঙ্গলে ঢুকে গেল। মাথার উপর রোদ বাড়ছিল, আমাদের বসায় ফেরার সময় হয়ে এলো। পথে কয়েকটি হরিণ ছাড়া আর কিছু দেখা হল না সে যাত্রায়। পরদিন বিমল কাকুর সঙ্গে ফিরে এলাম। এক পক্ষ কালের আমার প্রথম জঙ্গল যাপন অনেক অভিজ্ঞ করল আমাকে।

বছর কয়েক পরে, আমার ছোটবেলার মহল্লা ছেড়ে শহরের অন্য প্রান্তে চলে আসি আমরা। ছোটবেলার স্কুল ছেড়ে ফণীন্দ্র দেবে চলে আসার পর অনেকদিন সুকুর সঙ্গে দেখা হয়নি। একদিন ছোটকাকু জানালেন কয়েক মাস আগে হঠাৎ স্ট্রোক করে বিমল কাকু মারা গেছেন। বুঝতে পারলাম যে একে একে নাগরিক জীবনের ব্যস্ততায় আমরা পরস্পরের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছি, একে অন্যের থেকে দূরে চলে যাচ্ছি। কংক্রিট অরণ্যে একক মানুষের নিঃসঙ্গ তাঁবু তৈরি হচ্ছে। গত শীতে আমি আমার এক সহকর্মীর জন্য এক ব্যাগ খাতা পত্র নিয়ে তার আবাসনে গিয়েছিলাম। পাকা চুল ও রুগ্ণ চেহারার প্রায় বেঁকে যাওয়া শরীরের সিকিউরিটি গার্ড আমাকে সেখানে রাখা খাতায় নাম ফোন নম্বর লিখতে বললেন। আমি মাথা নীচু করে লিখছি, সে বলল— ‘আমাকে চিনতে পারলি না বাবন?’ আমি সেই রুগ্ণ শরীরের, দাড়ি গোঁফের মুখটার দিকে তাকালাম। সুকু! সুকল্যাণ রায়, আমার এক সময়ের হরিহর আত্মা বন্ধু! কংক্রিটের শরীরের সামনে বিষাক্ত সুকুর মৃতদেহ আগলে একা একা সুকল্যাণ!

সেদিন বাসায় ফিরে এলেও সেই মুখটা, সেই স্বরটা আমাকে তাড়া করছিল। খুব অস্থির লাগছিল। আমার ছোট্ট ও নিজস্ব ঘরটাতে আলো নিভিয়ে বসে আকাশ পাতাল ভাবছিলাম। একদিন স্কুল থেকে দলবেঁধে বন্ধুরা ফুটবল খেলা দেখতে টাউন ক্লাবের মাঠে গিয়েছিলাম। কলকাতার জর্জ টেলিগ্রাফ আর আমাদের জে ওয়াই সি সি। আমরা সবাই জে ওয়াই সি সি র সাপোর্টার। স্টেডিয়ামে নয় আমাদের জায়গা পূর্ব দিকের স্ট্যান্ড, পা ডুবে যাওয়া কাঁদায় দাঁড়িয়ে চিৎকার করে যাওয়া। আমাদের দল হেরে যায়, মন খারাপ আমরা চার বন্ধু সেখান থেকে তিস্তার চরে চলে যাই। সূর্য ডুবে যাওয়ার আগের মোহময়ী তিস্তা, তার এক মানুষ উঁচু কাশবনে লুকোচুরি খেলা। সুর্য ডুবে গেলে একে অন্যকে খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে যায়। অন্ধকারে পায়ের নিচের রূপালী ও মিহি বালু এক অদ্ভুত আলোতে চকচক করতে থাকে। আমরা সেই অন্ধকারের আলোতে পথ খুঁজে বাঁধে উঠে আসি। কিন্তু সুকু নেই! সে পথ খুঁজে না পেয়ে অনেকক্ষণ সেই কাশবনে এপ্রান্ত ওপ্রান্ত ছোটাছুটি করেছে। অবশেষে ঘরে ফেরা এক জেলে ওকে বাঁধের পথ দেখিয়ে পৌঁছে দিয়ে যায়। সেবার নীরব অভিমানে ও কয়েকদিন আমাদের সঙ্গে কথা বলেনি। আজ আমরা সবাই এক অলৌকিক কাশবনে পথ হারিয়ে একা হয়ে গেছি। এক অদ্ভুত অন্ধকার ঢেকে দিয়েছে সমস্ত আলোপথ


চলবে

/জেড-এস/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
এবার ছেলেদের কোচ হয়ে নতুন ভূমিকায় ডালিয়া
এবার ছেলেদের কোচ হয়ে নতুন ভূমিকায় ডালিয়া
আফ্রিকান শান্তিরক্ষীদের প্রত্যাহার বিলম্বিত করতে চায় সোমালিয়া
আফ্রিকান শান্তিরক্ষীদের প্রত্যাহার বিলম্বিত করতে চায় সোমালিয়া
‘রাজস্ব কর্মকর্তা মতিউরই ছাগলকাণ্ডে আলোচিত সেই ইফাতের বাবা’
‘রাজস্ব কর্মকর্তা মতিউরই ছাগলকাণ্ডে আলোচিত সেই ইফাতের বাবা’
সিলেট বিভাগে এইচএসসি পরীক্ষা ৮ জুলাই পর্যন্ত স্থগিত
সিলেট বিভাগে এইচএসসি পরীক্ষা ৮ জুলাই পর্যন্ত স্থগিত
সর্বাধিক পঠিত
জাম খাওয়ার ৯ উপকারিতা
জাম খাওয়ার ৯ উপকারিতা
এফ-১৫ যুদ্ধবিমান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্কে টানাপড়েন
এফ-১৫ যুদ্ধবিমান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্কে টানাপড়েন
‘লেবানন আক্রমণের পরিকল্পনা’য় অনুমোদন ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর
‘লেবানন আক্রমণের পরিকল্পনা’য় অনুমোদন ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর
শেখ হাসিনার ‘নজিরবিহীন’ ভারত সফরে সঙ্গী হচ্ছেন যারা
শেখ হাসিনার ‘নজিরবিহীন’ ভারত সফরে সঙ্গী হচ্ছেন যারা
‘মোংলা কমিউটার’ ট্রেন নিয়ে যাত্রীদের যত আপত্তি
‘মোংলা কমিউটার’ ট্রেন নিয়ে যাত্রীদের যত আপত্তি