করোনায় আমরা ভীত নই। বরং মোকাবেলা করছি গৃহে অন্তরীণ থেকে। এতে হয়ত কিছুটা বাড়তেও পারে মানসিক চাপ। তাই আসুন, খুলে দেই মনঘরের জানালা। নিজেকে চালিত করি সৃজনশীলতায়। আপনি নিয়মিত লিখছেন, বা এটাই হতে পারে আপনার প্রথম গল্প। লিখুন ফেসবুকে। চটজলদি ৫০০ শব্দের গল্প, বাংলা ট্রিবিউনের জন্য। একইসঙ্গে নমিনেট করুন আপনার পছন্দের আরও ১০ জন লেখককে। সেরা ১০ জন লেখক পাচ্ছেন কাগজ প্রকাশনের বই। আর অবশ্যই হ্যাশট্যাগ দিন #বাংলাট্রিবিউনসাহিত্য
এবার বাড়ি আসবার পর কাল প্রথম বৃষ্টি এলো। এদিকটায় বৃষ্টির ঘ্রাণ অন্যরকম। আমার মনে হয় আশেপাশে কোথাও দোলনচাঁপার বন আছে। জলের ফোঁটা গায়ে পড়লেই দোলনচাঁপার পাপড়িগুলো এক একটা পরী হয়ে যায়। তারপর পরস্পরের হাত ধরে উড়ুক্কু হাওয়ায় ভেসে বেড়ায়। কতদিন মাঝরাতে জানালা খুলে দিয়েছি কিন্তু ওদের দেখতে পাইনি। ওরা সরে পড়ে। হয়তো ওরাও ঘ্রাণ নিতে জানে আমাদের মতো।
আজকাল বেশ অখণ্ড অবসর। তাই ভাবনাগুলো হয়েছে এমন। ঘুম ভাঙবার তাড়া নেই বলে অ্যালার্ম ছাড়া জেগে উঠি প্রায়ই। জেগে দেখি আধফোটা হাসনাহেনার মতো মায়াবি এক ভোর। পাশের বাড়িতে কেউ সরগম সাধছে। সারেগা রেগামা গামাপা। রান্নাঘরে টুংটাং শব্দ। চাপাতার সুঘ্রাণ। গুড় দিয়ে চা আর টোস্ট বিস্কুট। মায়ের কাছে এলে বাসিমুখে চা আমার বিলাসিতা।
এই কথাটা অর্ধসত্য। বাড়ি এলে পুকুরে খানিকটা দাপাদাপি করাও বিলাসিতার মধ্যে পড়ে। তবে এবার সে উপায় নেই। কলপাড়ে বালতি ভরে স্নান সারতে হয় তাই। জলের রেণু, সাবানের বুদবুদ গায়ে মাখতে মাখতে আকাশ আর মেঘ দেখি৷ মেঘের রংটা খুব চেনা। মেঘের রং বলে নয়। খুব চেনা, অন্যকিছু। ‘ইটস অ্যা ওয়ান্ডারফুল লাইফ’ ছবির ম্যারি হ্যাচের চোখগুলো বোধহয় এমন চারকোল গ্রে রঙের ছিল!
বেলা বাড়লে মা ভাত খেতে ডাকে। ট্যাংরা মাছের লাল টুকটুকে ঝোল আর উচ্ছে ভাজা। পাঁচফোড়ন আর শুকনো মরিচ দেয়া ডালও থাকে সঙ্গে। তারপর জামবাটিতে চিনির কেলাস ছড়ানো ঘরে পাতা দই। আরেক বিলাসিতার নাম। মাকে বললাম– আরও মেপে চলতে হবে আমাদের। সময়টা খারাপ। মা হেসে বলে– সব ঠিক হয়ে যাবে দেখিস।
রাতে শুয়ে শুয়ে এক টুকরো আকাশে চোখ রাখবার সময় আমিও কখনো ভাবি সব ঠিক হয়ে যাবে, কোনো একদিন। কিন্তু কবে? মাকে জিজ্ঞেস করলে হয়তো এই প্রশ্নের উত্তরও দিয়ে দেবে ঝটপট। কী আশ্চর্য রকমের সুখী আর নির্লিপ্ত থাকে কিছু মানুষ। কিছুই স্পর্শ করে না তাদের।
তাতিয়ানাও হাসতে হাসতে বলে–হোয়াই আর ইউ সো আপসেট? তুমি কি নিজেকে অমর ভাবতে এতদিন?
নিজেকে অমর আমি ভাবিনি। তবে একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে এই মন্ত্রটাও নিছক ছেলে ভোলানো কথা হয়ে যায় যখন ভাবি যদি আমি না থাকি তবে সেই একদিন না এলেই বা কী!
তাতিয়ানা বলে–সেলফিশের মতো কথা বোলো না তো!
তারপর আমরা বহুক্ষণ কথা বলি না৷ নীল গোলবাতিটা কখন নিভে যায় টের পাই না। যার যার আকাশে চোখ রেখে রং চেনার চেষ্টা করি৷ তাতিয়ানা নক্ষত্র চেনে৷ ও হয়তো নিকষ আঁধারেও খুঁজতে বসে মারীচ, অত্রি কিংবা ক্রতুদের। আর আমার চোখে তখনও সেই চারকোল গ্রে ভেসে বেড়ায়।
দিন তারিখ ভুলে বসা সময়ে একদিন খবর পাই তাতিয়ানার ফুসফুস জোড়া আগের মতো কাজ করছে না। নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে ওকে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। চোখ বুজলে ওর মুখটা ভেসে ওঠে৷ মুখে হাসির রেখা টেনে নিষ্কম্প গলায় তাতিয়ানা বলছে–সব ঠিক হয়ে যাবে। বাড়ি যায়নি মেয়েটা। কাছের মানুষকে বিপদে ফেলতে চায়নি বলে ধাতব শহরে নিজের ওই এক রুমের ডেরাতেই থেকে গিয়েছিল। জানি না, আর সেখানে ওর ফেরা হবে কিনা।
এই নির্জন শহরতলিতে নিজের ঘরে বসে আমি রোজ ভাবি আকাশের রংটা ঠিক কেমন। আর তাতিয়ানাকে ভুলে যাই নিপুণ স্বার্থপরতায়, অলসতায়। চারকোল গ্রে রংটা ফিরে আসে। মাঝেমধ্যে মেঘ ঝরে গেলে সেই রং একটু একটু করে পাংশুটে হয়ে যায়। দোলনচাঁপার পাপড়িগুলো পরি হয়ে ফিরে আসে আমার জানালায়। তারপর আরও এক অজ্ঞাতকুলশীল দিনে আবিষ্কার করি রংটা আমি দেখেছিলাম তাতিয়ানার চোখে। সেদিন ফেসবুকে নিজের ছবিতে ক্যাপশন লিখেছিল মেঘদলের গানটা– ‘বারবার তোমাকে ফিরে পেতে চাইবে, এই করুণ নেক্রোপলিসে।’







