ঘৃণা

মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ
১৭ এপ্রিল ২০২০, ১৮:০০আপডেট : ১৭ এপ্রিল ২০২০, ১৮:০০

করোনায় আমরা ভীত নই। বরং মোকাবেলা করছি গৃহে অন্তরীণ থেকে। এতে হয়ত কিছুটা বাড়তেও পারে মানসিক চাপ। তাই আসুন, খুলে দেই মনঘরের জানালা। নিজেকে চালিত করি সৃজনশীলতায়। আপনি নিয়মিত লিখছেন, বা এটাই হতে পারে আপনার প্রথম গল্প। লিখুন ফেসবুকে। চটজলদি ৫০০ শব্দের গল্প, বাংলা ট্রিবিউনের জন্য। একইসঙ্গে নমিনেট করুন আপনার পছন্দের আরও ১০ জন লেখককে। সেরা ১০ জন লেখক পাচ্ছেন কাগজ প্রকাশনের বই। আর অবশ্যই হ্যাশট্যাগ দিন #বাংলাট্রিবিউনসাহিত্য ঘৃণা অগ্রহায়ণ মাস। হেমন্তের বিকেল। উন্মুক্ত প্রান্তর। আমন ধানের বিচালি ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে যত্রতত্র। কয়েকটা শিশু-কিশোর ছুটছে। প্রান্তরের ভেতর দিয়ে। পুব থেকে পশ্চিমে। সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্তের দিকে। তাদের পায়ের নিচে শুকনো বিচালি। মচমচ করে শব্দ করছে। ছুটছে তারা ক্ষেতের ভেতর দিয়ে। ক্ষেতের আল দিয়ে। অবিরাম ছুটে চলা। গন্তব্যে না পৌঁছা পর্যন্ত। দলের সর্বশেষ জন আমি। দলের মধ্যে সবচেয়ে ক্ষুদ্রাকৃতির।

আমরা যাচ্ছি পার্শ্ববর্তী ফাজিলপুর গ্রামে। আমাদের গ্রাম থেকে এক মাইল দূরে। ঝাড়কাটা নদী হতে একটা মাটির সড়ক আমাদের গ্রামের মধ্য দিয়ে ঝাড়কাটা স্কুলকে অতিক্রম করে বামে মোড় নিয়ে তেঘরিয়া বাজারের পাশ দিয়ে ফাজিলপুরের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করে চরপাকেরদহকে ডানে রেখে চরনগরের ছায়াবীথি পার হয়ে বালিজুরি হাটে পৌঁছেছে। আমরা এই মাটির পথ অনুসরণ করে ফাজিলপুর গ্রামে পৌঁছাতে পারতাম।কিন্তু আমরা তা না করে মাঠের ভেতর দিয়ে দৌড়াচ্ছি প্রাণপণে। কারণ আমাদের তাড়া আছে। আমাদেরকে সেখানে পৌঁছাতে হবে একজনের আগে। সে আমাদের আগে বেরিয়ে গেছে। এখন সে দ্রুত দৌড়ে এগিয়ে যাচ্ছে মাটির সড়ক অনুসরণ করে। আমাদের ত্রস্ত ছুটে চলা থেকে আপনাদের মনে হতে পারে যে,কোনো এক আলাদীনের আশ্চর্য প্রদীপের অনুসন্ধানে বেরিয়েছি আমরা। সেইজনের আগে পৌঁছাতে না পারলে কখনোই আমরা সেই প্রদীপের সন্ধান পাব না! আমরা যেন এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী!

বিস্তীর্ণ প্রান্তর। সদ্য কেটে নেয়া মাঠের ভেতরে ধান গাছের বিচালি ছাড়া কিছু নেই। আলের ধার দিয়ে ইতস্তত বিক্ষিপ্ত ইঁদুরের গর্ত। ইঁদুরেরা পাকা ধানের শীষ দাঁত দিয়ে কেটে নিয়ে নিয়ে এই গর্তগুলো ভর্তি করেছে। কোদাল দিয়ে গর্তগুলো খুঁড়ছে কয়েকটা কিশোরী। বের করে আনছে রাশি রাশি ধান। ইঁদুরের সঙ্গে তাদের নীরব প্রতিদ্বন্দ্বিতা। সারভাইভাল অফ দ্য ফিটেস্ট। আমাদের খেয়াল করার সময় নেই। সূর্যাস্তের আগেই সেই বাড়িতে পৌঁছাতে হবে আমাদের।

একটা উঁচু ঢিবির ওপরে মহিলার কুঁড়েঘর। খোলা মাঠের ভেতরে। দরজা নেই। পরিবর্তে রয়েছে চতুষ্কোণ ছনের তৈরি বেড়া। বাতাসকে প্রতিহত করার জন্য। সুতরাং ঘরের ভেতরে প্রবেশ করতে আমাদেরকে কোনো বেগ পেতে হয় না। মহিলার ঘরে প্রবেশ করতেই আমরা অবাক। কিছুটা হতোদ্যমও বটে। কয়েকটা মাটির হাড়ি ছাড়া আর কিছুই নেই। প্রত্যেকটার মুখ পর্যন্ত ভর্তি বালি। চকচক করছে। অথচ এমন হবার কথা ছিল না। চুরি করে আনা চালগুলো তাহলে কোথায় গেল? গত দুইদিন নিবিড় পর্যবেক্ষণের পর আমরা অভিভাবকদের বিষয়টা জানিয়েছি। আজ বিকেলেও সে চাল চুরি করেছে। উনারা বলেছেন হাতেনাতে প্রমাণ পাওয়া গেলে, কাল সকালে তার বিচার হবে।

আজ বিকেলেই শেষবার পর্যবেক্ষণ করছিলাম আমরা তাকে। শাড়ির কোচের ভেতরে চাল নিয়ে সে ছুটছিল তার বাড়ির দিকে। তারও তাড়া। সূর্য ডোবার পূর্বে তাকে পৌঁছাতে হবে। তারপর রান্নাবান্না করতে হবে। কিন্তু আমরাই উন্মুক্ত মাঠের ভেতর দিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে তার পূর্বেই পৌঁছে গেছি। তারই ঘরে!

আমাদের দলের ভেতরে বয়োজ্যেষ্ঠ খোকা ভাই। ক্লাস সিক্সে পড়ে। আমাদের মধ্যে সবচেয়ে বুদ্ধিমান। সে দ্রুত হাত ঢুকিয়ে দিল হাড়ির বালির ভেতরে। দুই ইঞ্চির আস্তরণ। তার নিচেই চাল। যা খুঁজছিলাম আমরা!

পরক্ষণেই হাঁপাতে হাঁপাতে মহিলা এসে উপস্থিত। বয়স ত্রিশের কাছাকাছি। প্রবল বিস্ময় নিয়ে আমাদের দিকে তাকাল। আমরা প্রবল ঘৃণার দৃষ্টিতে তার দিকে তাকালাম। চুরি করা মহাপাপ।

মহিলা আমাদের বাড়িতে ধান ভানে। আমার জন্মেরও পূর্ব হতে। চুরির অভিযোগ ইতোপূর্বে তার বিরুদ্ধে কখোনই আসেনি। এই প্রথম। তারপরেও সমাজের কেউই তাকে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখে না। সবার চোখে তীব্র ঘৃণা। আজ থেকে কোনো বাড়িতেই সে কাজ পাবে না।

অতঃপর যথারীতি আমরা সবাই ভুলে গেলাম তাকে।

কয়েক বছর পর। বাবার সেঙ্গে রংপুরে যাচ্ছি। দ্রুতযান ট্রেনে করে। জীবনে প্রথম বেড়ানো। বোনারপাড়া রেল জংশন। রেলগাড়ির ইঞ্জিন বদলি করা হবে। আমি স্টেশনের দোকান থেকে কিছু একটা কেনার জন্য রেলগাড়ির দরজা দিয়ে নামছি।

একটু সামনে যেতেই ভীষণ অবাক। ছেঁড়া কাপড়ে অদূরে এক ভিখারিনী দাঁড়িয়ে আছে। আমার খুব চেনা। শরীরটা শীর্ণ হয়ে গেছে। শুধু মুখের অবয়ব অবিকল পূর্বের মতো।

প্রবল ঘৃণার দৃষ্টিতে সে আমার দিকে তাকিয়ে আছে!

/জেড-এস/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
দিল্লীতে আগুনে ৮ বাংলাদেশি আহত, গুরুতর অবস্থা তিন জনের
দিল্লীতে আগুনে ৮ বাংলাদেশি আহত, গুরুতর অবস্থা তিন জনের
ফুল দিয়ে ড. খলিলুর রহমানকে বরণ
ফুল দিয়ে ড. খলিলুর রহমানকে বরণ
প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে বন্ধ কলকারখানা চালু ও ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত সভা
প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে বন্ধ কলকারখানা চালু ও ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত সভা
ত্রিমুখী তদন্তের ‍মুখে বেবিচকের প্রকৌশলী শরিফুল
ত্রিমুখী তদন্তের ‍মুখে বেবিচকের প্রকৌশলী শরিফুল
সর্বাধিক পঠিত
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
তৃতীয় বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাচ্ছেন আমির খান
তৃতীয় বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাচ্ছেন আমির খান