করোনায় আমরা ভীত নই। বরং মোকাবেলা করছি গৃহে অন্তরীণ থেকে। এতে হয়ত কিছুটা বাড়তেও পারে মানসিক চাপ। তাই আসুন, খুলে দেই মনঘরের জানালা। নিজেকে চালিত করি সৃজনশীলতায়। আপনি নিয়মিত লিখছেন, বা এটাই হতে পারে আপনার প্রথম গল্প। লিখুন ফেসবুকে। চটজলদি ৫০০ শব্দের গল্প, বাংলা ট্রিবিউনের জন্য। একইসঙ্গে নমিনেট করুন আপনার পছন্দের আরও ১০ জন লেখককে। সেরা ১০ জন লেখক পাচ্ছেন কাগজ প্রকাশনের বই। আর অবশ্যই হ্যাশট্যাগ দিন #বাংলাট্রিবিউনসাহিত্য
এবার বুঝি সত্যি সত্যিই হয়ে যাবে, প্রতীক্ষার পাথর গলে স্বস্তি জলের মিহি স্রোত হয়তো বয়েই যাবে এবার। হয় হয় করে গত সাত বছরে একটাও হয়নি। বাজারসদাই দাওয়াতপত্র বিলি হওয়ার পরেও শেষের বিয়েটাও ভেঙে গেছে। আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে অনেকে মুখ বাঁকিয়ে নানান কথা বলেছে, পাড়ায় পাড়ায় এবাড়ি ওবাড়ি ঘুরে অপয়া আখ্যা দিয়ে অনেকেই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। যেসব বাড়িতে বিবাহযোগ্যা মেয়ে রয়েছে সেসব বাড়ির অনেক বাবা-মা এই বাড়ির দিকে পা ফেলতে বারণ করেছে। দুর্ভাগ্য নাকি সংক্রমিত হয়! এই বিবেচনায় দূরত্ব বাড়িয়েছে অনেকেই। তাই নিজেকে জীবনদুখিনী ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারে না সে।
বাড়ির দক্ষিণের আম গাছটার নিচে, বাঁশের বানানো টুলের ওপর বসে প্রত্যাশা নিজের আপাত অনিশ্চিত জীবন নিয়ে নিদাঘ দুপুরে লুকানো চোখের জলে অবশেষে ভাবছিল, সকল বালাইয়ের মুখে ছাই চাপা দিয়ে এবার বুঝি বিয়েটা হয়েই যাবে তার।
ছেলেটি বড় মায়াবী মুখের। মোবাইলের লাইভে কত আদুরে ভাবভঙ্গি নিয়ে কথা বলে! কোনো হামবড়া ভাব নেই, কী সাদামাটা আন্তরিক মুখ! ফেসবুকে পরিচয়, তারপর ভাব বিনিময়। বিমল নিজে থেকেই সরাসরি বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে, প্রেম করার সময় নেই তাই প্রত্যাশার আপত্তি না থাকলে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে তার বাবা যাবে ওদের বাড়িতে। এখন প্রত্যাশার অনুমতি পেলেই হয়।
বংশ-গোত্রের ঝামেলাও নেই, মিলে যায় তাই প্রত্যাশাও না করতে পারেনি। বিমলের বাবা, ছোট কাকা ও বিমলের বড় দাদা এসে দেখে গেছে। সকলেই খুব পছন্দ করে একটা হীরার আংটি পরিয়ে দিয়ে আশীর্বাদ করে গেছে। শুভ দিনক্ষণ দেখে তুলে নিয়ে যাবে। বিমল বিয়ের এক মাস আগে চলে আসবে দেশে।
ডান পায়ের পাশ দিয়ে লাল পিঁপড়ের একটি দল লাইন দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে আম গাছটার দিকে। রেলগাড়ির মতো একটার পিছে আরেকটা পিলপিল করে ছুটে চলছে তো চলছেই। দু-একটার মাথার ওপরে পোস্তদানার মতো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সাদামতো কী যেন? মনে হয় কিছু একটা বয়ে নিয়ে যাচ্ছে! এই কি কবির লেখা সেই ছড়ার চিত্র! ‘খাদ্য সঞ্চয় করিতেছি তাই’-এর মতো কিছু কি? নাকি উপহারসামগ্রী নিয়ে বরযাত্রী যাচ্ছে কনে বাড়ি?
প্রত্যাশার ভাবনার গাড়ি বেসামাল হয়ে গেলে, ডান পায়ের বুড়ো আঙুল হঠাৎ লাইনটাকে মাঝখান দিয়ে মাড়িয়ে দিল। অনেকগুলো পিঁপড়ের মাথা মাটির সঙ্গে মিশে ভাঙা দেহে পড়ে রইল। বাকিরা দিগ্বিদিক ছুটতে থাকল যে যার মতো।
প্রত্যাশার এক মুহূর্তের ভুলে, হঠাৎ এই করুণ দৃশ্যের চূড়ান্ত ফলাফলে তার সমস্ত শরীর ঘাম দিয়ে হিম হয়ে গেল! হঠাৎ মায়ের ডাকে সম্বিত ফিরে পেল সে। আধ মাতালের মতোই এলোমেলো পায়ে ভেতরে চলে গেল খুব মন খারাপ করে।
পুনশ্চ:
সকালে প্রত্যাশা নিথর বসে আছে দক্ষিণের আম গাছটার নিচে বাঁশের সেই টুলের ওপর। ভাবছিল, তার জীবনের কথা। যেন গাছের ফল ও শিকড়ের মতো সম্পূর্ণ বিপ্রতীপ, শূন্যে ঝুলন্ত ও মাটিতে প্রোথিত এক জীবন! আজ ভোরে ইতালির রোম থেকে কল এসেছিল, বিমল নেই!
মাত্র তিন দিনের সর্দি জ্বরে মারা গেছে সে!







