করোনায় আমরা ভীত নই। বরং মোকাবেলা করছি গৃহে অন্তরীণ থেকে। এতে হয়ত কিছুটা বাড়তেও পারে মানসিক চাপ। তাই আসুন, খুলে দেই মনঘরের জানালা। নিজেকে চালিত করি সৃজনশীলতায়। আপনি নিয়মিত লিখছেন, বা এটাই হতে পারে আপনার প্রথম গল্প। লিখুন ফেসবুকে। চটজলদি ৫০০ শব্দের গল্প, বাংলা ট্রিবিউনের জন্য। একইসঙ্গে নমিনেট করুন আপনার পছন্দের আরও ১০ জন লেখককে। সেরা ১০ জন লেখক পাচ্ছেন কাগজ প্রকাশনের বই। আর অবশ্যই হ্যাশট্যাগ দিন #বাংলাট্রিবিউনসাহিত্য
স্টোকহোমে বিউবেনশিয়ার আদলে ছোট্ট শহর নোহাটা। এখন স্রেফ উইন্টার, কেউ হুট করেই এমন কিছু ছুড়ে দিতে পারে না। সময়টা আরলি এপ্রিল। মৃদু শীতের জাঁদরেল মেজাজটা স্যুট-বুটের কাছেই নিষ্পেষিত হচ্ছে। ষোড়শ শতাব্দীতে এ শহরের নিউরণ বেয়ে অনুভূতি প্রবাহ করেছিল সুইডিশ সাহিত্য। শহরকে গভীরভাবে আঁকেন কেউ কেউ। বিষয়গুলো স্মৃতি মন্থরের।
বিগলিত লিন্ড এ সময়টায় এডমিট আছেন সেন্ট গরান হসপিটালে। গত দুসপ্তাহ। এখনকার সময়টা একটু দীর্ঘ। পরিবারের কারওসঙ্গে দেখা হচ্ছে না। এখানেও কেউ আসছেন না। ফোনে নিয়মিত যোগাযোগ হচ্ছে একমাত্র মেয়ে মারিয়ার সঙ্গে। সে প্রচুর কান্না করছে। এ সময়টা জেসিকার সঙ্গে পার্কগুলোতে একটা উল্লাসিত সময় কাটানোর কথা ছিল। স্টারবাকসে কফি, সন্ধের ক্যাফেটেরিয়ায় নৈশভোজ ও হেঁটে বেড়ানো।
সেই ছোট্ট জেসিকাকে এখন সবাই চেনে। টেনিস খেলছে সে। সাতপাঁচ কল্পনায়; বুকের ভেতর হিম হয়ে আসা একটা চাপাকান্না কাজ করছিল। পলিফোনিক রিংটোনের ফোনটা বাজছে; মৃধা। সে নিয়মিত খোঁজখবর রাখছে।
—হ্যালো।
—কেমন যাচ্ছে আপনার সময়? মারিয়ার হাজব্যান্ড মৃধা, শব্দটা স্থির হয়ে আছে। সময় বোধহয় কিছু একটার জন্য অপেক্ষা করছিল!
—খুব একটা খারাপ না। এখন কিছুটা ভালো। নিজের বিষয়ে এরচেয়ে বেশিকিছু আর বললেন না। জেসিকা কী করছে?
—সে কিচেনে আছে; ডিনারের জন্য কিছু প্রিপেয়ার করছে। আপনার কাছে যেতে চেয়েছিল। হসপিটাল অথরিটির অনুমতি নেই।
—ও আচ্ছা।
—আই হোপ আমাদের দ্রুতই দেখা হবে। সে রাতে আপনাকে কানেক্ট করবে।
পৃথিবী এখন অনেকটাই থমকে আছে। হাজারটা স্বপ্নের অপমৃত্যু, নির্বিকার সময়, ভ্যাকুয়াম শূন্য নীরবতা আরও একবার দাঁড় করিয়েছে মানবিক পৃথিবীকে।
—মারিয়াকে দেখ মৃধা। সে এখনও ছেলেমানুষি; আমাকে নিয়ে হয়তো খুব দুঃশ্চিন্তা করছে।
—হুমম। এটা এমন কিছু নয়।
—আমার এটা দুর্ভাগ্য নয়। ছেলেবেলাটা কিছুটা কষ্টে কাটিয়েছি। বিয়ের পরের সময়টাও। মারিয়া বাবা হারিয়েছিল। এরপর ওকে কোলেপিঠে করে বড় করে তুলেছি। কীসের দুর্ভাগ্য?
—ইউ আর অ্যা হ্যাপি উমেন।
—হ্যাঁ, সময়টা নিঃসন্দেহে ভালো কেটেছে এ পৃথিবীতে। কাজে, ছুটিতে, সংসারে, দেশে-বিদেশে ও দেয়া-নেয়ায়। একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়লেন। ভালোই ছিলাম। তবে এখন কঠিন একটা সময় পার করছি। ও ভালোটা দেখে ও রেখে যেতে পারব এজন্যই হয়তো ভালো লাগছে।
আক্ষেপের কোনো জায়গা কি এ মুহূর্তে কাজ করছে বিগলিত লিন্ডের। হয়তো হ্যাঁ, হয়তো না। রহমান মৃধা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। কী বলবেন ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলেন না। এরপর ফোন কেটে দিলেন।
কথা বলার মাঝে মাঝে কিছুটা উচ্চ শব্দে হেসে উঠছিলেন তিনি। জেসিকা টেবিলে খাবাড় দিয়েছে। মারিয়া নিজ রুমেই টেবিলে চুপচাপ গুটি পাকিয়ে বসে আছে। জেসিকা বেশ কয়েকবার নক করল। সে নিজের জায়গা ছেড়ে খাবার টেবিলে আসেনি। ছয়টার সময় ডিনার করার কথা, এখন রাত প্রায় এগারোটা। জেসিকা খাবার টেবিলে অপেক্ষা করছে। মৃধা সাহেব মারিয়ার রুমের দিকে এগিয়ে গেলেন।
—কী ব্যাপার? ডিনার করবে না?
—উঁহু। আজ খেতে ইচ্ছে হচ্ছে না।
—দুঃশ্চিন্তা করো না। কিছুদিনের মধ্যেই ডক্টর জানিয়েছেন ওনার সঙ্গে দেখা করার সুযোগ হবে। সেরে উঠবেন উনি। খেয়ে নাও কিছু। মারিয়া এরপর শুধু একবার পাশ ফিরলেন।
বিগলিত লিন্ড হার মেনেছেন কোভিড ১৯-এ। নিথর দেহের পাশে নাতনি জেসিকা ও মেয়ে মারিয়া দাঁড়িয়ে আছেন। ওনার চোখ দুটো খোলা। সুন্দর এ বসেন্তে বোধহয় আরও কিছুটা দিন জেসিকার সঙ্গে ঘুরে বেড়াতে চেয়েছিলেন। দুজন নিথর দেহটির পাশে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। অবাক বিস্ময়ে। নক্ষত্রেরও কি একদিন মরে যেতে হয় নাকি? হয়তো হয়।
জেসিকা ফিরে যাবার জন্য পা বাড়াল। মনে হলো কেউ একজন হাত ধরে আছে!







