বাবার জুতো

আবদুল্লাহ আল জামিল
২০ এপ্রিল ২০২০, ১১:৩০আপডেট : ২০ এপ্রিল ২০২০, ১১:৩০

করোনায় আমরা ভীত নই। বরং মোকাবেলা করছি গৃহে অন্তরীণ থেকে। এতে হয়ত কিছুটা বাড়তেও পারে মানসিক চাপ। তাই আসুন, খুলে দেই মনঘরের জানালা। নিজেকে চালিত করি সৃজনশীলতায়। আপনি নিয়মিত লিখছেন, বা এটাই হতে পারে আপনার প্রথম গল্প। লিখুন ফেসবুকে। চটজলদি ৫০০ শব্দের গল্প, বাংলা ট্রিবিউনের জন্য। একইসঙ্গে নমিনেট করুন আপনার পছন্দের আরও ১০ জন লেখককে। সেরা ১০ জন লেখক পাচ্ছেন কাগজ প্রকাশনের বই। আর অবশ্যই হ্যাশট্যাগ দিন #বাংলাট্রিবিউনসাহিত্য বাবার জুতো বাবার আদরের একমাত্র কন্যা টুনটুনি আজ খুব খুশি। খুশিতে রীতিমতো হুলস্থূল অবস্থা তার। লাফাচ্ছে খুব চাচ্চুর বাসায় যাবে বলে; আমিও খুশি তবে মনে মনে। শত হলেও আমি এখন বড় হয়েছি, ক্লাস টুয়ে পড়ি; বাচ্চাদের মতো হাউমাউ করে আনন্দ দেখানো আমাকে মানায় না। মা বলেছে আজ চাচ্চু আসবে আমাদের নিয়ে যেতে। চাচ্চুর বাড়ি অনেক মজা।

বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে এই ৪০ দিন আমাদের খুব খারাপ কেটেছে। কষ্টের পর কষ্ট। প্রতিদিনই কেউ না কেউ এসেছে; এসেই বাবার কথা মনে করে শুরু করেছে কান্না, সঙ্গে মাও কাঁদে।

আর ভালো লাগছিল না। গতকাল চল্লিশা হয়ে যাওয়ার পর থেকে মানুষজন কমে গেছে। মায়ের কান্নাভেজা মুখ কম দেখতে হচ্ছে এটাই একটা সান্ত্বনা।

তবে আজ আমাদের ভাইবোনের আনন্দের উৎস আলাদা। আজ হাশেম চাচ্চু আসবে দুপুরের দিকে। এখন থেকে আমরা ওনার বাসাতেই থাকব। অনেক বড় বাড়ি ওনার, আর খুব সুন্দর করে গোছানো। চাচি একটু কেমন যেন; একটু দুষ্টুমি করলেই রাগি গলায় বকা দেন। একবার চাচার বাসা থেকে ঘুরে এসে মায়ের কাছে চাচির নামে নালিশ দিলে মা বলেছিল চাচি নাকি অনেক ভালো, আমাদের অনেক আদর করেন, শুধু রাগটা একটু বেশি এই আরকি। কিন্তু তারপর থেকে শত চাইলেও মা আর আমাদেরকে চাচ্চুর বাসায় খুব একটা যেতে দিতেন না। কিন্তু আজ কত্ত আনন্দের দিন আমাদের! আজ থেকে আমরা শুধু বেড়াতে নয় সবসময়ের জন্যই চাচ্চুর বাসায় চলে যাব। চাচ্চুর বাসাই হবে আমাদের বাসা। মা তো বাড়িওয়ালা আঙ্কেলের সঙ্গে কথা বলার সময় তেমনটাই বলছিলেন।

মা অনেকটাই গুছিয়ে নিয়েছেন, হয়তো আজই চলে যেতে হবে চাচ্চুর সঙ্গে আমাদের। এই বাড়ির বাড়িওয়ালাকে তেমনভাবেই জানানো হয়েছে। আমি তো মনে মনে ঠিক করে ফেলেছি চাচি যতই চোখ কুঁচকে তাকান না কেন আমি প্রতিদিন ছাদে যাবই। চাচ্চুর বাসার ছাদটা যা সুন্দর!

অপেক্ষা করতে করতে টুনটুনিটা কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছে। আমি ঠায় বসে আছি। আজ যে চকোলেটগুলো চাচ্চু নিয়ে আসবে, তারমধ্য থেকে আগেই বেছে বেছে মজার চকোলেটগুলো নিয়ে নেব, তারপর স্কুলে যাওয়ার পথে খাব। লুকিয়ে লুকিয়ে দেখেছি মার হাতব্যাগে খুব সামান্য কিছু টাকা আছে, এই দুইশ পনেরো টাকার মতো হবে হয়তো। মায়ের কাছে বেশ কিছুদিন চকোলেটের জন্য টাকা চাওয়া যাবে না। তবে ওসব নিয়ে চিন্তা এখন না করলেও হবে, চাচ্চু তো আছেই।

দুপুর তিনটার দিকে চাচ্চু এলো। আমি চাচ্চুকে দেখেই দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরলাম। চাচ্চু আমায় কোলে নিয়ে বললেন,‘কী রে তোর মা কোথায়? আমার অফিস আছে আবার যেতে হবে।’

মায়ের সঙ্গে মিনিট পনেরো কথা বললেন; অনেকবার দুঃখ প্রকাশ করলেন একই শহরে থেকেও বাবার চল্লিশাতে না আসতে পারায়।

আমি খুব অস্থির হয়ে আছি; কখন আমরা চাচ্চুর বড় গাড়িটাতে করে রওনা দেব। মায়ের সঙ্গে তো চাচ্চু কথাগুলো গাড়িতে বসেও সেরে নিতে পারে।

এইসময় চাচ্চু বলল,‘ভাবী, ভাইয়ার জামাকাপড়গুলা কই?’ মা আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতেই চাচ্চু একে একে বাবার শার্ট, প্যান্ট, বেল্ট, টাই, স্যুট সব নিয়ে মাকে বলল,‘ভাবী এই কাপড়গুলো নিয়ে গেলাম; খালি খালি পড়ে থেকে নষ্ট হবে, আমার আর ভাইয়ার মাপ তো প্রায় একই। ফেলে রেখে কী লাভ! আর কিছু লাগলে আমাকে কিন্তু ফোন দিও। ভালো থেকো তোমরা।’

মা হতভম্ব হয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল চাচ্চুর দিকে, তারপর তার নিজের ভাবনায় ফিরল। ততক্ষণে চাচ্চু হাওয়া।

আমি দৌড়ে গেলাম টুনটুনিকে ঘুম থেকে ডেকে তুলতে। গিয়ে দেখি ও দরজার পেছনে গুটিশুটি মেরে বসে আছে; বুকে দুহাত দিয়ে শক্ত করে ধরা বাবার অফিসে পরে যাবার কালো জুতো জোড়া। প্রতিদিন সকালে বাবা যখন অফিসের জন্য রেডি হতো তখন আমার কাজ ছিল বিছানার ওপর গুছিয়ে রাখা ইস্ত্রি করা শার্টের ভাঁজ খুলে দেয়া আর বাহারি টাইয়ের গায়ে আলতো করে হাত বোলানো। বাবাকে প্রায়ই বলতাম আমি বড় হলে কিন্তু তোমার টাইগুলো সব আমাকে দিয়ে দিতে হবে, আমি তোমার মতো শার্ট ইন করে পরে সঙ্গে টাই পরে ঘুরে বেড়াবো। বাবা হেসে বলত,‘তুই এই পুরনো টাই দিয়ে কী করবি! ততদিনে এই ডিজাইনের টাইয়ের চল চলে যাবে; আমি তোকে লেটেস্ট ডিজাইনের সুন্দর সুন্দর টাই কিনে দেব। সেগুলো পরে অফিসে যাবি, আর তোকে দেখে সবার চোখ ট্যারা হয়ে যাবে।’ আমি গো ধরে বলতাম, আমার এগুলোই চাই। বাবা আমার আর টুনটুনির সঙ্গে কথা বলতে বলতে রেডি হয়ে নাশতা শেষ করে যখন অফিসের উদ্দেশ্যে রওনা হতো তখন টুনটুনির কাজ ছিল কালো জুতো জোড়া দরজার কাছে রেখে আসা; সে এই কাজকে তার মহান দায়িত্ব মনে করত।

সেদিনের পরেও অনেকদিন পর্যন্ত টুনটুনি প্রতিদিন সকালে বাবার জুতো জোড়া দরজার কাছে রেখে আসত। তারপর বেশ কিচ্ছুক্ষণ অপেক্ষা করে জুতো জোড়া শেলফে এনে রেখে দিত।

ভাগ্যিস চাচ্চু সেদিন বাবার জুতো জোড়া খুঁজে পায়নি, এ যাত্রায় রক্ষা।

/জেড-এস/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
দিল্লীতে আগুনে ৮ বাংলাদেশি আহত, গুরুতর অবস্থা তিন জনের
দিল্লীতে আগুনে ৮ বাংলাদেশি আহত, গুরুতর অবস্থা তিন জনের
ফুল দিয়ে ড. খলিলুর রহমানকে বরণ
ফুল দিয়ে ড. খলিলুর রহমানকে বরণ
প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে বন্ধ কলকারখানা চালু ও ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত সভা
প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে বন্ধ কলকারখানা চালু ও ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত সভা
ত্রিমুখী তদন্তের ‍মুখে বেবিচকের প্রকৌশলী শরিফুল
ত্রিমুখী তদন্তের ‍মুখে বেবিচকের প্রকৌশলী শরিফুল
সর্বাধিক পঠিত
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
তৃতীয় বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাচ্ছেন আমির খান
তৃতীয় বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাচ্ছেন আমির খান