অনেক বেশি লেখেননি তিনি। মাত্র দু খান উপন্যাস, কয়েকটি গল্পগ্রন্থ আর হাতে গোনা কিছু প্রবন্ধ। কিন্তু এর মাঝেই অমরত্ব নিশ্চিত করে ফেলেছেন আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, যার সম্পর্কে মহাশ্বেতা দেবী লিখেছেন, “কী পশ্চিম-বাংলা, কী বাংলাদেশ, সবটা মেলালে তিনি (আখতারুজ্জামান ইলিয়াস) শ্রেষ্ঠ লেখক। ইলিয়াসের পায়ের নখের তুল্য কিছু লিখতে পারলে আমি ধন্য হতাম”। এটি যে নিছক স্তুতিবাক্য নয়, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস সেটাই প্রমাণ করে। আসলেই আখতারুজ্জামান ইলিয়াস এক রহস্য। ছিলেন মধ্যবিত্ত, লিখেছেন মধ্যবিত্তকে নিয়ে, কিন্তু মধ্যবিত্তের গতানুগতিক প্রভুত্ব নস্যাৎ করে নিম্নবর্গকে ভাষিক বয়ানের কেন্দ্রে এনেছেন। আদ্যন্ত একজন সমাজ সচেতন লেখক ইলিয়াস নির্মোহ ভঙ্গিতে স্বপ্ন দেখতে আর দেখাতে চেয়েছেন, যদিও উপন্যাসে স্বপ্নভঙ্গের বেদনা আছে, সাম্য ও মুক্তির স্বপ্নে তবুও আশা রয়ে যায়। নিম্নবর্গের প্রতিরোধ আর বিকল্প বয়ানের মৃত্যু নেই। অন্ততপক্ষে ইলিয়াসের ভাষ্যে, তাই শেষ পর্যন্ত খোয়াব দেখতেই হয়। সেই খোয়াব অবশ্যম্ভাবীভাবে ব্রাত্যজনের স্বপ্ন আর সংগ্রামের বয়ান।
মধ্যবিত্তের চেতনা ও ভাষিক মনোপলি ভেঙে ইলিয়াস অন্য এক সাহিত্যিক মাত্রা এনেছেন। অবসাদগ্রস্ত মধ্যবিত্ত জন্ম দেয় নিষ্ক্রিয়তা। কিন্তু নিম্নবর্গের চরিত্ররা অস্তিত্বগত একঘেয়েমিতে নয়, বরং কাঠামোগত অবিচারের শিকার। তাদের প্রতিবাদ হয়ে ওঠে মধ্যবিত্ত পলায়নবাদের বিপরীত শক্তি। ইলিয়াস প্রতিনিধিত্বের জটিলতা সম্পর্কে সচেতন। দিনলিপিতে লিখেছিলেন- “এ রকম ইতর মধ্যবিত্ত বোধহয় দুনিয়ার আর কোনো দেশে নেই, এখানে রাজনীতি মানে প্রতারণা আর হারামিপনা; টাকার লোভে, সামাজিক প্রতিষ্ঠার লোভে বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত পারে না হেন কম্ম নেই।”তিনি নিজেও মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবী। এই দুই উপন্যাসে মধ্যবিত্ত বিলুপ্ত হয় না; কিন্তু কেন্দ্রীয়তা হারায়। ইতিহাসের গতি সরে যায় নিম্নবর্গের দিকে। মধ্যবিত্ত স্বপ্ন দেখে পালাবার; নিম্নবর্গ স্বপ্ন দেখে রূপান্তরের। এই রূপান্তরমুখী স্বপ্নেই নিহিত ভবিষ্যতের বীজ।
ইলিয়াস জীবনমুখী লেখক আর রাজনৈতিক আন্দোলন আর অস্তিত্বের লড়াই তার উপন্যাসের- পটভূমি- উনসত্তরের গণ অভ্যুত্থান ‘চিলেকোঠার সেপাই’য়ের; আর কৃষক আন্দোলন ও তেভাগা আন্দোলন 'খোয়াবনামা'। সাধারণত- কী রাজনীতি কী সাহিত্যে -প্রান্তিক জনগোষ্ঠী অনুচ্চ যায়। কিন্তু ইলিয়াস এই সাহিত্যিক দ্বিচারিতাকে চুরমার করে এগিয়ে গেছেন। নীরবতার ট্যাবু ভেঙে তিনি রাজনীতি ও সাহিত্যকে একই সমতলে দেখেছেন - যার ভরকেন্দ্রে সাধারণ মানুষ। যেখানে ব্যক্তি ইতিহাসের নায়ক নয় বরং ইতিহাস আর সময় নিম্নবর্গের প্রতিরোধের মধ্য দিয়ে বাঙময় হয়ে উঠে। শ্রম-ঘাম-পুঁজ নিয়েই তাঁর সৃষ্ট চরিত্রগুলোকে রূপদান করেছেন। সেখানে নায়কের প্রাধান্য নেই, নেই ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধতার কচকচানি, রয়েছে জনগণের জীবনসংগ্রামের মধ্যে বেঁচে থাকার বিশ্বস্ত যাপনচিত্র। গায়ত্রী স্পিভাক প্রশ্ন রেখেছিলেন ' নিম্নবর্গেরা কি কথা বলতে পারে?' ইলিয়াস অনেক আগেই তার উপন্যাসে দেখিয়েছেন নিম্নবর্গ ইতিহাসের দিক নির্দেশক হয় আর আগামী ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখায়। মধ্যবিত্ত আর উচ্চবিত্তের বাক্যবাগীশ ও সুচতুর নেতাদের চেয়ে এইসব ব্রাত্যজনেরা বহুগুণে ক্ষমতাশালী।
শাহাদুজ্জামানের ‘লিরিক’ পত্রিকায় এক সাক্ষাৎকারে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস পরিষ্কার করে বলেছেন তার সাহিত্যে যেন ইমোশন সেন্টিমেন্টের রূপ না নেয়। আবেগকে নির্মমভাবে দেখানোর আশ্চর্য গদ্য শিল্পী তিনি। তাই নিম্নবর্গকে বাস্তবতায় প্রথিত করেছেন। নিম্নবর্গের চোখ দিয়ে যখন উচ্চ বর্গের সমাজ ও গল্প দেখি তখন তা অনেক ক্ষেত্রেই ফালতু ও অবাস্তব দেখায়। ঠিক একই কারণে যতই কাছাকাছি আসুক সমাজতন্ত্রের কর্মী আনোয়ারের চিন্তার সাথে করম আলীদের চিন্তার মধ্যে রাত আর দিন পার্থক্য থেকে যায়। এই পার্থক্যের কারণেই ওসমান চিলেকোঠাতেই বন্দী থাকে বারবার। ওসমান গণি ওরফে রঞ্জু দেশবিভাগের কারণে উদ্বাস্তু হয়ে ঢাকায় আসে। সবকিছু থেকে সে বিচ্ছিন্ন আর ছিন্নমূল। ওসমান সবকিছু দেখে, শোনে, মিছিল-মিটিংয়েও যায়। কিন্তু কোনো কিছুতেই সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে পারে না। তার বিচ্ছিন্নতা ও আত্মপ্রেমের চিলেকোঠার চার দেয়ালে আবদ্ধ থেকে তার দিন কাটে। ১৯৭৬ সালে প্রকাশিত ‘অন্য ঘরে অন্য স্বর’ গ্রন্থের একটি গল্প ‘নিরুদ্দেশ’। রঞ্জু বারবারই মনোটোনাস শহর ছেড়ে কোথায় যেন পালাতে চায়। বারবার মায়ের ঘরে যেতে চায় আর বলে 'আম্মা দরজা খোলো, দরজা খোলো, আম্মা দরজা খুলে দাও, খুলো না তাড়াতাড়ি, খোলো। রঞ্জু বারবার তার মায়ের ঘরে গিয়ে বলে কিছু একটা ফেলে এসেছে। কিন্তু মনে করতে পারে না আসলে কি ফেলে এসেছে। গল্পের শেষে ভারী বৃষ্টিতে রঞ্জু ভিজে গেল। এই গল্পের রঞ্জুর মত, ইলিয়াস নিজেই এক সংকটে ভুগছেন। রঞ্জুর এই ইডিপাস কমপ্লেক্স, অবচেতনের এই দ্বৈরথ আমরা আবার ফিরে পাই 'চিলেকোঠার সেপাই' উপন্যাসে। একসময় একই নামের আরেক বালক রঞ্জুকে প্রায় মেরেই ফেলতে গিয়েছিল। এর ব্যাখ্যা কোথায়? পলায়নবাদী মধ্যবিত্ত ও তার মানসিক দৈন্য, অক্ষমতা ও নার্সিসিজম?
নিম্ন বর্গের জীবন সংগ্রামের কথা বলতে গিয়ে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস একদিকে যেমন শ্রমজীবী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে সামনে এনেছেন, তেমনি ইতিহাস কেউ আলাদা চরিত্র, আলাদা বৈশিষ্ট্য দিয়েছেন। উনসত্তরের গণ অভ্যুত্থান এই উপন্যাসে শুধু মাত্র পটভূমি নয়; বরং উনসত্তর নিজেই একটি চরিত্র। আর চূড়ান্তে গুহাজীবী চিলেকোঠার ছোট বৃত্ত থেকে জনারণ্যে মানুষের সাধারণ জীবনের বৃহৎ পরিসরে রয়েছে সার্থকতা। উনসত্তর যে স্বাধীনতা আন্দোলনকে চূড়ান্ত রূপ দেয় এবং এই ঊনসত্তরই যে হাজার বছরের বাংলার শোষণ মুক্তির হাতিয়ার তা লেখক ওসমানের চিন্তায় এবং চোখে দেখিয়েছেন। লেখকের লেখনিতে-
…সব রাস্তায় আগুন জ্বলছিল, নবাবপুরে আগুন, নীমতলীতেও আগুন। ফায়ার ব্রিগেডের বড় বড় গাড়ি থেকে বড় পাইপ দিয়ে জলধারা পড়ে রাস্তাঘাট ভেসে যাচ্ছে, আগুনের শিখা নিচে নামে না। দেখতে দেখতে সেই জলধারা পরিণত হয় নদীতে। চিলেকোঠার চার দেয়াল থেকে মুক্তির প্রচেষ্টা অবশেষে ওসমানকে উন্মত্ত করে তোলে। পরিচিতরা বদ্ধ পাগল হিসেবে চিহ্নিত করে তাকে আটকে রাখে তার নিজের ঘরে। মুক্তি আকাঙ্ক্ষী ওসমানের কাছে মনে হয়,
… মহল্লার গলি, উপগলি, শাখা গলি থেকে আরো সব লোক এসে জুটেছে খিজিরের সঙ্গে। এত লোক কোত্থেকে আসে? অবশেষে সেই বিচ্ছিন্ন ঘর থেকে তাকে বেড়িয়ে পড়তে প্ররোচনা দেয় গণ-অভ্যুত্থানের সদস্য হওয়ার অপরাধে মধ্যরাতে কারফিউ চাপা রাস্তায় মিলিটারির হাতে প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত হাড্ডি খিজির। সমাজের তথাকথিত নিম্নস্তরের সামান্য একজন শ্রমিকই ওসমানের মুক্তি আকাঙ্ক্ষী সত্তাকে জাগিয়ে তোলে।
উপন্যাসের শেষে ওসমানকে আটকে রাখার জন্য বন্ধুদের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যায়। নিহত খিজিরের আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে সে ঘরের তালা ভেঙে সবার অগোচরে রাস্তায় বেড়িয়ে আসে। চিলেকোঠার বন্ধন থেকে মুক্তি পেয়ে ওসমানের সামনে অজস্র পথ খুলে যায়। নিজের সামনে-পেছনে-ডানে-বায়ে সব পথকেই তখন তার আপন মনে হয়। মূলত, চিলেকোঠার চার দেয়ালের বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়ার সাথে সাথে তার বিচ্ছিন্নতা ও আত্মপ্রেমের বন্ধন থেকেও তার মুক্তি ঘটে। বৃহত্তর গণ-আন্দোলনের জোয়ারে অবশেষে ওসমান একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে মিশে যেতে সক্ষম হয়। এই উপন্যাসে ওসমানের বিচ্ছিন্নতাবাদের বিপরীতে হাড্ডি খিজিরের সাহসী ও সংগ্রামী জীবনকে তুলে ধরা হয়েছে। সমাজের তথাকথিত নিম্নস্তরের সামান্য একজন শ্রমিকই ওসমানের মুক্তি আকাঙ্ক্ষী সত্তাকে জাগিয়ে তোলে। হাড্ডি খিজির চিলেকোঠার সেপাই উপন্যাসের একটি চরিত্র নয়। নিজস্ব বক্তব্য, বাচিক মানচিত্র এবং আপসহীন অস্তিত্ব নিয়ে কেন্দ্রীয় চরিত্র এই হাড্ডি খিজির।
“চিলেকোঠার সেপাই' রচনার প্রায় ২০ বছর পরে প্রকাশিত খোয়াবনামা আরো বিশাল পটভূমি, প্রেক্ষাপট ও স্বপ্ন নিয়ে রচিত হলেও, নিম্নবর্গের সত্যনিষ্ঠ বয়ান হিসেবে 'চিলেকোঠার সেপাইয়ে'র অনুরণন এখানেও রয়ে যায়। তেভাগা আন্দোলনের পটভূমিতে নির্মিত 'খোয়াবনামা'য় লোককথা, স্বপ্ন, স্মৃতি ও রাজনৈতিক বিদ্রোহ একত্রে গাঁথা। চিলেকোঠার সেপাই উপন্যাসের সাথে এর বর্ণনা কৌশল ও পটভূমির ফারাক অনেক। চিলেকোঠার সে পায়ে ব্যঙ্গ, স্যাটায়ার আর মধ্যবিত্তকে আগাপাশতলা পরিহাস করার যে বয়ান ভঙ্গি আমরা দেখি, 'খোয়াবনামা'য় তার চেয়ে একটা ভিন্ন মাত্রা দেখি। কারণ হয়ত শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এই উপন্যাসে ব্রাত্যজনের কথা বলা হয়েছে। রাজনৈতিক ভাষ্য নয়; বরং ভূমি, ফসল ও জীবিকার বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে উৎসারিত এর আবহ। ইলিয়াস এখানে কৃষককে কেন্দ্রে এনেছেন, নগরের শ্রমজীবী ও মধ্যবিত্ত নয়। তবু যে বিষয়টা এই দুই উপন্যাসকে এক করেছে তা হলো নিম্নবর্গের ভাষিক ক্ষমতায়ন আর বয়ান। স্বপ্ন - সমাজ বিনির্মাণ আর সাদাহন মানুষের মুক্তির অভীপ্সা এই দুই উপন্যাসকে এক পঙক্তিতে এনেছে। এখানে খোয়াব মানে মধ্যবিত্তের অবসাদ আর পলায়নবাদী আত্মরতি নয় -রাজপথ আর জনারণ্যের ব্রজ নির্ঘোষ। ‘খোয়াবনামা’ উপন্যাসে গ্রাম বাংলার নিম্নবিত্ত শ্রমজীবী মানুষের জীবনালেখ্যসহ ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ, আসামের ভূমিকম্প, তেভাগা আন্দোলন, তেতাল্লিশের মন্বন্তর, পাকিস্তান আন্দোলন, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ইত্যাদি ঐতিহাসিক উপাদান নিপুণভাবে ওঠে এসেছে। একদিকে তেভাগা আন্দোলন আর স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত গ্রাম - ‘নিজ খেলানে ধান তোলো’, ‘জোতদার মজুতদার হুঁশিয়ার’। অন্যদিকে পাকিস্তানের দাবি, ছেচল্লিশের ভোটাভুটি, হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে দাঙ্গায় পালটে যেতে থাকে ইতিহাসের পট, দেশ ভাগ। এর মধ্যেই কোনো এক গাঁয়ের ‘তমিজের বাপ’ বিলের ধারের কাদায় পা গেঁথে সেখানকার পাকুড় গাছের ডালে দেড়শো বছর আগের গোরা-ঠ্যাঙানো ভবানী সন্ন্যাসীর পাঠান সেনাপতি ‘মুনসি’কে এক পলক দেখার আশায় দিনের পর দিন আকাশে জমা ছাই রঙের মেঘ তাড়িয়ে বেড়ায়।
‘খোয়াবনামা’য় আখতারুজ্জামান ইলিয়াস এক অসাধারণ ইলিয়াসিয় ভঙ্গিতে পাঠককে জানান কীভাবে বাকি দৃষ্টিভঙ্গিতে পাঠ করতে হয়। কাতলা হাড় বিলে পাকুড় গাছে ঝুলে থাকা মুন্সি আর ঘুম তাড়ানো ও হাত দিয়ে তাড়ানো তাড়ানো মেঘের দিকে ইলিয়াস আমাদের ভালো করে তাকাতে বলেন। মনে করিয়ে দেন ওইদিকে আরও একটু নজর দিতে। আসলে তিনি নিম্নবর্গের বয়ানকে আরো গভীরভাবে, একনিষ্ঠভাবে দেখতে বলছেন। এই উপন্যাসে তমিজের বাপ এক বিচিত্র চরিত্র। তার জন্ম বা মৃত্যুর হদিশ নেই, এমনকি নাম পর্যন্ত জানা যায় না কোথাও। মুখে মুখে শ্লোক আওড়ে গ্রামের লোকের ব্যাখ্যাতীত স্বপ্নের ব্যাখ্যা করে বেড়ায় সে। এ যেন এক অলৌকিক মানুষ লৌকিক মানুষের আশেপাশে বসবাস করে। লৌকিকতা বলতে তমিজের বাপের আছে ফকিরি, ভিক্ষাবৃত্তি, অকারণে বেগার খাটা আর কঙ্কালসার শরীরে সীমাহীন ক্ষুধা। এই তমিজের বাপের কাছেই আছে ইলিয়াসে সেই গোপন খোয়াবনামা। কারণ চেরাগ আলি ফকিরের কাটাকুটি করা খাতায় সন্ধান মেলে সকল স্বপ্নের ব্যাখ্যা, যা এ তমিজের বাপে জানে। একদিকে ভাবলে তমিজের বাপ এ উপন্যাসের অতীত ও ভবিষ্যতের অতীন্দ্রিয় যোগসূত্র। এই আখ্যানে আছে স্মৃতি বাস্তবতা, ইতিহাসের পাশাপাশি কিংবদন্তি, প্রান্তিক মানুষ ও তাদের পূর্ব-প্রজন্মের সহাবস্থান। এ যেন ইতিহাস না হয়েও একখণ্ড ইতিহাস। তমিজের বাপ স্বপ্ন দেখে কাতলাহার বিলে মাছ ধরার, যা পরাবাস্তববাদী স্বপ্নে রূপ নেয় ফকির মজনুর সেনাপতি মুন্সির স্বপ্নে। সেই মুন্সির ঝুলে থাকে পাকুড় গাছে। কিন্তু তুমি স্বপ্ন দেখে বাস্তবের স্বপ্ন - নিজের জমি, নিজের ঘর আর খাবার স্বপ্ন। উপন্যাসের শেষ পৃষ্ঠায় আমরা দেখি তমিজের স্বপ্ন সম্প্রসারিত হয় তার মেয়ে সখিনার আউশ চালের গরম ভাত খাবার স্বপ্নের মধ্য দিয়ে। তমিজ চলে গেলেও তার উত্তরসূরি স্বপ্ন দেখে আর তাকিয়ে রই সেই "কাৎলাহার বিলের উত্তর সিথানে জখম চাঁদের নিচে জ্বলতে-থাকা জোনাকির হেঁসেলের দিকে।" এই উপন্যাস যেমন যেমন শুরু হয়েছিল তমিজের বাপের স্বপ্ন দিয়ে, শেষ হয় তমিজের বউ ফুলজানের স্বপ্ন দিয়ে।
‘চিলেকোঠার সেপাই’ ও ‘খোয়াবনামা’ পাশাপাশি রাখলে দেখবো এই উপন্যাস দুটো আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের সাহিত্য ও জীবন ভাবনার কেন্দ্রবিন্দু। ‘চিলেকোঠার সেপাই’ উপন্যাসের নিম্ন বর্গের চিত্র আর ‘খোয়াবনামা’র নিম্নবর্গের জ্যামিতির মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য আছে। ‘চিলেকোঠার সেপাই’ উপন্যাসে রাজধানী শহর ঢাকার ক্রমবর্ধমান নগরায়ণে শহুরে ঘিঞ্জি বস্তি, দুস্থ শ্রমিক আর নগরের হতদরিদ্র জনগোষ্ঠী প্রকটভাবে দৃশ্যমান, যদিও ৬৯ এর গণ-অভ্যুত্থানের গ্রামীণ ফলাফল দেখানোর জন্য বগুড়ার যমুনার ভাঙন কবলিত চরের খেতমজুর করমালি আর চেংন্টুদের গল্পে আমরা ঢুকে পড়ি। কিন্তু গল্পের আলোকপাত অনেকটাই শহরে মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবী শ্রেণির অতিরিক্তকারী ওসমানের 'শ্রেণিচ্যুতি হবার প্রক্রিয়ার উপরে। অন্যদিকে ‘খোয়াবনামা’ উপন্যাসে কৃষক শ্রেণির চোখ দিয়ে আমরা কৃষক শ্রেণিকে দেখি।। আর গল্পের ভেতরে অসংখ্য গল্প ঢুকে পড়া,এক স্বপ্নের ভেতরে আরেক স্বপ্নে ঢুকে পড়ার ক্রম প্রসারমান প্যাটার্নটি আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের গল্প বলার ধরনের গভীরতাকে নির্দেশ করে। এই দুই উপন্যাসেই নিম্নবর্গ বেশ জোরালোভাবে উপস্থিত। ইলিয়াসের লেখনীর শক্তি এখানেই যে তিনি একইভাবে ক্লান্তিকর একঘেয়ে বর্ণনা কৌশল অনুসরণ করেননি। তাই দুই উপন্যাসের পটভূমি, গল্প বলার কৌশল আর লেখনীর অভীক্ষা দুইরকম। কিন্তু চূড়ান্তে নিম্নবর্গের জীবনকে আরো ভেতর থেকে আমাদের সামনে উন্মোচিত করে। ইলিয়াসের সার্থকতা এই যে তিনি এই নিম্নবর্গের সফলতা ও সংগ্রামের একটি মহাকাব্যিক রূপ দিয়েছেন। জাতীয় ইতিহাস ও নিম্নবর্গের অর্থনৈতিক সংগ্রাম এক হয়ে গেছে। ইলিয়াস কোনো প্রকার নাকামোপনার আশ্রয় নেননি। তিনি একজন চিকিৎসকের চোখ নিয়ে সমাজকে দেখেছেন যাতে তার গভীরের রোগ গুলো ধরা পড়ে। আর কে না জানে সামন্তবাদী সমাজের রোগ তার অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে। ইলিয়াসের ব্যক্তিগত খোয়াব নিম্নবর্গের সাথে সমাজের ক্ষমতায়নের খোয়াব। শেষ পর্যন্ত সামন্ততন্ত্রের অবশেষ ভেঙে পড়বে নিম্নবর্গের সচেতন আন্দোলনে। এটাই আমরা দেখি " চিলেকোঠার সেপাই " উপন্যাসে। এটারই মহাকাব্যিক ব্যাপ্তি দেখি" খোয়াবনামা"যেখানে ফকির বিদ্রোহ,সন্ন্যাসী আন্দোলন, তেভাগা আন্দোলন আর কৃষকের স্বপ্ন এক হয়ে যায়।
ইলিয়াসের গল্পগুলোতে মধ্যবিত্তের একঘেয়েমি, বিচ্ছিন্নতাবোধ, ক্লান্তি ও এনুইয়ের মিথ স্ক্রিয়া দেখি। কিন্তু দুটো উপন্যাসে ক্লান্ত বিধ্বস্ত ও পলায়নবাদী মধ্যবিত্তকে তিনি অতটা গুরুত্ব দেননি। ইলিয়াসের যাবতীয় মনোযোগ কেড়ে নিয়েছে নিম্নবর্গের সামষ্টিক প্রতিবাদ। খোয়াবনামায় তেভাগা আন্দোলনে তমিজের বয়ানে আর চিলেকোঠার সেপাই উপন্যাসে খিজির, করমালি আর চেংটুদের প্রতিবাদ ইলিয়াসের কাছে পলায়নবাদী মধ্যবিত্তের বিকল্প বয়ান। গায়ত্রী স্পিভাক প্রশ্ন রেখেছেন " ক্যান দা সাবঅল্টার্ন স্পিক?" তমিজ, ফুলজান, খিজির, খিজির ছেলে জুম্মন, করমালি আর বেপরোয়া চেংটুদের বিকল্প বয়ানের মাধ্যমে রঞ্জু ওরফে ইলিয়াস স্পষ্ট করেছেন নিম্নবর্গ কথা বলে - দাপটের সাথেই আর ওখানে সব স্বপ্নের বীজ। নিম্নবর্গের গালিগালাজ ও ভাষারীতি প্রসঙ্গে একটি কথা না বললে নয় এই ভাষা ইলিয়াস সচেতনভাবে করেছেন যাতে ভাবালুতা বর্জিত হয়ে সমাজের বাস্তবতা সত্যভাবে ধরা পড়ে। খিজির গালি ছাড়া কথাই বলে না। আর গিরিলডাঙ্গা গ্রামের মাঝি ও কত ভাষায় গালি ব্যবহার করে। এই গালিগুলোকে কি আমরা ভাষাভিত্তিক প্রতিরোধের ছবি দেখতে পারি কিনা তা ভেবে দেখার বিষয়।
আখতারুজ্জামান ইলিয়াস শুধুমাত্র নিম্নবর্গের চরিত্রদের তার কথাসাহিত্যের কেন্দ্রে আনেন নেই, তাদের শব্দ, চেতন ও অবচেতন তথা ভাষা সবকিছুকেই তিনি জীবন্ত করেছেন। সেটা হোক ঢাকার ঘিঞ্জি বস্তির খেটে খাওয়া রিকশাওয়ালা বা বগুড়ার যমুনাচরের প্রান্তিক কৃষক। ইলিয়াসের ভুবনের প্রতিটি চরিত্র তখনই জীবন্ত হয়ে ওঠেন ভাষা ভাবতে প্রাণ দেয় আর সেই প্রাণ ইলিয়াসের সাহিত্যকে ইলিয়াসিয় করে তোলে। ইলিয়াস মোটেই চাননি তার উপন্যাসের চরিত্রগুলো সেন্টিমেন্টাল বা আবেগাপ্লুত হোক। কোন প্রকার মিথ্যে প্রবঞ্চনা, স্বর্গ নরকের বুজরুকি নেই তার গদ্য ভঙ্গিতে। একেবারে টাটকা রক্ত মাংসের মানুষেরা রূঢ় বাস্তবতা দেয়াল বেয়ে তার কথা সাহিত্যে উঠে আসে। কখনো কখনো তারা বাস্তবতা থেকে পরাবাস তবে ঝাপ দেয়। নিম্নবর্গের কাহিনি বলতে গিয়ে কখনো তিনি চিত্র খিস্তি খেউর ব্যবহার করেছেন। সহজ ভাষায় বললে তিনি গালিগালাজ ব্যবহার করেছেন। বাংলা সাহিত্যে ইলিয়াসের এত গালিগালাজ আর কেউ আওড়াননি। গালি অক্ষমের সান্ত্বনা, নিম্নবর্গের ভাসিক প্রতিবাদও বটে। ইলিয়াস নিজেও কোনোদিন ধার ধারতেন না, ভাষা ব্যবহারে কোনো ছুতমার্গের আশ্রয় তিনি নেননি। তার স্বাভাবিক গদ্য ও ভাষা বিন্যাস নিম্নবর্গের মানুষের কথোপকথনের মতো ব্যঙ্গ কৌতুক প্রবণ। ইলিয়াসের ব্রাত্যজনেরা তাদের মতো করেই খিস্তি করে আর অবলীলায় আঞ্চলিক উপভাষায় কথা বলে। ফলে তার গল্পে তেজস্ক্রিয়তা মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে পাঠকের মনে ও মগজে। শ্রেণি দ্বন্দ্ব, ধনবৈষম্য, নব্য সামন্ত শ্রেণির আবির্ভাব এবং প্রান্তিক জনের সর্বহারা সর্বহারা ও নিঃস্ব করণ প্রক্রিয়ার ফাসিক রূপ হচ্ছে এই স্ল্যাং ও খিস্তির ব্যবহার। রহমত উল্লাহ মহাজনকে আক্রমণের আর কোনো উপায় নাই যে হাড্ডি খিজিরের, শুধুমাত্র শব্দই পারে ক্ষমতায়ন করতে ; আর ‘খোয়াবনামা’র হতদরিদ্র খেতমজুরদের ভাষাই হচ্ছে প্রতিবাদের একমাত্র কৌশল। তাই জালে মাছ না উঠলে, জেলেরা কাতলাহার বিলের মাছদের সাথেও গালি দিয়ে কথা বলে। ইলিয়াস তার ডায়েরিতে লিখেছেন ‘ভোটের রাজনীতিতে দরকার পোস্টার, আর বিপ্লবের জন্য চাই সাহিত্য’। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের সাহিত্যভবন বিশেষ করে প্রান্তজনের ভাষা সেই সাহিত্যের প্রতিফল।
আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের উপন্যাসে আত্মপ্রেমিক ও আপাদমস্তক প্রবঞ্চক উচ্চবর্গের বিপরীতে নিম্নবর্গ সচল, সরব,ইতিহাসের গতিরেখা নির্ণায়ক। আলতাফ, খয়বর গাজী, আলাউদ্দিন মিয়া বা ওসমানেরা ' চিলেকোঠার সেপাই ' উপন্যাসে যত বড় অংশজুড়ে থাকুক না কেন, ছোটলোকের দলের হাড্ডি খিজির, করমালি ও চেংটুরা শেষপর্যন্ত ইতিহাসের নায়ক। তেমনি তমিজ, তমিজের বাপ, বৈকুন্ঠ, চেরাগ আলি ফকির, ফুলজান আর পাকুড় গাছে ঝুলে থাকা মুন্সি ' 'খোয়াবনামায়' এক নতুন ইতিহাস গড়ে তুলে পুরোনো হেজিমনি যা চাপা রাখতে চেয়েছে। শেষ পর্যন্ত দুই উপন্যাসেই নিম্নবর্গ প্রতিরোধের বিকল্প বয়ান নির্মাণ করে। ইলিয়াস সাবঅলটার্নকে রোমান্টিক করে তোলেন না, আবার তাদের কণ্ঠ নিঃশেষও করেন না। বরং তিনি বর্ণনার ভৌগোলিক মানচিত্র পালটে দেন। আত্মমগ্ন মধ্যবিত্তের বদলে ইতিহাস নির্মাণকারী সামষ্টিক দেহ হয়ে ওঠে তার উপন্যাসের কেন্দ্র। ইলিয়াসের উপন্যাসে নিম্নবর্গ সবল,স্পষ্ট ও প্রতিবাদী। আর এখানেই ইলিয়াস সবার চেয়ে আলাদা। গায়ত্রী স্পিভাক যেখানে প্রশ্ন তোলেন, ইলিয়াস সেখানে তত্ত্ব নয়, আখ্যানের মাধ্যমে সম্ভাব্য উত্তর নির্মাণ করেন। তার উপন্যাসে সাবঅলটার্ন কেবল কথা বলে না—তারা অর্থ-উৎপাদনের ক্ষেত্রকেই পুনর্গঠিত করে।
আপাতদৃষ্টিতে ‘চিলেকোঠার সেপাই’ ও ‘খোয়াবনামা’ দুটি ভিন্ন প্রেক্ষাপটে লেখা হলেও শেষ পর্যন্ত মূলত এই দুই উপন্যাসে এক ও অবিচ্ছিন্ন এক বয়ান। ১৯৬৯ সালে তিন মাসের পটভূমিতে লেখা চিলেকোঠার সেপাই মূলত লক্ষ লক্ষ নিম্নবর্গের স্বপ্ন সাধনার কথা বলে। হাড্ডি খিজির মরে গেলেও তার স্বপ্ন কথা বলে জুম্মনের মধ্য দিয়ে। ঠিক তেমনি খোয়াবনামা উপন্যাসে সকল চরিত্র আসলে একই স্বপ্ন দেখে। মুক্তি ও সংগ্রামের স্বপ্ন। আপাতদৃষ্টিতে অলীক বলে মনে হলেও উপন্যাসের স্বপ্নসমূহ প্রকৃতপক্ষে সাবঅল্টান চেতনার রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক আকাঙ্ক্ষার বাহক। তমিজের বাপের স্বপ্ন, গিরিরডাঙ্গার জেলেদের স্বপ্ন, তমিজ ও ফুলজানের স্বপ্ন কিংবা সখিনার অন্নসংকট অতিক্রমের স্বপ্ন—এসব বিচ্ছিন্ন অভিজ্ঞতা নয়; এগুলো এক সমষ্টিগত স্মৃতি ও মুক্তি চেতনার আন্তঃপ্রজন্ম সঞ্চার। স্বপ্ন তাই নিছক দিবাস্বপ্ন নয়; এটি এমন এক প্রতীকী উচ্চারণ, যেখানে ক্ষমতার প্রত্যক্ষ নজরদারি প্রবেশ করতে পারে না। ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহের নেতা মজনু শাহ–এর মুক্তিস্বপ্ন থেকে তমিজ ও তার পূর্বপুরুষদের আকাঙ্ক্ষা পর্যন্ত যে ধারাবাহিকতা, তা ইতিহাসের দীর্ঘ প্রতিরোধ স্মৃতিকে বর্তমানের সঙ্গে যুক্ত করে। এইভাবে ইলিয়াস স্বপ্নকে কেবল ন্যারেটিভ কৌশল হিসেবে নয়, বরং সাবঅল্টান চেতনার এক স্বতন্ত্র ও সাংস্কৃতিক ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন—যেখানে নীরবতাও হয়ে ওঠে উচ্চারণ, আর কল্পনাই রূপ নেয় ইতিহাস-সচেতন প্রতিরোধে।









