সাগরে পাওয়া পত্রাবলি।। লিয়ানা বাদর

অনুবাদ: আলমগীর মোহাম্মদ
২৪ মার্চ ২০২৬, ২২:২৭আপডেট : ২৪ মার্চ ২০২৬, ২২:৩০

[লিয়ানা বাদর ফিলিস্তিনি ঔপন্যাসিক, ছোটোগল্পকার এবং সিনেমা পরিচালক। ফিলিস্তিনের লেখকদের মধ্যে তার লেখা সবচেয়ে বেশি অনূদিত হয়েছে। জেরিকো থেকে তিনি ১৯৬৭ সালে নির্বাসিত হন এবং দুনিয়ার বিভিন্ন দেশে বসবাস করে আসছেন। তার পরিচালনায় নির্মিত ডকুমেন্টারি ফিল্‌মের সংখ্যা সাতটি। এই ফিল্মগুলো তাকে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পুরস্কার এনে দিয়েছে। গল্পটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন, আইদা বামিয়া ও অমনিয়া আমিন।]



এই ছোটো আলোক-নিঃসারী যন্ত্রটি এখনও সেই চিঠিগুলোর পাঠোদ্ধার করে চলেছে, যেগুলো আমি কিছুক্ষণ আগে সমুদ্রে ভাসমান অবস্থায় পাওয়া একটি বোতল থেকে উদ্ধার করেছি। বিচ্ছিন্ন কিছু শব্দের অর্থ উদ্ধার করতে শুরু করেছে এটা। যেমন : মধু, গ্রীষ্ম, পুরুষ মৌমাছি, উষ্ণতা, বাদামি, লাইলাক ফুল, নলখাগড়া, লতা-মাধবীর মাচা, এক মুঠো মাটি, এক চিলতে বাতাস, প্যাপিরাস, ভ্যানিলা আইসক্রিম, আঙুর, মশলা, ক্যাসেট টেপ, নীল, বাঁশি, একটি শার্ট, একটি ঘোটকী, তুষার...

​বোতলটি পাওয়ার আগে আমি 'ভালোবাসা' শব্দের অর্থ খুঁজছিলাম। ঘটনাক্রমে আমার হাতে আসা বেশ কিছু অস্পষ্ট গ্রন্থে এই শব্দটির দেখা মিলেছিল। আমি এমন কিছু চিত্র এবং টেপেও এটি পেয়েছিলাম যা মহাপ্লাবনের আগের পৃথিবীতে এক বিশেষ ধরনের জীবনধারাকে প্রতিনিধিত্ব করত। চোখের সামনে ভেসে ওঠা ওই অদ্ভুত নামগুলো আমাকে বিচলিত করে তুলছিল। প্রাচীনকালের মানুষ যেসব শব্দ ব্যবহার করত, সেগুলোর অধিকাংশের সাথেই পরিচিত না থাকাটা এক বিচিত্র অনুভূতি। মহাপ্লাবনের পরের সময়টা সব বদলে দিয়েছে।

​পানির ওপর ভাসতে থাকা বোতলটির ভেতর যখন একটি চিঠি পেলাম, তখন আমার কৌতূহল আরো বেড়ে গেল। এটি এমন সব শব্দে ঠাসা ছিল যা এমন এক ভালোবাসা বর্ণনা করছিল, যা আমি বোঝার আকাঙ্ক্ষা আমার আছে। সমুদ্রের পানি পৃথিবীকে গ্রাস করার ঠিক আগমুহূর্তে নিজের উপচে পড়া আবেগ প্রকাশ করতে চাওয়া এক ব্যক্তির হাতে লেখা ছিল এগুলো।

​আমার এই ছোট জাপানি যন্ত্রটির একটি কাজ হলো কোনো বস্তু বা তার অনুষঙ্গগুলোর অর্থ বুঝতে আমাকে সাহায্য করা। মাত্র একটি বোতাম চাপলেই এটি প্রতিটি বিশেষায়িত বিশ্বকোষ তন্নতন্ন করে খুঁজতে পারে এবং এটি অলৌকিকভাবে বুঝে ফেলে আমি ফলাফলে সন্তুষ্ট কি না।

আমি জানতে চাই ভালোবাসা কী, একে স্পর্শ করতে চাই, এর প্রতীক্ষায় থাকতে চাই, একে চিরকাল বহন করতে চাই—যদি এর অস্তিত্ব থাকে। শব্দটি আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে এবং আমার সত্তায় এক নতুন রহস্যময় ও কৌতূহলোদ্দীপক মাত্রা যোগ করেছে। অনুসন্ধানের সময় আমার আঙুলের ডগা দিয়ে এক উষ্ণতা বয়ে গেল, যা সাধারণত বরফের মতো ঠান্ডা থাকে।

​বোতলের চিঠিতে উল্লেখ ছিল , এটি একই ব্যক্তির লেখা ত্রিশটি চিঠির একটি। এ পর্যন্ত আমি মাত্র একটিই পেয়েছি; বাকিগুলো পাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। আমার দলের মধ্যে আমিই একমাত্র ব্যক্তি যার ডুবসাঁতার এবং পানির নিচে বসবাসের অভ্যাস ছিলো । এটিই আমাকে পুরোনো মানচিত্র হারিয়ে যাওয়া, দেশ বিভাজন এবং পরিবেশের আমূল পরিবর্তনের পর বোতলটি খুঁজে পেতে সাহায্য করেছে। ভূখণ্ড এবং এর অধিবাসীরা রূপান্তরিত হয়ে গেছে। এটি ঘটেছিল যখন উত্তর ও দক্ষিণ মেরুর বরফ গলে যাওয়ার পর এক 'মহা সুনামি' আঘাত হেনেছিল। এরপর মানুষ দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে: পাহাড়ের মানুষ ও সাগরের মানুষ।

​বাকিরা ডুবে যাওয়ার পর বিভিন্ন রূপ ও বর্ণের কেবল একটি মানব প্রজাতিই টিকে ছিল। জাতিসংঘ—যা এখন কেবল একটি ভার্চুয়াল নৈতিক সত্তায় পরিণত হয়েছে—তাদের একটি ঘোষণার পর এদের নাম দেওয়া হয় "টিকে থাকতে ভালোবাসা" প্রজাতি। ঘোষণায় বলা হয়েছিল, পৃথিবীর সমস্ত বাসিন্দা একক জিন থেকে উদ্ভূত, তাই তাদের বর্ণ নিয়ে তুচ্ছ বিবাদ বন্ধ করা উচিত, যা আমাদের গ্রহকে বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিয়েছে। ২০১৭ সালে 'ব্রাইটন হিউম্যান' আবিষ্কার এবং অনুরূপ অনুসন্ধানগুলো প্রমাণ করেছে যে, উত্তর গোলার্ধের বাসিন্দা এবং আদি ইংরেজদের গায়ের রং ছিল কালো এবং চোখ ছিল নীল, যা সেই পৌরাণিক যুগ পর্যন্ত বিস্তৃত। এই আবিষ্কারের সাথে সাথেই জন্ম নেয় এক নতুন প্রজন্ম যাদের গায়ের রং ফরসা এবং চোখের রং উজ্জ্বল। তারা অন্য সব প্রজন্ম যারা ভিন্ন গায়ের রং ও গড়নের ছিল, তাদের সাথে মিশে গিয়ে সর্বত্র বসতি স্থাপন করে। তাদের এই বিচরণ সেই সংকীর্ণমনা ও সীমাবদ্ধ চিন্তার অবসান ঘটায়, যা গায়ের রং বা চোখের রং দিয়ে প্রজাতি নির্ধারণ করত।

​ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল ত্রিশ বছরেরও বেশি সময় আগে, যখন উত্তরের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশের শাসক চরম দক্ষিণের অন্য এক নেতার সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন। দুজনেরই চরিত্র ছিল বিরক্তিকর, মেজাজ ছিল উগ্র এবং তাদের বাণিজ্যিক স্বার্থ ছিল সাংঘর্ষিক। একদিন একটি ফেরিতে তারা লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়েন যে কার 'পারমাণবিক বোতাম' বেশি বড়ো। এই সংঘাতের ফলে পেশিশক্তির প্রদর্শনী হিসেবে পরীক্ষামূলক হাইড্রোজেন ও ভ্যাকুয়াম বোমা ব্যবহার করা হয়। তাদের এই কর্মকাণ্ড বিশ্বকে কাঁপিয়ে দেয়, বিপুলসংখ্যক মানুষকে হত্যা করে এবং মহাসমুদ্রগুলো মনোরম উপকূলীয় শহরগুলোকে সম্পূর্ণ নিমজ্জিত করে ফেলে।

একমাত্র আশ্রয় ছিল পাহাড়ের চূড়া অথবা নৌকা, অথবা দীর্ঘ সময় পানির নিচে থাকার অভ্যাস করা। তারা কঠোর অনুশীলনের মধ্য দিয়ে গিয়েছিল যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম পূর্ববর্তীদের ভাগ্য থেকে রেহাই পায়। পাহাড়ের বাসিন্দারা টিলা এবং দূরবর্তী শৃঙ্গগুলো ডিঙিয়ে লাফিয়ে চলার প্রশিক্ষণ নিয়েছিল—ঠিক যেন সেই 'রাবার মানব'-এর মতো, যার আবির্ভাব ঘটেছিল ফিলিস্তিনি নামক এক জনগোষ্ঠীর মধ্যে যারা চরম বিপদের সম্মুখীন ছিল। এটি ছিল সেই সময় যখন তাদের দখলদাররা তাদের গ্রাম, শহর এবং পরিবারের সদস্যদের বিচ্ছিন্ন করার জন্য উঁচু দেয়াল তুলেছিল। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই ট্র্যাজেডি থেকেই একদল দেয়াল-আরোহী প্রজন্মের জন্ম হয়। তারা বৈদ্যুতিক ব্যারিকেড এবং কাঁটাতারের দেয়াল টপকে যেতে পারত এবং উঁচু গাছের মগডালে বসবাসের ক্ষমতা অর্জন করেছিল।

​তাদের নিপীড়করা মূলত অস্ত্র বিক্রি এবং বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে চাহিদামতো দেয়াল নির্মাণে ব্যস্ত ছিল। তাদের বেশিরভাগই দেয়ালের পেছনে বন্দি দরিদ্র মানুষের ওপর নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখতে চেয়েছিল। তারা জরাজীর্ণ রাস্তা, ভেঙে পড়া সেতু এবং বন্যার তোড়ে নড়বড়ে হয়ে যাওয়া বহুতল ভবনে লিখে রাখত: "আমাদের শান্তির কোনো সঙ্গী নেই"; "এই ভূমি এবং মহাকাশ কেবল আমাদের"; "আমরাই তোমাদের সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করি এবং তোমাদের সবার বিপরীতে আমরাই ঈশ্বরের মনোনীত জাতি হয়ে থাকব।"

​তারা সেই সব মানুষের মতো ছিল যারা এই ডিএনএ প্রমাণটি মেনে নেওয়া কঠিন মনে করত যে, যুগে যুগে সব জাতি একে অপরের সাথে মিশে গেছে। অন্যের চেয়ে শ্রেষ্ঠ কোনো 'বিশুদ্ধ জাতি'র ধারণা ছিল একটি ভ্রান্তি মাত্র। ধর্ম ও বিশ্বাসের বৈচিত্র্য সত্ত্বেও সব মানুষই এক। জাতি ও গায়ের রঙের বৈচিত্র্য হলো কেবল এক বাইরের আবরণ, অনেকটা আপেলের রঙের মতো।

​যাই হোক, এই বোতল এবং এর মধ্যকার অদ্ভুত চিঠিটি আমাকে পাগল করে দিচ্ছিল!

​'ভালোবাসা' শব্দটির নিচে রয়েছে লক্ষ লক্ষ গান, অভিব্যক্তি, তারাদের মতো নাচ এবং দূরবর্তী গ্যালাক্সির মতো অসংখ্য রহস্যময় প্রকাশ। আমি ভালোবাসার সারমর্ম বুঝতে চাই, কিন্তু যন্ত্রটি কেবল এমন তথ্য দেয় যা সুনির্দিষ্ট কিছুর দিকে নিয়ে যায় না। আমি বর্তমানে মানবজাতির ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য সমুদ্রবিজ্ঞানে বিশেষায়িত জ্ঞান অর্জন করছি। আমি পানিতে অ্যাসিড এবং বিকিরণের মাত্রা পরিমাপ করি, যার সাথে ভালোবাসার ভাষার কোনো সম্পর্ক নেই।

​চিঠির শব্দগুলো ছিল জটিল ও অস্পষ্ট। আমার সামনে বয়ে চলা ছবিগুলোর তাৎপর্য বোঝার চেষ্টা করতে আমি বাধ্য হলাম। আমি অভিধান এবং বিশ্বকোষের বাইরে ভালোবাসার অর্থ খুঁজছিলাম। এই অনুসন্ধান অন্তহীন মনে হচ্ছিল, যতক্ষণ না আমি আন্দালুসীয় কবি ইবনে হাজমের একটি আরবি পাণ্ডুলিপি পেলাম যার শিরোনাম 'দ্য রিং অফ দ্য ডোভ' (ঘুঘুর কণ্ঠহার)। এটি ভালোবাসার ওপর একটি গবেষণামূলক প্রবন্ধ যা ত্রিশটি অধ্যায়ে বিভক্ত; যার বারোটি অধ্যায় ভালোবাসার ইতিবাচক ও নেতিবাচক বৈশিষ্ট্যগুলোর জন্য নিবেদিত। এর ভূমিকাটি পড়েই আমার মাথা ঘুরে গেল:

"ঈশ্বর আপনার মঙ্গল করুন; ভালোবাসা শুরুতে একটি খেলা, কিন্তু শেষে তা অত্যন্ত গম্ভীর রূপ নেয়।"

আমার মতো একজন ব্যক্তি, যে প্রথমত গম্ভীর এবং খেলার মধ্যে পার্থক্যই জানে না, তার কাছে এর অর্থ কী হতে পারে?

​ভালোবাসাকে রহস্যময় মনে হয়: এটি ট্র্যাজেডি, বিপদ, ক্রোধ এবং একই সাথে এক অদ্ভুত ধরনের আনন্দ ও সুখের সাথে যুক্ত। এটি বিভ্রান্তিকর যখন এটি একজন ব্যক্তির ভাগ্যকে তার প্রিয়জনের হাতে তুলে দেয়। আমি বিভিন্ন ভাষার অনেক গান শুনেছি এবং অনেক কবিতা পড়েছি যা বৃথাই ভালোবাসাকে বর্ণনা করার চেষ্টা করে। তারা সেই কিংবদন্তি সত্তাকে ভাষায় প্রকাশ করতে ব্যর্থ হয়েছে, যার জিনের মানচিত্র কেউ তৈরি করতে পারে না।

​বিস্ময়কর বিষয় হলো, উৎসগুলো ভালোবাসাকে লেখালেখি, খাবার এবং নাচের অসীম বৈচিত্র্যের সাথে যুক্ত করে। যেমন ‘সোয়ে’(Sway) গানটিতে বলা হয়েছে: "যখন মারিম্বার ছন্দ বাজতে শুরু করে/ আমার সাথে নাচো, আমাকে দোলাও/ যেমন এক অলস সমুদ্র তটরেখাকে আলিঙ্গন করে / আমাকে নিবিড়ভাবে ধরো, আমাকে আরও দোলাও।" যে সমুদ্র অনায়াসেই মানুষকে গিলে ফেলে, সেটি কীভাবে প্রেমিকের সামনে শান্ত হয়ে তটরেখাকে আলিঙ্গন করতে পারে, তা বোঝা কঠিন। এর পানি কেবল ক্রোধে ফুঁসে উঠেছে এবং গ্রাস করেছে সেই সব অভিবাসীদের যারা আফ্রিকা, এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে উত্তরের দেশগুলোতে যাওয়ার পথে প্রাণ হারিয়েছিল।

​যেখানে বোতলটি পেয়েছিলাম, তার কাছেই একটি দূরবীন পেলাম। আমি আশা করেছিলাম আমাদের স্মার্ট যন্ত্রগুলো টেলিপ্যাথির মাধ্যমে আমাদের সেই ব্যক্তিদের সাথে যুক্ত করবে যারা এই জিনিসগুলো পাঠিয়েছিল এবং তাদের চোখের মাধ্যমে আমাদের পৃথিবীকে দেখার সুযোগ করে দেবে।

​চিঠিটি পাওয়ার পর আমি দূরবীনের গায়ের লেখাগুলো বিশ্লেষণ করতে শুরু করলাম এবং শেষ পর্যন্ত সেগুলোর মধ্যে সংযোগ খুঁজে পেলাম। ইস্পাতের নলের গায়ে আমি দুটি প্রতীক দেখতে পেলাম যা একটি হৃৎপিণ্ডের নকশার ভেতরে খোদাই করা ছিল। আমার যন্ত্রটি দেখাল যে, প্রতিটি প্রতীক সেই দুই অজ্ঞাত প্রেমিকের একজনের নাম নির্দেশ করছে।

​আমি সরে এসে টেলিভিশন পর্দায় একটি অদ্ভুত ঘটনা দেখতে লাগলাম: সংবাদ শিরোনাম, মধ্যপ্রাচ্য, বলকান, ইয়েমেন, সিরিয়া, ফিলিস্তিন এবং সব জায়গার যুদ্ধের দৃশ্য। এগুলোর কারণেই সেই মহাপ্লাবন ঘটেছিল। সৌভাগ্যবশত, কেউ কেউ সেই যুদ্ধ থেকে বেঁচে ফিরতে পেরেছিল যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে মানুষকে মানুষের বিরুদ্ধে এবং প্রকৃতির বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল।

​আমার কাছে সেই চীনা পাইন গাছের তেল ছিল না যা আমাকে ঘুমাতে সাহায্য করে; তা সত্ত্বেও, আমি গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলাম। পরদিন সকালে রেডিয়োতে সেই সংগীত শুনে আমার ঘুম ভাঙল যা আমি 'ভালোবাসা' শব্দটির সাথে মিলিয়ে সেট করে রেখেছিলাম। আমি ওয়াল্টজ, প্রাচ্যের নৃত্যসংগীত এবং স্প্যানিশ ফ্লামেনকো শুনতে পেলাম। পুরোনো পৃথিবীর সেই সরঞ্জামগুলোর মধ্য দিয়ে বিরতিহীন এক উৎসবের সুর বয়ে আসছিল।

​আমার মাথায় এক বুদ্ধি এল—পুরনো সেই দূরবীনের স্মৃতির সাথে আমার সরঞ্জামগুলো সংযুক্ত করার, কারণ পরমাণুগুলো ঘটনার স্মৃতি বহন করে। এটি দূরবীনের মালিক তার শেষ মুহূর্তে যা যা দেখেছিল তা প্রচার করতে শুরু করল। সে একটি লেকের ধারে শুয়ে ছিল এবং নীল সমুদ্রের ওপর দিয়ে সাদা পাখিদের উড়ে যাওয়া দেখছিল। আমার ধারণা ছিল না যে এমন রঙের অস্তিত্ব থাকতে পারে, কারণ বর্তমানের সমুদ্রগুলো অত্যন্ত দূষিত। আমি দেখলাম এক আসমানি সমুদ্র এবং সাদা আকাশ। কী চমৎকার সেই মেলবন্ধন!

লিয়ানা বাদর লোকটি ঘাসের ওপর শুয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিল এবং তার স্ত্রীর জন্য অপেক্ষা করছিল, যে 'ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক' নামক একটি ম্যাগাজিনের আলোকচিত্রী ছিল। সে প্রকৃতি এবং এর বিরল প্রজাতি রক্ষার একটি প্রকল্পে কাজ করছিল। স্বামীটি ছিল সম্পাদক, আর স্ত্রী সেই সব প্রাণীদের ছবি তুলছিল যারা শিকার, দূষণ এবং বরফ গলার কারণে বিলুপ্তির হুমকিতে ছিল। দম্পতিটি একটি ক্ষুধার্ত শ্বেতভাল্লুককে দেখেছিল যা ধুলো আর কালিতে ঢাকা ছিল; বরফ গলে আসা পানির প্রবল তোড়ে ভাল্লুকটির পক্ষে মাছ ধরা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। দম্পতিটি ডলফিন, কুমির, সিল মাছ, সুদৃশ্য পাখি, মেরু অঞ্চলের শিয়াল এবং নেকড়ে-কুকুরদের ভালোবাসত। দম্পতিটি সেই সব অঞ্চলের চরম দূষণ ও নোংরা দেখে ব্যথিত হতো যেগুলো একসময় দুর্গম ছিল কিন্তু এখন পর্যটক আর প্রমোদ-বিলাসীদের ভিড়ে ঠাসা। প্রকৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছিল বিলাসদ্রব্য ও বিনোদনের উৎস। এরই মধ্যে রেড ইন্ডিয়ানদের মতো দরিদ্র আদিবাসীদের দেয়াল এবং কাঁটাতারের পেছনে রাখা হয়েছিল যাতে সুখী পর্যটকদের চোখ থেকে তাদের আড়াল করা যায়।

​লোকটি মধু-রঙা সূর্যের রশ্মির নিচে শুয়ে ছিল এবং তার স্ত্রীর জন্য অপেক্ষা করছিল, যে উত্তর সাগরের ধারের সেই সবুজ পাহাড়টিতে পাখির ছবি তুলছিল। সে যখন এক চমৎকার স্বপ্নে বিভোর হয়ে চোখ বন্ধ করল, ঠিক তখনই পানির প্রথম প্লাবনটি আঘাত হানল।

​সে তার স্ত্রীর খোঁজে ছুটে গেল, পেছনে ফেলে গেল একটি ব্যাগ যাতে ছিল সেই দূরবীন এবং বোতলবন্দি তার শেষ প্রেমপত্রটি, যা সে পানিতে ভাসিয়ে দেওয়ার জন্য তৈরি রেখেছিল। সে এর আগে কোনো এক অজানা কারণে উনত্রিশটি বোতল পানিতে ভাসিয়েছিল; সম্ভবত তাদের ভালোবাসার এক উদ্‌যাপন হিসেবে।

​বিশাল ঢেউগুলো উঠে এল এবং পুরো পৃথিবীকে গ্রাস করে ফেলল—অথবা তার অন্তত সেটাই মনে হয়েছিল।

​আর এখন আমি কী করব যখন এই করুণ গল্প শুনে আমার গায়ের লোম খাড়া হয়ে যাচ্ছে? আমি কেবল সেই সব শব্দের অর্থ খুঁজে যেতে পারি যা আমি বুঝিনি এবং আগে কখনো ভাবিনি : মধু, গ্রীষ্ম, পুরুষ মৌমাছি, উষ্ণতা, বাদামি, লাইলাক ফুল, নলখাগড়া, লতা-মাধবীর মাচা, এক মুঠো মাটি, এক চিলতে বাতাস, প্যাপিরাস, ভ্যানিলা আইসক্রিম, আঙুর, মশলা, ক্যাসেট টেপ, নীল, বাঁশি, একটি শার্ট, একটি ঘোটকী, তুষার।

আমি সেই স্বপ্নদ্রষ্টা লোকটির ভাষা বুঝতে চাই, তার মতো হতে চাই এবং ওই শব্দগুলোর ব্যবহার বুঝতে চাই।

​আমি হয়তো কোনো গাছপালা বিশেষজ্ঞ তরুণের কাছে যেতে পারি যে এই শব্দগুলো বুঝতে পারবে অথবা কোনো অস্বাভাবিক জায়গায় ফুটে থাকা ফুলের প্রতি আমার এই আগ্রহের কারণ বুঝবে।

​আমি সূর্য বিশেষজ্ঞদেরও সাহায্য নিতে পারি, কারণ এখন আমরা সূর্যের আসন্ন বিলুপ্তির হুমকিতে আছি; আর মনোবিজ্ঞানীদের কাছেও যেতে পারি এটা নিশ্চিত হতে যে, তারা মানুষকে সুস্থ করার উপায় খুঁজে পেয়েছে কি না—সেই সব মানুষ যারা পৃথিবীর সবকিছু দখল করতে চায় এবং ধ্বংসস্তূপের ওপর বিজয়গাথা লেখে কারণ তারা মনে করে তারা অন্য সবার চেয়ে শ্রেষ্ঠ।

​আমি জানতে চাই এমন কেউ কি আছে যে আমাকে ভালোবাসার অর্থ বুঝিয়ে দিতে পারে?

​একদিন আমি অবশ্যই বুঝব সেই লোকটি শুয়ে শুয়ে তার স্ত্রীর জন্য অপেক্ষা করার সময় কী স্বপ্ন দেখছিল:

নীল, সাদা, আসমানি, ফিরোজা...

​ওই রংগুলোই হলো আমার স্বপ্ন দেখার অথবা হয়ত ভালোবাসার প্রথম পাঠ!

​আমাকে পারতেই হবে!

​এখানেই সেই যুবকের অসমাপ্ত স্বপ্নটি শেষ হলো যখন সে তার গল্পটি বলছিল। আমি তাকে এক পূর্ণাঙ্গ সত্তা হিসেবে দেখলাম, এমন এক জাগ্রত অবস্থায় যা আমি আগে কখনো এত স্পষ্টভাবে কল্পনা করিনি।

/জেড-এস/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
কট্টরপন্থী ইহুদিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থার নির্দেশ নেতানিয়াহুর
কট্টরপন্থী ইহুদিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থার নির্দেশ নেতানিয়াহুর
সংকোচে বিহ্বল নয়, আত্মবিশ্বাসে দৃপ্ত হোক নারী-কিশোরী 
সংকোচে বিহ্বল নয়, আত্মবিশ্বাসে দৃপ্ত হোক নারী-কিশোরী 
রামিসাকে ধর্ষণ-হত্যা: যুক্তিতর্ক শুনানি শুরু
রামিসাকে ধর্ষণ-হত্যা: যুক্তিতর্ক শুনানি শুরু
আর্জেন্টিনার সমর্থকদের জন্য সুখবর
আর্জেন্টিনার সমর্থকদের জন্য সুখবর
সর্বাধিক পঠিত
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম