‘তুমি যে আমার কবিতা
আমার বাঁশির রাগিণী
আমার স্বপন আধো জাগরণ
চিরদিন তোমারে চিনি
তুমি যে আমার কবিতা...’
নিজের ৮২তম জন্মদিন উদ্যাপন অনুষ্ঠানে আকলিমা খাতুন কম্পিত কণ্ঠে গানটির শেষ কলি গেয়ে ওঠা মাত্র উপস্থিত সবার হাততালিতে মুখরিত হয়ে ওঠে কক্ষটি। তরুণ দু-একটি কণ্ঠে শোনা যায় প্রশংসাবাণী— ‘বাহ দাদি, বাহ! দারুণ!’। সজোরে একটা সিটি বাজানোর শব্দও ভেসে আসে রুমের এক কোনা থেকে। মুরুব্বিদের ঝাড়িতে সে শব্দ ছড়িয়ে পড়বার আগেই মিইয়ে যায়। আবার মুরুব্বিদের মধ্যে থেকেই কে একজন যেন প্রশ্ন করে ওঠে— ‘মা, কাকে স্মরণ করে গাইছেন এ গান? নতুন কাউকে পছন্দ হয়েছে আপনার?’ রসিক এ প্রশ্নে ঘরজুড়ে আরও এক প্রস্থ হাসির হল্লা বয়ে যায়। আকলিমা খাতুনের ঠোঁটের কোনায় মৃদু হাসি ফোটে। সলজ্জ নয়, বরং ঠাট্টার। তিনি উপভোগ করছেন তাকে ঘিরে এত সব আয়োজন।
‘মা, বাবা বলছে তোমার নতুন কাউকে পছন্দ হয়ে গেলে তার কোনো আপত্তি নেই...’ ঘরে একটা যান্ত্রিক শব্দতরঙ্গ ছড়িয়ে পড়ে। ল্যাপটপের সাউন্ড বক্সে কানাডা থেকে সংযুক্ত আকলিমা খাতুনের সবচেয়ে বড় ছেলের কণ্ঠ ভেসে আসে। ফ্রন্ট স্ক্রিনে তার চেহারা দেখা যায়। ছেলের পেছনে আকলিমা খাতুনের স্বামীর হাস্যোজ্জ্বল মুখ। ‘কানাডায় বাবার অনেক সুন্দর সুন্দর নারীভক্ত জুটে গেছে। বাবা বিকেলবেলা পার্কে হাঁটতে বের হলেই তারা এসে বাবার সাথে গল্প জুড়ে দেয়।’
পুনরায় ঘরময় হাসির হল্লা ছড়িয়ে পড়ে। বাচ্চাদের মধ্যে কেউ কেউ বলে ওঠে— ‘কই কই! দাদাভাইকে দেখবো...’ তাদের অনুরোধে আকলিমা খাতুনের প্রৌঢ় স্বামীকে সোফা থেকে উঠে এসে ক্যামেরার সামনে হাজিরা দিতে হয়।
“বাবা কানাডায় বসে যা খুশি করুক, কিন্তু আমার মাকে আমি নতুন আর একটি বিবাহ করতে দেব না!” হঠাৎ আকলিমা খাতুনের কনিষ্ঠ কন্যা ইসমত আরা কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েন যুদ্ধাংদেহী ভঙ্গিতে। ‘...কারণ, আমার মাকে ছাড়া আমি থাকতে পারব না,’
উপস্থিত সবাই মুগ্ধ হয় ইসমত আরার আবেগে উচ্ছ্বাসে। সবার দৃষ্টিতে ঝরে পড়ে প্রশংসা। এই বয়সেও মেয়ে এতটা মা-পাগল! এর মধ্যেই খুব আবেগের সাথে ইসমত জড়িয়ে ধরেন তার মাকে। আর আকলিমা খাতুন তার মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকেন। আকলিমা খাতুন আর তার স্বামী দুজনেই কানাডার সিটিজেনশিপ কার্ডহোল্ডার। বছরে নির্দিষ্ট একটা সময় তাদের কানাডায় থাকা লাগে। তার স্বামী সে কোটা পূর্ণ করবার জন্যে বর্তমানে কানাডায়। আকলিমা খাতুনেরও এসময় স্বামীর সঙ্গে কানাডাতেই থাকার কথা। কিন্তু যাত্রার দিনকয় আগে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়ায় এবার আর একসঙ্গে কানাডা যাওয়া হয়নি। ফলে ছোট মেয়ে ইসমত আরার সংসারে তিনি আছেন আজ মাসখানেক। ইসমতের বাচ্চা ছেলে-মেয়ে দুটির যন্ত্রণা মিশ্রিত ভালোবাসায় স্নাত হয়ে তার সময় কাটছে বেশ। এরমধ্যেই তার ৮২তম জন্মদিন চলে এলো। পরিবার এবং বর্ধিত পরিবারের সদস্য, বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে এক ঘরোয়া আয়োজনে ইসমতের বাসায় মিলিত হয়েছে আজ সবাই।
***
"কী সুন্দর জীবন আকলিমা খালার, তাই না রে? মাশাআল্লাহ!"
রুমের কেন্দ্র থেকে একটু দূরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা কিছু সোফার একটিতে দুজন মহিলাকে দেখা যায়, ইসমত আরার সমবয়সি। তারা দুজনেই ইসমত আরার অতি ঘনিষ্ঠ বান্ধবী। প্রশ্নটি করেন মনোয়ারা বেগমকে—রওশন জাহান। মনোয়ারা বেগম উত্তর দেন না। হাসেন। আস্তে আস্তে চুমুক দেন কোকের গ্লাসে।
"ঘরভর্তি মানুষ, সবই আকলিমা খালার সন্তান, নাতিপুতি, নাতিপুতির ঘরের বাচ্চাকাচ্চারা। পড়াশোনা করেছেন মাত্র ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত। তাও বাংলা, ইংরেজি, উর্দু, হিন্দি, আর আরবি—পাঁচ পাঁচটা ভাষা জানেন। কত কত দেশ ঘুরেছেন...।"
মনোয়ারা বেগম একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা একজন বেয়ারাকে ডাকেন তার হাতে থাকা কোকের খালি গ্লাসটা নিয়ে যাওয়ার জন্যে। "কিছু দেবো এনে ম্যাডাম?" প্রশ্ন করে সে গ্লাসটা হাতে নিয়ে। "না, লাগলে আমি ডাকবো।" এরপর তিনি রওশন জাহানের দিকে তাকিয়ে বলেন— "হ্যাঁ, ঘুরবেনই তো। আমেরিকা, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া, এশিয়া—চারটা মহাদেশজুড়ে তার ছেলেমেয়েরা থাকে...।"
"আমরা যে কেন মানুষকে তার এডুকেশনাল কোয়ালিফিকেশন আর ক্যারিয়ার দিয়ে মাপার চেষ্টা করি! ভাগ্য একেকজনকে একেকভাবে ধনী বানায়। সবাইকে বড় ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার ব্যবসায়ী হতেই হবে, এমন কোনো কথা নেই।" যুক্ত করেন রওশন জাহান, "এই যে ঘরভর্তি করে আকলিমা খালার শুভানুধ্যায়ী আত্মীয়স্বজন, এই যে তার সন্তানেরা ছড়িয়ে আছে পৃথিবীর নানা প্রান্তে, সুখে আছে, আকলিমা খালাকে প্রতিনিয়ত স্মরণ করছে, ফোনে, মেসেঞ্জারে ভালোবাসা জানাচ্ছে, প্রতিটা পালাপার্বণে উপহার পাঠাচ্ছে—এসব কী হেলাফেলা করার মতো কোনো অর্জন? এদিকে এই যে আমি এত কষ্ট করে ঢাবি থেকে মাস্টার্সটা শেষ করলাম, তবু শ্বশুরবাড়ির প্রেশারে পড়ে আর কিছু করতে পারলাম না। এদিকে আমাদের ইসমত বিয়ে করলো ওর মা' মানে আমাদের আকলিমা খালার মতোই, ইন্টারমিডিয়েট পাস করে, হাবিবুল্লাহ বাহার থেকে খুব কষ্টে সংসার-সন্তান সামলে গ্র্যাজুয়েশনটা শেষ করলো। কিন্তু আমাদের জামাল ভাইয়ের ব্যবসায়ে বিয়ের পর এমনি বরকত লাগলো, ইসমতকে এখন বিরাট একটা সাম্রাজ্যের রানির মতোই লাগে। আমার পড়াশোনাটা কোনো কাজে লাগলো তবে বল?"
"ছেলেমেয়েকে আর পড়াশোনা করাস না তবে..."ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ধরে রেখে বলেন মনোয়ারা বেগম।
"কথা খুব একটা খারাপ বলিসনি," রওশন বলেন। "তুইও তো ডিগ্রি পাসের পর আর পড়লি না, এতে তোর কী ক্ষতিই বা হলো? তুইও তো বলতে গেলে আমাদের আকলিমা খালার মতই প্রায় হয়ে উঠেছিস। এই বয়সেই তিন মেয়েকে বিয়েশাদি দিয়ে তাদের দুটোকে দুই ভিন্ন মহাদেশে পাঠিয়ে দিয়ে দস্তুরমতো শাশুড়ি হয়ে বসেছিস। কিছু দিন পর তাদের সবার বাচ্চাকাচ্চা হবে। তোর সংসারও পৃথিবীজুড়ে ছড়িয়ে পড়বে।"
মনোয়ারা আবারও মৃদু হাসেন।
"আমার ছেলেমেয়ে দুটিকে তো কিছুতেই বিয়েতে রাজি করাতে পারছি না। রাজীব যে জার্মানি গেলো এ বছর পিএইচডি করতে, ওকে কত মেয়ের ছবি দেখাই নেটে, ইমেইলের পর ই-মেইল করি, ওর একটাও পছন্দ হয় না। কবে যে একটা হাফপ্যান্ট পরা জার্মান মেয়েকে বিয়ে করে আনে..."—চিন্তায় রওশনের ভ্রূ কুঁচকে যায়, "এদিকে মেয়েটা, মানে রওনক, ও তো ভার্সিটিতে কী সব শিখেছে নারীবাদ-টারিবাদ, মুখের ওপর সাফ বলে দেয়—চাকরি না জুটিয়ে কোনো বিয়েশাদি নয়। কোনো পুরুষের সংসারের ঘানি টানবার জন্যে নাকি ওর জন্ম হয়নি। তা বাবা হ তুই নারীবাদী, তাই বলে বিয়ে করবি না? বিয়ে মানেই ঘানি টানা? আর সংসার বলতেই কেবল পুরুষের সংসার? দুজনের নয়?" একটু বিরতি দিয়ে রওশন আবার বলে, "আহ, যদি তোর মতো কপাল আমার হতো! বাচ্চাকাচ্চা সব বিয়ে দিয়ে একদম নিশ্চিন্ত! আমারগুলো পড়াশোনা করে লায়েক হয়ে উঠছে বটে, তবে সেটা তো জীবনের একটা মাত্র দিক। প্র্যাক্টিক্যাল দিকগুলোও তো রপ্ত করতে হবে। ওই যে বলে না, গ্রন্থগত বিদ্যা আর পরহস্তে ধন, নাহি বিদ্যা নাহি ধন হলে প্রয়োজন...।"
"তোর ঢাবি থেকে মাস্টার্স শেষ করবার এই একটা সুফল তো চোখেই দেখতে পাচ্ছি।" মনোয়ারা বলেন, "সময়ে অসময়ে যে পরিমাণ বাগ্ধারা আর অলংকার তুই ব্যবহার করিস, সেটা আমরা পারি না...।"
"ধুর! রাখ তোর বাগ্ধারা!" রওশনকে আসলেই বিরক্ত লাগে।
"রওশন, এবার তোর পালা!" দূর থেকে ইসমতের গলা ভেসে আসে। সে কিছু বুঝে ওঠার আগেই রুমের ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা তাকে হাত ধরে টেনে উঠিয়ে রুমের মাঝখানে নিয়ে বসিয়ে দেয়, "খালা, এবার আপনার গান শোনাতে হবে..."
"গান, গান, গান" —চিৎকারে রুম আবার মুখরিত হয়ে ওঠে।
রওশনকে দেখে মনে হয় সে কিছুটা লজ্জা পেয়েছে এভাবে সবার মনোযোগের কেন্দ্রে চলে এসে। কিন্তু মনোয়ারা জানে, রওশন শীঘ্রই কাটিয়ে উঠবে এ লাজুকতা। ছেলেবেলা থেকেই তাদের এ বান্ধবী মানুষের মনোযোগ খুব পছন্দ করে।
গান চলতে থাকে। এই ফাঁকে মনোয়ারা তার মোবাইলের স্ক্রিন অন করে ফেসবুকে ঢোকেন। প্রথম পোস্টটাই চোখে পড়ে তার ছোট মেয়ের। সিলেটে বেড়াতে গিয়েছে দুজনে। বিয়ে হয়েছে মাসচারেক, কিন্তু ওদের হানিমুনে যাওয়া হয়ে ওঠেনি বরের চাকরির কাজের চাপে। এবার একটা ছুটি পেয়েই প্রথম সুযোগে ওরা সিলেটে চলে গেলো। কক্সবাজার যাওয়ার একটা আলোচনা চলছিল, কিন্তু দুজনেই আগে অসংখ্যবার ওখানে গিয়েছে। ফলে ওদের হানিমুনে সিলেটযাত্রা।
ছবিগুলো দেখে মন জুড়িয়ে যায় মনোয়ারা বেগমের। গ্র্যান্ড সুলতানে ডিনার, সাতরঙা চা, আগুনে পান খাওয়া, হযরত শাহজালালের মাজার জিয়ারত, টাঙ্গুয়ার হাওর, জাদুকাটা নদী, সুরমা নদী, হাছন রাজার বাড়ি, এক সপ্তাহ ছুটির পুরোটা উসুল করছে দুজনে মিলে। বিয়ের প্রথম প্রথম এ দিনগুলোই সবচেয়ে সুন্দর। তারপর দিন যত যায়, দায়িত্ব বাড়ে কেবল। ভালোবাসার জায়গাটাকে ক্রমশ প্রতিস্থাপন করে দায়িত্ববোধ, আর মায়া। সেটা অবশ্য শক্তির দিক থেকে ভালোবাসার চেয়েও অনেক প্রবল। ভালোবাসার টান মানুষ অহরহ এড়াচ্ছে। সম্পর্ক ভাঙছে এবং গড়ছে। কিন্তু ভেতরে ন্যূনতম বিবেকবোধ থাকলে মানুষ সাধারণত দায়িত্ববোধ এড়িয়ে যেতে পারে না।
একটু স্ক্রল করলে বড় মেয়েটার পোস্ট সামনে আসে। গত বছর ওর ছেলে হলো একটা। কী সুন্দর ফুটফুটে যে হয়েছে মাশাআল্লাহ! ওরই চার-পাঁচটা ছবি, শেষ ছবিতে মেয়ে- মেয়েজামাই, কোলে ছেলে। কী যে সুন্দর লাগে ওদের তিনজনকে একসঙ্গে! বড় মেয়ের বর মনাশ ইউনিভার্সিটির ইংরেজির লেকচারার। অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী। পারিবারিকভাবেই বিয়ে। ছোট মেয়েরটা পছন্দের বিয়ে।
পারিবারিক বিয়ে মেজো মেয়েরটাও। স্বামী, স্বামীর পরিবারের সঙ্গে আমেরিকা থাকে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, আজ প্রায় মাস ছয়েক যাবৎ ওর কোনো ছবি বা পোস্ট আসছে না ফেসবুকে। মেয়ে ছবি তোলেও না, শেয়ারও করে না। এই লম্বা সময়ে ফোনে কথাও হয়েছে মাত্র দুবার। আগে ভিডিয়ো চ্যাট হতো। পেছনের এই সময়টায় মেয়েকে ভিডিয়ো চ্যাটে রাজি করানো যায়নি। আগেও ভিডিয়ো কলে ও কিছু না কিছু একটা কাজ করতে করতেই কথা বলতো। একদম ফ্রি হয়ে কখনো কথা বলতো না। আর কলের সময় হতো সংক্ষিপ্ত। মিনিট পাঁচ-সাত। মনোয়ারা বেগমের তো আগ্রহের শেষ নেই। তিনি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে যতই এটা ওটা নিয়ে প্রশ্ন করেন, কন্যা তার সব প্রশ্নই এড়িয়ে যায়। একবার মেয়ের স্বামীকে ফোন করেছেন, সে ফোন রিসিভ করেনি। কোনো সমস্যা হলো কিনা সেটাও তিনি জানতে পারছেন না। এই মেজো মেয়ের চিন্তাই তাকে কুরে কুরে খাচ্ছে ক্রমাগত।
রুম গমগমিয়ে উঠেছে এরই মধ্যে রওশনের গানের তালে তালে হাততালিতে। রওশন গাইছে— "আমি রূপনগরের রাজকন্যা, রূপের জাদু এনেছি..." রুমের ছেলেবুড়ো সবাই দারুণ উপভোগ করছে ওর এ গান। এ আর নতুন কী। সেই কলেজ জীবনেই, যখন তারা তিনজন একসঙ্গে সিদ্ধেশ্বরী গার্লস কলেজে পড়তো, কলেজের ফাংশনের সময় রওশনের গান থাকতো একদম শো স্টপারের ভূমিকায়, সবার শেষে। কলেজের দেয়াল দিয়ে ছেলেরা উঁকিঝুঁকি মারতো আর শিস বাজাতো ওর গানের তালে তালে। এর মধ্যেই হঠাৎ ফোন বেজে উঠলো মনোয়ারার। আনিস, মনোয়ারার স্বামীর ফোন। বাসায় একা আছে। রাতের খাবার মনোয়ারা রেঁধে বেড়ে রেখে এসেছে। ওর খাওয়ার সময় তো এখনো হয়নি।
"মনু, বাসায় এসো জলদি। আমাদের রান্নাঘরের বেসিনের পাইপ আবার নষ্ট হয়েছে বোধহয়। খেয়ে প্লেট ধুতে গিয়েছিলাম। দেখলাম পানি পাস হচ্ছে না। পুরোটা রান্নাঘর ভেসে যাচ্ছে পানিতে। আমি কিছুটা মুছেছি। আর পারছি না...।"
আনিসকে অপেক্ষা করতে বলে মনোয়ারা হাতের ইশারায় ইসমতকে ডাকলো। “বলিস কী! তুই খেয়ে যাবি না?” মনোয়ারার চলে যাওয়ার প্রস্তাবে ইসমত একদম আকাশ থেকে পড়লো। অবশ্য বিস্তারিত ঘটনা শুনে ইসমত ত্বরিত একটা টিফিন ক্যারিয়ারে ভরে খাবার নিয়ে এসে ধরিয়ে দিলো মনোয়ারার হাতে।
“আনিস ভাইকে বলিস, আমি রাগ করেছি। নিজে দাওয়াত রক্ষা করেন না। বৌকেও থাকতে দেন না, এটা তো ঠিক না।”
আকলিমা বেগম এর মধ্যে খেয়াল করলেন মনোয়ারার প্রস্থানের উদ্যোগ। তিনি হাত ইশারা করে ডাকলেন মনোয়ারাকে। "খালা, এত খুশি হয়েছি আজ আপনার জন্মদিনে এসে! একদম ছোটোবেলার মতো লাগছে। আপনার মেয়ের চেয়ে আমরা তো আরও বেশি মজা করতাম সবসময় আপনার জন্মদিনে। আজও তাই করলাম।” মনোয়ারা হাসিমুখে আকলিমা বেগমের হাতের ওপর হাত রাখে। “আপনি শরীরের যত্ন নেবেন। অন্তত একশত বছর বয়স হবার আগে আপনার বুড়ো হওয়া চলবে না...।"
আকলিমা বেগমও হাসিমুখে মনোয়ারার গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলেন, "তোর পাজি জামাইটাকে বলিস, ও না আসায় অনেক রাগ করেছি আমি, আর অনেক করে বকে দিয়েছি...।"
***
জামাল মঞ্জিল থেকে বেরিয়ে এসে বিল্ডিংয়ের সামনে থেকেই রিকশা নেন মনোয়ারা।
রিকশার চাকা ঘুরতে আরম্ভ করে মালিবাগ চৌধুরীপাড়া থেকে খিলগাঁও পুলিশ ফাঁড়ির দিকে। ঘড়ির কাঁটা পৌনে দশটা ছুঁই ছুঁই। রাত হয়েছে ভালোই, যদিও এখনো রাস্তা গমগম করছে ছেলেমেয়েদের ভিড়ে। মনোয়ারা রিকশার হুডের ফাঁক গলে দুদিকে তাকান। শীতের রাত। সবার গায়ে শীতের বাহারি জামাকাপড়। রাস্তার সাইডে ফুটপাতে খাবারের দোকান বসেছে অনেক। একজোড়া ছেলে আর মেয়েকে দেখা গেল একটা চাদরে শরীর জড়িয়ে বসে আছে। ছেলেটার হাতে সিগারেট, মেয়েটার হাতে চায়ের কাপ। যতক্ষণ তাদের দেখা যায়, মনোয়ারা ততক্ষণ তাদের দিকে তাকিয়ে রইলেন। দৃশ্যটা তার আপাতদৃষ্টিতে খারাপ লাগে না। কিন্তু যতদিন তার মেয়েদের তিনি বিয়ে করাননি, সেই সময়টাতে এরকম কোনো দৃশ্য, এমনকি কোনো ছেলে আর মেয়ে রাস্তায় একসাথে হেঁটে যাচ্ছে— এমনটা দেখলেও তার বুক কেঁপে উঠতো। হাঁটতে থাকা জুটির একজন তার মেয়েদের কেউ কিনা— এটা নিশ্চিত হবার জন্যে আড়চোখে তাকাতেন বারবার। তার দুশ্চিন্তার মূলে ছিল মেয়েদের নিরাপত্তা। দুর্নাম রটে যাওয়ার ভয়। আজ থেকে পাঁচ বছর আগেও এই মহল্লাবাসীরা একটা ছেলে আর একটা মেয়ের সম্পর্ককে যে দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখতো, এখন ঠিক ওভাবে খুঁটিয়ে বিচার করে না। সবার জীবনের গতি যেন হুট করেই অনেক বেড়ে গেছে। কারো জীবনের দিকে কারো তাকিয়ে বসে থাকার সময় নেই। মেয়েদের বিয়েশাদির দুশ্চিন্তা মাথা থেকে নেমে যাওয়ার পর, একটা ছেলে আর একটা মেয়েকে একসঙ্গে রাস্তায় দেখলে মনোয়ারা বেগমের এখন বরং ভালোই লাগে। তার মনে হয়, যারা ছেলেমেয়েদের একসাথে ঘুরে বেড়ানো নিয়ে পাড়া-প্রতিবেশীদের মাঝে দুর্নাম রটায়, তাদের প্রত্যেকেরই তরুণ বয়সে আকাঙ্ক্ষা ছিল এমন একটা সম্পর্কের। খোলা আকাশের নিচে নিজের পছন্দের মানুষের হাতে হাত রেখে ঘুরে বেড়ানোর। সেই অপারগতার, স্বপ্নপূরণ না হওয়ার আক্রোশ থেকেই যেন এই বয়সে এসে তারা তাদের সমস্ত ক্ষোভ উগরে দেয় এসব তরুণ-তরুণীদের প্রতি।
তালতলা মার্কেটের বাইরের রাস্তায় কাচের চুড়ি, টিপ, কানের দুল, নাকফুল, গলার মালাসহ মেয়েদের বারোয়ারি অলংকারের সাঁঝি নিয়ে রাস্তায় বসে আছে ভাসমান ব্যবসায়ীরা। দুদিন পর পর এদের পুলিশ এসে উঠিয়ে দেয়, আবার দুদিন পর কিছু একটা আপোশরফা করে তারা জায়গা দখল করে বসে। ডানদিকে গিয়ে গোটাকয় মোড় ঘুরলেই খিলগাঁও পুলিশ ফাঁড়ি, মনোয়ারা আর তার স্বামীর নিবাস— তিনকন্যা কুটির।
মনোয়ারা বেগমের বুক থেকে একটা মিহি দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। পুরোটা জীবন তার এই এক এলাকাতেই কেটে গেলো। জন্ম এই এলাকায়। বড় হয়েছেন এখানে। বিয়েও ঠিক হলো খিলগাঁওয়ের এক পরিবারেই। বাড়ির মুরুব্বিরা মিলেই সব ঠিক করলেন। তার মতামত দেবার মতো কিছু ছিল না। নিজের প্রবাসী কন্যাদ্বয়ের কথা ভাবলে মনোয়ারা বেগমের ভালো লাগে। তিনি পৃথিবী দেখেননি। তার মেয়েরা দেখছে। বিয়ের সূত্র ধরেই যদিও। মনোয়ারার মনে প্রশ্ন জাগে- ছেলেদের পৃথিবী ঘুরে দেখতে বিয়ে করা লাগে না। তারা পড়তে যায়, চাকরি করতে যায়, ব্যবসার কাজে যায়- আজকে সিঙ্গাপুর, কাল ইংল্যান্ড, পরশু আমেরিকা। মেয়েদের এ সুযোগ হয় না কেন? না কি হয়? হয় তো বোধহয়। তাদের তিনকন্যা কুটিরের তৃতীয় তলার বাসিন্দার নতুন বিয়ে করিয়ে আনা ছেলের বৌটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। সে নাকি আরও পড়াশোনা করতে ইংল্যান্ড যাচ্ছে সামনে। স্পাউসের ভিসা মেলেনি বলে প্রথম বছর স্বামীকে ছাড়াই থাকতে হবে। সে যাই হোক, যাচ্ছে তো মেয়েরা একা একা বাইরে। মনোয়ারার বুকে এক চিনচিনে ব্যথা কাজ করে, তার বেলায় এরকম হলো না কেন? তার কন্যাদের কেন তিনি আরও একটু পড়াতে পারলেন না? বিয়ের বদলে তারা না হয় পড়াশোনা করতেই বাইরে যেতো।
রিকশা এসে থামলো তিনকন্যা কুটিরের সামনে। মনোয়ারা বেগম ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে তাকালেন একবার বাড়ির নেমপ্লেটের দিকে। বাড়ির মালিকের তিনটি মেয়ে আছে। সে বিবেচনাতেই বাড়ির এহেন নামকরণ। তাছাড়া কন্যাসন্তান নেই- এমন কাউকে তিনি বাড়িভাড়া দেনও না। অদ্ভুত নিয়ম।
লিফট তাকে তুলে আনলো বাড়ির সপ্তম তালায়। এখানেই ছাদ। ছাদ সংলগ্ন দুই কামরার একটি ফ্ল্যাটে তারা স্বামী স্ত্রী দুজনে মিলে থাকেন। এর চেয়ে বড় ফ্ল্যাটের তাদের প্রয়োজন নেই। ছাদের ওপরের ফ্ল্যাট বলে গরমকালে গরম একটু বেশি লাগে। এছাড়া আর কোনো ঝামেলা নেই। ভাড়াও বেশ সাশ্রয়ী।
বেল দিতে গিয়েও কী মনে করে বেল বাজান না মনোয়ারা। দুবার দরজায় ঠকঠকিয়ে কড়া নাড়েন। ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ আসে না। তিনি চাবি বের করে গেটের লক খুলে ভেতরে ঢুকে পড়েন।
ফ্ল্যাটে কেবল ড্রয়িং-ডাইনিং রুমে বাতি জ্বলছে। বাকি সব ঘরের বাতি নেভানো। শোয়ার রুমে উঁকি মেরে দেখেন আনিস ঘুমিয়ে পড়েছে। রান্নাঘরের ভেতরের মেঝে পানি জমে থৈ থৈ, রান্নাঘর ছাড়িয়ে বাইরেও কিছুটা গড়িয়ে এসেছে সে পানি। এত রাতে আর এসব ঘাঁটাঘাঁটি করতে ইচ্ছে করে না মনোয়ারার। সকালে বুয়াকে দিয়ে মোছানো যাবে। বাড়িওয়ালাকেও ঘুম থেকে উঠেই জানাতে হবে রান্নাঘরের পাইপ দিয়ে পানি পাস না হওয়ার এই সমস্যার কথা।
এখন তার ঘুমাতে যাওয়ার কথা। বেডরুমে গিয়ে জামা কাপড় বদলে ফ্রেশ হয়ে শুয়ে পড়বেন আনিসের পাশে। তবু কি মনে করে মনোয়ারা পায়ে পায়ে এসে হাজির হন বেডরুমের পাশের কামরায়। তার তিন মেয়ের ছোট থেকে বড় হয়ে ওঠার ছোট ছোট অসংখ্য স্মৃতি এই রুমে সাজিয়ে রাখা। মেয়েরা সব একে একে বিয়ে করে চলে যাবার পর এই স্মৃতিচিহ্নগুলোই তার বেঁচে থাকার রসদ একরকম। প্রতিবার বাড়ি বদলানোর সময় এই জিনিসপত্রগুলোই তিনি সবচেয়ে যত্ন সহকারে প্যাক করেন, যাতে কোনো ক্ষতি না হয়।
তিন মেয়ের একদম ছোটোবেলার জামাকাপড় এখনও নিজের কাছে রেখে দিয়েছেন তিনি। প্রায় বছর ত্রিশেক আগের এসব পোশাকে যেন এখনও দুধের গন্ধ লেগে আছে। তাদের নানা বয়সের অনেকগুলো ছবি ঘরের দেয়ালে ঝোলানো। আরও আছে তিন বোনের স্কুলের রিপোর্ট কার্ড। নানা বয়সে নানা প্রতিযোগিতায় জেতা বিভিন্ন মেডেল আর ট্রফি। তিন বোনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি গাছাড়া, ড্যামকেয়ার স্বভাবের ছিল বড়জন। সবচেয়ে সুন্দরী আর বুদ্ধিমতী ছোট মেয়েটা। আর মেজো মেয়েটা ছিল সবচেয়ে বেশি মেধাবী, এবং মনোয়ারা বেগমের সর্বাধিক নেওটা। তার এই মেয়েটাই দাম্পত্য জীবনে কিছু একটা সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এখন। মনোয়ারা দেয়ালে টানানো ছবিতে ওর হাসিমাখা মুখের দিকে তাকিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকেন কিছুক্ষণ।
মেয়েদের কলেজে পড়বার সময়কার ব্যাগগুলো ঝুলে আছে দরজার পেছনের হ্যাঙ্গারে। টেবিলের ওপর ওদের ছেলেবেলার একটা খেলনার সেট। গৃহস্থালি জিনিসপত্রের মিনিয়েচার ভার্সন, যা দিয়ে ওরা রান্নাবাটি খেলতো প্রতিদিন। ছোট মেয়েটা খুব কান্নাকাটি করবার পর একটা বারবি ডল কিনে দেওয়া হয়েছিল ওকে। ওয়েস্টার্ন ড্রেস বদলে পুতুলের মাপেরই একটা শাড়ি ব্লাউজ সেলাই করে পরিয়ে রেখেছে বারবিকে। এখন অবশ্য তার সব কন্যারাই কমবেশি ওয়েস্টার্ন পোশাকেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। মনোয়ারা বারবি পুতুলটিকে হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করেন। তার মনে প্রশ্ন আসে, সর্বদা রান্নাবাটি খেলায় অভ্যস্ত তার কন্যাত্রয়ের পক্ষে বিয়ে করে স্বামী-সংসার নিয়ে থিতু হওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প ভবিষ্যৎ কল্পনা করা কি আদৌ সম্ভব ছিল?
মনোয়ারার মনে পড়ে রওশনের সঙ্গে তার আজ রাতের কথোপকথন। মনে পড়ে, আকলিমা খালার সঙ্গে তার নিজের তুলনা, এবং সেই সূত্র ধরে মনোয়ারাকে এক সফল রমণী হিসেবে উপস্থাপনের প্রচেষ্টা। সত্যি বলতে, মনোয়ারা নিজেও ঠিকঠাক সংসারের দায়ভার সামলে, তিন তিনটি মেয়েকে পাত্রস্থ করে সংসার জীবনের গণ্ডির ভেতরেই জীবনটা কাটিয়ে দিয়েছেন। তার সাংসারিক সফলতা তিনি তার আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে নিয়ে উদ্যাপন করেন মাঝেসাঝে। কিন্তু তিনি জানেন, তার এসব উদ্যাপনের মাঝে একটা শুভঙ্করের ফাঁকি আছে।
তার স্বামীকে রোমান্টিক, অথবা নিদেনপক্ষে একটু প্রফুল্ল চেহারায় তিনি শেষ কবে দেখেছেন, তার মনে পড়ে না। ভদ্রলোক কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। চাকরির মেয়াদ শেষ হবার আগেই অবসরে গেছেন। আজীবন সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে চাকরি করবার ফলে চাকরিক্ষেত্রে শত্রু বানিয়েছেন প্রচুর। নিজে অসৎ উপায়ে কিছুই উপার্জন করেননি। সহকর্মীদের মধ্যে যারা সে চেষ্টা করেছে, তাদের জন্যে তিনি কাজটা কঠিন করে দিয়েছেন। একটা আপাদমস্তক দুর্নীতিগ্রস্ত সিস্টেমে এভাবে টিকে থাকা যায় না। সহকর্মীরা নানা মিথ্যা অপবাদ-অভিযোগ তৈরি করে তার স্বামীকে বারবার কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়ে বাধ্য করেছে চাকরি থেকে বয়সের আগেই অবসর নিতে। চাকরির মধ্যে কখনোই অসততা অবলম্বন না করা আনিস বৈবাহিক জীবনে খুব ঘটা করে মনোয়ারা, বা তাদের কন্যাদের কোনো শখ আহ্লাদ পূরণ করতে পারেননি। আবার একটা গোটা সিস্টেমের বিপরীতে চলতে গিয়ে যথোপযুক্ত সম্মান নিয়ে কর্মজীবন সমাপ্ত করতে পারেননি। এসব কষ্টই তার স্বামীকে এই পড়ন্ত বয়সে এসে কুরে কুরে খাচ্ছে। মেয়েগুলো যেন একটু ভালো থাকে, এই উদ্দেশ্যেই বেছে বেছে পাত্রস্থ করেছিলেন সবকটাকে। কিন্তু মেজো মেয়েটার নীরবতা তার আর তার স্বামীর মনের শান্তি একদম গিলে ফেলেছে। এই হচ্ছে মনোয়ারা বেগমের প্রকৃত বাস্তবতা, যার মধ্যে তিনি বসবাস করেন। একেই রওশন একটু আগে এক সফল সার্থক জীবনের প্রতিচ্ছবি হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছিল। মনোয়ারার ঠোঁটের কোণে একটা দুষ্পাঠ্য হাসি ফুটে ওঠে।
ঠিক এমন সময় মনোয়ারার ফোন বেজে ওঠে। মনোয়ারার ভ্রু কুঁচকে যায়। এত রাতে কে ফোন করলো তাকে? বিদেশে থাকা মেয়েদের কেউ? কোনো বিপদ হলো কি? দ্রুত ফোন হাতে তুলে নিয়ে দেখেন, স্ক্রিনে রওশনের নাম। রওশনই বা এত রাতে আবার কেন?
"হ্যালো" মনোয়ারা ফোন ধরেন।
ওপাশ থেকে কোনো কথা শোনা যায় না। কেবল কান্নার আওয়াজ ভেসে আসে। মনোয়ারার বুকের একপাশে চিনচিনে ব্যথা শুরু হয়। দুশ্চিন্তা মিশ্রিত কণ্ঠে বলে চলেন— "হ্যালো, হ্যালো রওশন! কী হয়েছে তোর? কোথায় তুই এখন? কাঁদছিস কেন?"
"আকলিমা খালা...", রওশন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কথা বলার চেষ্টা করেন "আকলিমা খালা আর নেই রে মনু...এই মাত্র তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন ...।"
"বলিস কি!" বিস্ময়ে মনোয়ারার মুখ দিয়ে কথা বেরোতে চায় না, "কখন ঘটলো এ ঘটনা? আমি তো বাড়ি এসে পৌঁছলাম মাত্র!"
"তুই বের হবার পরপরই খালা অচেতন হয়ে পড়লেন,” কান্না চেপে রওনকের কথা বলতে কষ্ট হয়, “অতিথিদের মধ্যে একজন ডাক্তার উপস্থিত ছিলেন, তিনিই এনশিওর করলেন যে খালা আর নেই। সম্ভবত ম্যাসিভ কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট,"
মনোয়ারা ভাবছিলেন এখনি আবার রওনা দেবে কিনা আকলিমা খালার বাসার উদ্দেশ্যে। তখনি রওশন বলে ওঠেন, "তুই এখনি আবার বের হয়ে পড়িস না মনু। খালাকে আগামীকাল সকাল দশটায় গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হবে দাফনের জন্যে। সকাল সাড়ে আটটায় জানাজা। তুই বরং সকালে এসে খালাকে একবার শেষ দেখা দেখে যাস। ইসমত তো ভেঙে পড়েছে একদম। একটা আনন্দের উপলক্ষ্যে কী যে হলো ব্যাপারটা..."। রওশন ফোঁপাতে ফোঁপাতে ফোনটা কেটে দেন।
মনোয়ারা পুতুলটা কোল থেকে নামিয়ে রেখে উঠে গিয়ে জানালার পাশে দাঁড়ান। জানালার উল্টো পাশের দালানে বেশ কিছু ফ্ল্যাট পুরো অন্ধকার। সারা দিন দৌড়ে বেড়ানোর পর খুব ধীরে ঘুমের কোলে ঢলে পড়ছে ক্রমশ এ শহরের মানুষেরা। মনোয়ারার দৃষ্টি অন্ধকার আকাশে নিবদ্ধ হয়।
আকলিমা খালা চলে গেলেন তাদের সবাইকে ছেড়ে?
বলতে গেলে আকলিমা খালার চোখের সামনেই তারা সবাই বেড়ে উঠেছেন। মনোয়ারা বেগমের বান্ধবীদের সবার মা- বাবা একে একে পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে চলে গেলেও শুধু আকলিমা খালাই রয়ে গিয়েছিলেন বয়স্ক বটবৃক্ষের মতো। আজ তিনিও চোখ বুজলেন।
মনোয়ারা কিছুক্ষণ ধরে চেষ্টা করেন আকলিমা খালাকে হারানোর ফলে সৃষ্ট তার শোক পরিমাপের। কিছুক্ষণ পর অবাক হয়ে লক্ষ্য করলেন, তার অতটা খারাপ লাগছে না। বরং তার ভালো লাগছে খালার জন্য।
যাচিত-অযাচিত অসংখ্য মানুষের আনাগোনা, খোঁচা, মুখের ওপর অপমান, আড় বাঁধিয়ে ঝগড়া করা, হয়রানি, শারীরিক -মানসিক আঘাত, স্বামী ও সন্তানের কাছ থেকেও কখনো গঞ্জনা সহ্য করা, কখনো কখনো জীবনের ওপরই পুরোপুরি আশা হারিয়ে ফেলা, তবু ডুবে না গিয়ে ভেসে থাকা কোনোক্রমে, এটাও তো আকলিমা খালার দীর্ঘ- দীর্ঘদিনের গৃহবধূ জীবনের সারাংশ। মানুষের চোখে কেবল স্বামী সন্তান নিয়ে তৈরি বিস্তৃত পরিবারটাই সফলতা হিসেবে ধরা পড়ে, মোমবাতির নিচে জমা হওয়া অন্ধকারের মতো আকলিমা খালাদের এই আঁধারঘেরা গল্পগুলো তাদের জানা নেই। জানলেও কেউ এ নিয়ে আলাপ করতে চায় না, ভুক্তভোগী নিজেও মুখ খুলতে চায় না। যে জীবন আকলিমা খালা কাটিয়ে গেলেন তাতে টিকে থাকতে হলে ঝানু অভিনেত্রী হতে হয়। আজীবন হাসিমুখে সুখী সংসার কর্ত্রীর অভিনয়ের নিরবচ্ছিন্ন চাপ থেকে আজ খালা মুক্তি পেয়েছেন। মনোয়ারা মনে মনে অভিনন্দন জানান খালাকে, তার জন্মদিনের দিন, সমস্ত আত্মীয়স্বজন পরিবেষ্টিত অবস্থায় তার ক্লান্তিকর অভিনেত্রী জীবনের সমাপ্তি ঘোষণা করে অসীমের পানে যাত্রা করার জন্য।
মনোয়ারা আর্দ্র চোখে তাকিয়ে থাকেন খিলগাঁওয়ের কুয়াশার চাদরে মোড়া রাতের ঘোলাটে আকাশের দিকে।
দীর্ঘ অভিনয়ের ক্লান্তি তিলে তিলে তাকেও গ্রাস করে নিয়েছে।
তার চোখও অপেক্ষায় আছে দীর্ঘ এক ঘুমের।









