এক
মুরগির পাইকারের মুঠিতে ধরা চাকুর তীক্ষ্ণ ডগাটা বিদ্যুতের আলোতে ঝিকমিকিয়ে ওঠে। চারপাশ থেকে সাপটে ধরা অন্ধকারে এই ধাতব ঝিলিকটুকু খেপের আশায় বসে থাকা চানুর অস্তিত্বে ঘা মারে। রাতের ঝিমঝাম নীরবতা তছনছ হয় মুরগি-খাসির পাইকারদের ঝগড়া-মারামারিতে ত্যক্ত-বিরক্ত চানুর ভেতরটা বিকৃত-বিষবাষ্পে খেকিয়ে ওঠে; সে সিটে বসেই ঘোরগ্রস্তের মতো বিড়বিড় করে, ‘দ্যা, দ্যা, হালার পুতের কৈলজার ভিত্তে ভইরা দ্যা।’ তার নিজের অজান্তেই একটা নিষ্ঠুর হিংস্রতা ভাসা ভাসা চোখের মণি দুটোতে চকচক করে আর ঠোঁট দুটো পরস্পর শক্ত হয়ে এঁটে বসে, দাঁত কিড়মিড় করে। অন্যদিকে স্টলের একশ’ ওয়াট বাল্বের লাল আলোর মধ্যে কুরুক্ষেত্রের নট-নটীর মতো পাইকারদের চিৎকার, দাঁতের কিড়িমিড়ি, হিসহিসানি আর তীক্ষ্ণ চাকুর ঝলকে চানুর সবটুকু চেতনা একবিন্দুতে মিলিত হয়ে যেন নীরবে বিস্ফোরিত হয়।
দূরের জেলা শহরের মোকাম-ফেরত মুরগি-খাসির পাইকারদের নিজ নিজ স্বার্থের হীন ঘূর্ণিতে, অভাব আর একাকিত্বের বিকারে ভরা চানুর উৎকট আকাঙ্ক্ষা দীপ্ত হতে চায়, পাইকারদের চোখে ঝলসে ওঠা হিংস্র-কপট ক্রোধের পরিণামে সে আশা করে; হঠাৎ আকাশচেরা একটা চিৎকার, ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে আসা রক্তের গরম স্রোত। মাথামোটা, গরম মগজের মানুষদের রক্তারক্তি-কাণ্ডের একটুখানি রস, কঠোর শ্রম আর সাহসের জোরে সে চিরকাল সংগ্রহ করছে, করতে ভালোবাসে।
গ্রাম্যতায় গলা পর্যন্ত ডুবে থাকা এই শহরের কোথাও অন্ধকার গভীর, কোথাও ম্যাড়মেড়ে চেরাগের জংধরা আলোর মতো পড়ছে-উঠছে, যেন বা হাঁটুর মালাইচাকি খুন্তির ঘা খেয়ে উঠে গেছে। সে চোখ বুজে থাকতে চায়; চানুর চোখ বুঝি আলোর ঝলকানি সইতে নারাজ! পচা-গলা-রক্তাক্ত নাড়িভুঁড়ি থেকে উঠে আসা তাল তাল অন্ধকারেই বুঝি সে স্বচ্ছন্দ, যে অন্ধকারে চোখের মণি ডুবিয়ে বসে থাকা যায়! চানুর কাছে এই বসে থাকাটাই একমাত্র সত্যি। পৃথিবীতে যেন সে-ই এক পুরুষ যে রক্ত ও পচা মাংসের কারবারি। এই ঝঞ্ঝাটের পৃথিবীতে কেবল সে-ই টিকে আছে অপঘাতে মৃতদের গতর টেনে। তার সমস্ত শুভাশুভ-বোধ উধাও; হৃদয়ের সকল সুকুমার বৃত্তি বিকিয়ে এখন সে তাজা রক্তের গন্ধে বাঁচা না-বাঁচার ফারাক করছে।
মুরগির পাইকারটি ততক্ষণে চাকুটা কোমরের পট্টির ফাঁকে লুকিয়ে ফেলেছে। চৌরাস্তার একমাত্র চা-খানাটা আগের মতোই অর্থহীন হা-মুখ এবং মাঝরাতের ট্রেনে মোকাম-ফেরতা খাটাশে পাইকারদের বিড়ির ধোঁয়ার ভেতর ফের ডুবে গেলে চানু মুখ ফিরিয়ে নেয়। এতক্ষণের উত্তেজনা অলৌকিক কারিশমায় উবে গিয়ে তার বুক চিরে বেরিয়ে আসে দীর্ঘশ্বাস। সে হাঁটা দেয় রিকশাস্ট্যান্ডের দিকে। গাংপাড়ের রিকশাস্ট্যান্ডটি এখন নিঝুমপুরী। আর রাতের আকাশ-ছোঁয়া ঠান্ডা পরশ, নির্জন পথের হা হা ঔদাস্য একটু একটু করে নিভিয়ে দেয় চানুর চোখের মণিকে, আর ভাসিয়ে নেয় এক আজগুবি ভাবালুতায়।
দুই
নদীর দিক থেকে তেড়ে আসা বাতাসে বালু, শীত, মূতের ঝাঁজালো গন্ধ, শুকনো পাতা আর কাগজ-পলিথিন হড়হড় করে এগিয়ে আসে, যেন পাগলা মিছিল। এই তো গেল পরশু শহরের দুই মাথায় দু’দলে মিটিং ডেকেছিল; পান-বিড়ি, ডালপুরি-শিঙাড়া আর মূতের মতো পাতলা-বিস্বাদ চায়ের মুচ্ছব হলো, আর কিছু গোমুখ্যু গোঁয়ার লিডার, পাতি লিডারের গলাবাজির পর দুটো মিছিল শহরের দুই দিক থেকে এসে পাক খেল এই চৌমাথায়। মিছিল তো নয়, যেন দুটো জঙ্গি জাহাজের পালে-মাস্তুলে গুঁতাগুঁতি। চানু তখন গামছা কোমরে বেঁধে তার রিকশার সিটে বসা। তার বাঁ হাতের দুটো আঙুল
চিকন মোচের গোছা ধরে এই টানছে তো এই মুচড়াচ্ছে আর বিড়বিড় করে একা একা কথা বলছে, ‘আউজক্যা যুদিন গুল্লি না ফুটছে তয় আমার নামে কুত্তা চুদাইছ।’
মানুষগুলো উজ্জ্বল আলোর চিকচিকে বন্যায় চিৎকার করে করে তাদের আক্রোশকে আগেই খানিকটা জুড়িয়ে নিয়েছিল। ধুলো আর পুলিশের পোশাকের বাতর না টপকেই তারা ফিরে গেছে, যেন মায়ের কোল আর বউয়ের আঁচলের জন্য তারা কতই না কাতর! চানুর হাতের আঙুল দুটো যেন ঠোঁটের ওপর থেকে মোচের গোছা উপরে আনবে, এতটাই তাকদে সে নিজের মোচ মোচড়ায়, তার নিশ্বাসে উল্কার আগুন— ‘হালা মাউড়ার দল, এইগুলানরে বুঝি রাজনীতি কয়, ঢাকার শ’র অইলে বিষ্টির লাহান পাত্থর পড়ত, দৌড়, উলটা দৌড় অইত, গুলি ফুটত, লাশ পড়ত, আগুনে-আমোদে, চিৎকার-চুদনে হালার কী বেউয্যা খেইল অইত!’ রাগে চানুর কপালের শিরা ধপধপায়। সে ভাবে, ‘গেরামের উজবুক হালারা জাও খাইয়া পাতি নেতাগর দশ-কুড়ি ট্যাহা পকেটে লইয়া বিশ্ব-প্রেমিক এরশাদরে গদি থেকে নামাইতে মিছিলে আইছে, পরানখান খালি ট্যাও ট্যাও করে, তাকত পাইব কৈথ্যে, মোড়ল বাড়ির দামড়া, পুটকিত নাই চামড়া।’ চানুর খুব হাসি পায়, সে যদি ছবিলার মতো খৈ খৈ করে একচোট হাসতে পারত! সে হাত দুটো পলকেই দুদিকে ছড়িয়ে দিয়ে ফের প্রচণ্ড বেগে এক করে, যেন সে কতই না খুশি! হাত-তালির শব্দটা চারপাশের বাতাসে ঢেউ তুলে মিলিয়ে যায়, কিন্তু শব্দের শিহরন ও গুনগুনানি চানুকে জানান দিল যে যারা রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে গেছে, সেইসব আদমির লাশ বেশ দামি। যেকোনো মামুলি মুর্দার চে’ ওসব মর্গের চালানে ৩-৪ গুণ মজুরি মিলতে পারে।
রাত একটার উত্তরবঙ্গ মেইলের বেল বেজে গেল। পোয়া মাইল দূরের ঘণ্টাধ্বনি দরদালান আর টিনের চালের ফাঁক-ফোক্কর গলিয়ে চানুর জীয়নকাঠি নাড়িয়ে যায়। হুডতোলা রিকশার চাকা খানাখন্দ, ইটের কুচি মাড়িয়ে এগোয়। একটা দূরের ট্রিপ, হাতেগোনা নগদ কয়টা টাকা...চানুর চোখে সাদা ভাতের ছবি হাসে। ঝাঁপ-ফেলা দোকানগুলোর ছায়ায় থিকথিকে অন্ধকারের সাথে ধুলো-মাটি এবং ড্রেনের পচা গন্ধ মিলেমিশে চানুর নাকে ঝাপট মারে। তার চিন্তা হয়, মনে প্রশ্ন জাগে; মাটি আর গলিজের পচা গন্ধ কি কখনো এক সূত্রে মিলে যায়? অমীমাংসিত চিন্তাটা সে একখণ্ড হলুদ সুতার মতো মাথায় বহন করে স্টেশনে আসে এবং এটা নিয়ে কোনো ফয়সালায় পৌঁছার আগেই ট্রেনের হুইসেল শোনে।
একঝাঁক বিষণ্ন বাতাস, ধুলোর ঝাপট আর পাদের গন্ধের মতো একটা ঢেকুর দিয়ে ট্রেনটা প্লাটফর্মে ঢোকে। গুড়ের চাকায় মাছির ভনভনানির মতো মানুষেরা কিছুক্ষণ বকবকায়। বগলে বোঁচকা, মলিন পোশাকের ঢ্যাঙা গতর দুলিয়ে যাত্রীরা একে একে নেমে আসে, টুকটাক কথার মাঝে মাথা নুইয়ে হাঁটে। রাত জেগে যারা দোকানের ঝাঁপ তুলে বসে আছে, তারা বন্যার আলাপ করে। পাছায় কামড় মারা মাশা মারে। কয়েক টাকার পান-বিড়ি বেচে আগামী দিনে ভালো বেচা-কেনার আশায় নিজেরাই নিজেদের মনকে সান্ত্বনা দেয়। বন্যা-উত্তর আকালের বাজারে কেনা-বেচা খুব মন্দা। দোকানিরা আজকাল গপ্পো করে— অভাবের টানে গ্রাম থেকে কেমন করে বেরিয়ে এসেছে ঝি-বেটিরা; কত সস্তায় তাজা-আঁটো গতরের মাল মিলছে, তাদের গতর বেচা কামাইয়ের ওপর দালালরা কতটা কমিশন নিচ্ছে ইত্যাদি। কিংবা ওই যে প্ল্যাটফর্ম, যেখানে ৮-১০টি জিরাতি সংসার এসে জুটেছে, এসব ছিন্নমূলরাও আলাপের বিষয় হয়ে ওঠে। এদের ভরসা বলতে তো ভিক্ষের ঝুলি; গতর বলতেও সেরকম আর কিছু অবশিষ্ট নাই যে ১০-২০ টাকায় কুলি-কামিনদের কাছে বেচে দেবে। ওরা সারা দিন ভিক্ষা করে, সন্ধ্যায় ইটের চুলায় কাগজ জ্বালিয়ে ধোঁয়ার দাপটে চোখ-নাকের জলে মুছতে মুছতে ভাত রাঁধে, চটের বিছানায় শুয়ে লাল টিনের শেড দেখে, দূরের বাতাসের শনশনানি খেয়াল করে, গভীর রাতে কুকুরের ডাকে ঘুমঘোরে কুঁকরে ওঠে, আর এই ধড়ে প্রাণ থাকতে নিজের ভিটায় ফিরে যাবার মতো সুদিন আসবে কিনা, সে আশা-নিরাশায় ডুকরে ওঠে।
স্টেশনের সামনে চানুর মাথার ওপর আদ্দিকালের শিমুলগাছ। পাতাহীন ডালের হাবিজাবির ভেতর নিজের হাড় ফাটানো লাল ফুলের শোভা-সৌরভে শিমুল নিজেই আত্মহারা। নিচে ফালি ফালি শেকড়ের জটা-ঝোপে মূতের পেচপেচা কাদা থেকে উঠে আসা দম আটকানো গন্ধে সে অটল, সহ্যের সকল স্তর পেরিয়েও নির্বিকার! সারা দেশ ভাসিয়ে নেওয়া বন্যায় সবই কি ভেসে গেল? এই যে স্তব্ধ রাত, মন ভার করে দেওয়া নিঃসঙ্গতা, গতরের কোনাকানায় কামড়ে-থাকা কষ্ট, অথবা ওই যে ট্রেন-থেকে-নামা ঘরমুখো মানুষ, পাষাণভার পা দুটো টেনেটেনে ঘরের দিকে চলছে, তারা সবাই মিলে কি চানুর বুকটা খুঁচিয়ে জাগাবে? চানু তো লতাপাতাহীন একটা শরীরসর্বস্ব মানুষ! সংসারে তার নিজের উপস্থিতি নিজেকেই বিরক্ত করে, টিটকারি দেয়, বিদ্রুপের ফলা মগজের কোঠাকাঠা ছিঁড়ে ফেলতে চায়।
স্টেশন রোডের দুই পাশের চা-খানা, হোটেলগুলোর চুলা খালি করা ছাইয়ে শিমুলতলা থেকে একটু দূরে জেগে উঠেছে একটা স্তূপ। কেমন একটা বিদ্ঘুটে গন্ধ ওই দিক থেকেই ভেসে আসে। গন্ধটা নাক দিয়ে ঢোকে চানুর খালি পেটে কয়টা পাক দিয়ে আঁত-নাড়ি নিয়ে উগড়ে আসতে চায়। সেই স্তূপটা ঘিরে জমে উঠেছে শহরের বেওয়ারিশ কুকুরদের আস্তানা। ওরা শরীর থেকে মশা, এঁটোলি তাড়াতে নিজেদের গতর কামড়ে-খামচে ছেলাবেলা করে। গতরের জ্বলুনি ভুলতে তারা মাটিতে গড়াগড়ি দেয়, চিত হয়ে চার পা আকাশের দিকে ছুড়ে কেও-কেওয়ায়, মাটিতে পাক খেয়ে ফের লাফিয়ে দাঁড়ায়; খামোখাই একটা আরেকটার লেজ কামড়ে দিলে অন্যটিও তাই করে—পলকে সে-ও সঙ্গীর কান কামড়ে মাটিতে গড়িয়ে পড়ে। কুকুরগুলোর মধ্যে একজন আবার মাটিতে নাক ছুঁয়ে কান খাড়া করে কিছু অনুমানের চেষ্টা করে, অনুমানটা সন্দেহে দানা বাঁধতেই সে ঘা ঘা করে তীর বেগে ছুট দ্যায়। তার সঙ্গীরাও বসে থাকে না। মুহূর্তে গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়ায়, সামনের দিকে মুখ উঁচিয়ে কলজে কাঁপানো চিৎকার দেয় আর মনের দোনামোনা ভাবটা ঝেড়ে ফেলে সবাই আগের জনের সহচর হতে জানবাজ দৌড় লাগায়। একজন আরেকজনের পায়ে পা মিলিয়ে নিমেষেই উধাও হয়ে যায়।
চানু শুনতে পেল, দূর থেকে ভেসে আসছে ঘেউ ঘেউ হিংস্র গর্জন, গড়গড় রাগি চিৎকার, কাইকুই রোদন। এমন তো নয় যে এই শহরে শুধু কুকুরের চরাট, তবু এত কুকুর! গব কিছুকে টেক্কা দেওয়া কুকুরদের এই উল্লাস-কাজিয়া এমন গভীর নিশিতে চানুর পেটের নাড়ি-ভুঁড়িতে যেন কম্পন জাগায়, মোচড় তোলে। প্রাণকাঁপানো প্রত্যেকটা চিৎকারে চানুকে তাক লাগিয়ে কুকুরগুলো জানান দিচ্ছে তাদের টিকে-থাকার আজিব বার্তা। এমন করে তাদের টিকে থাকা তাকে ভাবায়, আর ভাবতে গিয়ে শরীর রি রি করে। এখন গলিটার মালিকানা নিয়ে বেওয়ারিশ কুকুরদের এই দলটি হয়ত অন্য আরেকটা দলের সাথে মরণপণ যুদ্ধে নেমেছে। এরই মধ্যে দলের কেউ কেউ হয়ত তাদের কান, নাক, পিঠ আর ঘাড়ের ছাল হারিয়ে চাপ চাপ রক্তের গন্ধে দাঁত খিঁচিয়ে গর্জাচ্ছে; দেহের ক্লান্তি ও অনাহারের দুর্বলতা ঝেঁটিয়ে, মনের দোনামোনা ভাবটা খেদিয়ে নিশ্চিত প্রত্যেকে তাদের নিজ নিজ সামর্থ্যরে ষোলো আনা খাটাচ্ছে বিপক্ষ দলটাকে হটিয়ে দিতে।
এই গভীর রাতেও এত হিংস্রতা, আক্রোশের মত্ততা, উল্লাসের হুল্লোড় চানুকে আচাভুয়ার মতো খেপিয়ে দেয়। তার অসহনীয় নিঃসঙ্গতা, পাথরের চাঁইয়ের মতো ভারী কষ্টকে ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিতে এই মুহূর্তে যেন তার কাছে মাল-ই সিদ্ধ। সারমেয়কুলের পৈশাচিক কীর্তনে তার গলনালি বাংলা মালের উগ্রতা পেতে তুরতুরাচ্ছে। কিন্তু এখন সেটা তো স্বপ্ন! মালের স্বাদ-গন্ধ কেবলই স্মৃতি। চারপাশের মানুষের বসে যাওয়া চোখ-মুখ, খা খা রোদের লকলকে
জিভ, বাতাসে আগুনের ঝাপট, ধুলোর ওড়াউড়ি আর যাত্রীহীন রিকশা নিয়ে তার ফে ফে ঘোরাঘুরির মধ্যে মালের আশা স্বপ্ন ছাড়া আর কী?
সামনের জামগাছটা ঘিরে জমাট অন্ধকার। একটা বাজে গন্ধ জনমানবহীন ডাকবাংলোর বারান্দা টপকে অলক্ষ্মীর মতো তাকে প্যাঁচিয়ে ধরতে চাইছে। চানুর পায়ের নিচে শুকনো মাটি, আর খরায় পোড়া মরা ঘাসগুলো এই শেষ বসন্তেও পুরোনো শেকড়ে তাদের আত্মাকে লুকিয়ে রেখেছে! আর একটু আগে গ্যারেজে ফেলে আসা রিকশার ধাতব অস্তিত্ব এখনো যেন চানুকে গায়ে-গতরে ছাড়তে চাইছে না। সে একটু দোনামোনা ভাব নিয়ে ডাকবাংলোর বারান্দায় গিয়ে বসে। সমস্ত শরীর উপচানো যে দীর্ঘশ্বাস নিজের অজান্তে এতক্ষণ আটকে ছিল, এই ফাঁকে সেটা তেড়িয়া হয়ে বেরিয়ে পড়ে।
ভাঙাচুরা-পরিত্যক্ত ডাকবাংলোটা ব্রিটিশদের সাক্ষী। চওড়া আর উঁচু বারান্দা এখনো তেলের মতো পালিশ! ব্রহ্মপুত্র নদীর পাড়ে, গাছ-বৃক্ষ, লতাপাতার ঝোপ...এই শহরের বুকের কাছে কালো তিলের মতো অন্ধকারে ডুবে থাকে সারা বছর। তাই রাতটা এখন চানুর কাঁধের ওপর পূর্ণ সওয়ার। পুরোনো কালের গাছ-বৃক্ষের ফাঁকফোক দিয়ে বসন্তের শেষ পূর্ণিমার আলো আর আকাশ...যেন ঈদগাহের ইমাম সাহেবের মতো শুভ্র দাড়ি-পাগড়ি-কালামের মহিমা নিয়ে তার কানে মন জুড়ানো দীর্ঘ বয়ান জুড়ে দিয়েছে। আলাপের ভাব-ভাষায় ইন্দ্রিয় বেদখল হয়ে যায়!
রেণু রেণু সুগন্ধ-বাতাসে চানুর নশ্বর শরীরটা যেন ভাসতে থাকে এবং তা স্রেফ এক তিল সময়ের জন্য আর তার পরেই যেন সে একটা মিষ্টি-দুধেল জমিনের মাঝে আটকে যায়; সেই সাথে একটা গভীর ঘুমের তাল তাল আস্তরণের মাঝে তার দেহটা দুলতে দুলতে ভেসে ওঠে। আর তার মনে হতে থাকে সে যেন দুর্যোগে জখমি একটা কাফেলার ভেতর দিয়ে ছুটছে, দাঙ্গাবাজ শত্রু দ্বারা সর্বস্বান্ত সেই কাফেলাটা থেকে ছিটকে আসছে বিচিত্র সব আর্তনাদ! অবসাদ, তৃষ্ণায় মৃত-প্রায় জীবগুলো যেন তাদের বুকের হাহাকার প্রকাশের জন্য গড়র...গড় শব্দ ছাড়া অন্য কোনো ভাষা পাচ্ছে না। অসহ্য কষ্টে একজন তো বিজাতীয় পশুর মতো ঘা ঘা করে বারবার চেঁচিয়ে উঠছে।
চানু আজগুবি এক আতঙ্কে ঘুম থেকে ধড়ফড়িয়ে ওঠে। চোখ বুজেও চানু স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে, ডাকবাংলোর চারপাশ থেকে ভেসে আসছে ঘেউ-ঘেউয়ানি আর কু-ইঙ্গিতে ভরা জঘন্য সব শব্দ! আলোর ঝলকের মতো মুহূর্তে চানুর মনে ভেসে ওঠে স্টেশন রোডের জংবাজ কুকুরগুলোর লড়াইয়ের কথা আর সাথে সাথে এই কথাও তার মনে নিশ্চিতভাবে উদয় হয়ে যে ওই কুরুক্ষেত্রে হেরে যাওয়া দলটাই এই নির্জন-পতিত বাংলোর আনাচে-কানাচে এসে ঠাঁই নিয়েছে! ফালিফালি কান, ছেঁড়া নাক, পিঠ-পাঁজরের খাবলা খাবলা মাংস তারা নিশ্চয় রেখে এসেছে স্টেশন রোডের যুদ্ধবাজ কুকুরগুলোর নখে, দাঁতে।
কিছুক্ষণ পর চানু নিজেকে আবিষ্কার করে বারান্দার নিচে, হাতের মুঠিতে প্রমাণসাইজ ইটের টুকরো নিয়ে সে তৈরি ওই হারামির মাথাটা গুঁড়ো করে দিতে; আর হলোও তাই-চোখের ধপধপে তেজে, হাতের টানটান পেশি, মনের রোষ-ঘেন্নার তোড়ে ইটটা পান্ডাটার মাথার খুলি খুঁজে না পেলেও ঠিকই ঘাড়টা আঘাত করেছে। ঘা ঘা চিৎকারে শান্ত রাতটা চৌচির হয় আর সেই সাথে বাকিগুগুলো দেয় পড়িমরি দৌড়। আর কী কুদরত, ডাকবাংলোর চারপাশে জেঁকে-বসা বাজে গন্ধটাও সাথে সাথে উধাও!
‘কুত্তার বাচ্চারা’—এই কথা বলে চানু হাতের ধুলো ঝেড়ে ফের বারান্দায় বসার উদ্যোগ নিতেই রাস্তার পাশ থেকে একটা হাসির লহর ভেসে আসে। একটা মেয়েলি সুর, একঝাঁক কোমল অনুভূতি চানুর নিঃসঙ্গ জীবনের খাঁ খাঁ ভাবটাকে ছেঁকে ধরে। গুহার ঘুঁটঘুঁটে অন্ধকারে বসে-থাকা কোনো আদিম মানুষের মতো যে অন্তহীন নাই নাই আক্ষেপ স্নায়ুর আগপাশ খাবলে ধরে চানুকে ডুবিয়ে দিয়েছিল শ্বাসরোধী কষ্টের ভেতর কিংবা ঘন ঘন বুকচেরা দীর্ঘশ্বাসের বাতিকে, এখন হাসির ওই ঝরনাটি তার ছিটানো
জল-হাওয়ায়, কলকল প্রাণোচ্ছ্বাসে বুঝি চানুর মাঝে ফিরিয়ে আনবে থৈ থৈ জোয়ার।
নির্জন-পতিত ডাকবাংলোর বারান্দার জমাট অন্ধকারে বসে চানু দেখছে; পিচ রাস্তা থেকে এই দিকে এগিয়ে আসা একটা ছায়া আর এক-মানুষ উচ্চতার ঘন অন্ধকারের কায়া। অজানা কেউ দেখলে মুহূর্তে তার গরম-মগজ কল্পনায় অনেক কিছুই দেখে নিতে পারবে, কিন্তু ছবিলা আর তার ঘনকালো ছায়া সম্পর্কে সচেতন চানু অন্য দিনের মতো আজও ফের শুধু অবাক হয়। ভালো লাগে।
‘আসলেই তো হেরা কুত্তার বাচ্চা’—এই কথা বলতে বলতে ছবিলা চানুর পাশে বসে। তারা পথের মানুষ। সেই ভাব-ভাষাতে টুকটাক কথা শুরু হয়। ছবিলার মুখের পান-জর্দার গন্ধটা চানুকে জড়িয়ে ধরে। চানু ‘বুঝলে’ বলে কথা বলা শুরু করে-কুকুরগুলোর লড়াই, রক্তাক্ত হয়ে একটা দলের পিছিয়ে আসা, এই ডাকবাংলোর নির্জনতায় পড়ে আহত সারমেয়কুলের কাতরানো, তাদের সেই আর্ত-আহাজারিকে খোয়াবের মাঝে চানুর যুদ্ধফেরত জখমি সৈন্যদল মনে করা, আর ওই বাজে গন্ধের সাথে পান্ডাটার ঘা ঘা...তার নিজের ঘুম ভেঙে যাওয়া, আর এই কুকুরগুলো কেন বারবার পরাজিত হয়। কেন বারবার এত বেশি মার খায়? চানুর রাগ এখানেই। এই কারণেই সে লাল রঙের সর্দারটার ঘাড়ে ইট মেরেছিল—ইত্যাদি সব ছেড়ে ছেড়ে, ছোট ছোট দম ফেলে ছবিলার কাছে বর্ণনা করে। যদিও এই সময়ে তার নিজের ক্ষুধার্ত নাড়িভুঁড়ির ভেতর থেকে মুচড়ে-ওঠা একটা অদ্ভুত শব্দ গলার কাছে এসে বারবার আটকে যাচ্ছিল, সেই সাথে অসাড় শূন্যতাবোধটাও মগজে ফের ঝেঁকে বসতে চাইছে, যেমনটা খোরাকি-কষ্টের দিনগুলোতে বরাবর হয়ে থাকে। কিন্তু এখন সে ওসব হতচ্ছাড়া আপদকে একেবারেই আমলে ঘেঁষতে দিল না। ছবিলার শরীরের যে নিজস্ব গন্ধ চানুর মনকে সকল উটকো আপদ হতে ঘুরিয়ে আমোদের ভেতর ডুবিয়ে রাখে কিংবা ঠেসে ধরে উল্লাসের ঝাঁক ঝাঁক চেতানো ফুলকি, নারীর নিজের সেই গন্ধই তো চানুকে শিখিয়েছে—মানুষের ভুখ-তৃষ্ণার সাথে আমোদ-ফুর্তির একটা সরল-সহি যোগ-বিয়োগ চিরকাল ছিল, আজও আছে।
বন্যার পর গ্রামে গ্রামে নীরব দুর্ভিক্ষ চলছে। শহর-নগরের পথে পথে মিছিল-গুলি, পুলিশের গাড়ি উঠিয়ে দিয়েছে মিছিলের ওপর। আটজন নিহত! সারাটা দেশ এই নিয়ে জ্বলে উঠেছে।
খাইছ?—ছবিলার এই প্রশ্নে বারান্দার বাতাস নাড়া খায়, অন্ধকার কেঁপে ওঠে, আর চানুর নাড়িভুঁড়ি এতটাই মোচড়ায় যে সে উল্লুকের মতো লেপটে বসে চেষ্টা করে অসহিষ্ণু আঁত-নাড়িকে স্থির রাখতে। কিন্তু সে বারবার ব্যর্থ হয় আর তার চোখের সামনে নাচনজুড়ে রাতের সব জোনাকপোকারা।
হ,—চানুর ছোট্ট-গম্ভীর উত্তরের ক্ষীণ কম্পনটুকু যেন ছবিলার একটা গভীর শ্বাস শুষে নিয়ে ততোধিক বড়ো নিশ্বাসে নীরবতা ভেঙে যায়; অজস্র কথার খই না ফুটিয়েও তারা পরস্পরের শ্বাস-প্রশ্বাস সমঝে নিতে নিতে বুঝে ফেলছে তাদের জীবন-পথের বাঁক-মোচড়, কষ্ট-কামনা, সত্য-মিথ্যার নেকাবে ছলনার পাশা খেলা। ছবিলা উঠে দাঁড়ায়। বারান্দার নিথর বাতাস উত্তোলিত শরীরের আঘাতে দুলে ওঠে। ‘আমি অহন যাই’—ছবিলার এই কথাটার সাথে তার নিজের গায়ের গন্ধটাও বাতাসে খানিক আলোড়িত হয়ে চানুর মগজে ঘা দেয়। চানু মাথা তোলে, আলো-আঁধারির মাখামাখিতে নারীর অবয়ব খোঁজে, তার পাশে দাঁড়ানো ছবিলার নাকছাবিটা কালো একটা বিন্দুর মতো দেখায়।
চানু হাতের মুঠি ঢিলে করতেই ছবিলার হাতটা খসে যায়, যেমন করে গহিন জলের অতলে ডুবে যায় ঢিল, নরম উষ্ণতা আর দিলজোড়া ভাবটা নিমেষে সরে গিয়ে তার বুকজুড়ে নেমে আসে নাই নাই আক্ষেপ; সবাই চলে যায়, সব কিছু বদলে যায়, প্রতি মুহূর্তে উল্কার মতো ছুটে চলা এই সংসারের পথে যারা আসে, তারাও হারিয়ে যায়। চানুর বুকটা বেহুদাই মোচড়ায় আর লম্বা লম্বা শ্বাস ওঠে; তার ইচ্ছা জাগে ওই সামনের মোড়ে গিয়ে চিৎকার দিয়ে জিজ্ঞেস করতে, ‘অ মানু, কই যাও, কী তোমার বাসনা?’
দক্ষিণের দমকা হাওয়া শূন্য বারান্দায় মোচড় খেয়ে কঁকিয়ে ওঠে। চানুর মনে পড়ে যায় বুড়ো চাচার কথা। ওই বুড়োর হাতেই তার মর্গের চালানের হাতেখড়ি। মাকে হারিয়ে অথবা মা তাকে রাস্তায় ফেলে পালিয়ে গেলে সে রেলস্টেশনে বসে কাঁদছিল। জঙ্গলময় চুল-দাড়ি-গোঁফ আর কোটরে বসে যাওয়া চকচকে একজোড়া চোখের আলো জ্বালিয়ে শীতের সেই রাতে লিকলিকে বুড়োটা এসে চানুর মাথায় একটা হাত রাখে। তারপরের দশ বছর ভুতুড়ে এই ডাকবাংলোর বারান্দায় বুড়োর সাথে। ধীরে ধীরে বুড়োটা যেন তার মা-বাপ-ওস্তাদ সব, সব হয়ে ওঠে।
এই শূন্য বারান্দায় ব্রহ্মপুত্রের চর থেকে ধেয়ে আসা বাতাসের হুঁ হুঁ পাক খাওয়া চানুর কাছে বড়ো তীব্রভাবে জীবন্ত করে তোলে বুড়োকে। ওই তো ওই কোনার দিকে, যেখানে বুড়ো বিশ বছর কাটিয়েছে, সেই খালি জায়গাটায় এসে ছোট ছোট ঘূর্ণি হয়ে বাতাস পুবের দিকে বেরিয়ে যায়। এই বুঝি বুড়ো কেশে উঠল, গেয়ে উঠল; বেঁচে থাকতে সে হামেশা যা যা করত, সেই আচারগুলো এই অসাড় সময়ে একে একে চানুর মনে হানা দেয়।
চানু জিভ দিয়ে বারবার শুকনো ঠোঁট চাটে, যেন সে-ও বুড়োর মতো গোরে বসে মাটি ও বাতাস চেখে কবরের স্বাদ নিচ্ছে। এত দিন যাদের মর্গের চালান বলে বাড়িতে স্বজনদের কাছে পৌঁছে দিয়েছে, যাদের আপনজনেরা হায় হায় করে মাটিতে আছড়ে পড়েছে, তারা সবাই তো এখন কবরের তাল তাল অন্ধকারে জমে গেছে। এইসব কথা মনে উদয় হলে চানুর জিন্দা লহুর মধ্যে যেন কবর ঢুকে যায় আর তখন তামাম দুনিয়ার জমিনজুড়ে জেগে ওঠে সারি সারি লাশ!
বুড়োটা সব টের পেত। গাছ থেকে ঝরে পড়া শুকনো পাতা এমনভাবে হাতে তুলে নিত কিংবা চেয়ে দেখত যেন ‘মৌতা’। এই মুহূর্তে দুনিয়াদারির সকল হিসাব চুকিয়ে ঢুকে পড়তে যাচ্ছে পরলোকে। বৃষ্টির ধারা আর উড়ো বাতাসে মৃতদের সংলাপ মিশে থাকার কথা বুড়ো এমনভাবে বলত যে একিন না করে উপায় নাই। বর্ষার আদিম-উন্মত্ত রাতগুলোতে বুড়ো ও চানু যখন এই জঙ্গলময় ডাকবাংলোর বারান্দায় বিচ্ছিন্ন কোনো দ্বীপবাসীর মতো বসে আর টিনের চালের ঝমঝম শব্দ, চিকুর হানা বজ্রের দীর্ঘ ঝিলকানি, বুড়োর চোখের উদাস দৃষ্টি কিংবা থুতনির কাঠিন্যকে úষ্ট করে দিত, তখন চানুর দিব্যি মনে হতো: সে ও বুড়ো মিলে যতই লাশ টানুক, হোটেলে বসে খাবার খাক, শুয়ে শুয়ে আকাশ আর লাশের স্বপ্ন দেখুক, জামার নিচে বুকের ধুঁকপুকানি শুনুক, আসলে তারাও মৃতদের মিছিল থেকে ছিটকে পড়া এক রকম লাশ, কেবল চালানের অপেক্ষায় ঝিমোচ্ছে।
তিন
একটা নরম, মিষ্টি পরশ গভীর ঘুমের মধ্যে চানুর গরম কপাল শুষে নিচ্ছে, না তার কপালের চাড়া থেকে চুঁইয়ে পড়ছে সেই স্নেহভেজা হাতটায় এ দ্বন্দ্বের ঘোর যেন কাটতে চায় না। চানুর ঘুমঘোর অনুভূতি অপেক্ষা করে এইমাত্র পাশে বসে যে নারী তার কপালে হাত রাখল, তার স্ব-উদ্যোগের জন্য। প্রতিদিনের খণ্ড খণ্ড অপেক্ষার প্রহরগুলো তাকে শিখিয়েছে—অচেনা পথ আর চিতেন মানুষ আপনা থেকেই মিশে যায় নিজের দায়ে। কপালে যে হাত রেখেছে, তার হাতের চুড়ি বারবার চানুর নাকের ডগায় এসে ঘষা মারে। আর পলকে পলকে সেই শরীর ঢেলে দিচ্ছে চুন-খয়ের-জর্দার মিলিত একটা ঘ্রাণ, সে আপাত-আত্মিক সুবাস যেন চানুকে তার আত্মপরিচয়ের নিবিড় বৃত্তে বেঁধে ফেলতে বড়োই উতলা।
চানু শিথানের মানুষটার মুখ খোঁজে। আলো-অন্ধকারের মিশেলে যে কান্তি তার চোখের সামনে অধীর উৎসাহে দুলছে, আশা ও বিশ্বাসের ঝিলিক নিয়ে মমতা-বুভুক্ষু হৃদয় আবেগে কাঁপছে, চিরকাল মানুষ একেই বুঝি নারী বলে জানে! সে সুষমা এরকম আলো-আঁধারেই ভালো খেলে, যেখানে একজন নারীর মধ্যে পৃথিবীর সকল নারীকে আন্দাজ করা সহজ! কিন্তু চানুর মা...পাঁচ বছরের চানুকে একলা এই বারান্দায় ফেলে পালিয়েছিল, তার সেই জন্মধাত্রী মায়ের মুখ সে যতবার স্মরণে আনতে চেষ্টা করেছে, ততবারই তার চোখে ভেসে উঠেছে ঘুঁটঘুঁটে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকা এক হতচ্ছাড়া নারীর ঘোলাটে চোখের ছলছলানি। বাপ-মা ছাড়া পাঁচ বছরের চানু এই ডাকবাংলোর বারান্দায় কত দিন শীতের মাঝরাতে একটু বাড়তি ওম আর আদরের আশায় পাশ ফেরার সময় আরেকটা গতরের ওম পেয়ে জড়িয়ে ধরেছে, মা মনে করে তার বুকে মুখ গুঁজে নিশ্চিন্তে বাকি রাতটা কাটিয়েছে আর যখন ভোরে ঘুম থেকে উঠতে যাবে, তখন দেখেছে, রাস্তার বুড়ি কুকুরিটার পেটে মুখ ঠেসে গেল রাতের অর্ধেকটাই সে কাটিয়েছে।
বুক ভাঙা সেই সকালগুলোতে চানু ভিক্ষা কিংবা কাজে না গিয়ে ডান দিকের নিস্তেজ নদীটার বিশাল চরে পালিয়ে গিয়ে একা একা ঘুরেছে, কেঁদেছে, দূরে চলমান পানির ক্ষীণধারার ওপারে বিশাল সবুজ চরের ফাঁকা-নির্জন প্রকৃতি আর তার ওপর হেলে পড়া নীল আকাশ যেন কী বলতে চেয়েও বলতে না পেরে এক অফুরান কষ্টে বারবার আরও নীল হয়ে জমে যাচ্ছে; শরীরভরা ময়লা আর মাথার চুলের জঙ্গলে উকুন নিয়ে পাঁচ বছরের চানু মা মা বলে বারবার ডুকরে উঠেছে।
ছবিলা পা ঝুলিয়ে বারান্দায় বসে আছে। তার হাতে দুলছে দুটো রুটি। চাঁদের আলোর বৃত্তের মতো রুটি দুটো চানুর ছিন্নমূল জীবনের মতোই অন্ধকারে মাখামাখি আর তার হাতের চুড়ির রিনঝিন শব্দ চারপাশের বিষণ্ন প্রকৃতিতে যে কম্পন তুলছে, তা যেন আদমের হৃদয়ের গান আত্মার ভেতর থেকে কোরআনের ছবকের মতো ভেসে আসে।
ছবিলার আঙুলগুলো চানুর রুক্ষ চুলের গোড়ায় গোড়ায় পরম হয়ে ছুঁয়ে যায় আর রুটি চিবানোর জন্য ক্ষুধার্ত চানুর মুখ চপ চপ শব্দ ছড়ায়। মরা নদীর গহিন চর থেকে ভেসে আসে ক্ষুধার্ত শিয়ালের ডাক। চানুর ভেতরটা দপ করে কেঁপে ওঠে। তার মনে হয়, অন্ধকারে কারা যেন খুন করে একটা লাশ চরে গুম করে গেছে, আর সেই নরমাংস ভক্ষণের মচ্ছবে মত্ত শিয়ালরাই এমন হিংস্র গর্জন দিচ্ছে।
চানুর ইচ্ছা করে বাংলোর বারান্দা থেকে নেমে যায় চরের দিকে। একটু ভালো করে খুঁজলেই যেন সে লাশটা পেয়ে যাবে। মর্গের চালান ছাড়া আর কত দিন?
‘খাওতে’—বলে ছবিলা ফের চানুকে তাড়া দেয়। তার কথায় ঝরে পড়ে ক্লান্তির রেশ। চানু চমকে ওঠে। মুহূর্তে তার মনে পড়ে, সামনে যে বসে আছে, একটু পরেই সে এখানে থাকবে না; তার শূন্য স্থানটা নিষ্ঠুর হা-মুখ নিয়ে চানুকেই বুঝি তক্কে তক্কে রাখবে, আর যাদের সে এত দিন মর্গে বয়ে নিয়ে গেছে, অপঘাতে মৃত সেই হতভাগারা হয়তো একটু বাদে এখানে, এই নির্জন-পতিত ডাকবাংলোর তল্লাটজুড়ে জমায়েত হবে তাদের ফাড়া বুক, ঘিলুশূন্য খুলি, নাড়িভুঁড়িহীন খোলফা উদর তাকে দেখাবে বলে; কারণ, চানুই তো একমাত্র লোক যে তাদের দরদি হতে পারে, মর্ম বুঝতে পারে।
চানুর খাওয়া শেষ হওয়ার অপেক্ষায় ছবিলা যেন প্রতিটি পলক গুনে গুনে কাটায়। যদিও ক্লান্তিতে তার দেহ অবশ হয়ে আসতে চাইছে, কিন্তু চানুর সঙ্গ-লিপ্সা মন এই ডাকবাংলোর বারান্দা ছেড়ে যেতে নারাজ। অবশ্য বারান্দার তরল স্রোত আর ক্লান্তির হিমবাহ চানুর ভেতরটাকেও অনেক আগেই কাবু করেছিল আর বুঝি এখন তা থেকে রেহাই পাওয়ার জন্যই সে গামছায় হাত মুছে ছবিলার একটা হাত খাবলে ধরে বলে, ‘ল গাঙ্গের চরে যাই’ বলে রাস্তার দিকে হাঁটা দেয়। কালো পিচের ঠান্ডায় তাদের পা শিরশির করে ওঠে, আর বাতাসে হাঁটুর মটমট শব্দ ভেসে যায়। সারা শহর বিদ্যুতের পানসে আলো আর শেষ চৈত্রের নাজুক কুয়াশায় ঝিমিয়ে পড়েছে। গাছগাছালির পাতারা যেন এই আচানক নীরবতায় আলাপের ফিসফিসানিতে মেতেছে।
চানু ছবিলার হাতে হাত রেখে পিচ রাস্তা থেকে পৌরসভার মাঠে নামে। চাঁদের আলোতে তারা স্পষ্ট দেখতে পায়, মাঠজুড়ে কালো কালো কী সব যেন ছিটিয়ে আছে। অফিসঘরের সামনের সিঁড়িতে সেরকম যে জড়পিন্ডটি পড়ে আছে, হঠাৎ সেটি মাথা ঝাড়া দিতেই পটপট শব্দ ওঠে। তেলেসমাতিটা চানুর আর বুঝতে বাকি থাকে না। এখন সে দিব্যি শুনতে পারছে ওদের কাহিল শ্বাস-প্রশ্বাস, আর জানবাজ সেই কুকুরগুলোর এই চোরা কাতরানি তাকে মনে করিয়ে দিল স্টেশন রোডের লড়াইটাকে। সে পৌরসভার গেটের সামনের বিশাল ইউক্যালিপটাসের ছায়ার নিচে দাঁড়ায়। ছবিলা চমকে গিয়ে চানুর দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। সে ছবিলার হাতে হালকা চাপ দিয়ে মাঠের কোনাকানায় লাচাড় হয়ে পড়ে থাকা প্রাণীগুলো পরখ করে।
সারমেয়কুলের প্রতিটি ক্ষীণ নিশ্বাস তাদের পরাজয়ের কথাই চানুকে জানান দিচ্ছে। ডাকবাংলা থেকে পালিয়ে ওরা এখানে ঠাঁই নিয়েছে! স্টেশান রোডের কুকুরগুলোর ভয়ে ওরা পালিয়ে বেড়াচ্ছে! সে তীব্র চোখে ঠাহর করে দেখে, দলের পান্ডাটা সিঁড়িতে চিৎ হয়ে পড়ে আছে; তার সতর্ক কানশত্রুর আনাগোনা পরখে পলে পলে খাড়া হয়ে ওঠে আর যেন ঘোষণা করে, স্টেশন রোডের দখলের জন্য তারা যুদ্ধটা আমরণ চালিয়ে যাবে। দলপতি মরদটার চোয়ালের ফাঁক গলিয়ে বেরিয়ে পড়েছে তীক্ষ্ণ আর দীর্ঘ দাঁত দুটো। চাঁদের ম্যাড়মেড়ে আলোতে পান্ডাটা যেন ভেতরে ভেতরে ফুঁসছে! তার কালো ঠান্ডা নাক আর দীর্ঘ তেড়িয়া গোঁফ ঘুমের ঘোরেও বিরক্তিতে বারবার খিঁচিয়ে উঠছে। সামনের পা দুটোর থাবার নখে এখনো শত্রুর রক্ত-লোম আটকে আছে!
এই হারু পার্টির বিরুদ্ধ দলটা স্টেশন এলাকার বড়ো বড়ো হোটেলগুলোর ফেলনা হাড়-কাঁটা, গোরু-খাসি-মুরগির আঁত-নাড়ির উচ্ছিষ্টে বেশ নাদুস-নুদুস, শক্তিতে প্রবল, আর কখনো-সখনো রেল গোরস্তানের বেওয়ারিশ লাশের উপরি টেনে হিংস্রতায়ও তারা দুর্ধর্ষ। ওদের তুলনায় এই হারু পার্টির কুকুরগুলো চাল-চুলোহীন ফেউ; মাঝেমধ্যে খিদার কামড় সইতে না পেরে সীমানা ডিঙিয়ে হানা দেয় স্টেশন রোডে। চোরের মতো সামনে যা পায় গপগপ গিলতে থাকে, আর একটু পরেই ওরা টের পেয়ে যখন তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, তখন জান বাজি রেখে লড়াই করে, একসময় পরাজিত ও রক্তাক্ত হয়ে পালিয়ে আসে। অনেক বছর ধরেই এইরকম ঘটছে।
মচ করে একটা শুকনো পাতা চানুর পায়ের নিচে গুঁড়িয়ে যেতেই হারু পার্টির পান্ডাটা লাফ দিয়ে দাঁড়ায়, তার চোখের মণি দপ করে জ্বলে ওঠে। চানুও ছবিলার হাতটা আঁকড়ে ধরে থমকে যায়। তার চোখ সর্দারটার চোখের ঝিকমিক ঝিকমিক জেল্লায় আটকে গেছে। পান্ডাটা গাঝাড়া দিয়ে গতরের সবটুকু হিম্মত সামনের দু’পায়ে মজুত করেও চিৎকার দিতে দোনামোনা করে। চানু পান্ডাটার বিচক্ষণতায় খুশি হয়। কারণ সে এই মুহূর্তে নিশ্চিত যে কুকুরটা তাকে ঠিকই চিনে ফেলেছে আর সন্ধ্যারাতের ইটের স্বাদটাও মনে রেখেছে।
পৌরসভার দেয়াল টপকে মরা ব্রহ্মপুত্র নদীপাড়ে দাঁড়ালে চরের ঠান্ডা বাতাস, বালুর ওপর ফটফটা জোছনার চোখ-জোড়ানো ছায়া আর নির্জনতা...নৈঃশব্দ্যের মহিমা দিয়ে প্রকৃতি চানু ও ছবিলাকে স্বাগত জানায়।
চোখের পাতায় কাজলের রেখার মতো দূরের গ্রাম, মাঝেমধ্যে রবিশস্যের কালচে ছোপ, আর মরে যাওয়া নদীর যে অবশেষ সরু রেখার মতো আঁকাবাঁকা নালা, তার স্বচ্ছ জলে কাঁপা কাঁপা চাঁদকে নিয়ে তারা দুজন একটা বালুর উঁচু স্তূপে লেপচে বসে।
‘বুড়া চাচা এইখানে আছকা আছকা ঘণ্টার পর ঘণ্টা তব্দা মাইরা বইয়া থাকত’—ছবিলার কথায় চানু চমকে যায়। মুহূর্তে বুড়ার দরদি মুখটা তার চোখে ভেসে ওঠে আর বুকের গোপন ক্ষতটায় শুরু হয় জ্বলুনি; বুড়ো চাচা তার বাপ-মা, ওস্তাদ—আরও অনেক কিছু। এখন তার মনে হয়, এমন কিছু মানুষ আছে যাদের সাথে সম্পর্কের ওজন ঠাওরাতে এই সংসারের সব শব্দকেই রক্তহীন, পানসে লাগে।
‘গানটা মনে আছে?’ এই মাটির পৃথিবীর কেউ নয়, ছবিলা যেন চাঁদের সাথে আলাপ করছে, এমনি ধারায় সে কথা বলে যায়। তার চোখের নজর, মুখের কায়ায় এক আচানক ঔদাস্য আর তার পুরু ঠোঁট, খাড়া নাক, বুকের ছায়া বালুতে গড়িয়ে গড়িয়ে যেন তারার দেশের পথ তালাশ করে।
কোথা হইতে আসে মানু কোথায় চলে যায়
তাসের ঘরের তুরুপের তাস খেলে কোন লীলায়!
ছবিলার গান শুনতে শুনতে চানুর মনে পড়ে, মর্গের চালানহীন অলস দিনগুলোতে বুড়ো বিষণ্নতায় ডুবে যেত, তখন সে আকাশের দিকে মুখ তুলে গানের পর গান ক্লান্তিহীন গাইত। ‘বুড়া কাঁদতো না। দুনিয়ার সব কিছুরেই মনে করতো খুব স্বাভাবিক।’ হঠাৎ গান থামিয়ে ছবিলা কথাটা বলে। চানু ছবিলার দিকে তাকায়। তার ভাসা ভাসা শুকনো চোখ চাঁদের কিরণে ঝিকিয়ে ওঠে আর সেই বিবর্ণ-করুণ দৃষ্টি ছবিলার কথার সত্যতায় নেতিয়ে পড়ে।
সত্যি বলতে চানু নিজেও এখন মনে করতে পারছে না বুড়োকে কখনো কাঁদতে দেখেছে, খুব হাসতে দেখেছে? বুড়ো প্রায়ই বলত, ‘ভোগা, সব ভোগা। ’
দলা দলা কষ্ট চানুর গলায় আটকে থাকে, সারাটা বুকে চেপে বসে নিদারুণ জট, যেন শ্বাস নিলেও বেরোবে না।—চাচা আমি যেন কানতে পারি না! জন্মাবধি লাশ বইতে বইতে আর অপঘাতে মৃতদের স্বজনদের চোখের জল দেখতে দেখতে বুঝি তার নিজের চোখের-বুকের সব পানি শুকিয়ে গেছে!
কাম-ক্লান্তি, প্রেম-ভালোবাসা নয়, এবার ছবিলা যেন কী এক আজব অনুভবের ভার সইতে না পেরে কিছুটা নুয়ে পড়ে, আর ছোট্ট একটা হাই তুলে বাতাসে পান-জর্দার একটুখানি সুগন্ধ ছড়িয়ে ‘একটু কাইত হই’ বলে চানুর কোলে মাথা রাখে। মরা নদীর পানিতে একটা ব্যাঙ জোনাকের নীল আলোর ওপর ঝাঁপ দেয়। দক্ষিণের বাতাস শণ শণ বেগে ছুটে। চরের ঘাস-লতা-নলখাগড়ায় ঘষা খেয়ে বেগবান সেই বাতাস কখনো বাঁশি বাজায়, আবার কখনো যেন মিনমিনে রোদন জুড়ে। মাঝে মধ্যে দূরদিগন্ত থেকে বাতাস একরোখা কিশোরের মতো সোজা নদীর পানিতে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ে, তাতে ছোট ছোট ঢেউ ওঠে-ভাঙে আর সিসাবর্ণ সেইসব ঢেউয়ের মাথায় চাঁদের কিরণ চিকচিক দ্যুতি হয়ে গড়িয়ে পড়ে। প্রকৃতির এই আদিম আবেগঘন খেলা দেখতে দেখতে কীসের জন্য যেন চানুর বুকটা খাঁ খাঁ করে।
‘ছবি তুই ঘরে যা’—চানু নিজেই চমকে ওঠে তার স্বরের রুক্ষতায়। সে ভাবে; পচা বিকৃত-মুখ লাশগুলো বুঝি তার ভেতরের সব ভালোকে একেবারে শুষে নিয়েছে! ইট-লোহার পিঞ্জরের বাইরে অসীম আকাশ, নির্জন চর, জোছনার রুপালি ধরারায় স্বপ্ন স্বপ্ন রহস্য আর বাতাসের শীতল পরশ কত সহজেই তাকে ল্যাংটো করে দিয়েছে! আত্মার কোমলতাহীন এই অনুচিত প্রকাশ তাকে যেন ছবিলার কাছে খুব খাটো করে দেয়, খাটো করে দেয়—তাদের সামনে ছড়িয়ে থাকা ঈশ্বরপ্রতিম নিসর্গের কাছে। নিজের ভেতর এত পুঁজ আর পাথরের রুষ্টতা নিয়ে সরলপ্রাণ নারীর কাছে কীকরে বসে, ছবি বলে ডাকবে, তার চিবুকের পাশটায়, যেখানে রেশমের মতো গুচ্ছ গুচ্ছ লোম সেখানে চুমো দিয়ে শিহরিত হবে! দূরগ্রহ পানে তাকিয়ে থাকা তরুণের চোখ দিয়ে যেন লকলকে আগুন ঝরে আর ওই চাঁদের পিঠের কালো কালো দাগগুলোতে বুঝি মর্গের চালানের জন্য পড়ে থাকা লাশগুলো দেখেও কেন সে একটু খুশি হতে পারে না?
চানুর ভাব দেখে ছবিলা ভীতু গলায় বলে, ‘ইশ্, অত কটমট করতাছ ক্যায়া।’ তার মনে ভয়ের হিড়িক জটিল কুয়াশার মতো খোয়া খোয়া দানা হয়ে চেপে আসে। এ কার কোলে মাথা রেখে সে শুয়ে আছে! যাকে দেখে এই শহরের মুখ-চেনা মানুষ পথ ছেড়ে দেয়, দোকানিরা যার ভাসা ভাসা লাল চোখ ও পাথরের মতো অবয়ব দেখে হা হা করে ওঠে, যে লোকটা অন্য কোনো লোকের গায়ে হাত রাখলে ভয়ে সেই লোকের ভেতরটা কাঠ হয়ে যায়, যাকে সবাই চিনে লাশ-চালানদার বলে, যার নিশ্বাসে নাকি লাশের গন্ধ জড়িয়ে থাকে, ছবিলা কিনা এখন সেই মানুষের কোলে মাথা রেখে...!
চানু নিজের অজান্তে তার হাতের আঙুলগুলো ছবিলার গাল-গলার শ্যামলা ত্বকে ভেসে ওঠা লাল লাল ছোপগুলোকে কেন্দ্র করে ঘুরতে শুরু করে। আত্মীয়-এগানাহীন উটকো এই সংসারে ছবিলা নামের আপাত-নিঃস্ব জংলি ফুলটির স্নায়বিক স্পর্শ-গন্ধ-তাপ তাকে মাঝে-মাঝে জীবনাসক্ত করে, আর এখন সেইসব বিকৃত পুরুষের কামোল্লাসের চিহ্নে আঙুল দিতেই তার মগজ চিড়িক করে জ্বলে ওঠে। মনে পড়ে, আজ রাতে ছবিলা যাদের কাছে গিয়েছিল, এটা নিশ্চয়ই ওদের কাজ। আর এটা তো চানুর জানা কথাই, যারা টাকা দিয়ে নারীর শরীর কিনে, তারা জন্তু হিসেবে কতটা...।
চানুর আদরে ছবিলা যেন গলে পড়বে! আরামে তার চোখ দুটো বোজে আসে আর মনে মনে নিজেই নিজেকে শাসায়, চানুকে বোঝার অক্ষমতায় গাল পাড়ে এবং নিজের কাছে নিজের এই পরাজয় খুব শীঘ্র তার নিজের ওপর এক আজগুবি ঘৃণায় দ্রব হয়।
‘মশায় খুব কামড়াইছে?’—চানু ছবিলার থুতনিটা আলতো করে টানে।
‘উপাসি কুত্তায় কামড়াইছে?’—চানুর জিজ্ঞাসার জবাবে ছবিলা কথাটা বলে ডুকরে ওঠে; সে ব্লাউজের বোতাম খোলে বুকের দাগ দেখায়, দুই হাঁটু ভাঁজ করে বালুতে পা ঠেকায়। তাতে তার নিচের দিকের সায়া-শাড়ি হড়কে গিয়ে গোপন অঙ্গে চরের ঠান্ডা বাতাস লাগে।
মুখে-বুকে চাঁদের আলো মেখে শুয়ে থাকা ছবিলার বড়ো খোঁপাটা চানুর দু-ঊরুর ফাঁকে ডুবে যায় আর তার দাঁতের পাটি দু’ঠোঁটের ফাঁক হয়ে ঝলক দেয়। দপদপে জোছনায় বুনো ফুলের বিষাদের মতো মেয়েটার গলার ভাঁজে ভাঁজে লাল দাগগুলো আবছা আবছা দেখা যায়। অসহ্য এ দৃশ্য এবং অবশ্যই এই ক্ষেত্রে তার ভূমিকা নিতান্ত অসহায় দর্শকের আর এই বোধ তাকে যেন আরও বেশি উত্তেজিত করে। মুহূর্তেই তার চোখে ভেসে ওঠে বিশেষ একটি হোটেল মালিকের নোংরা-কামুক মুখ; খাঁটি লোচ্চা হিসেবে এই শহরে যার যথেষ্ট খ্যাতি আছে।
হঠাৎ চানু পাথরের মতো স্থির, চোখের দৃষ্টি মরা নদীর সিসাবর্ণে আটকে গেছে। আজ কত দিন হলো মর্গের চালান নাই। এ জন্যই কি তার এত বিষাদ-বিকৃতি? অথচ মাঝে-মধ্যে এক-আধটা লাশ না হলে ছাল-চামড়াহীন এই গেঁয়ো শহরে শুধু রিকশা চালিয়ে কিংবা ছবিলার সাথে মাঝনিশিতে কথা বলে, স্টেশন রোডের দখল নিয়ে কুকুরদের লড়াই দেখে কি চানুর চলে?
‘ঘরে যা ছবিলা’—চানুর ভেতরটা যেন পুড়ছে; একলা ওই আকাশ আর মনের মাঝে লুকিয়ে থাকা বুড়োটার সাথে রাতের এই দুর্লভ নিস্তব্ধতায় সে মিশে থাকতে চায়।
‘ঘর কই, ঐডা তো কব্বর’—ছবিলা যেন গর্তের সেই অন্ধকারে একলা একলা ছটফটায়, সাপের মতো মোচড়ায়, নিজের বিষে নিজেই জ্বলে মরে। এই কহরের সংসারে একবিন্দু আশার আলো, খোয়াব, মাথার ওপর শান্তির ছায়া বলতে তো এই চানু; তাই তো লাশের ভিড় দু’হাতে ঠেলেঠুলে তার কাছে ঘেঁষতে ছবিলার পরানটা সারাক্ষণ কাতরায়, ইনাই-বিনাই কান্দে।
‘ক্যান, ঘরের খোয়াব দ্যাখতারস না’—চানু বুঝি ছবিলার ঘর বাঁধার স্বপ্নে নিজেকে না জড়িয়ে আলগোছে পাশ কাটে, তার স্বপ্নকে বাঁক ফেরাতে উজ্জোগ করে, কিংবা দায়হীন একটা সম্পর্কের একাকিত্ব-রহিত আমোদে মজে থাকার পয়গাম রাখে।
‘কত খোয়াব দ্যাহি, কিন্তুক সকাল হইলে যে আর টিকে না!’—দিনের আলোতে যাকে কাছে পাওয়া মুশকিল, আপন বলে জানিয়ে দেওয়া অন্যায়, সেই চানুই তো ছবিলার মনজুড়ে দিনমান বসে থাকে; পুরুষটার ভর-তাপ-দীপ্তি দেহ-মনে সুর ছড়ায় আর রাতের অন্ধকারের খোয়াব দেখায়। চানু ছবিলার ব্লাউজের বোতাম লাগায় আর জিজ্ঞেস করে; ‘কী কী খোয়াব দ্যাখস?’ চানুর হাতের পিঠে ছবিলার স্তনের বোঁটার ঘষা লেগে সুড়সুড়ি ওঠে। পাওয়ার আনন্দ ও না পাওয়ার হাহাকারের সাথে যুঝতে না পেরে চানু বুঝি ডুবে যায়; অতলে পড়ে হাঁসফাঁস করে, কী এক অদৃশ্য জাল থেকে মুক্তি চায়।
ছবিলা লাফিয়ে ওঠে। তার দু’চোখ ঝলমল করে। ভরা বুক আশার ছন্দে ওঠে-নামে। নিশ্বাসে নিশ্বাসে পান-জর্দার সুবাস বেরিয়ে এসে চানুর নাকে-মুখে হামলে পড়ে চানুকে আরও উদাসী বানায়। আর ছবিলা যেন অচিন পাখি হয়ে ডাকে, গান গায়: ‘আহারে কত খোয়াব! তামানটা রাইত খালি খোয়াবের পিছনে খোয়াবেরে জোড়া দেই! একখান ছন-বনের ছোট্টু ঘর, একখান জানলা পুবে, একখান দক্ষিণে, দক্ষিণা আর পুবাল হাওয়ার আউলা-ঝাউলা দৌড়, তার লগে চান্দের রোশনাই জানলা দ্যায়া গৈল্লা গৈল্লা পরব আর পাশের মানুষটা কানে কানে কথার খই ফুটাইব!’
চানু মহা আচানক! ছবিলা তাইলে কার কথা কয়? যে চানুর অপাঙ্গে লাশের গন্ধ, চোখে সারি সারি গলিত মুর্দা, বুকের ভিতরে খালি করোটি-কঙ্কাল আর রাজ্যের পেরেশানি, পেরেশানি। এত্তানি ছোট্টু যে চানু হঠাৎ এক ভোরে ঘুম থেকে ওঠে, দেখে এই জগৎ-সংসার বড় অকরুণ। মা নাই পাশে, তাকে ফেলে পালিয়েছে। তার বদলে পথের বুড়ি কুকুরীটাকে মা ভেবে তার বুকে মুখ গুঁজে শুয়ে আছে। এই তক ভেবেই বিচিত্র এক ঘেন্না-ক্রোধে চানুর বুক জ্বলে ওঠে; হাত নিশপিশ করে। সে মনে মনে আঞ্জাম করে ফেরার পথে পৌরসভার মাঠে লাচাড় হয়ে পড়ে থাকা কুকুরগুলোকে আরেক দফা পেটাবে। রাগে সে মুখ খারাপ করে, ‘কুত্তার বাচ্চারা, সরকারের জাগাত পৈড়া খালি ঘুমায় আর লড়াই করতে গিয়া ফি বার মাইর খায়।’
ছবিলা চানুর ঘাড়ে দুই হাত রেখে কাছে টানে। ‘তুমি খোয়াব দ্যাখ না’ বলে পানের রসে ভেজা ঠোঁট চানুর গালে ঠেকিয়ে আদর করে। কিন্তু চানুর নিশ্বাসে সে চমকে ওঠে—নারীর পাশে বসা পুরুষের শ্বাস তো এমন হয় না! এটা টের পেয়ে ছবিলার হাত আপনা থেকে গুটিয়ে আসে। এই ফাঁকে চানু আলাপ জুড়ে, ‘আমি খোয়াব দ্যাহি’—চানু যেন অনেক দূর থেকে শুরু করে; কায়া না ফুটিয়ে হাতের দশ আঙুল খাপের খাপ বসায়, হাই তুলে হাত দুটো ধনুকের মতো বাঁকায় এবং শিরদাঁড়ায় মটমট শব্দ তুলে শরীরের আড়মোড়া ভাঙে—‘আমি খোয়াব দ্যাখি গাঙ্গের পাড়ে একখান ঝকঝকা টিনের ঘর!’ তার কথায় ছবিলা চমকায়। চানুর গলা বাতাসে ওড়ে; চারদিকে কেঁপে কেঁপে পাক খায়। আশা আর আনন্দে চানুর সামনে বসা নারীর শরীর কাঁপে, বুক কাঁপে, স্তন দু’টো আবেগে থত্থর করে, শ্বাস পড়ে না—এখন কি তার দম ফেলা উচিত? চানু ফের শুরু করে, ‘গাঙ্গের পাড়ে একখান ঝকঝকা টিনের ঘর, চৈত মাসের বাতাস মরা চরের খালি হুঁ হুঁ বিলাপ করব, আষাঢ়ে পাগলা পানির বেউয্যা গোঙানি, জানলার শিক ধইরা তামান রাইত বাতাসের গন্ধ টানি খবর লইমু লাশটাশ পড়ছে কিনা।’ অ, বলে ছবিলা থেমে যায়। চানুর এই ভয়ানক আর বিস্ময়কর খোয়াবের কথা শুনে তার শরীর পাথরের মতো জমে গেছে, সাথে তার মুখের কথাও। তার চোখে ভাসে দুই সারি লাশ; জীবনের স্বাভাবিক নিয়মে যারা চলে গেছে, তাদের শান্ত-তৃপ্ত মুখ এবং বিপরীতে, যারা অপঘাতে মরে যেতে বাধ্য হয়েছে, তাদের বিস্ফারিত চোখ, হা-মুখ, রক্তাক্ত গতর। ‘আর কত লাশ চাও?’—ছবিলার গলা হাহাকারের মতো শোনায়। তার ঘর, পুবের বাতাস, চাঁদের জোছনার স্বপ্ন অনাকাঙ্ক্ষিত পচা লাশের নিচে যে তলিয়ে দিয়েছে, সে কে? এখন রাত্রিকাল; চাঁদের সুস্থ আলোয় পৃথিবী হাসছে, ছবিলাকে কোথায় যেন ডেকে নিতে চাইছে, অথচ তার অনিকেত জীবন, গুমোট হৃদয়জুড়ে নাকছাবির পাথরের মতো ভার, ছবিলাকে অঙ্গে-অধরে জড়িয়ে রেখেছে যে, সেই চানু কেন ঠাঁইয়ের উদ্দিশ করে না?
‘সংসার যদ্দিন আছে, লাশ পড়ব; আমি চাই কি না চাই। প্যাঁক-পঙ্কের তল দ্যায়া বাইন মাছের মতো যারা চলাচল করে, তাগরে দ্যাখা না গেলেও লেঙ্গুর দ্যায়া যখন ঘাই মারে, তখন এই জগৎ ভয়-তাইজ্যবে বোবা হইয়া যায়। মর্গের শেষ চালানডারে দ্যাখছস না: দেড় বছরের পোলা, তারও গতরখান এক কোপে দুই টুকরা কৈরা দিল।’ চানু আকাশের দিকে মুখ তুলে যেন আ আ করে। তার বুক বুঝি পাথরের চাপে জমে আসে। সে এক বুক দম নিয়ে ফের শুরু করে, ‘জানস, সারাডা পথ আমার খালি মনে হইছে, পোলাডা বুঝি বাজান বাজান কৈয়া ডাকে, যতবার পিছন ফিইরা তাকাই, দ্যাহি লাশটা মাটিত পৈড়া গেছে; দুই হাতে পাঞ্জায়া উঠাই—লাশ পৈড়া যায়, উঠাই, পৈড়া যায়, আর ঘুটঘুইট্টা অন্ধকারে বাতাসের ফাতফাতিতে হারিকেনডা ধপধপ করে, তিন দিনের পচা লাশের গন্ধে ভ্যানের পিছনে কয়ডা শিয়াল বাঘের লাহান গোঙড়ায়।’ রোদন নয়, চানুর গলায় দম আটকে থাকার মতো অসহ্য আওয়াজ ওঠে, সাথে ছবিলাও তাকে জড়িয়ে ধরে ভয়-বিহ্বল গলায় যেন ডুকরে ওঠে। নারীর গলার আবেগাকুল ফেসফেস শব্দে চানু নতুন করে দ্বন্দ্বে পড়ে, ‘পোলাডা তো ছবিলার না, না ছবিলার? তাইলে হে ক্যান কান্দে? যুবকের চিন্তিত চোখ-জোড়া নারীর চোখের পানিতে চাঁদের আলো বারবার ঝলকাতে দেখে। নারীর মাথার ওপর স্তম্ভিত আকাশ, স্নেহময় তারার চোখ, ক্ষীণকায় মেঘের জলশূন্য গতর, আর ছায়াপথের অজস্র আঁকিবুঁকি। জটিলতায় গা ডুবিয়ে বসে থাকা দুই নর-নারীর গরম নিশ্বাস বুঝি চৈত্রের শুকনো বাতাসে মুহূর্তে মিলায়।
‘চাচার কথা মনে হইল, বুড়া মর্গে রওনা হইলে লাশের লগে আলাপ জুড়ত, আর লাশেরে লাশ কৈত না, পেসেঞ্জার কৈয়া ডাকত। চাচায় কৈত, গাড়িতে পেসেঞ্জার উঠাইয়া পানি ছুঁইবি না, মাল টানবি, খাঁটি বাংলা মাল।’ চানুর কথায় ছবিলার ভেতরটা লাফায়—‘এই কাম না করলে কী হয়?’ কথাটা বলতে পেরে তার নিজেকে ভারমুক্ত মনে হয়; আর এক পলকের জন্য অন্যরকম একটা জগৎ মনের মাঝে ঝলক দেয়: যেখানে কেউ কোনো দিন খুন হবে না, মুর্দার পচা গন্ধ-ডোবানো লোবানের ধোঁয়া উড়বে না।
চানু ভোঁস করে দম ছাড়ে—‘আমি তো ছাড়তেই চাই, কিন্তুক কাম যে আমারে ছাড়ে না।’ ছবিলাকে চানু কী করে বুঝাবে, শৈশবের দুঃখী দিনগুলোতে নিজের অজান্তে বুড়ো চাচার হাত ধরে একদিন যে পথে নেমেছিল, সেই পথ পায়ে পায়ে আজ তাকে যে দেশে নিয়ে এসেছে, সেখানে শুধু পচা রক্ত আর লাশের গন্ধ, অন্ধকারের ভয় আর আলোর উত্তেজনা, অতিপ্রাকৃত ঘটনারাশির মোকাবিলায় সাহসের খেল হরদম ডাক পাড়ে। সেই ডাকের সাথে কদম মিলিয়ে সামনে হাঁটা যায়, পেছনে নয়।
ছবিলা মনে মনে আঁতকে ওঠে। চানু যদি তাকে জিজ্ঞেস করে, তুই পারলি না কেন? তবে সে কি জোয়াব দেবে। এই ভয় তাকে অস্থির করে। কতবার ফিরে আসার পথ সে তন্নতন্ন করে খুঁজেছে, কিন্তু হায় পুরুষ! যারা তাকে জেনে গেছে, তাদের চোখ ছবিলার ওই ভারী বুক আর পুরুষ্টু মাজা দেখেই চকচকায়, হাত নিশপিশ করে, দাঁত হিড়হিড়িয়ে ওঠে। কতবার সে মেসে বা বাসায় কাজ নিয়ে দেখেছে, ফলাফল সেই একই। তারা কিছু বোঝে না, কোনো বাধাই মানে না; তাদের শরীর চাই, চাই নরম গোশত, যেখানে দাঁত-নখ ডুবিয়ে ইচ্ছে মতো খেলা যায়, শিরার ভেতর ফুঁসে ওঠা আগুন ঢেলে দিয়ে ঠান্ডা হওয়া যায়। ছবিলার মনের সুখ-দুঃখ, ইচ্ছা-অনিচ্ছা তাদের কামুক আগুনের কাছে কতই না তুচ্ছ! পুরুষ! কী অদ্ভুত চরিত্রের প্রাণী! তাদের মধ্যে অনেকেই কাছে এসে টগবগ করে ফোটে, গড়র-গড় করে, আর শরীরটা গিলে ফেলতে পারলেই বুঝি বাঁচে। কেউ কেউ হতাশায় ভেঙে পড়ে, নরম গলায় ব্যক্তিগত কষ্টের বয়ান দিতে দিতে চোখের পাতা ভারী করে তোলে এবং দরদি হাতে শরীর নিয়ে খেলে, মমতায় জড়িয়ে কাতরায়, দু-চারটে সুখ-দুঃখের হদিস নেয় আর মজার ব্যাপার হলো, এই পুরুষগুলোই সহজে খসেও যায়।
ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটিকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার জন্য হবে হয়ত, ছবিলা চানুকে জিজ্ঞেস করে; উকিলের পুরিডার কথা মনে আছে? তার প্রশ্ন চানুকে উসকে দেয় মৃতদের জগতে, অতিপ্রাকৃত ঘটনার বর্ণনায়, যেখানে সে সহজ ও গতিশীল। সে তো জানে চানুর মগজটা সুরতহাল রিপোর্টে ঠাসা। মর্গের চালান নিয়ে রওনা হবার আগে চানুর অস্থিরতা, লাল চোখের উত্তেজিত ঝিলিক, মর্গ থেকে ফিরে ডাকবাংলোর বারান্দায় হাত-পা ছড়িয়ে নিসাড় পড়ে থাকা চানুর শীতল চাহনি, নিশ্বাসে বাংলা মালের কড়া গন্ধ, পাথরের মতো শক্ত চোয়াল—এসব কী কখনো ছবিলা ভুলতে পারে!
উকিল সাহেবের মেয়ের কথায় চানু ‘ওহ’ বলে চমকে ওঠে, আর যেন সেই বিষম চমকের ধাক্কা সামাল দিতেই ছবিলার দিকে করুণ চোখে তাকায়। তার পাথরের মতো শক্ত-ভরাট মুখ আর খাড়া নাকের দু’পাশে ভাসা ভাসা চোখ দুটি ক্রোধে-ঘৃণায় দপ দপ করে জ্বলে, কিন্তু কী এক ব্যর্থতায় যেন মাথাটা আপনাতেই বুকের কাছে ঝুলে পড়ে। ক্লান্তিতে ভেঙে পড়া আবেগহীন এক অতিমানবীয় গলায় সে বলতে থাকে—‘সোনার পুতুল। একটা সোনার পুতুল আছিল। তার মুকখান গোলাপের মতন আর চিক্কণ ঠোঁটে মায়ার একটা হাসি সারাক্ষণ ঝলমল করত। কত দিন ইশকুলের পথে দ্যাইখ্যা মন কৈছে, তারে মা বইলা ডাক দেই, জননী জননী কৈয়া জনমের দুক্কু ভুলি; এই রহম একটা তেরো বছরের কাঁচা মাইনষেরে...চানু খানিকক্ষণ ঝিম মেরে নিজেকে যেন সামলে নেয়। বুক-গলা-মগজের আলোড়িত আবেগ কিছুটা থিতু হলে সে আবার শুরু করে—জননীরে লইয়া মর্গে যাইতাছি। কী গরম! গতরের ছাল-চামড়া বুঝি গইল্যা যায়। ত্রিশাল পার হইয়া বৈলরের বাঁকে খোলা মাঠের বাতাস এমুন বেগে খলবলায় যে আরামে দুই চৌখ বন্ধ হইয়া আসে, মনে হইল আইজ তো জননী আমার সোয়ারি; একটুন হাওয়া খাওয়াই। ভ্যানটা খাড়া কৈরা মার কপালে হাত রাখলাম। মায় আমার শ্বশুরবাড়ি যাইব; তার আগে মর্গের শান-পাত্থরে শুইয়া সাজগোছ করব। ইশ্, কী ঠান্ডা, শীতে গতরটা বুঝিন জইম্যা যাইতাছে। চানু থেমে যায়। তার গলার অদ্ভুত শব্দের সাথে ছবিলার কণ্ঠও জড়িয়ে আসে। তারা পরস্পরকে চেপে ধরে স্বজনহারা মানুষের মতো। অবলম্বন খোঁজে। চানু ফের শুরু করে : ‘জননীর কপালের ধুলা গামছায় মুইছ্যা ফের হাত রাখতেই মা আমার চৌখ খুইল্যা চাইল, এক পলকের একখান পরানজুড়ানো চাওনি; ছবিলারে তুই যুদিন দ্যাখতে—হেই দিষ্টি আর চিক্কণ ঠোঁটের হাসি! মাথার নাট-বল্টু সব লুজ হইয়া গেল। সিটের নিচ থিকা বোতলডা লইয়া গলাত গপগপ কৈরা ঢালি।’
ডাকবাংলোর উত্তর দিকে জংলি পেঁয়াজের থোকা থোকা সবুজ কলিগুলো পটপট খুলে গিয়ে অবাক চোখে দুনিয়াটা দেখছে; তাদের বুক থেকে ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে আসছে মনমাতানো সৌরভ, যা দলা পাকিয়ে চানুর দিকেই ধাবমান, যেন তারা অভাগা এই চানুকে একটু খুশি দেখতে চায়, আর চানুও নাকটা উঁচিয়ে বারান্দায় বসে আছে সুঘ্রাণ পাওয়ার আশায়; কিন্তু তার আগেই সারাটা জামতলা উপচে গেছে পচা-গলা লাশে; লাশগুলোর বিকট গন্ধের তোড় ফুলের সৌরভকে খেদিয়ে নিয়ে যাচ্ছে চানুর নাগালের বাইরে। তার বুকটা ধক করে ওঠে। এ কেমন শত্রুতা? একটু সুবাস, এক বুক সুগন্ধি বাতাস তার সারাটা বুকের কোনাকাঞ্চিতে ছড়িয়ে পড়বে, সারা জীবনের আটকে থাকা বদ গন্ধগুলোকে ধুয়ে-মুছে সাফ করে দেবে—এই আশায় মরিয়া চানু কাঙালের মতো গলাটা বাড়িয়ে দেয়। দৈবের কী চক্কর দ্যাখো, সুগন্ধির জন্য মরিয়া চানুই কি না গড়িয়ে পড়ল নিচের নালাটায়, যেখান দিয়ে শুধু পুঁজ-রক্তের তেড়িয়া স্রোত বইছে। চানু পিছলে যাচ্ছে তো যাচ্ছেই; ওপরে উঠে আসার জন্য সে আকুল হয়ে হাত-পা চালায়। আশপাশে একটা লতাপাতা, খড়কুটাও নাই যে খামচে ধরবে। ছবিলাটা যে কী! বুকের আঁচলখানা বাতাসে উড়িয়ে দিয়ে দিব্যি বসে আমোদ করছে, ফুলের সুগন্ধটা আমলে না এনে বিদ্ঘুটে হাসিতে ভেঙে পড়ছে খানখান! ও যদি আর হাতখানেক লম্বা করে আঁচলটা ছুড়ে দিত, তবে চানু ওটা ধরে
নালা থেকে উঠে আসতে পারত। আর এখন কিনা সে স্রোতের টানে নালার পুঁজ-রক্তে ডুবছে-ভাসছে।
চার
চানু ঘুম থেকে দড়ফড়িয়ে ওঠে। ডাকবাংলোর বাইরে দুপুরের ঝকঝকে রোদ, গাছের সবুজ পাতায় পাতায় সোনার মতো ঝলকাচ্ছে। এক প্রসন্ন দৈবের করুণা যেন পৃথিবীর মানুষের ওপর পলে পলে ঝরে পড়ছে—স্রেফ এইটুকু ভাবতেই চানুর বুকটা অন্যরকম একটা অনুভবে কেঁপে ওঠে; আর মনে পড়ে, গত রাতের সেই বদ খোয়াবটা। এখনো যেন তার শরীরটাকে পেঁচিয়ে রেখেছে পচা মুর্দার কু-গন্ধটা। যদিও সে গত রাতে ছবিলার সাথে গপ্পো ও শরীর ঢলাঢলিতে মজেছিল, কিন্তু তারপর থেকে এই সকাল পর্যন্ত সে যে একটা বদ খোয়াবের সঙ্গে লড়েছে, সেটা টের পেল ডাকবাংলোর চাতালের জামতলার আস্তর আস্তর শুকনো পাতা দেখে; আর কী কুদরত, বারান্দার পাশের ঝোপটার জংলি পেঁয়াজের সব সবুজ কলি এখন সাদা ফুলে ফুলে দুলছে! নাক টানলেই বুঝি আগরের মতো মিষ্টি গন্ধে বুক ভরে যাবে।
ছবিলাকে চানু প্রথম দেখে রেলস্টেশনে মালগাড়ির ফাঁকে; সে অনেক দিন আগের কথা, তখন সবেমাত্র সে নারীর শরীরের ছবক নিতে শুরু করেছে। সেই আবছা আলোয় মেয়েটার ঠোঁটের ফাঁক গলে দুধ-সাদা দাঁতের চমক, চওড়া কপাল, খাড়া নাক, আর বড়ো বড়ো চোখ দুটো জুড়ে করুণ একটা মিনতিতে ঢলো ঢলো ছবিলা চানুর মতো মরদের যৌনতাকে উসকে দেবার জন্য ছিল যথেষ্ট। আঁচলের তুচ্ছ বাধা ডিঙিয়ে সগর্বে উঁচিয়ে থাকা তার বিশাল বুক ও দীর্ঘ পুরুষ্টু উরু চানুকে মুহূর্তে পাগল করে তুলেছিল; আর সে-ও শিকারি ডাহুকের মতো শিস দিয়েছিল ছবিলার মনোযোগ আকর্ষণে। যদিও ছবিলা চানুর দিকে চেয়ে নিজের বিষণ্ন মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিল। ভাবটা ছিল এমন, ‘তুমি আর কয় ট্যাহার মরদ।’ চানুর খাবলায় ততক্ষণে উঠে এসেছে আগের দিনের মর্গের চালানের সবটাই। বুনিয়াদি কারবারির মতো তাজা নোটগুলো কড়, কড় শব্দ তুলে গুনে যাচ্ছিল সে; এক, দুই, তিন...খুচরো দশ/বিশ সমেত চারশো আশি টাকা। সযত্নে ভাঁজ করা টাকাগুলোয় চুমু খেতে খেতে টাকরায় ওচ ওচ শব্দ তুলে চানু এমনভাবে পকেটে রেখেছিল, যার একটাই অর্থ; দেখো মেয়ে, চাইলে তুমিও এর থেকে কিছু সাপটাতে পারো; কে না জানে দুনিয়াটা সাপটাবার।
ছবিলা খুব নিরীক্ষার চোখে চানুকে দেখতে দেখতে কাছে এসে বলেছিল, ‘কই যাইবা, লও।’ অন্ধকারে তখন মেয়েটার গলা রিনরিন করে কাঁপছে; চানু তার হাতের কব্জি খাবলে ধরলে আঙুলগুলো তুলার মতো নরম মাংসে কামড়ে বসে। পুরুষের এই উগ্র নিষ্ঠুরতায় মেয়েটা কঁকিয়ে ওঠে। হুড তোলা রিকশাটা দেখিয়ে চানু সামনে হাঁটা দেয়। ডাকবাংলোর জামতলার অন্ধকারে রিকশায় বসে তারা বুড়ো চাচার গানও শুনে;
‘গোরের মাটি বেজায় আন্ধা
দয়াল দেখাও তোমার নূর।’
বুড়োর গান আর দয়ালের নূরের কথায় না দমে তারা আঁতিপাতি করে নির্জন ভূমি খোঁজে আর তখন তাদের মনে পড়ে নদীর চরের কথা। রিকশাটা জামতলায় ফেলে তারা পাড় ভেঙে নেমে যায় চরের দিকে। ওপরে দরদি আকাশ আর নিচে ঝকঝকে বালুর বিছানা তাদের জন্য প্রস্তুত। চানু উলঙ্গ হয়ে লুঙ্গিটা বিছিয়ে দেয় বালুর ওপর। খুশিতে ডগমগ তার আত্মা। আরাম আর আমোদে তার ভেতরটা যেন গলে পড়ছে। চোখ বুজে সুখটা তাড়িয়ে তাড়িয়ে নেবার ফাঁকে মেয়েটাকে প্রশ্ন করে:
—তর বাপ আছে?
এহেন বিজাতীয় প্রশ্নে ছবিলা কেঁপে ওঠে; অবশ্য উত্তর দিতে সময় নেয় না।
না।
চানু ভাবছিল, ‘এর বুঝিন বাপ পলাইছে।’ তাই আবার জিজ্ঞাস করে:
‘বাপের কী হইছে?’
‘মইরা গেছে।’
চানু একটু চমকে উঠলেও চুকচুক করে প্রবোধ দেয়: ‘বাপ তো আর চিরকাল বাঁচে না, একদিন না একদিন মরেই।’
চানুর তখন ফুরিয়ে যাবার সময় ঘনিয়ে এসেছে, তাই মনোযোগ দূরে সরাতে অথবা ছিন্নমূল নিজেকে সান্ত¦না দিতেই যেন সে তার মতো আরেকটি অভাগার সন্ধানে আলাপ দীর্ঘ করে:
তর ভাই নাই।
ছবিলার গলায় তখন বিরক্তির আভাস:
আছে। মুখ চিনা মাইনষের মতন।
চানু তখন ঘা-খাওয়া পরানে ভাবছিল, সবাই তো তার মতো অভাগা নয় যে মা-বাপ-ভাই কেউ থাকবে না। তবে বাপের জায়গাটায় একটু মিল আছে।
হেরা তরে ভাত দেয় না?
না।
না বলার সময় ছবিলার গলা এত করুণ হয়ে ওঠে যে চানু ভাবতে বাধ্য হয়— তাইলে কী মাগিডা অহন কানতাছে? ওর গালে একটা হাত রেখে কিছুক্ষণ দম নিয়ে সে ফের প্রশ্ন ছুড়ে: তর মা নাই? এই প্রশ্নে বুঝি দাঁত কামড়ে রোদন রুখছে, এমনই দমসমে গতর কাঁপিয়ে ছবিলা উত্তর দেয়— হ নাই, মইরা গেছে।
চানু অবাক! তবু মনের কষ্ট চেপে নরম সুরে জিজ্ঞেস করে: কবে?
পরশু দিন, পরশু দিন আমার মা মইরা গেছে। এই কথা বলতে বলতেই ছবিলার বিলাপ বাঁধভাঙা বানের মতো হুঁ হুঁ করে বেরিয়ে আসে।
মেয়েটার ওপর থেকে ছিটকে সরে যায় চানু। সরে যেতে যেতেই গর্জে ওঠে, আইলে ক্যা, তরে ক্যাডায় কইছিন এই কামে আইতে, তুই মানুষ না কুত্তি।
কী করতাম, পেট যে মানে না। আর একলার ঘর খালি খাঁ খাঁ করে, মনে হইল বাইর থাইক্যা একটু ঘুইরা আই, যুদিন চিনাজানা কেউরে পাই তে ধারকর্জ করাম। ছবিলার গলা রোদনে বন্ধ হয়ে আসে।
গতরে লাশের গন্ধ লইয়া চুদা দিতে আইছস, খানকির খানকি।
উলঙ্গ চানু বালুচরের অন্ধকারে লাফাতে লাফাতে, হুংকার দিতে দিতে যখন পাগল-প্রায়, ছবিলার কান্নার রেশ তখন ধীরে ধীরে তার ভেতরটাকে একটু একটু করে গলিয়ে দেয়।
এখন চানু ছবিলার মাথাটা কোলে নিয়ে মানচিত্রময় আকাশের দিকে মুখ তুলে বসে বসে ভাবছে। বুঝি সে এই আবহমান অন্ধকার ও অনাহারের হাত থেকে ছবিলাকে আগলে রাখতে চায়। তার নিজেকে এখন আর আগের মতো একলা, কপাল পোড়া মনে হয় না। মনে হয় না, সে-ই একমাত্র মানুষ, যে কিনা শেকড়-বাকড়হীন শোকতাপের হৃদয়ে রাতের অপেক্ষা করে আর রাত এলে দিনের জন্য ডাকবাংলোর বারান্দায় ওত পেতে পড়ে থাকে।
তাইলে তর আর এই সংসারে কেউ নাই?—চানু কথাটা জিজ্ঞেস করতেই ছবিলার নাকের পাটা ফুলে ওঠে ভেতরে কান্না চেপে রাখার আপ্রাণ চেষ্টায়। তার বড় বড় স্তন দুটো তীক্ষ্ণ চুঁচি উঁচিয়ে আকাশের দিকে স্থির চোখে চেয়ে থাকে। মেদহীন চামড়া ফুঁড়ে পাঁজরের হাড়, নালখাল পেট, মেয়েটার অনাহারের কথা এত করুণভাবে প্রকাশ করছে যে চানু নিজের অজান্তেই শিউরে ওঠে।
চানু হুড়মুড় করে দাঁড়ায়। পাশে পড়ে থাকা শার্টের পকেট থেকে মুঠিভরা নোট ছবিলার হাতে গুঁজে দিয়ে শাসায়—ক্যাডা কইছে হুনি, ক্যাডা কইছে তর কেউ নাই, আমি আছি না। ছবিলার হাত দুটো আঁকড়ে ধরে, বালুতে হাঁটু ডুবিয়ে, কষ্টভরা চোখে চোখ রেখে চানু অপেক্ষা করে অন্য পক্ষের সায় পেতে। তাদের উলঙ্গ গতর আদিম অন্ধকারে মিশে গেলেও দুইজোড়া চক্ষুমণি মানবিক আনন্দে জ্বলতে থাকে। চরের অন্ধকারে নাক-মুখহীন দুটো কালো অবয়ব পরস্পরকে চেপে ধরে বুঝি সমঝে নিচ্ছে নিঃসঙ্গের জ্বালা! তাদের আজন্ম লাঞ্ছিত হৃদয়, বেঁচে থাকার তেতো অভিজ্ঞতায় পোক্ত মন নিয়ে নাঙা দুটি মানুষ এই নির্বাক প্রকৃতিকেই সাক্ষী রেখে যেন সেদিন পরস্পরের নির্ভর হয়ে ওঠে।
পাঁচ
বাঁ কাঁধটা সম্পূর্ণ ছেড়ে, বাঁ দিকে মাথাটা একটু হেলিয়ে পায়ের নখ দেখতে দেখতে চানু হাঁটছে। আনমনে চলতে থাকা মানুষটার নজরে হঠাৎ ধূসর বর্ণের একটা চারপেয়ে জীবের ছায়া নড়ে উঠতেই চানু সচেতন হয়। দেখে হারু পার্টির সেই পান্ডা কুকুরটা তাকে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে। ওর সাথে চোখাচোখি হলো, আর সেটা একতিল সময়ের জন্য মাত্র। এরই মধ্যে চানু কুকুরটার মনের পাঠ নিয়ে ফেলেছে; তাকে দেখামাত্রই ওর চোখের কালো মণি দুটো ঘৃণায় ছেয়ে যাচ্ছে, আর পশুসুলভ মুখটা ধীরে ধীরে তেড়া-বেঁকা করে, গ্রাম্য আঁতেলদের মতো হলদে দাঁতগুলো একটু বের করে সে। তারপর চলার পথটা পরিবর্তন করে ফেলে। তার প্রতি কুকুরটার এই বিরক্তি প্রকাশের ভঙ্গি চানুকে অবাক করে আর কুকুরটা বুদ্ধি দেখে সে অবাক হয়। তারপর কুকুরটাকে উদ্দেশ করে সে জোরে জোরে বলে, লড়াইয়ে যে যুদ্ধা বারবার হারে তার জীবন চোরের মতন। কুকুরটা চানুর দিকে ঘৃণাভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে, বিরক্তিতে নাক চাটে।
রেলস্টেশনের দিক থেকে ভেসে আসছে ট্রেনের হুইসেল, যাত্রীদের হইচই, হকারদের বকবকানি। হারু পার্টির সর্দার কুকুরটা থেকে মনোযোগ সরিয়ে নিজের অজান্তেই চানু হাঁটার গতি বাড়িয়ে দেয়। এক্ষুনি বুঝি ট্রেন তাকে ফেলে চলে যাবে। দক্ষিণের শহরে তার কতই না জরুরি কাজ! এমন একটা তাড়নায় সে হাঁটে। ফের হুইসেল বাজতেই চানুর মনে হলো, ২১২-এর ফিরতি লোকাল তাকে ডাকছে—আয় চানু, আয়; এই শহরে লাশ নাই, এইখানে খালি মানু আর কুত্তা; তারা খালি খায়-ঘুমায়, চুদে আর খালি খালি কাইজ্যা-ফ্যাসাদ করে।
প্ল্যাটফর্মে উপচে পড়া ভিড়। ট্রেনের শরীর বলতে আর কিচ্ছু অবশিষ্ট নাই। দীর্ঘ বন্যার পর গ্রামে ফসল নাই, কাজ নাই। গরিব মানুষরা সব শহরের দিকে ছুটছে। তাই ট্রেনের শরীর বলতে শুঁটকির ডালার ওপর মাছির ঝাঁক। ছুটতে ছুটতেই চানুর মনে হলো, ডাকবাংলোর বারান্দা থেকে ছবিলার গলা ভেসে আসছে; তোমার মায়রে দূর-দূরান্তের শহরে তালাশ করতে যাইতাছ? যাও, আমি কিন্তু অপেক্ষায় আছি।
চানু থমকে দাঁড়ায়। ছবিলা কেন তার মায়ের কথা উঠায়? তাইলে কি সে মাঝেমধ্যে এই হাড়গিলা শহরটা ছেড়ে দূরে পালিয়ে যায় আর নতুন কোনো শহরের পথে পথে, রেলস্টেশনের ভিড়ে কিংবা ছিন্নমূলদের আস্তানায় আস্তানায় বিষণ্ন মনে ঘুরে বেড়ায়, সেটা কি তার মায়ের সন্ধানে? একটা তীব্র হুইসেলে চানুর চিন্তা ছিন্নভিন্ন হলে সে চেয়ে দেখে পেট-পিঠ-মাজাভর্তি মানুষ নিয়ে ট্রেনটা প্রায় ছুটছে। মানুষের শরীরময় তেমনি একটা দরজার হাতল এখনো কয়েক ইঞ্চি খালি আছে দেখে চানু আর দ্বিধা করে না, হাতলটার উজ্জ্বল সাদা বর্ণের ঝিলিকটুকু লক্ষ্য করে সে ঝাঁপ দেয়।
ট্রেনের পা-দানিতে একটা পা আর দু’হাতে হাতল আঁকড়ে ধরে, ভিড়ের মাঝ থেকে মাথাটা বের করে উঁকি দিতেই ধাপুটে বাতাস চানুর মাথার চুল নিয়ে কাড়াকাড়ি শুরু করে। আর এতদিনের চেনা শহরের আবর্জনার স্তূপ, উপচে ওঠা নর্দমা ও ছবিলাদের বস্তি পেছনে ফেলে, সারি সারি চামড়ার গুদামগুলোর অসহ্য গন্ধের গুমোট উতরে ট্রেন এখন রেলেকাটা বেওয়ারিশ লাশের গোরস্তান পার হচ্ছে। গোরস্তানের ছাতিমতলায় লেজ উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে স্টেশান রোডের কুকুরদের সর্দারটা, আর সে ওখান থেকে তীক্ষ্ণ নজরে পরখ করছে ছুটন্ত ট্রেনটাকে। শুধু সে একা নয়, তার পেছনে পুরো দলটাই ট্রেনের দিকে তাকিয়ে চিৎকার পাড়ছে। চানু জানে, এ শুধু বিশাল এই ট্রেনটার পরিচিত কিন্তু ভীতিকর শব্দের জবাবে নিজেদের অস্তিত্ব তুলে ধরার চেষ্টা। সে বুক ভরে বাতাস টেনে বুঝল, লাশটাশ নাই। গোরস্তানের দখল অটুট রাখতে নিয়মিত টহলে এসেছে তারা। সর্দারটা গোরস্তানের চারপাশে ঘুরে ঘুরে, প্রত্যেকটা গাছ, টিবি কিংবা রেললাইনের তারের খুঁটি...সবখানে সে একটু দাঁড়াবে, একটা পা তুলে একটু পেশাব করবে। এভাবে সে তার রাজ্যের সীমানা ঠিক রাখে।
শহরতলির খানাখন্দ, টিনশেড দালান, পচা পাগাড়, আগাছার ঝোপ পেরিয়ে ট্রেন এখন ছুটছে সবুজ মাঠের বুক চিরে। দূরে গাছগাছালির কালচে ছায়ার ভেতর বাড়িঘর, টিনের চালার ঝিলিক, জল-কাদার ছোপছোপ দাগের মধ্যে গম্ভীর আকাশের নীল, পতিত জমি, একটা আঁকাবাঁকা মাটির সড়ক হঠাৎ গ্রামের দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে কোথায় যেন হারিয়ে যেতে চাইছে।
চানুর বুক মোচড় দিয়ে ওঠে, ট্রেনের বেগ ও ঝাঁকুনিতে গতর শিরশির করে আর মন এক আজব আনন্দে কাঁদে। ভাতের থালার এক কোনার এক টুকরো মাছ-মাংসের মতো চানুর বুকে কিছু একটা জেগে থাকে।
এই এক কাণ্ড! যখন হাত খালি হয়ে যায়, মর্গের চালান থাকে না, ভাত আর বাংলা মদের আকালে পড়ে তখন এই থানা শহরের মানুষজন রিকশাতেও চড়তে চায় না। আসলে দেশে অভাব দেখা দিলে ছোট-বড়ো সবার শরীরেই কমবেশি সেই তাপ লাগে। দেশের চৌদ্দ আনাই কয়দিন আগেও ছিল বন্যার পানির নিচে। সব রকম ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। কোনরকম কাজ নাই। তাই অভাবে গ্রামগুলো জ¦লছে। আর শহরগুলো পুড়ছে স্বৈরাচার-বিরোধী আন্দোলনে।
সম্বলহীন-চানু ডানা ভাঙা কৈতরের মতো যতবার আছড়ে পড়েছে, ততবারই সে উড়াল দিতে চেয়েছে দূরে, বহু দূরে কোথাও। যেখানে মানুষ তাকে আড় চোখে দেখেই পাশ কাটায় না। অচেনা শহরের পথে পথে ঘুরে সারাটা দিন পার করবে আর মাঝেমধ্যে আচম্বিতে কোনো ভাতের হোটেলে ঢুকে কাউকে কিছু না বলে ঢকঢক করে কয় গ্লাস পানি খেয়ে—ফের পথের ভিড়ে মিশে যাবে। অচেনা মানুষের নাক-মুখ পরখ করতে করতে রাত গভীর হলে ফুটপাত বা রেলস্টেশনে পড়ে টানা ঘুম দিবে। শুধু অনাহার আর ক্লান্তি যখন শরীরজুড়ে চঙ্গল বসাবে আর ফেলে আসা ডাকবাংলোর বারান্দার আলো-ছায়ার আশ্রয়টুকুর সাথে ছবিলার কাজলা মুখটাও বারবার তার চোখে হানা দিয়ে তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলবে আর তখনই সে ফিরতি ট্রেনের কোনো কামরায় লাফিয়ে উঠবে। আর দ্যাখো কী কুদরত! ফেরার ২/৪ দিনের মাথায় কখনো কখনো তার কপালে জুটেও গেছে মর্গের চালান!
ট্রেন শেষ স্টেশনটায় পৌঁছার পর চানু আবিষ্কার করে, পুরনো জংধরা লোকালের লক্কড়ঝক্কড় কামড়ায় সে একা বসে আছে। বাইরে প্ল্যাটফর্মে হকারের গলা, যাত্রীদের ভিড় আর ট্রেনটাকে টেনে আনা ইঞ্জিনটা হুইসেল বাজিয়ে চলে যাচ্ছে অন্য কোথাও, আর সে যাদের সাথে ঠাসাঠাসি করে এসেছিল, তারাও তো একটু আগে চলে গেছে তাদের ইচ্ছামাফিক। কোনো প্রকার তাড়াহীন পূর্ণ একাকিত্বে চানুর আমোদ লাগে। আসলে তার যেমন কোথাও যাওয়ার নাই, তেমনি আসারও নাই। কেননা, দায় ও ধনশূন্য পুরুষের তামাম দুনিয়াটাই নিজের তালুক বলে সে ‘যেখানে রাইত, সেখানে কাইত’ হিসেবে সবখানে জমিয়ে নিতে পারবে।
জিব উল্টে পড়ে থাকা যাত্রীশূন্য ট্রেনের কামরায় তিনটা টোকাইয়ের খানাতল্লাশির পর উঠে এলো এক ডাকুমার্কা, তার গেঁজেল চোখের করমচা-রাঙা চাহনিতে ভাবখানা এই, ‘পুরান পাগলের ভাত নাই, নয়া পাগলের আমদানি।’ ওর ঝড়তি-পড়তি ওঠানামার ফাঁকে আরেকজন আসে। সে দাঁতের হলদে পাটি দেখিয়ে হাসে। ফ্রক তুলে পাজামার নেওয়ার টেনে বাঁধার ছল করে তার তলপেটের লোভী জমিন দেখায়। তারপর অনেক দিনের চেনা খদ্দেরের মতো চানুর নাকের ডগায় তুড়ি মেরে ‘দশ টাকার মোকদ্দমা’ বলে পাশে বসে। কিন্তু চানুর চোখে চোখ পড়তেই, ‘গেরাইম্যা ভূত’ বলে গাল দিয়ে লাফিয়ে পড়ে নিচে। চানুও নিচে নামল। সারাটা প্ল্যাটফর্ম ঘুরে ঘুরে নতুন জায়গাটার সাথে কুটুম্বিতা পাতিয়ে নিল। তারপর ফাঁকা চত্বরের থানে বসে লোকাল, মেইল ও আন্তনগর ট্রেনের যাত্রীদের ওঠানামা দেখতে শুরু করে। যাত্রীদের উনিশ আনার কাপচোপড়, বোঁচকা-ব্যাগ, পায়ের জুতা, নাক-মুখ, চুল-চামড়া দেখে চানুর খুব খারাপ লাগে। দেশটা ভিত্তে ভিত্তে অত গরিব! এই কথা ভেবে ছিন্নমূল চানুর মনটা কিছুক্ষণের জন্য হলেও অন্যরকম হয়ে যায়।
ছয়
এই বিশাল রাজকীয় স্টেশনে দেশের দূর-দূরান্ত থেকে আসা ট্রেনগুলো থেকে নেমে আসা মানুষের স্রোত, তাদের শরীরের চিলবিলে উল্লাস চানুর বুকে এসে যেন বাঁদরের নাক ঘষার মতো খুঁতখুতানি জুড়ে দিলে সে এক আজব বৈরাগ্যে ডুবে যায়। আর তৃষ্ণাভরা চোখে চেয়ে চেয়ে দেখে, প্রত্যেকের চোখে-মুখে ফুটে উঠছে এক আত্মপরায়ণতা। সবাই নিজেকে নিয়ে চরম ব্যস্ত।
এই বেডা, দ্যাহছ না সাইবে ডাহে’—কাগলাসের দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা শকুনে-চেহারার লোকটার কথায় সংবিত ফিরে চানুর; সে চেয়ে দেখে, এইমাত্র প্ল্যাটফর্মে ঢোকা ট্রেনের ভেতর থেকে একজন যাত্রী জানলা দিয়ে তাকে ইশারায় ডাকছে। তার দোনামোনা ভাব দেখে কাগলাস-মার্কা মানুষটা তার পিঠে খোঁচা দিয়ে ফের উসকায়—‘ভ্যাটকায়া বইয়া রইছস ক্যা, যাছস না ব্যাডা, ভালা পাত্তি পাইবে।
শুঁটকি মাছের বস্তা মাথায় নিয়ে চানু তাজ্জব বনে যায়—চিটাগাং থেকেও এইসব আনতে হয়! ট্রেন থেকে মাল মাথায় নিয়ে নামতে নামতে শুকনো মাছের আবিল গন্ধ চানুকে ছেঁকে ধরে আর মোটা চালের গরম গরম ভাত দিয়ে শুঁটকিভর্তা খাবার লালচে তার মুখগহ্বর লালায় উপচে ওঠে। পাকানো চেহারার লোকটা দশ হাত আগে ভিড়ের ভেতর শকুনের মতো ধারালো চোখে চানুর দিকে চোখ রাখছে। ওদিকে সাহেব মানুষটা দূর থেকে তাকে ইশারায় পথ দেখাচ্ছে।
মাথার ওপর শুঁটকির নোনতা গন্ধ চানুর মনে খাবারের লোভকে চেতিয়ে রাখে। কত দিন ডাকবাংলোর বারান্দার অলস মুহূর্তে পড়শির ডাল বাগারের ছেঁৎ ছেঁৎ শব্দ ও ঝাঁজালো খুসবু তার মনকে কত হাবিজাবি স্বপ্নে আলোড়িত করেছে। কখনো বৃষ্টিভেজা বাতাসের আচমকা ঝাপটে পাশের বাড়ি থেকে ছিটকে আসা সালুনের তেজি ঘ্রাণ চানুর মনে চেপে বসে নাছোড়ের মতো কল্পনার ডালপালা মেলে দিয়েছে। আর আজ এই রুক্ষ নাগরিক সময়ের মধ্যে এসে সেই স্মৃতিরা কেন যে ওভাবে হামলে পড়ে? সে তো খাবার বলতে স্টেশন রোডের পাইস হোটেলের ডাল-রুটি-ভাত এবং ছোট মাছের তরকারি, আর যদি কখনো পকেটের খোলতাই থেকেছে তবে তো গরুর ঝোল-গোশতে রুটি ডুবিয়ে পেটের তাগিদ উশুল করেছে। জেলেদের ঝাঁকাভর্তি যেসব মাছ তাদের রুপালি ঝিলিক দেখিয়ে হাটুরেদের মন কাড়ে, তাদের নাম কি চানু জানে? না কখনো জানার মউকা মিলবে? দুনিয়া ভরা এত সব মাছ-আনাজে কত রকম পদ হয়, আর সেগুলোর স্বাদই বা কেমন, সে কপাল এ জন্মে যে চানুর হবে না, এটা তো জানা কথা। তার বুকের কোণে বিষাদের একরত্তি কালো ছায়া জেগে ওঠে। সেটা কী আক্ষেপ! মুহূর্তের জন্য চোখের তারায় ছলকে ওঠে একটা ঘরের আদল, একজন বসে বঁটিতে মাছ-তরকারি কুটছে; যার রেশমের মতো নরম চুলের গোছার ফাঁক দিয়ে শুধু নীল নাকছাবিটা দেখা যাচ্ছে। তার গোটা স্বপ্নটার মধ্যে ছবিলা নামক রমণীটি কারও ইচ্ছা-অনিচ্ছার তোয়াক্কা না করে হুট করে চেপে বসেছে দেখে চানু যেন খুশিই হয়। সেটা কয় পলকের জন্য আর তার পরই ভেলকির মতো জোড়ায় জোড়ায় পচা লাশগুলো এসে তার আর ছবিলার মাঝে হুড়মুড় করে ছড়িয়ে পড়ে। আর যারা রাতে ছবিলাকে কিনে নেয়! ওদের কী কেরদানি! বেলা ডোবার তর সয় না, ছোঁ মেরে তার সামনে বসা ছবিলাকে নিয়ে উধাও হয়! লাশ আর লুচ্চাগুলো যদি চানুর পথজুড়ে না থাকত?
মালগাড়ির ওয়াগন, সারি সারি রেললাইন, ঝুপরির পিঠে ঝুপরি পেরিয়ে খড়ি ওঠা কাগলাসটা ততক্ষণে এগিয়ে চলেছে। চানু ভাবে, ব্যাটা কী শকুন! এমুন কৈরা চায় যে বুকখান শিরশির করে। কাগলাসের সঙ্গী সিগারেটের ধোঁয়া উড়িয়ে পেছনে পেছনে হাঁটছে, যেন বস্তাটার সাথে ওর কোনো সম্পর্ক নাই। বস্তির চিন-আঁকাবাঁকা গলি পেরিয়ে, ঝিলের ওপরে, বাঁশের খুঁটির মাথায় সারি সারি ঝুপরিঘর। মাঝ বরাবর দীর্ঘ সাঁকো উতরে ওরা যে মাচাং ঘরটায় ঢুকে, তার নিচে শুধু কুটকুটা কালো বিষাক্ত পানি। চানুর ঘাড়-গর্ধনা জমে গেছে। রাগে সে মনে মনে গর্জায়, মাওগার পুতেরা কি সিসি দিয়া শুঁটকি বানাইছে, এমুন পাত্থরের মতন ওজন লাগে ক্যা?
ঘরে ঢুকতে তার সাহসে কুলায় না। বাঁশের মাচার ওপর মোটা লাল গালিচা। দক্ষিণের কোনার দিকে ভারী জাজিমের ওপর মখমলের আসন পাতা। ঘরের আর এক কোনায় ডিভিডি চলছে। টিভির রঙিন পর্দায় খারাপ ছবি চলছে। সোফার বসা আধা ল্যাংটো একজন মেয়েলোক। দেখতে বলিউডের নায়িকার মতো। রেড রামের গ্লাসে ঠোঁট ঠেকিয়ে চানুর মাথার বস্তাটার দিকে হাসির ঝিলিক ছঁড়ে দেয়।
লোক দুটো চানুকে ছোঁ মেরে ভেতরে ঢুকিয়ে দরজাটা আটকে দেয়। ডিভিডি বন্ধ করা হয়। তারপর দুই খাটাশ মিলে হাসতে হাসতে বস্তাটা চানু মাথা থেকে নামায়। একজন অগাধ আমোদে চেঁচায়—‘একে ফরটি সেভেন অহন আর খোয়াব না। শালাগোরে এক ব্রাশে উড়াইয়া দিমু না।
কাগলাসটা চার হাত-পায়ে লাফায়। লাফাতে লাফাতে কথার তুবড়ি ঝাড়ে—‘হালায় জিনিস একখান! বুকটা পাষাণ কৈরা সারাডা পথ হাঁটল, য্যান তার বাপের সম্পত্তি মাথায় বইয়া শ্বশুরবাড়ি যাইতাছে; পাও দুইখান যুদিন একটু ইল-ঢিল হইত। আব্বে হালায়, ওস্তাদরে কই, আমি পইলাই লজরের তাছিড় দেইখ্যা চিনছি, চৌখে-মুখে আগুন ঝরে। ওস্তাদরে কৈতাছি, সোনারে যুদিন এক হপ্তার টেরনিং দেই, তয় হালায় জাদু দেখাইব। বোম্বায়া কাঁচুলিওয়ালী ততক্ষণে রামের গেলাস হাতে সোফা থেকে কাগাবগা পায়ে উঠে এসেছে। ডান হাতে গেলাস ধরে বাঁ হাতের আঙুলে চানুর গোঁফ ছোঁয়, বুকের পাট্টা টিপে বাতাসে তুড়ি মেরে বলে—বিছানায় সিংহের মতো লড়বে।
ওস্তাদ রামের বোতলে হাত লাগায়। চানুর দিকে চোখ নাচিয়ে জিজ্ঞেস করে: চলবে? ওস্তাদের আমন্ত্রণে চানুর হাত আপনা থেকে গেলাস খোঁজে, খালি পেটে ঠাসা এক গ্লাস রাম তার আঁত-নাড়ি জন্মের মতো কামরে ধরে।
ওস্তাদের হাতের পাঁচ আঙুল নায়িকার লাল পিঠে ডুবে যায় আর চানুর পিঠ খালি শিরশির করে। ওস্তাদ চানুর চোখের পুতলিতে নজর গেঁথে মালের পিঠ কচলায় আর দাঁড়াশ সাপের মতো হিসহিস করে চিবিয়ে চিবিয়ে কয়—পারবে না? লাইনের পথঘাট চিনাইয়া দিমু, হাতের টার্গেট সই কৈরা দিমু, মাত্তর পাঁচখান বডি হুতায়া দিবে। এলাকার মানু উঠতে-বইতে সেলাম ঠুকব, সরকারি দল বেহেশতের মেওয়া-মিছরি লইয়া ডাকব, বিরোধী দল আদরের ছোট ভাই কৈয়া পিঠ চাপড়াইব, ওয়ার্ড কমিশনার খালি তর সম্বাদ লইব : কী রে, ভালা আছস তো, কোনো অসুবিধা হইলে আমারে কৈস। কোনো ঝক্কি-ঝামেলা নাই, হেই ওচাত থাইক্যা বড়ো ওস্তাদের নেক নজর তরে আগলাইয়া রাখব। খালি খাও, ঘুমাও আর কাঁড়ি কাঁড়ি ট্যাহার ওপরে বইয়া হাগো-মুতো কর, মাল টানো।
চানুর লাল চোখ নত হলে ওস্তাদ ছেমরির দিকে তাকিয়ে হাসে আর সে সেই ভঙ্গুর মুহূর্তে আমতা আমতা করে জিজ্ঞাস করে—হেরা কেড্যা?
কাগলাসের মতো লোকটা লাফিয়ে ওঠে কী যেন বলতে শুরু করে কিন্তু ওস্তাদের ডান হাত বাতাসে বাও মেরে থামিয়ে দেয়: হেরা কেড্যা? বুঝলা না, হেরা হইলগা আপদ, আমাগো দুশমন; জনগণের শত্রু। চলতে-ফিরতে পথের কাঁটা কেডা না সাফ করে?
চানু নাক টানে, এই বুঝি তাজা লাশের গন্ধে তার বুকটা জুড়িয়ে গেল, দানা-পানিহীন তার খালি পেটটা আগর আর ফিনাইলের গন্ধে ভরে উঠল: আমারে লাশগুলান দিবাইন না। আমি মর্গে চালান লইয়া যাইয়াম।
ঘরে যেন বাজ পড়েছে, এমন বিস্ময়ে ওরা চানুর দিকে তাকিয়ে থাকে। কাগলাসটা তার লাফানো ভুলে গিয়ে তোতলায়—‘হা-লা-র হালা কুলি।
ওস্তাদের ঘোর কাটে না, তাই আস্ত গেলাসটা এক চুমুকে উড়িয়ে দিয়ে চানুকে জিজ্ঞেস করে: লাশ দ্যা কী হইব?
চানুর গলা এবার খুশিতে ভরে ওঠে—ক্যান, মর্গে চালান দিমু।
ওস্তাদের চোখ দপ করে জ্বলে ওঠে। মানুষ চিনতে ভুল করার মতো মূর্খতায় রাগে শরীর কাঁপে। মানিব্যাগ হাতড়ে একটা কড়কড়ে নোট ধরিয়ে দিয়ে নিজেই দরজাটা খুলে আর নিজের রাগ একটু হলেও পুষিয়ে নিতে চানুর পাছায় কষে একটা লাথি মারে—ভাগ হালা তিন কড়ার ডোম।
সাত
প্ল্যাটফর্মের একেবারে উত্তরের দিকের শেষ থামটায় হেলান দিয়ে চানু বসে আছে। এদিকে লোকজন খুব কম। তাই নিজেকে, নিজের ভেতরের মানুষটিকে সে যেন একটু একটু অনুভব করতে পারছে। তার ডান হাতটা এখনো নিজের পাছাটা ঘষে চলেছে বস্তির সেই বিরক্তিকর অভিজ্ঞতাটা ভুলে যেতে। এ কথা সত্যি যে চানু নিজের সাথে নিজেই কথা বলে। যেহেতু তার জীবনপ্রণালি গুটি কতক কর্ম ও কথা দ্বারা চালিত এবং ডাকবাংলোর বারান্দার ঘেরাটোপে আবদ্ধ তাই নিজের চারপাশের প্রাণঘাতী নৈঃশব্দ্যকে তাড়াতেই যেন সে একা একা কথা বলে। এর মধ্যেই সে ঝিমুতে শুরু করে, কিন্তু অক্লান্ত মগজটা তার সমৃদ্ধ স্মৃতির ভান্ডার থেকে বয়ে আনে বিচিত্র সব ঘটনা। এই বিশৃঙ্খল চিন্তার বাঁকবদলের ফাঁকে ফাঁকে সে বিড়বিড় করে।
মাঝরাতের স্টেশন তার চালচিত্র পালটে উত্তুরে হাওয়ার শীতল পরশ ও স্তব্ধতায় জুড়িয়ে গিয়ে নিঝুম পুরী, যদিও শহরের দিক থেকে আসা খুচরো কিছু শব্দ চানুর ঘাড়ের ওপর দিয়ে লাফিয়ে যায়। কিন্তু সেটা তার নিয়তিপাঠের ঝিমানোতে কোনো ব্যাঘাত ঘটায় না। যেমন একটু আগে টহল পুলিশ এসে ডান্ডা দিয়ে গুঁতিয়ে যাদের ঘুম থেকে তুলে দিয়েছিল, প্ল্যাটফর্মের সেই ছিন্নমূল মানুষেরা ডান্ডার জ্বলুনি ভুলে ফের জায়গা মতো এসে নাক ডাকতে শুরু করেছে। এই সময় চানুর চোখের সামনে একটা ছায়া নেচে ওঠে। কিম্ভূত ছায়াটা দ্রুত ঘাড় ঘুরিয়ে চারপাশটা দেখে আর চানুকে আচানক করে দিয়ে ছুটতে থাকে। বুড়োটাকে সে চিনতে পারে। এ তো সেই দাড়িওয়ালা বুড়ো যাকে সে গতকাল থেকে দৃষ্টিহীন নিরীহ ভিখারি হিসেবে সারাক্ষণ ‘এক পৈসা দিলে ভাই গো...’ গানে ডুবে থাকতে দেখেছে আর দেখেছে, ট্রেনের যাত্রীরাও তার টিনের থালায় যথেষ্ট দিতেছে।
স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে ঢাকার শহর জ্বলছে। পুলিশ দুমছে পিটায়, গুলি চালায় তাতে আন্দোলন আরও বাড়ে। ওদিকে সারাটা বর্ষাকাল জোড়ে ছিল বন্যার পর বন্যা! শহরের পথে পথে চোর-বাটপার আর খালি পা, ছেঁড়া-নোংরা কাপড়চোপড়...গ্রাম থেকে উচ্ছেদ হওয়া মানুষের ভিড়। তাই সারাটা প্ল্যাটফর্মে উইপোকার ঢিবির মতো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে ঘরছাড়া মানুষ। তাদের মধ্যে একজনের খেতার ভেতর বুড়োটা ঢুকে যায়। খেতার নিচের শরীরটার হাঁটু দুটি প্ল্যাটফর্মের নীরবতা আর খেতার ভেতরের অন্ধকার জড়িয়ে জেগে ওঠে। চানু দেখে, একটু পরেই খেতা লড়ছে...খেতার ভেতরে জেগে ওঠা হাঁটু লড়ছে। সেই দাড়িওয়ালা কিস্তি টুপি পরা বুড়োর অস্থির ঝাঁকুনির তাড়া খেয়ে থামে হেলান দিয়ে বসা চানু কেঁপে ওঠে। খেতার উত্থান-পতন একসময় থেমে যায়; আর একটু পরেই একটা ওজনধার কয়েন ঝনাৎ করে প্ল্যাটফর্মের মেঝে গড়িয়ে পড়ে। কয়েনের ঝনঝনানিতে চানু যেন ছবিলার জর্দার গন্ধ পায় আর সে হাত বাড়াতেই ছবিলা যেন ‘ইস’ বলে তার গায়ে ঢলে পড়ে।
শতশত মসজিদের মাইক প্রায় এক সাথেই ঘোষণা করে, ‘আল¬াহু আকবার’। ভোরের প্রথম ট্রেন ধরার জন্য যারা প্ল্যাটফর্মে বসে ঝিমোচ্ছিল, তাদের মধ্যে দু-চারজন নামাজি আড়মোড়া ভেঙে ঘুমজড়িত পায়ে মালগাড়ির চিপায় বসে পেশাব করে। একজন গামছা বিছিয়ে ফরজ নামাজ শেষ করে মোনাজাতের দীর্ঘ বয়ানের ভেতর ডুকরায়, নিজের গোনা কসুরের জন্য কাতর মিনতি জানায়, পিতা-মাতার গোরাজাবের আসান চেয়ে হু হু করে রোদন পাড়ে। মানুষটার কান্না চানুর মৃত ওস্তাদের রোদনের সাথে হুবহু মিলে গেলে গোরের অপরিসর স্যাঁতসেঁতে বিছানা, অন্ধকারের গুমোট আচম্বিতে হানা দিয়ে চানুকে তছনছ করে ফেলে। মৃত পিতা-মাতার আত্মার শান্তির জন্য দয়ালের কাছে মানুষটার কাকুতি, কফজড়ানো বিলাপ শুনে তার আক্ষেপ জাগে; নিজের মায়ের মুখ-চোখ-কায়ার কথা ভাবনায় চেপে বসলে সে বসা থেকে উঠে হাঁটা দেয়। তার বুকে দ্রিম দ্রিম ডাক ওঠে, যেন সে সামনের কদমেই তার মাকে দেখতে পাবে, দেখতে পাবে তাকে ফেলে পালিয়ে আসা তার মা হাড্ডিসার ভিক্ষুকনীর মতো প্ল্যাটফর্মের এক কোনায় একটা থালা সামনে নিয়ে বসে বসে আছে আর পথে পথে বেড়ে ওঠা তার সন্তান চানুর হায়াত বৃদ্ধির জন্য খোদার কাছে মিনতি করছে।
হাঁটার মধ্যে চারুর পা কাঁপতে থাকে। সে একটা মুখ খুঁজছে; একজন দুক্কিনী নারীর ভাঙাচোরা জীর্ণ মুখ আর ঠিক সেই মুহূর্তেই বুঝতে পারে, কেন সে বারবার ডাকবাংলোর বারান্দা এবং ছবিলাকে ফেলে পালিয়ে আসে। পালিয়ে বেড়ায় দূর-দূরান্তের বিভিন্ন শহরে। কেন সে অচেনা পথে পথে মানুষ দেখতে দেখতে হাঁটে! এক অপূর্ব দুঃখের চুরচুরে জ্বালায় তার বুকটা মোচড়ায়। এই দিন-দুনিয়ার পথে পথে লক্ষ-কোটি জনতার কাতারে তার নিজের বলে কেউ নাই; এই বিষাদ তাকে এক তিলেকের জন্যও থিতু হতে দেয় না। যে পুরুষ তাকে খালিখালিই পয়দা করে পালিয়ে গেছে, তার কায়াখান দেখার বোকা হাউসে সে মনে মনে বাজান বাজান বলে ডেকে ওঠে। আর যে নারী তাকে বোঝা ভেবে ডাকবাংলোর বারান্দায় ফেলে পালিয়েছে...।
নিয়তিতাড়িত অস্থির-অসহায় চানু এক বিফল আক্রোশের বসা থেকে ছিটকে ওঠে; সারাটা প্ল্যাটফর্মের আগা-মাথা ঘুরে ঘুরে তার হাঁটুর মালাইচাকি ব্যথায় টাটায়। মা-বাবা-ভাই-বোনের একটা পূর্ণ সংসারের কলকলানিতে নিজেকে মিশিয়ে দেওয়ার সকল তদবির বিফল হলে একটা ছায়া ছায়া চিত্রকল্প তার চোখে ভাসে, একটা মরা-ন্যাড়া গাছের আউলা-ঝাউলা ডালের কাটাকুটির নিচে, মাথায় খাঁ খাঁ দুপুর নিয়ে সে একা-অসহায় দাঁড়িয়ে আছে; আর ছবিলাটা ফাজিল মেয়েছেলের মতো দূরবর্তী কোন এক ঘরের ছাঁইচ ধরে তাকে ডাকছে, খালি বিচ্ছিরি ইশারায় ডাকছে। ‘আহারে আমার ছবিল কৈন্যা, ক্যান তুমি গুপ্তি ইশারা করো! ক্যান তুমি গলা ছাইড়া ডাকতারো না, জোর কৈরা হাতের কব্জিখানে টান দিতে পার না?
আট
আমারে কাম না দিলে রড ভৈরা দিমু না, পাঁচ সুতা শিক দ্যায়া গুঁতাইয়া হেই জাগা খাল কৈরা ফালাইমু না। স্টেশনের দক্ষিণ দিকের ওভার ব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে, সবেমাত্র গোঁফের রেখা ওঠা কৈশোর পেরোনো এক উঠতি মস্তান, বয়সে তারচে’ বড়ো একটা মেয়েকে শাসানির ফাঁকে খোলা চাকুর চকচকে ফলা দিয়ে কপালের ওপর নেতিয়ে পড়া চুল সরিয়ে দিচ্ছে। আর বলছে, আমার তল্লাটে চরাট করবি, আকাম-কুকাম কৈরা মাল কামাইবি, কিন্তুক আমারে ভেট দিবি না, ফের বেউয্যা টাইমে আমরাই তোগরে শেল্টার দিমু, এইডা তো হক কথা না। মস্তান চাকুর পিঠের দাঁড়া টেনে খোলে আর লাগায়, তাতে চাকুর ধাতব কিচকিচ শব্দে রোগা মেয়েটার ভয়ার্ত চোখ দুটো চঞ্চল হয়। অসহায় মেয়েটার অপুষ্ট-শীর্ণ একটা হাত ব্লাউজের ভেতর থেকে টেনে টেনে কুড়ি টাকার একটা দলাপাকানো নোট ছেলেটার সামনে তুলে ধরে। অঢেল অনাচারে কিশোরের শরীর থেকে দ্রুত মুছে গেছে সব কোমলতা। হাতের আঙুলগুলো দেখায় চিলের নখের মতো। সে ছোঁ মেরে টাকাটা নিয়ে শোঁকে; টাকার গায়ে স্তনের গন্ধ লেগে আছে, এমন একটা খিস্তি দিয়ে বাঁ হাতে মেয়েটার একটা বুক খামচে ধরে। চারদিকে এখন আলো-আন্ধকারের জড়াজড়ি। নগর এখনও ঘুমন্ত। চানু অবাক হয়ে দেখে—কোন দূর ছায়াচ্ছন্ন গ্রামের নিরন্ন কুটির থেকে ছিটকে আসা এই ইট-রড-স্টেইনলেস স্টিলের জঙ্গলে মেয়েটা আপত-মুক্তির জন্য খাবি খাচ্ছে।
একশো টাকার আনকোরা নোটটা মুঠিতে নিয়ে চানু চুপ মেরে বসে থাকে। কম করে হলেও কুড়িবার সে নোটটাকে সূর্যের মুখে ধরে দেখেছে। বাঘের মাথাটা ছায়া ছায়া দেখা যায়, কিন্তু সেটা বাঘ না কুকুর, তা উদ্ধার করা দুষ্কর আর মাঝখানের সুতার জায়গায় একটা দাগ থাকলেও সেটা আদপেও সুতা নয়। কমলাপুরের হোটেলের মারমুখো লোকগুলো নোটটা ফেরত দিয়ে পুলিশের ডর দেখিয়ে কুঁদিয়েছে, ইচ্ছে মতো বেজাত গালি-গালাজ দিয়ে তাদের গতরের ঝাল মিটিয়েছে।
এখন সে ফিরতি ট্রেনের কামরার এক কোনায় বসে রাতের শহর দেখছে। দেখছে রেলের দু’পাশে বস্তির দীর্ঘ জংলা। এখন ট্রেনে বসে চানুর মনে হচ্ছে, এই শহরটা তার চাচার কাছে শোনা রূপকথার জঙ্গল মনে হয়। মাঝেমধ্যে লাইটপোস্টের আলোর ভিতর লক্ষ লক্ষ পোকা-মাকড়-ফড়িং উড়ছে। ট্রেন গাভিন গাইয়ের মতো হেলে-দুলে ছুটছে। মাইলের পর মাইল বস্তির নিবিড় অরণ্য। হঠাৎ হঠাৎ বস্তির বুক চিড়ে নদীর মতো সড়ক, জলের মতো মানুষের স্রোত। চানুর শরীরটা ঘেন্নায় শিউরে ওঠে। হঠাৎ দু’সারি বস্তির ফাঁক থেকে দ্রিম দ্রিম করে পর পর তিনটা গুলির শব্দ ভেসে আসে। পাশের লোকটা ‘অরে বাপরে’ বলে লাফ দেয়। কোনার দিক থেকে একজন চেঁচায়, ‘নডির পুতাইন।’
চানুর ঘিলুতে শব্দটা বাজের মতো ঝিলকায়। সে নিশ্চিত হয়, অস্ত্রের যে চালানটা পরশু দিন সে পৌঁছে দিয়েছিল, আজ তারা সেটা পরখ করছে।
হাতের থাবায় গুড়ের চাটকি হতে ছিটকে পড়া ঝাঁকের মাছির মতো চানুও ট্রেনের ভিড় ঠেলে প্ল্যাটফর্মে লাফিয়ে পড়ে। হাগা-মুতু-ধুলার সাথে আজন্ম পরিচিত ড্রেনের পচা এবং পরিচিত গন্ধ তাকে চেপে ধরতেই শরীর-মন দুটোই আনন্দে ভরে ওঠে। খুশি লাগে। যেন কত দিন পর সে এই শহরে ফিরে এলো!
খাসির গোশতের সাথে মসুরের পাতলা ডালে ভাত ডুবিয়ে সে রাতের খাবার সারে। অবশিষ্ট ডালটুকু লম্বা চুমুকে শেষ করে পাতেই হাত ধুয়ে বিড়ি ধরায়। একটা মেছিয়ার প্লেটের পানির দিকে চেয়ে চানুর অভব্যতায় কিড়িমিড়ি খায়। হাতের মুঠিতে একশো টাকার জাল নোটটা ছাল-বাল ছাড়া পথুয়া কুকুরের মতো ঘা ঘা করছে। কাউন্টারে দাঁড়িয়ে চানু ধনিয়ার বাটিতে হাত ডোবায় আর টাকাটা চেপে রেখে মেছিয়ারের গলা শোনে। ধনিয়া চিবুতে চিবুতে সে ক্যাশের লোকটার চোখে চোখ রাখে এবং নোটটা বাড়িয়ে দেয়। দলামচা কিন্তু ঝকঝকে তাজা নোটটা একনজর দেখেই ড্রয়ারে ফেলে দিয়ে ক্যাশিয়ার ভাঙতি খোঁজে। ডাল আর খাসির গোশতের ঘন সরুয়ার স্বাদ-গন্ধ এখন চানুর তৃপ্তির ঢেকুরের সাথে উঠে আসবে।
স্টল থেকে বাইরে পা ফেলতেই চানুর চোখ চলে যায় ড্রেনের পাশে ছাইয়ের স্তূপ, কলার খোসা, পানের পিক আর পেশাবের গন্ধের সাথে দেয়ালে দেয়ালে সিনেমার রঙিন পোস্টার। এই শহর আজও কি চানুর মনে মায়া জাগায়? ভালো লাগায়? এ রকম একটা ঘোরের মধ্যেই সে বিড়বিড় করে বলে, ‘অহন যুদিন মর্গের একটা চালান পাইতাম।
চানু অবাক হয়! স্টেশন পাড়ার কুকুরগুলান গেল কই!’ এখন ওদের গড়াগড়ি দেবার কথা, হালকা ঘেউ-ঘেওয়ানির মধ্যে দুষ্টামিতে মজে থাকার কথা; অথচ কী বেউয্যা কাঁথা, ওদের দলের পিচ্চি ল্যাংড়িটাও উধাও! চারপাশে সে আবার নজর চালায়, লম্বা করে শ্বাস টেনে বুকের মধ্যে চেপে রেখে গন্ধগুলো আলাদা আলাদা ভাবে চিনতে চেষ্টা করে। কিন্তু তার নিরীক্ষাময় তালাশে কিছু খোলাসা হওয়ার পরিবর্তে সন্দেহ আরও ঘনিয়ে আসে। ঠিক এই রকম গুমোট মুহূর্তে চামড়ার গুদামগুলোর দিক থেকে একটা বুক কাঁপানো গর্জন ভেসে আসে। চানু কান পেতে নিশ্চিত হয়, স্টেশনপাড়ার সর্দারটাই গজরাচ্ছে। পান্ডাটার একেকটা গর্জনে বাতাসে যেন আগুনের ফুলকি ছড়িয়ে দিচ্ছে। এই মাঝরাতে কুকুরগুলোর রক্ত হিম করে দেওয়া ঘেউ-ঘেওয়ানির কারণ বুঝতে চানুর দেরি হয় না। রেল গোরস্তানটা তো ওই দিকেই। নিশ্চয়ই ওরা নতুন কোনো লাশের তালাশ পেয়েছে!
শ্যামলা রং আর মজবুত গড়নের চানু বয়স্ক রাতের আদিম অন্ধকারে গতর লুকিয়ে রেলপথ ধরে হাঁটছে। তার হাত-পা-পিঠ-পেটের প্রত্যেকটি পেশি, স্নায়ুতে এক আজব প্রস্তুতি। রেলকলোনি, চামড়ার গুদাম, আউটার সিগনালের লাল চোখ পেরিয়ে রেল গোরস্তান। আর সে দিক থেকেই গর্জন আসছে। দ্রুত হাঁটতে থাকা চানু রেলের নুড়িপাথরে উস্টা খেলে খুট করে একটা শব্দ হয়। একটা পাথরের ধাক্কায় আরেকটা গড়িয়ে যায়। কটকট শব্দ হয়। গভীর রাতের নীরবতায় সামান্য এই শব্দ চামড়ার গুদামের নোনা ধরা দেয়ালগুলোতে বাঁধা পেয়ে প্রতিধ্বনি তুলে। আর তার জবাবে কম করে হলেও দশটা কুকুর একসাথে গর্জে ওঠে। কবর ভাঙতে থাকা হিংস্র শিয়াগুলো দাঁতে কটকট আওয়াজ তুলে।
চানুর নাক টানতে হয় না, এদিকের বাতাস পচা লাশের তেজি গন্ধে ভারী। কুকুর দলের পান্ডাটা দক্ষিণের সীমানা ডিঙিয়ে রেলপথের সমান্তরালে জোড়-লাফে উড়ে আসছে। জমাট অন্ধকারে তার ক্রোধান্ধ চোখজোড়া উড়ন্ত উল্কার মতো ঝিলিক দেয়। চানু থমকে দাঁড়ায়। হিংস্র জীবটার টর্চের মতো চোখ দুটো দেখে তার মাথার চুল শিরশির করে খাড়া হয়ে যাচ্ছে। জীবনের সবরকম পরিস্থিতি সে ঠান্ডা মাথায় মোকাবিলা করতে শিখেছে। এটাই বুড়োর শিক্ষা।
চানু একটা বিড়ি ধরায়। তারপর জ্বলন্ত কাঠিটা হাতে নিয়ে উঁচু করে ধরে। অন্ধকারে এক জোড়া জ্বলন্ত চোখ এগিয়ে আসছে। চানু সর্দারটার জন্য অপেক্ষা করে। সে আসছে। চোখে লোভ আর ঘৃণার দাউ দাউ আগুন! ছুটন্ত জীবটার পায়ের শব্দ কাছাকাছি আসতেই চানু আবার নতুন করে একটা কাঠি দেয়াশলাইয়ের বাক্সের জোরছে ঠুকে। ম্যাচের কাঠির বারুদটুকু ফস করে ঝলসে উঠলে উন্মত্ত সর্দার খাটো একটা গর্জন দিয়ে দাঁড়ায়। তারপর চানুর দিকে ঘৃণার চোখে তাকিয়ে থাকে। আর এক তিল পরেই চানুর নিরুত্তাপ মূর্তির দিকে ‘ঘেউ ঘেউ’ করে একটা তাচ্ছিল্য ছুড়ে দিয়ে প্রাণীটা নিমেষে অন্ধকারে মিলিয়ে যায়।
চানুর ঘোর কাটতে না কাটতেই গোরস্তানের চারপাশ থেকে ভেসে আসে কুকুরদের হিংস্র গর্জন। কুকুরগুলোর এরকম উত্তেজনা আর যুদ্ধ-প্রস্তুতির কারণ এতক্ষণে তার কাছে খোলাসা হয়। এখন সে কল্পনা করতে পারছে, ওরা সারাটা গোরস্তানকে ত্রিভুজ আকৃতিতে ঘিরে বসে আছে। তারা মানুষের মাংস-খেকো এই শিয়ালগুলোর মুখোমুখি হতে চায় না। তাই সকালের আশায় বসে আছে। আর সর্দারটা এই ব্যবস্থার তদারকিতে ক্লান্তিহীন টহল মারছে। যেখানে শিয়ালগুলো কবরটা ভাঙছে, তার ঠিক বিপরীতে চানু রেলের সিলপাটে বসে আরেকটা বিড়ি ধরায়। শেয়ালগুলো ভোর পর্যন্ত খাবে। থাকবে শুধু কঙ্কালটা। দিনের বেলায় ক’খানা হাড় আর মাথার খুলি নিয়ে কুকুরগুলো নিজেরা নিজেরা মারামারি করবে, রক্তাক্ত হবে।
প্রেতের মতো একটা কুৎসিত ছায়া খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে এদিকেই আসছে। চানু অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে। কত জাত-বেজাতের মানুষ এই গোরস্তানে দাফন-কাফনহীন শুয়ে আছে আর এই কবরখানা ঘিরে চারপাশের বাড়িগুলোর মানুষের মুখে মুখে কত বিচিত্র কাহিনি! এসব রটনা থেকে চানু নিজেও কি পুরোপুরি মুক্ত?
সর্বাঙ্গে অন্ধকার জড়িয়ে রেলপথ ধরে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে আসা ত্রাসময় ছায়াটি এবার চানু চিনতে পারে। তার তরুণ চোখজোড়ায় উৎসাহের বাতি জ্বালিয়ে ছুটে আসা ল্যাংড়ি কুকুরিটা চানুকে দেখে বেশ স্বস্তিতে রেলের সিলপাটের ওপর কাত হয়ে শুয়ে পড়ে। এসময় চামড়ার গুদামের দিক থেকে আসা একটা উত্তেজিত ডাকের জবাবে সে আমোদে গলায় ‘ঘেউ’ বলে একটা ছোট্ট সাড়া দেয়। তার সে সংক্ষিপ্ত উত্তরের জবাবে অনেকগুলো শিয়ালের কর্কশ গলা একসাথে গর্জে ওঠে আর তাদের চোখের দাউ দাউ দৃষ্টি গোরস্তানের থিকথিকে অন্ধকারকে যেন ঝলসে দেয়। দানবীয় সেই গর্জন ও দৃষ্টির ঝলকানিতে ল্যাংড়ির ছোট্ট শরীরটা কুঁকড়ে যায়।
একটু পরেই সেই কুকুরটা ছুটে এসে ল্যাংড়ির সামনে দাঁড়ায়। সে মুখে করে প্রেমিকার জন্য নিয়ে এসেছে টুকরো কাঁচা চামড়া।
সঙ্গীটি এসেই অভিবাদন হিসেবে ল্যাংড়ির গালে একটা আলতো থাবা বসায়, নাকে নাক ঠেকিয়ে গড়িয়ে পড়ে; তাদের জোড়া শরীর আলগোছে উঠে দাঁড়াবার ফাঁকে ল্যাংড়ি প্রেমিকের কালো চিকচিকে অন্ডকোষে থুতনি দিয়ে গুঁতো মারে। কুকুরটাও ¯িপ্রংয়ের মতো ঘুরে ল্যাংড়ির ছোট্ট শরীরটা সামনের দু’পায়ে বাগিয়ে নিতে গেলে ল্যাংড়ি খপ করে চামড়ার টুকরোটা কামড়ে ধরে। চামড়ার টুকরোটা নিয়ে ওরা মুখোমুখি যুঝে আর প্রতিটা টানের ভর সইতে তারা মাটিতে একটা করে গড়ান দেয়, আবার ওঠে দাঁড়িয়ে দড়ি টানার মতো পেছনের পায়ে ভর রেখে, সামনের দু’পায়ে খুড়ি ধরে... চামড়ার টুকরোটা মাঝখানে ছিঁড়ে দুজন দু’দিকে ছিটকে পড়ার আগ পর্যন্ত তাদের খেলাটা চলবে।
চানু গোরস্তান সামনে নিয়ে রেলপথের অন্ধকারে বসে থাকে। তার মাথার ওপর তারা ভরা আকাশ আর পাশে গেঁয়ো শহরে একশ ওয়াট এর মিটিমিটি আলো। শেষ চৈত্রের এই থেমে থেমে বয়ে চলা দমকা হাওয়া, নক্ষত্র থেকে ছিটকে আসা ক্ষীণ-ভঙ্গুর আলো, রেলপথ থেকে বাঁক নিয়ে ফসলের মাঠ চিড়ে দূর গ্রামের দিকে হারিয়ে যাওয়া ওই মেঠোপথ আর সবার ওপর চেপে বসা অন্ধকার; এইসব কিছুকে ছাড়িয়ে কোন দূর বৃক্ষ থেকে একটানা ভেসে আসছে একটা পাখির কাতরানি। এই বসন্তের মাঝরাতেও বিরহী কোকিলার ডাক অনুবাদ করার ব্যর্থ চেষ্টা চানুর কাছে তার নিজের অসহায়ত্বকে আরও বেশি জটিল করে। আর সে জন্যই তার বুকে একটা অসহায় আক্ষেপ বারবার গুমরে উঠছে: ‘আমি কী কৈরা একলা একলা লাশটা ঠেয়াই, আর কেমনেই বা রাক্ষসগুলানরে ঠেক দেই’—নিজেকে অপরাধী ঠাওরায় চানু। দূর থেকে ভেসে আসা পাখির কণ্ঠ যেন ‘আমার ভাই, আমার ভাই’ বলে ডাকছে।
লাশ কি গোরে নামবে, না শিয়ালগুলো সাবাড় দেবে? ওস্তাদদের গুপ্তি অস্ত্রের চালান, নকল টাকা—এসব প্রশ্নের ধকলে তার হাঁফ ধরে গেলে চানু লাফিয়ে ওঠে আর এতক্ষণ ধরে যে পাথরটা হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করছিল, সেটা ধা করে ছুড়ে মারে। ভাবটা এমন যে, মগজ থেকে সব ঝামেলা সে ঝেঁটিয়ে দিচ্ছে এমনই হালকা শরীরে সামনে পা বাড়ায়। ছুড়ে মারা পাথরের সাথে রেলের লোহার প্রচন্ড ঠোক্করে যে বিকট শব্দ হয়, চিড়িক করে আগুনের ফুলকি ওঠে, তাতে টহলরত কুকুরগুলো থমকে যায়, লাশ খাওয়া শিয়ালগুলো মুখে মানুষের মাংস নিয়ে মাথা তোলে আর নিরিবিলি রাতের অন্ধকার ফুঁড়ে চানু হঠাৎ দৌড় দেয়। তার মন বলে, যেন ডাকবাংলা যাবার এই দূরত্বটুকু উতরে গেলেই বাঁচোয়া!
চামড়ার গুদাম। চানুর পায়ের নিচে নুনে খেয়ে ফেলা পাথুরে মাটি, চারপাশে বিষাক্ত-ভারী বাতাস, দু’দিকে চুন-প্লাস্টার খসে পড়া জীর্ণ দেয়ালের বড়ো বড়ো গুদামঘর। গ্রিল দেওয়া বারান্দাগুলোতে সারি সারি চামড়ার স্তূপ থেকে চুঁইয়ে পড়া রক্ত-লবণের ছোট্ট একটা পাগাড়। তারপর ডাকবাংলো যাবার রোডে উঠে চানু হঠাৎ পিছন ফিরে তাকায়; আতঙ্কে তার খাড়া নাকটা কাঁপছে, ভাসা ভাসা ভয়ার্ত চোখ দুটো একটা করুণ আর্তিতে ছিটকে বেরিয়ে আসতে চাইছে! সাথের কেউ যেন পিছিয়ে পড়েছে, যেন তার ফর্জন্দের ভাইকে রাক্ষসদের হাতে ফেলে, স্বার্থপরের মতো পালিয়ে এসেছে এমনি একটা কষ্ট তাকে চেপে ধরলে মাথাটা আপনা থেকে নুয়ে পড়ে।
একটু দূরে ডাকবাংলো পিয়নের ঘরের টিনের বেড়ার ছেদা দিয়ে আলোর তির্যক রেখার সাথে ভেসে আসে পিয়নের গলা। কথাবার্তায় কর্তা কর্তা ভাব: মশারিডা টাঙ্গায়া দিলা না। চানুর এলোমেলো-উদাসী শরীর-মন মুহূর্তে সতর্ক হয়ে ওঠে। সে যেন দিব্যি চোখে দেখছে, পিয়নটা বালিশে ঘাড় ফেলে চিত হয়ে বিড়ি টানছে। চিকন গলার মেয়েলি সুর শোনার জন্য চানু কান খাড়া করে রাখে। একটু পরেই কোকিলার আলাপের মতো শোনা যায়, ‘ছ্যাড়ায় বুকের দুধ খাইতাছে, তুমি এট্টু কষ্ট কৈরা...। চানুর শরীরটা মুহূর্তে কেঁপে ওঠে। একটা অনাস্বাদিত জীবনের ছবি পলকের জন্য তার ভাসা ভাসা দু’চোখের মণিতে ঝিলিক দিয়ে মিলিয়ে যায়। বুকটা হুঁ হুঁ করে মোচড়ায়। মনের চোখে সে দেখে, তুলতুলা নরম গতরের ছেলেটা শ্যাওলা রঙের একজোড়া ফোলা ফোলা বুকের একটাতে কচি হাতের পাঁচটা আঙুল রেখে আরেকটাতে মুখ গুঁজে দুধ খাচ্ছে।
নয়
ছবিলা এসে চানুর শিথানে বসে। চারপাশ থেকে তেড়ে আসা অন্ধকারে বারান্দাটা বারবার ডুবে যেতে চাইছে কিন্তু রাস্তার আলোর আভাস সেই থিকথিকে অন্ধকারকে যেন দু’হাতে ঠেকিয়ে রাখে। তাতেই বারান্দার চিলতে ভূমিটুকু হয়ে উঠতে চাইছে কমবয়সি প্রেমিকের মতো ভাবপ্রবণ। ছবিলা এক মনে চানুকে দেখে। মানুষটার খোলা ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে দাঁতের পাটি ঝিলিক মারছে। তার চওড়া কপালের নিচে আত্মমগ্ন জোড়া ভুরু আর চিবুকের পাশে বিষাদের করুণ ছাপছোপ মুহূর্তে মনে করিয়ে দেয় চানুর শেকড়-বাকড়হীন, নিস্বঃ-নিঃসঙ্গ জীবন-কথা।
ছবিলা চেয়ে দেখে চানুর গালে একটা মশা বসে রক্ত চুষে চুষে ঢোল হয়ে গেছে। মশাটাকে টিপে গলিয়ে দেবার জন্য তার হাতের আঙুলগুলো তুরতুরায়, কিন্তু সে তা না করে মশাটার রক্ত-টইটম্বুর পেটের দিকে অপলক চোখে তাকিয়ে থাকে। সেটা শুধু এক দলা অন্ধকার।
নিজের অজান্তে ছবিলার একটা হাত চানুর খোলা বুকের ওপর চলে যায়, কমবয়সি সব তরুণের মতোই মানুষটার স্পর্শকাতর শরীর তাতে একটু কেঁপে ওঠে ফের মৌপোকার গুঞ্জনের মতো নাক ডাকতে শুরু করে। চানুর বুক থেকে ছবিলা হাত সরায় না। মানুষটার বুকের ভেতর ঘড়ির মতো টিপটিপ গতিতে জীবনটা চলছে। আর তাতেই উৎসাহী হয়ে ছবিলা ভাবতে শুরু করে: এই মানুষটার বুকের ওম ওম গুঞ্জনে সে কি নাই? তার স্বপ্ন, শরীর কি এই তরুণ পুরুষের হৃদয়ে একটুও স্থান করে নিতে পারেনি? বহমান এই পৃথিবীর জটিল আবর্তনে প্রত্যেক মানুষই যেমন অন্যের মাঝে নিজের অস্তিত্বের প্রতিফলন চায়, ছবিলাও বুঝি সেটাই চানুর মাঝে খুঁজে?
ছবিলা ভাবে, সে আর চানু, তারা তো বিপরীত জগতের বাসিন্দা! জীবনের টানে শুধু চলতি পথে একে অন্যের সাথে জড়িয়ে গেছে। তবু তারা চাইলেও কোনো দিন দুধ-ভাত হয়ে একে অন্যের ঠিকানা হতে পারবে না, সংসার করতে পারবে না। ছবিলার কালো চকচকে চোখ দুটো দিয়ে নোনা জল গড়ায়। চানুর বুক থেকে হাতটা আলগোছে ফিরে আসে আর সে বারান্দার একটা খুঁটিতে হেলান দিয়ে পাথরের মতো বসে থাকে।
একটু পরেই চানু ঘুম থেকে ধড়ফড়িয়ে উঠে বসে। পাশেই ছবিলাকে বসে থাকতে দেখে অবাক হয়। ছবিলার চোখ-মুখ বিষাদ-গম্ভীর! আবছা অন্ধকারেও চানু সব টের পায়। তারপর নিজের চারপাশ সম্পর্কে সচেতন হয়ে বলে, বড় খারাপ স্বপ্নে পড়ছিলাম। ছবিলা চানুর কথায় সাড়া না দিয়ে হাই তোলে, হাতের চেটো দিয়ে পান-জর্দার গন্ধ মাখা বাতাস তাড়ায়। ছবিলার নিশ্বাসের মিঠা ঘ্রাণে চানু সব কিছু ঝেড়ে ফেলেতে চায়।
বারান্দার রোগা অন্ধকারে গতর ডুবিয়ে ছবিলা ধীরে ধীরে বয়ান করে, কলেজের হোস্টেলে গেছলাম, পোলাগুলান খালি তিড়িং-বিড়িং করতাছে; কালকোয়া নাকি ঢাকা থিকা হেগোর সরকারের বড়ো লিডার আইব, মস্তবড় মিটিং আছে। এক দল চাইতাছে মিটিং খুব জমাইতে, আরেক দল ভাঙতে; এই লইয়া সব কয়ডা পোলা বারুদের লাহান জ্বলতাছে। কাঁচা বয়সের ঝকঝকা পোলাগুলানের মুখের দিকে চাইলে ক্যামুন যে লাগে...।
একটা আজব আবেগে ছবিলার নারীহৃদয় দুলে ওঠে। তার আবিল জীবনের খুব গোপনে লুকিয়ে থাকা মা-মনটা যেন এই দুর্লভ মুহূর্তে হুড়মুড় করে জেগে বসে আর তার জীবন-যাপনের বিপরীত-চেতনায় সে যেন চানুর কাছে ধরা পড়ে যায়, এমনি শরমে তার দুই কান গরম হয়ে উঠলে সে দ্রুত বলে, হোস্টেলের যে হালত, মনে কয় রাইত কাবার হইবার আগেই লাশ পড়ব।
বিষণ্ন মনে ছবিলা বারান্দা থেকে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। তার বুকটা যেন আজ দু’ভাগ হয়ে গেছে; এক ভাগে চানু তার সমস্ত অস্তিত্ব নিয়ে বাহাদুরের মতো বসে বসে পা নাচাচ্ছে আর অন্য ভাগটা ফাঁকা পড়ে আছে। ধু-ধু ফাঁকা সেই প্রান্তরজুড়ে যেন তার মাতৃরূপী নারী আত্মা হাহাকার করছে।
চানু ছবিলার একটা ঊরুতে বাঁ হাতটা রেখে সামনের অন্ধকার ভরা জংলি পেঁয়াজের ঝোপটার দিকে তাকিয়ে থাকে। মনে পড়ছে বুড়োর মুখ। পরক্ষণেই ঢেউয়ের মতো লাফিয়ে চলে আসছে একজন দুঃখী-শীর্ণ ভিক্ষুনীর ভাঙাচোরা মুখ। চানুর ভেতরটা কেঁপে ওঠে, ‘ক্যাডা, ক্যাডা এই জননী!
দুটি নর-নারীর আত্ম-আবর্তনের এই নিবিড় মুহূর্তে পাশের পিচপথ দিয়ে একদল তরুণ কর্কশ গলায়, ‘ধর ধর’ বলে কিছু তরুণকে তাড়া করে। তাদের সেই হিংস্র-কপট চিৎকারে রাতের পবিত্র শান্তি চৌচির হয়। মানুষের গলায় শ্বাপদের অন্ধ ক্রোধ-ঘৃণার সেই হুঙ্কার শুনে চানু হকচকিয়ে ওঠে। কী এক কষ্টে তার হৃদয় কাতরায়। সে ছবিলার একটা হাত খাবলে ধরে ঘোরগ্রস্তের মতো বিড়বিড় করে বলে, আমি আর লাশ চাই না। তবু তাদের দুজনকে চমকে দিয়ে পর পর দুটো গুলির শব্দ হয়। তরুণ কণ্ঠের একটা আর্ত-চিৎকারে গোটা শহরে পিন-পতন নীরবতা আর ভয় নেমে আসে।








