ঈদ সংখ্যা ২০২৬

জনান্তিক

শরণ এহসান
৩০ মার্চ ২০২৬, ১৮:১৩আপডেট : ৩০ মার্চ ২০২৬, ১৮:১৩

প্রস্তাবনা

এই সামন্ত নগরীতে বিস্তৃত কোলাহলের মাঠ পেছনে ফেলে নেমে আসে প্রাচীনগন্ধী কোনও সন্ধ্যা। আকাশভর্তি চৈত্রের বিকেলে থরে থরে সাজানো মেঘ বিছায়েছে আঁধারের চাদর, ক্রমশ নরম হাতের প্রলেপনে ঢেকে দেয় সে গোটা শহরকে। পূর্ণরূপ রোদে ডুবে-আচ্ছন্ন বিকেল গড়াতেই আকাশজুড়ে ভেসে ওঠে নাগরিকতার অট্টহাসি। আমাদের চারপাশে ঘৃণ্যতম বিষাদ-কীট তরঙ্গ বুনে বুনে জালে-জঞ্জালে আবদ্ধ স্থির করে রাখে। আদতে হারায়েছে পথ সেই শপথের দিনগুলোতেই, চাতকের প্রাণ তবু খুঁজে যাচ্ছে বিহ্বল জল, হারিয়েছে প্রাণ ভরেছে চোখ। এই এখানে আমরা যারা এসেছিলাম মধুমিত ক্রান্তির খোঁজ তবু পাইনি কেউ। সেই ক্লান্তি প্রশমিত সবুজের আচ্ছাদন বিস্তীর্ণ জলাভূমি আর দূরে দিগন্তের অবারিত হাতছানি। এসব এখন ছাইদানি ভাঙা মরা আগুনের মতো টল্কে পড়া ভস্ম। একাকী বন্দি জীবনে কোনো এক যুবক, যে যুবক পেরিয়েছে শপথের দিন, যাপনের কাল তাঁর কেটেছে নির্জীব। সেই যুবকের কোমল হৃদয়খানি বারবার উত্তর খোঁজে এই ঐন্দ্রজালিক ঘোরের। যাপিত জীবনজুড়ে কলুষতার অবাধ্য আসা-যাওয়া, কে আছে পাপে কে আছে তাপে আর কে আছে শাপে অথবা কার হৃদয়জুড়ে পঙ্কিলতার অবাধ বিচরণ। কার দোষ কার কাঁধে তুলে দেয় পৃথিবী, কার ভুলে কে যেন বন্দি দশাকে করে আলিঙ্গন।

আলিঙ্গনের ভ্রমে ক্রমশ বিস্তারলোভী বাসনা মানুষকে নিয়ে গেছে সভ্যতার এমন এক প্রান্তে, যেখানে শেষ আর শুরু কেবলমাত্র স্ফুটিত দুটি পত্রপুট। ওই একটু দূরে দেখা যায় গন্ধম গাছ অথবা তার আড়ালে পাওয়া যায় বিবি হাওয়ার একেলা জলকেলির শব্দ।

হ্যাঁ, সেই দূরাগত শব্দপিণ্ড ধেয়ে ধেয়ে আসে ক্রমশ ধেয়ে আসে তপ্ত মরুঝড় সাইমুম, ধেয়ে আসে লেবাননে কোমল শিশুর চিৎকার, ধেয়ে আসে কিয়েভের ভাঙা ঘরের ধ্বংসস্তূপ থেকে এক বালিকা বধূর কান্না, এদিকে এদিকেই। অথচ এসব দৃশ্য শ্রবণ ভঙ্গিমায় আপনাদের মননে প্রবেশ করলেও দৃশ্যের বিপরীতে দাঁড়িয়ে থাকে অন্য কোন পট

- আপনারা দেখছেন বার্লিনের রাস্তায় মদ্যপ পড়ে আছে এক অষ্টাদশী যুবতী;

- আপনারা দেখছেন ফিলিস্তিনি যুবকের বাহুডোরে আটকে পড়া ইসরায়েলি প্রেমিকার উদ্দাম চুম্বন দৃশ্য;

- আপনারা দেখছেন সুধাংশু চলে যায় জীবন হাতের মুঠোয় ধরে কাঁটাতার পেরিয়ে।

- দস্যু জাহাজি ঘর ভেঙে তুলে নিয়ে যাচ্ছে আপনার গৃহলক্ষ্মীকে। পেছনে পড়ে আছে তার ভাঙা লাঠি, উঠান পেরোনো ছেড়া পাদুকা আর জবুথবু খাতাপত্র-দফতরের ফিরিস্তি।

- আপনারা দেখছেন ভেঙে পড়ছে যুদ্ধজাহাজ, স্কুল বালিকার রক্তাক্ত শরীর ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে আছে। ভেঙে পড়ছে ছাদের কার্নিশ আর অষ্টাদশীর মন।

- আপনারা এও দেখছেন, চারদিকে শুধু ইনসাফ ইনসাফ ইনসাফ। অথচ মানুষ মরছে দেদার, আগুনে পুড়ছে দীপু দাস আর একমুঠো ভাতের আশায় জীবন বিকিয়ে দিলো তোফাজ্জেল।

- আর আপনারা যা দেখতে পাচ্ছেন না পৃথিবীর আদিমতম ক্ষোভ জমে জমে ফুলে ফেঁপে উঠেছে অজান্তে, কখন জনারণ্যে আঘাতে আঘাতে খণ্ডবিখণ্ড করে ফেলবে, টুকরো টুকরো করে ফেলবে নিঃশব্দে নীরবে, যেমন বয়ে চলেছে ধেয়ে চলেছে ভোলগা কী গঙ্গা-মিসিসিপি অন্তরে কত উত্তাল ঢেউয়ের আঘাত সয়ে।

হ্যাঁ, সেই বিস্ফারিত ক্ষোভের আলোকছটা কিছুটা কিছুটা গোপনে আজ এসে পৌঁছেছে এই এইতো আপনাদের সম্মুখে। ক্ষোভের সেই আদিমতম আলোক কণা নিভে যাবার আগেই আজ এখানে এই আপনাদের ওপর বর্ষিত হোক রসুলের আশিস, চার্চের ঘণ্টাধ্বনি বেজে ওঠার আগেই যীশুর বরপুত্রে ধন্য হোক আপনাদের জীবন, কৃষ্ণের মোহনবাঁশিতে মোহাবিষ্ট হোক রাঁধা মন।

সুধীসমাজ ও আসরজনা, হে উৎসুক জনতা, সেই আদি বিস্ফোরণের আলোকচ্ছটা এই আপনাদের সমুখে মঞ্চে প্রক্ষেপ করলে স্পষ্ট হবে ঘটনাসকল, স্পষ্ট হবে মাতৃজঠরে ব্যথার দাগ, সুজলা-সুফলা পৃথিবীর তীক্ষ্ণ খরার মরুকষ্ট।

অনুমতি করুন হে উৎসুক জনতা-

এই সুর

এ যে এক সুর,

ক্লান্তি জড়ানো, ব্যথায় মোড়ানো দুপুর।

কাদের উঠোনে মাথা নত আর

কাদের দেরাজে জ্যোৎস্না সুচতুর?

ভিড়

মানুষের ভিড়,

শুধু অযাচিত মানুষের ভিড়।

নীড়

নেই কোথাও নীড়,

নেই সহস্র মানুষের মাথা গোঁজা একটুকু নীড়।

 

প্রথম স্বর্গ:

একলা আজব সময় গলায় ঘণ্টি বেঁধে চারপাশে ঘোরাঘুরি করে প্রায়শ আদিগন্ত নগ্ন অনুভূতির জগৎ চোখের অবয়বে তাকিয়ে চোখ রাঙায় সময়কে। স্নেহময় অবরোধ পথ আটকে দিলে ভিড় করে নীরবতা। আর সেখানেই সে হিংস্রতায় হৃষ্টপুষ্ট মগজ ছিন্নভিন্ন করে দিয়ে উষ্ম নিশ্বাস ছাড়ে বারবার।

- তোমরা আমাকে মেরেছ।

- কে? কে কথা বলে?

কেউ বলে ওঠে অস্ফুট স্বরে, তার গলার ভাঁজে ভাঁজে ক্রুব্ধতার তীক্ষ্ণ থেকে তীক্ষ্ণতর ফালি। সময়ের সাথে সে শব্দ কম্পমান বাতাসে ক্রমশ মিলিয়ে গেলে যাকে শোনার ভুল বলে চালিয়ে দেওয়া যেতে পারে। শোনার ভুল- বলার ভুল- দেখার ভুল। ভুল যা কিছু ছেড়ে এসেছ পথের বাঁকে বাঁকে, মনে রেখো, মুছে যায়নি তার চিহ্নপট। অনুতাপে বিরাগে কুণ্ডলী পাকিয়ে বুকের মাঝে বিঁধে আছে যদিও তবু এখন শুধু প্রায়শ্চিত্তের পালা।

- তোমাকেই করতে হবে এর প্রায়শ্চিত্ত।

- কে করবে প্রায়শ্চিত্ত? আমি? না না- আমি পারবো না। অপরাধ কী আমার।

আরাম কেদারা থেকে যুবকটি তড়পাতে তড়পাতে উঠে দাঁড়ায়। কী ভুল করেছে সে, তাকে কেন নিয়তির সাজা বইতে হবে?

জানালার ওপাশে দমকা হাওয়ার জোরে হঠাৎ পর্দা দুলে ওঠে। কেদারাটি কাঁপছে থরথর, জানালার কার্নিশ ঘেঁষে এসে দাঁড়ায় যুবকটি। বাইরে ভীষণ সুনসান, কেউ নেই এ ধারে ও ধারে কোন ধারে রাস্তাঘাট ফাঁকা। সারা পৃথিবীজুড়ে বদ্ধ বদ্ধ খুপরি ঘরে আটকে থেকে কী করুণ পাপের প্রায়শ্চিত্ত করছে সকলে!

এমন সময় পূর্ব অনুমতির কোন অবলেশ না রেখে ঘরের দরজায় টোকা দেয় বয়সের ভারে ন্যুব্জ কেয়ারটেকার।

- স্যার, আসতে পারি?

- এসো এসো।

- আপনার ফরমায়েশি জিনিসগুলো এনেছিলাম।

- বেশ! হুইস্কির বোতলটা টেবিলে রাখো। আর এক বোতল মিনারেল ওয়াটার দিয়ে যেও। পত্রিকাটা আমার হাতে দাও।

- এই যে নিন। টেবিলে খাবার রাখা আছে, ক্ষুধা লাগলে খেয়ে নেবেন।

- আচ্ছা। তুমি এখন আসতে পারো।

গত দুই সপ্তাহ যাবৎ একই রুটিনে যাচ্ছে জীবন। আদতে বদ্ধ ঘরে ছাইপাঁশ গিলে সময় পার করাটাকে কি জীবন বলে নাকি? যান্ত্রিকতাকে একবার ভালোবেসে ফেললে আর কি নিস্তার আছে এর থেকে? ফস করে গাড়ির হার্ড ব্রেক চেপে ধরলে কী হবে একবার ভাবুন? একটু ধীরস্থ হোন, ভেবে দেখুন, পারবেন নিজেকে সামলে নিতে?

যুবকটি নিজেকে মৌনতার প্রাচীরে আটকে টেবিলের পাশে গিয়ে দাঁড়ায়- বরফ সহযোগে গ্লাসে হুইস্কি ঢালে। চুমুক দিয়ে গ্লাস ফাঁকা করে আরাম কেদারায় শুয়ে পড়ে। পেছনে রেকর্ডারে বাজছে পিট সিগার অথবা এই সকল মৌনতার ঝংকার-

Where have all the flowers gone?

Long time passing.

Where have all the flowers gone?

Long time ago.

The girls have picked them every one.

Oh, when will you ever learn?

 

দ্বিতীয় স্বর্গ:

- শুনতে পাচ্ছেন?

কেউ কি ডাকলো? আধেক ঘুমের মাঝেই যুবকটি চোখ বন্ধ করে কান সজাগ রাখে।

- তোমরা আমাকে মেরেছ।

চোখের পাতা অল্প উঠিয়ে আশপাশ দেখে যুবকটি। নাহ! কেউ নেই কোথাও। মৌনতার দেয়াল ধরে তড়পাতে থাকে নীরবতা, কেউ কি সজোরে আঘাত করছে নীরবতার পাঁজরে?

অস্পষ্টস্বরে আবার শোনা যায়-

- কেন মেরেছ আমাকে?

ঠোঁটে-গলায় ক্ষোভ নিয়ে কেউ একজন বারবার প্রশ্ন করে যাচ্ছে- উত্তরের প্রত্যাশায়।

হুইস্কি যুবককে কতটা আপন করে নিয়েছে তা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। তবে ঘোরের মধ্যে দৃশ্যমান ঘটনায় কোনো অলীক চরিত্রের কথোপকথন সে স্পষ্ট শুনতে পায়।

- আমি তো কিছু করিনি। আমি তো একজন সাধারণ ব্যবসায়ী।

কিছুক্ষণ বিরতির পর আবার শোনা যায়। এবার একটি নয়, দুটি কণ্ঠস্বর স্পষ্ট হয় যুবকটির কাছে।

- সাধারণ? হা হা হা.. তুমিই আমার মৃত্যুর পথকে সুগম করেছ।

- আমি? কিন্তু কীভাবে? আমি তো প্রতিনিয়ত সমাজের সেবায় ব্যস্ত, কাজ করছি মানবতার কল্যাণে। আমার জন্যই তো কলকারখানা গড়ে উঠেছে, দেশে দেশে বেকারত্ব কমছে, মানুষ দুবেলা দুমুঠো খেয়ে-পরে বাঁচতে পারছে।

বদ্ধ হল ঘরে মুহুর্মুহু ভেঙে পড়া ঝাড়বাতির শব্দের মতোই স্পষ্ট শোনা যায় হাসির ঝংকার। কারা? কারা হাসছে? নিমিত লোচনে যুবকটি পরখ করে নেয়। নাহ, কারো বিন্দুমাত্র ছায়া কাছেপিঠে নেই।

- তুমি কি আমার ধমনিতে আঘাত করোনি? ধমনি দখল করে গড়ে তোলোনি তোমার সাম্রাজ্য, তোমার কারখানা।

- কিন্তু আমি তো দেশের বেকারত্ব কমিয়েছি। আমার কলকারখানার পণ্য বিদেশে রফতানি করে শ্রমিকের ভাগ্য পরিবর্তন করেছি। জিডিপি’র মান বেড়েছে- মানুষ হয়েছে স্বাবলম্বী।

- তাতে কি আসে যায়! দেহের ধমনি-শিরা বন্ধ হয়ে গেলে জিডিপি আদতে কোনও কাজে আসে না। ঝড়ের রাতে পারবে তুমি তোমার ছিটকে পড়া মগজের ওপর দিয়ে হেঁটে পালিয়ে যেতে!

- আহা! তা হবে কেন? মানুষ থাকবে উঁচু উঁচু অট্টালিকায়। শান বাঁধানো বাথটবে গলা অবধি ডুবিয়ে বসে থাকবে। আর তাদের চারদিকে ঘিরে থাকবে শানশওকত, কোনো কমতি থাকবে না কিছুর।

- আর বনের পশুপ্রাণী? তারাও তোমার বাথটবে শুয়ে হুইস্কি খাবে বুঝি?

- আ হা! হিংস্র জীব যত কম থাকে ততই ভালো।

- তোমার পরিণতি ওই অবলা ছোট্ট হরিণ ছানাটির থেকেও করুণ হবে। মনে রেখো পৃথিবী সকলকে তার পাওনা ঠিকঠাক বুঝিয়ে দেয়।

দুজনের অলীক কথোপকথন শুনতে শুনতে আরাম কেদারায় স্থবিরতা এলে যুবকটি হঠাৎ উঠে দাঁড়ায়। পরম মমতায় হাতে তুলে নেয় গ্লাস। আঙুলে ছিপি মেপে স্কচ হুইস্কির বোতলটি উপুড় করে দেয় গ্লাসের ওপর।

এ সময় চানাচুর কী ডালমুট থাকলে ভালো হতো। চানাচুর চিবুতে থাকলে কশ্মিন চরিত্রদের অত্যাচার থেকে রেহাই পাওয়া যায় যদি!

কিন্তু রেহাই কীসের! বরং আরও দ্বিগুণ ক্লেদ-ক্ষোভে রগড়াতে রগড়াতে এসে পড়ে তাঁরা।

হুইস্কির নেশায় বুঁদ হয়ে যুবকটি আরাম কেদারায় ঝাঁকি খেতে থাকলে পুনরায় দৃশ্যপটে আসে সেইসব চরিত্র।

- আমার ফুসফুসে কেন আগুন জ্বালিয়েছেন?

- ওটা সাধারণ প্রাকৃতিক ঘটনা ছিল। আগ্নেয়গিরির ছাইভস্ম থেকে আগুন লেগেছিল। সেখানে আমাদের কিছুই করবার ছিল না। আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি আগুন নিভানোর এবং সফলও হয়েছি।

- সফল হয়েছেন? হা! হা! হা! তাচ্ছিল্য ঝরে পড়ে তাঁর হাসিতে।

- কয়টা কলকারখানা বসাবেন ওখানে?

- ইয়ে মানে। কারখানা তো মানুষের কল্যাণের জন্যই। এগুলো মানুষের চাহিদা- সকলের জন্য কর্মক্ষেত্র চাই, চাকরি চাই। মানুষের জীবনকে সহজলভ্য করতে কারখানার দরকার আছে।

- প্রতিদিন কী পরিমাণ কার্বন বাতাসে মিশছে জানা আছে আপনার?

- তাতে কী? আমরা কম দামে এয়ার কন্ডিশনার পৌঁছে দেবো মানুষের কাছে।

- সকলের মাঝে? আপনি জানেন বিশ্বজুড়ে দরিদ্রতার হার এখন কত?

- ওসব নুলো ভিখিরিদের খোঁজ রাখা আমার কম্ম নয়।

- ওই মানুষগুলো মানে আপনি যাকে নুলো ভিখিরি বললেন, ওরা পথে নামলে কিন্তু আপনাদের গদি টিকবে না এক মুহূর্তও।

- তাহলে এত সৈন্য-সামন্ত, পুলিশ বাহিনী কেন পুষছি বলুন? ঠেঙিয়ে বিদায় করবে সব ব্যাটাকে।

- হা হা হা... জনগণের টাকায় পোষা পুলিশ বাহিনীকে জনগণের ওপরই লেলিয়ে দেবেন? বাহ্!

- বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীকে বরদাস্ত করবে না এ সরকার। আমরা কেবল শান্তিপ্রিয়দের পক্ষে আছি।

অন্ধের কাছে যষ্টিই তাঁর সমস্ত আশ্রয়, ভুলভাল উত্তরে সেরকম যষ্টিই আঁকড়ে ধরেন লোকটি। সে যাই হোক, পাপের ফল ভোগ করতে হবে সবাইকে। কোনো এক অচেনা সত্তা বদলা নেবে আঘাতের, যেখানে বাজতে থাকবে মহাকালের সুর আর দৃশ্যত হবে মানুষের পতনকাল। আজ এখানে এই মঞ্চেই পরিদৃশ্যমান হবে ভাবীকালের ইতিহাস।

হে ভাবুক আসরজনা, ধৈর্য ধরে আরেকটু অপেক্ষা করুন, এখানেই আপনাদের পূর্বতন থেকে ভাবীকাল দৃশ্যত হবে আচমকা।

জানা অজানার অটল বেহাল উৎপীড়ন পিছু তাড়া করতে করতে ছাদের কার্নিশে এনে ফেলে দেয় যুবককে। দুলে ওঠা পর্দা দিয়ে যুবকটির ঘরে কিঞ্চিৎ আলোর রেখা ঝলমল করে। আরাম কেদারা থেকে উঠে দাঁড়ায় যুবকটি, বাইরে কি ঝড় উঠবে!

- কই, না তো। ঝলমলে রৌদ্রের দিন। এমন চনমনা রোদের কিছুটা উত্তাপ হৃদয়ে লাগিয়ে আপন মনেই বলে ওঠে যুবকটি। সব কিছু ফিটফাট মনে হচ্ছে, যেন সদ্য ফোঁটা ফুলের মতো বাতাসে পাঁপড়ি মেলে দিয়েছে সূর্য। উজ্জ্বল আকাশ হাসির ঝলকে আনন্দ ছড়িয়ে দিচ্ছে।

গলির মোড়ে বাংলার অধ্যাপক অজয় শর্মার বাড়ি। তাঁর দোতলা বাড়ির ছাদে এলোমেলো পায়চারীরত কিছু অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছেলেমেয়েকে দেখা যায়। অথচ তাদের প্রায়শই সামনের মাঠে খেলতে দেখা যেত। তারাও কি আজ দ্বিধা-শঙ্কায় ঘরবন্দি!

- ওইটুকু শিশুরাও কি প্রায়শ্চিত্ত করছে?

- হ্যাঁ। তা নয়তো আবার কি?

- ওরাও? কী এমন পাপ ওদের? ওই শিশুরা তো প্রথমবার পৃথিবীর জমিনে আছড়ে পড়া আদম-হাওয়ার থেকেও পূত-পবিত্র।

- কালের পর কাল বয়ে চলা মানুষের জীবনে কেবল মৃত্যুই সকল পাপের চিহ্ন মুছে দিয়ে যেতে পারে না। একটি মৃত্যু তার পরের প্রজন্মের কাঁধে তুলে দিয়ে যায় পাপের অন্তরীণ বোঝা।

একটা অপরিচিত কিংবা খুব পরিচিত গলার স্বর শোনা যায়। অথচ কি আশ্চর্য! আশপাশে মানুষের কোনো নামগন্ধ নেই।

- তোমরাই আমাকে শেষ করেছ তিলেতিলে। সিসার স্রোত বইয়েছ আমার বুকে, মস্তিষ্কে করেছ আঘাত, ফুসফুস দিয়েছ পুড়িয়ে। আমার রক্ত ঝরেছে অনর্গল আর তোমরা তাতে কুলকুচি করে ঝান্ডা উড়িয়েছ মানবতার। মানুষই পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাণী! আহাম্মক! মানুষ পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ আহাম্মক!

এমন ঘোরের ভঙ্গি কাটিয়ে একটা চড়ুই ছানা উড়ে গেলো ফুড়ুৎ করে। যুবকটি একটু নড়েচড়ে দাঁড়ায় যেন আহাম্মক কথাটি তাকেই বলা হয়েছে। কিন্তু কে বলবে? আর কেউ তো নেই আশপাশে। এদিকটা যেন নির্জনতার অতুল ভাণ্ডার।

 

তৃতীয় স্বর্গ

পশু কি কখনো মানুষ হতে পারে? মানুষের জীবন তবে কী করে হয় ফড়িংয়ের দোয়েলের মতন। কিংবা জগতের সকল সত্তা একই সুরে বাঁধা- শুধু ভিন্ন ভিন্ন অবয়বে ভিন্ন ভিন্ন প্রাণী। তবে মানুষ আর চড়ুই কি বোধের দুটি উন্মীলিত রূপ!

- আপনি ঠিক ধরেছেন। যেমনটি হচ্ছে একই রূপের মাঝে শয়তান আর ঈশ্বর। এ দুয়ের ভেতরে খুব একটা তফাত নেই। দুজনেই অবয়বহীন তবে নশ্বর নন। দুজনেই খুনি, তবে ঠান্ডা মাথার।

- কার কথা ভেসে আসে? কোথা থেকে আসে এই কথা?

মানুষের অন্তর্গত কথা রাতের আঁধার আর হুইস্কির ভাঁজে ঢুকে পড়ে উচ্চারিত হতে থাকে মননে মগজে- কী অবিকল নেশার মতো দেখতে তাঁরা।

- তবে মানুষ কিন্তু একই অবয়বে দুইকেই ঠাঁই দিয়েছে চমৎকারভাবে।

- আপনি তো ধর্মবিরোধী কথা বলছেন। আপনার শাস্তি হওয়া উচিত।

- ওহ্! আপনি বুঝি খুব ধর্মভীরু? তা আপনার ধর্ম কি আপনাকে খুন করতে শেখায়, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষে? কোন ধর্ম পালন করেন আপনি?

- উফ! আপনি বড্ড বেশি কথা বলেন। আমরা ক্ষমতায় গেলে ধর্ম-বিদ্বেষীদের শাওয়া-মাওয়া ছিঁড়ে ফেলা হবে।

- হা হা হা.. এত সব কিছুর ভেতর দিয়ে আপনি নিজের অজান্তে নিজেকেই খুন করে চলেছেন, খুন করে চলেছেন অনাগত শিশুকে, আপনার উত্তর প্রজন্মকে।

নেশার ঘোরে মানুষ কি তবে নিজের সত্তাকে খুন করে? বোধের কোন স্তরে গিয়ে খুন করে মানুষ? ক্রোধ ঠিক কতটা জাপটে ধরলে দ্বিখণ্ডিত সত্তা হয়ে মানুষ ঢুকে পড়ে অবয়বহীন চরিত্রে? পৃথিবীর সব থেকে খুনি প্রাণী তো মানুষই। বুভুক্ষের মতন শুধু ক্ষুধায় নয়, নিজের পাশবিক আনন্দ চরিতার্থ করতে যুগে যুগে মানুষ নির্মমভাবে মেরেছে সহস্র জীবজন্তু প্রাণীকে। এর দায় তো মানুষকেই নিতে হবে। মানুষ! হ্যাঁ! এমনকি মানুষ নিজের সহোদর মানুষকে খুন করতেও দ্বিধাবোধ করে না। হাবিল-কাবিলের প্রেত-ছায়া এখনো কি মানুষের ওপর ভর করে আছে সমস্ত আদিমতা নিয়ে?

আমার দুচোখ জুড়ে অন্ধ মায়া

ব্যথা জড়োজড়,

আমার রক্তে ধ্বংস আনে আমারই বংশধর

আমায় বুকে জড়িয়ে ধরে

আমায় করে খুন,

আমার চোখে জলের প্রপাত

হৃদয়ে আগুন।

ওগো মানুষ কেমন তুমি

কেমন তোমার বুক,

কতটা আগলে ধরলে তবে মনে আসে সুখ।

কতটা মানুষ জাগিয়ে রেখেছ

নিস্তার দেবে বলে,

আঘাতে আঘাতে খণ্ড করেছ ভালোবাসার ছলে।

তবু মানুষ তোমার বোধের দরজায় নাড়ি কড়া,

মৃত্যু এলে তো তোমার সাজানো জীবন,

আর দেবে না সাড়া।

- মানুষ কি নিজেই নিজেকে খুন করতে পারে?

এই প্রশ্নে হতচকিত হয়ে ওঠে যুবক! হুইস্কির নেশা হয়ত গভীর অনুধ্যানে তাকে মুখোমুখি করেছে মানবতার- তন্দ্রা কি জেঁকে বসেছে তাঁর কপোলে-ঠোঁটে-চিবুকে? হঠাৎ ঘুমের ঘোরে কিংবা আধো-ঘুমে সে শুনতে পায় নূপুরের জ্বালাময়ী শব্দ। ঘরটিকে যেন অ-দৃশ্যত কোনো ছাইরঙা পেঁচা ঘিরে ধরেছে। হয়ত কোনো অপ্সরী- যে কিনা পেঁচার বাহুডোরে লুকিয়ে ছিল, আজ সে বালিকার বেশে এসে দন্ডায়মান যুবকটির সম্মুখে। মেয়েটির ফেলে আসা পায়ের ধ্বনিতে মহাপ্রলয় নেমে আসতে চায় এই ধরণি তথা যুবকটির অন্তরমহলে। তার ছন্দবদ্ধ শরীর, সুমেদসহ প্রলম্বিত কটিদেশ, বক্ষবন্ধনীতে আবদ্ধ দুটি উত্তল মহাদেশ- আর তার নিশ্বাসের ফেরে ফেরে যেন ঝংকার তোলে জাকির হোসেন। একটু নিচে নাভির মতো দেখতে দেবতাপুকুর, কাদামাটি মেখে মাছ ধরবার শৈশব। সবটাই বিহ্বল চেতনার আদ্যোপান্ত ঘুরিয়ে এনে যুবকটিকে ছেড়ে দেয় উত্তাল মাঝ সমুদ্রে, যোনি দ্বীপের ঠিক কাছাকাছি। যুবক আবিষ্কার করে মেয়েটির যোনিদেশে রক্তের ছোপ ছোপ দাগ- যেন সুপ্ত কোনো আগ্নেয়গিরি- যেন এই রক্ত এসেছে দজলা-ফোরাতের উত্তরাধিকার সূত্রে, যা একদিন ভাসিয়ে দিয়েছিল কারবালার ধু-ধু প্রান্তর। টাইগ্রিস কি ইউফ্রেটিস দিয়ে সে জল কি আজও বয়ে চলেছে অনন্ত পথের দিকে?

কেঁপে কেঁপে ওঠে মেয়েটির শরীর। দোহারা শরীরজুড়ে প্রবল ঝড় এসে আছড়ে পড়ে। বক্ষজুড়ে প্রবহমান এমন ঝড়ে চেতনা ঠিক রাখা দুষ্কর।

ঘুম থেকে লাফ দিয়ে জেগে ওঠে যুবক। তার কপোলে-ঠোঁটে নোনা স্বাদ। মেয়েটির কোনো নাম-গন্ধও নেই আশপাশে, ঠিক তারই মতো এক সুঠামদেহী যুবক ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে আছে তাঁর দিকে-

- আমার কি দোষ?

- দোষ তোমারই।

- নারী যদি তাঁর লজ্জাস্থান ঢেকে রাখতে না পারে তবে সে ব্যর্থতা কার?

- পুরুষ মাত্রই শরীরপ্রিয়, আর কোটি বছরের ইতিহাসে নারী কেবলই ভোগের বস্তু হয়ে এসেছে। রন্ধ্রে রন্ধ্রে যে অন্ধতা বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে মানুষ তা কি দুয়েক বর্ষায় ধুয়ে-মুছে সাফ হয়?

- যোনিদেশের যে অন্ধকার সোপান ঠেলে পুরুষ একদিন জগতের আলো দেখেছিল, আজ সেই যোনিদ্বারকেই ছিঁড়ে-খুঁড়ে নষ্ট করতে চায় আবলীলায়। এমন চেতনাহীন বেকুব মূর্খকে আপনারা চিনে রাখুন।

- কে? কে?

হকচকিয়ে আরাম কেদারা থেকে উঠে দাঁড়ায় যুবকটি। মূর্খ শব্দটি শুনে সে সংবিৎ ফিরে পায়। এ যেন তাঁকেই বলা হয়েছে।

 

চতুর্থ স্বর্গ

এবার দৃশ্যপটে কিছু পূর্বতন ঘটনা আনা যাক।

শীতের শেষাবধি বসন্তের আগমন যখন বাতাসে গুন গুন করছে এমন একটা সময় যুবকটি গিয়েছিল পাহাড়ের কাছে। যুবকটি মানুষ বলে পাহাড় তাকে বিশ্রী ভাষায় তিরস্কার করে।

- ছিহ! তোমাদের মানবিকতার সেসব বুলি আজ কোথায়?

- আমি তো কিছু করিনি। আমি কিছু জানি না।

- তোমরা মানুষেরাই তাকে মেরেছ।

- কে সে? আমি তো কাউকে মারিনি। এমনকি কোনো চঞ্চল ফড়িং কিংবা বিরক্তিকর মশাদের আস্তানাও গুঁড়িয়ে দেইনি কখনো।

- প্রজাপতির মতো উষ্ণ চঞ্চল যে প্রাণ, পাহাড়ি ফুলের মতো অপরূপ পাপড়ি মেলে দেয় যে, দুলে ওঠে বায়বীয় ভালোবাসায়। পাহাড়ি ঝরনার মতো সরস মেয়েটিকে তোমরা কীভাবে নরকের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দিতে পারলে? কী করে পারলে দেবশিশুর চঞ্চল আকুল হৃদয়ের মেয়েটিকে এভাবে ছিঁবড়ে খেতে? তোমাদের যদি এতই যৌন ক্ষুধা, যদি তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারো, কেটে ফেলে তোমার যৌনাঙ্গ, মূল উৎপাটন করো সকল বিকৃত মানসিকতার।

এ কী? এসবের কিছুই তো সে জানে না। না জানাটাও অপরাধ? কিন্তু তারচেয়েও বড়ো যে ব্যাপারটা, পাহাড় ছিল তাঁর নিকটতম বন্ধু, সেই পাহাড় তাকে ধিক্কার করলো আজ মানুষ বলে? আজ পুরুষ বলে? কিন্তু সে পাহাড়কে কী করে বোঝাবে, যারা গুম করে, যারা খুন করে, যারা অত্যাচার করে, ধর্ষণ করে, হত্যা করে মানুষকে কিংবা মানুষের মতোই অন্য কোনো জীব, তারা আদতে মানুষ নয়। মানুষের মতো দেখতে অন্য কিছু। বোধ নেই যাদের, পৃথিবীর প্রতি কল্যাণমূলক কোনো ভাবনা নেই তাদের। যে পাহাড়ি মেয়েটি মারা গেছে সাতটি পুরুষ দ্বারা ধর্ষণের পর, সে তো তারই বোন, তারই মা, তারই অনন্য আপন কেউ হবে।

- তোমাদের কথায় আর কাব্যেই যত মানবিকতার স্থান, আচরণে নেই তাঁর বিন্দুমাত্র। যদি থাকতো কিছুটা হলেও বোধের অবগুণ্ঠন, তবে নিশ্চয় তোমরা আমার অঙ্গ কেটে বিলাসবহুল প্রমোদ উদ্যান বানাতে পারতে না। ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করতে পারতে না আমার মেয়ের সম্ভ্রম।

- সবাই এক নয়, বিশ্বাস করুন। আমরা অনেকেই পৃথিবীটাকে ভালোবাসতে চেয়েছি। ভালোবাসতে চেয়েছি লাল টকটকে রক্তজবার মতো। অথচ পৃথিবীর সমস্ত রাইফেল ঘাতকের মতো ঢুকে পড়ে আমাদের কোমল প্রাণ হৃদয়ে, ছিন্ন ভিন্ন করে তুচ্ছতায়। পঙ্কিলতার গ্লানি টুপটাপ ঝরে কপাল, কপোল আর শরীর বেঁয়ে। কণ্টক বিঁধে দেয় চিবুকে ঠোঁটে। ছিড়ে ফেলে কণ্ঠ শিরা উপশিরা ধমনি। আমার নাড়িভুঁড়ি পেঁচিয়ে আমাকেই হাঁটু মুড়িয়ে বেঁধে ফেলে।

পাহাড়ের বদলে যুবকটি যখন সমুদ্রের কাছে গেলো, সেখানেও একই রকম কথাপীঠ মুছড়ে পড়ে তার সামনে। গভীর সমুদ্রে তার নৌযানে উঠে পড়ে একটি অযাচিত কচ্ছপ। মায়ের মৃত্যুতে কোলহারা হয়েছে সে ক্ষণকাল আগে। শুধু সে একা নয়, তার মতো আরও অনেকেই। তার মতো একই গোত্রভুক্ত আরও অনেকেই ছেড়ে গেছে এই পৃথিবীর মায়া, উঁহু যেতে বাধ্য হয়েছে।

- আপনার মাকে আপনি চোখের সামনে মরতে দেখছেন, এমন দৃশ্য ভাবতে পারেন?

- মানে? কি বলছেন এসব?

- এই আপনাদের জন্য, আপনাদের জন্যই মুখে প্লাস্টিক পেঁচিয়ে মারা গেছেন আমার মা। আমি কিছুতেই বাঁচাতে পারিনি তাকে। হৃদয়ের তপ্ত রোদ্দুর আমাকে কুরে কুরে খেয়েছে সে দৃশ্য দেখে। চোখ ভিজে গেছে নোনা জলে। হায়! এক সমুদ্র নোনা জলের মাঝে সেসব আর কতটাই বা গুরুত্ব রাখে?

- বিশ্বাস করুন, আমি এসব কিছুই করিনি। আমি কিছুই জানি না।

- এ দায় আপনারই। আপনার সহোদর, অথবা আর অন্য কারও। আপনারা শুধু মারতে জানেন, মরতে জানেন, গড়তে জানেন না। আপনিও সেই মানুষ যারা শুধু ধ্বংস করতে জানেন, জানেন অতি সহজে দুমড়ে মুচড়ে ভেঙে ফেলতে।

কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেয় তার এই কথা। ভাষার জড়তা যুবকটিকে চুপ থাকতে বাধ্য করে।

ধিক্কার শুধু ধিক্কার

তোমার এ অহংকার

ভাঙুক ঘুমের ঘোর।

মানুষ তুমি জেগে ওঠো

দেখাও রাঙা ভোর,

বিষাদ ভুলে দাও খুলে

বোধের প্রাচীর-দ্বোর।

স্বপ্ন দেখো মানুষ,

নিয়ে বাঁচো অধিক প্রাণ

একের বিপদে সকলে দাঁড়াবো

এই হোক জবান।

 

বোধি স্বর্গ

গ্লাসের জল সরাসরি হুইস্কির বোতলে ঢালে যুবকটি। দি লাস্ট পেগ এভার দিস টাইম। গ্লাসটি হাতে নিয়ে আরাম কেদারায় বসে। তার বুক থেকে গলা অবধি যেন জ্বলজ্বলে আগুন জ্বলছে, ঢেকুর ওঠে বারবার।

কী এক ক্লান্তির ছাপ তার চোখেমুখে, এই পাপাত্মা নিয়ে কোথায় যাবে সে? সমস্ত পৃথিবী তাকে তিরস্কার করতে থাকে, ধিক্কারে ধিক্কারে জর্জরিত করতে থাকে।

- অথচ আমিও তো চেয়েছি সুন্দর আর সাবলীল পৃথিবী। আমি তো চাইনি একের লাশের ওপর দিয়ে অন্যের বিজয় মিছিল। চাইনি বাতাসে এমন ঘৃণার বিষবাষ্প। চাইনি বোধিবৃক্ষের এমন বনসাই নীরবতা।

মাথা ঝুঁকে চোখ বন্ধ করে হাতে হুইস্কি ভর্তি গ্লাস ধরা যুবকটি বলতে থাকে নিজেকে।

এসব আসলে আর কিছুই নয়, আত্মশুদ্ধি? আত্ম উপলব্ধি? যুবকটির এমন অযাচিত ভাবনা আদতে তাবৎ পৃথিবীর কর্মকাণ্ডে আলাদা কোনো ভূমিকাই রাখতে পারে না। হয়ত যখন সে বসে এসব ভাবছে ঠিক তখনই পৃথিবীর অন্য কোনো প্রান্তে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত হাত গ্রাফিতি এঁকে চলেছে যুবতীর স্তনজুড়ে। হয়ত ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে ফেলেছে জবান বন্ধক রাখা কোনো ক্রীতদাস। হয়ত কলাম্বিয়ার একটা অংশ পুড়ে যাচ্ছে অনায়াসে। ‘কানো ক্রিস্টালস’ জুড়ে কৃষ্ণচূড়া নয়, কেবলই রক্তের স্রোত বয়ে যাচ্ছে। আরব শেখেরা বাথটবে বসে উপভোগ করছে কোনো রমণীর স্তনবৃন্তের স্বাদ। তাদের তেলের খনি থেকে উঠছে শুধু তেল নয়, তাবৎ পৃথিবীর রক্তক্ষত। আর ঠিক সেসময় কাপাচিনোয় মুখ ডুবিয়ে মানবতার জয়গীত গাইছেন বব ডিলান।

যেমনটি করছে এই যুবকটি, হুইস্কির গ্লাস হাতে নিমিত লোচনে ভাবছে, এই কোটি বছরের মানব ইতিহাসে মানুষ কি আদতে মানুষ হতে পেরেছে? কতদূর এগিয়েছে সভ্যতা? দজলা-ফোরাতের জলজ ঢেউ ছুটে চলেছে ওদিকে রাইন-মিসিসিপি, তার কিছুটা ধাক্কা এসে কি লাগেনি গঙ্গা অথবা পদ্মাতেও? মানুষ পেরেছে কি সময়কে ছুরি মেরে বিহঙ্গের মতো উজ্জ্বল আলোকিত স্বপ্নময় আকাশে ডানা মেলতে? অথবা ভালো ছিল তার জিপসি জীবন, নাগরিক কোলাহলের চির মায়াহীনতা।

পুষ্প তবু ফোটো, মেঘের গর্জন

বাতাসের আছে ব্যাকুল অনুরণন,

সব অচেনা পথঘাটে

একাকী বৃত্তের মতো ছোটা

নিজের ভেতরেই ক্রন্দন।

 

আজ জ্যোৎস্নার ঘরে টান পড়ুক

জ্বলে উঠুক শত পুষ্প সরোবর।

ঝরনার ধারা বয়ে চলুক

নিস্তার পাক ঝড়ো বন।

আজ পাখির মতন সকাল

সময় ছুঁয়ে যায় মৃত দিন,

মানুষের তবু শুধিতে হবে

বহুকালের শত জমা ঋণ।

/জেড-এস/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
টিভিতে আজকের খেলা ( ৪ জুন, ২০২৬)
টিভিতে আজকের খেলা ( ৪ জুন, ২০২৬)
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক