১.
হঠাৎ এক লোক রাজা হয়ে গেল। সবাই তাকে ‘হঠাৎ রাজা’ বলে। যদিও সে অনেক আগে থেকেই রাজ্য দখল করে ছিল। কিন্তু কেউই তা বুঝতে পারেনি।
রাজা খুবই ভয়ংকর। তার নাম শুনলে লোকে অজ্ঞান হয়ে যায়। চোখে দেখলে তো কথাই নেই!
তার সব সময়ই ক্ষুধা পেত। ক্ষুধা। ক্ষুধা। ভীষণ ক্ষুধা। সারা দিন সে শুধু খায় আর খায়। তবু তার পেট ভরে না। তৃষ্ণা মেটে না। হাঁ করে দুনিয়াটা খেয়ে ফেলতে চায়!
রাজা নিজেকে দেখেও মাঝে মাঝে ভয় পায়। তাই তার প্রাসাদে একটাও আয়না নেই। পুরো রাজ্যের কোথাও আয়না নেই। সব আয়না নিজে হাতুড়ি ঠুকে ঠুকে ভেঙেছে। যদি কখনো পানির ওপর নিজের চেহারা দেখে, চিৎকার করে ভয় তাড়ানোর মন্ত্র পড়ে:
ভয় ভয় ভয়
নয় নয় নয়
ভয় পেলে পিষু পায়
যা ভয় চলে যা
যা ভয় মলে যা
রাজা আবার মনে মনে ছিল ভীতুর ডিম। কিন্তু তা কাউকে বুঝতে দিত না। সবাইকে সে শত্রু বানিয়ে রাখত। হাতের কাছে পেলেই গপাগপ খেয়ে ফেলত।
২.
সকালে ঘুম থেকে উঠেই রাজা নাশতা করতে বসে। বড়ো বড়ো প্লেটে সাজানো থাকে ৫১টি হাতির রোস্ট, ৭০০টি ভেড়ার কাবাব, ৩২টি তিমি ভাজা, গোটা তিরিশেক গন্ডার ভর্তা এবং ৫০০ থেকে ৬০০ গরুর শিক কাবাব।
এছাড়াও ট্রাক ট্রাক পোলাও, সবজি, পায়েস, মুগ ডাল, দই মিষ্টি ও লাড্ডু যা-ই পায় গপাগপ খেয়ে ফেলে। অনেক সময় ট্রাকগুলোও খেয়ে ফেলে।
পায়েস বা লাড্ডুর ট্রাক মুখের মধ্যে নিয়ে কটরমটর চিবিয়ে খায়। মনে হয় যেন ছোলা ভাজা খাচ্ছে।
খাওয়া শেষে মেঘের মতো গুড়গুড় শব্দ করে ঢেকুর তোলে।
তারপর ইটভাটার লম্বা পাইপ দিয়ে পানি খেয়ে বলে, ‘আহ্ কী শান্তি!’
এরপর যায় বাথরুমে। এইটুকু নাস্তা না করে রাজা বাথরুমেও যায় না!
বাথরুম থেকে ফিরে আসতে না আসতেই তার ক্ষুধা লাগে। সিংহাসনে বসে কাঁদতে শুরু করে। কাঁদতে কাঁদতে বলে, ‘এই গরিব দেশে খেতেও পেলাম না! না খেয়ে খেয়ে আমি মরেই যাব। মরেই যাব।’
৩.
রাজার রাজসভায় নানা রকম মন্ত্রী আছে। তারা সবাই রাক্ষসের মুখোশ পরে দাঁড়িয়ে থাকে। তাদের কাজই হলো রাজার জন্য খাবার সংগ্রহ করা, আর রাজাকে ভয় পাওয়া। তাদের বসার হুকুম নেই।
তবু তারা খুশি। রাজ দরবারের চাকরি বলে কথা!
রাজা হাতি-মন্ত্রীকে চেঁচিয়ে বলে, ‘দুপুরের খাবারে কী আছে?
হাতি-মন্ত্রী ভয়ে ভয়ে বলে, ‘হুজুর, মাত্র ৮২টা হাতি শিকার করেছি। আর তিরিশেক বাচ্চা’
রাজা হুংকার দিয়ে বলে, ‘গর্ধপ! ১০১টা হাতি ছাড়া ভাতই খাব না। যা আবার শিকারে যা।’ এই বলে মন্ত্রীর দিকে থুতু ছুড়ে মারে।
হাতি-মন্ত্রী বলে, ‘হুজুর, দয়া করুন, দয়া করুন। বনে আর হাতি নাই।’
তিমি-মন্ত্রীকে ধমক দিয়ে রাজা বলে, ‘তিমি কয়টি পেলি?’
তিমি-মন্ত্রীর এমনিতেই সর্দিকাশি লেগে থাকে। দূরে থেকেই শিকারের খবরাখবর রাখে। সে ভয়ে ভয়ে বলে, ‘হুজুর, মাফ করবেন, সাগরে আর তিমি নাই। আজ মাত্র ১৯টা শিকার করতে পেরেছি।’
রাজা তাকে মাফ করলো না, তিমির সঙ্গে তাকেও ভাজতে হুকুম দিলো।
এভাবে একে একে উট-মন্ত্রী, গরু-মন্ত্রী, গণ্ডার-মন্ত্রী, মিষ্টি-মন্ত্রী সব্বাইকে ডেকে রাজা খাবার সংগ্রহের খবর নেয়।
মাঝে-মধ্যে শিকার কম পেলে কোনো কোনো মন্ত্রীকে মাফ করে দেয়। কাউকে আবার খেয়েও ফেলে। এতে রাজসভায় প্রায়ই মন্ত্রীর সংকট দেখা দেয়।
তখন রাস্তা থেকে যাকেই পায় তাকেই ধরে এনে মন্ত্রী বানিয়ে দেয়। লোকেরা মন্ত্রী হতে পেরেও খুশি।
রাজসভার কাজ করতে করতে রাক্ষস হাঁপিয়ে ওঠে। ‘এবার একটু জিরিয়ে নিই’ বলে চিনি গোলানো একটা দিঘিতে পাইপ বসায়।
দুপুরের খাওয়া শেষে ৩০ টন ওজনের একটি বিড়ি টানতে টানতে রাজা রাতের খাবারের চিন্তায় কাঁদতে শুরু করে আর বলে, ‘এই গরিব দেশে খেতেও পেলাম না! না খেয়েই আমি মরে যাব। মরেই যাব।’
৪.
রাজার ছিল খেলাধুলার শখ। সে প্রায়ই বিকালবেলা হাই-জাম্প আর উচ্চতা মাপা খেলার আয়োজন করে।
খেলাটি এমন: রাজ্যের সবচেয়ে লম্বা লোকদের ডাকা হয়। সবচেয়ে বেশি লম্বা লোকটিকে রাজার পাশে দাঁড়াতে বলে। তখন ঘোষক চিৎকার করে বলে, ‘কে বেশি লম্বা? কে বেশি লম্বু?’
সবাই একসাথে জবাব দেয়, ‘রাজা। রাজা। রাজা।’
তারপর লম্বা লোকটি আর রাজা হাই-জাম্পে অংশ নেয়। রাজা অনেক উঁচুতে বাঁধা দড়ি সহজেই ডিঙিয়ে যায়। ঘোষক চিৎকার করে বলে, ‘কে বেশি লাফায়? কে বেশি লাফারু?’
সবাই জবাব দেয়, ‘রাজা। রাজা। রাজা।’
বেশি লম্বু আর লাফারু হয়েও রাজা ছিল ভীষণ দুখী। তার সত্যিকারের উচ্চতা দুই ফুটেরও কম। একটা গাধাও তাকে ডিঙিয়ে চলে যেতে পারে।
রাজা সবসময় দুই পায়ে দুটি বাঁশের তৈরি রণ-পা পরে থাকে। যা মন্ত্র দিয়ে এমনভাবে ঢেকে রাখে, তা কেউ দেখতে পায় না। সবাই দেখে লম্বা এক রাজাকে। তবু রাজার মন থেকে দুঃখ যায় না।
রানি রাজাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলে, ‘রণ-পা আপনার সত্যিকারের পা হয়ে গেছে, মহারাজ। দয়া করে আর কাঁদবেন না।’
রাজা বলে, ‘সত্যি বলছ? সত্যি বলছ?’
রানি মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়।
৫.
রাজার খাই খাই স্বভাব মেটাতে একদিন রাজ্যের সব খাবার, পশুপাখি, নদী-জল-সমুদ্র সব শেষ হয়ে গেল।
মন্ত্রীরা কিছু দিন মানুষকে গোরু-ছাগলের মতো সাজিয়ে রান্না করেছে। এখন রাজ্যে মানুষও নাই। রাজা বলল, ‘মানুষ নাই, ভয়ও নাই।’ সে রাজসভার সবাইকে গপাগপ খেয়ে ফেলল।
রাজা পথে পথে ঘোরে। আর চোখের সামনে যা পায় তাই খেয়ে ফেলে। ঘরবাড়ি, অফিস-আদালত, স্কুল-কলেজ, বিদ্যুতের খুঁটি, গাছ, পাথর, পাহাড়-পর্বত, জলাশয় সব।
মুহূর্তেই বিশতলা বিল্ডিং আখের মতো টেনে তুলে কপাৎ করে মুখে পুরে নেয়। কড়মড় করে খায় আর হাঁটে।
খেতে খেতে রাজ্যের সব কিছু খেয়ে ফেলল রাজা। বাকি রইলো তার দুটি রণ-পা, আর পৃথিবীর মাটি।
রানি বাতাস থেকে ছোট ছোট পোকা ছেঁকে খেয়ে কোনোরকম বেঁচে থাকে। একদিন রাজা রানির কাছে কিছু পোকা চাইল। রানি তার মুখে একটা ছাঁকনি বসিয়ে দিয়ে বলল, ‘মহারাজ, এবার জোরে জোরে বাতাস টানুন, দেখবেন ছাঁকনিতে পোকা জমবে।’
অনেক সময় ধরে বাতাস টানার পর কিছু পোকা ছাঁকনিতে জমা হয়। সবগুলোর ওজন একটা মাছির সমান। এটুকু খেয়ে রাজার মন যায় বিগড়ে। পেটের মধ্যে ডিগবাজি দিয়ে উঠল ক্ষুধা। সে রানিকে বলল, ‘রানি, গোপন কথা আছে। কাছে আসো।’
রানি ভাবল, এবার বুঝি তার পালা। শেষ মানুষটিও রাজার পেটে ঢুকবে।
রানিকে চিবিয়ে খেতে খেতে রাজা বলল, ‘রণ-পায়ের কথা শুধু তুমিই জানতে। তোমাকে আগেই খাওয়া উচিত ছিল।’
৬.
পরদিন সকালে রাজা পৃথিবী খেতে শুরু করল। পৃথিবীর ভেতরে যা যা আছে সব। সারা দিন পৃথিবী খায় আর নাক ডেকে ঘুমায়। খেতে খেতে একদিন পৃথিবীও ফুরিয়ে গেল। ঘুমানোর জায়গাটুকুও নেই। নিরুপায় হয়ে রাজা তারা রণ-পায়ের ওপরই ঘুমায়।
একদিন রাজা স্বপ্নে দেখল, যদি সে চাঁদ ধরে বগোলের নিচে রাখে তাহলে চাঁদ ১২ লক্ষ ডিম দেবে।
যেই স্বপ্ন, সেই কাজ।
সে রণ-পা দুটি একটার সঙ্গে আরেকটা বাঁধে। তারপর চাঁদ ধরতে বেয়ে বেয়ে উপরে ওঠে। উপরের দিকটা মেঘের সঙ্গে ঠেকানো, নিচে তো আর মাটি নাই। তাই সে ছিটকে পড়ে যায়।
আর পড়তে, পড়তে, পড়তে পড়তে, সে কেবল পড়তেই থাকে। আর হা হা করে হাসতে থাকে।
রাজা জানে, সে যেখানেই ধপাস করে পড়বে, সেখানের রাজ্য দখল করবে। সেখানকার সব কিছু খেতে শুরু করবে। পায়ে পরেও নেবে তার রণ-পা দুটি।








