অ্যালিস মেজরের কবিতা

ভূমিকা ও ভাষান্তর: গৌরাঙ্গ মোহান্ত
৩০ মার্চ ২০২৬, ১৮:৫৩আপডেট : ৩০ মার্চ ২০২৬, ১৮:৫৩

অ্যালিস মেজর বিশিষ্ট কানাডীয় কবি ও প্রাবন্ধিক। তিনি সাহিত্য ও বিজ্ঞানের অন্তর্লীন সম্পর্ককে কবিতায় রূপায়িত করার জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। ১৯৪৯ সালে স্কটল্যান্ডে জন্ম, পরে কানাডায় সুস্থিত হন এবং সমকালীন কানাডীয় কবিতায় এক স্বতন্ত্র কণ্ঠ হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন।

তার কবিতায় পদার্থবিদ্যা, জীববিদ্যা, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও গণিতের ধারণা কেবল উপমা নয়, ভাবনার কাঠামো নির্মাণের উপাদান। বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধিৎসা ও মানবিক অনুভূতির মেলবন্ধন তার কবিতার প্রধান শক্তি। ‘Welcome to the Anthropocene I Standard Candles’ গ্রন্থে মহাজাগতিক সময়, আলো, স্মৃতি ও মানব-অস্তিত্ব নতুন ব্যঞ্জনা পেয়েছে।

তিনি এডমন্টন শহরের প্রথম কবি-লরিয়েটের সম্মান অর্জন করেন এবং কবিতাকে জনজীবনের সঙ্গে যুক্ত করতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। সাহিত্যকীর্তির স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ‘University of Alberta’-এর সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রিসহ একাধিক পুরস্কারে ভূষিত হন। বিজ্ঞানচেতনা দীপ্ত কাব্যভাষা ও গভীর চিন্তাশীলতার জন্য অ্যালিস মেজর পাঠককে নতুনভাবে ভাবতে অনুপ্রাণিত করে চলেছেন।

পাখি-অসীম-ঘনত্ব-বিন্দু ‘Welcome to the Anthropocene’ (২০১৮) এবং মানচিত্রাবলি, সংগীত, শহর ও মাছ শীর্ষক কবিতাগুলো ‘Corona Rsdiata’ (২০০০) কাব্যগ্রন্থ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে।


মানচিত্রাবলি

প্রথম সেই কোষ-চক্র টেবিলে শক্ত করে

ধরে রাখা এক মানচিত্রের মতো স্থিরীকৃত।

ভাগ্যের মানচিত্রাবলি, উপকূলের সংকেতপূর্ণ মানচিত্রাঙ্কন,

উন্মোচন করে নিঃশব্দ গতিপথ।

এটি অস্থি হয়ে উঠবে,

এটি মস্তিষ্ক হয়ে উঠবে।

 

এবং চক্রটি কুঁকরে গিয়ে ক্ষুদ্র নৌকায় রূপান্তরিত হয়,

দ্বিমাত্রার ভাঁজ থেকে ত্রিমাত্রায় উত্তীর্ণ ওরিগামির ভূ-প্রকৃতির মতো এক সরু নলিকায় রূপ নেয়।

 

মানচিত্রের রয়েছে ইতিহাস, বিবর্তন।

প্রাচীন সামুদ্রিক মানচিত্রে যা ছিল উপদ্বীপ, তা হয়েছে দ্বীপ।

ক্ষুদ্র মহাদেশ স্ফীত হয়ে ওঠে,

বৃহৎ বহিষ্করণ হ্রাস পায়।

ধীরে ধীরে উদ্ভাসিত হয় পরিচিত বিশ্বের আকৃতি।

 

তেমনি রূপান্তরিত হয় ভ্রূণ। গলবিল এলাকার খিলান

সংকুচিত হয়ে মুখের কোমল অস্থিতে রূপ নেয়; গোলাকার পাখনা থেকে

প্রসারিত যোজকের দিকে অঙ্গকলিকা দীর্ঘায়িত হয়।

 

যেন একটি শিশুর উন্মোচন

বৃদ্ধি-কাহিনি নয় ততটা,

যতটা এক আবিষ্কারের ইতিহাস।


পাখি-অসীম-ঘনত্ব-বিন্দু

পাখি-গণিতজ্ঞরা

গণনা করতে চেষ্টা করে

সে সকল অদৃশ্য প্রাচীর

যেখানে এসে ব্রহ্মাণ্ড থেমে যায়।

 

স্পেস ও সময় উল্লম্ব বৃত্ত অতিক্রম করে,

তারা বিচক্ষণতার সাথে কম্পমান শব্দ সৃষ্টি করে।

তবু রয়েছে অসীম-ঘনত্ব-বিন্দু

উড্ডয়নের চতুর্মাত্রিকতা

মিলিত হয়, দুয়ে সংকুচিত হয়ে দাঁড়ায় এবং

আমাদের সমীকরণগুলো

হঠাৎ অতিক্রমের জন্য নিষিদ্ধ হয়।

 

যেসব পাসেরাইনের গণিত

শেখার শ্রেণিকক্ষ নেই

তারা কার্যত বেশি সজাগ হয়ে ওঠে।

বাস্তববুদ্ধিসম্পন্ন এসব পাখি

এড়িয়ে চলতে শেখে

সেসব উল্লম্ব তল

যা যুক্তির মোহে দীপ্যমান

কিন্তু ভ্রান্ত অনুমানের ওপর স্থাপিত

সে বাতাস সর্বত্র বহমান।


সংগীত

দীপ্তিমান প্রাণী বায়ু আর জল, দুজগতের মাঝখানে বাস করে,

ক্ষুদ্র ডলফিন, পাঁক খায়

সমুদ্রপৃষ্ঠে, বিভাজক সমতলে।

 

জলের সংগীত, তিমির গান, ধ্বনির সমুদ্র,

স্বনতীক্ষ্নতা অবিরত সরে যায়, যেন

মহাসাগরে স্রোতের মতো তরল।

 

পৃথিবীর সংগীত টুকরো টুকরো

স্বরে কর্তিত, বিভক্ত, সমন্বিত, পুনর্বিন্যস্ত।

পৃথিবীর কান তার তীক্ষ্ণতা হারায়,

সমস্ত ধ্বনিকে একত্রিত করে ফেলে।

 

কিন্তু একটি স্কেলের ধাপগুলোর

ভেতর কী লুকিয়ে আছে?

কোন কোন স্বর অশ্রাব্য, বিশৃঙ্খল হয়ে ওঠে,

যখন সামুদ্রিক প্রাণীটিকে

ডাঙায় তুলে আনা হয়?

 

কানে খোলক ধরো,

এবং শোনো, সমুদ্র নয়, বরং দেহের

নিজস্ব তরঙ্গ-দোল, তার

গোপন সুর,

এবং দীর্ঘশ্বাস, হারিয়ে যাওয়া ঝংকার।


শহর

হৃৎপিণ্ডের অনেক প্রবেশপথ ও নিষ্ক্রমণপথ রয়েছে।

 

প্রাচীরঘেরা শহরের ফটক। তার খিলানের নিচে

দূর বন্দর থেকে আসা যাত্রী আর পরিবাহিত পণ্যের

মিশ্র নিশ্বাসে সড়কগুলো মুখরিত।

নিরন্তর গতির এক বিশাল, তরল প্রবাহ।

 

মহাশিরা, হৃদয়ের শিরাগুলি ভেতরে রক্ত ঢেলে দেয়।

মহাধমনী, উন্মুক্ত দ্বার, রক্ত পাম্প করে বাইরে পাঠায়।

 

আর, পার্শ্বদ্বারের মতো,

করোনারি ধমনি শাখা বিস্তার করে সরে যায় এবং বাঁক নিয়ে ফিরে আসে শহরপ্রাচীর ঘেঁষা গলির গোলকধাঁধায়,

যেখানে সহস্র প্রচ্ছন্ন দরজা

অনুপ্রবেশ করে,

গোপন প্রবেশের অনুমতি দেয়।

 

শহরগুলো সবচেয়ে সর্বজনীন,

সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত তল্লাট।


মাছ

ছোটো নৌকা, ছোটো বাঁকানো মিনো মাছ, লিঙ্গ-পিচ্ছিল,

বিপুলতার ভেতর একটি মাত্র,

প্রতিশ্রুতির আলোয়

ঝলমলে জাল।

 

মাছের স্বপ্ন দেখা, পরিবারে শিশু জন্মাবে, এমন লক্ষণ।

বন্ধ্যাত্বের বিরুদ্ধে জাদুমন্ত্র, মাছের ভেতরে পাওয়া মাছ ভক্ষণ করো।

 

সেফার্ডিক বিয়ের রীতি

বর বাজার থেকে

একটি বড় কার্প মাছ কিনে এনে কনের সামনে তামার টবে রাখে।

তার ওপর দিয়ে কনে লাফ দেয়, তিন তিনবার,

রমণীরা তার হালকা পায়ের প্রশংসা করে।

সমুদ্রের মাছের মতো অনেক সন্তানে

তুমি ধন্য হও।

 

যখন কনে এই যাত্রা শুরু করল,

নিজের মায়ের গর্ভের দিকে ফিরে যেতে যেতে,

তার সন্তানরাও ততক্ষণে তার সঙ্গে ভ্রমণ করছিল, রেশমি জালে ধৃত ছোটো ছোটো মাছের কার্গো।

/জেড-এস/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
ফাইনালের আগে ড্রেসিংরুমে কী ঘটেছিল? মেসির ভিডিও ঘিরে রহস্য
ফাইনালের আগে ড্রেসিংরুমে কী ঘটেছিল? মেসির ভিডিও ঘিরে রহস্য
একটার পর একটা ধস শুরু হইছে, বাঁধটি ভেঙে গেলে আমরা সব হারিয়ে ফেলবো
একটার পর একটা ধস শুরু হইছে, বাঁধটি ভেঙে গেলে আমরা সব হারিয়ে ফেলবো
২০২৭ সালের মধ্যে সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন করবে সরকার
২০২৭ সালের মধ্যে সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন করবে সরকার
বিদ্যুৎস্পৃষ্টে মা-মেয়েসহ এক পরিবারের ৩ জনের মৃত্যু
বিদ্যুৎস্পৃষ্টে মা-মেয়েসহ এক পরিবারের ৩ জনের মৃত্যু
সর্বাধিক পঠিত
এমপির ‘দ্বিতীয় বিয়ে’ নানান প্রশ্ন, দ্বিতীয় স্ত্রী ও শ্বশুরের বক্তব্যে অমিল
এমপির ‘দ্বিতীয় বিয়ে’ নানান প্রশ্ন, দ্বিতীয় স্ত্রী ও শ্বশুরের বক্তব্যে অমিল
জামায়াত এমপির ভিডিও ভাইরাল, জানা গেলো আসল ঘটনা 
জামায়াত এমপির ভিডিও ভাইরাল, জানা গেলো আসল ঘটনা 
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বড় পরিবর্তনের পথে ইসি
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বড় পরিবর্তনের পথে ইসি
এবার কাশিমপুর মহিলা কারাগারের জেল সুপার বদলি, জেলার বরখাস্ত
এবার কাশিমপুর মহিলা কারাগারের জেল সুপার বদলি, জেলার বরখাস্ত
আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিলেন ভিডিও ছড়িয়ে পড়া এমপির প্রথম স্ত্রী
আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিলেন ভিডিও ছড়িয়ে পড়া এমপির প্রথম স্ত্রী