ঈদ সংখ্যা ২০২৬

শূন্যের ওপর ছন্দ

সালমা বাণী
৩০ মার্চ ২০২৬, ১৯:০৬আপডেট : ৩০ মার্চ ২০২৬, ১৯:০৬

শূন্যের ওপর ঘুরে ঘুরে নাচছে রিমঝিম! আর দর্শক সারির সামনে বসে বিস্ময়ে অপলক রায়হান। মোহগ্রস্তের মতো রিমঝিমের নূপুর বাঁধা পায়ের ওপর দৃষ্টি আবদ্ধ রেখে ভাবছে, এ-ও কী সম্ভব! মঞ্চের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পলকে পলকে ঘুরে যাচ্ছে ছন্দের তালে তালে। একি রায়হানের চোখের ভুল? রিমঝিমের পা জোড়া মঞ্চের ওপরে নয়, সে যেন নাচছে শূন্যের ওপর। তাই তো মনে হচ্ছে রায়হানের! সে তার চোখ দুটোর দেখার ভুল মনে করে আরো গভীর, আরো তীক্ষ্ণভাবে আটকে রাখে তার দৃষ্টি রিমঝিমের পায়ের ওপর। এভাবে অপলক দৃষ্টি রিমঝিমের পায়ের ওপর আটকে রেখে চেষ্টা করছে নিশ্চিত হবার। না, রিমঝিম মঞ্চের ওপরে নয়, সে নাচছে শূন্যের ওপরে। রিমঝিমের নাচ দেখতে দেখতে হয়তো রায়হান যেন ভুলে যায় নিশ্বাস নিতেও। হয়তো ক্ষণিকের জন্য থেমে যায় হৃৎপিন্ডের স্পন্দনখানি!

এমনই বিভোর হয়ে থাকে রায়হান, যখন রিমঝিম নাচে মঞ্চের ওপর। যেখানেই রিমঝিমের নাচের অনুষ্ঠান, সেখানেই মঞ্চের একেবারে সামনের সারিতে এমনই তন্ময় অপলক হয়ে বসে থাকে রায়হান। এই অপলক চেয়ে থাকা শুরু হয়েছে প্রথম যেদিন সে দেখেছিল রিমঝিমকে টিএসসির মঞ্চে নাচতে। এমনও চমৎকার হতে পারে কোনো মেয়ের নাচ, সে ধারণাও যেন ছিল না রায়হানের। হতেই পারে না এটা কোনো মানবীর নাচ! এ যেন রূপকাহিনির কোনো এক ময়ূরীর নাচ! সে ময়ূরীর নাচের উপমা শুনেছে গানে, কবিতায়, কিন্তু কখনো দেখেনি বাস্তবে। কিন্তু রিমঝিমের নাচ যেন সেই ময়ূরীর নাচ।

দিনটা ছিল টিএসসিতে বসে ইউনিভার্সিটির বন্ধুদের সাথে বেহিসাবি আড্ডার। হঠাৎই বন্ধুরা বললো, চলো গীতিনাট্য দেখিগে। আজকে কবিগুরুর গীতিনাট্য নাচবে রিমঝিম। চল, চল, যাই, রিমঝিমের নাচ দেখি। রিমঝিমের জনপ্রিয়তা এখন যেন আকাশছোঁয়া। টেলিভিশন, মঞ্চ, যেখানেই নাচের অনুষ্ঠান, সেখানেই সকলের প্রিয় নৃত্যশিল্পী রিমঝিমের নাচ। শুধু কি দেশের ভেতর? আন্তর্জাতিক যেকোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান রিমঝিম যায় দেশকে, দেশের সংস্কৃতিকে তুলে ধরতে। এই তো সেদিন সার্ক সম্মেলনেও প্রতিনিধিত্ব করতে গেলো বাংলাদেশের নৃত্যশিল্পীদের সাথে। কত কত পুরস্কার জমে গেছে ড্রয়িংরুমের ওয়াল ইউনিটজুড়ে।

রায়হানের বন্ধু আকাশ প্রায় জোর করে নিয়ে গেলো রিমঝিমের নাচ দেখতে। রিমঝিম আর আকাশ ওরা ক্লাস ফ্রেন্ড। গীতিনাট্য শেষ হওয়ার পর মঞ্চ থেকে রিমঝিম যখন নেমে এলো, তখন আকাশ এগিয়ে গেলো মঞ্চের কাছে, সাথে নিয়ে রায়হানকে। অনেক কথা, অনেক গল্প প্রথম পরিচয়ের সেই বিকালে। সেদিন, সেই প্রথম পরিচয়ের সন্ধ্যাতেই রায়হান জানিয়েছিল তার মুগ্ধতার কথা। সেদিনের সেই পরিচয় থেকে প্রেম, প্রেম গড়িয়ে বিয়ে পর্যন্ত রায়হান এভাবেই দেখেছে রিমঝিমের নাচ দুচোখে অপলক মুগ্ধতা আর বিস্ময় নিয়ে।

দিন যায়, বাড়তে থাকে রিমঝিমের জনপ্রিয়তা। যেখানেই রিমঝিমের নাচ, সেখানেই উপচে পড়া ভিড়। শুধু রায়হান নয়, রিমঝিমের নাচ দেখে দর্শকের চোখেও যেন লাগে বিস্ময়ের ঘোর। নাচ শেষে মঞ্চ থেকে নেমে এলে লম্বা লাইন পড়ে যায় ভক্ত-অনুরাগীদের, তার অটোগ্রাফ নেয়ার। শুধু মঞ্চ থেকে নেমে আসার পরই-বা কেন, ইউনিভার্সিটি, শপিং মল থেকে শুরু করে যেখানেই যায়, সেখানেই ভক্তদের ভিড়। প্রতিদিনই রিমঝিমের নাচের অনুষ্ঠান থাকে কোথাও না কোথাও। ভীষণ ব্যস্ততায় কেটে যায় রিমঝিমের প্রতিটা দিনই। যেটুকু সময় বাড়িতে, সেটুকু সময়ও সে ব্যস্ত থাকে তার নাচের রিহার্সাল, পোশাক ডিজাইনিং অথবা বাছাই, অনুষ্ঠানের বুকিং নেয়া অথবা অ্যাডভান্স পেমেন্টে নেওয়া ইত্যাদি। সবই তার নাচবিষয়ক। একদিকে যেমন বাড়ছে নাচের জনপ্রিয়তা, অন্যদিকে তেমন বাড়ছে রায়হানের সাথে প্রেমের গভীরতা। এটার কারণ যতটা না রিমঝিমের, তার চেয়ে অনেক বেশি রায়হানের পাগলামি। অনুষ্ঠানগুলো তো আছেই, এমনকি রিহার্সালের রুমের সামনে এসে পর্যন্ত রায়হান অপেক্ষায় থাকে। রিহার্সাল শেষে বের হয়ে এলেই চমকে দেয় রায়হান। কখনো ফুলের তোড়া, কখনো চকলেটের ব্যাগ অথবা অন্য কোনো উপহারে।

রায়হান পাগল হলো রিমঝিমকে বিয়ে করার জন্য। রিমঝিম বোঝাল রায়হানকে, দেখো, আমি নাচের শিল্পী, আমার জীবনের একমাত্র সাধনা নাচ। নাচ ছাড়া আমি আর কিছু বুঝি না, আমার জীবনের সকল আনন্দ নাচে। একদিন প্র্যাকটিস না করলে কেমন যেন বিষণ্ন হয়ে থাকে আমার দিনটা। তারপরও রায়হান নাছোড়। ঠিক আছে, তুমি নাচবে, তুমি তোমার নাচ নিয়েই থাকবে, আমি তো তোমার নাচের জন্য বাধা হয়ে দাঁড়াবো না। রায়হান হয়তো তখন নৃত্যের ছন্দের মতো সুর তুলে গায়, তুমি নাচবে...নাচবে, নাচবে...আমি দেখবো, দেখবো...দেখবো মুগ্ধ চোখে...।

রায়হানের অতিরিক্ত আহ্লাদ আর জেদের কারণে রাজি হলো রিমঝিম। মা-বাবার মৌন সম্মতিতে ধুমধামে বিয়ে হলো রিমঝিম আর রায়হানের। বিয়ের অনুষ্ঠানও ছিল নাচে-গানে ভরপুর। টেলিভিশন, মঞ্চের জনপ্রিয় শিল্পী, চেনামুখ, প্রিয়মুখ, তাদের সকলেই এসেছে রিমঝিমের বিয়েতে আমন্ত্রিত হয়ে। এসেছে রিমঝিমের সহযাত্রী বান্ধবীরা ও বন্ধুরা, এসেছে রায়হানের বন্ধুবান্ধব। রিমঝিমের নাচের সঙ্গী বন্ধুরা দারুণ মেতে ওঠে বিয়ের জন্য বিশেষ সব গীতিনাট্য রচনায়। বাংলাদেশের লোকগীতি, পল্লিগীতি, আধুনিক সবকিছুর মিশেল দিয়ে বিয়ের গানের রিহার্সাল করে অনেক যতনে। শুধু তা-ই নয়, বিয়েবাড়ির অতিথিদের মনোরঞ্জনের জন্য বাংলা, হিন্দি আর ইংলিশ গানের মিশেল দিয়ে সাজায় অনেক নাচ। বিয়ের অনুষ্ঠান ঝলমলিয়ে ওঠে নাচে-গানে।

বিয়ের পর ছয় মাসও গেল না। কেমন যেন বদলে গেল রায়হান। বিয়ের আগে বলেছিল বাবার ব্যবসার পুরোটাই তাকে দায়িত্ব নিতে হবে। এখন ধনী বাবার ব্যবসা দেখে নামমাত্র। সারাক্ষণই অলস সময় কাটায় ঘরে শুয়ে-বসে। ফেসবুক আর মুভি দেখে। এখন প্রায়ই বাধা হয়ে দাঁড়ায়, নিষেধ করে রিমঝিমকে নাচের অনুষ্ঠানে যেতে। অথবা বলে, ফোন করে ক্যানসেল করে দাও আজকের অনুষ্ঠান। অবাক হয়ে রিমঝিম জিজ্ঞেস করে, কেন? আমি আমার অনুষ্ঠান ক্যানসেল করবো কেন? আমি আজ তোমাকে খুব কাছে পেতে চাইছি, কাটাতে চাচ্ছি সারা দিন একান্ত নিবিড় রোমান্টিক সময়। আমার ইচ্ছে করে সারাদিন তোমাকে জড়িয়ে থাকি। তোমাকে নিয়ে ঘুরে বেড়াই সারাটা পৃথিবী। হারিয়ে যাই সাগরসৈকতে অথবা বালুচরে।

ঠিক আছে, ঠিক আছে, সেটা হবে, আমার প্রোগ্রাম শেষ হয়ে যাবে এই আটটার মধ্যে। শেষ হওয়ার সাথে সাথেই চলে আসবো বাসায়, যত খুশি রোমান্স করো তখন। কিন্তু আমার নাচ ক্যানসেল করে দেবো, এটা হতেই পারে না, এত বড় অনুষ্ঠান, সব একেবারে পণ্ড হয়ে যাবে আমি না গেলে। কতদিনের রিহার্সাল, তুমি তো জানো, তা ছাড়া কত গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান, এটা তুমি ভেবে দেখো। এই ধরনের যুক্তি দিয়ে শুরু হয় দুজনার তর্কবিতর্ক, বিতন্ডা।

কয় টাকা পাও তুমি নেচে? আমি তোমাকে সেই টাকা দিয়ে দেবো। তোমার নাচের ওই টাকা আমার পায়ের ময়লাও না।

আমি তো শুধু টাকার জন্য নাচি না রায়হান, নাচ আমার আনন্দ, নাচ আমার ভালো লাগা, নাচ আমার সাধনা।

ফালতু কথা বলো না, নাচ তোমার সাধনা, আসলে তোমার নাচের উদ্দেশ্য কী, সেটা আমি জানি!

কী বলছো তুমি? বলো কী? আমার নাচের উদ্দেশ্য কী?

ইয়েস, ইয়েস, তোমার নাচের উদ্দেশ্য হলো জাস্ট বডি শো করা, আই মিন দেহ প্রদর্শন করা। তুমি কি মনে করো আমি বুঝি না? এখন বন্ধ করো এই নাচানাচি। দুনিয়ার পুরুষদের সামনে দেহ দেখায়ে এত কোমর না দুলালেও চলবে। অনেক তো নেচেছো বুক-পাছা নাচায়ে, আর কেন? কোনো না কোনো একটা সময়ে এসে তো থামাতে হবে তোমার এই নাচানাচি-কুন্দাকুন্দি।

বিস্ময়ে হতবাক, বিমূঢ় রিমঝিম! একেবারে সোজাসাপটা উত্তর, না, আমি নাচ ছাড়ার জন্য শিখিনি। তুমি যা ইচ্ছা তা-ই বলতে পারো, তোমার খুব ভালো করেই জানা উচিত। তা ছাড়া বিয়ের আগে তোমার এই মুখোশটাও তুমি খোলোনি। তখন একবারের জন্যও তো উচ্চারণ করোনি তোমার এই গোপন ইচ্ছা। তুমি কি মনে করেছো বিয়ের পর ট্রিক করে আমার নাচ ছাড়াবে? কোনোদিনও না, নাচ আমার এক জীবনের সাধনা।

প্রায়ই রায়হানের সাথে নাচ নিয়ে শুরু হয়ে যায় তুমুল ঝগড়া। সেদিনও এমন এক বিতণ্ডার সময় খ্যাপাটে হয়ে ওঠে রায়হান। টেনে ধরে রিমঝিমের চুলের মুঠি। চিত করে বিছানার ওপর ফেলে ওর বুকের ওপর বসে ক্রমাগত থাপড়াতে থাকে রিমঝিমের চোখেমুখে। লম্বা-চওড়া, শক্ত-সবল রায়হানের সাথে পেরে ওঠে না রিমঝিম। দুচোখে অন্ধকার নেমে আসে রিমঝিমের। চোখের পলকে ওয়ার্ডরোবের ওপর রাখা কেঁচিটা তুলে নেয় শক্তহাতে রায়হান। বিছানার সাথে ঠেসে ধরে খ্যাঁচ-খ্যাঁচ করে কেটে দেয় রিমঝিমের চুলের গোড়া থেকে। একমাথা ভরা ঘন কালো চুল রিমঝিমের। ঘন কালো চুলের মোটা একখানা বেণি বেঁধে ছেড়ে দিলে কালনাগিনীর মতো দুলতে থাকে ওর পিঠের ওপর। তার সহকর্মী নাচের শিল্পীরা প্রায়ই বলতো, রিমঝিম, কী সুন্দর চুল তোমার, শুধু সহকর্মী বন্ধুরাই নয়, কত কতজনের মুগ্ধ দৃষ্টি আটকে থেকেছে রিমঝিমের সেই বেণির ওপর। শুধু কি মাথার ওপরেই? অপরূপ মায়াবী মিষ্টিমুখ, গভীর কালো পাপড়িঢাকা দুই চোখ আর সাপের মতোই ছিপছিপে সুন্দর ফিগার, ঠিক যেন নাচের জন্যই তৈরি করেছেন সৃষ্টিকর্তা রিমঝিমকে।

রিমঝিমের নাচের তালিম শুরু তার মা আর বাবা দুজনার শখ আর আনন্দে। যখন রিমঝিমের মা গর্ভবতী, তখন স্বপ্নের জাল বুনেছে মা ও বাবা, যদি আমাদের একটা মেয়ে হয়, তাহলে নাচ শেখাবো। মা ও বাবা দুজনের মনের আশা পূর্ণ করে মেয়ে এলো কোলজুড়ে। সেই শখেই মা ও বাবা দুজনে মেয়ের নাম রেখেছে রিমঝিম। মাত্র দশ বছর বয়সে তাকে ভর্তি করে দিলো নাচের স্কুলে। প্রথমে বুলবুল ললিত কলা, তারপর কলেজ শেষ করলে তিন বছর শান্তি নিকেতনে। সেসবই কি সে আবর্জনার স্তূপে ফেলে দেবে? অথবা নষ্ট করবে রায়হানের খেয়ালের জন্য?

একি বলে রায়হান! তাকে নাচ ছেড়ে দিতে হবে!

গোছা ধরে কেটে ফেলা চুলের দিকে তাকিয়ে হু হু কান্নায় ভেঙে পড়ে রিমঝিম। সে যে বেণি দুলিয়ে নাচে তার প্রিয় ভরতনাট্যম, কত্থক, কথাকলি, মণিপুরি—এসব নাচ যে তার প্রাণের মতো প্রিয়। নাচের সময় সে তার অস্তিত্বের ভেতর অনুভব করে তার বেণির দোল। রায়হান কতদিন তার চোখের ওপর বেণির আবেশ নিতে নিতে বলেছে, জানো, রিমি, তোমার এই বেণিটা আমার দারুণ প্রিয়। কী অপূর্ব লাগে যখন বেণিটা দোলে তোমার পিঠের ওপর, আর নাচের সময় সেটা ঘুরে ঘুরে আসে তোমার বুকের ওপর, আবার ঘুরে যায় তোমার পিঠে, বিছা হারের চেয়েও সুন্দর, বেণি তো নয়, যেন প্রেমনাগ জড়িয়ে ধরে তোমার গলা। জানো, রিমঝিম, আমি মরতেও পারি তোমার এই নাচ দেখতে দেখতে। প্রেমের সময় চুলের যে বেণি রায়হানকে মুগ্ধ করতো, সেই বেণিই বিয়ের পর সে কেটে লুটিয়ে দিলো আজ! না, এ যে বিশ্বাস করতেও শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে, নিজেকেই অচেনা লাগছে রিমঝিমের!

আর এ কষ্টের কথা, এ যন্ত্রণার কথা সে কেমন করে বলবে মা-বাবাকে! কেমন করে মা-বাবাকে বোঝাবে সেই রায়হান আর এই রায়হান এক মানুষ নয়! রায়হান তার কাছে এখন বদলে যাওয়া এক ভয়ের নাম, এক হিংস্র আঘাতের নাম, এক নির্মম-নিষ্ঠুর কষ্টের নাম! কয়েক দিন ঘরে বসে কেঁদেকেটে শান্ত হয়ে ফোন করলো প্রিয় বান্ধবী প্রিয়তিকে। প্রিয়তি সেই ছোটবেলা থেকে একসাথে নাচের সাথি। নাচতে নাচতে বড় হয়েছে দুজন একসাথে। সব শুনে প্রিয়তি ফুঁসে ওঠে। কেন? নাচ ছাড়বি কেন তুই? তুই নাচ ছাড়বি না। শোন, তুই উইগ কিনে নে, উইগ মাথায় দিয়ে নাচবি, কেউ টের পাবে না। আর খুব বেশি বাড়াবাড়ি করলে তুই চলে যা মা-বাবার কাছে। একমাত্র সন্তান তুই, তোর সাথে এরকম বাড়াবাড়ি করছে শুনলে ওনারা নিশ্চয় চুপ করে বসে থাকবেন না। তোকে বুকে তুলে নেবেন, রেখে দেবেন তাদের ঘরে। তোকে আগলে রাখবেন বুকের ভেতর! আর করতে দেবেন না তোকে এই শয়তান প্রতারকের সংসার।

কয়েক দিন ঘরে বসে বিষণ্নতায় কাটানোর পর রিমঝিম এলো ধানমন্ডি সাতাশ নম্বরে ঝর্ণা আহমেদের কাছে। বিদেশি কসমেটিকস, ব্রা, পেন্টি থেকে মাথার উইগ—সবকিছু নিজের বাড়ির নিচতলা ও দোতলার সবটা জুড়ে সাজিয়ে বিক্রি করে ঝর্ণা আহমেদ। আর কাস্টমারের চাওয়া কোনো পণ্য না থাকলে প্রাইভেট অর্ডার, সাথে অ্যাডভান্স পেমেন্ট নিয়ে সেটা এনে দেয়। রিমঝিম তার কাছে এসে হাসিমুখে বললো, লম্বা চুল ম্যানেজ করা ঝামেলা। শুধু নাচের প্রোগ্রামে বেণি বাঁধার জন্য একটা উইগ ব্যবহার করবো, আর রেগুলার ইজি লাইফ লিড করার জন্য এখন থেকে ছোটই রাখবো মাথার চুল। লম্বা চুল ম্যানেজ করা অনেক ঝামেলা। এই মিথ্যা সাজানো ছাড়া রিমঝিম যেন আর কোনো পথ দেখে না ব্যাখ্যা দিতে লম্বা চুল হারিয়ে বাবরি হয়ে যাওয়ার। নাচের জনপ্রিয় শিল্পী রিমঝিম সহজেই যখন তখন নিউজ হয়ে যায় পত্রিকার। মুখরোচক সংবাদ হয়ে চলে আসে মিডিয়ায়। এখন যদি কোনোভাবে টের পায় সে স্বামীর আক্রমণের শিকার, তাহলে তো পত্রিকার আনন্দ-বিনোদনের পাতাগুলো ভরে যাবে সেই সংবাদে। আর সারা দিনের জন্য হবে বিনোদন মিডিয়ার আলোচনার হেডলাইন!

সেদিন কোমর পর্যন্ত লম্বা গোছা চুলের একখানা উইগ কিনে নিয়ে এলো রিমঝিম। শিল্পকলা একাডেমিতে আন্তর্জাতিক নারী দিবস উদ্‌যাপন, সেখানে প্রধান অতিথি থাকবেন প্রধানমন্ত্রী। গীতিনাট্যে আজ নাচবে রিমঝিমের দল। মেকআপ, সাজগোছ সবটুকু প্রায় শেষ হয়ে এসেছে, এমন সময় বাড়ি ফিরে এলো রায়হান। রিমঝিমকে সাজগোছ করা অবস্থায় দেখে খ্যাপা সুরে জিজ্ঞেস করলো, কোথায় যাচ্ছেন, ম্যাডাম? কোমর দোলাতে? বুক-পাছা নাচাতে? স্বামীর কথায় কোনো উত্তর না দিয়ে রিমঝিম হাতের ব্যাগ তুলে নিয়ে বের হতে উদ্যত হতেই রায়হান চেঁচিয়ে ওঠে, আমি যে কথা বলছি কানে যাচ্ছে না তোমার? উত্তর দেয়ার প্রয়োজন বোধ করছো না? কোথায় যাচ্ছো?

কানে যাবে না কেন? অবশ্যই কানে যাচ্ছে, অনেক বেশিই যাচ্ছে! কিন্তু তোমার এসব কথার কোনো উত্তর দিতে চাচ্ছি না আমি। তুমি তো কথা বলছো না আমার সাথে, এসে পর্যন্ত কন্টিনিউয়াসলি টিজ করে যাচ্ছো, মুখ খারাপ করে আজেবাজে কমেন্ট করেই যাচ্ছো। আমার উত্তর দেয়ার কিছু নেই।

রিমঝিম ঘরে থেকে বের হওয়ার জন্য পা বাড়াতেই পথ আগলে ধরে রায়হান। তুমি আজ নাচতে যাচ্ছো না।

মানে? কী বলছো তুমি?

খুব সহজ, সিম্পল কথা, ইজি টু আন্ডারস্ট্যান্ড, তুমি আর নাচতে যাবে না।

তুমি বললে আর হয়ে গেলো? আমি যাবো, অবশ্যই যাবো, তুমি অন্য কোনো কথা থাকলে বলো, আমার নাচ নিয়ে কোনো কমেন্ট করবে না, অথবা স্বামীগিরি দেখাবে না, আমি তোমাকে বারবার এই একটা কথাই বলছি, বলতে পারো অনুরোধ করছি।

শাটআপ, তোর নাচের মাইরেও চুদি না, খানকি মাগি, তোর নাচন-কোঁদন যদি আমি বন্ধ না করি...।

ফুঁসে ওঠে রিমঝিম, মুখ সামলে কথা বলো রায়হান, খবরদার, আমি তোমাকে নিষেধ করে দিচ্ছি, অসভ্য জানোয়ারের মতো আমাকে গালাগালি দিয়ে, আজেবাজে নোংরা ভাষায় কথা বলবে না।

কী করবি তুই? আমাকে ডর দেখাস? যা, বাইর হ-অ, বাইর হইয়া যা...।

না, না, ডর দেখাবো কেন? তুমি কী মনে করেছো? তুমি যা ইচ্ছা তা-ই ব্যবহার করবে, আর আমি সব সহ্য করে যাবো মুখ বুজে? কখনো না, আমি থাকবো না তোমার সাথে, নিশ্চয় বের হয়ে যাবো, আমার যাওয়ার জায়গা আছে, আমার মা-বাবা আছে। রিমঝিম ওয়ার্ডরোবের পাশে গিয়ে ড্রয়ার খুলে ধরে। বেডরুমের সাথে লাগোয়া ক্লোজেট থেকে হড়হড়িয়ে টেনে নিয়ে আসে খালি লাগেজখানা। ওয়ার্ডরোবের ড্রয়ার থেকে কাপড় নিয়ে ফেলতে থাকে লাগেজে।

এবার রায়হান লাথির পর লাথি মেরে দূরে ছুড়ে ফেলে লাগেজখানা। তারপর ওয়ার্ডরোবের ড্রয়ার থেকে রিমঝিমের পোশাক নিয়ে ছুড়ে ছুড়ে মারতে থাকে চারপাশে। সরে দাঁড়ায় রিমঝিম খাটের পাশে। সেখান থেকে বলে, তুমি বেশিই করছো বাড়াবাড়িটা। আমাকে তুমি বাধ্য করছো রায়হান, তোমার এখান থেকে চলে যেতে।

কই যাবি তুই? আরেকবার মুখ দিয়া যাওনের কথা বলছস যদি, তোর কপাল খারাপ আছে! ছুটে আসে রিমঝিমের পাশে। হ্যাঁচকা টান মেরে রিমঝিমকে টেনে নিয়ে চেপে ধরে বিছানার ওপর।

সেখান থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে রিমঝিম বলে, তুমি কিন্তু অনেক বাড়াবাড়ি করছো, রায়হান!

করবো, একশ’বার করবো, তুই বাড়াবাড়ির কী দেখছস? কী করবি তুই আমি বাড়াবাড়ি করলে?

তুমি জানোয়ারকেও হার মানাচ্ছ রায়হান! আমি বলছি তুমি থামো। আমাকে বাধ্য করো না চলে যেতে!

কই যাবি তুই? রাখ, আমি তোরে যাওয়াইতাছি বলেই রায়হান ছুটে যায় রান্নাঘরে। চুলার নিচে পাল্লায় রাখা আছে কয়েকটা দা, বঁটি। সেখান থেকে টান দিয়ে বের করে নেয় চকচকে দাখানা। এই দা দিয়ে বেশির ভাগ সময়ই বুয়া নারকেল ভাঙে, অথবা ছোট ছোট টুকরো করে মাংসের বড়সড় হাড্ডি। মুহূর্তে ফিরে আসে বেডরুমে রায়হান। ধাক্কা মেরে দ্বিতীয়বারের মতো রিমঝিমকে ফেলে দেয় মেঝের ওপর। মেঝেয় ফেলেই চেপে বসে রিমঝিমের বুকের ওপর। এলোপাতাড়ি কোপ মারতে থাকে রিমঝিমের দেহের নানা জায়গায়। ধারালো দায়ের কোপে কাতরে ওঠে রিমঝিম। আর্তনাদ করে ওঠে প্রাণের সমস্ত শক্তি দিয়ে, বাঁচাও...আর ঠিক তখনই আরেকখানা কোপ ঘাড়ের কাছে পড়তেই সে জ্ঞান হারায়। তখনো ক্রমাগত কোপাতে থাকে রায়হান। কোপাতে থাকে রিমঝিমের নাচের ঘাগরা তুলে হাঁটুর গোড়ায়, আর ক্রুদ্ধ, খ্যাপা কণ্ঠে বলতে থাকে, তোর নাচের পা আমি ফালায়া দিমু, এই পাও দিয়া নাচস, নাচের দেমাগ দ্যাখাস, তর মতো খানকি বেশ্যারে কী কইরা ঠিক করতে হয়, আমি জানি, তর নাচানির পাও আমি আলগা কইরা দিতাছি, রাখ...তরে আর নাচতে লাগবো না। ক্রমাগত কোপাতে থাকে রায়ান রিমঝিমের দুই হাঁটুর গোড়ায়। কোপাতে থাকে সে দেহের সমস্ত শক্তি দিয়ে রিমঝিমের পা দুটো শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য।

/জেড-এস/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
একটার পর একটা ধস শুরু হইছে, বাঁধটি ভেঙে গেলে আমরা সব হারিয়ে ফেলবো
একটার পর একটা ধস শুরু হইছে, বাঁধটি ভেঙে গেলে আমরা সব হারিয়ে ফেলবো
২০২৭ সালের মধ্যে সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন করবে সরকার
২০২৭ সালের মধ্যে সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন করবে সরকার
বিদ্যুৎস্পৃষ্টে মা-মেয়েসহ এক পরিবারের ৩ জনের মৃত্যু
বিদ্যুৎস্পৃষ্টে মা-মেয়েসহ এক পরিবারের ৩ জনের মৃত্যু
বিল পাস ও স্থায়ী কমিটি গঠনে সরকারের ভূমিকা নিয়ে টিআইবির উদ্বেগ
বিল পাস ও স্থায়ী কমিটি গঠনে সরকারের ভূমিকা নিয়ে টিআইবির উদ্বেগ
সর্বাধিক পঠিত
এমপির ‘দ্বিতীয় বিয়ে’ নানান প্রশ্ন, দ্বিতীয় স্ত্রী ও শ্বশুরের বক্তব্যে অমিল
এমপির ‘দ্বিতীয় বিয়ে’ নানান প্রশ্ন, দ্বিতীয় স্ত্রী ও শ্বশুরের বক্তব্যে অমিল
জামায়াত এমপির ভিডিও ভাইরাল, জানা গেলো আসল ঘটনা 
জামায়াত এমপির ভিডিও ভাইরাল, জানা গেলো আসল ঘটনা 
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বড় পরিবর্তনের পথে ইসি
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বড় পরিবর্তনের পথে ইসি
এবার কাশিমপুর মহিলা কারাগারের জেল সুপার বদলি, জেলার বরখাস্ত
এবার কাশিমপুর মহিলা কারাগারের জেল সুপার বদলি, জেলার বরখাস্ত
আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিলেন ভিডিও ছড়িয়ে পড়া এমপির প্রথম স্ত্রী
আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিলেন ভিডিও ছড়িয়ে পড়া এমপির প্রথম স্ত্রী