জগতের বস্তু ও ভাবপ্রকৃতি আর তাতে মানুষের উপস্থিতি ও অবস্থান কেমন, শুরুতেই এ প্রসঙ্গটির অবতারণা আমাদের কথামুখের পথকে উন্মুক্ত করতে পারে। পৃথিবীতে, যাপনের বিবেচনায়, অস্তিত্বের শর্তাধীন এবং শর্তস্বাধীন দুটি অবস্থাকে বিবেচনা করা যায় যদিও পুরোপুরি শর্তস্বাধীন বা শর্তাধীন জীবনযাপন বলে কিছু নেই। কিন্তু বিবেচনাটিকে একটু সীমিত করে আনলে মোটা দাগে কিছু বিষয়ে আলাপ আনা যায়। যদি আমরা ধর্মকে বিবেচনায় আনি, তাহলে দেখবো, ধর্মকে আশ্রয় করে গড়ে ওঠা পথকে আমরা বলতে পারি শর্তাধীন যাপন, যার মানে হলো, অনুসরণের দান অথবা দণ্ড হিসেবে ধর্ম আমাদের ওপর কিছু শর্তারোপ করে, আর আমরাও তাকে অনুসরণ করি দানগ্রহীতা বা দণ্ডিত হিসেবে। অর্থাৎ, ধর্মকে মানতে গেলে তার অনেক আচার-আচরণকে মানার দায় নিতে হয়, কিন্তু এই মানার পেছনে রয়েছে কতিপয় বিষয়কেন্দ্রিকতা, যার প্রধানতমটি হলো ঈশ্বরে বিশ্বাস। এটি একটি প্রয়োজনীয় শর্ত কিন্তু আবশ্যকীয় শর্ত নয়; আর অবশ্যকীয় শর্ত ছাড়া প্রয়োজনীয় শর্তপালন পূর্ণতা তো পায়ই না, বরং অর্থহীনও হয়ে পড়তে পারে।
আমাদের এ পৃথিবী মূলত নানা জগতে বিভক্ত: বহির্জগৎ, অন্তর্জগৎ, বৌদ্ধজগৎ, অধ্যাত্মজগৎ। এর মধ্যে সবগুলোতেই মানুষ ঈশ্বরের বিভাবকে অনুভব করে থাকে, এমনকি যে বৌদ্ধজগৎ বুদ্ধির বিষয়ীভূত সেখানেও। এছাড়া বহির্জগৎ যা ইন্দ্রিয়নির্ভর, তার চেতন এলাকায় মানুষ এক বিশেষ আধ্যাত্মিক আবেশকে আবিষ্কার করে বসে। বহির্জগতের অন্তর্গত যে প্রাকৃতিক জগৎ, তার বিস্তার ও গভীরতার কাছে মানুষের একজাতীয় বিমুগ্ধতা আছে, আছে এই বিমুগ্ধতার আর্তিও। আবার অন্তর্জগতের রয়েছে এক অনন্ত অনন্তবোধ, এখানে বস্তুভাবে পরিণত হয়ে যায় ঠিক বিশাল চুম্বকক্ষেত্রের মধ্যে সকল ধাতু আটকে থাকার মতো। বৌদ্ধজগতে সৃষ্টি ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য, তাই সমস্ত জগৎকে এর অধীনে আনার প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকে। আর অধ্যাত্মজগৎ হলো বিবেকচালিত, যাকে আবার বলা হয় ধর্মেন্দ্রিয়, যেখানে সত্য-মিথ্যা, পাপ-পুণ্য, ন্যায়-অন্যায়কে চিহ্নিতকরণের কাজ চলতে থাকে। মানবমনের, এবং মানবচিন্তার ইতিহাসের প্রধান আধারটি ধরা আছে এই ভাবনায় যে মানুষের ব্যক্তিত্ব শুধু শরীরসর্বস্ব নয়, বরং শরীরকে কেন্দ্র করে এমন একটা কিছু রয়েছে, যা এসবের বাইরে ব্যক্তিকে নিয়ে যায়, যাকে বলা যায় মন। বুদ্ধ ব্যক্তিসত্তাকে পাঁচ ভাগে ভাগ করেছেন: রূপ, বেদনা, সংজ্ঞা, সংস্কার এবং বিজ্ঞান। এর মধ্যে রূপ ব্যতীত অবশিষ্ট চারটিই মানসিক ধর্ম, শুধু রূপই হলো জড়। সুতরাং আশি শতাংশই বলা যায় মন-সংশ্লিষ্ট। আর এর হাত ধরে আধ্যাত্মিকতা দানা বাঁধতে থাকে। ব্যক্তিত্বের মানসিক প্রকৃতি যে মানুষটিকে প্রভাবিত করবে তাতে সন্দেহ কী? আবার জড় স্থির নয়, তা গতিশীল, ফলে চেতনার সঙ্গে জড়ের সংযোগ রয়েছে।
এখন এ জায়গাটিকে যদি আমরা প্রস্থানক্ষেত্র করি তবে দুটি বিবেচনা আসে: এক শুদ্ধ-পবিত্রের জন্য মানুষের আকুলতা আর অমরতার আকাঙ্ক্ষাবোধ। এ দুটি আবার একটি স্থানাঙ্ককে খুঁজে পেতে চায়, যাকে আমরা বলি ঈশ্বর, এই ঈশ্বরকে আমরা ইমেজও বলতে পারি। কিন্তু এই ঈশ্বর কীভাবে বিরাজিত মানুষে? প্রশ্নটির মীমাংসা সহজ নয়, বরং তা অনেকটা অমীমাংসিতই, বলা যায়। ঈশ্বর যে বিরাজমান এ ইতিবাচকতায় না গিয়েও আমরা ধরে নিতে পারি, ঈশ্বর তাঁর জানান দেন দুভাবে: মানুষের মনের প্রপেলারকে ঘুরিয়ে দিয়ে, আর তাঁর আস্তিত্বিক সত্তাকে প্রতিষ্ঠার জন্য, ক্রিয়াশীল করার জন্য, উপাসনালয় সৃষ্টির মাধ্যমে। মানুষের ইতিহাসে এ ব্যাপারটি এমনভাবে ঘটেছে যে এমন কোনো সমাজব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি যেখানে ঈশ্বরে বিশ্বাস করাটাকে বাতিল করে দেওয়া যায় সামগ্রিকভাবে। অর্থাৎ, কোনো সমাজই এই ঐশ্বরিক প্রপঞ্চকে মূলোৎপাটিত করতে পারেনি, কিছুটা হয়তো নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে। অন্যদিকে, এই সামাজিক অবস্থার বিপরীতে ব্যক্তিমনের বিবর্তন থেমে থাকেনি। ইতিহাসের শুরু থেকেই এই বিশ্বাসটি মানসিক বিবর্তনের ভিতর দিয়ে ক্রমাগত অগ্রসর হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের একটি উক্তিকে সাধারণভাবে দেখলেই বিষয়টা আরও পরিষ্কার হয়ে যাবে। একটি চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ লিখছেন: ‘‘আমি যে-গৃহে জন্মেছি সেখানকার ধর্ম্মেই দীক্ষা পেয়েছিলুম। সে ধর্ম্মও বিশুদ্ধ। কিন্তু আমার মন তারই মাপে নিজেকে ছেঁটে নিতে কোনোমতেই রাজিদ ছিল না। তবু আমার এ নিয়ে টানহেঁচড়া মুক্তির প্রয়াস।" রবীন্দ্রনাথের এ কথায় একটি ভাব দানা বাঁধে যে ধর্মকে পছন্দনীয় করা বা স্বনির্বাচিত করার কাক্সক্ষা মানুষের চিরন্তন আর্তি। ফলে এ বিষয়টাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল সারা বিশ্বে যে কীভাবে ব্যক্তিকে ধর্মজীবনে স্বাধীন রাখা যায় আর সমাজকেও ধর্ম থেকে স্বাধীন রাখা যায়। অর্থাৎ, ব্যক্তি ও সামাজিক জীবনে ধর্ম ততটুকুই ক্রিয়াশীল থাকবে যতটুকু ব্যক্তি ও সমাজ তাকে ছাড় দেবে। ধর্ম ও রাষ্ট্র যে পৃথক দুটি বিবেচনা, এই বিষয়টা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে যখন বাহ্যিকতার কারণে ধর্মের মাহাত্ম্য ও মহত্ত্ব মানুষের কাছে সন্দেহের উদ্রেক করে বসে। অর্থাৎ, ধর্ম আর দশটা উপাদানের মতোই রাষ্ট্রের অঙ্গীভূত একটি বিষয়, যা কোনোরকম অপতৎপরতা বা প্রতিক্রিয়া ছাড়াই অরাজনৈতিক থাকবে, তার শ্রেষ্ঠ আশ্রয়স্থল হলো মানুষের মন। সমাজে তার অস্তিত্ব থাকবে ধর্মীয় মূল্যবোধের শান্তিকল্যাণের সর্বজনীনতাকে প্রকাশ করার মধ্যে সীমিত। অর্থাৎ, যেকোনো ধর্মের আহ্বানগুলো অন্য ধর্মের সঙ্গে সংগতিহীন ও সাংঘর্ষিক হলে তা সামাজিকভাবে প্রকাশ্য হবে না, অর্থাৎ, পার্থক্যের মধ্যেও মিলনের পথটিকে ঠিক রাখতে হবে।
প্রাপ্ত ধর্মকে ঠিক জেনেও তাতে এঁটে না থেকে বা ‘‘তারই মাপে নিজেকে ছেঁটে ’’ না-নিয়ে কোথাও মুক্ত হওয়ার বাসনার যে-কথা রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, তাকে আমরা কী বলতে পারি? ধর্মের এই আঁটসাঁট পরিসরে আটকা না পড়ে বাইরের কোনো কিছুর অন্বেষণকে আমরা বলতে পারি ‘‘আধ্যাত্মিকতা"। আরও স্পষ্ট করে বললে, ধর্মের ছাঁচ, মতবাদ ও প্রথাকে অতিক্রম করে অন্তরের অনুভূতির জাগরণ ঘটানো এবং এর মাধ্যমে জগৎ ও জীবনকে ধরার যে মুক্তবেগ অর্জন, সেই আধ্যাত্মিকতা। বাহ্যিক ধর্ম সেটা করতে পারে না, সাধারণ ধর্ম সাধারণত আবদ্ধ থাকে ‘‘কী", ‘‘কীভাবে", ‘‘কোথায়"—এর গোলকধাঁধা; অর্থাৎ নিয়মের নিগড়ে। ‘‘ইস্ট অ্যান্ড ওয়েস্ট" নামের আরেকটি প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ বলেন, ‘‘ভিন্নতাকে বাদ দিয়ে নয়, ভিন্নতার মাঝ দিয়েই আমাদের একত্রিত হতে হবে, কারণ ভিন্নতা কখনও লুপ্ত হবে না, আর ভিন্নতা ব্যতিরেকে জীবন আরও নিষ্প্রাণ হয়ে পড়বে। সকল মানবগোষ্ঠী স্বকীয় ব্যক্তিত্ব বজায় রেখে একতাবদ্ধ হোক, তবে তা প্রাণহীন সমরূপতায় নয়, জীবন্ত ঐক্যে।" রবীন্দ্রনাথের এ কথার মধ্যে রয়েছে ভিন্নতাকে নিয়েই এক অভিন্নতায় পৌঁছার কথা। একে কথা না বলে প্রাণের দর্শনবিভা বলা চলে, কারণ পৃথিবীকে রক্ষা করতে গেলে এ ছাড়া আর ভিন্ন কিছু নেই।
যে সমস্ত ভিন্নতাগুলো ব্যবধান বাড়ায়, সেগুলোকে নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় না এনে এমন কিছুকে আনা দরকার যা ভিন্নতাকে একক নেতৃত্বে না এনেও তাদের রক্ষা করবে। যেহেতু রাষ্ট্রভাবনা ইহকালিক আর ধর্মভাবনা পারকালিক, তাই রাষ্ট্রভাবনায় ধর্মকে যুক্ত করা একটি ‘‘slippery-slope" সমস্যা সৃষ্টি করে। অর্থাৎ, রাষ্ট্রের সঙ্গে ধর্মকে অনুমোদন করা হলে তা পরিণতিতে সামান্য লাভের বিনিময়ে ক্ষতিকর ফলাফলের দিকে এগিয়ে যাবে। রবীন্দ্রনাথ যাকে বলেছেন, ‘‘ধর্মের বেশে মোহ যারে এসে ধরে"র মতো অবস্থা, যা মানুষকে অন্ধ করে যে-মানুষ ‘‘মারে আর শুধু মরে।" সুতরাং সমাজে এ জাতীয় অন্ধ বিন্দুর জন্ম হওয়া সুখকর হবে না। আরও মনে রাখা প্রয়োজন, মতবাদকেন্দ্রিক রাজনীতি বা সরকারব্যবস্থা সর্বাত্মকবাদী হয়ে ওঠার আশঙ্কা থাকে, যা রাষ্ট্রের বিধিসংগত শাসনের বিরুদ্ধে মেতে ওঠে।
সংস্কারযুগ আর ফরাসি বিপ্লবের মাঝের সময়টিতে নতুন একটি ভাবধারার আগমন ঘটে, যাকে বলা হয় উদারবাদ, যা রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রণের ভূমিকাকে প্রভাবিত করতে থাকে নতুন পৃথিবীর ভাবনাকে মাথায় রেখে। এই ধারা বা ধারণা খ্রিষ্টীয় জীবনকে পুনরাবিষ্কার করতে চায়, পোপের বাঁধন ছিঁড়ে খ্রিষ্টত্বকে প্রতিষ্ঠা করতে চায়, এমনকি পোপকে খ্রিষ্টবিরোধী বলেও মনে করতে চায়। হ্যারল্ড জে. লাস্কির ভাষায়, ‘‘ইংলিশ রিফরমেশন" সংক্ষেপে তিনটি জিনিস সম্পন্ন করে: যাজকতন্ত্রকে উচ্ছেদ করে, খ্রিষ্টীয় কর থেকে জনগণকে রেহাই দেয়, যাজকদের হাত থেকে সম্পত্তিকে জনগণের কাছে ফিরিয়ে দেয়। পরিবর্তনের এই উত্তরণের অবস্থাকে সংহত করার জন্য রাষ্ট্রের রাজনৈতিক দর্শনের সংস্কারের প্রয়োজন দেখা দেয় আর এক্ষেত্রে সেক্যুলারিজমই একমাত্র রক্ষাকবচ হিসেবে বিবেচিত হতে থাকে।
সেক্যুলারিজম শব্দটি আধুনিক মননে-মনস্তত্ত্বে-আচরণে-রাজনীতিবিজ্ঞানে যেভাবে আলোচিত, তার তুল্য শব্দ দ্বিতীয়টি খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। এই শব্দটি একটি তুমুল প্রপঞ্চ হয়ে উঠেছে, কারণ এটি এক অভিজ্ঞতা যাকে উপলব্ধি, পর্যবেক্ষণ এবং ধারণ করা হচ্ছে সামাজিক বা রাজনৈতিকভাবে গতিশীলতার আওতায়, নিরন্তর। শুধু সামাজিক বা রাজনৈতিক অর্থেই নয়, মনোজাগতিক অর্থেও এটা এক গতিশীল প্রপঞ্চ। এবং সেক্যুলারিজম একটি গতিবিকাশী প্রপঞ্চ, এটি সামষ্টিক ও ব্যষ্টিক জায়গা থেকে রূপান্তরশীল ভূমিকা রাখে নিজ মাত্রাকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য। কিন্তু শুধু তাই নয়, এটি দ্বান্দ্বিকও। ফলে সংশ্লেষণী সিদ্ধান্তে না থেকে বিশ্লেষণী সিদ্ধান্তের দিকে তা ধাবিত হয়। শব্দটি নিরীহ তো নয়ই, বরং সংবেদী, উল্লাসী ও প্রগতিবাদী। এবং অনেক দেশেই এটি একটি সক্রিয় দ্বন্দ্বের জন্ম দেয়, যা সে দেশের ফলিত রাজনীতির গতিপথকে নিয়ন্ত্রিত করে, বা করে উঠতে চায়, তা মনোরাজনীতিকেও প্রভাবিত করে।
আধুনিক পার্থিবমানসকে বিনির্মাণে সেক্যুলারিজমের মৌলিক প্রভাব রয়েছে, এবং এটা পুঁজিবাদ বা সাম্যবাদ বা গণতন্ত্র বা উদারতন্ত্রবাদের মতো কোনো ধারণা নয়, যা শুধু কোনো মানসিক উপস্থাপনা করে থাকে, বরং এটি একটি সক্রিয়তা যা রাষ্ট্রের অন্তর্গত নাগরিকদের রাজনৈতিক উপস্থিতিকে তাদের ধর্মীয় অংশগ্রহণের স্বাধীনতা থেকে আলাদা করে রাখে, এবং রাষ্ট্রও এ বিশ্লিষ্টতাকে রাজনৈতিক ভিত্তিতে বিন্যস্ত করে। প্রাচীন গ্রিসের ‘‘আইসোনোমিয়া (Isonomia)’’ ধারণায় একটি রাজনৈতিক অবস্থায় আইনের দৃষ্টিতে নাগরিকদের যে সমতার ধারণা বা রোমকদের ‘‘সিভিতাস (Civitas)’’ ধারণায় যে নাগরিক-রাষ্ট্রনীতির কথা বলা হয়েছে, সেখানে সেক্যুলারিজম ছাড়া তার সুষ্ঠুতা প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা সংকীর্ণ হয়ে পড়ে। হেরোদোতোস এই আইসোনোমিয়াকে গণতন্ত্রের সদ্গুণ বলে বর্ণনা করেছেন।
পৃথিবীর ইতিহাসে রাষ্ট্রচালনার যে সকল পদ্ধতি প্রাচীন বা মধ্যযুগে ছিল বা এখনও রাষ্ট্রদেহে ও চরিত্রে সামান্যতম যার চিহ্ন রয়েছে, সেসবের প্রায় সবগুলোই অধিবিদ্যা বা ধর্ম বা বহমান প্রথার সারাৎসার থেকে সংগৃহীত, কখনও একাধিক পদ্ধতি থেকে নিয়ে তার ফলিতরূপ দেওয়া হয়েছে। এসবের শিকড় অবশ্যই অগভীর বা সুগভীরভাবে প্রোথিত রয়েছে কোনো মতবাদে বা মতবাদিক পরিসরে। কিন্তু সেক্যুলারিজম কোনো মতবাদ (ডকট্রিন) নয়, এটি বড়োজোর মনোভাব যা এককভাবে আধুনিককালে মানবোদ্ভূত, তবে তা অনেকটা বিপ্লবীচরিত্রেই আবির্ভূত যেখানে ধর্মের নাক-গলানোকে বন্ধ করে বা সীমিত করে মানুষের ইহজাগতিক কল্যাণকে নিশ্চিতকরণের দায়িত্ব রাষ্ট্রের হাতে সমর্পণ করা হয়েছে। এটি ছিল রাষ্ট্রীয় নীতিপ্রশ্নে প্যারাডাইম শিফটের মতো। এ জাতীয় প্যারাডাইম শিফটিং ঘটেছে খ্রিষ্টেনডোমে যখন রোমান আইনের ভেতর খ্রিষ্টীয় পুরোহিতদের তথা যাজকদের ক্ষমতার অনুপ্রবেশ ঘটছিল আর ইসলামি রাষ্ট্রের ভেতর যখন প্রচলিত আইনকানুনকে প্রতিস্থাপন করেছিল ইসলামি আইন। এসব রাষ্ট্রে মানবভাবনা ছিল পরাধীন ধর্মাশ্রয়ী, বিশেষত রাষ্ট্রীয় ধর্মকে এবং তার বিশ্বাসীদের অগ্রাধিকার প্রদানের মাধ্যমে পরিচালিত একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা যা নির্ভরশীল থাকত ধর্মের বিধিব্যবস্থার ওপর। কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের আবির্ভাব মানবভাবনার এক ভিন্ন প্রপঞ্চকে হাজির করলো, যাতে রাষ্ট্রের দায়িত্ব প্রশ্নে সকল নাগরিককে ইহজাগতিক কল্যাণের ছাতার নিচে আনার উদ্যোগ নেওয়া হলো। অর্থাৎ, রাষ্ট্রের যে রাজনৈতিকতা, সে ব্যাপারটায় একটি নতুন দৃষ্টান্ত বিশিষ্টতার সাথে আবির্ভাব ঘটলো। মানুষের পরকালীনতাকে সমাজ বা রাষ্ট্রকেন্দ্রিক দায় থেকে মুক্ত করে একান্ত ব্যক্তির দায় হিসেবে বিবেচনা করা হলো আর মানুষের ইহকালীনতায় রাষ্ট্রের দায়কে পরিষ্কার ও উদ্ধত করা হলো। এটা বিপ্লবাত্মক, কারণ এর দ্বারা ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে গিয়ে ইহকালকে দেখার সুযোগ এলো এবং এই দেখার ব্যাপারটা এমনভাবে ঘটল যাতে রাজনীতি, সমাজনীতি বা অর্থনীতিকে ধর্মের ছায়াতল থেকে সরিয়ে ফেলা হলো। কিন্তু এতে প্রকৃত ধর্মের ক্ষতি হলো না, বরং তার পরিসরকে আরও নিবিড় করা হলো। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন যে ধর্মের যে দিকটা বিশুদ্ধভাবে আধ্যাত্মিক, সেখানে ধর্ম স্ব-প্রতিষ্ঠ। যেদিক প্রাকৃতিক সেদিকে ইতিহাস বা বিজ্ঞানের বিচার চলবেই। ইহজাগতিকতা ধর্মের ‘‘আধ্যাত্মিক" দিকটাকে ঠিক রেখে তার ‘‘প্রাকৃতিক" দিকটাকে ঘুচিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলো। এই প্রাকৃতিক দিকটাতেই থাকে ধর্মের আচার, অনুষ্ঠান, রাজনীতি, সমাজনীতি ইত্যাদি।
বিখ্যাত চিন্তক চার্লস টেইলর তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ আ সেক্যুলার এজ-এ ‘‘সংহতির যুগ" নামের অধ্যায়ে বলেছেন সেক্যুলারাইজেশন তত্ত্বের কথা। তার আগে তিনি বলেছেন, অষ্টাদশ শতাব্দের শেষে খ্রিষ্টানত্ব থেকে স্বতন্ত্র মানববাদে সম্ভাব্য উত্তরণের বিষয়টির কথা। এটাকে তিনি বলেছেন ‘‘নোভা ইফেক্ট"। তিনি বলছেন, এসবই ঘটেছিল সমাজের এলিট শ্রেণির বা বৌদ্ধিক শ্রেণির মধ্যে। এই বহুত্ববাদিতা পুরো ঊনবিংশ শতাব্দ ধরেই ঘটেছিল। এভাবেই ধর্মীয় বা অধর্মীয় বা বাস্তব-সামাজিক চিন্তার ‘‘প্যারাডাইম শিফট" ঘটতে থাকে, যা অবশেষে সেক্যুলারাইজেশন তত্ত্বে প্রতিফলিত হয়। তাঁর মতে, এক্ষেত্রে যে ঘটনাদিগন্ত উন্মোচিত হয় তার দশাগুলো হলো: ধর্মনিরপেক্ষতা ১ ( জনজীবন থেকে ধর্মের পশ্চাদপসরণ), ধর্মনিরপেক্ষতা ২ (বিশ্বাস ও পালনের কমতি), ধর্মনিরপেক্ষতা ৩ (বিশ্বাসের ধরনে পরিবর্তন)। এর মধ্যে ৩ নম্বরটি ২ নম্বরের কাছাকাছি। কিছুই এগুলোকে অনিবার্য করে তোলে না কিন্তু মৌলিক পরিবর্তনের বহুমুখিতা না হওয়া পর্যন্ত মোটের ওপর এগুলো ঘটতে পারে না। প্রথমটির ক্ষেত্রে জনজীবনে ধর্মের প্রভাব এবং ব্যক্তিজীবনেও ধর্মের প্রভাবের নেতিবাচকতা দেখা দেয়। এর হাত ধরেই ঘটে দ্বিতীয় ধরনের পরিবর্তন। উল্টো করেও বলা যায়, ৩ নম্বরটি ২ নম্বরকে আর ২ নম্বরটি ১ নম্বরকে প্রভাবিত করেছে। যেখানে ধর্মের প্রথাগত সংস্কারাদির প্রতি মানুষের অনীহা স্পষ্ট হয়ে পড়ে। এখানে মনে রাখা দরকার, প্যারাডাইম শিফট হলো গতির পরিবর্তন, যা পুরোনো অবস্থাকে বিদায় করে নতুন ভাবধারাকে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করে।
আধুনিক রাষ্ট্র হলো সার্বভৌম। এই রাষ্ট্র আসলে ষোড়শ শতাব্দের ধর্মীয় সংঘর্ষের অনিবার্য ফল, অন্তত পশ্চিমি প্রেক্ষাপটে। ইউরোপে ধর্মবিবাদ নিমিষেই একটি ধর্মসংঘর্ষে রূপ নিয়েছিল। আন্তঃধর্মীয় বা আন্তসম্প্রদায়ের মধ্যকার সংঘর্ষের আগে একাদশ থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দে খ্রিষ্টান-মুসলিম যুদ্ধ দেখা দিয়েছিল ক্রুসেডের আকারে। তারপর ষোড়শ শতাব্দে দেখা দেয় আন্তঃধর্মীয় সংঘর্ষ। এর আগে পশ্চিমা সভ্যতা ছিল একটি একক কমনওয়েলথ বা আরও সীমিত ও সুনির্দিষ্টভাবে বললে বলা যায় রিপাবলিকা ক্রিশ্চিয়ানা, যেখানে আধুনিক-অর্থে, সার্বভৌমত্বের অস্তিত্ব ছিল না। ৪. কোনো না কোনোভাবে চূড়ান্ত ক্ষমতা ছিল সম্রাট ও পোপের কাছে, অনেকটা দ্বৈত চারিত্র্যে, যেখানে বাহ্যিক ও মানসিক সংঘর্ষ ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু এ দুয়ের অনিবার্য সংঘর্ষ থেকে রিপাবলিক অব বোদাঁ বা ফরাসি দার্শনিক জাঁ বোদাঁর (Jean Bodin) ৫. রাজনৈতিক দর্শন হিসেবে পরম সার্বভৌমত্ব ধারণার জন্ম হয়। বোদাঁ বলেন, আইন হলো সেটাই যা আদেশ করা হয়েছে: jus est quod jussum est 5: সার্বভৌম রাষ্ট্র ধর্মীয় দাবিকে বাতিল করে ধর্মনিরপেক্ষ দাবিকে তুলে ধরে। এই সার্বভৌমতার মাঝ দিয়ে রাষ্ট্রের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটে যা রাষ্ট্র ও ধর্মের আলাদাকরণকে নিশ্চিত করতে চায়। কিন্তু রাষ্ট্রের এই সার্বভৌমত্ব কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর চিন্তার ফল নয়, বরং তা রাষ্ট্রের মানবচৈতন্যের একটি ফলিত রূপ। লাস্কির কথায় সার্বভৌমত্ব হলো: ‘‘এটি অন্যান্য সম্প্রদায়ের সমীপে স্বাধীন। এটি এমন একটি শক্তি ধারণ করতে পারে, যা বাইরের কোনো শক্তির প্রভাব ছাড়া নিজেই কার্যকর। তাছাড়া, এটি যে অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করে, সেখানে তা অভ্যন্তরীণভাবে সর্বময়।" ৬. সুতরাং রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের বিবেচনা ঐশ্বরিক সার্বভৌমত্বকে বাতিল করে এগিয়ে যায় যার রাজনৈতিক ফলাফল হলো ধর্মনিরপেক্ষতা। যেহেতু সার্বভৌমত্বের মানে এটাও যে রাষ্ট্র কোনো দায়িত্বহীন ইচ্ছার ধারক হবে না তাই দায়িত্বশীল ইচ্ছার ধারক হিসেবে রাষ্ট্র সকল নাগরিকের সাধারণ ইচ্ছাকে পূরণে সচেষ্ট থাকবে। আর এই সাধারণ ইচ্ছার সবকিছুই সামবায়িক যা একইসঙ্গে সামষ্টিক উপযোগিতার সৃষ্টি করে, আর এটা কেবল সম্ভব ইহজাগতিক লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যগুলোকে সম্বোধন করার মাধ্যমে। ধর্মের লক্ষ্য অর্জিত হয় বিশ্বাসগত ব্যক্তিস্বভাবের উপকরণমানে। রাষ্ট্র কাউকে ধর্মশীল করে তুলতে পারে না, যা ব্যক্তির ধর্মীয় প্রাপ্তির নিশ্চয়তাজ্ঞাপক। ব্যক্তিমানসের ধর্মস্বভাব এক এক ধরনের এবং ধর্মীয় পরিত্রাণের দায়ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক। ব্যক্তির ধর্মীয় বা আধ্যাত্মিক পরিত্রাণে প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থন তার পরকালীন স্বাধীন প্রচেষ্টাকে প্রভাবিত করে যা ধর্মীয় মুক্তির প্রশ্নে পক্ষপাতযুক্ত। আর ধর্মের ফলাফল ইহকালিক নয়, পারকালিক। ধর্মে গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের সংশ্লিষ্টতা দেখা দিয়েছিল তার সম্প্রসারণের যুক্তিতে, যা এখন অপ্রযোজ্য। এসব কারণে মানুষের যে ধর্মগত আচরণ তার একটা ‘‘মদুস ভিভেন্দি" ৭. রক্ষা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব কিন্তু তা সম্ভবপর হয় রাষ্ট্রকে ধর্ম থেকে বিচ্ছেদের মাধ্যমে। ধর্মকে ক্ষমতা বা রাষ্ট্রের সঙ্গে সংযুক্ত করলে স্রষ্টার প্রতি ব্যক্তির দায়বদ্ধতার রাজনীতীকরণ ঘটে যা ধর্মের স্থান থেকে ব্যক্তির পরিত্রাণভাবনার সঙ্গে সংগতিহীন। ধর্মের পরিত্রাণভাবনা হলো ব্যক্তির নিজস্ব উপলব্ধি ও সমর্পণের একটি প্রপঞ্চ যা সামষ্টিকভাবে যুক্ত হয় না।
সেক্যুলারিজম ধর্মের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় না, যতক্ষণ-না ধর্ম রাজনীতিতে বা সমাজনীতিতে বা সম্প্রদায়নীতিতে হস্তক্ষেপ করে। তবে সেক্যুলারিজম ধর্মকে সীমিত রাখতে স্বেচ্ছাপরিকর, ধর্মের পরিসরকে আত্মিকতা দিতে বেশি আগ্রহী। আধ্যাত্মিক ভূমিকার বাইরে ধর্মের রাজনৈতিক-সামাজিক-অর্থনৈতিক ভূমিকার পরিসর সৃষ্টি করাকে তা বন্ধ করতে চায়। পৃথিবীতে সেক্যুলারিজমের যত রূপ তার মধ্যে তার অভিযোজিত রূপটিই অধিক আচরিত। এমনকি কোনো কোনো দেশে ধর্মকে গণতান্ত্রিক পিলার হিসেবেও সেক্যুলারিজম ব্যবহার করে থাকে। অনেক সময় ধর্মনিরপেক্ষতাকে উপেক্ষা করে বহুত্ববাদের বাতায়নে একে ঢেকে দেওয়া হয়। এটা মনে হয় ঘোড়াবিহীন গাড়ির মতো। রাজনীতিতে ধর্মের অনুপ্রবেশ একটি বিভাজনমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্ম দেয় যা জনবৈষম্যকে উগরে দেয়।
তালাল আসাদ বলেছেন, সেক্যুলারিজমকে বোঝা যেন আধুনিক জীবনের একটি প্রবল ধারণাকে বোঝা, এজন্যই সম্ভবত এক্ষেত্রে পরোক্ষভাবে অগ্রসর হওয়া উত্তম; তাঁর মতে সেক্যুলারিজম বিষয়টি স্বাভাবিক ধরে নেওয়ার ব্যাপারটাই সমস্যা। তাঁর মতে সেক্যুলারিজমের নিরপেক্ষতার মিথকে ভেঙে ফেলা উচিত। কিন্তু তিনি কোনো সেক্যুলার-বিরোধী ইশতাহারকে হাজির করেন না, তাঁর উদ্দেশ্য সেক্যুলারিজমের ধন্বন্তরি ভাবকে নস্যাৎ করা। একটি দেশের যে রাজনৈতিক জাতীয়তা, যেখানে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ অভিন্ন রাজনৈতিক সত্তা হিসেবে বাস করে, বাহাস করে, অংশগ্রহণ করে; সেখানে সেক্যুলারিজম তার ভূমিকাকে দৃঢ় করে, আবার সাংস্কৃতিক জাতীয়তায় ধর্মবিষয়ক ভূমিকাকেও দৃঢ় করতে পারে।
এখানে একটি কথা বলা উচিত, ‘‘মনোভাব" (অ্যাটিটিউড) আর ‘‘আচরণ" ( বিহেভিয়ার) এক বিষয় নয়; প্রথমটি ব্যক্তিগত যদি না তা পরেরটিতে পরিণত হয়, আর পরেরটি বাহ্যিক। রাষ্ট্রপরিচালনায় বা সমাজপরিক্রমায় আচরণ একটি বড় বিষয়। রাষ্ট্রনীতিতে প্রাইভেট আর পাবলিকের পার্থক্য রয়েছে। যতক্ষণ না ‘‘প্রাইভেট" ‘‘পাবলিক" কে প্রভাবিত করে, ততক্ষণ পর্যন্ত রাষ্ট্রনীতিতে ‘‘প্রাইভেট"-এর গুরুত্ব নেই। অর্থাৎ, এ দুটি স্বাধীন প্রপঞ্চ থাকলে রাষ্ট্রনীতিতে তা সমস্যার সৃষ্টি করে না, সমস্যা হবে এ দুটি একাকার হয়ে ক্ষমতা বা শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলে। মনোভাব হলো একটি আভ্যন্তরিক মানসিকতার রূপ যার সঙ্গে বিশ্বাস ও আবেগের সদাসম্পর্ক রয়েছে, কিন্তু যা দৃশ্যমান নয়, আর আচরণ হলো বাহ্যিকতা যার দৃশ্যমানতা রয়েছে। রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে মনোভাব বলে কিছু থাকে না, থাকে আচরণ; আবার ব্যক্তির ক্ষেত্রে দুটিই থাকে, কিন্তু ব্যক্তির সমাজভাবনার বা রাষ্ট্রভাবনার মধ্যে এ দুটির স্বাধীন অবস্থান থাকা জরুরি, তা না-হলে সামষ্টিক উন্নয়নে তার প্রভাব হয়ে পড়ে নেতিবাচক এবং মানববিরোধী। সুতরাং ব্যক্তির মনোভাব থেকে তার আচরণকে স্বাধীন রাখা রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক ধর্মনিরপেক্ষতাকে ঠিক রাখার জন্য জরুরি, কারণ মনোভাব অব্যক্ত আচরণ ব্যক্ত। অব্যক্ত জিনিস অবচেতন বা নির্জ্ঞান স্তরে থাকে, ফলে তার প্রকাশ সাধারণত প্রকাশ্য হয় না; গোপনে টিকে থাকে এবং পরে সহিংস বা বিদ্বেষমূলক রাজনীতিতে প্রকাশ পায়। মনোভাবকে অবদমনের মাধ্যমে দূর করা না গেলেও চাপিয়ে রাখা সম্ভব; এক্ষেত্রে শিক্ষা, সংলাপ, সচেতনতা বা আইনের মাধ্যমে মনোভাবের ‘‘প্যাসিভ অ্যাগ্রেশন", ‘‘সোশাল ব্যাকলাশ"কে দূর করা সম্ভব, তা না করা হলে এটার মানসিক প্রতিক্রিয়া (সাইকোলজিক্যাল ব্যাকফায়ার) হওয়ার আশঙ্কা থাকে। কিন্তু সবচেয়ে মারাত্মক হয়ে ওঠে যখন মনোভাব ও আচরণ একাকার হয়। ‘‘মনোভাব" যখন সক্রিয় শিকড় গাড়ে আর তার ফলে ‘‘আচরণ" বৃক্ষ হয়ে ওঠে তখন তা একটি বিপর্যয়ের জন্ম দেয়। সুতরাং সেক্যুলারিজমের ক্ষেত্রে এ দুটির অপনোদন অতি প্রয়োজনীয়।
আর একটি বিষয়, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ আর ধর্মনিরপেক্ষময়তা এক নয়। ধর্মনিরপেক্ষময়তা হলো একটি অরাজনৈতিক অবস্থা যেখানে সহজাতভাবে মানুষের মধ্যে ধর্মবিষয়ক একটি মুক্ত এবং গ্রহণীয় মানসিকতার অবকাশ থাকে। কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ হলো রাজনৈতিক প্রত্যয় বা সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতি, যাকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা বা বন্দোবস্ত করা হয়। ধর্মনিরপেক্ষময়তা একটি প্রাকৃতিক আবহ যেখানে এক ধরনের আন্তর্ধর্মীয় সহাবস্থান স্বভাবতই বিরাজিত থাকে। অন্যদিকে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ একটি রাষ্ট্রীয় নির্বাচন, যা কতিপয় স্তম্ভকে ধরে বিকাশ লাভ করতে পারে: ধর্মের ব্যক্তিকরণ, বৈজ্ঞানিক যুক্তিবাদ ও আধুনিকতা, বিভাজন, ধর্মীয় বহুত্ববাদ ও সহনশীলতা, নাগরিকতা ও মানবাধিকার চেতনা ইত্যাদি।
সুতরাং, অবশেষে এটা ভাবাই যায় একটি রাজনীতিক গতিবিকাশ হিসেবে সেক্যুলারিজম বর্তমান বিশ্বে সর্বাধিক আচরিত ও চর্চিত একটি প্রপঞ্চ, যাকে নিয়ে সন্দেহ বা অস্বস্তিরও কমতি নেই, আবার তাকে এড়িয়ে যাওয়ারও উপায় নেই। আধুনিক সমাজ পরিবর্তনে বা বিনির্মাণে এর রাজনৈতিক বুনুন অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে রেখেছে। সুতরাং যদি সেক্যুলারিজমকে বলা হয় যুগের ‘‘এপিস্টিম", তবে তা একাধারে সত্য ও মিথ্যা। এর অর্থ, এর শক্তি সত্য হবে তার সঠিক ও যুগোপযোগী প্রয়োগে, আর মিথ্যা হবে তার ভুল ও জোরজবরদস্তি প্রয়োগে। একে যদি সংস্কারের মাঝ দিয়ে নেওয়া যায় তবে তা তার সুগতিকে এবং নিজ রাজনৈতিক ভূমিকাকে ঠিক রাখতে পারবে। রাষ্ট্র ও ধর্মকে ‘‘বাইনারি অপোজিশন" না ভেবে পজিশন ভাবলে এ দুটির দ্বন্দ্বকে মোকাবিলা ছাড়াই অভিযোজন করা সহজ হয়ে যায়, আর এক্ষেত্রে সেক্যুলারিজম একটি ইতিবাচক রাজনৈতিক উপায় হিসেবে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে। কিন্তু সেক্যুলারিজমকে অপর বা বিকল্প ধর্ম হিসেবে ভাবলে তার অহিফেন গাঢ় নিদ্রায় আমাদের ডুবিয়ে রাখবে অথবা একটি কুরুক্ষেত্রে সমবেত করবে যেখানে আমরাই আমাদের হত্যা করতে থাকবো।
টীকা ও গ্রন্থনির্দেশ:
১. হ্যারল্ড জে. লাস্কি, দ্য রাইজ অব ইউরোপিয়ান লিবেরালিজম, (আকবর বুকস, দিল্লি, ২০০৫). পৃষ্ঠা: ৩৫)।
২. আশীষ লাহিড়ী, রবীন্দ্রনাথ: মানুষের ধর্ম মানুষের বিজ্ঞান, (অবভাস: ২০১৮, কলকাতা, পৃষ্ঠা: ৮২, সূত্র: ১৯৩৭ সালে বিমলাকান্ত রায়চৌধুরীকে লেখা রবীন্দ্রনাথের চিঠি)।
৩. জ্যোতির্বিজ্ঞানে একটি তারকার হঠাৎ উজ্জ্বল হয়ে ওঠা। হঠাৎ করে ঘটে যাওয়া কোনো চিন্তা বা অনুচিন্তা বা কোনো মনোযোগের বা কার্যকরতার বিস্ফোরণকে বোঝাতেও শব্দটি ব্যবহৃত হয়।
৪. হ্যারল্ড জে. লাস্কি, আ গ্রামার অব পলিটিকস, রাউটলেজ, ২০১৫, পৃষ্ঠা: ৭৪।
৫. jus est quod jussum est : লাতিন বাগ্ধারা যার মানে হলো, আইন তা-ই যার আদেশ জারি করা হয়েছে; অর্থাৎ কর্তৃপক্ষের আদেশই আইন, নৈতিকতা বা অন্তর্নিহিত ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে নয়।
৬. হ্যারল্ড জে. লাস্কি, আ গ্রামার অব পলিটিকস, ( রাউটলেজ, ২০১৫, পৃষ্ঠা: ৭৩)
৭. modus vivendi: লাতিন শব্দবন্ধ যার অর্থ ‘‘জীবনযাপনের উপায়" বা ‘‘সহাবস্থানের পথ" যেখানে বিভিন্ন ধর্মমত, দল বা গোষ্ঠীর মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান সম্ভব। মতবিরোধ থাকা রাষ্ট্র বা গোষ্ঠীর মধ্যে অস্থায়ী বা অপ্রকাশিত চুক্তির মাধ্যমে এটার বাস্তবায়ন হয়।








