ঈদ সংখ্যা ২০২৬

উঁচু গোড়ালির জুতা ।। বানু মুশতাক

অনুবাদ: ফজল হাসান
৩০ মার্চ ২০২৬, ১৯:২৪আপডেট : ০৬ এপ্রিল ২০২৬, ১৫:৪২

বানু মুশতাক (জন্ম: ৩ এপ্রিল ১৯৪৮) ভারতের কর্নাটক রাজ্যের একজন প্রখ্যাত সাহিত্যিক। তিনি জীবিকাসূত্রে একজন আইনজীবী, এছাড়া সমাজকর্মী হিসেবে বিখ্যাত। তিনি কন্নড় ভাষায় লেখেন। তিনি ২০২৫ সালে তার ছোটগল্প সংকলন হার্ট ল্যাম্প-এর জন্য আন্তর্জাতিক বুকার পুরস্কার লাভ করেন। 


পৃথিবীকে ছোট জায়গা বলো অথবা বিশাল বলো, কিংবা বলো পৃথিবী গোলাকার, এমনকি এ-ও বলো যে, পৃথিবী ছোট্ট গ্রামে রূপান্তরিত হয়েছে, একটা কিছু বলো! যা কিছুই বলো না কেন, তাতে সামান্য পার্থক্য দেখা যায়।

যদি বলার মতো কোনো পার্থক্য থেকে থাকে, তবে তা পাঁচ-বছর আগে মিলিয়ে গিয়েছে। তারপর যখন কেউ সৌদি থেকে ফিরে আসতো, তখন তাদের মতো পরিবারের মধ্যে রাজা কিংবা মহারাজা কেউ থাকতো না। না, না, তাদের মতো কোনো সম্রাটও ছিল না। তারা যে ন্যাপি পরিয়ে বাচ্চাদের পাছা ঢেকে রাখতো, যে প্লাস্টিকের টিউব-ভর্তি টুথপেস্ট ব্যবহার করতো, মহিলারা যে ঝালরের পোশাক পরতো, রঙিন ও আকর্ষণীয় ফিনফিনে রাতের পোশাক, যা সূক্ষ্ম কারুকাজ লেইস দিয়ে সজ্জিত থাকতো, যে শাড়ি মরা সাপের মতো তাদের গায়ে জড়ানো থাকতো এবং ‘যেমন আছে’ তেমনভাবে দেহের আকৃতি প্রকাশ করতো, তাদের ধমনীর প্রতিটি স্পন্দনের সঙ্গে বেরিয়ে আসা সুগন্ধি ব্যবহার করতো, দামি হাতের ঘড়ি, স্যামসোনাইট সুটকেস... এবং তারপর, তাদের গলায় ঝুলন্ত লকেটের নাম, যেন তারা ভুলে গেছে তাদের কোন নামে সম্বোধন করা হতো! আংটি দিয়ে ভরা থাকত তাদের আঙুল, কনুই পর্যন্ত থাকত স্বর্ণের চুড়ি, ব্রেসলেট, কাউকে বলে দিতে হতো না যে অলংকারগুলো খাঁটি সোনার তৈরি। অত্যন্ত সাবধানে ঝুলে থাকা কানের দুল, সাদা কবুতরের পালকের মতো সাদা সুতার পাতলা অন্তর্বাস, এসব কী একটি কিংবা দুটি জিনিস ছিল? এমন কে আছে, যে এসব কিছু বর্ণনা করতে পারে! আর তারপর, এবং তারও পর, বাথরুমের হালকা ওজনের চটিজুতা, যা দেখতে ময়ূরের পালকের মতো, চপ্পল, স্যান্ডেল। যখন নায়াজ খানের স্বপ্নের ঘোড়া এ পর্যন্ত পৌঁছে, তখন ঘোড়াটি খোঁড়াতে শুরু করে। দুর্বল এবং জীর্ণ-শীর্ণ ঘোড়ার মতো, যা জাটকা দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, তাকে এক কদমও সামনের দিকে এগোতে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে। সুতরাং নায়াজ খান এমন এক জাদুকরী জায়গায় থেমে যায়, যেখানে এক জোড়া জুতা তাকে সবসময় নিজেকে ভুলে যাওয়ার মতো অনুভূতি মনে করিয়ে দেয়।

তিন বছর আগে নায়াজ খানের ভাবী নাসিমা সৌদি থেকে ছুটি কাটাতে এসেছিলেন। তার ভাই মেহাবুব খান রাডো হাতঘড়ি এনেছিলেন এবং সেই ঘড়ি নায়াজ খানের বাম কব্জিতে সুন্দরভাবে সেঁটেছিল। তখন সে ডিডিপিআই সরকারি অফিসের একজন সামান্য আরদালি ছিল, এবং রাজীব, তার সহকর্মী যে চাকরির পাশাপাশি সুদের ব্যবসা করতো, ভাবত কোনো একদিন রাজীবের হাত থেকে ঘড়িটা তার হাতে চলে আসবে। নায়াজ আসলে ঘড়িটি রাজীবের কাছে গচ্ছিত রাখার কথা নিয়ে চিন্তিত ছিল না। তার সমস্ত মনোযোগ ছিল নাসিমার জুতার দিকে।

চল্লিশের কাছাকাছি বয়সি নাসিমার সৌন্দর্য তখনো মলিন হয়নি। যদিও নায়াজ তার দিকে খুব একটা খেয়াল করেনি, তবে তার সম্পূর্ণ মনোযোগ ছিল ভাবির পায়ের দিকে। ভাবির পায়ের জুতা তার মনকে পাগল করে দিয়েছিল। কালো চামড়ার জুতার গায়ে এমনভাবে চকমকে পাথর বসানো ছিল, যেন পাথরগুলো কোনো প্রস্ফুটিত ফুল। জুতার গোড়ালি ছিল উঁচু এবং ত্রিভুজ আকৃতির। জুতা জোড়া যেন একমাত্র ভাবির পায়ের জন্যই তৈরি করা হয়েছিল। যখন নাসিমা জুতা জোড়া পায়ে দিয়ে আলতোভাবে হাঁটতো, মনে হতো যেন সে বাতাসে ভেসে চলেছে। নায়াজ খান মরিয়া হয়ে চাইতো যে উঁচু গোড়ালির জুতা পরে হাঁটার সময় যেন ভাবি হোঁচট খেয়ে পড়ে যায়। হয়তো তার পায়ের বুড়ো আঙুল ভেঙে যেতে পারে এবং গোড়ালির গাঁট মচকে যেতে পারে। নায়াজ আশা করেছিল তারপর নাসিমা সেই জুতা পরা বন্ধ করবে। তখন সে সেই জুতা নিয়ে মেরামত করিয়ে আনবে এবং আরিফাকে পরতে দিবে। কিন্তু তার সমস্ত অঙ্ক কষাকষি সম্পূর্ণ বিফলে গিয়েছে।

নায়াজের মাথায় একটা দুষ্ট বুদ্ধি এসে ভর করেছিল। নাসিমার সৌদিতে ফিরে যাওয়া আগের রাতে সে অনায়াসে জুতা জোড়া চুরি করে লুকিয়ে রাখতে পারতো। যেন নাসিমা তার মনের কথা আগেভাগেই অনুভব করতে পেরেছিল, তাই সে গুঁড়া মেথি, ভুট্টার আটা ও গুঁড়া মরিচের প্যাকেটের সঙ্গে আট দিন আগেই গুছিয়ে স্যুটকেসের ভেতর লুকিয়ে রেখেছিল। তারপর সে লিবার্টি চপ্পল পরেছিল। নায়াজ নিজেকে দোষী ভেবেছিল, যেন সে ভাবির সামনে হাতে-নাতে ধরা পড়েছে এবং তার সঙ্গে কথা বলা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছিল।

অবশেষে নায়াজ সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে তাদের ফিরে যাওয়ার আগের রাতে সে সাহসের সঙ্গে বিয়ষটি উত্থাপন করবে এবং ভাবিকে বলবে যেন সে জুতাজোড়া আরিফাকে দিয়ে যায়। যদিও গল্পগুজবে এবং শেষ মুহূর্তের গোছগাছ করতে করতে অনেক রাত হয়ে গিয়েছিল, নায়াজ মুখ থেকে একটি শব্দও বের করতে পারেনি। সে এক অদ্ভুত পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে গিয়েছিল এবং তার সমস্ত চেষ্টাই বিফলে যায়। তার সব সংগ্রাম এবং উত্তেজনা শুধুমাত্র নগণ্য এক জোড়া জুতার জন্য, যা তার স্ত্রী পরবে? সন্ধ্যার শেষদিকে তার মধ্যে ভীষণ অস্থিরতা ও অশান্তভাব ছড়িয়ে পড়েছিল। অল্প সময়ের মধ্যে সে অত্যন্ত বেপরোয়া হয়ে উঠেছিল এবং অনবরত বমি করতে শুরু করেছিল। তার সারা শরীরে জ্বরের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছিল এবং সে পরবর্তী আট দিন বিছানা থেকে উঠতে পারেনি।

আর এই কারণে সে ভাই ও ভাবিকে বিদায় জানাতে বিমানবন্দরে যেতে পারেনি। নায়াজকে ছাড়া আরিফা যেতে পারে না। তাই তাদের একা একাই যেতে হয়েছে, আর সেই জন্য তার মন খারাপ হয়েছিল। নাসিমা মন থেকে বিষয়টি বের করে দেয়নি, বরং ঔদ্ধত্য ভঙ্গিতে স্বামীকে বলেছিল, ‘আহা! দুঃখজনক। এতিমের মতো এসে বিমানে বসলে! তুমি তোমার প্রিয়, আদরের ছোট ভাইয়ের জন্য কী করোনি? এখন তোমার ওদের আরও টাকা দেওয়া উচিত।’ তারপরও স্ত্রীর অগোচরে মেহাবুব খান মুম্বাই থেকে এক বা দুবার ছোটো ভাইকে ফোন করেছে এবং তার শরীর ও স্বাস্থ্য সম্পর্কে খোঁজ-খবর নিয়েছে। 

যদিও মেহাবুব খান এসব বিষয় নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা-ভাবনা করতে চায়নি, তবু একই ধরনের ভাবনারা এসে তার মস্তিষ্ক দখল করেছিল। আর তাই সে ভাইয়ের সঙ্গে দূরত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে। সৌদিতে যাওয়ার দু’বছর পরে সে দীর্ঘ দু’মাসের ছুটি কাটাতে তার গ্রামের জন্মস্থান পরিদর্শনের জন্য গিয়েছিল। সে যাওয়ার আগে তার ছোট ভাইকে জানিয়েছিল এবং তখন মাত্র এক সপ্তাহ বাকি ছিল। স্বাভাবিকভাবেই সে তার ভাইকে জিজ্ঞেস করেছিল যে সে সৌদি থেকে কিছু চায় কিনা। কিন্তু তারপরও নায়াজের সাহস হয়নি যে বড় ভাইকে সে তার পছন্দের জিনিস আনার জন্য বলবে।

সেদিন নায়াজের দম নেওয়ার মতো এক মুহূর্তও সময় ছিল না। সে সহকর্মী ও বন্ধুদের কাছ থেকে টাকা ধার করে এবং সেই টাকা দিয়ে পুরোনো যে বাড়িতে বসবাস করতো, তা পুনঃসংস্কার করে। তবে বাড়ি পুরোনো হলেই বা কী এমন ক্ষতি হবে? তার দাদাজান বাড়িটি নির্মাণ করেছিলেন। এই সেই বাড়ি, যে বাড়িতে তার আম্মাজান নববধূ হিসেবে পা রেখেছিলেন, চন্দনের পেস্টে হাত ডুবিয়ে বসার ঘরের পশ্চিমমুখী দেয়ালে হাতের ছাপ রেখেছিলেন, সেই বাড়িতেই তার বড় ভাইয়ের জন্ম হয়েছিল; এমনকি সেই বাড়িতে সে-ও জন্মগ্রহণ করেছে। তার ভাবি নাসিমা এবং স্ত্রী আরিফা, যারা তার মায়ের মতো হুবহু একই কাজ করেছে, তাদের হাত চন্দনের পেস্টে ডুবিয়েছিল এবং একই ঘরের পশ্চিম দেয়ালে হাতের ছাপ রেখেছে। তার আদরের কন্যা মুন্নি এ বাড়িতেই পা ফেলে প্রথম হাঁটতে শিখেছে। এ সবকিছুই ঘটেছে এই বাড়িতে। এক মাস আগে-পিছে তার আব্বাজান ও আম্মাজান কোনো এক অপরিচিত কণ্ঠস্বরের আহ্বানে সাড়া দিয়ে এই বসতবাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন, এই সেই ডালিম গাছ, যার নিচ থেকে লোকজন তাদের নিথর দেহ কাঁধে তুলে নিয়ে গিয়েছিল। এখন তার স্মৃতির পাতায় সমস্ত ছবি ভেসে উঠছে।

আব্বাজানের মৃত্যুর পরে নায়াজ উত্তরাধিকার সূত্রে পুরোনো বাড়িটি পেয়েছে। বড় ভাই মেহাবুব খান কখনোই তার ভাগের পৈতৃক সম্পত্তি দাবি করেনি। যখনই সে ছুটি কাটাতে এসেছে, তখনই খড়ের মাদুরের ওপর ঘুমিয়েছে এবং তার চাওয়া ছিল খুবই সামান্য। যেখানেই তার বসতে ইচ্ছে হতো, ঘোরাঘুরি করতে মন চাইতো এবং শান্তিতে ঘুমাতে চাইতো, সেখানেই সে সেসব ইচ্ছেগুলো পূরণ করতো। অন্যদিকে নাসিমা খালি পায়ে মেঝেতে হাঁটাচলা করতে চাইতো না। ঘরের ভেতর সে বাথরুমের চটি স্যান্ডেল পরতো এবং শব্দ করে হাঁটতো। রান্নাঘর থেকে নিজের জন্য এক গ্লাস দুধ আনার সময় যখন কোঁচকানো মুখে এবং বড় বড় পা ফেলে, যেন ঘরের মেঝে নোংরা এবং স্যাঁতসেঁতে, হেঁটে যেত, তখন তাকে দেখলে প্রতিবারই নায়াজের রাগের পারদ উপরে উঠতো। তার মেজাজ তিরিক্ষি হতো। যদিও আরিফা এসব তুচ্ছ বিষয়ে মনোযোগ দিতো না, বরং নাসিমার পেছন থেকে ডাকতো, ‘ভাবি, ভাবি,’ এবং তাকে অত্যন্ত সম্মান করতো। এই তথাকথিত ভাবি নাসিমা ছিল নিস্পৃহ এবং তারপরও সে সবসময় ভাবির প্রতি সম্পূর্ণ মনোযোগ দিয়েছে।

নায়াজ কোনো ধরনের খারাপ অনুভূতি মনের মধ্যে স্থান দিত না, এমনকি আরিফা নাসিমার সমস্ত ইচ্ছা পূরণ করার জন্য আরও নিচে নামতো। তার কাছে বিষয়টা ভালো লাগতো, যদি যাওয়ার আগে নাসিমা ভাবি তার উঁচু গোড়ালির জুতাজোড়া আরিফাকে দিয়ে যেত। যদি আরিফা সেই জুতা পায়ে দিয়ে শুধু একটিবার তার সামনে দিয়ে পরীর মতো হাঁটতো, তাহলে তার আত্মা সন্তুষ্ট হতে পারতো। সে যদি জুতা পরা আরিফার পা একবার স্পর্শ করার সুযোগ পেতো, তাহলে তার মন পূর্ণ হতো। এ সবকিছুই স্বপ্নে এসে তাকে মোহাবিষ্ট করে তুলেছিল, কিন্তু হঠাৎ এক ধাক্কায় সে বাস্তবের কঠিন জগতে ফিরে এসেছে।

বাড়ির সামনের বড় আম গাছটি পড়ে গিয়েছে। প্রথমে নায়াজ কয়েকজন লোক ডেকে এক এক করে ডালপালা কাটিয়েছে। গাছটি ছিল রাসপুরি আম গাছ। প্রতিটি আম ছিল দুই তালুর মধ্যে ধরে রাখার মতো বড়। প্রতিবছর মন ভরে খাওয়ার পরেও সে ঝুড়িভর্তি আম সহকর্মীদের মধ্যে বিতরণ করতো। একসময় বিতরণ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে যেত। বিগত চার বা পাঁচ বছর ধরে সে গাছে মুকুল আসার সঙ্গে সঙ্গে ফলের ব্যবসায়ীর কাছে আম বিক্রি করে দিয়েছে এবং বিনিময়ে মুঠোভর্তি টাকা উপার্জন করেছে। কিন্তু এখন ফাঁকা জায়গা, যে জায়গায় আম গাছ দখল করে ছিল, দেখে সে খুব বিরক্তি অনুভব করে। বাড়ির দেয়াল এবং ঘরের মধ্যে সেই ফাঁকা জায়গা, মাঝে কোনো ভাবনা-চিন্তা না করেই অনায়াসে একটা পুরো বাড়ি নির্মাণ করা যায়।

সেই বছর, যখন আমের মুকুল আসার সময় নায়াজ ব্যবসায়ীর জন্য অপেক্ষা করেছিল, সে কেবল হতাশ হয়েছিল। নায়াজ নিজেই এক বা দুজন ব্যবসায়ীর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল, কিন্তু তারা অবজ্ঞার সুরে বলেছিল, ‘কে শুধু একটা গাছের আম নিবে? এ বছর ভালো ফলন হয়েছে। হয় তুমি নিজেই এখানে আম নিয়ে আসো, নতুবা আস্তাকুঁড়ে ফেলে দাও।’ কিন্তু তারপরই সে এক অজ্ঞাত লোকের কাছ থেকে প্রস্তাব পেয়েছিল: যদি সে গাছটি কেটে সেখানে একটা ভূগর্ভস্থ ভাঁড়ার ঘর ও দুটি দোকান তৈরি করে, তবে সে সব দোকানপাট ভাড়া নেবে এবং এমনকি অগ্রিম টাকাও দিতে রাজি আছে। নায়াজ কিছুতেই সেই অপূর্ব সুযোগ হাতছাড়া করতে চায়নি।

হয়তো নায়াজের কাঁধে কোনো পেঁচা বসেছিল। শুরুর দিকে সে একটা একটা করে ডাল কেটেছে এবং একদিন সম্পূর্ণ গাছটি কেটে ফেলতে সক্ষম হয়েছে। আরিফা জানালার ভেতর দিয়ে সেই দৃশ্য দেখেছে এবং অঝোর ধারায় অশ্রু বিসর্জন করেছে। গাছটির সঙ্গে তার অনেক বেশি স্মৃতি জড়িয়ে ছিল না। মাত্র কয়েকটা স্মৃতি, যেগুলো সে অনায়াসে একটা বোয়ামে ঢুকিয়ে রাখতে পারে। তার প্রথম অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার সময় কাউকে না বলে সে গাছ থেকে লাঠি দিয়ে একটা আম পেড়েছিল। খানিকটা টক ছিল। যখন সে কামড় দিয়েছিল, তখন নিচের দিকে কিছুটা শক্ত ছিল। দুষ্ট মেয়েটি লজ্জায় নিজের ভেতর লুকিয়ে থাকা এক ধরনের আনন্দ অনুভব করেছিল। তার বিয়ের পরে প্রথম দিকের সময়ে সে গরম দিনের বিকাল বেলায় গাছের নিচে বসতো। গাছের নিচের সেসব আনন্দঘন মুহূর্তগুলো তার স্মৃতির খাতায় জমা হয়ে আছে। কাঁচা আমের টক স্বাদ, পাকা আমের মিষ্টতা, প্রচুর ফলন, কচি ডালপালার বিস্তার, আম গাছ ঘিরে এসবই তার স্মৃতি হয়ে আছে।

নায়াজ খান সবকিছু গড়ে তুলেছে: ভূগর্ভস্থ ঘর, দুটি দোকান এবং এগুলোর পাশেই তার বাড়ির পুনর্নির্মাণ। তার বড় ভাইয়ের শোবার ঘরের সঙ্গে সংযুক্ত বাথরুম বানিয়েছে। সে রান্নাঘরের মেঝের ওপর রাজহাঁসের পালকের মতো ধবধবে সাদা মার্বেল টাইলস লাগিয়েছে, যা তার ভাবির নরম পায়ের সঙ্গে মানানসই হয়েছে। যেহেতু নায়াজ তার ভাইকে ব্যবসার প্রসার দেখিয়ে অবাক করে দিতে চেয়েছিল, তাই এসব কাজ সে ভাই বিদেশ থেকে আসার ঠিক আগেই তড়িঘড়ি করে শেষ করেছে। সে ভাইকে কিছুই বলেনি, তবে নাসিমা তার মায়ের বাড়ির আত্মীয়স্বজনদের কাছ থেকে নিয়মিত অতিরঞ্জিত খবরাখবর পেতো। এসব খবরের ভিত্তিতে নাসিমা তার অলৌকিক স্বপ্নের ঘোড়ায় চড়তো এবং তার স্বামীকে অবমাননা করতো, খোঁচা দিত এবং ঠেস মারা কথা বলে তাকে মানসিকভাবে বিধ্বস্ত করতো। এসব করে নাসিমা ভীষণ সুখ-আনন্দ উপভোগ করতো। অবশেষে সে দুই ভাইয়ের মধ্যে বিভাজন তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে, যারা একসময় রাম ও লক্ষণের মতো অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিল।

আর এ কারণেই, যদিও নায়াজ খান তার ভাই আসার আগের দিনে সবকিছু সম্পন্ন করার জন্য দ্রুতগতিতে কাজ করেছিল, কিন্তু মেহাবুব খান তাকে না জানিয়ে সৌদি থেকে এসে প্রথমে সোজা নাসিমার বাবা-মায়ের বাড়িতে যায়। আগে সে সৌজন্যের খাতিরে শ্বশুরবাড়িতে এক সপ্তাহ কাটিয়ে ছুটির বাকি দিনগুলো নিজের বাড়িতে কাটাতো। কিন্তু এখন কি নাসিমা এমন অপূর্ব সুযোগ হাতছাড়া করবে? সে স্বামীকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে এবং তার বাবা-মায়ের বাড়িতে থাকতে রীতিমতো বাধ্য করে। এমন অস্থির পরিস্থিতির মাঝামাঝি সময়ে মেহাবুব খান মানসিক যন্ত্রণায় অসুস্থ হয়ে পড়ে, নিজের ভেতর ভেঙে খান খান হয়ে যায় এবং অযথা কথা বলা বন্ধ করে দেয়। তার হাসি এবং কদাচিৎ কথা বলা কৃত্রিম শোনাতে শুরু করে। তার মনে হয়েছে যে সে একান্ত নিজের সবকিছু হারিয়ে ফেলেছে এবং ভীষণ মুশকিলে পড়েছে। কোনো কারণ ছাড়াই সে রেগে যেত, যেন ইচ্ছে করে রাগ তাকে স্পর্শ করেছে। সে যখন-তখন কারণে-অকারণে উত্তেজিত হতে শুরু করে, যেমন আগুনে ঘি ঢেলে দেওয়া হয়েছে। নাসিমার বাবা-মায়ের বাড়ির কোথায় সে একবিন্দুও মানসিক শান্তি খুঁজে পায়নি। তার অস্বস্তি বাড়তে থাকে এবং বিনা কারণে তার ধৈর্য হারাতে শুরু করে। ঠিক তখনই নাসিমা সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে ভাইয়ের সঙ্গে মেহাবুব খানের দেখা করার উপযুক্ত সময়। যদি মেহাবুব খান ধৈর্য হারিয়ে ফেলে, তবে যেন সে তার ভাইয়ের সঙ্গেও হারিয়ে ফেলে, তাতে আমার কী, নাসিমা ভাবে। যাহোক, অবশেষে সে তার স্বামীকে ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে রাজি করিয়েছে।

এ সবকিছুর মাঝে নায়াজ খান ভীষণ চিন্তিত হয়ে পড়ে, কেননা সে ভাইয়ের কাছ থেকে কোনো চিঠি বা ফোন কল পায়নি। তাই সে কয়েকবার সৌদিতে ভাইয়ের কাছে ফোন করেছে, যার জন্য তার পকেট থেকে হাজার হাজার রুপি বেরিয়ে গেছে। একসময় সে জানতে পারে যে ইতোমধ্যে তার ভাই ভারতে এসে পৌঁছেছে। বড় ভাই দেশে না আসার কারণে সে খুবই দুশ্চিন্তায় ছিল। যেই সে তার ভাবির বাবা-মায়ের বাড়িতে ফোন করতে যাচ্ছিল, তখন নাসিমা তার স্বামীর হাতে তীর-ধনুক তুলে দিয়েছে, যেন মেহাবুব খান সহজেই ভাইয়ের দিকে ছুড়তে পারে।

অবশেষে মেহাবুব খান নিজের বাড়িতে যায়। তার হৃদয় ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। সে কোনো অশ্রু বিসর্জন করেনি। কিন্তু সে নিজেই একটা কান্নার সাগর হয়ে যায়। তার মুখ থেকে একটি শব্দও বের হয়নি, যদিও সে নিজের ভেতর দুমড়ে-মুচড়ে গিয়েছে। তার মনে হয়েছে যে সেসব দৃশ্য না দেখলেই ভালো হতো। সে ভাবছিল, ভারতে আসা তার আদৌ ঠিক হয়নি। আরও মনে হয়েছিল যে মরুভূমির দেশে তার মৃত্যুর পর মৃতদেহ ভস্ম হলেই ভালো হতো। হয়তো তখন আম গাছের ডালপালা ফিরে আসতো, সবুজ পাতা গজাতো এবং তাকে মৃদুমন্দ হাওয়া দিতো। শৈশবে সে এবং তার ভাই গাছের একটা ডালে বাঁধা দুলুনিতে উপর-নিচে দুলতো। তখন তাদের আব্বাজান গাছের ছায়ায় একটা চেয়ারে বসে থাকতেন এবং তাকে ও নায়াজকে পবিত্র কোরআন শরিফ থেকে আয়াত আবৃত্তি করে শোনাতেন। আব্বাজানের সেই সুরেলা কণ্ঠ এখনো মেহাবুব খানের কানে গুনগুন করে অনুরণিত হয়। তার আরও মনে পড়ে শৈশবে সে তার আম্মাজানের কোলে উঠে আম গাছের নিচে আসতো। তখন আম্মাজানের এক হাতে থাকতো খাবারের প্লেট এবং তিনি একটা করে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসতেন। তারপর তিনি চামচে খাবার তুলে খাইয়ে দিতেন, এমনকি তাকে গাছের ডালে বসিয়ে তার মুখে খাবার তুলে দিয়েছেন, যেন কেউ বোকার মতো বিপজ্জনকভাবে তার পেট ভরিয়ে দিচ্ছিল। এখানেই সেই আম গাছ ছিল, যে গাছের এক ডাল থেকে অন্য ডালে তারা সাবধানে এবং ভয়ে উঠতো আর বানরের মতো ঝুলে খেলতো, লাফালাফি করতো। নায়াজ কী তাদের একবারও বলতো পারতো না যে সে গাছটি কেটে ফেলবে? লোভ-লালসা এবং সামান্য কিছু অর্থকড়ির জন্য সে কী এমন কাজ করতে পারে? মেহাবুব খান কেমন করে ভাইকে ক্ষমা করবে? বলার মতো নায়াজের সাহস ছিল না। তার ওপর নাসিমা অনবরত ঘ্যান ঘ্যান করতে শুরু করেছে, বলেছে, ‘রি২, তোমার ভাই ব্যাংক থেকে টাকা ধার নিয়েছে। এখন মনে হচ্ছে সে-ই পুরো বাড়ির মালিক। দুশ্চিন্তা করার মতো এখন তোমার কোনো কিছুই নেই। তাকে সম্পূর্ণ মালিকানা লিখে দেয়ার জন্য কষ্ট করে বাড়ির দলিলপত্রে তোমার স্বাক্ষর করার কোনো দরকার নেই। নাকি তুমি আমাকে না জানিয়ে ভাইয়ের সঙ্গে মিলে সব ব্যবস্থা পাকা করে ফেলেছ?’

নায়াজ খান ধীরে ধীরে তার বড় ভাইয়ের নীরবতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা রহস্য বুঝতে শুরু করে। সে অনুভব করতে পেরেছে যে এখন ভাবির হাতে চাবিকাঠি। কিন্তু কেমন করে এই জটিল তালা খুলবে? সে-ও অস্থিরতার ঘোলা পানিতে হাবুডুবু খাচ্ছিল। যাহোক, সেই অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মাঝেও, নাসিমা যখন তার স্যুটকেস নিয়ে আসে, তার দৃষ্টি গিয়ে আটকে যায় ভাবির উঁচু গোড়ালির জুতার ওপর। তবে বলা খুবই কঠিন যে তার ক্ষুধার্ত চোখ সন্তুষ্ট ছিল, নাকি ছিল না। তার কারণ এই যে পরনে কচি কলাপাতা সবুজ রঙের ঝলমলে কারুকাজ করা পাঞ্জাবি পোশাকের সঙ্গে, ভাবির পায়ে ছিল সেই সরু গোড়ালির জুতা। আর জুতার জন্য তার অলংকারও ঝলমলে দেখাচ্ছিল। নাসিমার পায়ের ওপর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নেওয়া নায়াজের পক্ষে অসম্ভব ছিল এবং সে এক ধরনের অদ্ভুত আকর্ষণ অনুভব করেছিল।

নায়াজ খান অনেক মানুষের কাছ থেকে টাকা ধার করেছে। এছাড়া সে তার অফিস থেকে টাকা কর্জ করেছে, এমনকি সুদ-ব্যবসায়ীদের থেকেও টাকা নিয়েছে। রাজীবও, যার দৃষ্টি সবসময় নায়াজের হাতঘড়ির ওপর আটকে থাকতো, তাকে টাকা ধার দিয়েছে। সেসব টাকা মিলিয়ে সে একটা সেকেন্ড-হ্যান্ড ফ্রিজ এবং কাপড় ধোয়ার মেশিন কিনেছে। যাহোক, সে ভেবেছে যে ভাই ও ভাবির আরামের জন্য বাড়িতে এসব জিনিস দেখে হয়তো ভাই আর্থিক সাহায্য করবে। কিন্তু মেহাবুব খান ছিলেন মানসিকভাবে ভেঙে পড়া একজন অসহায় মানুষ। তার কাছে ভাইয়ের কাজকর্ম, কথাবার্তা এবং ব্যবহার সব কিছুই মেকি মনে হয়েছে। সে ভেবে পায়নি, এসব কাজের জন্য কী তার ছোট ভাইয়ের পিঠে হালকা চাপড় দিয়ে বাহবা দিবে, নাকি তার শৈশবের সমস্ত স্মৃতি মুছে তার ওপর সৌধ নির্মাণ করার জন্য তিরস্কার করবে। সে অনুভব করতে শুরু করে যে বাড়িটি আদৌ তার নয় এবং সেখানে সে একজন আগন্তুক, অপ্রত্যাশিত এবং অযাচিত অতিথি। আর এ কারণে ছোট ভাইয়ের করা কোনো কাজই মেহাবুব খানকে আকৃষ্ট করতে পারেনি। এসব কাজ করার আগে কেন সে একবারও আমার সঙ্গে আলাপ করেনি? আমি কী এতই দূরে চলে গেছি, ওর কাছে এত তুচ্ছ হয়ে গেছি? কখন থেকে আমার ভাই এমন লোভী হয়ে উঠেছে? কীসের জন্য? আম গাছের নিচে এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে।   

দুই ভাইয়ের অবস্থানের দূরত্ব বেড়ে গেছে। নীরবতার কারণে দূরত্বের যে খাদ তৈরি হয়েছে, তার ওপর কোন কথার সেতু গড়ে উঠবে? তারা নিজেরাই গুহার মধ্যে হারিয়ে গেছে। একমাত্র নাসিমার ঠোঁটের কোণে স্বস্তির মৃদু হাসির ঝলক দেখা যায়। সেই উঁচু গোড়ালির জুতা, যা সে সবসময় পায়ে দিয়ে থাকে। দুশ্চিন্তার কালো ছায়া আরিফার চোখেমুখ ঢেকে দিয়েছে। আগে কখনোই তার চোখের কোণে কালিমা দেখা যায়নি। তার ওপর সে পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। এখনো তার শরীরে পুরোপুরি উপসর্গ ফুটে ওঠেনি, তবে অন্তঃসত্ত্বার বিষয়টি তার মনের সমস্ত সুখ-আনন্দ শুষে নিয়েছে। যেখানে অন্তঃসত্ত্বা নারীদের খুশি এবং উজ্জ্বল থাকার কথা, সেখানে সে দুর্বল, মনমরা, অনুভূতিহীন। মুন্নীকে দেখাশোনা করা ছাড়াও তাকে অতিথিদের সামলাতে হয়, নিজের স্বামী ও তার ভাবির মধ্যে মধ্যস্থতা করতে হয়, জায়ের তিরস্কার হজম করতে হয়, তার কি একটি বা দুটি বিষয় সামলাতে হয়? সে ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। এমন বিষয় যেন তার জন্য এ সবকিছু পর্যাপ্ত নয়। অসহনীয় কাশি তার সমস্ত শরীর কাঁপিয়ে দিয়েছে, যেমন প্রচণ্ড বাতাসে গাছের পাতা দুলে উঠে। যদিও নায়াজ খানের দৃষ্টি এড়িয়ে যায়নি, কিন্তু সেদিকে সে মনোযোগ দেয়নি। মেহাবুব খানের চোখেও বিষয়টি ধরা পড়েছে, কিন্তু তার ভাইয়ের প্রতি রাগ-ক্ষোভ এবং স্ত্রীর ভয়ে যদি এই দুটি সমস্যা না থাকতো, তবে সে নিজেই আরিফাকে নিয়ে হাসপাতালে যেত এবং নিশ্চিত করতো যে আরিফা যেন বিশ্রাম নিতে পারে এবং দ্রুত ভালো হয়ে যায়। কিন্তু যাকে বলে অহংকার, তাই তার মধ্যে কাজ করছিল। ঔদ্ধত্যতার বিষাক্ত সাপ অগণিত ডিম পেড়েছে।

ঘরের ওপর সূর্য উজ্জ্বল আলো বিতরণ করছিল। বাতাস ছিল নিশ্চুপ এবং কোথাও যেন লুকিয়ে ছিল। নাসিমা, রামায়ণে মন্থরার মতো ষড়যন্ত্রকারী, তার শাড়ির আঁচল দিয়ে নিজেকে হালকা বাতাস করছিল। তার অন্তরে ঈর্ষার কয়লা উজ্জ্বল আলোয় জ্বলছিল। এ সবের মধ্যে অন্তঃসত্ত্বা অল্প বয়সি রমণী সমস্ত কিছুর মাঝে একটা অলৌকিক সুতার বন্ধনে একত্রিত করতে বৃথা চেষ্টা করেছে। এক সপ্তাহের মধ্যে মেহাবুব খানের ধৈর্যের রশি ছিঁড়ে যায়। সেই দুঃসময়ে সে অনুভব করে যে শৈশবের সেই স্মৃতি জড়ানো আম গাছ তাকে ডাকছে। বাইরের গরমে সে কাবু হয়ে যায়নি, বরং ঘরের ভেতরের প্রচণ্ড গরম তাকে দুর্বিষহ করে তুলেছে।

এক অপরাহ্ণে যখন মেহাবুব খান শুয়েছিল, আম গাছটি তার খুব কাছে চলে এসেছিল এবং একই সময় অন্য সব সম্পর্ক তাকে আলোড়িত করেছিল। গাছ কোনো কথা বলেনি। বরং গাছটি যেন ঠান্ডা হাত দিয়ে তার কপালে পরশ বুলিয়ে দিয়েছিল। সেই স্পর্শ এমন ছিল যে মেহাবুব খানের অভ্যন্তরের আগ্নেয়গিরি শীতল হতে শুরু করে। তাই ছিল সব কিছু! সে জানতে পারেনি কতক্ষণ এভাবে ঘুমিয়েছে, কী ধরনের অলৌকিক রেশ রেখে গেছে। যখন সে জেগে ওঠে, তখন সন্ধ্যার অন্ধকার জমতে শুরু করেছে। পশ্চিম আকাশে পড়ন্ত সূর্য লুকোচুরি খেলায় ব্যস্ত ছিল।

‘ভাইয়া  ভাইয়া’, মেহাবুব খানের ঘুম ভেঙে যায়, কিন্তু সে চোখের পাতা বন্ধ করে রাখে। যখন সে দূরের ডাকে সাড়া দিয়ে চোখ মেলে তাকালো, তার মনে হয়েছে আম গাছটি এসে তার সামনে দাঁড়িয়েছে। বিশাল ডালপালা ছড়ানো ফলবতী গাছ, যেখানে প্রচুর আম ধরেছে, যেখানে গাঢ় সবুজ পাতার সমারোহ; যেন কোনো প্রস্ফুটিত ফুলের তোড়া; জীবনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে পরিপূর্ণ কোনো কাঁচা আমের মতো; যেখানে রয়েছে চোখে পড়ার মতো প্রশস্ত কপাল, চোখের কোণে প্রেম-ভালোবাসা ও সম্মানের মিশ্রণ।

‘এই নিন চা, ভাইয়া।’ মেহাবুব খান হাত বাড়িয়ে চায়ের কাপ গ্রহণ করে, যেন কাপের মধ্যে কোনো বিশেষ রস। সে চিন্তার গভীরে ডুবে ছিল। চোখ তুলে সে আপাদমস্তক আরিফার ওপর চোখ বুলিয়ে আনলো। আরিফা দুর্বল হয়ে পড়েছে। তার সমস্ত চঞ্চলতা শুকিয়ে আমসি হয়ে গিয়েছে। চা শেষ না হওয়া পর্যন্ত সে সেখানেই ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর আরিফা খালি কাপ নিজের হাতে তুলে নেয়। কোনো এক অজ্ঞাত কারণে মেহাবুব খান কেঁপে ওঠে। 

‘আরিফা, কেমন করে তোমার এমন অবস্থা হয়েছে?’

পনেরো দিন আগে এ বাড়িতে মেহাবুব খান এসেছে এবং সেই ছিল আরিফার সঙ্গে তার মোলায়েম স্বরে প্রথম কথা বলা। আরিফা কিছুই বলেনি। তার চোখ টলোমলো। সে মাথা নিচু করে রেখেছিল। মেহাবুব খান রীতিমতো অভিভূত।

আধা সেকেন্ড পরে মেহাবুব খান চিন্তিত গলায় বললো, ‘পনেরো মিনিটের মধ্যে তৈরি হয়ে নাও। তোমাকে ভালো একজন স্ত্রীরোগ চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাবো। যদি তুমি অকর্মাকে বিশ্বাস করে বসে থাকো, তবে তোমার পরিস্থিতি খারাপ হবে। সে কোনো ধরনের দায়িত্ব নেওয়ার জন্য অযোগ্য।’ সে গলার স্বর নিচু করে আরও বলছিল, ‘যাহোক, তোমাকে রাতের খাবার নিয়ে চিন্তা করতে হবে না। ডাক্তারকে দেখিয়ে আমরা মোগল দরবার রেঁস্তোরায় খেয়ে নেবো।’

নাসিমা হাত-পা ছড়িয়ে বিছানায় শুয়ে ছিল এবং এক ঝাঁকুনিতে জেগে ওঠে। এছাড়া অন্য কোনো উপায় ছিল না। আজ পর্যন্ত বালির ব্যাগ দিয়ে প্রতিরোধ গড়ে বন্যাকে ঠেকিয়ে রাখা হয়েছিল, কিন্তু আর থামিয়ে রাখার মতো কিছুই নেই। সে অলস ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়ালো। তারপর সে তার কাসুতি কারুকাজ করা পাঞ্জাবি পোশাক এবং উঁচু গোড়ালির জুতা পরিধান করে বসার ঘরে আসে। যেই মুহূর্তে আরিফার মুখে নায়াজ খবরটা শুনেছে, ঠিক তখনই সে ভীষণ আনন্দ অনুভব করে। আন্না ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে চলেছে! এই সেই অপূর্ব সুযোগ, যার জন্য নায়াজ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল। বসার ঘরের এক কোণে সে একটা বেতের চেয়ারে বসে এবং ভাবতে শুরু করে। এখন সে আন্নাকে সব কিছু খুলে বলতে পারবে। তার সাফল্য অথবা নির্বুদ্ধিতার ঘটনা সে তার ভাইয়ের সামনে তুলে ধরতে পারবে। হয়তো একটা বা দুটি চড় খাবে। কোথায় গেছে তার সাধারণ বিবেক-বুদ্ধি? এসব ঘটনা ঘটার আগেই সে অনায়াসে বড় ভাইয়ের সঙ্গে আলাপ করে তার মতামত চাইতে পারতো। তার উদ্দেশ্যহীন তাকানোর ভঙ্গি হঠাৎ থেমে যায়। মাটির সামান্য ওপরে নাসিমার পায়ের আত্মপ্রকাশ ঘটে এবং পায়ে সেই উঁচু গোড়ালির জুতা, যা নায়াজের চিত্ত হরণ করেছে।

গত কয়েক দিনের ধাক্কায় নায়াজ নাসিমার জুতার কথা বেমালুম ভুলে গিয়েছিল। কিন্তু এখন, যখন তার বড় ভাইয়ের রাগ আর অভিমানের বরফ গলতে শুরু করেছে, ভূতের মতো জুতা জোড়া পুনরায় তার সামনে এসে হাজির হয়। নাসিমা যেখানেই হাঁটাচলা করুক না কেন, সেখানেই নায়াজের চোখ অনুসরণ করে। সে ভাবতে শুরু করে, যদি নাসিমা তার প্রসারিত হাতের তালুর ওপর একবার হাঁটতো, তাহলেই সে ধন্য হতো। সে অনেক কষ্ট করে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে। ‘পাগল, আস্ত একটা উন্মাদ, এসব কী ভাবছো? জাহান্নামে যাও। এক জোড়া জুতার জন্য এমন মাতলামি। তুমি চুরি করতেও প্রস্তুত। এমনকি ভিক্ষা চাইতেও রাজি? তুমি ধ্বংস হয়ে যাবে।’ নায়াজ খান নিজেকে ভর্ৎসনা করে। কিন্তু তারপরও, কিন্তু তারপরও উঁচু গোড়ালির জুতা। সেই জুতা জোড়ায় রয়েছে বিশেষ ধরনের জাদুকরি শক্তি, যা তাকে শুধু কাছে টেনে নিচ্ছে না, বরং তার সাধারণ জ্ঞান-বুদ্ধিও নষ্ট করে দিয়েছে। সে নিজের মধ্যে হারিয়ে গেছে, লুপ্ত হয়েছে তার বোধ, অনুভূতি, বিদ্যা ও চেতনা। সে বিবেকহীন হয়ে পড়ে। যেভাবেই হোক না কেন, তাকে সেই জুতা জোড়া পেতে হবে এবং পরার জন্য আরিফাকে দিতে হবে, তার এই ইচ্ছা এমন বড় হয়ে দেখা দেয় যে সে অন্য সবকিছু ভুলে যায়। তখনো সে সেখানেই বসে ছিল, যেন ভীষণ আঘাত পেয়েছে। যখন তার সংবিৎ ফিরে আসে, তখন মেহাবুব খান এক সেকেন্ডের জন্য ছোট ভাইয়ের দিকে আড়চোখে তাকায়। আর ঠিক তখনই ছোট ভাইয়ের জন্য তার মনের এক কোণে সহানুভূতির ঢেউ জেগে ওঠে। মেহাবুব খান তা প্রকাশ না করে সেখান থেকে উঠে চলে যায়।                            

মাতৃসদনে আরিফার সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষ হওয়া পর্যন্ত মেহাবুব খান দাঁড়িয়ে থেকে এমন উৎকণ্ঠিত হয়ে অপেক্ষা করেছে যে যা শুধু মায়েরা করতে পারে। সব কিছুই স্বাভাবিক ছিল, কিন্তু সে রক্ত স্বল্পতায় ভুগছিল। এছাড়া তার উচ্চ রক্তচাপ মেহাবুব খানকে দুশ্চিন্তায় ফেলেছিল, যদিও সে তা প্রকাশ করেনি। নাসিমার কোনো সন্দেহ নেই যে আরিফার চিকিৎসার সমস্ত খরচপাতি তার স্বামী বহন করছে। সে শুধু ওষুধপত্রের জন্য খরচ করেনি, এমনকি সে তার নিজের জন্যও প্লাস্টিকে মোড়ানো ওষুধ কিনে নিয়ে এসেছে। সেই দৃশ্য দেখার পর নাসিমার সারা দেহে রাগ-ক্ষোভের ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে।

মাতৃসদন ভবন থেকে মোগল দরবার রেস্তোরাঁ সামান্য দূরে অবস্থিত। তখনো রাতের খাবার খাওয়ার সময় হয়নি। নাসিমার অন্য আরও কেনাকাটা বাকি ছিল।

বস্তুগত জিনিসগুলো অমূল্য সম্পদ হয়ে উঠেছিল এবং মানব জীবন হয়ে গিয়েছিল মূল্যহীন। সেসব বস্তু জগতের সামগ্রিক মালিকানার আড়ালে বিক্রয়ের জন্য থাকে মানুষের অনুভূতি। ক্ষুদ্র মানুষ এবং বিশাল ছায়ার মধ্যে সম্পর্ক নির্ধারণ করে বস্তু জগৎ। যুবতী নববধূর জীবন পাল্টে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে একটা ফ্রিজ। তার স্বপ্নের মাঝে হোলি খেলার রঙের ভূমিকা রাখতে পারে বিভিন্ন রঙের ফ্রিজ। সেসব মালিকানাধীন বস্তু যে শুধু বাড়ির মধ্যে কোথাও এক বিশেষ স্থানজুড়ে থাকে, তা নয়। এমনকি জীবনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পেছনে ভূমিকাও রাখে। লোকজন দৌড়ের ওপর থাকে এবং তাদের মূল্য ও সম্পর্কগুলোকে বাতাসে ভাসিয়ে দেয়। ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত হওয়ার কারণে ভেঙে পড়া, ঘামতে থাকা, তারপরও তারা ছুটে চলেছে। আহা! সোনার হরিণ ইতস্তত ঘোরাফেরার চেয়ে অধিক মূল্যবান, যা প্রত্যেক মানুষকে পাগল করে। এই সোনার হরিণ সবাইকে অলৌকিক জাদুর মাঝে আবদ্ধ করেছে এবং এর চুম্বকত্বের কাহিনি, যা কেউ তাদের হাতের মুঠোয় নিতে পারে না, এই ছিল সভ্যতার মহান চিহ্ন।

নাসিমা এবং আরিফা জামাকাপড়ের দোকানে ঢুকেছে। মেহাবুব খান একটা টুলের ওপর বসেছিল এবং আসবাবপত্র, সিলিংয়ের মেকি কারুকাজ, কাউন্টার নির্মাণ কৌশল এবং এ ধরনের অনেক কিছুর দিকে গভীর মনোযোগ দিয়ে দেখছিল। নায়াজ খান এদিক-ওদিক ঘোরাঘুরি করছিল এবং প্রতিটি দোকানের সামনে ক্ষণিকের জন্য থেমে কাচের আলমারির ভেতর সাজানো জিনিসপত্র দেখছিল। একসময় সে দোকানের ভেতর প্রবেশ করতে যাচ্ছিল, যে দোকানে তার পরিবারের মহিলারা ঢুকেছে, ঠিক তখনই সে অনুভব করল কেউ একজন পেছন থেকে আলতোভাবে তার পিঠ স্পর্শ করেছে। সেই স্পর্শ! সে অনুভব করল যে সেই স্পর্শ যেন তার মনের মধ্যে জমে থাকা কিছু অমীমাংসিত প্রশ্নের জবাব। সে এক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়াল। সে ঘুরে দেখতে গেল কে তার পিঠ স্পর্শ করেছে, কিন্তু কাউকে পেছনে দেখতে পেলো না। তারপর, ঠিক একইভাবে, সে পুনরায় ঘুরে দেখল যে তার সামনে রয়েছে বিশাল এক কাচের আলমারি, যার মধ্যে থরে থরে সুন্দরভাবে সাজিয়ে রাখা হয়েছে বিভিন্ন প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, তার হৃৎপিণ্ড একবারের জন্য ধুকপুকানির অনুপস্থিতি অনুভব করে। তারপরও সে ঘোরাঘুরি করছিল, ইতিউতি তাকিয়ে দেখছিল আর ভাবছিল, যদি এটা একটি স্বপ্ন হতো। তার অবিরাম অনুসন্ধানের কেন্দ্রবিন্দু, যা তাকে দিন এবং রাত পীড়া দিচ্ছিল, তার স্বপ্নের মাঝে, হৃদয়ের মধ্যে শেকড় গজিয়েছে, সেই জুতা জোড়া, সেখানে ওই কাচের আলমারির ভেতর সাজিয়ে রাখা হয়েছে! মুগ্ধ হয়ে সে সেখানেই স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। এটা কি সত্য ছিল, নাকি মিথ্যা ছিল? এটা কি আদৌ সম্ভব ছিল?  

অবশেষে নায়াজ খান সুস্থ হয়ে ওঠে। একসময় যা অকল্পনীয় বলে মনে হয়েছিল, সেই বস্তুর সম্ভাবনা তার বিবেককে বিদ্ধ করে। সে সরাসরি দোকানে প্রবেশ করল, কিন্তু দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিল না। তাই সে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে একটা টুলের ওপর বসে পড়ে। সে অনুভব করতে শুরু করে যে দোকানের সবগুলো বাতি তার দিকেই তাকিয়ে আলো দিচ্ছে, যেন সে একজন অসাধারণ ব্যক্তি। তার ভয় হচ্ছিল যে কাচের আলমারির ভেতর সাজানো সেই জুতার ওপর হয়তো কারোর নজর পড়বে। আর তাই সে এমন জোরে বললো যেন দোকানের ভেতর সবাই স্পষ্ট শুনতে পায়, ‘আমাকে ওই উঁচু গোড়ালির জুতা জোড়া দেন।’

ছোট ভাইয়ের গলার স্বর শুনে মেহাবুব খান ঘুরে দোকানের ভেতর তাকাল। নাসিমাও দেবরকে দেখছিল। এসবের প্রতি অমনোযোগী নায়াজ খান কণ্ঠস্বর আরও উঁচুতে তুলে তার স্ত্রীকে ডাকলো। ভাশুরের রের সামনে স্বামীর এমন ব্যবহার দেখে আরিফা এগিয়ে আসে এবং স্বামীর পেছনে দাঁড়ায়। নায়াজ খান খুবই আবেগময় হয়ে ওঠে। হঠাৎ সে উঠে দাঁড়াল এবং স্ত্রীর দিকে ঘুরে বললো, ‘ওখানে বসো, ওই জায়গায় বসো।’ নায়াজ খান যে জায়গা দেখাচ্ছিল, সেদিকে তাকিয়ে আরিফা রীতিমতো হতভম্ব হয়ে যায়। সিংহাসনের মতো সাজানো চেয়ারটি মোটা কাচ দিয়ে তৈরি। তাই আরিফা চিন্তিত ছিল যে সে বসলে হয়তো কাঁচটি ভেঙে যেতে পারে। যদিও সে ভাবছিল কেন তার স্বামী এমন অভিনয় করছে, কিন্তু সে টুঁ-শব্দটিও করল না। নায়াজ উচ্ছ্বসিতভাবে আরিফার হাত ধরলো এবং তাকে সেই সিংহাসনে বসিয়ে দিলো। আরিফা নিজের ভেতর সংকুচিত হয়ে যায়। সেই উঁচু গোড়ালির জুতাজোড়া দোকানদারের হাতে এবং একজন স্বামী, যে কোনো দিকে কোনো মনোযোগ দিচ্ছে না, মেহাবুব খান ফাঁকা দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে রয়েছে আর নাসিমা তার ঠোঁটের ফাঁকে খুশির হাসি লুকানোর জন্য ভীষণ কসরত করছে।

বিক্রেতা লোকটি হাঁটু গেড়ে বাঁকা হয়। সে আরিফার পায়ের নীল ফিতার হাওয়াই চপ্পল খোলে এবং উঁচু গোড়ালির জুতা জোড়া পরিয়ে দেয়। বাতির উজ্জ্বল আলোয় জুতার হলুদ রঙের ধাতুর বগলস স্বর্ণের মতো চকচক করছিল। কিন্তু কিছুতেই তার পায়ে লাগছিল না। নাজুক-পায়ের মহিলার জন্য তৈরি জুতা তার প্রশস্ত পায়ে ঢুকছিল না। তবে নায়াজ খান অসন্তুষ্ট হয়নি। সে একটা টুলে বসলো এবং দোকানিকে সাহায্য করার জন্য তৈরি হলো। তারা একসঙ্গে মিলে আরিফার পায়ের আঙুল অনেক কষ্টে বাঁকা করে এবং জুতার ভেতর পা ঢোকায়। নায়াজ জুতার পেছনের দিকের ফিতা খুলে গোড়ালির চারপাশে ঘুরিয়ে এনে কোনোরকম বগলসের মধ্যে ঢুকিয়ে আটকে দেয়। দোকানি তাকে অনুসরণ করে এবং অন্য পায়ের ফিতা লাগিয়ে দেয়। আরিফার গোড়ালি জুতার বেশ খানিকটা বাইরে বেরিয়ে আছে। জুতার এখানে-সেখানে শব্দ হচ্ছিল এবং কালো রেখাগুলো এখন আরও বেশি স্পষ্ট হয়ে ফুটে রয়েছে। এটা সত্যি যে সাংসারিক কাজকর্মে আরিফা এতই ব্যস্ত থাকে যে নিজের পায়ের প্রতি যত্ন নেওয়ার সময় তার হয় না। কোনো ধরনের মনোযোগ না দিয়ে সে তার স্বামীর হাওয়াই চপ্পল পায়ে দিয়ে অভ্যস্ত। তাতে সে স্বাচ্ছন্দ্য দ্রুত চলাফেরা করতে পারে। সে যখন দেখলো জুতার সুচালো গোড়ালি, তার ভয় হতে শুরু করলো।

দোকানি জুতা জোড়ার দিকে তাকাল যে জুতা কোনোভাবেই আরিফার পায়ে লাগেনি, এবং দ্বিধান্বিত গলায় বলল, ‘একটুখানি হেঁটে দেখুন ম্যাডাম।’ আরিফা খুব সাবধানে উঠে দাঁড়ায়। যাহোক, সে সোজা হয়ে দাঁড়াতে পেরেছে। সে হালকাভাবে এক পা সামনে দিকে এগিয়ে দেয় এবং তারপর আরেক পা। আর এভাবেই সে জুতা পায়ে হাঁটে। ইতোমধ্যে নায়াজ খান কাউন্টারে ছুটে যায় এবং পকেট থেকে টাকা বের করে মূল্য পরিশোধ করে। এ দৃশ্য দেখে নাসিমার আনন্দের সীমা নেই। সে তার দু’বাহু নিজের বুকের ওপর রাখে এবং উৎসাহ দিয়ে আরিফাকে বললো, ‘হুম, এখন হাঁটো, এক পা এক পা করে, দেখি কেমন লাগছে।’ তার ভেতরে আরিফাকে বিদ্রুপ করার যে ইচ্ছে জমেছিল, তা সে লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করে। কিন্তু পরমুহূর্তেই তা বেরিয়ে আসে এবং প্রচণ্ড হাসির বেলুন ফাটতে শুরু করে, যা কেবল তার ঠোঁটে নয়, এমনকি সারা মুখমন্ডলেও।

হোঁচট খেতে খেতে, অর্ধেক ভয়ে এবং বাকি অর্ধেক লজ্জায়, আরিফা বুঝতে পারলো যে কোনোভাবেই এই পরিস্থিতি থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া যাবে না। যদিও স্বামীর চরম আকারের অদ্ভুত ব্যবহারের জন্য তার হৃৎপিণ্ড রাগ-ক্ষোভে পুড়তে শুরু করেছিল, কিন্তু তারপরও সে সুন্দর গালিচার ওপর হেঁটে জুতার সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। সেই মুহূর্তে তার কাছে কোনো বিকল্প পথ খোলা ছিল না। সে অনুভব করতে শুরু করে যে জুতা পরে হাঁটা তার পক্ষে সম্ভব নয়। কয়েক কদম এগিয়ে যাওয়ার পরে সে ফিরে এসে দোকানিকে বললো, ‘এদিকে তাকান। জুতা প্যাকেট করে দেন,’ এবং সে আশপাশে তার হাওয়াই চপ্পল খুঁজতে থাকে। কোথায় গেলো? ইতোমধ্যে নায়াজ খান সেগুলো প্যাকেটে ভরে নিয়েছে এবং আরিফার জন্য দোকানের বাইরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে। আরিফার চোখ ভরে যায় অশ্রুবিন্দুতে।

তাকে গালিচার বাইরে পা ফেলতে হয়েছে এবং অবশেষে দোকানের মেঝের ওপর দাঁড়ায়। মেঝের ওপর বিছানো পাথর চকচক করছিল। সে ভাবছিল হয়তো পা ফসকে পড়ে যাবে। তাই আস্তে আস্তে পা ফেলছিল। সে দোকানের থাম ও কাচের আলমারি ধরে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং অবশেষে সামনের দরজায় পৌঁছে। দোকানের বাইরে যাওয়ার জন্য মসৃণ গ্রানাইট পাথর বিছানো পথ দেখার পরও সে ক্ষণিকের জন্য থামে। নাসিমা তার দুর্দশা বুঝতে পারে। সে তার দেবরের পাগলামির জন্যও রাগ করেছে এবং বুঝতে পারল যে সে এসব করেছে একমাত্র তার সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার জন্য। কিন্তু বেচারি আরিফার জন্য তার মায়া হলো এবং সে আরিফার হাত ধরে বললো, ‘আস্তে নেমে এসো।’ যতক্ষণ না আরিফা রাস্তায় নেমে আসে, ততক্ষণ সে বলতে থাকে।

তারা রাস্তায় নেমে আসার সময় আরিফার হাত ধরে নাসিমা বলছিল, ‘পাই, মা, পাই,’ যেন কোনো বাচ্চাকে এক পা এক পা করে হাঁটতে উৎসাহ দিচ্ছে? সে আস্তে করে আরিফার হাত ছেড়ে দেয়। নায়াজ খান ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গেছে এবং অনেক আগে হাঁটছিল। যদিও মেহাবুব খান ভাবছিল যে যেই জুতা আরিফার পায়ে লাগেনি, তাই কেনার জন্য ছোট ভাইয়ের আচরণ তার কাছে অদ্ভুত লাগে। যাহোক, সে অন্য আর কিছু লক্ষ করেনি। নাসিমা ঘটনাটি তার মস্তিষ্কের এক কোণে সঞ্চয় করে রাখলো, যাতে সময় ও সুযোগ মতো তার স্বামীকে বিদ্রুপ করার জন্য ব্যবহার করতে পারে। যাহোক, শীঘ্রই সে নিজেও অন্যান্য বিষয় নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

বেচারি আরিফা তখনো ভয় পাচ্ছিল যে সে হয়তো হোঁচট খেয়ে পড়ে যাবে এবং পা মচকে গিয়ে আশ্চর্যজনকভাবে খুঁড়িয়ে হাঁটবে। নতুন জুতা জোড়া তার পায়ের আঙুলে চাপ দিতে শুরু করেছে। তার পায়ের গোড়ালি পেছন থেকে বের হয়ে আছে এবং ভীষণ ব্যথা করছে। তার চেয়েও বেশি হলো তিন ইঞ্চি সরু জুতার গোড়ালি, যদি সে পড়ে যায়, তা ঠিক আছে। বড় জোর কয়েকটা আঙুল ভাঙবে। সে ভাবতে থাকে, পেটে যে বাচ্চা আছে, তার কী হবে?

আরিফা আরও ধীরে হাঁটতে থাকে। নায়াজ, মেহাবুব এবং নাসিমা অনেক দূর এগিয়ে গেছে। তাদের দেখা যাচ্ছে না। তার কাছে প্রতিটি পদক্ষেপ অকল্পনীয় মনে হচ্ছিল। সে টেলিভিশনে অনেক মহিলাকে এ ধরনের উঁচু গোড়ালির জুতা পরতে দেখেছে, যাদের পড়নে ছিল খাটো স্কার্ট অথবা বিকিনি এবং তারা তাদের দীর্ঘ পা দেখিয়েছে। কীভাবে তাদের পা তালে তালে চলতো, তা মনে করে সে সামনের দিকে শক্তভাবে কদম ফেলার চেষ্টা করে। কিন্তু নিজেকে সাহসী অনুভব করার পরিবর্তে সে বরং উলঙ্গ ভাবতে আরম্ভ করে এবং হোঁচট খেতে শুরু করে।

এসব দুশ্চিন্তার মাঝে আরিফার ভীষণ কাশি পায়, যা তার মন এবং সমস্ত শরীর অনেকক্ষণ ধরে দখল করে রেখেছিল। আরিফা কাঁপতে থাকে। যেই তার কাশির রেশ কেটে যায়, তখন সে আরক্তিম মুখের ঘাম মোছে এবং কয়েক মিনিট স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। সেই প্রথম সে ভাবলো যে জুতার জন্য তার পা কতো সমস্যায় ফেলবে।

এখনো আরিফা তার স্বামীর আচরণ বুঝতে পারেনি। তার ব্যাপারে নায়াজের কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই, যে জুতা সে চায়নি, এমনকি তার অনাগত শিশুর ক্ষতি হতে পারে, তা পরতে তাকে রীতিমতো বাধ্য করেছে। নায়াজ একবারও পেছন ফিরে না তাকিয়ে হন হন করে হেঁটে বেরিয়ে যায়। আরিফা আপনমনে ভাবছিল সে কী অপ্রয়োজনীয় জুতা জোড়া খুলে ফেলবে এবং এমন এক উপসংহারে এসে পৌঁছাবে, যা আধা সেকেন্ডের মধ্যেই তার সমস্ত দুশ্চিন্তা, ভয় এবং অত্যাচার প্রতিহত করবে। সে দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, শরীরের সমস্ত শক্তি পায়ের আঙুলে এনে জমা করে এবং সামান্য পরিসরে তাদের নাড়াচাড়া করার চেষ্টা করে। সে তখন ব্যথা পাচ্ছিল। তাই সে গোড়ালি দিয়ে মেঝেতে আঘাত করে, জুতার সরু গোড়ালি বাঁকা করার জন্য শরীরের সমস্ত শক্তি জড়ো করে চাপ দেয়। উম্ম! হুঁ! সে বুঝতে পারে যে অভিশপ্ত জুতার গোড়ালি এক ইঞ্চিও বাঁকা হয়নি। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর আরিফা মানসিকভাবে বেশ শক্ত হয়েছে। তার সেই আত্মপ্রত্যয় তাকে অদ্ভুত ক্ষমতা দিয়েছে। সে পুনরায় শিরদাঁড়া সোজা করে দাঁড়ায় এবং দেহের সমস্ত ভার দু’পায়ে ওপর রাখে এবং আপন মনে সুর তুলে গাইতে থাকে, ‘বাম, ডান, বাম,’ আর কুচকাওয়াজ শুরু করে।

এটা স্পষ্ট হয়ে দেখা দিয়েছে যে আরিফা যেভাবে হাঁটছিল, তার সেই হাঁটার ভঙ্গি দেখে কে কী ভাবলো, তাতে তার কিছুই যায় আসে না। অল্প সময়ের মধ্যেই তার সতর্কতা কমে যায় এবং বাম গোড়ালির গাঁট মচকে যায়। ভাগ্যিস, তার পা ভাঙেনি, কেননা সে তৎক্ষণাৎ তার সামনে হেঁটে যাওয়া এক বিশাল দেহি লোকের শার্ট ধরতে পেরেছিল। লোকটি বুঝতে পারে, কেউ একজন পেছন থেকে প্যান্টের ভেতর গুঁজে থাকা শার্ট হ্যাঁচকা টানে এমন জোরে বের করেছে যে শার্টের বোতাম তার গলার কাছে এসে চেপে ধরেছে এবং কাঁধের পেছন দিকে সরে গেছে। লোকটি ক্ষিপ্ত হয়ে পেছন ফিরে তাকায়। কিন্তু সেই মুহূর্তে আরিফার শোচনীয় অবস্থা দেখে তার সমস্ত রাগ-ক্রোধ পানি হয়ে যায়। যদিও আরিফা লোকটির শার্ট ছেড়ে দিয়েছে, তারপরও সে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর জন্য কসরত করতে থাকে। লোকটি ভদ্রভাবে আরিফাকে দাঁড়াতে সাহায্য করে এবং নরম গলায় জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি যে জুতা পরেছেন, তা ঠিকমতো লাগেনি, তাই না?’ জীবনে কিছু মুহূর্ত এমনই হয়। এর আগে আরিফা কখনোই কোনো অপরিচিত পুরুষের মুখোমুখি হয়নি, সে অল্প সময়ের জন্য তোতলাতে থাকে। তারপর একসময় বলল, ‘হ্যাঁ, এই জুতাজোড়া আমার পায়ের মাপের না, আরামদায়কও নয়, বরং যন্ত্রণাদায়ক।’  

‘আপনি কেন জুতা খুলে হাতে নিচ্ছেন না?’ এমন অস্বস্তিকর পরিবেশের মুখোমুখি হয়ে আরিফা লোকটির দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল। বললো— ‘এগুলো শয়তানের জুতা। আমি যদি খুলে ফেলি, তারপরও আমাকে বারবার এই জুতা পরতে হবে।’

এটা বলেই আরিফা তার ডান পা উপরে তোলে এবং মেঝেতে জোরে আঘাত করে। জুতার গোড়ালি ভেঙে যাওয়ার কথা ভুলে গিয়ে সে দেখে গোড়ালি একটুও নড়েনি। সে বুঝতে পারে যে অশ্রু এসে তার চোখ ভিজিয়ে দিচ্ছে। এই আশায় সে হাত বাড়ায়, যেন কোনো একটা কিছু ধরে শরীরের ভারসাম্য রক্ষা করতে পারে।

সেখানে যখন সে দোনোমোনো করছিল, সে জানুক বা না জানুক, তখন তার চারপাশ অন্ধকার হয়ে আসছিল। বিদ্যুৎ কী চলে গেছে? না। তবে হঠাৎ করে অন্ধকার হয়ে গেছে। কোন ধরনের অন্ধকার? চামড়ায় শীতল পরশ বুলিয়ে দিচ্ছে এবং সেই স্পর্শের অনুভূতি তার শিরা-উপশিরায় বয়ে বেড়াচ্ছে। সে ক্রমশ অবচেতন হয়ে পড়ছিল। প্রতি সেকেন্ডে তার শরীর ভারী হয়ে আসছিল; আর অন্ধকার তার প্রতিটি স্নায়ু গ্রাস করছে। ক্রমশ সেই অন্ধকার তার হৃৎপিন্ডের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল এবং বরফের মতো সমস্ত চেতনা জমাট বেঁধে যায়। তার শেষ শক্তিটুকুও সে গিলে ফেলেছে। অবশেষে অন্ধকার এসে তার সমস্ত সত্তাকে দখল করে তাকে অতলে তলিয়ে দেয়।  

সেই অদ্ভুত সময়ের প্রতিটি সেকেন্ডে আরিফা অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করছিল। সে দেখতে পেলো যে অন্ধকার তার অস্তিত্বের গভীরে শেকড় ছড়িয়েছে। সেসব শেকড় তার মস্তিষ্ক থেকে নেমে এসেছে, তারপর তার মুখমণ্ডল, গলা, ঘাড়, তার বুক বেয়ে নিচে নেমেছে, যতক্ষণ না পর্যন্ত তার ফুসফুস বেয়ে আরও নিচে নেমে ফেটে যায়। সে যখন উপলব্ধি করলো, ততক্ষণে শেকড় এসে গর্ভবতী পেটে গিয়ে থেমে গেছে। অবশেষে ধারালো শেকড়গুলো অবশ হয়ে যায়। তাদের শক্তি ক্রমশ শ্লথ হতে থাকে এবং চরম অন্ধকার সংকুচিত হয়। আর সেই সময় সে উপলব্ধি করে যে, সব জায়গায় বিস্তৃত অন্ধকারেরও কিছু সীমা থাকে।

হঠাৎ আরিফা তার পেটের দিকে তাকায়। সে অনুভব করতে শুরু করে যে যদিও কুয়াশাচ্ছন্ন অন্ধকারের মাঝে আছে, তবে তার জন্য রয়েছে আশার আলোর রশ্মি। তখন সে উপলব্ধি করে তার পেটের মধ্যে কয়েক স্তর ভেতরে কেউ একজন গর্ভের চতুর্দিকে পা দিয়ে চাটি দিচ্ছে। যখন তার পাঁচ ইন্দ্রিয় অন্ধকারের তলানিতে চাপা পড়ে আছে এবং সে সমস্ত অনুভূতি থেকে যোজন দূরে রয়েছে, তখন সে অবিশ্বাস্য যোগাযোগ তৈরি করে। সেখানে রয়েছে জীবনের স্পন্দন, নড়াচড়া।

‘আম্মা।’

‘আমাকে বলো, কী হয়েছে, আমার কলিজা,’ আরিফা তৎক্ষণাৎ জবাবে বললো, কিন্তু যখন সে বুঝতে পারলো যে সমব্যথা কান্নার আওয়াজের উৎস, তার সমস্ত শরীর অবশ হয়ে এলো। অনিচ্ছা সত্ত্বেও তার চোখের পাতা বন্ধ হয়ে যায়। সে উপলব্ধি করে তার স্নায়ু যেন নিয়ন্ত্রণের নাগালের বাইরে চলে গেছে। তার মনে হলো সে অনাগত শিশুর সঙ্গে চেতন অবস্থায় কথা বলছে, তা তার নিজের নয়। একমুহূর্তের জন্য নীরবতা নেমে আসে। তারপর তার গর্ভের কোনো এক কুঞ্চিত জায়গা থেকে পুনরায় সেই ডাক ভেসে এলো। 

‘আম্মা।’

‘বলো, আমাকে বলো, আমার সঙ্গে কথা বলো, আমার আদরের ধন।’ আরিফা তার পেটের সে জায়গায় আলতো পরশ বুলিয়ে দিতে শুরু করে, যেখানে বলের মতো গোল হয়ে কুঞ্চিত হয়ে আছে।

আরিফার আলতো স্পর্শে জায়গাটি কিঞ্চিৎ হালকা মনে হলো। ফিসফিস গলায় বলল, ‘আপনার কী হয়েছে, আম্মা? আপনাকে আমার অনেক ওজন বহন করতে হচ্ছে।’

‘কীভাবে, কীভাবে, কোন ধরনের ওজন, আমার বাচ্চা, আমার কলিজার টুকরা?’

‘আমি জানি না, আম্মা। আমার জন্যই আপনার পেটের সমস্ত ওজন। আমি একটুও নড়াচড়া করতে পারছি না, আম্মা।’

‘আইয়্যু, আমার আদরের ধন, কী হয়েছে তোমার? আমি বুঝতে পারছি না।’

‘আপনার সমস্ত শরীরের ওজন যেন আমার ওপর পড়েছে, আম্মা। একবার তাকিয়ে দেখুন, দেখুন আম্মা, আমি নড়াচড়ার করার জন্য কোনো জায়গা নেই।’

আরিফার আধাখোলা চোখ থেকে নেমে আসে অশ্রুধারা।

‘ওহ, আমার জীবন, তোমার সঙ্গে কী ঘটছে, আমি কী করতে পারি?’

আরিফার পা কাঁপতে শুরু করে। সে আত্মবিশ্বাসী যে পড়ে যাবে না। কিন্তু যতই সে স্থির হয়ে সোজা দাঁড়িয়ে থাকার চেষ্টা করছিল, ততই যে তার হাঁটুর শক্তি কমে যাচ্ছিল। সেই সময় সে নিজের ভেতর উপলব্ধি করে, যদি সে পড়ে যায়, তাহলে তার গর্ভের শিশু ব্যথা পাবে। অনাগত শিশু পুনরায় নিজের মধ্যে প্যাঁচিয়ে যায় এবং বললো, ‘আপনার পায়ে কী হয়েছে, আম্মা?’ সেই সময় আরিফার চিন্তায় ছেদ পড়ে।

এক পলকে আরিফার সামনে সমস্ত কিছু পরিষ্কার হয়ে যায়। সেই উঁচু গোড়ালির জুতার কারণে সে অযথা গর্ভের শিশুর ওপর বেশি চাপ সৃষ্টি করেছে। তার হৃদয় কোমল হতে শুরু করে।

আরিফা অন্ধকারে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিল, বগলস টেনে জুতা খোলার চেষ্টা করে। বগলসগুলো একটুও নড়াচড়া করলো না। শুধু তাই নয়। বরং সে যতই টানছিল, ওগুলো যেন ততই তার পায়ের চতুর্দিকে শক্ত হয়ে আটকে যাচ্ছিল। বগলসগুলো দেখে মনে হচ্ছিল যেন পায়ের চামড়া।

যত চাপ গিয়ে পড়ছিল তার গর্ভে, ততই যেন শিশুর জন্য জায়গা সংকুচিত হচ্ছিল। আরিফার মনে হলো জীবন ও মরণের সঙ্গে লড়াই করছে তার গর্ভের শিশু।

আমি কোনো মা নই, আমি মহামারি, একজন দানবী। মন খারাপের এমন অস্থির সময়ে আরিফার কাছে এক ধরনের আশার আলো দেখা দেয়।

এখনো সময় আছে। শেষবারের মতো সে গর্ভের শিশুকে বাঁচাতে চেষ্টা করবে। স্বামীকে খুঁজতে সে এদিক-ওদিক তাকায়, কিন্তু সে আশপাশে কোথাও নেই। আরিফার পায়ে জুতা পরিয়ে সে হাওয়া হয়ে গেছে।

চরম দুশ্চিন্তায় আরিফা আকাশের দিকে দৃষ্টি মেলে তাকায়। সেই অন্ধকারে সে কিছুই দেখতে পেল না।

অবশেষে দুর্বল কণ্ঠস্বর ভেসে আসে। ‘আম্মা’।

সেই কণ্ঠস্বর আরিফার ভালোবাসার হৃদয় যেন বিদীর্ণ হয়ে গেল। অদ্ভুত এক আবেগ এবং অবিশ্বাস্য শক্তি তার মধ্যে সঞ্চারিত হলো, যা আগে সে জানতো না।

 

আরিফা দু’হাত পেটের ওপর রাখে। সে তার সমস্ত ইচ্ছাশক্তি গর্ভের শিশুর ওপর মনোনিবেশ করে, যার জন্য ধীরে ধীরে শিশুর নড়াচড়া থেমে যায়। তার হৃদয় ভরে ওঠে এক নিষ্পাপ, মিষ্টি শিশুর জন্য, যে অচিরেই ভূমিষ্ঠ হবে। আর তার পরিবর্তে আরিফার সমস্ত শক্তি উঁচু গোড়ালির জুতায় মনোনিবেশ করতে শুরু করে।

আরিফা যতই জুতার ওপর মনোযোগ দিতে থাকলো, ততই সে ঘামতে লাগলো। তখনই তার মনে হলো যে গর্ভের শিশু উঁচু গোড়ালির জুতার চাপের শিকার হয়েছে, যেন সেই চাপ কোনো এক পরম শক্তি থেকে এসেছে, বিস্ফোরিত হয়ে হাজার হাজার টুকরায় পরিণত হয়েছে, উল্কার মতো জ্বলন্ত, কোথাও গিয়ে আছড়ে পড়েছে, কোথাও মিশে গেছে।

আর তারপর শান্ত পৃথিবীর মতো আরিফা দৃঢ়ভাবে দাঁড়ায়, আর মাটির সঙ্গে শক্ত করে পোঁতা তার অস্তিত্ব।

গল্পসূত্র: ‘উঁচু গোড়ালির জুতা’ গল্পটি বানু মুশতাকের ইংরেজিতে ‘হাই হিল সুজ’ গল্পের অনুবাদ, যা ২০২৫ সালে ‘আন্তর্জাতিক বুকার’ পুরস্কারপ্রাপ্ত ছোটোগল্প গ্রন্থ ‘হার্ট ল্যাম্প'—এ অন্তর্ভুক্ত। গ্রন্থটি কন্নড় ভাষা থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন দীপা ভাসতি।

/জেড-এস/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
ফোনালাপ ফাঁসের পর বদলি করা হলো জেল সুপারকে
ফোনালাপ ফাঁসের পর বদলি করা হলো জেল সুপারকে
বিশ্বতারকাদের সঙ্গে ফিফা অ্যালবামে সানজয়, নোরা ফাতেহি-ভেজড্রিমের সঙ্গে ‘সির সির’
বিশ্বতারকাদের সঙ্গে ফিফা অ্যালবামে সানজয়, নোরা ফাতেহি-ভেজড্রিমের সঙ্গে ‘সির সির’
সৌদি থেকে ফিরেছেন ২৫৩৭৭ হাজি, মৃত্যু বেড়ে ৪৫
সৌদি থেকে ফিরেছেন ২৫৩৭৭ হাজি, মৃত্যু বেড়ে ৪৫
পশ্চিমবঙ্গে যেকারণে তৃণমূলের ‘অপ্রত্যাশিত রক্ষাকর্তা’ খোদ বিজেপি
কী, কেন, কীভাবেপশ্চিমবঙ্গে যেকারণে তৃণমূলের ‘অপ্রত্যাশিত রক্ষাকর্তা’ খোদ বিজেপি
সর্বাধিক পঠিত
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম