লিপিকা অনেক চেষ্টা তদবির করে শেষ পর্যন্ত চারদিনের ছুটি ম্যানেজ করতে পেরেছিল। যেহেতু সে একটা কর্পোরেট অফিসে পারসোনাল সেক্রেটারির কাজ করে, তাই ছুটি পাওয়া তার জন্য ছিল খুবই অনিশ্চিত বিষয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বসের থাইল্যান্ড যাওয়ার বিমানের টিকিট বুকিং দেওয়ার সময় তার মাথায় এলো এই কয়েকটি দিন যেহেতু তার বস থাকবে না, সে ছুটির জন্য আবেদন করবে কিনা! করবে কি! একদিকে কাজ করার একঘেয়েমিতে প্রাণ হাঁপিয়ে উঠেছিল। অন্যদিকে নিজের সব রকম ভাবনার চেয়েও তার মনে পড়ছিল মুনতাহার কোমল মুখটা। মুনতাহা অনেক দিন থেকে কানের কাছে ঘ্যান ঘ্যান করছিল,‘ ছোটমা, চল না, আমরা সমুদ্রের কাছে বেড়াতে যাই’। মুনতাহার কথা ভেবেই সে আলটপকা বসকে বলেই ফেলেছিল তার এই ছোট্ট আবদারের কথা। বস ভদ্রলোকটি এমনিতে গম্ভীর প্রকৃতির। কিন্তু সেদিন যে কোনো কারণে খোশমেজাজে ছিলেন। সে রকম আয়েশি মেজাজেই তিনি বললেন, ‘মেয়েকে নিয়ে সমুদ্রে বেড়াতে যেতে চান, অসুবিধা নেই। কক্সবাজারে আমার একটা পুরোনো বাংলো আছে। সমুদ্রের কাছেই। মাঝে-মাঝে আমার স্ত্রীকে নিয়ে বেড়াতে যাই। আপনি যান। আমি বাংলোর কেয়ারটেকারকে বলে দেবো।’ হঠাৎ অপ্রত্যাশিতভাবে এমন একটি চমৎকার ছুটির সংবাদ আর বাংলোর ব্যবস্থা হওয়ায় লিপিকা যেন আবেগে আর কৃতজ্ঞতায় উদ্দীপ্ত হয়ে উঠল। তার ফর্সা মুখের ওপর লাল আভাটি বসের চোখ এড়ালো না। তিনি স্বাভাবিক গলায় বললেন, ‘যান—যান, মেয়েকে নিয়ে ঘুরে আসুন। আমার তো থাইল্যান্ড থেকে ফিরতে দেরিই হবে। আপনি ফিরে এসে অফিসের প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টগুলো গুছিয়ে রাখবেন। ফোনকল রিসিভ করে, নোট নিয়ে রাখবেন।’
অফিস থেকে ফিরে খবরটি বলার সঙ্গে সঙ্গেই উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে মুনতাহা। গলা জড়িয়ে ধরে লিপিকার। আচ্ছা! তবে কবে যাচ্ছি! এই তো দুদিন পর— হেসে হেসে উত্তরটা দিতে গিয়ে লিপিকার চোখটা গেল খোলা জানালার দিকে। তখন অপরাহ্ণের আলো এসে ঢুকছে ঘরের একোণে-ওকোণে। আলোতে ঝলমলিয়ে উঠেছিল মুনতাহার অগোছালো চুলের অবিন্যস্ত রূপ। একটা পাখি উড়ে গেল খোলা আকাশের দিকে। যেন কোনো এক অপার সম্ভাবনার দিকে। মুনতাহার সেদিকে মন নেই। বেড়াতে যাবার উচ্ছ্বাসে আর আনন্দে সে বিহ্বল। লিপিকা মুগ্ধ হয়ে দেখল এই শ্যামা মেয়েটির ভিতরের রং।
২.
সমুদ্রপাড়ের বাংলোটি খুব বিলাসবহুল কিছু নয়, তবে বেশ পরিপাটি। সবসময় ব্যবহৃত হওয়া আর একটু পুরোনো ধাঁচের —এমনটাই লাগছে। সম্ভবত প্রায়ই এটা ভাড়া দেয়া হয়ে থাকে। লিপিকার এমনটাই মনে হলো। এই সময়ে ভিড়-ভাট্টা কম। তাই বোধহয় ওরা খালি পেয়েছে। একতলা বাড়ি, সিমেন্টের গাঁথুনি, হালকা— অফহোয়াইট কালারের রং দেয়া। সমুদ্রের জলের লবণাক্ত হাওয়ায় দেয়ালের নিচের দিকের কিছুটা রং উঠে গেছে। ছাদের লাল টালিতে শ্যাওলার দাগ স্পষ্ট আর গাঢ় হয়ে আছে।
বাড়ির সামনে ছোট্ট খোলা জায়গা— সম্পূর্ণ জায়গাটা বালুময়। দুপাশে কয়েকটি নারিকেল আর ঝাউগাছ দাঁড়িয়ে আছে সমুদ্রের ঝোড়ো বাতাসকে প্রতিহত করার জন্য। একটি সিমেন্টর পথ চলে গেছে সরাসরি বারান্দা পর্যন্ত। সন্ধ্যায় বসে চা খাওয়া আর সূর্যাস্ত দেখার জন্য বারান্দায় চমৎকারভাবে বিছানো আছে প্লাস্টিকের চেয়ার আর একটা ছোট্ট টেবিল।
ভেতরে ঢুকতেই সাধারণ ড্রয়িং রুম, কাঠের সোফার ওপর সুতির কভার দেয়া। দেয়ালে একটা বড় ঘড়ি আর সমুদ্রের ছবি টানানো। কাচের জানালাগুলোর বাইরে লোহার গ্রিল —ঝড়ের সময় যা বন্ধ করে রাখার ব্যবস্থা আছে। মেঝেটা মোজাইক করা তবু পুরোনো ভাবটা রয়ে গেছে। কোথাও কোথাও একটু চিড় ধরেছে।
বেডরুম দুটি। একটিতে ডাবল বেড আর অন্যটিতে দুটি সিংগেল খাট। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র রাখার জন্য আলমারি রয়েছে, আর রয়েছে বড় আয়না। বাথরুম আর রান্নাঘরটিও বেশ ভালো আর পরিচ্ছন্ন।
মুনতাহার সবচেয়ে ভালো লাগল বারান্দা আর পায়ে হাঁটা পথটি। আরও একটি বিষয়ে সে আপ্লুত হয়ে পড়ল যে এখানে সমুদ্র খুব কাছেই। সারা দিন ঢেউয়ের শব্দ শুনতে শুনতে তার কেমন লাগবে এটাই সে ভাবছিল। একবার কানে হেডফোন দিয়ে আবার খুলে পরীক্ষা করে দেখতে চাইছিল আওয়াজটা আসলে কতটা ভারী। বারান্দায় বসে দেখা যাচ্ছিল দূরের জেলেদের নৌকা। সত্যিই অপূর্ব! মুনতাহা জীবনে এই প্রথমবার সমুদ্র দেখতে এলো। তবে লিপিকা এসেছিল আরও একবার। তার বিয়ের পরপরই।
৩.
চারদিনের ভ্রমণের প্রথম দিনটি ছিল আনন্দ— উচ্ছ্বাস আর ক্লান্তি মিলিয়ে উত্তাল। প্রথম রাত বড় বেডরুমে একসঙ্গেই কাটালো দুজন। কিন্তু দ্বিতীয় দিন থেকে ওরা যেন পরস্পরকে একটু অন্যভাবে নিজেদের চেনবার সুযোগ করে নিলো। একটু ভয় লাগলেও ওরা দুজনে দুই রুমেই ঘুমালো। মুনতাহা এই বছরই এসএসসি পাস করেছিল। তাই নিজেকে একটু করে বড় ভাবতে শিখে নিয়েছিল সে। এমনিতেও নিজের প্রাইভেসি সে যেমন করে বুঝে, লিপিকার ব্যক্তিগত জীবনকেও সে ততটাই গুরুত্ব দেয়। তাই লিপিকা যখন বলছিল, ওই রুমে তোমার একা থাকতে ভয় লাগবে না?
ভয় কি লাগবে! নিজেকেই প্রশ্ন করেছিল মুনতাহা। তারপর হাসিমুখে খুব দৃঢ়ভাবেই বলেছিল, না ভয় নেই। গান শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়বো।
তবে বিষয়টা যত সহজ বলে সে ভেবে নিয়েছিল তা কিন্তু ঘটলো না। প্রথম রাতেই মুনতাহার কেবলই মনে হতে লাগল ওই সমুদ্র ঢেউয়ের সঙ্গে মিশে আছে কারো পায়ের আওয়াজ। যেন ভেজা বালির ওপর দিয়ে পা টিপে টিপে হেঁটে আসে কেউ, তারপর বারান্দায় এসে থেমে যায়। কৌতূহলী মুনতাহা ঘুমের বিছানা ছেড়ে বারান্দায় যেতে চাইল, সত্যিই কেউ আছে কিনা সেখানে তা দেখার জন্য। কিন্তু এত রাতে বাইরে গেলে দরজার আওয়াজে লিপিকার ঘুম ভেঙে যাবে ভেবে আর সে সাহস করল না। তারপর ভোরের দিকে ঘুম ভাঙার পর মুনতাহা বারান্দায় গিয়ে দেখল সত্যিই কিছু পায়ের ছাপ আছে। তবে তা সমুদ্রের দিক থেকে নয়, বরং ঘর থেকে সমুদ্রের দিকে গেছে। একটু অবাক হলো সে! কেয়ারটেকার এসেছিল! কিন্তু সে তো এখানে নেই। ঘর বুঝিয়ে, রান্না করে দিয়ে সে সন্ধ্যার আগেই তার বাড়িতে চলে গেছে। তবে কি লিপিকা! ছোট মা কি সমুদ্রের দিকে গেল রাতের অন্ধকারে পায়ে হেঁটে!
চিন্তামগ্ন হয়ে মুনতাহা ভাবতে লাগল তাদের দুজনের অতীতের দিনগুলো। বলতে গেলে মুনতাহা শৈশবেই হারিয়েছে তার নিজের মাকে। কোন সুদূর থেকে ভেসে আসে মায়ের মুখ। কিছুটা আবছা— অস্পষ্ট। অল্পই মনে পড়ে। বরং ওই জায়গাটা ভরিয়ে রাখে তার দাদি। যে তাকে মায়ের মতোই নিবিড়ভাবে ভালোবেসেছে। তবে দাদি যে মাকে খুব ভালোবাসতো, তেমনটি দাদির কথাবার্তা থেকে জানতে পারতো। তার মা রোগা ও দুর্বল ছিল— এটা সে শুনেছিল দাদির কথাবার্তায়। মনে পড়ে মা মারা যাবার পর পাঁচ বছর বয়স থেকে সে দাদির সাথেই মফস্বলের স্কুলে যেত। বাবা ছিল কেমন যেন অচেনা। বাবাকে কখনও তেমনভাবে হাসিখুশি সে দেখেনি। বাবা কখনও তাকে স্কুলে নিয়ে গেছে, তেমনটা মনেও পড়ে না। তবে একটু বড় হতে হতে পুরো সময়টা হঠাৎ বদলে গেল। লিপিকা, যাকে সে ছোট মা বলে ডাকে, তাকে একদিন হঠাৎ করেই বাসায় নিয়ে এলো বাবা। দাদি বুঝল যে বাবার সঙ্গে মেয়েটির ভাব হয়েছে। মনে পড়ে, দাদি সেদিন ঘুমাতে গিয়ে তাকে একটা নতুন বিয়ের গল্প শুনিয়েছিল। যে গল্পে বিয়ের পাত্র তার বাবা! সে বারবার জিজ্ঞেস করেছিল লিপিকা খুব সুন্দর! তাই না? সে তার মা হবে! খুব ভালো! কিন্তু বাবা কেন বিয়ের সাজ করবে! বিষয়টা খুবই অদ্ভুত আর অবাক বিস্ময়ের ছিল সেই ছোট্ট মনে। মনে পড়ে তখন শীতকাল ছিল। স্কুলের বড় গাছটার পাতা ঝরছিল অবিরল। স্কুলের বাংলা মিস বলেছিল পাতাগুলো মরে যায় বলেই ঝরে যায়। মুনতাহার মনে হয়েছিল, তার নামটা মুনতাহা না হয়ে পাতা হলে সেও ঝরে পড়ে এভাবে মরে যেতে পারতো কোনো এক অজানা দুঃখে। মনে পড়ে, হুম, এত ছোট বেলার কথাও তার মনে পড়ে। মন খারাপ করে সে সেদিন ওই গাছটার নিচে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়েছিল। বাবার বিয়ে! সত্যিই মন খারাপ হয়েছিল তার।
যাই হোক, বিয়েটা দাদিকে আশ্বস্ত করেছিল। তবে দাদি মাঝে মাঝে বিরক্ত হয়ে বলত, তোর মা থাকতে কত অসুস্থ ছিল, আমার ছেলে একদিনও তারে যত্ন করে নাই। একদিনও বলে নাই, তুমি অসুস্থ, আমার কাছে একটু বস। শরবত খাও, বা চা খাও। বানিয়ে দেই। অথচ, সেই মেয়েটা অসুস্থ শরীর নিয়াও সংসারের সব কামকাজ করত। এখনকার বউ ওর থেকে বয়সে পনেরো বছরের ছোট। তবু তোর বাপের কি আহ্লাদ! সক্কাল সক্কাল নিজে চা কইরা খায়, বউরেও খাওয়ায়। বউ তো কুটাটাও নাড়ে না।
মুনতাহা শিশু হলেও বুঝত, দাদির কোথাও যেন একটা কষ্ট হচ্ছে। তাই সে সংসারের এসব জটিলতা না বুঝেই বলত ছোট মা কি ভালো না খারাপ!
দাদি মুখ ঝামটা মেরে বলত, খারাপ হইব কেন! ভালো! শিক্ষিত মাইয়া। চাকরি করব কয়দিন পর। পড়াডা শেষ হইলেই চাকরি করব।
দাদি মুখে এসব বললেও লিপিকার প্রতিও এক আলাদা টান ছিল। লিপিকার সুন্দর মুখের ওপর ভাসা-ভাসা উদাসী চোখ সবাইকে মায়ায় আটকে রাখতো। লিপিকার সঙ্গে বাবার বিয়েটা হওয়ার কোনো কথা ছিল না। বাবার অফিসেই চাকরি করত লিপিকার বাবা। সেই সূত্রে অনেক দিন থেকে চেনাজানা। তার ওপর লিপিকার এক দূরসম্পর্কের ভাই, যে স্বভাবে লম্পট আর স্থানীয় রাজনৈতিক দলের সঙ্গী ছিল, তার ভয়েই লিপিকার বাবা অনেকটা গোপনেই বিয়ের এনগেজমেন্ট করিয়ে দেয়। বিয়ের পর দাদিও চাইতো মেয়েটা লেখাপড়া করুক। আর সঙ্গে সঙ্গে এও চাইতো যে মুনতাহা আর লিপিকার ভিতরে একটা চমৎকার সম্পর্ক তৈরি হোক। দুজনকে একসঙ্গে সময় কাটাতে দেখলে সে মনে মনে খুব খুশি হতো। তাই বয়স হলেও দাদি নিজেই ঘরের কাজকর্মগুলো করতো, বা গৃহকর্মীর সাহায্য নিতো।
এসব সত্ত্বেও দুর্ভাগ্যের কালো মেঘ যেন কোথাও বসতি বেঁধেছিল। লিপিকার একদিন খুবই দেরি হচ্ছিল কলেজ থেকে ফিরতে। অনার্সের শেষ বছর। মফস্বল শহরের সময়গুলো এমনিতেই শান্ত। সেদিন হঠাৎ ঘটে গেল এমন একটা কিছ্।ু ক্লাস শেষ করে কলেজের কাছেই এক বান্ধবীর বাসা থেকে বেরোতে লিপিকার দেরি হয়ে গিয়েছিল। বের হয়ে রিকশা বা সিএনজি কোনোটাই পাচ্ছিল না। অন্ধকার হয়ে আসছিল গলির পথটায়। গলির চারপাশের দোকানগুলোর ভিতর বেশ ক’টিই তখন বন্ধ হয়ে গেছে। লিপিকা দেখলো গলির লাইটপোস্টের টিমটিমে আলোটা। ওটা আরেকটু উজ্জ্বল হতে পারতো। এমন ভাবতে ভাবতে ভিতরটা অস্থির হয়ে পড়ল তার। নিজের পায়ের শব্দটিও যেন তাকে তাড়া করছিল। দ্রুত হাঁটছিল সে। গলিটা কোনোরকমে পার হলেই বড় রাস্তায় উঠতে পারবে, তখন চারপাশে আলো পাবে। কিন্তু সময়টা যেন চলছিল না। সে দ্রুত হাঁটতে থাকে, দুপাশের দেয়ালগুলোতে শ্যাওলার অন্ধকার, পুরোনো ছেঁড়া পোস্টার, ড্রেনের প্রস্রাবের গন্ধ। দূরে কোনো দোকানের শাটার নামানোর শব্দ আসে। নীরবতার ভিতর নিজের পায়ের আওয়াজটা কানে লাগল জোরে। দ্রুত হাঁটার কারণে তার স্নিগ্ধ, নিটোল শরীরের ওপর থেকে ওড়নাটা কাঁধ থেকে পিছলে পড়ে যাচ্ছিল বারবার। সে তাড়াহুড়ো করে ঠিক করছিল, আবার হাঁটছিল। হঠাৎ সব অন্ধকার করে তার সামনে দাঁড়িয়ে পড়ল একটা মানুষের ঘন শ্বাসের শব্দ। লিপিকার কণ্ঠরোধ করা চিৎকার বাতাসে ভেসে আসতে চাইল। কিন্তু কে যেন তাকে আটকে দিল। সে জ্ঞান হারিয়ে পড়তে পড়তে দেখল কতগুলো মানুষের ছায়াশরীর। ছায়াগুলো মিশে যাচ্ছিল একে অপরের সঙ্গে। সে জ্ঞান হারাতে হারাতে শুনতে পেল তার কাপড় ছিঁড়ে যাবার শব্দ, তার দুর্বল শরীরের গোঙানি আর নিজের লড়াইয়ের শব্দ। যখন জ্ঞান ফিরল তখনও গলিটা নীরব— স্থির। শুধু মাটিতে ছড়িয়ে থাকা তার ব্যাগ, কেমেস্ট্রির নোটস, দেয়ালে আর বালিতে আঁচড়ের দাগ। টিমটিমে আলো—ছায়ার ভিতর লিপিকা সটান উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করল। সমস্ত শরীর ব্যথায় মরমর, দেয়ালটা শক্ত করে ধরে দাঁড়াল সে। রাত কয়টা বাজে! হাতঘড়িটা খুঁজল, পেল না। ভাবল দেরি করা ঠিক হবে না। সকাল হলেই মানুষ জড়ো হবে, ফিসফাস করবে, পুরো সমাজটা আঙুল তুলবে। সালোয়ার পরতে গিয়ে দেখল সালোয়ার দুইভাগ করে ছেঁড়া। কিন্তু ঠান্ডা মাথায় সময় নষ্ট করল না সে। রাতের অন্ধকারেই উঠে এলো গলি পার হয়ে বড় রাস্তায়। সেখান থেকে কয়েক গজ হেঁটে গেলেই বাড়ি। হুম, ভোরের দিকেই বাড়ি ফিরেছিল সে। আর সব কিছুই সে খুলে বলেছিল একে-এক, শাশুড়িকে — স্বামীকে।
লিপিকা যখন কথাগুলো খুলে বলছিল তখনও জানে না কতটা নির্বোধ ছিল সে। সে ভেবেছিল যে স্বামী তাকে সকালে ঘুম থেকে জেগে উঠাবার জন্য এত আদর করে চা খাওয়ায়, তার কাছে সবই বলা যায়। সে মন খুলে বলেছিল আততায়ীদের কথা। কিন্তু সে কথা শোনার পর চারপাশের সকল বাতাসও যে একযোগে ধর্ষকামী হয়ে উঠবে তা সে জানতো না। হুম, তারপরের সময়টা আগুনে ঝলসানো সময়। দুজনের দাম্পত্যে আর প্রেমের বিন্দু-বিসর্গও নেই। শুধুই প্রেমের কঙ্কাল। মুনতাহা টের পেত। সে ছোট মানুষ, কিন্তু টের পেত চারপাশের বিষাক্ত নিশ্বাসের ভিতর দিনযাপন করছে ওরা। বাবা আর লিপিকার কথাবার্তা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেল। বাবা কয়েকদিন রাতে বাড়িতেও ফেরেনি। লিপিকা তখন ক্রমেই নিবিড় হল মুনতাহার কাছে। দুজনের মধ্যের এই ভাবটি দাদিকে কোমল করে রাখত। দাদি একদিন বলল, ‘মাগো, পুরুষ মানুষ চিনতে এক জীবন ব্যয় করা লাগছে। তয় তোমার সুবিধা হইল তুমি অল্প দিনে ওই চিনাডা চিন্না ফেলছ। এডা কাজে লাগাও। তুমি কিছু ভাইবো না। আমি যতদিন আছি, তোমার ভাবনা নাই। তুমি পড়ালেখা শেষ কইরা চাকরি নাও। আমার পুতে বাড়িতে না আইলে না আইবো। এর জন্য আমার মন খারাপ হবে না। তুমি নিজেরে দাঁড় করাও’।
কিছুদিন পর বাবা ফিরে আসল ঠিকই। কিন্তু লিপিকার তখন সম্পূর্ণ বদল ঘটে গেছে। সে প্রবল আত্মবিশ্বাস নিয়ে পড়ছে রেজাল্ট ভালো করার জন্য যেন শীঘ্রই একটা চাকরি পেতে পারে। সে তখন ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছে তার প্রিয় ছোট মা, দাদীর খুব প্রিয় লিপিকা, তারা তিনজনে মিলে ঘরের হাসি-খুশি-ভাব। বাবা শুধুই অতিথি। ছোট মা আর কোনো দিন বাবার সঙ্গে কথা বলেনি। হঠাৎ করে দাদির স্ট্রোক হয়ে যাবার পর বাবার অবস্থা আরও খারাপ হতে লাগল। নিয়মিত মদ খাওয়া অভ্যাসে গিয়ে দাঁড়াল। না, শেষ পর্যন্ত বাড়িতে আর থাকতেই পারলো না ছোট মা। রাতে মদ খেয়ে এসে বাবার অকথ্য গালাগালি কাঁহাতক সহ্য হয়। অন্যদিকে ছোট মা তখন একটা বেসরকারি এনজিওতে চাকরি নিয়েছে, বেতন ভালো। তবু সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল ছোট মাকে।
এই বাড়ি ছেড়ে আমি চলে যাবো মুনতাহা। ঢাকায় আমার একটা চাকরি হয়েছে।
তো আমার কী হবে! আমি তো তোমার সঙ্গেই থাকবো।
তোমার বাবা কি রাজি হবে!
রাজি না হয়ে সে কি করবে! সে কি কখনও জানে আমি কোন ক্লাসে পড়ি! আমি কী খেতে ভালোবাসি! আমার অবসরগুলো কেমন করে কাটে! এমন একটি জায়গায় তুমি আমাকে ফেলে যেতে চাইছ কেন! সে তো কোনোদিন আমার বাবা হয়ে উঠতে পারেনি।
তবু, সে তোমার বাবা। এই বাড়ি তোমার, তোমার বাবার, তোমার দাদির। এসব ফেলে তোমার যাওয়াটা কি ঠিক হবে? তাছাড়া তুমি এখানে লেখাপড়া করছ। এখানে সবাই তোমার পরিচিত। নতুন জায়গায় তোমার নতুন স্কুলে ভর্তি, নতুন মানুষদের সঙ্গে পরিচিত হতে অনেক সময় লাগবে।
তুমি আমাকে নিয়ে ভেবো না ছোট মা। আমি আমার মা পেয়েছি, এটাই যথেষ্ট। আর অন্য কিছু আমি আস্তে আস্তে গুছিয়ে নেবো।
অনিবার্যভাবেই যেন ওরা চলে এলো ঢাকায়। প্রথম দিকে দুর্গতির সীমা নেই। দাদির কিছু জমানো টাকা ছিল মুনতাহার নামে। সেই সব দিয়ে কোনোরকমে জীবনটা সাজানো হলো নতুন পরিবেশে। মুনতাহার পৃথিবীতে এখন দুটো জিনিসই বড় প্রিয়। তার লেখাপড়া আর তার ছোট মা। চার বছর কেটে গেছে। সময় চলেছে নিজের মতো। অন্য কোনো উপলব্ধিতে যাবার তীব্র টান এলেও তারা দুজনেই উপেক্ষা করেছে সেসব টানকে তীব্রভাবে। কিন্তু জীবন যে এক জটিল প্রক্রিয়া তা লিপিকা বয়সের কারণে যত প্রবলভাবে জানে, মুনতাহা এখনো এতটা জানে না। তবু মুনতাহার জীবনের নির্মম অভিজ্ঞতাগুলো তাকে যে এই বয়সেই অনেকটা আবেগহীন করে ফেলেছে, লিপিকা তা টের পায়। মুনতাহার মনের গভীরে ঘুমিয়ে থাকা শীতলতাগুলো সে ভয় পায়।
৪.
পরদিন লিপিকা ঘুম থেকে উঠতেই মুনতাহা বলে—
রাতে তুমি ভালো ঘুমিয়েছিলে?
হুম, কেন?
না, রাতে পায়ের আওয়াজ পেয়েছি বারান্দায়, তুমি বাইরে গেছিলে নাকি?
লিপিকা মুখটা লুকিয়ে বলে, হ্যাঁ, বের হয়েছিলাম। বারান্দায় ছিলাম। তুমি ভয় পেয়েছ!
না, ভয় পাইনি। তো তুমি একা এত রাতে হাঁটতে গিয়েছিলে!
হুম, হাঁটতে গিয়েছিলাম। কিন্তু একা নই।
একা নও! কার সাথে! মুনতাহা অবাক!
তোমাকে বলা হয়নি। আমার ফেসবুকের পোস্ট ‘ফিলিং ফ্রেশ এট কক্সবাজার’ এই পোস্টের ছবিগুলো দেখে তোমার বাবা আমাদের আসার পরদিনই কক্সবাজার এসে হোটেলে উঠেছে। সে যে আমাকে ফেসবুকে ফলো করে আমি জানতাম না। যেহেতু আমাদের ডিভোর্সের কাগজপত্র হয়নি সে এখনও আমাকে তার স্ত্রী হিসেবেই দাবি করে। যদিও সম্পর্কটি আমি মন থেকে আর মানি না। তবে তোমার ওপর তার দাবি আছে। সে তোমার সঙ্গে কথা বলতে চায়। কাল ভোরে ঢাকায় রওনা হবার আগে আমরা তার সঙ্গে সমুদ্রপাড়ে দেখা করবো। আমি তাকে কথা দিয়েছি।’
সকালে লাবনী বিচের কাছেই দেখা হলো ওদের। দেখা হওয়াটা অস্বস্তিকর লাগছিল মুনতাহার, তবু তা ছিল অনিবার্য। বাবার সেই পরিচিত হাঁটার ছন্দ, চওড়া বুক। মুনতাহার যেন বিশ্বাস হচ্ছিল না। এই প্রথম তার মনে হলো এই মানুষটি তেমনভাবে উপস্থিত না ধাকলেও, মানুষটি কোনো না কোনোভাবে তার মস্তিষ্কের ভিতর উপস্থিত ছিল, যার প্রভাব সে আসলে এতদিনেও কাটাতে পারেনি। এক অদ্ভুত দ্বন্দ্ব তার ভিতরে খুব রাগ তৈরি করে দিয়ে তা একফোঁটা নোনা জল হয়ে যেন চোখ দিয়ে বের হয়ে আসতে চাইলো। মুখোমুখি দাঁড়িয়ে রইল ওরা। কোনো কথা নেই— নিশ্চুপ।
হঠাৎ সমুদ্রের ঢেউ এত জোরে বিশাল আকার নিয়ে ধেয়ে এলো, ভয় পেয়ে লাফিয়ে দূরে সরে এলো তিনজনেই। মুনতাহার বাবা এসে মেয়ের হাত ধরে বললো, কাছে আসো। সমুদ্র ভাসিয়ে নেবে।
একটা ছোট্ট নিশ্বাস নিয়ে বাবার দিকে তাকিয়ে সে বললো, ‘ভয় নেই বাবা। সাঁতার কাটতে শিখে গেছি। কোনো ভয় নেই। তুমি ভালো থেকো।’








