ঈদ সংখ্যা ২০২৬

মারিয়াম ও কৃপণের গল্প ।। নিয়াজ জামান

অনুবাদ : নূর কামরুন নাহার
০২ এপ্রিল ২০২৬, ১৭:১৮আপডেট : ০৬ এপ্রিল ২০২৬, ১৫:২৮

নিয়াজ জামানের জন্ম ১৯৪১ সালে। নকশি কাঁথা এবং জামদানি নিয়ে গবেষণা করেছেন এবং রচনা করেছেন ‘দ্য আর্ট অব কাঁথা এমব্রয়ডারি’ নামে একটি গ্রন্থ। তার ‘দ্য ড্যান্স অ্যান্ড আদার স্টোরিজ’ গল্পটি এশিয়া উইক শর্ট স্টোরি অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেছে। তার গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে: দিদিমার নেকলেস অ্যান্ড আদার স্টোরিজ, দ্য ক্রুকড নিম টি, দ্য কনফেশনাল আর্ট অব টেনেসি উইলিয়ামস। তার ‘এ ডিভাইডেড লেগেসি: দ্য পার্টিশন ইন সিলেক্টেড নভেলস অব ইন্ডিয়া পাকিস্তান অ্যান্ড বাংলাদেশ’ গ্রন্থটি জাতীয় আর্কাইভস পুরস্কার লাভ করে। সাহিত্যে অবদানের ২০১৩ সালে অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। অনুবাদক হিসেবে ২০১৭ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন। মারিয়াম ও কৃপণের গল্পটি Mariam and the miser-এর অনুবাদ। 



আমার মা আমাদের মানে, আমার আর আমার ভাইকে অনেক গল্প শোনাতেন। কিছু গল্প তিনি শুনেছিলেন নানির কাছ থেকে, নানি আবার শুনেছিলেন তাঁর মায়ের কাছ থেকে। কিছু গল্প ছিল ইংরেজি বইয়ের, যেগুলো মা অনুবাদ করে শোনাতেন, আর কিছু গল্প নিশ্চয়ই তিনি নিজেই তৈরি করতেন, কারণ বড় হয়ে আমি যখন বই পড়া শুরু করি, তখন দেখি এ গল্পগুলোর বেশিরভাগই কোনো বইয়ে নেই। ইচ্ছে হয় মাকে জিজ্ঞাসা করি, এসব গল্প তিনি কোথায় পেতেন। কিন্তু এখন সে সুযোগ আর নেই, কারণ বারো বছর আগেই তিনি চলে গেছেন। 

অনেক গল্প ছিল যা আমি আর আমার ভাই রিয়াজ একসঙ্গে শুনেছি, ও আমার থেকে দুই বছর ছোট এবং আমার দুষ্টুমির সবচেয়ে বড় সাথি। তবে কিছু গল্প ছিল যেগুলো তার জানা নেই। পরে বুঝতে পারি কিছু কিছু গল্প মা শুধু আমাকে বলতেন, রিয়াজকে নয়। এমন এক বিশেষ নারীর গল্প আজ বলবো, যে বিয়ে করেছিল এক কৃপণকে। মায়ের গল্প আর চরিত্রগুলোর সব সময় নাম থাকত না, তাই এ গল্পের নাম আমিই দিয়েছি, আর নায়িকার নাম রেখেছি মারিয়াম।

আমার মা নারীবাদী ছিলেন না। তিনি কলেজে পড়েছেন, এক বছর চাকরিও করেছেন, কিন্তু বিয়ের পর চাকরি ছেড়ে দেন। পরে, যখন আমরা সবাই বড় হয়ে নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত, তখন তিনি সমাজসেবামূলক কাজ শুরু করেন। কিন্তু তিনি কখনো নারীর অধিকারের পক্ষে কথা বলেননি। বাসাতেও নারীর অধিকার বিষয়ক বিশেষ কিছুর অনুশীলন ছিল না। রিয়াজের পর আমার আরও তিন ভাই ছিল। বাবা আর আমার ভাইদের মধ্যে ভাগ করার পর আমি আর মা সাধারণত হাড়ের অংশ পেতাম। হাড় খেতে আমি এতটাই অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি যে আজও মুরগির ভালো অংশ, রান বা বুকের মাংস খেতে পারি না, বরং গলা, ডানা কিংবা পাঁজরের হাড়ই নেই। হয়তো এত হাড় খাওয়ায় উপকারও হয়েছে, আমার বেড়ে ওঠায় ক্যালসিয়ামের যে চাহিদা তা  ঠিকেমতো পূরণ হয়েছে।

তবে যদিও মুরগির ভালো অংশগুলো “পুরুষদের” জন্য সংরক্ষিত ছিল, কিন্তু খাসির মাংসের একটা বিশেষ অংশ যা এক ধরনের কানের মতো শক্ত তরুণাস্থি, এটার বরাদ্দ ছিল শুধুই আমার জন্য। এ টুকরোটা ভাইদের কপালে জুটত না। মা বলতেন, ছেলেদের শরীরের রাস্তা নাকি অনেক সরু। তাদের শরীর থেকে নাকি এমন হাড় বা তরুণাস্থি সহজে বের হতে পারে না। যদিও এটা ঠিক কতটা বৈজ্ঞানিক, তাতে সন্দেহ রয়েছে। কারণ একবার মাংস আর হাড় অন্ত্রে চলে গেলে আর খাবার হজহম হয়ে গেলে ছেলে কিংবা মেয়ে সবারই তো এক রকম গর্ত দিয়েই তো বের করে। আর সে গর্তের সাইজও তো প্রায় সমান।

তবু মেয়ে হওয়ার এটুকু সুবিধা নিয়ে আমি সবসময় পেতাম ওই কুরমুরিয়া হাড়। সত্য বলতে তাতে খুব একটা মাংস থাকত না, কিন্তু এমন এক অসাম্যের দুনিয়ায় এটা শুধুই আমার, ভাইদের নয়, এই ভাবনাটাই আমাকে এক ধরনের বিজয়ের অনুভূতি দিত।

মেয়ে হওয়ার আরও কিছু অসুবিধা ছিল। ডিম খেতে মানা ছিল না ঠিকই, কিন্তু সেটা ছিল সীমিত। এক ফালি অমলেট, দু-এক টুকরো ফ্রেঞ্চ টোস্ট, আর মাঝে মাঝে ডিমের ঝোল, যেখানে সবার জন্যই একটি আস্ত ডিম- এই ছিল সব।

খাদ্যসংক্রান্ত এসব বিধিনিষেধের মাঝেও অবাক লাগে, মা আমাকে এক কৃপণকে বিয়ে করা এক নারীর এমন এক গল্প বলেছিলেন, যার পুরোটাই ছিল খাবার নিয়ে।

মা পেঁয়াজ কুচো করে করছিলেন যেন সেগুলো কেটে ঘিয়ে ভাজছিলেন, যাতে সেগুলো ঘিয়ে ভেজে সুন্দর বাদামি আর মুচমুচে করা যায়। সরিষার তেল দিয়ে রান্না শুরু করার আগে তখন ঘি দিয়েই রান্না হতো। মা পেঁয়াজ কুচি করতে করতেই বললেন-

এক ছিল কৃপণ। যে বিয়ে করতে চেয়েছিল। আর পাঁচজন যেমন সুন্দর, লম্বা, পরিচ্ছন্ন ও ভদ্র স্বভাবের মেয়ে চায়, সেও তেমনি একটা মেয়ে খুঁজছিল।"

আমার চোখ দিয়ে টপ টপ করে পানি পড়ছে আর আমি ভাবছি মার চোখে পানি নেই কেন?

মা গল্প বলে চলেছেন—

কিন্তু, সে এমন কৃপণ ছিল যে এমন এক স্ত্রী চাইত যার খাওয়া-দাওয়ার পেছনে একটুও খরচ হবে না। “আমি এমন মেয়ে চাই না, যে এত খাবে, যে আমাকে পথে বসাবে, আর যার জন্য প্রতিবছর দশ গজ কাপড় কিনতে হবে। আমি এমন স্ত্রী চাই, যার একবেলা খাবার হবে মাত্র একটি বাজরা দানা, সেই দানাটা আবার সাতবার পেষা ও সাতবার ছাঁকা হতে হবে।”

আমি কখনো বাজরা দেখিনি। ওটা যে কী, তাও জানি না। তখন মা আমাকে বুঝিয়ে বললেন, বাজরা কেমন দেখতে, কত ছোট, আর সেটা গরিব মানুষেরাই খায়।

সবাই হেসে বলে, ‘একজন নারী তো দূরের কথা, এমন খাবারে একটা পাখিও বাঁচতে পারবে না।’"

কিন্তু কৃপণ লোকটা ছিল ধনী, আর পাত্রী খোঁজার জন্য তার আশপাশে পেশাদার আর অপেশাদার দুই ধরনেরই ঘটক-ঘটকীর অভাব ছিল না। কিছু বৃদ্ধা, যারা স্বর্গে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সাতটি সৎকাজ এখনো পূর্ণ করতে পারেননি, তারা স্বর্গের আশায় বিনা পারিশ্রমিকে কৃপণের জন্য পাত্রী খুঁজতে মাঠে নামলেন। আর পেশাদার ঘটক-ঘটকী, যাদের পেশাই হলো বিয়ে করানো, তাদের তালিকায় ছিল অসংখ্য অবিবাহিত মেয়ে, যাদের বাবা-মায়েরা উপযুক্ত বা অনুপযুক্ত যে কোনো পাত্রের সঙ্গেই বিয়ে দেবার জন্য পুরো প্রস্তুত ছিলেন।

 বিয়েটাই ছিল মুখ্য, মানানসই হওয়াটা (মা এই শব্দটা ব্যবহার করেননি ঠিকই, তবে তার মানেটা বুঝিয়েছিলেন) ছিল গৌণ।

কৃপণও যেমন ফর্সা, লম্বা, সুন্দরী, পরিচ্ছন্ন ও মার্জিত স্বভাবের খুঁজছিল ঘটক-ঘটকীদের কাছেও, তেমন অনেক পাত্রী ছিল। কিন্তু কৃপণের ওই একটা শর্ত মানানো ছিল প্রায় অসম্ভব। কৃপণ অবশ্য বলেছিল, ফর্সা না পেলেও চলবে, লম্বা না পেলেও সমস্যা নেই, অপরূপা না হলেও চলবে, শুধু যেন একেবারে কুৎসিত না হয়। কিন্তু তার মূল সমস্যা ছিল অন্য। কৃপণ তার স্ত্রীর জন্য যে খাদ্য-বরাদ্দ করেছে, কোনো মেয়ে বা মেয়ের মা-বাবাই সেটা মেনে নিতে রাজি হচ্ছিল না, আসলে এটা ছিল একেবারে অবাস্তব শর্ত। বিয়ের যোগ্য কন্যার মা-বাবা তো বটেই, এমনকি বিয়ের যোগ্যতা পার করে ফেলা ‘অযোগ্য’ কন্যার অভিভাবকেরাও মাথা নেড়ে বলতেন, ‘না, এটা হবে না।’

নিজের গ্রামে পাত্রী না পেয়ে, এক জেদি ঘটক রওনা দিলেন পাশের গ্রামে। সেখানে বাস করতেন এক দরিদ্র পিতা, যার সাত কন্যা, সবাই বিয়ের উপযুক্ত। গরিব হলে সাতটা মেয়ের বিয়ে দেওয়া যে কতটা কঠিন, সেটা বলাই বাহুল্য। তার ওপর যদি সব মেয়েই খুব একটা সুন্দরী না হয়, তাহলে তো কথাই নেই।

মারিয়াম ছিল বড় মেয়ে। তার বিয়ে না হলে ছোট বোনদের বিয়ে আটকে থাকবে। এখন, মারিয়াম রূপসি ছিল না। তার গায়ের রং ছিল পেঁয়াজের খোসার মতো হলদেটে, উচ্চতাও মাঝারি, আর হ্যাঁ, সে একেবারে কুৎসিত ছিল না ঠিকই, তবে সুন্দরীও না, একটা নির্দিষ্ট বয়সে সব মেয়েকেই যেমন একটু-আধটু সুন্দর লাগে, সেরকম।

‘আমি কৃপণকে বিয়ে করতে রাজি,’

‘তুই কী বলছিস, মা? জানিস বাজরা দানাটা কত ছোট? তুই তো না খেয়ে মারা যাবি।’

মারিয়াম ভদ্রভাবে উত্তর দেয়, “হ্যাঁ মা, আমি জানি বাজরা কত ছোট। আর আমি না খেয়ে মরবো না।’

মারিয়ামের মা কেঁদে ফেলেন, কিন্তু মারিয়াম অনড়। সে জানিয়ে দেয়, মা-বাবা রাজি হোন আর না হোন, সে কৃপণকেই বিয়ে করবে।

বিয়ের দিন এসে যায়। কৃপণ যেমন বিয়ের উপহারও তেমন। সে নিয়ে আসে একটা মাত্র লাল রেশমি শাড়ি আর দু-একটা ছোটোখাটো গহনা। নতুন শাড়ি আর গহনা পরে মারিয়ামের বিয়ে হয়, এবং সে পাড়ি দেয় স্বামীর বাড়ি।

কৃপণ মারিয়ামকে তেল, মসলা, চাল আর গমের আটা কোথায় রাখা আছে দেখিয়ে দেয়। আর এ-ও জানিয়ে দেয় ‘প্রতিদিন সকালে মারিয়ামকে ছয়টা রুটি বানাতে হবে; তিনটা সে খাবে চা-সহ নাশতা হিসেবে, বাকি তিনটা একটা পিঁয়াজের সঙ্গে কাপড়ে বেঁধে দুপুরের খাবার হিসেবে নিয়ে যাবে। বিকেলে যখন সে বাড়ি ফিরবে, তখন তাকে দিতে হবে চারটা রুটি, সঙ্গে ডাল বা সবজি। যেদিন কাজে যাবে না, সেদিন দুপুরে ভাত খাবে।

সে মারিয়ামকে পাটাও দেখিয়ে বলে, “যদি দোকানের আটা ফুরিয়ে যায় তাহলে এই পাটা দিয়ে গম থেকে আটা তৈরি করতে হবে। প্রতিদিন সকালে কাজে যাওয়ার আগে সে মারিয়ামকে খাবারের জন্য তিনটি বাজরার দানা দেবে, যেদিন কৃপণ দুপুরে ভাত খাবে, সেদিন মারিয়ামও ভাত খেতে পারবে। অপচয় একেবারেই চলবে না।  সে কোনো অতিথি পছন্দ করে না, চায়ও না কেউ আসুক। কেউ যদি এসেও পড়ে, তাহলে তাকে শুধু এক গ্লাস পানি দিয়েই বিদায় করতে হবে।”

পরদিন ভোরে মারিয়াম আগুন জ্বালিয়ে তার স্বামীর জন্য ছয়টা রুটি বানায়। তিনটা রুটি আর একটা টাটকা পেঁয়াজ কাপড়ে বেঁধে রাখে দুপুরের খাবার হিসেবে। এরপর স্বামীর নাশতার জন্য বাকি তিনটা রুটি দেয়, সঙ্গে দেয় গুড় দিয়ে মিষ্টি করে বানানো এক কাপ গরম চা।

‘তুমি খেয়েছ?’ কৃপণ জানতে চাইল।

‘না, ঘর ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার করে, তোমার কাপড় ধুয়ে তারপর খাবো।’

তারপর স্বামীর হাতে দুপুরের খাবারের পুঁটলিটা দিয়ে তাকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে বিদায় জানায়।

স্বামী বেরিয়ে যেতেই মারিয়াম বসে পড়ে রান্নাঘরে। নিজের জন্য আগেভাগেই কোমরের কাপড়ের কুঁচিতে লুকিয়ে রাখা দুটি রুটি সে বার করে। নাশতা শেষ করে সে ঘর ঝাঁট দিলো, গোসল করল, নতুন কাপড় পরলো। কারণ সে জানে লোকজন নিশ্চয়ই দেখতে আসবে নতুন বউ কেমন চলছে।

যেমন ভেবেছে, তেমনই হলো। একটু পরেই প্রতিবেশীরা দলে দলে আসতে শুরু করল। কৌতূহলী মুখে তারা জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি কি কিছু খেয়েছো?’

মারিয়াম পাটার দিকে ইশারা করলা, সেখানে শুধু সামান্য কিছু গুঁড়ো দানা পড়ে আছে।

প্রতিবেশীরা অবাক।

মারিয়াম বিনীতভাবে ক্ষমা চাইল কিছু খাওয়াতে না পারার জন্য। বলল, 'কৃপণের ঘরে খাবারই তো খুব কম।'

তবু মারিয়ামকে দেখে মনে হচ্ছিল সে বেশ খুশি। প্রতিবেশীরা চলে গেল ধাঁধায় পড়ে। এত অল্প খাবারে একটা মানুষ কীভাবে বেঁচে থাকে? এতোটুকুতে তো একটা চড়ুই পাখিও টিকতে পারে না।

দিন কেটে যেতে থাকে। প্রতিদিন সকালে কৃপণ পরিমাপ করে আটা, আর গুনে গুনে তিনটি বাজরার দানা দেয়। মারিয়াম রুটি বানায়, তিনটি পেঁয়াজসহ কাপড়ে বেঁধে দেয় স্বামীর দুপুরের খাবার হিসেবে, আর তিনটি দেয় মিষ্টি গুড় মিশ্রিত গরম চা-সহ  নাশতার জন্য।

আর চারটি রুটি কোমরের কাপড়ে গুঁজে রাখে লুকিয়ে সকাল আর দুপুরে নিজে খাওয়ার জন্য। একমাত্র সমস্যা ছিল রাতের খাবার, যেটা তাকে খেয়ে ফেলতে হয় স্বামী ঘরে ফেরার আগেই।

 

কৃপণ খুব খুশি। তার স্ত্রী শুধু নরম রুটি আর সুস্বাদু ডাল বা তরকারিই রান্না করে না, এখন তাকে দেখতে বেশ সুন্দরও লাগে।

মারিয়াম ছোট্ট কুটিরটিকেও সুন্দর আর প্রাণবন্ত করে তোলে। বিছানার রঙিন সূচিশিল্পে সাজানো চাদর আর বালিশের কভার। কৃপণ নিজেকে ভাগ্যবান মনে করে। এমন এক স্ত্রী সে পেয়েছে, যে শুধু কম খায় না, রুচিও চমৎকার। ঘরের সামনে, যেখানে একসময় আগাছা আর লতাগুল্ম ছিল, সেখানে এখন ফুলে ভরা বর্ণিল লতাপাতা আর ফুটে আছে গোলাপ। আর হ্যাঁ, কৃপণ আবারও ভাবে, সে সত্যিই ভাগ্যবান।

একদিন দুপুরে কাজ ছিল অল্প, তাই কৃপণ ঠিক করে একটু আগেই বাড়ি ফিরে যাবে। সে ভাবে, এমন অপ্রত্যাশিত সময়ে বাড়ি ফিরে সে মারিয়ামকে চমকে দেবে। কুঁড়েঘরের দিকে এগোতে এগোতে ভাবে, এ সময়টা মারিয়াম কীভাবে কাটায়? নিজে তো দুপুরে তিনটা রুটি আর একটা পেঁয়াজ খেয়েছে। মারিয়াম প্রতিদিন সেটি দারুণভাবে গুছিয়ে দেয়। হয়তো নামাজ শেষ করে এখন বসে আছে তার সূচিকর্ম নিয়ে।

চুপচাপ দরজার কাছে গিয়ে সে কড়া নাড়ে।

কে? ভিতর থেকে মারিয়ামের কণ্ঠ ভেসে আসে।

চমক দেওয়ার উদ্দেশ্যে কৃপণ গলা পাল্টে বুড়ি মহিলার মতো বলল, ‘আমি একজন বুড়ি ভিখারিনি, একটু ভিক্ষে দাও মা।’

‘চলে যাও,’ মারিয়াম ভেতর থেকে বলে, ‘এ ঘরে ভিক্ষা দেওয়া হয় না।’

কিন্তু কৃপণের কানে মারিয়ামের গলা যেন একটু ভারী আর মোটা লাগে, যেন মুখে কিছু আছে। জানা থাকলে হয়তো সে বলতো, ওর মুখে নিশ্চয়ই খাবার আছে। কিন্তু সে তো জানে একটা বাজরার দানা দিয়ে কারো মুখ ভরবে না।

আবার সে সেই বুড়ির গলায় বলে, ‘কিছু পয়সা দে মা, না হলে পুরোনো একটা জামা দিলেই চলবে।’

এবার মারিয়াম জানালার গরাদের ফাঁক দিয়ে উঁকি দেয়। তার মাথায় কোনো ঘোমটা নেই, আর হ্যাঁ, তার মুখে কিছু একটা আছে।

স্বামীকে দেখে সে তাড়াতাড়ি মাথা ঢাকে, জানালা থেকে সরে আসে আর দরজা খুলে দেয়। দেখে বোঝা যায় ততক্ষণে সে তাড়াহুড়ো করে কিছু গিলে ফেলেছে, আর ডান হাতে খাবারের দাগ। কৃপণ সোজা রান্নাঘরে হেঁটে যায়। সামনে একটা প্লেটে পড়ে আছে আধখাওয়া একটা পেঁয়াজ আর দেড়টা রুটি। সে চেয়ে দেখে একবার প্লেট আর মারিয়াম, আবার মারিয়াম আর প্লেট।

কিন্তু মারিয়াম লজ্জিত বা অপরাধবোধে কুকরে যাওয়ার বদলে হেসে ওঠে।

‘তাহলে অবশেষে তুমি আমাকে ধরে ফেললে! সত্যি করে বলো তো, তুমি কি ভাবতে একটি মাত্র বাজরার দানা, সাতবার পেষা আর সাতবার ছাঁকা দিয়ে একজন নারী বেঁচে থাকতে পারে? আমি হয়তো তোমার থেকে কম খাই, কিন্তু আমিও মানুষ, আমাকেও খেতে হয়।’

আমার মায়ের গল্পটা এখানেই শেষ। কিন্তু ছোটোবেলায় আমরা গল্পের আনন্দময় পরিণতি চাই। রূপকথার মতো “সুখে-দুঃখে তারা চিরকাল একসঙ্গে থাকল” এমন কিছু। তাই আমি জানতে চাই “তারা কি শেষমেষ সুখে-শান্তিতে সংসার করেছিল?

কিন্তু মা উল্টো আমাকে প্রশ্ন করে, ‘তুমি কী মনে করো?’

আমি একটু ভেবে বলি, “কৃপণ নিশ্চয়ই চুপচাপ বসেছিল, বুঝেছিল যে সে কত বড় বোকা। আবার হয়তো রাগও করেছিল, কারণ মারিয়াম তাকে ঠকিয়েছে, মিথ্যা বলেছে। কিন্তু সে এটাও জানত, যদি মারিয়াম মিথ্যা না বলত, তবে হয়তো তার কখনো বিয়ে করাই হতো না। আর মারিয়াম তার ঘরটাকে এত সুন্দর করে তুলেছে যে এখন তার জীবনে মারিয়াম ছাড়া কিছু ভাবাই যায় না।”

‘আর মারিয়াম?’ মা জানতে চান।

মারিয়ামও হয়তো ধীরে ধীরে কৃপণকে ভালোবেসে ফেলেছে। কৃপণ একটা বোকা, সে ভেবেছে যে একজন নারী বাতাস খেয়ে বেঁচে থাকে। তবে সে মিথ্যা বলেছে, লুকিয়ে খেয়েছে, তাই হয়তো কৃপণ চাইলে তাকে বাড়ি থেকে বের করেও দিতে পারে। তারপর আমি ভাবি, কৃপণ নিশ্চয়ই মারিয়ামের কাছে ক্ষমা চেয়েছে যে শর্তগুলো সে চাপিয়ে দিয়েছিল, তার জন্য। আর মারিয়ামও নিশ্চয়ই মাফ চেয়েছে তার প্রতারণার জন্য।

কিন্তু মায়ের গল্পটা কোনো প্রেমের গল্প ছিল না। তাই সেটা শেষ হয়েছিল সেই বিশেষ বিকেলেই, যেদিন কৃপণ সময়ের আগেই ফিরে এসে আবিষ্কার করে সে আসলে এক মহা বোকা।

মা যেন ওই গল্পের মাধ্যমে আমাকে কিছু বোঝাতে চেয়েছেন। তখনও আমি ‘নারীবাদ’, ‘নারীকেন্দ্রিক সাহিত্য বিশ্লেষণ’, কিংবা ‘ফেমিনিস্ট থিয়োরি’ এসব শব্দের মানে জানতাম না। তিনি যেন বলেছিলেন, নারীদের নিজেদের টিকে থাকা জানতে হবে। নিজের যত্ন নিতে জানতে হবে, সুস্থ আর শক্তিশালী থাকার জন্য পর্যাপ্ত খেতে হবে।

কিন্তু আজ হলে আমি মাকে অন্য প্রশ্ন করতাম। আমি আর জিজ্ঞেস করতাম না, গল্পের শেষ কী হলো। আমি জিজ্ঞেস করতাম, মারিয়াম কেন একজন কৃপণকে বিয়ে করতে গেল? একজন কৃপণ আর বোকা মানুষকে বিয়ে না করে একা থাকাটাই কি ভালো না?

অবশ্য আমি জানি, মাত্র কয়েক বছর আগেও বিয়ে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এখনো অনেক সংস্কৃতিতে তাই। এমনকি উন্নত দেশগুলোতেও বিয়ের হার আর জন্মহার কমে যাওয়া নিয়ে মানুষ চিন্তিত। তবু আজও আমি ভাবি, মারিয়ামের গল্প কি বাস্তবে আদৌ সম্ভব? বাস্তবে তো মারিয়াম শ্বশুরবাড়িতে যেত, এবং যদি স্বামী এমন কোনো শর্ত দিতো, তাহলে মরে যাওয়ার মতো হলেও শাশুড়ি বউকে নজরবন্দি করে রাখত যেন একমুঠো খাবারও চুরি করতে না পারে।

তবে আবার এও মনে হয়, কঠোর শাশুড়ির ঘরেও বউদের অনেক সময় কৌশল খাটাতে হয়। যতক্ষণ না কোনো ভুল পুরুষকে বিয়ের জন্য দিনের পর দিন নির্যাতন শিকার হয়ে দুর্ভাগ্যজনকভাবে তাদের “দুর্ঘটনাজনিত” মৃত্যুবরণ করতে না হয়।

আমি ভাবি, অন্য মায়েরা কি তাঁদের মেয়েদের প্রতারণার এই কৌশল শেখান? অন্য মেয়েরা যখন তাঁদের মায়েদের কথা বলেন, তখন শোনা যায় তাঁদের মা তাদের শিখিয়েছেন কীভাবে নিজেকে উৎসর্গ করতে হয়, কীভাবে হতে হয় আদর্শ স্ত্রী, আদর্শ বউ, আদর্শ মা।

তাহলে আমার মা? একজন সৎ, আত্মত্যাগী, পরিবারকে নিয়ে বাঁচা একজন নারী। তিনি কেন আমাকে, বিয়ের কথা মাথায় আসার আগেই, শিখিয়ে দিয়েছিলেন ‘নিজের যত্ন নিতে হবে’? কেন তিনি শিখিয়েছিলেন পেট ভরে খেতে হবে, যাতে শরীর-মন দুটোই ঠিক থাকে?

আর আমি কতটা রক্ষা করতে পেরেছি সেই শিক্ষা, যে শিক্ষা পেয়েছিলাম রান্নাঘরে, পেঁয়াজ কাটতে কাটতে, চোখের জলে?

নিয়াজ জামান: জন্ম ১৯৪১। লেখক অনুবাদক ও গবেষক। দীর্ঘকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে অধ্যাপনা করেছেন। পাঠদান করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ে। বাংলাদেশের প্রসিদ্ধ লোক-ঐতিহ্য নকশিকাঁথা এবং জামদানি নিয়ে গবেষণা করেছেন এবং রচনা করেছেন দ্য আর্ট অফ কাঁথা এমব্রয়ডারি। তার দ্য ড্যান্স অ্যান্ড আদার স্টোরিজ, গল্পটি এশিয়া উইক শর্ট স্টোরি অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেছিল। তাঁর গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে দিদিমার নেকলেস অ্যান্ড আদার স্টোরিজ, দ্য ক্রুকড নিম টি, দ্য কনফেশনাল আর্ট অব টেনেসি উইলিয়ামস। তার এ ডিভাইডেড লেগেসি: দ্য পার্টিশন ইন সিলেক্টেড নভেলস অব ইন্ডিয়া পাকিস্তান অ্যান্ড বাংলাদেশ গ্রন্থটি জাতীয় আর্কাইভস পুরস্কার লাভ করে। সাহিত্যে অবদানের ২০১৩ সালে অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। অনুবাদক হিসেবে ২০১৭ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন। ব্যতিক্রমধর্মী সংগঠন ‘গাঁথা’র প্রতিষ্ঠাতা। সংগঠনটি বাংলা ও ইংরেজি মাধ্যমের নারী লেখকদের প্ল্যাটফর্‌ম হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। বাংলাদেশের নারী লেখকদের লেখা ও গ্রন্থ ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন এবং এ বিষয়ক ব্যাপক কাজ করে যাচ্ছেন।

/জেড-এস/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
টিভিতে আজকের খেলা ( ৪ জুন, ২০২৬)
টিভিতে আজকের খেলা ( ৪ জুন, ২০২৬)
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক