ঈদ সংখ্যা ২০২৬

তুলনামূলক সাহিত্যের ‘বাংলা ঘরানা’: বৈশ্বিকতা ও প্রান্তিকতার স্থানান্তর

হামীম কামরুল হক
০২ এপ্রিল ২০২৬, ১৭:২৫আপডেট : ০২ এপ্রিল ২০২৬, ১৭:২৫

নিজেকে অনর্থক ছোট করে দেখা এবং অন্যকে সর্বদা বড় করে দেখা— দুটোই সুস্থতার বিপরীত। সৃজনে ও মননে এটি যদি নিত্য হয়ে ওঠে, তাহলে কতটা বিপজ্জনক হতে পারে— তাতে বারবার অঙ্গুলিনির্দেশ করতে হয়। সবচেয়ে বড় কথা, এই বিষয়টি যদি ইতিহাস থেকে প্রাপ্ত হয়, তাহলে সেটি মোচন করা বিদ্যাচর্চার একদম প্রাথমিক কাজ হয়ে ওঠে। তুলনামূলক সাহিত্যের ক্ষেত্রে পশ্চিমাসাহিত্যের ক্যানন (Canon)-গুলোকে বিনাপ্রশ্নে গ্রহণ বা কোনো একক সাহিত্যের শ্রেষ্ঠত্ব বা হীনতার জায়গা থেকে দেখবার সুযোগ নেই। তুলনামূলক সাহিত্যের বাংলা ঘরানা নির্মাণ অনিবার্য হয়ে দেখা দেয়। (শামীম; ২০১৯:১৮৫-১৯৫)

আজকে বিশ্বের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে যে ইউরোপের শিল্পবিপ্লব, এর গোড়াতে বাঙালি ও বাংলা অঞ্চলের বিরাট ভূমিকা ছিল— এই ঐতিহাসিক সত্যটি মনে রেখে হীনম্মন্যতা ও উচ্চম্মন্যতা—এই দুই মানসিকতার মোচন সম্ভব হতে পারে। সব রকমের বৈজ্ঞানিক ও নান্দনিক আধিপত্য ও তথা হীন-কূট ও গভীর রাজনীতিকে সাহিত্যের জগৎ থেকে তুলনামূলক সাহিত্য উৎখাত করতে চায়। বলতে গেলে, এটিই হলো তুলনামূলক সাহিত্যের ‘রাজনীতি’ বা প্রধান নীতি। ফলে তুলনামূলক সাহিত্যের বাংলাদেশি ধারা ইতিহাসে বাংলা ও বাঙালি ভূমিকাটি এই ছোট করে দেখা, তথা হীনম্মন্যতা এবং বড় করে দেখা কথা উচ্চম্মন্যতা থেকে সতর্ক থাকতে চেয়েছে। (সৈয়দ মনজুরুল; ২০১৯:২৯) এই ধারা ক্যাননের তদন্তকারী, প্রতিষ্ঠানবিরোধী এবং বাঙালির দর্শনের পদ্ধতিগুলো শনাক্ত করেই সাহিত্যের প্রকৃত উত্তরাধুনিক অধ্যয়ন পদ্ধতিতে জোর দিতে চেয়েছে।

আমরা জানি যে ইউরোপের শিল্পবিপ্লবের প্রথম আঁচ লাগে ইংল্যান্ডে, কিন্তু ১৭৫৭ সালের পূর্বকাল অবধি, সেই শিল্পবিপ্লবের প্রস্তুতি ছিল অপেক্ষাকৃত ধীর ও মন্থর। লক্ষণীয়, পলাশীর যুদ্ধের পর কয়েক দশকের যে অবাধ ও অভূতপূর্ব শোষণ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি চালাল ‘‘তার স্বাভাবিক পরিণতিতে ইংল্যান্ডে ঘটলো যুগান্তকারী শিল্পবিপ্লব, অন্যদিকে বাংলার বুকে ঘনিয়ে এল ছিয়াত্তরের ভয়ংকর মন্বন্তর। হলো দেশের এক-তৃতীয়াংশ মানুষের মৃত্যু।’’ (পুলক; ২০১৯:১০)। শুধু তাই নয়, কোম্পানি কূটকৌশলে বাংলার কুটিরশিল্প ও বাণিজ্যে যে অর্থ লগ্নি করা হতো, সেগুলোর গুরুত্ব হ্রাস করে দিয়ে জমিনির্ভর অর্থনীতিকে প্রবল করে তোলা হলো। জমিদার শ্রেণি হলো এরই ফলশ্রুতি।

ইউরোপ যখন সামন্ততন্ত্রকে দুর্বল করে দিয়ে আধুনিক সৃজনে ও মননে চিন্তাভাবনার প্রসার ঘটছিল, বাংলা তখন নতুন করে নেমে এলো সামন্ততন্ত্র। জমিকে অর্থনীতির চালিকা করা হলেও কৃষকদের ঠেলে দেওয়া হলো চরম দুর্দশায়, সেই সঙ্গে ভয়াবহ হীনম্মন্যতায়। সখরাম গণেশ দেউস্কর তাঁর দেশের কথা গ্রন্থে সেসবের চুলচেরা বিশ্লেষণ করেছেন।

১৯০৫ সালে ভারতীয় আয়-ব্যয়ের হিসাব থেকে দেখা গেছে, যেটি গোখেল তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের কাছে পেশ করেছিলেন, সেখানে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে ইউরোপের তুলনায় ভারতীয় কৃষকদের থেকে অপেক্ষাকৃত অধিক পরিমাণে ভূমি-রাজস্ব আদায় করা হচ্ছে। যে ভূমিতে ১০০ টাকা মূল্যের ফসল জন্মে, এর জন্য ইউরোপীয় দেশসমূহের কৃষকদের রাজস্বের একটি তালিকা দিয়ে সেটি বোঝানো হয়েছিল। (সখরাম; ২০১১:৯১)। একটি মেধাবী ও সমৃদ্ধ জাতিজনগোষ্ঠীর বিরাট দেশকে ক্রম অবনতির দশা দেশের কথা গ্রন্থে ধাপে ধাপে উপস্থাপন করা হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ এই গ্রন্থটি সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে লিখেছিলেন,

‘‘আমাদের জাতির মধ্যে যে নিত্যপদার্থটি, যে প্রাণপদার্থটি আছে, তাহাকেই সর্বেতোভাবে রক্ষা করিবার জন্য আমাদিগকে ঐক্যবদ্ধ হইতে হইবে— আমাদের চিত্তকে, আমাদের প্রতিভাকে মুক্ত করিতে হইবে, আমাদের সম্পূর্ণ হৃদয়, স্বদেশের প্রতি আমাদের সম্পূর্ণ শ্রদ্ধা চাই— যাহা শিক্ষা ও অবস্থার গুণে অন্যদিকে ধাবিত হইয়াছে, তাহাকে ঘরের দিকে ফিরাইতে হইবে।’’ (সখরাম; ২০১১: [৪])

১৯০৪ সালে প্রকাশিত গ্রন্থটি ১৯১০ সালে সরকার বাজেয়াপ্ত করেছিল। এটিও প্রমাণ করে, সব ধরনের ঔপনিবেশিকতা ও সাম্রাজ্যবাদ কখনো চায় না মানুষ স্বদেশ ও স্বভাষার ওপর ভিত্তি করে নিজেদের খুঁজে পাক ও বিকশিত করার জন্য ক্রিয়াশীল হোক, নিজের তত্ত্ব বা দর্শন এবং প্রায়োগিক সামর্থ্যে বলীয়ান হোক। কিন্তু আমরা সেই তত্ত্ব ও প্রয়োগ— দুটি ক্ষেত্রেই পিছিয়ে আছি। অথচ, তত্ত্ব ও প্রয়োগের সমন্বয়ে বিদ্যায়তনিক ক্ষেত্রে, বিশেষ করে, বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্ঞানকান্ডের নতুন নতুন শাখার বিস্তার ঘটেছে। আধুনিকতা ও আধুনিকবাদ নিয়ে চিন্তাভাবনা করা ব্যক্তিবর্গ একযোগে স্বীকার করেন যে মানুষের চিন্তা ভাবনায় চালর্স ডারবিন, কার্ল মার্কস, সিগমন্ড ফ্রয়েড ও আলবার্ট আইনস্টাইনের বিরাট প্রভাব যথাক্রমে প্রাণ-প্রজাতির উন্মেষ ও বিকাশের ক্ষেত্রে, মানুষের ইতিহাসের গতিপথ নির্দেশে, নির্জ্ঞানের ভুবন আবিষ্কারে এবং অপেক্ষিক তত্ত্বের মাধ্যমে বস্তু নতুন সম্ভাবনায় বিপুলভাবে বদলে গেছে জ্ঞানবিজ্ঞানের নানান শাখা। এরাঁই মূলত আধুনিকবাদের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। (Childs; 2000: 26)

এরইসঙ্গে সাহিত্যের ক্ষেত্রে জয়েস, প্রুস্ত, কাফকা বা স্যামুয়েল বেকেটের সাহিত্যের বাঁকবদলের পেছনেও এঁদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভূমিকা আছে। (Peter; 2000: 27)

বলাবাহুল্য বাংলা সাহিত্যের আধুনিকতার ক্ষেত্রেও এঁদের ভূমিকা প্রবল। জীবনানন্দ দাশ, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় শুরু করে পঞ্চাশ ও ষাট দশকের কবি ও লেখকদের চিন্তাচর্চা, অনুভব ও পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রেও এঁদের ভূমিকা আছে। বিশেষ করে বাঙালি অনেক গবেষকের বিশ্ববীক্ষায় যেমন কার্ল মার্কসের বিরাট ভূমিকা আছে, তেমনই আছে সিগমন্ড ফ্রয়েডের ভূমিকা।

পশ্চিমা তথা ইউরোপীয় চিন্তাকাঠামো ব্যতিরেকে প্রাচ্যের তথা বাংলা অঞ্চলের চিন্তার জগতে প্রাচ্যের দার্শনিকদের প্রভাব ততটা পড়েনি, পড়লেও তা প্রধান হয়ে ওঠেনি। এখানেই সেই প্রশ্নটি দেখা দেয়: ঠিক এর বিপরীত হলে কেমন হতো; অর্থাৎ পশ্চিমের চিন্তাকাঠামোর পরিবর্তে প্রাচ্যের মনীষীদের চিন্তা ও তত্ত্বে নির্ভর করে যদি এই অঞ্চলের মানুষের বিশ্ববীক্ষা তৈরি হতো, তাহলে বর্তমানে জ্ঞানকাণ্ডে সমস্ত ক্ষেত্রে পশ্চিমাদের একচেটিয়া আধিপত্যে কতটা চিড় ধরতো? এবং এর ফলে জগৎ ও জীবনকে ভিন্ন এক ভঙ্গিতে গড়ে তোলা হতো কিনা?

এই যে, তুলনামূলক সাহিত্যের চর্চা, তাও পশ্চিমা জ্ঞানকান্ডেরই আরেকটি শাখা। যদিও পশ্চিমারা এর সংজ্ঞা এবং গবেষণা পদ্ধতি ও এর পরিধি নিয়ে সুস্পষ্টভাবে এখন অব্দি কিছু করে উঠতে পারেনি। ((Ferris; 2014: 33)

বিশ্বসাহিত্য অধ্যয়ন হবে তুলনামূলক সাহিত্যের অন্যতম দিক বা কোনো টেক্সটকে নানান দিক থেকে যাচাই করা হবে এর অন্যতম লক্ষ্য। আদতে যেকোনো দেশের সাহিত্যকে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ও সুবিস্তৃতভাবে মানবিক কর্মকাণ্ডের সমস্ত দিক থেকে যে-যেভাবে অধ্যয়ন করা যায়, তা সাধন করা হবে এর অন্যতম দিক, কেবল একটি দেশের সাহিত্যের সঙ্গে অন্য দেশের সাহিত্যই একমাত্র তুলনার বিষয় হবে না।

ÔÔIt is now generally agreed that comparative literature does not compare national literature in the sense of setting one against another. Instead, it provides a method of broadening one’s perspective in the approach to single works of literature—a way of looking beyond the narrow boundaries of national frontiers in order to discern trends and movements in various national cultures and to see the relations between literature and other spheres of human activity.ÕÕ (Aldridge; 1969: 1)

তুলনামূলক সাহিত্য নিয়ে প্রথম লেখা গ্রন্থ হ্যাচেসন ম্যাকুলে পসনেট (Hutcheson Macaulay Posnett)-এর Comparative Literature (1886) গ্রন্থের শুরুতে বিজ্ঞান ও সাহিত্যের মধ্যে গড়ে ওঠা শত্রুতার দিক থেকেই বিষয়টি বিবেচনা করেছেন। তাঁর মতে, সাহিত্যের লোকেরা মনে করছে বিজ্ঞানের হাতে পড়ে আমরা Philistine (ফিলিস্টাইন) দশায় উপনীত হয়েছি। (ফিলিস্টাইনের মানে হচ্ছে: a person who has no interest in or understanding of the arts, or hostile to tham). অন্যদিকে, বিজ্ঞানের লোকেরা মনে করেছেন, সাহিত্যের এই রহস্যময়, কাল্পনিক জগৎ ব্যবহারিক জীবনের উপযোগী নয়। পসনেট এই দুয়ের বন্ধুত্ব তৈরি কীভাবে হবে— সেটি নিয়েই ভেবেছেন। (Posnett; 1886: v-vi) পসনেটের চিন্তায় তাই অন্য জ্ঞানকান্ডের সঙ্গে যুক্ত করে সাহিত্যপাঠকে বিস্তারদানের চিন্তাটিই ফুটে উঠেছে।

ÔÔHow shall we distinguish the various classes of writing which social evolution produces; how shall we separate specialized scientific studies from the works of creative imagination– the latter apparently Elia’s ideal ‘‘books;’’ what, if fact, as distinct from scientific treatises and all other ‘things in books’ clothing,’’ is ‘‘literature ’’?ÕÕ (Posnett; 1886:3)

তুলনামূলক সাহিত্যের সূত্রপাত সেই দিক থেকে সাহিত্য ও বিজ্ঞানের দোস্তি পাতানোর ভাবনা থেকে। অন্যদিকে, তুলনামূলক সাহিত্যে বিশ্বসাহিত্য অধ্যয়নের দিকটাও ততধিক গুরুত্বপূর্ণ। সেক্ষেত্রে পশ্চিমা সাহিত্যবিচারে ও নন্দনতত্ত্বে প্রতীচ্যের কবি, সাহিত্যিক ও নন্দনতাত্ত্বিকদের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কথা, কিন্তু বিস্ময়করভাবে দেখা যায়, পশ্চিমা সাহিত্যের বেশিরভাগ সংকলন, সেটি হোক নাটক, কবিতা বা ছোটগল্পের এমনকি কোনো প্রবন্ধের বা চিন্তামূলক সংকলনগ্রন্থে প্রাচ্যের প্রায় কোনো কবি, সাহিত্যিক বা চিন্তকের রচনা প্রায় উপেক্ষিত। অথবা জগৎ মানেই কেবল পশ্চিমা জগৎ। সেখানে বিশ্ব ছোটগল্পের ইতিহাসে অন্যতম পথিকৃৎ রবীন্দ্রনাথ যেমন নেই, তেমন নেই বিভূতি-তারাশঙ্কর বা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়; তেমনি নেই নেগুচি থেকে কো উনের মতো কবি ও চিন্তক। বা অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাগীশ্বরী প্রবন্ধাবলির নন্দনিক চিন্তার কোনো উল্লেখ পাওয়া যাবে না, তেমন পাওয়া যাবে না আনন্দ কুমারস্বামী বা নন্দলাল বসুর উল্লেখ বা রাজনীতিতে এম.এন. রায় বা সুভাষ বোসের ভূমিকা।

ইতিহাসচিন্তা থেকে অর্থনৈতিক চিন্তা বা দার্শনিক ক্ষেত্রে প্রাচ্যের মনীষীদের কোনোমাত্র উল্লেখ তো দূরের কথা, রামায়ণ বা মহাভারতের মতো টেক্সট, উপন্যাস নিয়ে তত্ত্বের আলোচনায় এপিকের প্রসঙ্গ এলেও ই. এম. ফরস্টার, গেয়র্গে লুকাচ, মিখাইল বাখতিন, পল দ্য মান, মিশেল ফুকো, বা জ্যাক দেরিদা প্রমুখের জ্ঞানতাত্ত্বিক আলোচনার এর কোনো উল্লেখ নেই। এমনকি এঁদের কোনো ফুটনোটেও সংস্কৃত অলংকারশাস্ত্রের উল্লেখমাত্র নেই। (শামীম; ২০১৯:১৮৭) অথচ পশ্চিমা চিন্তা ছাড়া প্রাচ্যের কোনো কবি, সাহিত্যিক, চিন্তক কোনো আলাপ-আলোচনই গড়ে তুলতে পারেন না; তুলতে গেলেও অন্যদের এ সম্পর্কিত অজ্ঞতার ও অপরিচয়ের কারণেও সেটি অনুধাবনের ক্ষেত্রে তৈরি হয় না। কতজন অবহিত আছেন যে মাধবাচার্যের (১৪ শতক) সর্বদর্শন সংগ্রহ গ্রন্থ, নাগার্জুন, ধর্মকীর্তি, দিগনাগ, শান্তরক্ষিতসহ আরো অনেকে, যাঁরা বৌদ্ধ দর্শনের যুক্তিবাদী ধারার বিকাশ ঘটিয়েছেন? তাঁদের ইউরোপীয় পন্ডিতরাও যেমন কোনো গণ্যতা-মান্যতা দেন না, তেমনই যে অঞ্চলের তাঁরা অধিবাসী ছিলেন, তারাও দেন না; এমনকি ন্যায় ও বৈশেষিক দর্শনের বিকাশ সম্পর্কেও তাদের কোনো ধারণা নেই।

আরো আক্ষেপের বিষয় এই যে বাঙালিরাও জ্ঞানচর্চার ও তত্ত্বীয় জগতে যে অভূতপূর্ব ভূমিকা রেখেছিলেন, সেটিই আমাদের শনাক্তকরণের বাইরে পড়ে আছে। অথচ, ‘‘বাংলার প্রাচীন ধর্মতন্ত্র। আদি কৌম সমাজে প্রচলিত গূঢ় সাধন-পদ্ধতি এবং প্রাচীন জনগোষ্ঠীগুলোর বিশ্বাস ও সংস্কৃতির প্রভাব পড়েছে তন্ত্রধর্মে।’’ (রায়হান; ২০১৮:১৭)

তন্ত্র ছাড়াও পরবর্তীকালে বৌদ্ধমত, বাউলমতের যে বিকাশ ঘটেছিল, যেখানে জীবন ও দর্শন অঙ্গাঙ্গিভাবে মেশানো ছিল— সেগুলোকে ব্যবহার করে বাঙালি দর্শন তৈরি হওয়ার কথা ছিল, যা আসলে তৈরি হয়েই ছিল, কিন্তু আমাদের গণ্যতা-মান্যতা ব্যতিরেকে সেসবেরও প্রচার-প্রসার ঘটেনি। আমরা জানতে পারি যে পঞ্চদশ শতকের পরে বাঙালি বেশ কিছু মনীষী গড়ে তুলেছিলেন নব্যন্যায়চর্চার কেন্দ্র। রায়হান রাইন এ সম্পর্কে লিখেছেন,

‘‘পঞ্চদশ শতকের পর থেকে নদীয়া হয়ে ওঠে নব্য ন্যায়চর্চার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। রঘুনাথ শিরোমণি ন্যায়শাস্ত্র অধ্যয়ন শুরু করেছিলেন বাসুদেব সার্বভৌমের চতুষ্পাঠীতে। পরবর্তীকালে মিথিলা থেকে ফিরে নিজেই বাসুদেব ন্যায়ের নদীয়া ধারার প্রবর্তন করেন। এই নৈয়ায়িকেরা বিশ্বাস করতেন, প্রমেয় বা জ্ঞানের বিষয়কে যুক্তিসিদ্ধ ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব। এ কারণে তাঁরা এমন সব পরিভাষা নির্মাণের চেষ্টা করেন, যার মাধ্যমে অভিজ্ঞতার জগৎকে অর্থপূর্ণভাবে প্রকাশ করা যাবে। জ্ঞেয়জগৎকে ভাষার অনুষঙ্গে বুঝতে চাওয়ার এই নৈয়ায়িক ধারাকে পুষ্ট করেন অনেক বাঙালি পন্ডিতরা। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন রামভদ্র সার্বভৌম, মথুরানাথ তর্কবাগীশ, বিশ্বনাথ পঞ্চানন, হরিরাম তর্কবাগীশ, রঘুদেব ন্যায়ালংকার, জগদীশ তর্কালঙ্কার প্রমুখ।’’ (রায়হান;২০১৮:২০)

রঘুনাথ শিরোমণি, জগদীশ তর্কলঙ্কার, বিশ্বনাথ পঞ্চানন প্রমুখ নৈয়ায়িকের মাধ্যমে গড়ে ওঠা বিশাল বিস্তৃত ও সুগভীর জ্ঞানক্ষেত্র এখনও পশ্চিমাদের কাছে গুরুত্ব পাওয়া তো দূরের পরিকথা, আমাদের প্রাচ্যের বিদ্যাতনিকচর্চায় এঁদের ততটা আমলে নেওয়া হয়নি। (রায়হান; ২০১৮:২০)

ফ্রাঙ্ক থিলি আ হিস্টরি অব ফিলোসফি গ্রন্থে সর্বজনীন দর্শনের ইতিহাস লিখতে গিয়ে ইউরোপের বাইরে বেরুতে পারেননি, অন্যদিকে ব্রিটিশ পণ্ডিত ডব্লিউ টি স্ট্যাস মনে করেন, হিন্দু মিশরীয় চীনাদের দর্শন ধর্মীয় ও ব্যবহারিক প্রয়োজন থেকে নিজেকে আলাদা করতে পারেনি। (রায়হান; ২০১৮:১২)

বাঙালির তন্ত্রধর্মের দৃষ্টান্ত অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানের জীবনেও বিদ্যমান। তন্ত্রচর্চা দিয়েই তাঁর দীক্ষা শুরু। পিতার কাছেই তন্ত্রোপসনা শিখেছিলেন। তিনি পরে নালন্দায় একটি পর্যায় অবধি শিক্ষালাভ করেন। বিখ্যাত নৈয়ায়িক পণ্ডিত জেতারির কাছে তিনি গৌণবিজ্ঞান শিক্ষা করেন, যা পরবর্তীকালে তাঁর জন্য ধর্ম ও দর্শন পাঠের পথ তৈরি করে। (রায়হান; ২০২০: ১৩)

আমরা জানতে পারি যে তিনি রাহুল গুপ্ত, শীলরক্ষিতের কাছে বিদ্যাশিক্ষা করেন। অতীশ দীপঙ্কর দর্শনের একটি পদ্ধতি তথাচিন্তাচর্চা তাঁর ভূমিকা দেখতে পাই মাধ্যমিকবাদী দার্শনিক হিসেবে। (রায়হান; ২০২০: ২০)— এই যে দর্শনের পথ, চিন্তার পথ, তত্ত্বের পথ— এগুলো আমাদের জীবনচর্চায় নানান কারণেই অন্তর্ভুক্ত হয়নি, এর একটি কারণ হলো ঔপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থা।

তুলনামূলক সাহিত্যচর্চায় আমাদের ইতিহাসবোধ ও সংস্কৃতিধারণা তৈরির সবচেয়ে বড় বাধা হলো সাম্রাজ্যবাদীশক্তি বা ঔপনিবেশিক মানসকাঠামো। (দেবেশ; ২০১৯ : ২০) দেবেশ রায়ের মতে,

‘‘আমাদের নিজস্ব তুলনামূলক সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিবেচনার পদ্ধতি ও উপায় যখন আমরা আবিষ্কার করতে চাই, তখনই আমরা ইংল্যান্ড ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রচলিত সংজ্ঞা ও পদ্ধতি অনুসরণ করি। তার কারণ, ইংল্যান্ড আমাদের ওপর প্রায় দুই শো বছর প্রভুত্ব করেছে— তাই ইংল্যান্ডে প্রচলিত বিদ্যাচর্চার পদ্ধতিই আমাদের কাছে একমাত্র বহির্বিশ্ব।’’ (দেবেশ; ২০১৯: ২০)

তুলনামূলক সাহিত্যচর্চার বাধা আরো অনেক আছে। যেমন, শুরু থেকেই তুলনামূলক সাহিত্যে সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদ একটি কেন্দ্রীয় ধারণা হতে পারত, কিন্তু তা হয়নি। পশ্চিমকেন্দ্রিক ক্যানননির্ভরতা, আমাদের দেশে বিদেশি ভাষা হিসেবে ইংরেজির একক আধিপত্য তুলনামূলক সাহিত্যের পথ তৈরি করতে বড় বাধা হয়ে আছে। (সৈয়দ মনজুরুল; ২০২৯:৩০) আমাদের দেশের বিদ্যায়তনে ইংরেজি ভাষার পাশাপাশি প্রাচ্যের দুটি, যেমন: ফার্সি ও জাপানি বা আরবি বা চীনা ভাষা এবং প্রতীচ্যের দুটি ফরাসি ও জার্মান বা স্পেনীয় ও ইতালীয় এমনকি রুশ— এমন কিছু ভাষার চর্চা জোরদার হতেও পারত, কিন্তু তা হয়নি। পর্তুগিজ ভাষার সঙ্গে বাংলা ভাষার আদি যোগও আছে— সেটিও আমরা বহাল রাখতে পারিনি।

ফলে তুলনামূলক সাহিত্যচর্চার নিজস্ব নিরিখ তৈরির নানান উপকরণ, যেমন বাংলা অঞ্চলের প্রাচীন ও মধ্যযুগের সাহিত্য, রস ও ভাবের তত্ত্ব এবং দর্শন হাতে থাকার পরও, এখন অব্দি পশ্চিমা নিরিখই আমাদের সম্বল হয়ে আছে। এটি মূলত আমাদের ঔপনিবেশিক মানসিকতা ফল, যে-বাধাটির কথা দেবেশ রায় জোর দিয়ে উল্লেখ করেছেন। অন্যদিকে, কেনিয়ার বিশ্ববিশ্রুত সাহিত্যিক-চিন্তক এনগুগি ওয়া থিয়েঙ্গো দেখিয়েছেন কীভাবে ঔপনিবেশিক মানসিকতা সাহিত্যের মাধ্যমে শেকড় গেড়ে চলে। এনগুগি তাঁর দেশ কেনিয়ায় দেখেছেন, সরকারি কার্যক্রমের পথ ধরে ইংরেজি নিয়ন্ত্রক ভাষা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তিনি দেখিয়েছেন, কেনিয়ায় আফ্রিকানদের সবচেয়ে অভিজাত স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে সেই বাস্তবতা তৈরির রূপরেখা:

‘‘সাহিত্যের পড়ালেখা তখন নির্ধারিত হতে লাগল নিয়ন্ত্রক ভাষার দ্বারা সমানভাবে এই আধিপত্যকে আরো শক্তিশালী করার মাধ্যমে। কেনিয়ান ভাষায় চর্চিত কথ্য সাহিত্য (Orature or Oral Literature) বন্ধ হয়ে গেল। প্রাথমিক স্কুলে রিডার হ্যাগার্ডের পাশাপাশি পড়া শুরু হলো ডিকেন্স এবং স্টিভেনসনের সহজ পাঠ। জিম হকিন্স, অলিভার টুইস্ট, টম ব্রাউন, —খরগোশ, চিতা, সিংহের গল্প নয়— যেগুলো তখন আমার কল্পনার জগতের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়েছিল। মাধ্যমিক স্কুলে, স্কট, জি.বি.শ, পাল্লা দিয়েছে আরো রিডার হ্যাগার্ড, জন ব্যুক্যান, অ্যালন প্যাটন, ক্যাপ্টেন ডব্লিউ.ই. জোন্সের সাথে। ম্যাকারিরিতে আমি ইংরেজি সাহিত্য পড়েছি: সামান্য গ্রাহাম গ্রিনের আলোকে চসার থেকে টি.এস. এলিয়ট অবিধ।

এভাবে ভাষা ও সাহিত্য আমাদের নিয়ে যাচ্ছিল নিজ থেকে অন্যে, আমাদের জগৎ থেকে অন্য জগতে...।’’ (এনগুগি; ২০০৪:২৯৩)

এনগুগি ওয়া থিয়েঙ্গো নিজে জেমস নগুগি নামে ইংরেজি ভাষায় লেখা শুরুর সতেরো বছর পর ১৯৭৭ সালে তার নিজের মাতৃভাষা গিকুয়ুতে লিখতে শুরু করেছিলেন। এনগুগির মতে, গিকুয়ু ভাষায় সাহিত্য রচনা যুগপৎ মাতৃভাষা ও কেনিয়ান ভাষায় সাহিত্য রচনা, কেবল তাই নয়, এটি সাম্রাজ্যবাদবিরোধী লড়াইয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। (এনগুগি; ২০০৪:২৯৪) তিনি জোর দিয়ে বলেন,

‘‘আমি চাই না কেনিয়ান শিশুরা তাদের ইতিহাস এবং সমাজের মধ্যে বেড়ে ওঠা যোগাযোগের মাধ্যমসমূহের প্রতি ঘৃণা প্রদর্শনের সেই সাম্রাজ্যবাদ-চাপানো ঐতিহ্যের মধ্যে বড় হোক। আমি চাই তারা ঔপনিবেশিক বিচ্ছিন্নতাকে অতিক্রম করুক।’’ (এনগুগি; ২০০৪:২৯৪)

বাংলা ভাষার দশা গিকুয়ুর ভাষার মতো নিশ্চয়ই নয়। ব্রিটিশরা এ দেশের কোনো ভাষাকেই উৎখাত করে সেখানে এককভাবে ইংরেজি ভাষাকে প্রোথিত করতে পারেনি; কিন্তু আমরা ক্রমে ইংরেজি ভাষাকে, আমাদের ঔপনিবেশিক মানসিকতার কারণে নিয়ন্ত্রকভাষা হিসেবে পথ করে দিয়েছি। তদুপরি, বিপুল জনগোষ্ঠী এর বাইরে। ইংরেজি এর ক্ষমতা কাঠামোর ভাষা হয়ে বিদ্যমান। প্রান্তিক জনসংযোগের ভাষা হয়ে উঠতে পারেনি। বাংলা ভাষা ইতিহাসের পরিক্রমায় বিপুল ব্যবহারকারীদের ভাষা। তা ভাষার ভেতরের ভাষা নয়। যেমনটা কেনীয় ভাষার ভেতরকার ভাষা গিকুয়ু। সব দেশেই এমন দেশের ভেতরে দেশ আছে, সংস্কৃতির ভেতরে ও পাশে এবং তাকে ঘিরে আছে কত না সংস্কৃতি। পশ্চিমাধারার বা পুরোনো তুলনামূলক সাহিত্যের চিন্তা সেদিকে যেতে চায়নি। সেক্ষেত্রে সূচনালগ্ন থেকেই বাংলাদেশের তুলনামূলক সাহিত্যের চর্চা প্রান্তেও ছড়িয়ে পড়তে চায়, প্রান্তের ভাষা সাহিত্যকেও কেন্দ্রীয় আলাপ চর্চা ও বিশ্লেষণে আনতে চায়। ফলে, পশ্চিমা ক্যাননকে গ্রহণ করেও তুলনামূলক সাহিত্যের বাংলা ঘরানা জাতিজনগোষ্ঠীর সাহিত্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত হতে চায়। তাদের সাহিত্যের ফুটে ওঠা সংক্ষোভ বিক্ষোভ থেকে সম্প্রতির সূত্রগুলো খুঁজে বের করে বৃহত্তর মানবিকবোধে যুক্ত হতে চায়। যেমন, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস ‘চাকমা উপন্যাস চাই’ নামের প্রবন্ধে লিখেছিলেন,

‘‘উপমহাদেশের রাজনীতি থেকে পাহাড়িদের আড়ালে রাখার যত চেষ্টাই করা হোক, এর ফল থেকে তারা রেহাই পাবে কেন? দেশ ভাগ হয়, দফায়-দফায় দেশ স্বাধীন হয় আর চাকমাদের ঘরে লাগে নতুন নতুন ধাক্কা। গোটা দেশে আলো জ্বালাবার জন্য তাদের বাড়িঘর ডুবিয়ে দেওয়া হয় অন্ধকার পানির নিচে। বাঁচার জন্য তারা চলে যায় আরো ভেতরে আরো আড়ালে। বাঁচার লড়াই করতে করতে কষ্টে, দুর্যোগে ও অপমানে নিজেদের পরিচয় নিজেদের কাছে স্পষ্ট হয়। তারা উদ্যোগ নেয় সেই পরিচয় প্রতিষ্ঠা করার আয়োজনে। তাদের আত্মপ্রতিষ্ঠার স্বপ্ন রাষ্ট্রে কাছে গণ্য হয় স্পর্ধা বলে। এই স্বপ্ন মুছে ফেলার আদেশ তারা প্রত্যাখ্যান করলে পেশিশক্তি ঝাঁপিয়ে পড়ে তাদের ওপর। আর নতুন করে গৃহচ্যুত হওয়ার পালা।’’ (আখতারুজ্জামান; ২০২৪:১৮৬)

এই বাস্তবতার সঙ্গে তুলনামূলক সাহিত্যের বাংলা ঘরানা যুক্ত হতে চায়। ইলিয়াসের লেখায় ‘চাকমা’ শব্দের বদলে অন্য যেকোনো জনগোষ্ঠীর নাম বসিয়ে দিলে বিষয়টি একই থাকে। সেই লক্ষ্যে কেবল চাকমাই নয়, এমন জাতি জনগোষ্ঠী, পৃথিবীর নানান প্রান্তে যারা বিদ্যমান, তাদের অতীত ও বর্তমানের পরিস্থিতি তাদের রচনা থেকে, টেক্সট থেকে পেতে চায়। ওঁরাও, কোচ, কোল, খুমী, খাসি, খিয়াং, গারো, চাক, ডালু, তঞ্চঙ্গ্যা, ত্রিপুরা, পাংখো, পাহাড়িয়া, বম, বর্মণ, ম্রো, মুন্ডা, মণিপুরী, মারমা, রাখাইন, লুসাই, সান্তাল, হাজং— এমন সরকার স্বীকৃত নৃগোষ্ঠী (আলতাফ ও রমেন; ২০১৩: ৮৯)-সহ আরো জনগোষ্ঠীর সাহিত্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত হওয়াও তুলনামূলক সাহিত্যের বাংলা ঘরানার লক্ষ্য।

কৈবর্ত, কুর্মি, কাহার, চুনারু, চৌহান, জলদাস, তেলুগু, নিকারি, বাউরি, বাওয়ালি, বেদে, বাগদি, মানতা, মালো, মৌয়াল, রাজবংশী, শবর, হিজড়া, হাজরা, হদি— সরকারি তালিকার বাইরে থাকা এসব প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক প্রকাশের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে প্রান্তকে বিশ্বের দিকে, বিশ্বকে প্রান্তর দিকে আনার প্রক্রিয়া তুলনামূলক সাহিত্যের বাংলা ঘরানার আরাধ্য কাজ। এসব জনগোষ্ঠীর লোককথা, লিখিত ও মৌখিক গল্পগাথা, সংগীত, চিত্রকলা, নাট্যকলা, ছড়া কবিতাসহ যেকোনো শিল্পমাধ্যমে সংযোগ তৈরির প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়েই সব ধরনের ঔপনিবেশিক বাধা ভেঙে দেওয়ার প্রক্রিয়া জোর দরকার হতে পারে। তুলনামূলক সাহিত্যের সঙ্গে যেহেতু নৃবিজ্ঞান, সমাজতত্ত্ব এবং সমাজবিজ্ঞান নানান জ্ঞানকান্ডের নিবিড় সম্পর্ক বিদ্যমান— এর ফলে এটি বাংলা ঘরানার একটি অনিবার্য অভিমুখ হয়ে উঠতে পারে।

বাংলা অঞ্চলে চাকমা উপন্যাস বা গারো বা মান্দি কবিতার চর্চা যারাই করছেন, তিনি আদতে একদিকে নিজের ভাষাকে সমৃদ্ধ করছেন, ততটাই বাংলা ভাষার সঙ্গে বিনিময়ে সাংস্কৃতিক সেই সূত্রটি তৈরি করছেন, যেটি কিনা তুলনামূলক সাহিত্যের প্রধানতম দিক (সাংস্কৃতিক সংযোগ সূত্র), যা দেখিয়ে দেয়, বিচিত্র পার্থক্য থাকার পরও আমরা এক হতে পারি। ফলে বাংলা ভাষা, সাহিত্য দিয়ে যে-ইতিহাস ও সমাজদর্শনের চর্চা হতে পারে, তা সহজেই বাংলা ঘরানা তৈরি করতে পারে। উপকরণ ও উপাদান হাতের কাছে মজুত, কাজ কেবল কাজে নেমে পড়ার।

বাংলাদেশের তুলনামূলক সাহিত্যের প্রাতিষ্ঠানিক চর্চা শুরু হওয়ার এক দশকও পার হয়নি। এর ভেতরে বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্যায়ে তুলনামূলক সাহিত্যের বাংলাদেশি ধারার প্রধান দুটো বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এর একটি হলো এটি একদিকে গ্রহীষ্ণুতা এবং অন্যদিকে সহিষ্ণুতা। সহিষ্ণুতা অর্থে ভিন্ন মত পথ ভাবধারার যত রকমের দিক আছে, সেগুলোকে গণ্যতা-মান্যতা দেওয়ার দিক থেকে। ফলে তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বও এর অন্তর্ভুক্ত। এর ফলে তুলনামূলক সাহিত্যের যে-পরিচয় ও সংজ্ঞার দ্বিধ ছিল, তুলনামূলক সাহিত্যের বাংলাদেশি ধারা সেটিকে ঘোচানোর কাজ শুরু করেছে। তুলনামূলক সাহিত্য বলতে, এটি একদিকে যেমন: বিশ্বসাহিত্যের গবেষণামূলক অধ্যয়ন, যা আন্তর্জাতিক আন্তঃসাংস্কৃতিক, সীমানা অতিক্রমী ও বহুশাস্ত্রের সমন্বয়ে গঠিত; তেমনি নিজের দেশের ভেতরে নানান জাতিজনগোষ্ঠীর সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে সমান গুরুত্ব দিতে চায়। ফলে লোকসাহিত্য বা ফোকলোরকে আরো বিস্তৃত আকারে দেখতে চায়। এই সংযোগ তৈরি করতে না পারলে, তুলনামূলক সাহিত্যের প্রধান বাধাটিকেই উৎখাত করা সম্ভব হবে না। এনগুগি যেটিকে বলেছিলেন ঔপনিবেশিক বিচ্ছিন্নতা। এটি বর্তমানে একসময়ের উপনিবেশের অন্তর্গত দেশের প্রধানতম বৌদ্ধিক বাস্তবতা। এনগুগির মতে,

‘‘ঔপনিবেশিক বিচ্ছিন্নতা দুটো পরস্পর যুক্ত আকার নেয়: একটি ব্যক্তির সাথে তার পারিপার্শ্বিক বাস্তবতার প্রত্যক্ষ (অথবা পরোক্ষ) দূরত্ব তৈরি; এবং অপরটি ব্যক্তির সর্বাধিক বাহ্যিক পরিবেশের মধ্যে যা আছে, তাকে প্রত্যক্ষ (বা পরোক্ষভাবে) চিহ্নিত করা। এ প্রক্রিয়ার শুরু হয় ধারণায়ন, চিন্তা, মানসিক উন্নতির ভাষার সাথে ঘর ও সমাজের প্রাত্যহিক মিথস্ক্রিয়ার যে ভাষা তার সুচিন্তিত বিভেদকরণের মাধ্যমে। এটি হচ্ছে শরীর থেকে মনকে আলাদা করার মতো ব্যাপার, যেন তারা একই ব্যক্তির মধ্যে দুটি বিচ্ছিন্ন ভাষা পরিবেশ তৈরি করছে। আরো বৃহৎ সামাজিক পরিসরে এটি হচ্ছে দেহহীন মাথা ও মাথাহীন দেহের একটি সমাজ উৎপাদন করা।’’ (এনগুগি;২০০৪:২৯৪)

এই মানসিক বাধা অতিক্রম না করলে তুলনামূলক সাহিত্যের চর্চাই সূচিত হতে পারে না। বাংলা সাহিত্যের প্রতিনিধিত্বশীল রচনাবলির যথাযথ অনুবাদ এবং বিশ্বের নানান ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর রচনা অনুবাদ ও সংস্কৃতির সঙ্গে গভীর পরিচয়ের মাধ্যমে অর্জিত হতে পারে এর প্রাথমিক লক্ষ্য, চূড়ান্ত লক্ষ্য বিশ্বসংস্কৃতির সংযোগসূত্রগুলো তৈরির মাধ্যমে পুব-পশ্চিম, পুব-পুব সংলাপ নিত্য জারি রাখা, (সৈয়দ মনজুরুল;২০১৯:৩৩) সর্বোপরি বৈশ্বিক-প্রান্তিক সীমারেখা পেরিয়ে গিয়ে মানবসভ্যতার সমস্ত বৈচিত্র্য অক্ষুণ্ন রেখেই স্ব-স্ব ভাষা ও দেশের সাংস্কৃতিক অগ্রগতি আনয়ন।

তুলনামূলক সাহিত্যের বাংলাদেশি ধারার লক্ষ্য তাই অনেক বিস্তৃত। সূচনালগ্নে পুরোনো ও প্রচলিত তুলনামূলক সাহিত্যের পথটিকে গায়েত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক মৃত বলেছিলেন, ততটাই এর উজ্জীবন নিহিত আছে প্রচলিত পথ পরিত্যাগের মধ্যেই। তুলনামূলক সাহিত্য ও নৃগোষ্ঠীগত বা জাতিগত গবেষণার ভিত্তিতে (Spivak;2003:28) তেমনি বলেছিলেন সুজান ব্যাসনেট। এতে তৈরি হওয়া সংকীর্ণ বাইনারি দশা, অনৈতিহাসিক আবেদন এবং আত্মতুষ্টিময় অদূরদৃষ্টি— একে পথভ্রষ্টই নয়, বিলোপের দিকে নিয়ে যাচ্ছিল। (Bassnett,1993:47) এ পর্যায়ে স্পিভাক এর নবজন্মের পথ দেখালেন। (Spivak;2003:82) সেখানে: ‘‘ভাববো জগৎজুড়ে, কিন্তু কাজ করবো নিজের ঘরে।’’— এমন দ্যোতনাও এলো। বৈশ্বিক ও প্রান্তিক যোগসূত্র স্থাপন ও স্থানান্তরের পথ তৈরি হলো। তিনি তায়েব সালেহ ও মহাশ্বেতা দেবী অবধি গিয়েছিলেন, (Spivak;2003:26) কিন্তু আমরা গারো, মণিপুরী, ত্রিপুরা, ম্রো প্রভৃতি জনগোষ্ঠীর কবি, লেখক, চিন্তক ও শিল্পীদের অন্দরমহলে প্রবেশ করতে চাই।

তুলনামূলক সাহিত্যের প্রথমদিকে চিন্তাবিদ হ্যাচেসেন ম্যাকুলে পসনেট যে গতিপথে তুলনামূলক সাহিত্যকে এগিয়ে নিতে চেয়েছিলেন, সেই লক্ষ্যে বৈজ্ঞানিক ও নান্দনিক শিক্ষাকে সমন্বিত করে, তুলনামূলক সাহিত্যের বাংলা ঘরানা এর অভিমুখ তৈরি করতে অগ্রসরায়মান।

তথ্যসূত্র ও গ্রন্থপঞ্জি:

  • আখতারুজ্জামান ইলিয়াস (২০২৪)। ‘চাকমা উপন্যাস চাই’, সংস্কৃতির ভাঙা সেতু, মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা
  • এনগুগি ওয়া থিয়েঙ্গো (২০০৪)। ‘মনের ভেতরে উপনিবেশ’, অনুবাদ: আসফিয়া গুলরুখ, আফ্রিকার সাহিত্য সংগ্রহ, সম্পাদক: শিবনারায়ণ রায় ও শামীম রেজা, কাগজ প্রকাশন, ঢাকা।
  • দেবেশ রায় (২০১৯)। ‘সাহিত্য ও সংস্কৃতির তুলনামূলক পাঠ’, তুলনামূলক সাহিত্য ও সংস্কৃত জার্নাল, সম্পাদক: অধ্যাপক ড. মো. রেজাউল ইসলাম (শামীম রেজা), বঙ্গবন্ধু তুলনামূলক সাহিত্য ও সংস্কৃতি ইনস্টিটিউট, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, সাভার, ঢাকা
  • রায়হান রাইন (২০১৮)। ‘ভূমিকা’, বাংলার দর্শন: প্রাক উপনিবেশ পর্ব, প্রথমা, ঢাকা (২০২০)। ‘ভূমিকা’, অতীশ দীপঙ্কর রচনাবলি, প্রথমা, ঢাকা
  • শামীম রেজা (২০১৯)। শিল্প ও সাহিত্যতত্ত্বে বাংলা ঘরানা: অনুসন্ধান ও প্রস্তাবনা, তুলনামূলক সাহিত্য ও সংস্কৃত জার্নাল, সম্পাদক: অধ্যাপক ড. মো. রেজাউল ইসলাম (শামীম রেজা), বঙ্গবন্ধু তুলনামূলক সাহিত্য ও সংস্কৃতি ইনস্টিটিউট, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, সাভার, ঢাকা
  • সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম (২০১৯)। ‘তুলনামূলক সাহিত্যের নতুন পাঠ’, তুলনামূলক সাহিত্য ও সংস্কৃত জার্নাল, সম্পাদক: অধ্যাপক ড. মো. রেজাউল ইসলাম (শামীম রেজা), বঙ্গবন্ধু তুলনামূলক সাহিত্য ও সংস্কৃতি ইনস্টিটিউট, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, সাভার, ঢাকা
  • Bassnett, Susan(1993). Comparative Literature: A Critical Introduction, Blackwell, Oxford UK & Cambridge USA
  • Aldridge, A. Owen (1969). ‘The Purpose and Perspectives of Comparative Literature’, General Introduction, Comparative Literature: Matter and Method, University of Illinois Press, Urbana Chicago London
  • Childs, Peter (2000). Modernism, Routladge, Londo and New York.
  • Posnett, Hutcheson Macaulay (1886). ‘What is Literature’, Comparative Literature, Kegan Paul, Trench & Co ,London
  • Spivak, Gayatri Charavorty(2003). Death of a Discipline, Seagull Books, Calcutta New Delhi.
/জেড-এস/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
বিএসইসির চেয়ারম্যান রাশেদ মাকসুদ ও ৪ কমিশনারের পদত্যাগ
বিএসইসির চেয়ারম্যান রাশেদ মাকসুদ ও ৪ কমিশনারের পদত্যাগ
দাম বৃদ্ধির একদিন পরই লাইফলাইন গ্রাহকদের জন্য রিভিউ আবেদন
দাম বৃদ্ধির একদিন পরই লাইফলাইন গ্রাহকদের জন্য রিভিউ আবেদন
ফোনালাপ ফাঁসের পর বদলি করা হলো জেল সুপারকে
ফোনালাপ ফাঁসের পর বদলি করা হলো জেল সুপারকে
সর্বাধিক পঠিত
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম