কাঠমান্ডু শহরের অর্ধেক সৌন্দর্য আকাশ থেকে উপভোগ্য। মাটিতে পা ফেললে চোখে পড়ে বাকি অর্ধেক। আকাশপথ হয়ে শহরে পৌঁছাতে যত পাহাড়-পর্বত ও গিরিপথের দেখা মেলে, আদতে শহরটি ততটা জটিল নয়। দেখতে বরং ছিমছাম। শহরে সুউচ্চ ভবন কম। ধুলো-ময়লার বাড়াবাড়িও কম। তবে শহরের সব স্থানে এ কথা খাটে না। শহরে দেখা যাচ্ছে, কোথাও কোথাও নির্মাণাধীন সাইটের ধুলো এসে পুরো পথঘাটে ছড়িয়ে পড়ছে অনায়াসে। স্কুটির চালক ও আরোহী মুখে রুমাল বেঁধে চলে যাচ্ছে এসবের তোয়াক্কা না করে দিগ্বিদিক। নভেম্বরের বিকেলগুলোতে তাপমাত্রা নিচে নামতে শুরু করলে শহরে ধুলোর বাড়াবাড়ি রকম বাড়বাড়ন্ত দেখা যায়। এমন ধূলিমলিন পথ পেরিয়ে পৌঁছাতে হয় বাবরমহল; সেখানে যেতে উঁচু-নিচু পথের সঙ্গে পার হতে হয় নদী, লোকালয় আর মনুষ্য উপত্যকা। নদীর ওপর থাকা রুদ্রমতি ব্রিজ। ব্রিজ পার হতে হতে ধোবিখোলা নদীর দুই কূলে ঘর-গেরস্থালির নোংরা দেখে মনে হয় নদীটি চিরদুঃখী বুড়িগঙ্গার ভাই। নদীর এই হতোদ্যম দশা দেখে জামিলের মনের ভেতরটা কেমন গুলিয়ে উঠলো। সে ভাবলো নদীর সঙ্গে এই কাণ্ড শুধু স্বদেশে না, বিদেশেও ঘটতে পারে। নেপালের মানুষজন সম্পর্কে সে আগে যতটুকু জেনেছিল তাতে তার অনুমান ছিল ঢাকা শহরের মানুষের চেয়ে তাদের রুচি উন্নত। আদতে যে তা নয় সে বিষয়েও জামিল নিশ্চিত নয়। তবে ধোবিখোলা নদীর সঙ্গে এহেন আচরণ মানতে তার কষ্ট হচ্ছে। মনের ভিতর থেকে হাঁপিয়ে উঠছে মন।
এই দশা নিয়েই জামিল বাবরমহলে ঢুকলো। বাবরমহল এক কথায় পরিপাটি। সাফসুতরো। পুরোনো স্থাপত্যকৌশলে নির্মিত সেই মহল। দেয়াল, মাথার উপরের ছাদ আর থাম্বগুলোর দিকে তাকালে তা বোঝা যায়। সাদা চুনকামে আদি নকশাগুলো যেন অধিকতর স্পষ্ট। নানা দেশের ডেলিগেটরা আসবেন বলে সেখানে বাড়তি যত্নের ছাপ স্পষ্ট। বাবর মহলের যে দিকটাতে রেস্টুরেন্ট সেদিকটায় পরিপাটি বেয়ারার দৌড়ঝাঁপ চোখে পড়ছে। আঁটসাঁট পোশাকে সুন্দরী বেয়ারা মদের সরু ও আকর্ষণীয় গ্লাস এগিয়ে দিচ্ছে অভ্যাগতদের দিকে। রেস্টুরেন্টটা দোতলায়। সেখানে উঠবার জন্য আছে কাঠের মোড়ানো সিঁড়ি। হাইহিল পড়ে কেউ যখন দোতলায় উঠছে, ঠক ঠক শব্দ হচ্ছে তখন, সেই সিঁড়িতে। নিচতলায়, কাঠের সিঁড়ির গোড়ায় একটি মিনিবার। রেস্টুরেন্টে খাবার সার্ভ করার কিছুক্ষণ পূর্বে বারের সম্মুখভাবে ছোট ছোট লম্বা টেবিল ঘিরে দণ্ডায়মান লোকের জটলা। একে একে এপিটাইজার আসছে। চিকেন কাবাব, ফিশ কাটলেট, সমুচা, ভেজিটেবল রোল আর বহুপদের ফ্রুটস। লোকেরা টুথপিক দিয়ে নিজের পছন্দেরটা গালে তুলছে। বিকেলের আলো নিভে এলে জটলা ঘিরে সোডিয়াম বাতি জ্বলে উঠলো। একদিকে কাঠ জোগাড় করে তাতে আগুন জ্বালানো হলো। কনকনে শীতে সকলে নিজেদের দুই হাতের তালুতে ঘষে তাতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করতে চাইলো। বহু লোকের ভিড়ে যে দু-চারজন মদ নেবে না বলে জানালো তাদের জন্য বেয়ারা ছেলেটি একটি সরু গ্লাসে গরম জলে আদাকুঁচি, লেবুজল ও মধুর মিশেলে এক আজব ককটেল নিয়ে এলো। সকলে যখন দামি ব্রান্ডের মদ ও মধুর গ্লাসে চুমুক দিচ্ছিল তখন ঘোষণা এলো ডিনারের টেবিল প্রস্তুত হতে এখনও ঘণ্টা খানেক সময় প্রয়োজন— সকলে মিলে আমরা এখন আর্ট গ্যালারি পরিদর্শন করবো।
সিদ্ধার্থ আর্ট গ্যালারির প্রবেশমুখের হাফ সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠলেই চতুর্দিক বন্ধ ঘর। কাঠের দরজা, উপরের তলায় উঠবার কাঠের সিঁড়ি আর ভিতরের দুটি পিলার বাদ দিলে চারদিকে কেবল দেয়াল। ছাদসহ দেয়ালের উপর-নিচে সাদা চুনকাম। চার দেয়ালে ঝুলে আছে দক্ষিণ এশীয় আটটি দেশ— বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটান ও মালদ্বীপের সিকিসংখ্যক তরুণ শিল্পীর শিল্পকর্ম। এক শিল্পী তো অদ্ভুত আইডিয়া নিয়ে হাজির। গ্যালারির মেঝেতে সে ফেলে রেখেছে ইন্টারনেট সংযোগ দেবার একগুচ্ছ ক্যাবল। এলোমেলো সেই ক্যাবলের মাঝে এদিক-ওদিক ফিরে বসে আছে কতগুলো ধাতব চড়ুই। দেয়ালের দিকে মনোযোগী দর্শনার্থীদের মনকে দেয়াল থেকে বিযুক্ত করছে চড়ুইয়ের এই ঘর-বসতি। গ্যালারির চার দেয়ালজুড়ে নানা ছবি ও চিত্রকর্ম ঝুলছে। দেয়ালের পশ্চিম দিকে সাঁটানো ছবিটি নীলবর্ণের। ছবির শিরোনাম নীল চোখের তরুণী। এটি সত্য যে ছবির তরুণীর চোখ দুটি নীল। তবে চিত্রকর্মটি দেখে যে কারও মনে হতে পারে এটির নাম নীল চুলের তরুণী। অন্তত ওরহান পামুকের খিরমিজি সাচলি কাদিন বা লাল চুলের তরুণী উপন্যাসের মতো। উপন্যাসের নায়িকার চুল লাল হওয়ায় পুরো বইয়ের নাম ও কভার লাল হতে পারলে এই চিত্রকর্মে তার ব্যত্যয় হবে কেন। এই প্রশ্ন জামিলের মনের মধ্যে ঘুরপাক খেলো। তবু জামিল এই ভেবে নিজেকে সান্ত্বনা দিলো যে চিত্রকর হয়তো নামকরণের ক্ষেত্রে তার মতো দর্শনার্থীর কথা বিশেষ বিবেচনায় নেয়নি।
চিত্রকর্মে থাকা তরুণীর শরীরে নীলজলের টেরাকোটা। নীলসমুদ্র তার চুল। আকাশের রং অঙ্গে মেখে তরুণী নেমে গেছে সমুদ্রের জলে। ছবির নারীমূর্তির শরীরজুড়ে এক অদ্ভুত পোশাক। পোশাকে উৎকীর্ণ একঝাঁক মাছ। কোনটি কোন জাতের মাছ তা কূলকিনারা করা যায় না। সেসকল মাছের শরীরে সবার সমান স্বাস্থ্য। লম্বাটে গড়নের মধ্যে নাদুসনুদুস। এই মাছেরা সকলে নিম্নগামী, যেন দলবেঁধে নেমে গেছে জলের কোলে। তরুণীর দুই হাতের পেশিতে বাঁধা দুটি কুসুম রঙের ফুল, ফুলের সঙ্গে ঝুলে আছে সবুজ দীর্ঘ লতা— যেন ফিনফিনে লেজ। জামার সঙ্গে জুড়ে আছে দুইগাছি—স্বর্ণলতা—জামার পাইপিন। তরুণীর দুই হাতে দুটি মাছ— অন্য মাছেরা তার শরীরজুড়ে থাকলেও দুটি মাছকে বিশেষভাবে হাতে ধরে রাখবার বিশেষত্ব খুঁজে পেল না জামিল। একই রং ও বর্ণের দুটি মাছকে কেন বিশেষ পাত্তা দেবে মেয়েটি। কিশোরী বয়সে অনেক সন্তান জন্ম দিলে শরীরের যে সুরত হয়, তরুণীর চেহারায় সেই ছাপ বিদ্যমান। কিছুটা রোগা, কিছুটা ভগ্ন।
এতক্ষণ ছবির দিকে চেয়ে থাকা জামিলের মুখ থেকে অস্ফুটে বের হলো— মাছের মা। নীল চোখের তরুণী নামটি বোধহয় জামিলের জুতসই ঠেকল না। সে নিজের মতো করে একটি নাম দিলো। তাতে আর যাই হোক— ছবিটি দেখতে তার বিশেষ সুবিধা হলো। জামিল দেখলো, চিত্রপটে থাকা মাছেরা সব অকস্মাৎ চঞ্চল হয়ে উঠেছে— অশান্ত হয়ে দিগ্বিদিক ছুটতে আরম্ভ করলো। মাছেদের এই পাগলা দৌড় আর তরুণীর উদ্বিগ্ন মুখ জামিল ছাড়া গ্যালারিতে থাকা অন্য কোনো দর্শনার্থী দেখতে পেলো কিনা তা বিশেষ অনুমান করা গেলো না। সম্ভবত দেখতেও পায়নি। অন্য দর্শনার্থীরা এই ঘোড়দৌড় দেখতে পেলে তো তাদেরও চিত্রকর্ম ঘিরে জটলা পাকাবার কথা ছিল। এই নিয়ে হইচই হওয়ার কথা ছিল। জামিল দেখলো, মাছেরা সব অবিরাম ছুটছে। শুরুতে জামিলের মনে হলো সে ঘোরের মধ্যে আছে। পরক্ষণে সে খেয়াল করলো, কোনো ঘোর নয়, সত্যি, মাছের এই ছোটাছুটি দেখে মাছের মা-ও উদ্বিগ্ন। সে এতক্ষণ একাই ছবির সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। মন দিয়ে দেখছিল, এবার সে তার সমস্ত মনোযোগ চিত্রকর্মের দিকে নিবিষ্ট করলো। যেন সে চিত্রকর্মের মধ্যে ডুবে গিয়ে যা জানলো তাতে তার অবাক না হয়ে উপায় থাকলো না—মাছের মা তার সন্তানদের সমুদ্রে গমনের উপদেশ দিচ্ছে। সঙ্গে দিচ্ছে গল্প কুড়াবার এক অদ্ভুত আদেশ। জামিল ভাবলো, সন্তানদের সমুদ্র গমনের কঠিন আদেশ নিয়ে মা কীভাবে নির্ভার হতে পারে। কলেরা মহামারির প্রকোপে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর এগারো বছর বয়সি শিশুসন্তান সমীন্দ্রনাথ সামিকে হারানোর পর বেদনাভরা মনে লিখেছিলেন— আমি সেই পিতার মতো অনুভব করছি যে তার সন্তানকে সমুদ্রে পাঠিয়েছে এবং তার নিরাপদ আগমনের জন্য অপেক্ষা করছে। সন্তানহারা রবীন্দ্রনাথের ভাষ্য থেকে বোঝা যায়, সন্তানকে সাগরে পাঠানোর বেদনা সন্তান হারানোর বেদনার সমান্তরাল। বিক্ষুব্ধ সাগরে সন্তানকে পাঠিয়ে কোনো অভিভাবক নির্ভার থাকতে পারে না যতক্ষণ না সেই সন্তান নিরাপদে প্রত্যাবর্তন করে। অথচ এই মা একের পর এক সন্তানকে সমুদ্রে প্রেরণ করছে। গল্প আহরণের এক অদ্ভুত খেলা তাকে পেয়ে বসেছে। সমুদ্রে প্রেরণের ভীতি ও শঙ্কা এই মাছের মা-কে আচ্ছন্ন করছে কিনা তা অনুমান করা গেলো না। সে ঘোষণা করলো— ততক্ষণ অন্তত কেউ ফিরবে না, যতক্ষণ না তোমরা হৃদয় জয় করা গল্প সংগ্রহ করতে সমর্থ হও। এই সামর্থ্যই তোমাদের ফিরে আসার একমাত্র শর্ত। গল্প না পাওয়া পর্যন্ত গল্প অনুসন্ধান হোক তোমাদের জীবনের একমাত্র ব্রত। এমনকি তাতে যদি এক জীবন খরচও হয়ে যায়। জেনে রেখো আমি তোমাদের প্রত্যেকের ফিরে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে থাকবো। মাছের মায়ের শেষ কথা শুনে সন্তানেরা আরো অবাক হলো। মাছের মা বললো, তোমাদের শেষজন যেদিন ফিরে আসবে, জেনে রেখো, সেদিন হবে এই জীবনে আমার শেষ দিন। মাছেরা তাদের মায়ের মুখে এ কথা শুনে পড়লো উভয় সংকটে। একদিকে ফিরে না আসা পর্যন্ত মিলনের আকাঙ্ক্ষা তাদের পুড়িয়ে মারতে থাকবে, অন্যদিকে ফিরে যদি একে একে সবাই আসে সেদিন তারা তাদের মা হারাবে। তারা নিজেরা পরামর্শ করলো, তবে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারলো না। তারা একে অপরকে বলতে থাকলো, তুই তবে কয়েক বছর দেরি করে ফিরবি। আমরা বাকিরা মায়ের সঙ্গে না হয় থাকবো। সে তখন বললো, আমাকে ছেড়ে তোরা ভালো থাকবি, আর আমি ঘুরে বেড়াবো ডালে ডালে, নিঃসঙ্গ, একা। এভাবে মাছেরা এক মিশ্র অনুভূতি নিয়ে একে একে জলে লাফ দিতে থাকলো। যেন চঞ্চল শুশুকের দল জলের কোলে ভীষণ খেলায় মত্ত। সমুদ্রের জলে যখন প্রত্যেকে লাফালাফি আরম্ভ করলো তখন প্রত্যেকের শরীরের রুপালি বর্ণ প্রখর রোদে ঝলক খেলে গেলো। তাদের এই খেলা দেখে অনুমান করা গেলো না যে, মা মাছটি তাদের এক কঠোর আদেশ দিয়েছেন। জামিলের মনে হলো, প্রবল কঠিনের মুখে দাঁড়িয়েও যে সন্তানেরা এভাবে নির্ভয় খেলতে পারে জীবনের অধিকার তাদের আছে।
মাছের মায়ের অপেক্ষা বাড়লো। সে জানে না কতদিন পর তার সন্তানেরা ফিরে আসবে চিত্তাকর্ষক সব গল্প নিয়ে। বছর কয়েক পর হঠাৎ একদিন তার সন্তান গুলেছা ফিরে এলো। গুলেছা সম্ভবত প্রথম দিককার সন্তান। মাছেদের জন্মের দিন-তারিখ লিপিবদ্ধ থাকে না। তাছাড়া মাছ তো আর মানুষের মতো একবারে একটি সন্তান জন্ম দেয় না। একটি মাছ একবারে শত-সহস্র সন্তান জন্ম দিয়ে থাকে। জ্যেষ্ঠ সন্তান গুলেছাকে দেখে মাছের মা আবেগে ভেসে গেলো। তার দুচোখ ছলছল করে উঠলো। জামার হাতা দিয়ে নিজের চোখ মুছলো সে। নিজেকে সামলে সে ভাবলো তার সন্তানেরা সত্যি সাবালক হয়ে উঠেছে। সামর্থ্য তাদের করতলে। গুলেছার দিকে চেয়ে মা মাছ তাদের জিজ্ঞেস করলো, কোথায় ছিলে এতদিন, কী গল্প এনেছো সঙ্গে? কোন সেই গল্প যার পিছনে ঘুরে ঘুরে তুমি এতগুলো দিন কাটিয়ে দিতে পারলে? গুলেছা এবার মায়ের কথা বুঝতে পারলো না। সে ভেবে পেলো না, মা তাদের এত কঠোর আদেশ দিয়ে এখন কেন তার দূরে থাকাকে অপরাধের সুরে বিচার করছে। তবে মা কি তার সন্তানদের নিজের কাছ থেকে দূরে পাঠাতে চায়নি? একান্ত বাধ্য হয়ে সে এমন কাজ করেছে?
গুলেছা বললো, মা আমি এক সমুদ্রের গল্প জোগাড় করতে সমর্থ হয়েছি। মা বললো, তোমাকে তো সমুদ্রেই পাঠিয়েছি। মাছের মায়ের ভ্রূ কুঁচকালো। যেন এ আর বিশেষ কী। সমুদ্র যদি সমুদ্রের গল্প দিয়েই তোমাকে ফিরিয়ে দেয় তবে তাতে কি এমন হেরফের হয়। মা মাছের এই অবস্থা দেখে গুলেছা কষ্ট পেলো। সে ভাবলো এতটা সময় গল্পের জন্য সমুদ্র জলে ঘুরে ঘুরে অতিক্রম করলাম, মা তবু কেন খুশি হলো না। সন্তানের জীবন বৃথা যায় কী তবে এভাবেই।
দুজন মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। মা তাকে বলল, বিলম্ব না করে এখানে বসো, শোনাও তোমার গল্প। গুলেছা বললো, আমি একদল মানুষের হতাশার গল্প এনেছি। তুমি তো আমাদের শিখিয়েছো মানুষ আশায় বাঁচে, বাঁচে আনন্দে। অথচ সমুদ্র আমাকে জানালো সে কীভাবে মানুষের জীবনে চিরদুঃখের ছাপ এঁকে দেয়। গুলেছা কিছুক্ষণ থেমে ফের বললো, আমি এক বন্দরের কাছে গিয়েছিলাম, যেখানে একসময় বিদেশিরা এসে ভিড় করতো। শাসন-শোষণের কেন্দ্র ছিল। ব্যবসায়-বাণিজ্য হতো, তরী এসে ভিড়তো একে একে। ছিল মশলার ঘ্রাণ। দক্ষিণ থেকে আরো দক্ষিণে মালাবার উপকূলে। গুলেছার কথা শুনে মা মাছটি জিজ্ঞেস করলো তুমি কি কালিকট গিয়েছিলে? গুলেছা চুপ করে মাথা নাড়লো। কালিকটের বুকে এখনো কী হতাশা চেপে আছে— যা তুমি বয়ে এনেছো। কালিকট তো দেবতার অভিশাপে এমনিতেই এখন বিরানভূমি। মা মাছ প্রশ্নের সুরে বললো গুলেছাকে।
দক্ষিণে সাগর ফুঁসে উঠেছিলে একদিন। গুলেছা বললো। সাগর ফুঁসে ওঠার কথা শুনে মা মাছটি গুলেছার দিকে তাকালো। গুলেছা মাথা নাড়লো। সে বললো, একদিন সকাল বেলা, মানুষ নিজ নিজ কাজ করছিল, কেউ ঘুরে বেড়াচ্ছিল। কেউ বন্দরে, কেউ সমুদ্রতটে। দক্ষিণের মেয়ে জেনিফার দেখলো, তুমুল গর্জন মাথায় নিয়ে সাগর আক্রমণাত্মক হয়ে উঠেছে। গুলেছা কিছুক্ষণ থেমে ফের বললো, জেনিফার আমাকে বলেছে— আমরা দেখলাম সাগর ধেয়ে আসছে, আমরা দৌড়ালাম, দৌড়াতে দৌড়াতে খোদাকে ডাকলাম। কিন্তু তিনি আমাদের খুব অল্প সাহায্য করলেন। এতদিন যাকে আমরা ‘হৃদয় সমুদ্দুর’ বলে ডাকতাম মুহূর্তে সেই সাগর যেন আজব এক বিষাদসিন্ধুতে রূপ নিলো। জেনিফার দেখলো, মুহূর্তে সাগর সব কিছু কেড়ে নিলো যা কিছু সীমানায়। মানুষের ঘরবাড়ি, রেস্তোরাঁ, ফুলের দোকান, বন্ধু আর যাবতীয় ঠিকানা। সমুদ্রের খেলা সাঙ্গ হলে আমরা যারা বেঁচে ছিলাম তারা প্রত্যেকে প্রিয়জনকে খুঁজতে থাকলাম, কাউকে পেলাম, কাউকে পেলাম না। আমার জোড়ের বোন মনিকাকে পেলাম না। সাগর এখনো আমার বোনটিকে ফিরিয়ে দেয়নি, এখনো না। অথচ সাগরের এই ফণা তোলাকে লোকে নাম দিয়েছে সুনামি। যেন সাগরের আদতে কোন দোষ নেই। সব দোষ ওই সুনামির, ওই নামের। জেনিফার রাগত স্বরে প্রশ্ন করলো, অনিষ্টের একটি নাম থাকলেই কী অনিষ্টের দায় ঘুচে যায়? আমার বোনকে ফিরিয়ে না দিলে আমি তো সমুদ্রকে ক্ষমা করতে পারি না। সমুদ্র আমার কাছে ভীষণ অপরাধী। আমি এখনো সমুদ্রের ওপর ক্ষোভ আর ক্রোধ পুষে রেখেছি। সুনামি থেমে গেলে তোমরা কোথায় কোথায় মনিকাকে খুঁজেছো— গুলেছার এই জিজ্ঞাসার জবাবে জেনিফার ফের বললো, আমরা আমাদের বোনকে খোদার আসমান ছাড়া সবখানে খুঁজেছি। আমার বাবা এখনো প্রতিবছর গির্জায় প্রার্থনার আয়োজন করেন এই ভেবে যে— তার মেয়েটি কোনোদিন সকালবেলা দরজায় এসে দাঁড়াবে। বলবে, বাবা আমি তোমার মনিকা, ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সমুদ্র পেরিয়ে ফিরে এসেছি। আমার মা বছরের ওইদিনটিতে আমাদের প্রতিবেশী নারীদের নিয়ে সমুদ্রসৈকতে দেবতার উদ্দেশ্যে কলসির কান্দা ধরে দুধ ঢেলে দেয়। এই আশায় যে— যদি দেবতা তার মেয়েটিকে ফিরিয়ে দেয়। জেনিফার গুলেছাকে কাছে পেয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো। বোন হারানোর শোক তাকে পুরোনো দিনে ফিরিয়ে নিয়ে গেলো, ফিরিয়ে নিয়ে গেলো সৈকতে, নিয়ে গেলো সেই উত্তাল হাওয়ার দিনে— যেদিন আক্ষরিক অর্থেই সমুদ্র জেগে উঠেছিল।
সে গুলেছাকে বললো, লোকমুখে শুনেছি, ঘূর্ণায়মান জলের কবলে পড়ে আমার বোন মনিকা মাছ হয়ে গেছে। লোকেরা এগুলো কানাঘুঁষা করে, আমাদের সামনে বলবার সাহস দেখায় না। বিরাট সমুদ্রের তলায় এখন নাকি তার ঘরবসতি। ছেলেপুলে নিয়ে তার বিরাট সংসার। একথা শুনে গুলেছা চমৎকৃত হলো। তবে জেনিফারকে বুঝতে দিলো না। সে বললো, তোমার বোন যদি সত্যি মাছ হয়ে থাকে তবে সে কবে ফিরবে তোমাদের কাছে? নাকি সন্তান-সংসারের মায়ার শিকল তার পায়ে? জেনিফার হাউমাউ করে কাঁদলো। মনে হলো সমুদ্রের তাবৎ ফেনা এসে তীরে ভিড় করছে। অশ্রু সংবরণ করে সে বললো, এ কেমন মায়া তার? সে কি আমাদের মায়ার কথা বেমালুম ভুলে গেলো? জেনিফার ফের সমুদ্রকে দোষারোপ করতে লাগলো। সে বললো, আমরা তো কোনোদিনও সমুদ্রের সংসারে হস্তক্ষেপ করিনি। সে কেন তবে আমাদের ঘর-সংসার ভাঙতে আসে?
গুলেছার মুখে সমুদ্রের জেগে ওঠার ও জেনিফারের দুঃখের গল্প শুনে মাছের মা চোখ মুছলো। গুলেছার দিকে চেয়ে সে বললো, মানুষ অপেক্ষা করতে পারে বটে, তবে দীর্ঘ অপেক্ষায় মানুষ নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারায়। মা মাছের এই সিদ্ধান্তমূলক কথায় গুলেছার গল্পে যেন যবনিকা ঘটলো।
গুলেছার গল্প শেষ হবার বছর কয়েক বাদে হা-হুতাশ করতে করতে ফিরে এলো ইলিশা। মনে হলো কেউ তাকে তাড়া করছে বা সে এমন কোনো কথা বলতে চায় যা সে বহু কষ্টে বহু দিন নিজের ভিতরে চেপে রেখেছে। গুলেছা ও ইলিশা দুই বোন। মাছের মা তাদের দুই বোনকে দুই হাতে এতদিন আগলে রেখেছিল। বাকিদের রেখেছিল শরীরের অন্যান্য স্থানে। গুলেছা ও ইলিশার প্রতি মা মাছের ভালোবাসা স্বাভাবিক মাত্রারও অধিক।
মা মাছটির একপাশে বসেছিল গুলেছা। অন্যপাশে এসে বসলো ইলিশা। মা মাছটি ইলিশার দিকে চেয়ে বললো, এবার তোমার গল্প শোনাও। কোথা থেকে কী গল্প তুমি এনেছো। ইলিশা গল্প বলবে এমন সময় দেখা গেলো একে একে অন্য মাছেরা এসে হাজির হচ্ছে মা মাছের চারিপাশে। তারা কেউ গল্প এনেছে আফগানিস্তানের নিমরুজ, শ্রীলঙ্কার জাফনা, বাংলাদেশের বাগেরহাট, ভারতের পানাক্কারনগর, পাকিস্তানের কেট্টা, নেপালের নাগরকোট, মালদ্বীপের নাইফারো আর ভুটানের মঙ্গার থেকে। অঞ্চলভেদে তাদের গল্পও বৈচিত্র্যময়। তাদের গল্পগুলোর কোনোটি বিষাদের, কোনো গল্প সীমাহীন আনন্দের, কোনোটি ভয়ের তো কোনোটি করুণার।
ইলিশা তার গল্প বলা শুরু করলো। শুরুতে ইলিশা একটি বন্দনাগীত গাইলো। প্রেমের বন্দনা। সে মা মাছের দিকে চেয়ে বললো, আমার গল্পটি প্রেমের। মা মাছ ইলিশার গল্প বলার কৌশল দেখে মুচকি হাসলো। ইলিশা এবার বললো, গল্পটি এক প্রসূতি মায়ের। যে তার সন্তান জন্মদানের কিছু দিনের মাঝে সূতিকা রোগে মারা গেছে। সূতিকার কথা শুনে গুলেছা ভ্রূ কুঁচকালো। সম্ভবত সে সূতিকা কী তা বুঝতে পারেনি। ইলিশা বিষয়টি খেয়াল করলো। সে খোলসা করলো—সূতিকা হলো প্রসূতি মায়ের সন্তান জন্মদান পরবর্তী পেটের অসুখ। তবে কার্তিক মাসে সূতিকা হলে বিপদ। কার্তিক মাসে কাইতানি হয়। আকাশে অসময়ে বৃষ্টি ঝরে। বাগেরহাটের শরণখোলার জামাল ফকিরের বৌ আরজিনা বেগমের এই সূতিকা রোগ হয়েছিল। ডেলিভারির ব্যথা ছিল টানা আঠারো ঘণ্টা। পরে ধাত্রী টেনেহিঁচড়ে বাচ্চা প্রসব করালো। প্রসবের পর শুরু হলো তার প্রস্রাবের অসুখ। জবরদস্তি ডেলিভারি প্রস্রাবের নালীকেও ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল। বাচ্চা হওয়ার পর থেকে জামালের বৌ আরজিনার ঠিকঠাক নাওয়া-খাওয়া বন্ধ ছিল অনেক দিন। হঠাৎ একদিন তার মন চাইলো সে শুকনা মরিচ দিয়ে রুটি খাবে। ভাবনা মতো আরজিনা দুটি শুকনা মরিচ পোড়ালো। একটি পেঁয়াজ কুচি করে কেটে তাতে ভাজা মচমচে মরিচ, সরিষার তেল ও লবণ দিয়ে ডলে তৈরি করলো মরিচ ভর্তা। আয়েশ করে গমের গরম রুটি দিয়ে সেই মরিচ ভর্তা পেটে পুরলো। বহুদিন পর তার মনে হলো সে পেটপুরে খেতে পারলো। সন্তান জন্ম দেওয়ার চেয়েও ক্ষুধার যন্ত্রণা তীব্র— তা আরজিনার তৃপ্তির ঢেকুর দেখে বুঝা গেলো। আরজিনাকে ভরপেট খেতে দেখে জামাল ফকিরও যারপরনাই খুশি। সে মনে মনে ভাবলো, তার সদ্যভূমিষ্ঠ সন্তান এবার মায়ের দুধ পাবে। মায়ের পেটে আহার না গেলে ছেলে খাবার পাবে কোথা থেকে।
দুপুরের এই খাবার সন্ধ্যায় আরজিনার পেট নামালো। যে মানুষটি ঠিকভাবে হাঁটতে পারছিল না তার ঠিকানা হলো টাকটিখানা। একরাতে আরজিনার শরীরের সীমাহীন কাহিল দশা। ভূমিষ্ঠ ছেলেটিও পাতলা পায়খানার কবলে পড়লো। শেষতক ডায়রিয়া। জামাল ফকির চোখে কেবল অন্ধকার দেখলো। বিপদের পর বিপদ তাকেও যেন রোগী করে ছাড়লো। সে বাড়িতে কবিরাজ ডাকলো। কবিরাজ আরজিনাকে দেখে সূতিকার ওষুধ দিলেও ছেলেটিকে কোনো ওষুধ দিতে পারলো না। বললো, মায়ের দুধ খাওয়ানো বন্ধ রাখাই এখন তার একমাত্র ওষুধ। মায়ের সূতিকা ভালো হলে ছেলেও ভালো হবে। এক রাতে আরজিনার চোখ দুটি গর্তে ঢুকে গেলো। জামাল ফকিরের পানে চেয়ে সে বললো, আমারে তুমি মাফ করে দিও। তোমার পোলারে মনে হয় মানুষ করবার পারলাম না। জামালের চোখে পানি এলো। সে চুপ রইলো। সে শুধু বুঝলো ক্ষমা তো তার চাওয়ার কথা। সে এই দুর্যোগে বৌয়ের জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসাটুকুর ব্যবস্থা করতে পারলো না। এমনকি বৌয়ের কাছে নিজের অপারগতার কথাটুকুও সে বলতে পারলো না। কৈফিয়ত তো দূরের কথা।
জামাল ফকির শুধু বুঝলো, প্রত্যেকটি বিষয়ের কৈফিয়ত দরকার হয়। সম্পর্কের ক্ষেত্রেও। ভুলের ক্ষেত্রে তো বটেই। যদি সেটিকে ভুল মনে করা হয়। এমনকি কোনো মানুষ যদি বুঝতে পারে কেউ তাকে ভালোবাসে, তখন সে বুঝতে চায়, সে কি সত্যি ভালোবাসে, না ভালোবাসার ভাব ধরে, অভিনয় করে তার সঙ্গে। ভালোবাসা যাচাই হওয়া জরুরি। জামাল ফকির বুঝতে পারলো না ভালোবাসার পরীক্ষায় সে কি পাস করলো না ফেল।
ভালোবাসার মতো বিষয় নিখাদ না হলে মনের মানুষকে ফাঁদে পড়তে হয়। এই বিস্তর যাচাই-বাছাইয়ের জন্য মনের মানুষ চেনা জরুরি। তবে মানুষ চিনতে হলে মানুষের কাছে যেতে হয়। তবে ততটাও কাছে যেতে নেই, ততটাও চিনতে নেই, যতটা কাছে গেলে, যতটা চিনলে কষ্ট বাড়ে। আরজিনার অবশ্য এই কষ্ট নেই, সে চলে গেলেও জেনে গেছে জামাল ফকির তাকে কত ভালোবাসে। কতটা নিখাদ তার প্রেম।
বেশি চিনতে গেলে মনের মানুষকেও খারাপ লাগতে শুরু করে এই কথা জামাল ও আরজিনার ক্ষেত্রে খাটে না। তাদের অবস্থা বরং এমন হয়েছে যে— আশ না মিটিতে হারাইয়া ফেলি। মনের মানুষ বেঁচে না থাকলেও তার ছায়া পিছু ছাড়লো না জামাল ফকিরের। আরজিনার প্রেম তাকে এবার ভূমি থেকে জলে নিয়ে ডোবালো। বিশেষত যে রাতে সে স্বপ্নে দেখলো— আরজিনা মাছ হয়ে নদীতে ভেসে বেড়াতে বেড়াতে দুধ খাওয়াচ্ছে কোলের সন্তানকে। স্বপ্ন শেষ হলেও জামাল ফকির নিজেকে বুঝ দিতে পারলো না যে সে আদতে যা দেখেছে তা সত্যি নয়। ভালোবাসার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ মনের মানুষ সম্পর্কেও সে ভাবতে লাগলো, আমাকে ফাঁকি দিয়ে কেন ঘোলা জলে ঘুরে বেড়ায় বৌ। তবে কি ভালোবাসায় কমতি ছিল? পরক্ষণে সে ভাবলো সে হয়তো আরজিনাকে ঠিকঠাক চিনতে পারেনি। এমনিতে তো মানুষ বুঝা খুব কঠিন। মানুষ নিজেই তো নিজেকে বুঝে না। তবে মানুষ নিজে নিজেকে না বুঝলেও মানুষ নিজে নিজেকে বুঝাতে পারে বটে। আরেকজনের বুঝ সে মানে না। বুঝ যদি মানতো তাহলে পোষ না মেনে গাঙে কেন যাবে আরজিনা।
ধীরে ধীরে অন্ধকার কেটে গেলো। পুবদিকের গাছপালা ঘেরা জঙ্গল সদৃশ এলাকা পরিষ্কার হয়ে উঠলো। আঁধারের সঙ্গে সঙ্গে মনের ভয়ও কমলো জামালের। তবে সে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতে লাগলো, তার বৌ মাছ হয়ে নদীতে নতুন ঘর বেঁধেছে। একথা এক-দুইয়ে জানাজানি হলে লোকেরা তাকে বললো, গাঙের জলে সাঁতার কাইটা মনের দুঃখ কমলে তোমার বৌ ঠিকই একদিন ফিইরা আইবো। বৌ পাগলা মানুষের বৌয়ের ফিরে না আইসা উপায় নাই। জামাল ফকির এবার এ কথাও বিশ্বাস করতে শুরু করলো। সে নদীর জলে কান পেতে রইলো, সকাল-বিকেল, বৌয়ের কথা শুনবে বলে। বৌয়ের জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া জামাল ফকিরের আর তেমন কোনো কাজও রইলো না। তার অবস্থা যেন কানামনা— কাজ নাই মজুরি নাই। এখন সে বাজার থেকে মাছ কেনে না, খালে-বিলে মাছ ধরে না, এমনকি মাছ খাওয়া পর্যন্ত ছেড়ে দিলো। যার স্ত্রী-সন্তান মাছ হয়ে গেছে সে কীভাবে মাছ খাবে।
গুলেছা ও ইলিশার গল্প শেষ হতে হতে আরো অনেক মাছ হাত উঁচিয়ে নিজেদের গল্প বলতে আগ্রহ দেখালো। হালিশা, মেনি, ইতুলসহ অনেকের উদগ্রীব অবস্থা দেখে মা মাছ তাদের অপেক্ষা করতে বললো। তার হাতের ইশারায় সকলে শান্ত হলো। সে বললো, মেনি তোমার গল্প বলো এবার। অন্য মাছেরা মেনির দিকে তাকালো। কেন মা মাছ মেনিকে সকলের আগে প্রাধান্য দিচ্ছে তা অন্যরা বুঝতে পারলো না। তারা ভেবে পেল না— মেনির শরীরে কালো ছোপ ছোপ দাগ, ততটা গৌরি নয়, সুদর্শনাও সে নয় তবু কেন মা মাছ মেনিকে অগ্রাধিকার দেবে।
মেনি উপস্থিত অনেকের মনের অবস্থা বুঝতে পারলেও কিছু বলতে পারলো না। সে কেবল নিজের গল্পটি বলতে চাইলো। মেনি এমনিতে নরম স্বভাবের। প্রতিবাদ তার ধাতে নেই। হয়তো এজন্যই মা মাছটি তাকে আলাদা যত্ন করে। যার মুখে ভাষা নেই, কেউ না কেউ তো তার ভাষা হয়ে ওঠে।
মেনি বললো, আমি এক নির্জন বাড়ির গল্প এনেছি। মেনির অন্য ভাই-বোনেরা এ কথা শুনে মুখ বাঁকালো। যেন বলতে চাইলো— এ আর নতুন কী। মেনি সেদিকে ভ্রূক্ষেপ না করে গল্প বলায় মন দিলো, সে বললো, বাগানবাড়ির মালিক বাড়িটি ভাড়া দিয়েছে এক একাকী ব্যাচেলরের কাছে। ব্যাচেলর ভদ্রলোকের নাম মতিলাল। পেশায় এনজিও কর্মী। চাকরিসূত্রে এখানে থাকে। পরিবার থাকা সত্ত্বেও সে একা। দূরে, গ্রামের বাড়িতে তার বৌ-বাচ্চা-সংসার। বাড়িটি পুরোনো ও জঙ্গলাবৃত। জঙ্গল বলতে বাড়ির চারিপাশে জবা ফুলের গাছ এমনভাবে বাড়িটিকে ঘিরে রেখেছে দূর থেকে দেখলে মনে হবে বাড়িটি আদতে জবা ফুলের বাগান। মতিলাল মনে করে বাড়িটিতে সে একা নয়। বাড়িটি পুরোনো হওয়ায় সেখানে তার সঙ্গে আছে অশরীরী উপস্থিতিও। তবে এই বিষয়টি সে যে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে এমনও নয়, মতিলাল মনে মনে হাসে, নিজেকে নিজে প্রবোধ দেয়, ধুর, ভূত বলে কিছু আছে নাকি। রোজকার মতো সেদিনও সকালবেলা স্নানের পূর্বে সে বেসিনের সামনে দাঁড়িয়ে মুখে সাবান মেখে নিলো। চোখ বন্ধ করে দুই হাত দিয়ে সে মুখমণ্ডল পরিষ্কার করতে থাকলো। হঠাৎ মতিলালের মনে হলো কেউ একজন তার কাঁধে হাত রেখেছে। সে শরীরজুড়ে এক অদ্ভুত শীতল স্পর্শ অনুভব করলো। মতিলাল তৎক্ষণাৎ ভাবলো, হয়তো কোনো ভুল অনুভব তাকে ঘিরে ধরেছে। সে জলদি করে চোখেমুখে পানি ছিটিয়ে আয়নায় তাকালো। তেমন কোনো অস্তিত্ব সামনে ঠাহর হলোনা। নিজের বড় বড় দুটি চোখ আয়নায় দৃশ্যমান হলো। মতিলাল ভাবলো, সে যা ভেবেছিল হয়েছেও তাই। একা বাড়িতে সে সারাক্ষণ ভুলভাল চিন্তা করে, এই অনুভবও সেই চিন্তার প্রতিফলন। বাস্তবে তেমন কিছু না। চোখমুখ ধুতে ধুতে সে পিছন দিকে থাকা বালতিতে শব্দ শুনতে পেলো। বালতির দিকে চেয়ে সে বুঝলো, এক বিশাল গজার মাছ পানির ভেতরে খলবল করছে। মাছের চোখে না ঘুমোনো টকটকে লাল রং। সে ভেবে পেলোনা, সারারাত নির্ঘুম কাটিয়ে লাল চোখের মাছটি কীভাবে তার গোসলখানায় ঢুকলো। এক সপ্তাহে সে গজার মাছ বাড়িতে এনেছে বলে স্মরণ করতে পারলো না। পানির কল বন্ধ করে সে সেখান থেকে বেরিয়ে গেলো, ভাবলো, মাছটি ডিপ ফ্রিজে ঢুকিয়ে রাখবে। গোসলখানায় ব্যাগসহ ফিরে এসে মতিলাল দেখে মাছ হাওয়া। এবার তার শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠলো। তবে ঘটনাটি সে কাউকে বললো না, এমনকি টেলিফোনে স্ত্রীকেও না, বাড়ির মালিককেও না। সে ভাবলো, নিক্যাচকেচির উপোস ভালো। কে জানে এই বলাবলি তাকে কতটুকু ভোগাবে। শেষে লোকে যদি আবার তাকে পাগল ভেবে বসে। ভোগান্তির ভয়ে ঘটনা চেপে গেলেও ভোগান্তি তার পিছু ছাড়লো না। সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার সময় ফটকে ঢুকতেই দেখে মতিলালের জন্য অপেক্ষা করছে সেই বড় গজার। চোখ দুটি তখনও জ্বলজ্বল করছে। রাতে দেখে বালিশের পাশে লেজ নাড়ছে যে সেও ওই বিশাল গজার।
বাকি মাছেরাও এবার হাত উঁচিয়ে কিছু বলতে লাগলো। সকলের সমস্বরে কারো কথাই আন্দাজ করা গেলো না। কেবল বহু স্বরের মাঝে একটি শব্দই প্রধান হয়ে রইলো— মাছ। মাছের মা সকলকে থামিয়ে বললো, বুঝেছি, তোমাদের কাছে যে গল্প আছে, সেখানেও মাছ আছে। মাছই তোমাদের কাহিনির মুখ্য চরিত্র। সকলে হ্যাঁ সূচক মাথা নেড়ে একে অপরের দিকে অবাক চেয়ে থাকলো।
মাছের মা হেসে বললো, মাছ কেবল মাছের গল্প করবে এই তো স্বাভাবিক, ঈশ্বর বলবে ঈশ্বরের কথা। ঘোড়া কেবল নিজেকেই ভালোবাসে। একথা কেবল মানুষের বেলায় ব্যতিক্রম।
মাছের মা এবার দুহাত ঝেড়ে বললো, তোমরা সকলে ফিরে এসেছো দেখে আমি নিশ্চিন্ত। তোমরা শক্ত-সমর্থ হয়েছো দেখে আমি নির্ভার। আমাকে ফিরতে হবে। সকলে অবাক দৃষ্টিতে মা মাছের দিকে তাকালো। মা মাছ বললো, ঠিক শুনেছো তোমরা। জেনিফার, জামাল ফকির আর মতিলালের মতো অনেকের অপেক্ষা দীর্ঘ হচ্ছে আমার পথ চেয়ে।
এই বলে মাছের মা একদল সন্তানতুল্য মাছের কাছ থেকে বিদায় নিলো। জামিল দেখলো স্বপ্নের ডানায় ভর করে এক পরিবারের আশা ভঙ্গের দায় মাথায় নিয়ে মাছের মা ফরফর করে উড়ে চলেছে। শরীরে আঁশটে গন্ধ মেখে সে চললো হাজারো ঘরে।









