নোবেলজয়ী অ্যান কারসনের ফ্ল্যাশ ফিকশন ‘হারানো ভেড়া’

অনুবাদ : শাহনেওয়াজ শাহিন
০৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৫৮ আপডেট : ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৫৮

শীত ও অন্ধকার ঘেরা পরিবেশ, তার ওপর আমরা বড্ড জলদি পৌঁছেছিলাম। পার্টি জিনিসটা আমি একদম পছন্দ করি না। এপ্রোনের ওপর দুটি হাত জড়ো করে, রান্নাঘরে তোমার দাদি দাঁড়িয়ে ছিলেন, যেন কোনো পৌরাণিক কাহিনির চরিত্র। তুমি বললে, সবার সঙ্গে একটু মিশতে হবে, বলে চলে গেলে। অনেক পরে তুমি ফিরে এলে আমার কাছে; আমি তখন সিঁড়িতে চুপ করে বসে আছি। কী আনন্দেই না ছিলে তুমি সেদিন! একের পর এক বলে যাচ্ছিলে তোমার নতুন সব স্বপ্নের কথা: কনসার্টের মঞ্চের জন্য নিজেকে তৈরি করবে, দুঃসহ সব অডিশনে অংশ নেবে, ঘুরে বেড়াবে দেশ থেকে দেশান্তরে। তোমার কপালে যেন তোমার আত্মাটাই জ্বলজ্বল করছিল। আমার মুখে কোনো কথা ফুটল না। আমি তখন মনে মনে প্রাণপণে ঈশ্বরকে ডাকছিলাম, একটা ঝড় উঠুক, তুমি যেন যেতে না পারো। কিন্তু সে রাতে আকাশ পরিষ্কারই রইল। তুমি বলেই চললে, ওদিকে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করল। আমার একটা গোপন ইচ্ছা ছিল: নিঃশব্দে তোমার দিকে ঝুঁকে পড়ব, যেভাবে মানুষ ঝুঁকে পড়ে গভীর হ্রদের জলে, তারপর তলিয়ে হারিয়ে যাব। কিন্তু ততক্ষণে তুমি উঠে দাঁড়িয়েছ, গা থেকে ধুলো ঝাড়ছ। 

পরদিন, তোমারই পরামর্শ মতো কালো চশমা পরে বাড়ি থেকে বের হলাম, নেমে গেলাম সমুদ্রের ধারে। ‘তুমি ভাবো, একটা সত্যিকারের কবিতাই তোমাকে বাঁচিয়ে দেবে,’ পিকনিকের সেই দিন তুমি আমাকে বলেছিলে। ‘এটা তোমার ভুল ধারণা!’ ছোট্ট ফুটফুটে বাবুই পাখি একটা! মনে মনে ভাবলাম আমি। তারপর হেঁটে নেমে গেলাম সমুদ্রে। সমুদ্রের পানি নক্ষত্রের মতো হাড়কাঁপানো ঠান্ডা ছিল। কী দীর্ঘ একটা সকাল! আমার কবিতাটা আর কোনোদিকেই এগোচ্ছিল না। শেষমেষ একটা বাস ধরে রওনা হলাম গ্র্যান্ড পিয়ানোর নিলাম দেখতে। 

‘কিটস-এর গান গাওয়া ভাল্লুকটার কী যে হলো শেষমেষ?’ নিলামে আলাপ হওয়া কয়েকজন লোক প্রসঙ্গটা তুলেছিল, গানের বিষয়ে কথা হচ্ছিল, হঠাৎ আমার তোমার কথা খুব মনে পড়ে গেল। না, গান গাওয়া ভাল্লুকটা কিটস-এর ছিল না, ওটা ছিল বায়রনের, কথাটা মুখ দিয়ে বলতে চেয়েও শেষমেষ চেপে গেলাম। বেবি গ্র্যান্ড পিয়ানো একেকটা সাত হাজার ডলারে বিক্রি হচ্ছিল। তোমার কথা ভাবলাম, কীভাবে তুমি আমাকে চমকে দিয়েছিলে, তোমার দাঁত দেখে আমি চমকে উঠেছিলাম। নিলামটা যেন শেষ হতেই চাইছিল না। রাত নেমে এলো। তোমাকে ছাড়া আমি একটা পুরোটা দিন অন্তত টিকে রইলাম। আর একা থাকার একটা ভালো দিক এখানে লিখে রাখি—অন্তত বাটাইকে আর সহ্য করতে হচ্ছে না। তুমি সারাক্ষণ এই ধরনের বিদঘুটে জিনিস উদ্ধৃত করতে, ‘এরোস হলো মৃত্যুর শেষ সীমা পর্যন্ত প্রেমে সায় দিয়ে যাওয়া।’ কী ছাইপাঁশ কথাবার্তা! আমার তো মনে হতো, এগুলো কি শুধুই নিজের কর্তৃত্ব বজায় রাখার ফন্দি ছিল না?

তুমি তোমার নিজের কাজ, তোমার ওই সংগীতশাস্ত্রী গবেষণার নিয়ন্ত্রণটাও এক অদ্ভুত উপায়ে হারিয়ে ফেলেছ। নিজের সাথেই নিজের এক অঘোষিত প্রতিযোগিতায়। তুমি বলেছিলে, তোমার বয়স যখন আট বা নয় বছর, তখনকার একটা ছোট নোটবুক তোমার দাদি নাকি হঠাৎ খুঁজে বের করেছিলেন। তার একটা পাতায় কয়েক স্বরের মিউজিক্যাল নোটেশন লেখা ছিল—যেটা কি না পরবর্তী সময়ে সংগীত ও সত্য নিয়ে তোমার গড়ে ওঠা সমস্ত অন্তর্দৃষ্টির মূল উৎস। ওই একটুখানি নোটেশন তোমার ভেতরে এক তীব্র আলোড়ন তৈরি করেছিল। তুমি আর কখনোই সেটাকে ছাড়িয়ে যেতে পারোনি, এমনকি তার সমকক্ষও কিছু করতে পারনি। ঈর্ষায় নিজের জিভ কেটে নেওয়ার মতো অবস্থা হয়েছিল তোমার, শেষমেষ নোটবুকটা সরিয়ে রেখেছিলে। আমার মনে পড়ে তখন বিকেল বা সন্ধ্যা নামছিল, শীত শেষের এক সময়, আর আমরা একটা বন ধরে হেঁটে যাচ্ছিলাম। গলে যাওয়া বরফের জমে থাকা জলে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল গাছগুলো, অন্ধকার আর সোনালি এক আবহে।

প্রথম যেদিন আমাদের দেখা, এক লেকচারের পরের এক পার্টিতে, সার্ত্র সেখানে ছিলেন, কিংবা এমন কেউ, যে নিজেকে সার্ত্র বলে পরিচয় দিচ্ছিল। গায়ে মোটা সোয়েটার। তার ভক্তদের গায়ে পশমি কোট, নয়তো ভেড়ার চামড়ার জ্যাকেট। সেদিন গভীর রাতে, তুমি পুরো এক ঘণ্টা আমার উরু সন্ধিতে মুখ গুঁজে পড়ে রইলে, কিন্তু কাজের কাজটি, যাকে বলে, তা আর করতে পারলে না। ভোর চারটার দিকে আমি হেঁটে হেঁটে বাড়ি ফিরলাম। পুরো শহরটার ওপর যেন একটা শুভ্র রুমাল ফেলে দেওয়া হয়েছে, বরফের কণাগুলো তাতে তারার মতো জ্বলজ্বল করছে। যৌনতার শেষে একা হেঁটে বাড়ি ফেরাটা সবসময়ই ছিল আমার সবচেয়ে প্রিয় অনুভূতি।

এমনও কিছু দিন আসে যখন চারপাশের সবকিছুই দিশাহীন মনে হয়, নিজেকে মনে হয় একটা কোনা ধরে কোনোমতে ঝুলে আছি। মানুষের মেজাজ বা অনুভূতির গুরুত্ব কতটুকু? কোনো এক দার্শনিক, হাইডেগার বলেই মনে হয়, বলেছিলেন, অনুভূতি না থাকলে আমরা টেরই পেতাম না যে বেঁচে আছি। আমার ধারণা, তিনি খারাপ অনুভূতির কথাই বুঝিয়েছিলেন। কারণ মেজাজ ভালো থাকলে নিজের মাথার টুপিটার বাহার কিংবা মোটরসাইকেলের গতির বাইরে খুব বেশি কিছু আমার চোখে পড়ে না। তবে আবার ভেবে দেখলে মনে হয়, তিনি হয়তো দুই অনুভূতির মধ্যবর্তী সীমান্তটার কথা বলছিলেন, এক অনুভূতি থেকে অন্য অনুভূতিতে বদলে যাওয়ার সেই রূপান্তরটা। কারণ সত্যিই তো, অলৌকিক ব্যাপারটা ঘটে ঠিক ওখানেই। ধরা যাক, তুমি একদম কুয়োর তলায় এসে ঠেকেছ আত্মা ফাঁকা, নিঃস্ব, শূন্য, একদম ভেঙে পড়ার মুখে, ঠিক তখনই হঠাৎ করে আবহ বদলে যায়। সবগুলো দরজা খুলে যায়। সমস্ত দুশ্চিন্তা গলে পানি হয়ে যায়। জগৎটা চট করে আবার তার নিজের জায়গায় ফিরে আসে। কীভাবে ঘটে এটা? কার হাতে এর লাগাম? আর আমি কেন প্রতিবার ভেবে বসি যে এই অলৌকিক পরিবর্তনটা জীবনে আর কখনোই ঘটবে না? আহা, আমার ওই হতভাগা মৃত কবিতাটা!

আমার কবিতাটা, প্রসঙ্গত বলি, মোটেল নিয়ে লেখা। প্রায়ই আমার মনে হয়, আমাদের সেরা সময়গুলো মোটেলেই কেটেছিল। মোটেলে কাটানো সেই সেরা সময়গুলো ছিল রাতের অন্ধকারে মোটেলের সুইমিং পুলে সাঁতার কাটার মুহূর্তগুলো। পানির নিচে সেই ফিরোজা রঙের আলো, আমার সবচেয়ে প্রিয় আলো।

রোড ট্রিপগুলোতে রিসোর্ট বা মোটেল আগেই ম্যাপ দেখে ঠিক করে রাখাটা ছিল আমার কাজ। কয়েকবার অবশ্য ভুল হিসাবও করে ফেলেছিলাম। যেমন সেবার যখন আমরা মরুভূমির এক ছোট্ট শহরে গাড়ি চালিয়ে গেলাম আমার এক অভিনেতা বন্ধুর নতুন নাটক দেখতে। থিয়েটারের ঠিক পাশেই আলো জ্বলছিল স্থানীয় একটা মোটেলের, তার অভ্যর্থনাকক্ষে বসেছিল উন্মাদ-চাহনির এক পাকিস্তানি তরুণ, তার হুইলচেয়ার ঘিরে তড়িঘড়ি ছুটে বেড়াচ্ছিল এক নারী যাকে পরে জেনেছিলাম তার খালা বলে। জঘন্য মোটেল, মাছিতে গিজগিজ করা জঘন্য সব ঘর, আর ‘ম্যাজিক মাদ্রিগাল’ নামের এক বাজে নাটক। আমার কাছে অন্তত জাদুকরী কিছু ছিল না সেটা। থিয়েটারটাও এত ছোট যে অভিনেতারা কখন শ্বাস নিচ্ছে, কখন শ্বাস নেওয়ার জন্য বুক ফোলাচ্ছে, সব দেখা যাচ্ছিল। এমনকি একে অপরের দিকে চোখের ইশারা ছুড়ে দেওয়াটাও এড়ায়নি। ব্যাপারটা আমাকে ভীষণ বিব্রত করেছিল—বিব্রতই কি সঠিক শব্দ? তুমি বলেছিলে, ‘দর্শকরাই আসলে চিরকাল অনাহূত, অসময়ের অতিথি।’ আমি উত্তর দিয়েছিলাম, ‘তাহলে কেমন হয়, যদি পৃথিবীর সব অভিনেতারা কেবল একটা ঘরে পায়ে হেঁটে ঢুকবে, আর হেঁটে বের হয়ে যাবে। ব্যস, পর্দা নেমে এলো! নাটকের সেখানেই সমাপ্তি! আর কোনো নাটক থাকবে না।’ তুমি হেসে উঠেছিলে। অথচ আমার মন পড়ে ছিল মোটেলের সেই তরুণটির কাছে হুইলচেয়ারের সমান উঁচুতে রাখা কম্পিউটার আর অতিথিদের কফি মেশিনটুকু সম্বল করে যে একাই শাসন করছিল অভ্যর্থনাকক্ষের ছোট্ট ওই নাট্যমঞ্চ (যার সাথে ফ্রি ব্রেকফাস্টের বরাদ্দও ছিল)। নাটকের নেপথ্যকর্মীর মতো তার খালা প্লাস্টিকের কাঁটা-চামচ আর মার্মালেডের খুদে প্যাকেট হাতে নিঃশব্দে আসা-যাওয়া করছিলেন। দুজনের মুখের ভাঁজ দেখলেই স্পষ্ট বোঝা যেত যে যন্ত্রণা আর জীবনসংগ্রামের অনুভূতি তাদের অজানা নয়। আমি ভেবে পাচ্ছিলাম না, বুয়েনোস আইরেসের কোনো এক অভিজাত দলের ইতালি ও অস্ট্রিয়ার জন্য ব্যাকুল অতীত-স্মৃতির গল্প ‘ম্যাজিক লায়ার’ নাটকটা দেখলে তারা কেমন প্রতিক্রিয়া দেখাত? আমি এই স্মৃতিকাতরতার বিলাসিতাকে বড্ড ঘৃণা করি। হয়তো অভিনয় জিনিসটাই জন্মসূত্রে স্মৃতিকাতর—অন্য কোনো এক দূরবর্তী প্রহরে যে মানবযন্ত্রণা একসময় রক্তমাংসের সত্য ছিল, তাকেই যেন হাহাকার করে ফিরে পাওয়া। গাড়িতে বসে আমি জেন অস্টেনের ‘ম্যানসফিল্ড পার্ক’ পড়ছিলাম; যেখানে একটা নাটকে অভিনয় করা নিয়ে চরম দ্বিধাদ্বন্দ্ব আর মনস্তাত্ত্বিক টানাপড়েন তৈরি হয়। উপন্যাসের সবচেয়ে নীতিভ্রষ্ট বা সন্দেহভাজন দুটি চরিত্র বাড়ির একদল অনভিজ্ঞ তরুণের কাছে এক ‘ঘরোয়া নাটকের’ প্রস্তাব দেয়। বাকিরা দ্বিধায় পড়ে যায়। গল্পের নায়িকা ফ্যানি তো বলেই বসে অভিনয়কে সে তীব্র ঘৃণা করে। দূরদেশ থেকে হঠাৎ বাবার অকালপ্রত্যাবর্তনে কেবল দুটি রিহারসেলেই ভেস্তে যায় পুরো আয়োজন। রিহারসেলের মাঝে হাতেনাতে ধরা পড়ে যাওয়া সেই অভিনয়ে মত্ত অভিনেতারা এমন তীব্র অপরাধবোধে ভুগে যে, সপ্তাহের পর সপ্তাহ বাবার দিকে চোখ তুলে তাকানোর সাহস পর্যন্ত তাদের থাকে না।

অপরাধবোধে বুকটা ভারী করে একদিন আগেই আমরা মোটেল ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিলাম। ছেলেটি কিংবা তার খালা কারোর মুখেই অবশ্য বিস্ময়ের বিন্দুমাত্র ছাপ দেখা গেল না। শুধু বলল, চুক্তিমাফিক পুরো টাকাটাই মেটাতে হবে; আমরাও তা-ই করলাম। তখন সকাল গড়িয়ে প্রায় দুপুর, অথচ রিসেপশনে নিয়ন আলো জ্বলছিল, টানা ছিল জানালার পর্দা, আর একঘেয়ে শব্দে গুনগুন করছিল কম্পিউটারটা। সব অভিনয়ই তো আর কাল্পনিক বা বানিয়ে বলা নয়। আপনি যদি কনে হন, রেস্তোরাঁর প্রধান ওয়েটার হন, কিংবা কোনো শবযাত্রার কফিন বহনকারী হন তবে আপনাকেও তো এক নির্দিষ্ট ভূমিকা পালন করে যেতেই হয়। মানবসত্তার নানা রূপ এভাবেই বারবার ফিরে আসে। বাড়ি ফেরার পথে আমরাও একে অপরকে এসব দর্শনের কথাই বলছিলাম। কিন্তু হঠাৎই আমার মনে পড়ে গেল খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ শতকের বিখ্যাত অভিনেতা পলোসের কথা, খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম শতকের সোফোক্লিসের ‘ইলেক্ট্রা’ নাটকের পুনর্মঞ্চায়নে যিনি নাম কুড়িয়েছিলেন। পলোস সেখানে ইলেক্ট্রার চরিত্রে অভিনয় করছিলেন। নাটকের এক চরম মুহূর্তে ইলেক্ট্রা একটি চিতাভস্মের পাত্র বা ভস্মাধার আঁকড়ে ধরে দাঁড়ায়, তার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, এতে তার নিজের ভাই ওরেস্তেসের ছাই রয়ে গেছে। অথচ আসল সত্য হলো, পাত্রটি ছিল সম্পূর্ণ ফাঁকা ও ভুয়া; আর যে লোকটা কাল্পনিক সেই ভস্মের খবর নিয়ে মিথ্যা আশ্বাস দিতে এসেছিল, সে নিজেই আসলে ওরেস্তেস! নাটকের জটিল বিন্যাসে কীভাবে এসব ছলচাতুরী অর্থবহ হয়ে উঠেছিল, তা জানতে আপনাকে মূল নাটকটিই পড়তে হবে। তবে ছাইহীন (অথবা কল্পিত ছাইয়ে ভরা) ওই ভস্মাধারটি কি পুরো নাট্যকলারই এক অপূর্ব ও সূক্ষ্ম রূপক নয়? এই রূপকের জগতে সব ভস্মাধারই যে বানানো ও মিথ্যে! আর বিলাপ করতে থাকা প্রতিটা ইলেক্ট্রার কান্না হৃদয়বিদারক হলেও কেমন যেন অসার ও অদ্ভুত। অথচ ‘স্পষ্ট বাচনভঙ্গি ও মার্জিত অভিনয়ের’ জন্য খ্যাতি পাওয়া অভিনেতা পলোস (অলুস গেলিয়াসের বর্ণনা অনুযায়ী) অভিনেতাদের এই কৃত্রিম অশ্রু আর বাস্তব যন্ত্রণার ধাঁধায় যেন আরও এক বৈপ্লবিক মোড় এনে দিয়েছিলেন।

কেননা পলোস নিজেও যে সম্প্রতি এক গভীর স্বজন হারানোর বেদনায় ভেঙে পড়েছিলেন। তাই যখন তাকে ইলেক্ট্রার চরিত্রে অভিনয় করার আহ্বান জানানো হলো, তিনি সেই শোকাতুর নারীর পোশাক নিজের গায়ে জড়িয়ে নিলেন। হাতের সেই কৃত্রিম ভস্মাধারের জায়গায় তুলে নিলেন নিজের মৃত পুত্রের ভস্মভরা আসল চিতাভস্মের পাত্রটি। সেদিন মঞ্চে তিনি কোনো বানিয়ে তোলা অভিনয় বা অনুকরণমূলক কষ্ট বিলিয়ে দেননি, দর্শকদের সামনে উজাড় করে দিয়েছিলেন এক পিতার খাঁটি ও অবিকল পুত্রশোক।

সত্য আর মিথ্যার কতগুলো জটিল পরত যে এই একই দৃশ্যে একে অপরের সাথে আংটার মতো আটকে আছে ভাবতেই আমার মাথাব্যথা ধরে যায়। চিতাভস্ম, কিছুটা আসল ও কিছুটা কেবল কল্পনার রঙে আঁকা। অভিনেতারা, কখনো নিছক অভিনয় করে চলেছে, কখনো বা নিজস্ব স্বজন হারানোর খাঁটি বেদনায় বুক ভাসাচ্ছে। বোনের চরিত্রে যে দাঁড়িয়ে আছে, সে আসলে এক পিতা। নারীর ছদ্মবেশে এক রক্তমাংসের পুরুষ। গল্পের ভেতরে থাকা ছলচাতুরীর সাথে বাস্তব জীবনের জুড়ে দেওয়া নতুন সব মিথ্যার ছলাকলা। ভস্মাধার, মঞ্চের সাজসরঞ্জাম, জীবনের নিখুঁত অনুকরণ। প্রেক্ষাগৃহের দর্শকেরা কখনো কিংকর্তব্যবিমূঢ়, কখনো আনন্দে মাতোয়ারা, কখনো নাটকের জালে বোকা বানানো, আবার কখনো বাস্তবের মুখোমুখি হয়ে পুরোপুরি বিভ্রান্ত! তারপর গভীর রাতে, মুখভর্তি মেকআপ না মুছেই থিয়েটার থেকে হেঁটে হেঁটে বাড়ি ফিরছে পলোস আর তার পিঠের ব্যাগে, একটা সামান্য শক্ত কাগজের পাত্রে পরম যত্নে রাখা আছে নিজের সন্তানের প্রকৃত চিতাভস্ম।

সেই ভ্রমণের পর থেকেই অনিদ্রা আমার চিরসঙ্গী হয়ে উঠল। মাঝরাতে প্রায়ই রান্নাঘরের আলো জ্বেলে বসে বসে পড়ি জন কিটসের চিঠিগুলো, আমার মতোই যিনি থিতু হতে না পারা ছটফটে পায়ের এক যন্ত্রণাদায়ক ব্যাধিতে ভুগেছিলেন। মাথার ওপরের ল্যাম্পটাকে ঘিরে গোল হয়ে একটা পোকা একাকী ঘুরেই চলেছে। সময়টা যেন হঠাৎ ফিরে গেছে ১৮১৯ সালে, ফ্যানির কাছে লেখা কিটসের সেই মাতাল করা অস্থির সব চিঠির দিনে, যেখানে প্রেমিকা ফ্যানি ব্রনকে তিনি কখনো আবেশে বুকে টেনে নিচ্ছেন, পরক্ষণেই আবার ভয়ে-বিতৃষ্ণায় ঠেলে দিচ্ছেন দূরে। কিটসের সকাতর অকপট স্বীকারোক্তি, মেয়েটি নাকি তাকে নিজের অস্তিত্বে একেবারে ‘গ্রাস’ করে নিয়েছে।

ফ্যানিকে সে লেখে তার তৃষ্ণা নাকি আজও ‘হরিণের মতো স্বাধীন-মুক্ত’ থাকার। নিজের শেষ বিলাসী স্বপ্ন হিসেবে সে ফ্যানিকে দাঁড় করায় মৃত্যুর মুখোমুখি। কিন্তু অন্তরে সে আসলে কী অনুভব করে? ভালোবাসা পেতে চাওয়ার তীব্র আকুলতা তার ছিল, তাতে সন্দেহ নেই। সন্দেহ নেই এই চিঠিগুলোর প্রতিটি শব্দ গাঁথতেও সে দারুণ আনন্দ পেত—এক নিঃসঙ্গ ভাড়াটে ঘরে একা বসে, যেখানে সে নিজেকে বাধ্য করেছিল কেবল লিখে যেতে। সে লিখেও গেছে, চরম একাগ্রতায়, প্রতিদিন নিবিষ্ট মনে, কিন্তু তবু সেই রাতগুলো, রাতের প্রহরগুলো যে থেকে যায় নির্জনতায় স্থির হয়ে। প্রেমে পড়লে আমরা সবাই কি অল্পবিস্তর ছলনার আশ্রয় নিই না? একপাশে যদি থাকে কোনো ছদ্মবেশহীন খাঁটি অনুভূতির অলৌকিক প্রকাশ, তবে অন্যপাশে তো দড়িতে শুকোতে দেওয়া অভিনয়ের সেই সব নাটকের পোশাক ছাড়া আর কিছুই থাকে না।

কিটসের আকাঙ্ক্ষা ও খিদে ছিল বহুমুখী, সর্বগ্রাসী। চিকিৎসকেরা রক্ত কমাবার জন্য তাকে প্রায় না খাইয়ে রাখার মতো খাদ্যতালিকায় আটকে রেখেছিল সে তো একটা দিক। কিন্তু এর পাশাপাশি সে চেয়েছিল নির্ভেজাল সত্য ভালোবাসা। বই প্রকাশের পর দুটো মাত্র পর্যালোচনার চেয়ে অনেক বেশি কিছু সে দাবি করত। চেয়েছিল বইয়ের বিক্রি, নিজস্ব উপার্জন ও মানুষের অন্ধ আরাধনা বায়রন যা যা পেয়েছিল, তার সবটুকুই সে এক নিঃশ্বাসে চেয়েছিল! এই অতৃপ্তি তার মনকে দিনদিন অন্ধকার করে তুলছিল। আমার মনে পড়ে, অনিদ্রা যখন প্রথম আমাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল, আমি চারপাশের মানুষের কাছে নিরাময় খুঁজে বেড়াতাম। ‘তুমি ভেড়া গুনতে পারো,’ এক বন্ধু আমাকে পরামর্শ দিয়েছিল, ‘তবে সজ্ঞানে বা জোর করে হিসাব কষে নয়, চোখ বন্ধ করে অবয়ব কল্পনা করে গুনে যাও।’ (সে একজন বৌদ্ধ) তারপর আরও বলেছিল, ‘আর শোনো, যে ভেড়াগুলো হারিয়ে গেছে, সেগুলোকে গোনার পেছনে শুধু শুধু সময় নষ্ট করার দরকার নেই।’ তখনকার মতো কথাটাকে নিছক ঠাট্টা বলে উড়িয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু সত্যিই তো, সারারাত জেগে এই হারিয়ে যাওয়া ভেড়াগুলোকে গোনা ছাড়া কিটস-ই বা আর কী করছিল? কেননা, মানুষের কিছু কান্না থাকে যা কেবল চোখের নয় পুরো শরীর দিয়ে তা রক্তক্ষরণের মতো ঝরে পড়ে। জীবন তো বড্ড বিশৃঙ্খলাপূর্ণ, অদ্ভুত আর এলোমেলো। আমি আজও জেনে উঠতে পারলাম না যে ঠিক কোনগুলো আসলে হারিয়ে গেছে, কোনগুলো অধরা রয়ে গেল। জীবন যেন এক যন্ত্রণার ঘড়ি, যার প্রতিটা টিক্ আর প্রতিটা টকে কেবল বিষাদ ও হাহাকারের ধ্বনি বাজে। এভাবেই আমরা সামনে এগিয়ে চলি, এভাবেই নিঃশব্দে আমাদের পথ চলা শেষ হয়ে গিয়েছিল।

/জেড-এস/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
ইরানে ফের যুদ্ধ শুরুর প্রস্তুতি, তিন দিনের হামলার ছক যুক্তরাষ্ট্রের
ইরানে ফের যুদ্ধ শুরুর প্রস্তুতি, তিন দিনের হামলার ছক যুক্তরাষ্ট্রের
স্বজন পরিচয়ে সখ্য, এরপর মায়ের কোল থেকে নবজাতক চুরি
স্বজন পরিচয়ে সখ্য, এরপর মায়ের কোল থেকে নবজাতক চুরি
বান্দরবানের নতুন ডিসি নাজনীন সুলতানা
বান্দরবানের নতুন ডিসি নাজনীন সুলতানা
রহস্যময় দুর্গ থেকে জলপ্রপাত, প্রকৃতির নৈসর্গিক সৌন্দর্যে ভরা সিমডেগা
রহস্যময় দুর্গ থেকে জলপ্রপাত, প্রকৃতির নৈসর্গিক সৌন্দর্যে ভরা সিমডেগা
সর্বাধিক পঠিত
রংপুরে চার খুন: খেজুর-শসা-সিগারেট কারা খেয়েছিল নিশ্চিত করলো সিআইডি
রংপুরে চার খুন: খেজুর-শসা-সিগারেট কারা খেয়েছিল নিশ্চিত করলো সিআইডি
মন্ত্রী বললেন বাবা শোনো, বিক্ষোভকারী বললেন ‘এখানে দেশ বিক্রি হচ্ছে, ঢুকতে দেবো না’
মন্ত্রী বললেন বাবা শোনো, বিক্ষোভকারী বললেন ‘এখানে দেশ বিক্রি হচ্ছে, ঢুকতে দেবো না’
ফ্যামিলি কার্ডের জন্য টিপসই দিয়ে বিধবা জানলেন ‘বিয়ে হয়ে গেছে’
ফ্যামিলি কার্ডের জন্য টিপসই দিয়ে বিধবা জানলেন ‘বিয়ে হয়ে গেছে’
বিমানবন্দরে আটকে দেওয়া হলো বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সেই মাহদীকে
বিমানবন্দরে আটকে দেওয়া হলো বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সেই মাহদীকে
রাতে হঠাৎ অসুস্থ, হাসপাতালে নেওয়ার পর মারা গেলেন থানার ওসি
রাতে হঠাৎ অসুস্থ, হাসপাতালে নেওয়ার পর মারা গেলেন থানার ওসি