জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ড্রাইভার নিয়োগ, বরাদ্দপ্রাপ্ত বাসা সংস্কার এবং গাড়ি ব্যবহারে মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক আলী আজম তালুকদারের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। তিনি একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ সালাম-বরকত হলের প্রাধ্যক্ষ এবং পরিবহণ অফিসের ভারপ্রাপ্ত শিক্ষক।
উপাচার্যের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত এই অধ্যাপকের বিরুদ্ধে অভিযোগ, স্থায়ী পদে নিয়োগের প্রক্রিয়া সম্পন্ন না করেই তিনি মাস্টাররোলে (অস্থায়ী ভিত্তিতে) দুইজন ড্রাইভার নিয়োগ দিয়েছেন। একই প্রক্রিয়ায় আরেকজনের নিয়োগ অনুমোদনের সর্বশেষ পর্যায়ে রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বলছেন, পছন্দের ব্যক্তিকে নিয়োগ দিতেই মাস্টাররোল প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়ে থাকে। এছাড়া আলী আজম তালুকদার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত নিয়ম ভেঙে প্রায় ১৯ লক্ষ টাকা ব্যয়ে প্রাধ্যক্ষের জন্য বরাদ্দপ্রাপ্ত বাসাটি সংস্কার করেছেন। ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ব্যবহার করছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গাড়ি।
এর আগে ২০১৬ সালে বিভাগীয় সভাপতি থাকাকালে ব্যয়ের খাত না দেখিয়েই ছাত্রকল্যাণ তহবিল থেকে পাঁচ লাখ টাকা উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে আলী আজম তালুকদারের বিরুদ্ধে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম আলী আজম তালুকদারকে দুটি পদে বসিয়েছেন। আরও কয়েকজন শিক্ষক এককভাবে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদের চেয়ার পেয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির নির্বাচনে উপাচার্য সমর্থিত আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের প্যানেলের ভরাডুবির পেছনে এর প্রভাব রয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত বছরের ১৭মে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আলী আজম তালুকদারকে পরিবহণ অফিসের ভারপ্রাপ্ত শিক্ষকের দায়িত্ব দেয়। জুনে বেশ কয়েকটি নতুন গাড়ি ক্রয় করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। যেগুলোর জন্য স্থায়ী ভিত্তিতে ছয়জন ড্রাইভার নিয়োগে দুটি বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। এতে আবেদন করা প্রার্থীদের নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন না করেই মাস্টাররোলে দুইজনকে নিয়োগ দেন আলী আজম তালুকদার। আরেকজনের নিয়োগ ফাইল চালাচালির সর্বশেষ পর্যায়ে আছে বলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক জানিয়েছেন, মাস্টাররোলে নিয়োগ দেওয়ার নিয়ম থাকলেও পছন্দের প্রার্থীকে সুযোগ করে দিতে এই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়। এজন্য নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির প্রয়োজন হয় না। আগে-পরে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নিয়োগ স্থায়ী করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে মাস্টাররোলের নিয়োগে নিরুৎসাহিত করে আসছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি)।
এদিকে রেওয়াজ ভেঙ্গে সদ্য নিয়োগপ্রাপ্তদের নতুন গাড়ির ড্রাইভিং সিটে বসানোয় পুরনো ড্রাইভারদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত বছরের ১১ এপ্রিল শহীদ সালাম-বরকত হলের প্রাধ্যক্ষের দায়িত্ব পান আলী আজম তালুকদার। প্রাধ্যক্ষ হিসেবে তাকে একটি ডুপ্লেক্স বাসা (এ-২০ টাইপ) বরাদ্দ দেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত নিয়ম না মেনে তিনি বাসাটি সংস্কারে হাত দেন। এরজন্য ব্যয় ধরা হয় ১৮ লক্ষ ৯০ হাজার ৪ টাকা। এই অংককেও ‘অস্বাভাবিক’বলছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত নিয়মানুযায়ী, বাসা সংস্কার করতে হলে প্রথমে প্রকৌশল বিভাগকে অবহিত করতে হয়। প্রকৌশল বিভাগ প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই শেষে পরিকল্পনা ও উন্নয়ন অফিসে ব্যয়ের হিসাব পাঠায়। পরে কম্পট্রোলার অফিস হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ হয়। এ প্রক্রিয়ার মধ্যেই প্রকৌশল বিভাগের তত্ত্ববধানে সংস্কার কাজ চলতে থাকে।
কিন্তু আলী আজম তালুকদারের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি এ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে না গিয়ে সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত তত্ত্বাবধানে সংস্কার কাজ করেছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) আবদুস সালাম মো. শরীফ বলেন, ‘বাসাটির সংস্কার কাজ সম্পর্কে আমরা কিছু জানি না।’
অভিযোগ রয়েছে, পরিবহণ অফিসে ভারপ্রাপ্ত শিক্ষকের দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে তিনি ঢাকা মেট্রো গ- ৩১-০০৫৫ নম্বরের গাড়িটি সার্বক্ষণিক ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ব্যবহার করে আসছেন।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনসূত্র জানায়, গত জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত জ্বালানি ও সার্ভিসিং বাবদ এই গাড়িটির পেছনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যয় হয়েছে ৭৬ হাজার ৭১৮ টাকা।
নিয়মানুযায়ী; বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, দুজন উপ-উপাচার্য, কোষাধ্যক্ষ এবং রেজিস্ট্রার ছাড়া অন্য কেউ ব্যক্তিগত প্রয়োজনে গাড়ির জ্বালানি খরচ পান না। কিন্তু আলী আজম তালুকদারের ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ব্যবহৃত গাড়ির খরচ বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাগার থেকে পরিশোধ করা হচ্ছে।
পরিবহণ অফিস সূত্র জানায়, ঢাকা মেট্রো চ-৫৬-৩৩১৫ নম্বরের অপর একটি গাড়ি পুলে যুক্ত না করেই গ্যারেজে ফেলে রাখা হয়েছে। মাঝেমাঝে এই গাড়িটিও ব্যবহার করেন আলী আজম তালুকদার। এর আগে চ-৫৬-৩৩১৬ নম্বরের আরেকটি গাড়ি ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ব্যবহার করলেও সম্প্রতি তা পুলে যুক্ত করা হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত ১৬ এপ্রিল সকালে রাজধানীর শ্যামলী থেকে ক্যাম্পাসগামী শিক্ষকদের বাস ধরতে না পেরে মাইক্রোবাস ভাড়া করে ক্যাম্পাসে যান আলী আজম তালুকদার। পরে নিয়মবহির্র্ভূতভাবে পরিবহন অফিস থেকে ২ হাজার ৬০০ টাকা পরিশোধ করেন।
পরিবহণ সংক্রান্ত সমস্যায় শিক্ষকদের অসহযোগিতার অভিযোগও রয়েছে আলী আজম তালুকদারের বিরুদ্ধে।
অনিয়মের এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে আলী আজম তালুকদারকে দুইবার ফোন করে সরাসরি সাক্ষাৎ করতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ঠাণ্ডা মাথায় সোমবার কথা বলতে চাই।’
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে থাকা একাধিক শিক্ষক জানিয়েছেন, আলী আজম তালুকদারের নিয়মবহির্ভূত কর্মকাণ্ডে তারা বিব্রত। উপাচার্যকে একাধিকবার জানানো হলেও কার্যত কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম অসুস্থ থাকায় তার মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মো. আমির হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি পরিবহণ এবং চিকিৎসা কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকলেও নিয়োগসহ কোনও ব্যাপারে আমাকে অবহিত করা হয় না। ব্যক্তিগত প্রয়োজনে কারও জন্য সার্বক্ষণিক গাড়ি বরাদ্দের নিয়ম নেই। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো সংস্কারের দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয়েরই। ব্যক্তিগতভাবে কেউ তা করতে পারেন না।’








