বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে শীর্ষ স্থান দখল করে ক্রমাগত নানা শিরোপা অর্জন করলেও দেশের অন্যতম বিদ্যাপীঠ সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে অবকাঠামোর সংকটে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্রতিনিয়িত দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। তবে প্রতিষ্ঠার তিন দশক পর এবার সেই দুর্ভোগ লাঘবে দৃষ্টি দিয়েছে সরকার। প্রায় ১২’শ কোটি টাকার দুটি প্রকল্প পেয়ে অনেকটা স্বস্তিতে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। এ দুটি প্রকল্পে নতুন করে ২৪টি ভবন নির্মিত হলে অনেকটাই পাল্টে যাবে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের চিত্র। দূর হবে ক্লাসরুম, ল্যাব ও আবাসনের সংকট।
বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ ২০১৭ সালের ২১ আগস্ট উপাচার্য হিসেবে যোগদানের পর থেকে বিশ্বদ্যিালয়ে একাডেমিক শৃঙ্খলা বিধানের পাশাপাশি বিশেষভাবে অবকাঠামোগত উন্নয়নে উদ্যোগ নেন। তার প্রচেষ্টায় ২০১৯ সালের ৯ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকতর উন্নয়নের জন্য ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রপোজাল (ডিপিপি) এর আওতায় ১৮টি ভবনের জন্য ৯৮৭ কোটি ৭৯ লক্ষ টাকার একটি প্রকল্প জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) অনুমোদন দিয়েছে।
এর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদায়ী উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আমিনুল হক ভূঁইয়ার সময়ে ‘অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্প’ নামে সাড়ে ৩ বছর মেয়াদী ২শ কোটি ৩৮ লক্ষ টাকার আরেকটি প্রকল্প একনেক থেকে অনুমোদিত হয়েছিল।
কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠের গ্যালারির একাংশ ছাড়া এ প্রকল্পের আওতার অন্য কোনও নির্মাণ কাজের বাস্তবায়ন করতে পারেননি উপাচার্য আমিনুল হক ভূঁইয়া। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শুরু করতে না পারায় প্রকল্প বাতিল হওয়ারও শঙ্কায় পড়ে। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ যোগদানের পর এ প্রকল্প আলোর মুখ দেখে। বর্তমানে সেই প্রকল্পের অধীনে সীমানা প্রাচীর নির্মাণের পাশাপাশি ৭টি ভবন নির্মাণাধীন রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ হাবিবুর রহমান বলেন, ২’শ কোটি ৩৮ লক্ষ টাকার প্রকল্পের মধ্যে ৬ কিলোমিটার এলাকা ঘিরে সীমানা প্রাচীরের প্রায় ৫ কিলোমিটারের কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। এছাড়া ৫০০ আসন বিশিষ্ট ছাত্রদের জন্য চার তলা বিশিষ্ট সৈয়দ মুজতবা আলী হল বর্ধিতকরণ, ৪ তলা বিশিষ্ট সামাজিক বিজ্ঞান ভবন বর্ধিতকরণ, ৫০০ আসন বিশিষ্ট ছাত্রীদের জন্য চার তলাবিশিষ্ট বেগম ফজিলতুন্নেসা মুজিব ছাত্রী হল নির্মাণ, ৫ তলা বিশিষ্ট সেন্টার অব এক্সিলেন্স ভবন নির্মান কাজ শুরু হয়েছে।
এছাড়া এম এ ওয়াজেদ মিয়া আইআইসিটি ভবনের ৫ তলা থেকে ১০ তলায় বর্ধিতকরণের জন্য দরপত্র (টেন্ডার) ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। এছাড়া শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের জন্য ৪ তলা বিশিষ্ট আবাসিক ভবন নির্মাণ ও সিভিল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের জন্য ২ তলা বিশিষ্ট ওয়ার্কশপের দরপত্র প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
৯৮৭ কোটি ৭৯ লক্ষ টাকার প্রকল্পের আওতায় ১৮টি ভবন নির্মাণের কথা রয়েছে। এর মধ্যে ১০ তলা বিশিষ্ট ১টি ছাত্র হল, ১০ তলা বিশিষ্ট ১টি ছাত্রী হল, গ্র্যাজুয়েট ও বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য ৭ তলা বিশিষ্ট ১টি হোস্টেল নির্মাণ, সিনিয়র শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের জন্য ১১ তলা বিশিষ্ট ২টি ভবন নির্মাণ, জুনিয়র শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের জন্য ১১ তলা বিশিষ্ট ২টি আবাসিক ভবন নির্মাণ, কর্মচারীদের জন্য ১০ তলা বিশিষ্ট আবাসিক ভবন নির্মাণ করা হবে।
এছাড়া এই প্রকল্পের অধীনে ১০ তলা বিশিষ্ট ১টি প্রশাসনিক ভবন নির্মাণ, ২ তলা বিশিষ্ট কেন্দ্রীয় ওয়ার্কশপ নির্মাণ, শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় স্কুল ও কলেজের জন্য ৬ তলা বিশিষ্ট ভবন নির্মাণ, ৩ তলা বিশিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাব নির্মাণ, ছাত্রদের আবাসিক এলাকায় ৪ তলা বিশিষ্ট মসজিদ নির্মাণ এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য সাব স্টেশন নির্মাণ, অ্যাপ্লায়েড সায়েন্সেস অ্যান্ড টেকনোলজি অনুষদের জন্য ১০ তলা বিশিষ্ট ২টি শিক্ষা ভবন, ফিজিক্যাল সায়েন্সেস অনুষদ ও এগ্রিকালচারাল অ্যান্ড মিনারেল সায়েন্সেস অনুষদের জন্য ১০ তলা বিশিষ্ট ১টি শিক্ষা ভবন, ব্যবস্থাপনা ও ব্যবসায় প্রশাসন, বাংলা ও ইংরেজি ও আধুনিক ভাষা ইনস্টিউটের জন্য ১০ তলা বিশিষ্ট ১টি শিক্ষা ভবন নির্মাণ করা হবে।
‘কয়েকটি ছোট ছোট আলাদা প্রকল্পের কাজ চলছে’ উল্লেখ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রধান প্রকৌশলী বলেন, ঢাকা মগবাজারের ওয়ারলেস গেটের কাছে ৬ হাজার বর্গফুটের একটি গেস্ট হাউজ ক্রয় করা হয়েছে। ১ কোটি ১০ লক্ষ টাকা ব্যয়ে করোনা টেস্ট ল্যাব স্থাপন, বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রবিন্দু গোলচত্বর নান্দনিকভাবে সংস্কার এবং বিভিন্ন স্থানে আকর্ষণীয় ডিজাইনে সিটিং বেঞ্চ স্থাপন করা হয়েছে। শিক্ষাভবন ই ও সি তে ১ কেটি টাকা ব্যায়ে ২টি লিফট স্থাপন ও এক কিলোতে ২টি যাত্রী ছাউনী নির্মাণ কাজ, ১ কোটি টাকা ব্যয়ে সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়ক সংলগ্ন আধুনিক মানের মূল গেইট নিমার্ণের কাজ প্রক্রিয়াদিন বলে জানান হাবিবুর রহমান।
দুই প্রকল্পের অধীনে নির্মাণাধীন ও নির্মেয় ভবনগুলোর কাজ শেষ হলে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থান সংকট অনেকটা লাঘব হবে বলে মনে করছেন শিক্ষক শিক্ষার্থীরা। এতে শিক্ষা-গবেষণায়ও তারা আরও জোরালো ভূমিকা রাখতে পারবেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষকের সাথে এ বিষয়ে কথা বলে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ে অবকাঠামোগত বেশ সংকট রয়েছে। অধিকাংশ বিভাগগুলোর পর্যাপ্ত ক্লাসরুম ও ল্যাব নেই। এক ল্যাবেই বিভিন্ন কাজ চালাতে হয়। আবার শিক্ষকদের বসার জন্যও পর্যাপ্ত জায়গা নেই, একরুমে ২/৩ জন শিক্ষক বসেন। আর আবাসন সমস্যাতো অনেক দিনের। হাতেগোনা কয়েকজন সিনিয়র শিক্ষকের জন্য আবাসন ব্যবস্থা আছে। তবে বর্তমান উপাচার্য যোগদানের পর থেকে এ সমস্যাগুলো সমাধানে কাজ করছেন। ১২’শ কোটি টাকার এ প্রকল্পগুলো শেষ হলে অধিকাংশ সমস্যারই সমাধান হবে বলে প্রত্যাশা করেন শিক্ষকরা।
একাধিক শিক্ষার্থী এ বিষয়ে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন বিভাগের ক্লাসরুম ও গবেষণা ল্যাবের বিরাট সংকট রয়েছে। কোনও কোনও বিভাগতো ২/৩ টা ক্লাসরুম দিয়ে ক্লাস চালাচ্ছে। আবার আবাসিক হলেও পর্যাপ্ত থাকার জায়গা নেই। শিক্ষার্থীদের প্রায় ৭৫ শতাংশই বাইরে মেসে থাকে। তবে দুই প্রকল্পের অধীনে এসব কাজ শেষ হলে অনেকাংশে এসমব সমস্যার সমাধান হবে।
বর্তমানে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে ৭টি অনুষদের অধীনে ২৭ টি বিভাগ ও ২টি ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীদের জন্য ৬টি শিক্ষা ভবন, ৫টি আবাসিক হল রয়েছে। এছাড়া ২টি প্রশাসনিক ভবন, উপাচার্য বাসভবন, কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার ভবন, কয়েকটি বিভাগের গবেষণা ওয়ার্কশপ, বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাব, ইউনিভার্সিটি সেন্টার (ইউসি), মেডিক্যাল সেন্টার, শারীরিক শিক্ষা ভবন, শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের জন্য দুটি করে ডরমেটরি ও দুটি গেস্ট হাউজ রয়েছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য।
এমনকি সর্বশেষ ২০১১ সালের জুলাই মাসে তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. সালেহ উদ্দিনের সময়ে এম এ ওয়াজেদ মিয়ার নামে ৫ তলা বিশিষ্ট তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইআইসিটি) ভবন নির্মাণের পর আর কোনও উল্লেখযোগ্য অবকাঠামো উন্নয়ন হয়নি।
৯৮৭ কোটি টাকার আওতায় থাকা ১৮টি প্রকল্পের কাজ কবে শুরু হবে এমন প্রশ্নে জবাবে প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ হাবিবুর রহমান বলেন, ডিপিপি এর আওতায় যে প্রকল্পগুলো রয়েছে আমরা সেগুলো নিয়ে কাজ করছি। ইতোমধ্যে এ বিষয়ে আমরা পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে কথা বলেছি। তাদের অনুমতির একটা বিষয় আছে। তারাও এটা নিয়ে কাজ করছে। আশা করি খুব শীঘ্রই আমরা এ প্রকল্পগুলোর কাজ শুরু করতে পারবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত পরিবর্তন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ বলেন, আমি বিশ্ববিদ্যারয়ে যোগদানের পর থেকে দেখেছি যে, আমাদের ক্লাসরুমের বিরাট সংকট রয়েছে। শিক্ষকদের বসার জায়গা নেই। শিক্ষার্থীরা অধিকাংশই বাইরে মেসে থাকে। সব মিলেয়ে অবকাঠামোগত দিক দিয়ে বিরাট সংকট ছিল। আমরা এর আলোকে বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নিয়েছি। সরকার আমাদেরকে আর্থিকভাবে সাপোর্ট দিচ্ছে।
উপাচার্য আরও বলেন, আমাদের ১২’শ কোটি টাকার যে প্রকল্প রয়েছে তা বাস্তবায়ন হলে চলমান সমস্যা অনেকটা কমে যাবে। তবে আমাদের এগুলোর গুণগত মান নিশ্চিতে কাজ করতে হবে। আমরা এজন্য প্রত্যেক প্রকল্পে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক, কর্মকর্তা ও ইঞ্জিনিয়ারদের নিয়ে একটি কমিটি করে দিয়েছি। তারা নিয়মিত তদারকি করে গুণগত মান নিশ্চিত করে ভবনগুলোর। এজন্য সকলের সহযোগিতা কামনা করেন উপাচার্য।








