রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি পরীক্ষা শুরু হচ্ছে সোমবার (৪ অক্টোবর)। এবার রাবির তিনটি ইউনিটে এক লাখ ২৮ হাজার ভর্তিচ্ছু পরীক্ষায় অংশ নেবেন। ভর্তি পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে একাধিক জালিয়াতি চক্র সক্রিয় হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বলছে, জালিয়াতি রোধে তৎপর রয়েছে তারা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে জালিয়াতি চক্রের বেশ কয়েকটি সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়ে উঠেছে। এসব সিন্ডিকেটের মধ্যে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের সদস্য ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীও রয়েছেন। চক্রের সদস্যরা প্রক্সি ও ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার করে অসদুপায়ে ভর্তিচ্ছুদের পরীক্ষায় চান্স পাইয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করে।
জানা গেছে, ২০১৮ সালে ভর্তি পরীক্ষার আগ মুহূর্তে এক ছাত্রলীগ নেতার ফোনালাপ ফাঁস হয়। যেখানে ভর্তিচ্ছুকে টাকার বিনিময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার নিশ্চয়তা দেন ওই ছাত্রলীগ নেতা। তাদের মধ্যে আড়াই লাখ টাকার চুক্তি হয়।
এর আগে ২০১৪ সালের ভর্তি পরীক্ষার সময় ঢাকা থেকে একটি গ্রুপ পরীক্ষায় জালিয়াতির উদ্দেশ্যে মাইক্রোবাসে রাজশাহীতে আসে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে বিষয়টি জানতে পেরে তৎক্ষণাৎ ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে তাদের অবস্থান নিশ্চিত হয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এরপর তাদেরকে ওই গাড়িতেই রাজশাহী থেকে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
সেই সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টরের দায়িত্বে ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সোলাইমান চৌধুরী।
এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা প্রায়ই শুনি পরীক্ষা অসদুপায় অবলম্বনের জন্য রাজশাহীর বাইরে থেকে এই চক্রকে আনা হয়। প্রশাসনের দায়িত্বে থাকার কারণে বিষয়গুলো খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে। এই চক্র দিন দিন আরও শক্তিশালী হচ্ছে। তাই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সর্তক থাকা জরুরি।’
দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটলেও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বিগত কয়েক দশকে এমন অভিযোগ পাওয়া যায়নি। তবে এখানে ভর্তি জালিয়াতির অন্যতম প্রক্রিয়া হচ্ছে ‘প্রক্সি’। ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীর কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে তার জায়গায় বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা দিতে পাঠানো হয়। এক্ষেত্রে বিশেষ অ্যাপের মাধ্যমে পরীক্ষার প্রবেশপত্রের ছবি পরিবর্তন করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জালিয়াতি চক্রের সদস্যদের কাছে ‘এক্সপার্ট’ হিসেবে পরিচিত।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাবিতে প্রক্সি দিতে আসা এক্সাপার্টদের অধিকাংশই ঢাকা থেকে আসেন। এ ছাড়া কিছু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীও রয়েছেন। পরীক্ষাপ্রতি একজন এক্সপার্ট পান এক থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত।
এদিকে আসন্ন ভর্তি পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে ভর্তি জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে—এমন অন্তত দেড় ডজন নেতাকর্মী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীর ওপর নজরদারি করছে আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যরা।
আইন শৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, দেড় ডজন এই নেতকর্মীর মধ্যে ছাত্রলীগের সুপার কমিটির সদস্য থেকে শুরু করে যুগ্ম-সম্পাদক, সাংগঠনিক সম্পাদক, সহ-সম্পাদক ও ছাত্রলীগ কর্মী রয়েছে।
নাম প্রকাশ না করা শর্তে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এক সদস্য বলেন, ভর্তি জালিয়াতির সাথে সক্রিয় থাকতে পারে এমন একাধিক ব্যক্তির ওপর আমাদের নজরদারি রয়েছে। যে তালিকায় ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও রয়েছে।
ভর্তি পরীক্ষায় জালিয়াতি ঠেকাতে রাবি ক্যাম্পাসে চার স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা করা হয়েছে। মোতায়ন করা হয়েছে অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য। ক্যাম্পাস ঘুরে তাদের বেশ তৎপরতা দেখা গেছে।
রবিবার (৩ অক্টোবর) সকালে রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশ লাইনস মাঠে এক ব্রিফিং প্যারেডের আয়োজন করা হয়। পুলিশ কমিশনার মো. আবু কালাম সিদ্দিক এতে সভাপতিত্ব করেন। এ সময় ভর্তি পরীক্ষা ঘিরে দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ সদস্যদের উদ্দেশে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দেন তিনি।
আবু কালাম বলেন, ভদ্রতা ও শালীনতা বজায় রেখে আগত ভর্তিচ্ছুদের ব্যাগ ও দেহ তল্লাশি করতে হবে। সর্বোচ্চ পেশাদারি বজায় রেখে অত্যন্ত ধৈর্য্য ও সহিষ্ণুতা এবং দৃঢ়তার সঙ্গে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করার জন্য পুলিশ সদস্যদের তিনি আহ্বান জানান প্রতি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক সুলতান-উল-ইসলাম বলেন, জালিয়াতি ঠেকাতে গত কয়েক বছরের মতো এ বছরও প্রস্তুতি রয়েছে। আমরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছি। সবকিছু এখনও আমাদের নিয়ন্ত্রণে আছে।









