দীর্ঘ প্রায় পাঁচ বছর পর সাবেক শিক্ষার্থী ও গ্র্যাজুয়েটদের জন্য সমাবর্তনের আয়োজন করে বেসরকারি ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি (ডিআইইউ)। দীর্ঘসময় পর কাঙ্ক্ষিত এ সমাবর্তনে শিক্ষার্থীদের চাওয়া পূরণ হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। কেবল সার্টিফিকেট ও সনদ বিতরণ করে দায়সারা কাজ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এমনকি সমাবর্তনে শিক্ষার্থীদের বাবা-মায়ের অংশগ্রহণের কোনও সুযোগ ছিল না, এ নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে বিতর্ক।
বুধবার (৬ এপ্রিল) রাজধানীর মিরপুরের পিএসসি কনভেনশন হলে এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয় ডিআইইউর সমাবর্তন। বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর ও রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের পক্ষে প্রধান অতিথি হিসেবে ভার্চ্যুয়ালি উপস্থিত ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি। সমাবর্তন বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইউজিসির সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক আব্দুল মান্নান।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. সাইফুল ইসলাম, ইউজিসি সদস্য দফতর-১ এর সদস্য অধ্যাপক ড. দিল আফরোজা বেগম। ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান ও সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী ও উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. গণেশ চন্দ্র সাহা।
তবে সমাবর্তন অনুষ্ঠানে নানা সমস্যা নিয়ে ক্ষোভ জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। তারা বলেন, এটি এমন একটি সমাবর্তন ছিল যেখানে কর্তৃপক্ষ প্রতিশ্রুত কোনও সুবিধা পূরণ করেনি। সমাবর্তনে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনির সশরীরে উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও তিনি শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে উপস্থিত থাকতে পারেননি। গ্র্যাজুয়েট শিক্ষার্থীরা মনে করেন এ দায় অবশ্যই ডিআইইউ প্রশাসনের।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিআইইউর সিএসই বিভাগের এক গ্র্যাজুয়েট শিক্ষার্থী বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ হুট করে মার্চের ১৩ তারিখে নোটিশ দিয়ে জানায় ১৮ মার্চের মধ্যে সমাবর্তনের আট হাজার টাকা জমা দিতে হবে। অনেক কষ্ট করে হলেও টাকা জমা দিয়েছি। কিন্তু সমাবর্তন অনুষ্ঠানে আমার অভিভাবককে নিয়ে যেতে পারিনি। খাবার থেকে শুরু করে সমাবর্তনের গাউন পর্যন্ত নিম্নমানের দেওয়া হয়েছে। আর গিফট হিসেবে একটা নিম্নমানের ব্যাগ ও একটি মগ দিয়ে দায়সারা কাজ করেছে কর্তৃপক্ষ।’
ইংরেজি বিভাগের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক শিক্ষার্থী ও বর্তমানে স্নাতকোত্তর পড়ুয়া শিক্ষার্থী বলেন, ‘সমাবর্তন রমজান মাস বাদ দিয়ে বছরের অন্য সময়ে করার কথা থাকলে হুটহাট করে আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। আর নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে বাবা-মা নিয়ে যাওয়ার অনুমতি পাবো না এটা কখনই কল্পনা করিনি। জাঁকজমকপূর্ণ সমাবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রতিটি শিক্ষার্থীর কাছ থেকে আট হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে। কিন্তু সেগুলোর ৯০ ভাগও শিক্ষার্থীদের জন্য খরচ হয়নি বলে অভিযোগ করেন শিক্ষার্থী। আবার রমজানের দিনে সমাবর্তন অনুষ্ঠান আয়োজন করে বিকাল ৫টা পর্যন্ত অনুষ্ঠান পরিচালনা করার পরও কোনও শিক্ষার্থীর ইফতারের ব্যবস্থা করা হয়নি, যা খুবই দুঃখজনক।’
সিভিল বিভাগের আরেক শিক্ষার্থী অভিযোগ করেন, মিরপুরের যে কনভেনশন হলে তিন হাজার ৭৪৪ জন গ্র্যাজুয়েটকে নিয়ে সমাবর্তন আয়োজন করা হয়েছে, সেখানে সর্বোচ্চ এক থেকে দেড় হাজার শিক্ষার্থী ধারণের সামর্থ ছিল। ফলে প্রচণ্ড রকম ভোগান্তির শিকার হতে হয়েছে আমাদের।
বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্বরত শিক্ষকদের কাছে এরকম অনিয়ম ও ভোগান্তির কারণ জানতে চাইলে তারা এক বাক্যে প্রশাসনের কথা বলে দায় এড়িয়ে যান। যদিও ২০১৭-২০২১ সাল পর্যন্ত পাস করা ডিআইইউ গ্র্যাজুয়েটরা দায়িত্বরত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন এবং প্রশাসনের ব্যাপক সমালোচনা করে ক্ষোভ উগড়ে দেন।
এসব বিষয়ে জানতে প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের মোবাইলফোনে যোগাযোগ করা হলে তারা কেউ কল রিসিভ করেননি। আবার কেউ কেউ ফোন ধরে কেটে দিয়েছেন। প্রশাসনের বাকিরাও মুখে কুলুপ এঁটে দায় এড়িয়েছেন।
প্রশাসনের এমন আচরণে শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ অনেকেই বিব্রতবোধ করেছেন এবং ডিআইইউ গ্র্যাজুয়েটরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। এ অবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক-বর্তমান শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতের সমাবর্তন নিয়েও উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেন।
সমাবর্তনে নিম্নমানের উপহার ও পোশাক প্রদান, খাবার ও প্রয়োজনীয় আসনের ব্যবস্থা না থাকা এবং অনলাইন সার্টিফিকেট ভেরিফিকেশন ওয়েবসাইটে রোল ভুল দেখানোর অভিযোগের বিষয়ে ডিআইইউ জনসংযোগ কর্মকর্তা ডেপুটি রেজিস্ট্রার আজাদ হোসেন বলেন, ‘গাউন, খাবার, গিফট বক্স, ব্যাগ এগুলো সমাবর্তন অনুষ্ঠানের নির্ধারিত হওয়ার অনেক আগেই কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা করেছে। আর সার্টিফিকেটের (সনদ কপি) রোল নম্বর ভুল আসার বিষয়ে এখনও কোনও শিক্ষার্থী অভিযোগ দেননি। সমাবর্তন বিষয়ে আর কোনও মন্তব্য করতে চাই না।’ বিষয়টি উপরমহল কর্তৃক নির্ধারিত বলে ফোন রেখে দেন তিনি।
উল্লেখ্য, এবারের সমাবর্তনে আটটি অনুষদের মোট তিন হাজার ৭৪৪ জন শিক্ষার্থীকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি প্রদান করা হয়। শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে তিন জনকে চ্যান্সেলরস অ্যাওয়ার্ড, ১০ জনকে ভাইস চ্যান্সেলরস অ্যাওয়ার্ড এবং ১২ জনকে ডিনস অ্যাওয়ার্ড দেওয়া হয়।









