রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের ক্যান্টিনমালিক শফিকুল ইসলাম। শিক্ষার্থীদের কাছে ‘শফি ভাই’ নামেই তিনি পরিচিত। বাকিতে খেতে চাইলে শিক্ষার্থীদের কখনও ‘না’ করেন না। কবে টাকা দেবে সেটাও জানতে চান না। তার ভাষ্য, ‘শিক্ষার্থীরা আমার ভাই। এরাই আমাকে বাঁচিয়ে রাখবে।’ তবে সেই ‘ভাইদের’ বাকিতে খেতে দিয়ে বিপাকে পড়েছেন শফিকুল ইসলাম।
সম্প্রতি তার ক্যান্টিনে একটি বিজ্ঞপ্তি ঝুলানো হয়েছে। এতে লেখা, ‘বাকি চাহিয়া লজ্জা দেবেন না। আমার চলতে কষ্ট হয়। আমাকে ক্যান্টিন চালাতে সহযোগিতা করুণ। বাকির খাতা পরিশোধ করুন। অনুরোধে শফি ভাই ‘
জানা গেছে, ২০১০ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলে ক্যান্টিন পরিচালনার দায়িত্ব পান শফিকুল ইসলাম। এরপর থেকে নিয়মিতভাবে ক্যান্টিন পরিচালনা করছেন। লেখাপড়া না জানায় শিক্ষার্থীরাই বাকি খেয়ে তা খাতা লিখে রাখতেন। পরে তারাই হিসাব করে বকেয়া পরিশোধ করতেন। অনেকে পড়াশোনা শেষে ক্যাম্পাস ছাড়ার আগে তার বকেয়া পরিশোধ করেন। কেউ আবার পরে টাকা পাঠিয়ে দেন।
শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘বকেয়া টাকা না দিয়ে চলে যাওয়ার সংখ্যা কম ছিল। ফলে খুব একটা কষ্ট হতো না। কিন্তু গত কয়েক মাস ধরে অধিকাংশ শিক্ষার্থী বকেয়া পরিশোধ করছেন না। গত কয়েক মাসে শিক্ষার্থীদের কাছে লাখ টাকার বেশি বকেয়া পড়েছে। আমাকে তো জিনিসগুলো অন্য কোথাও থেকে কিনে এনে রান্না করতে হয়। মুদি দোকান ও মাছ-মাংসের দোকানে বকেয়া পড়ে গেছে। দোকানের কর্মচারীদের বেতন দিতে ঋণ করতে হয়েছে।’
তিন বেলা ক্যান্টিন চালাতে পাঁচ থেকে ছয় জন কর্মচারী রয়েছে। তাদের প্রতিদিন সাড়ে তিন হাজার টাকা পারিশ্রমিক দিতে হয়। শফিকুলের স্ত্রী ও ছেলেরা ক্যান্টিনে সময় দেন। ক্যান্টিন চালিয়েই তার সংসার চলে।
বকেয়া টাকার জন্য শিক্ষার্থীদের একাধিকবার অনুরোধ করেছেন জানিয়ে শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমার অনেক ঋণ। ঋণ শোধ করতে পারলে শান্তি পাবো। শিক্ষার্থীদের বলেছি, এই গরিবের দিকে তাকান। আমি আপনাদের সেবক। আমার বুকে লাথি মারবেন না। আপনারা যদি আমাকে ভাত না দেন, তাহলে গুলি করে মেরে ফেলেন।’
বাকিতে খাওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে অধিকাংশই ছাত্রলীগের নেতাকর্মী দাবি করে তিনি বলেন, ‘এখানকার ছাত্রলীগের ছেলেরাই বাকি খেয়েছে। নন-পলিটিক্যাল ছেলে অল্প কয়েকটা হতে পারে। বিষয়টি আমি কিবরিয়া (রাবি ছাত্রলীগের সভাপতি) ভাই ও রুনু (ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক) ভাইকেও জানিয়েছি।’
শফিকুল ইসলামর গ্রামের বাড়ি কুমিল্লায়। ১৯৭১ সালের পর থেকে মা-বাবার সঙ্গে রাজশাহীতে বসবাস করছেন। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন বিনোদপুর এলাকার মির্জাপুরে স্ত্রী ও দুই ছেলেকে নিয়ে থাকেন।
শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘সবসময় শিক্ষার্থীদের পাশে থাকার চেষ্টা করি। বর্তমানে জিনিসপত্রের প্রচুর দাম। তবু শিক্ষার্থীদের কথা ভেবে ক্যান্টিনে কোনও খাবারের দাম বাড়াইনি। সবাই শিক্ষিত, তাদের কাছে কি আমি ভাত পাবো না? আমি বউ ছেলেসহ ডাল-ভাত খেয়ে বেঁচে থাকতে চাই।’
বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি গোলাম কিবরিয়া বলেন, ‘শফি ভাই আমাদের কাছে এসেছিলেন। আমি আশ্বস্ত করেছি, টাকা পরিশোধের ব্যাপারে সহযোগিতা করবো। প্রয়োজনে যেসব শিক্ষার্থী তার কাছ থেকে বাকি খেয়েছেন, তাদের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলবো।’
এ বিষয়ে হল প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক সাইখুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, ‘ক্যান্টিনের বিষয়টি একান্তই ব্যক্তিগত মালিকানাধীন। এখানে হল প্রশাসন কোনও ভর্তুকি দেয় না। তাই কোনও হস্তক্ষেপও করে না।’









