জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) প্রশাসনিক ভবন অবরোধ করেছে প্রগতিশীল শিক্ষার্থীরা। গণরুম সংস্কৃতি উচ্ছেদ করে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের আবাসন নিশ্চিত করা, নতুন হল খুলে কৃত্রিম আবাসন সংকট দূর করা এবং আসন বণ্টন ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব প্রশাসনকে নেওয়ার দাবিতে শিক্ষার্থীরা এই অবরোধ করেন।
রবিবার (৫ মার্চ) সকাল ৮টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন রেজিস্ট্রার ভবনের সামনে অবরোধ কর্মসূচি শুরু হয়। পরে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে উপাচার্য অধ্যাপক মো. নূরুল আলম দ্রুত সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিলে শিক্ষার্থীরা কর্মসূচি প্রত্যাহার করেন।
অবরোধ চলাকালে ছাত্র ইউনিয়ন জাবি সংসদের সভাপতি ইমতিয়াজ অর্ণব বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে গণরুম ব্যবস্থা আগে ছিল না। এখন বৈধ শিক্ষার্থীরাও আসন পাচ্ছে না। এ সমস্যার সবচেয়ে বড় সমাধান ছিল উন্নয়ন প্রকল্পের অধীনে নির্মিত নতুন ছয়টি হল। কিন্তু দেড় বছর পার হয়ে গেলেও প্রশাসন সবগুলো হল উদ্বোধন করতে পারেনি।’
সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের জাবি শাখার সাধারণ সম্পাদক কনোজ কান্তি রায় বলেন, ‘গণরুম বিলুপ্তির জন্য প্রশাসনের নিকট দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছি। প্রশাসন আমাদের দাবি আমলেই নেয়নি। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমরা অবরোধ চালিয়ে যাবো।’
ছাত্র ইউনিয়ন জাবি সংসদের সাংগঠনিক সম্পাদক আলিফ মাহমুদ বলেন, “ভিসি বলেছিলেন গণরুম জাদুঘরে যাবে। কোথায় তার জাদুঘর? নতুন হলে উঠানোর জন্য ৫১ ব্যাচের ক্লাস পিছিয়েছে। অথচ শিক্ষার্থীদের সেই গণরুমেই ঠাঁই হয়েছে। ছাত্রলীগ হলগুলোতে ‘ছায়া প্রশাসন’ চালু করেছে। তারা হল চালায়। গণরুমে ঢুকতে হলে তাদের পারমিশন নিতে হয়।”
তিনি আরও বলেন, ‘গণরুম সংস্কৃতির কারণে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা, মেধা নষ্ট হচ্ছে। তারা মাদকে জড়িয়ে পড়ছে। অবৈধ শিক্ষার্থীদের দ্রুত হল ত্যাগের নির্দেশ দিয়ে বৈধ শিক্ষার্থীদের আসনের ব্যবস্থা করতে হবে। নয়তো অচিরেই একটি মেধাশূণ্য জাতি তৈরি হবে।’
অবরোধ চলাকালে রেজিস্ট্রার ভবনের ফটকে তালা লাগিয়ে দেয় শিক্ষার্থীরা। ফলে প্রশাসনিক ভবনে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ভবনের ভেতরে ঢুকতে না পেরে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকেন। এক পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর আ স ম ফিরোজ উল হাসান কর্মসূচি স্থলে উপস্থিত হয়ে প্রত্যাহার করার অনুরোধ করেন। তবে শিক্ষার্থীরা তাদের দাবিতে অনড় থাকার কথা জানায়।
এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর আ স ম ফিরোজ-উল-হাসান বলেন, ‘আবাসন সঙ্কট সমাধানে দুইটি হল খুলে দেওয়া হয়েছে। আরও দুইটি হল মার্চ মাসে খুলে দিতে পারবো বলে আমরা আশাবাদী। এটি হলে সংকট সমাধান হয়ে যাবে। শিক্ষার্থীরা চাইছে আজকেই বাকি হলগুলো খুলে দিতে। কিন্তু পর্যাপ্ত বিদ্যুতের ব্যবস্থা না থাকায় এটি সম্ভব না।’
এ ছাড়া কর্মসূচি স্থলে উপস্থিত হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকল্প পরিচালক নাসির উদ্দিন বাকি হলগুলো উদ্বোধন ও আসবাবপত্রের বিষয়ে বলেন, ‘হলগুলোর ফার্নিচারের জন্য আমরা সরকারের কাছে বাজেট চেয়েছি। সরকার এই মূহুর্তে বাজেট অনুমোদন করছে না। তবে ৩০ মার্চের মধ্যে ১৭ ও ২০ নম্বর হল চালু করতে পারবো বলে আশা করছি।’
এদিকে শিক্ষার্থীরা তাদের দাবিতে অনড় থাকলে কর্মসূচি স্থলে উপস্থিত হন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, উপ-উপাচার্যসহ শিক্ষকরা। এ সময় দ্রুত সমস্যার সমাধানে উপাচার্যের সম্মতিতে শিক্ষার্থীদের প্রভোস্ট কমিটির সভাপতি অধ্যাপক নাজমুল হাসান তালুকদার স্বাক্ষরিত একটি লিখিত অঙ্গীকারনামা দেওয়া হয়।
অঙ্গীকারনামায় বলা হয়, ‘আগামীকালের (৬ মার্চ) মধ্যে মাননীয় উপাচার্য প্রভোস্ট কমিটির মিটিং ডাকবেন এবং গণরুম বিলোপ কমিটি গঠন করবেন। কমিটি হল সংশ্লিষ্টদের সাথে এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে গণরুম সংকট সমাধানকল্পে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। আগামী ৭ কর্ম দিবসের মধ্যে এই কমিটি গণরুম সংকট নিরসনে একটি দৃশ্যমান রোডম্যাপ তৈরি ও বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেবে।’
অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর শেষে প্রভোস্ট কমিটির সভাপতি অধ্যাপক নাজমুল হাসান তালুকদার সাংবাদিকদের বলেন, ‘আজকের কর্মসূচির বিষয়ে আমরা ইতোমধ্যে কাজ শুরু করে দিয়েছি। আগামী প্রভোস্ট কমিটির মিটিংয়ে এই বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা করা হবে। যেহেতু বিষয়টি নিয়ে আমরা কাজ করছি, এটি দ্রুত সমাধান হবে বলে আশা করছি।’
উপাচার্য অধ্যাপক মো. নূরুল আলম শিক্ষার্থীদের আশ্বস্ত করে বলেন, ‘তোমাদের দাবিগুলো যৌক্তিক। আজকে আমার একটি জরুরি মিটিং আছে তাই ঢাকায় যাচ্ছি। কালকের মধ্যেই একটি কমিটি গঠন করবো। আগামী সাতদিনের মধ্যে অছাত্রদের হল ত্যাগ করার জন্য কঠোর ব্যবস্থা নেবো।’
এদিকে অঙ্গীকারনামা পেয়ে ও উপাচার্যের আশ্বাসে কর্মসূচি প্রত্যাহার করেছে শিক্ষার্থীরা। এ সময় জাহাঙ্গীরনগর সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি সৌমিক বাগচি বলেন, ‘গণরুম সংস্কৃতি যেন না থাকে এই নিয়ে দুই মাস যাবৎ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছি।বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন লিখিতভাবে আমাদের দাবি মেনে নেওয়ায় ও সাত কর্ম দিবসের মধ্যে গণরুম বিলুপ্তির জন্য রোডম্যাপ তৈরি এবং বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেবে বলে আশ্বাস দিয়েছে। এই প্রেক্ষিতে আমরা অবরোধ তুলে নিয়েছি। এটি বাস্তবায়ন না হলে আমরা নতুন কোনও পদক্ষেপে যাবো।’









