ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ক্যাম্পাসে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের যাতায়াত রয়েছে। যেকোনও আন্দোলন-সংগ্রামে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি সব শ্রেণির নাগরিক অংশ নেয়। ছুটির দিনসহ বিশেষ দিনগুলোতে ক্যাম্পাস এলাকায় থাকে অপ্রত্যাশিত ভিড়। এই ভিড়ের ভেতরে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থীকে পড়তে হয় নানান অসুবিধায়। শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন সময়ে চুরি, ছিনতাই ও হেনস্তার শিকার হয়েছেন, এমন অভিযোগও রয়েছে। শিক্ষার্থীদের একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরেই ক্যাম্পাসে বহিরাগত নিয়ন্ত্রণের কথা বলে আসছিল। সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টর সহযোগী অধ্যাপক সাইফুদ্দিন আহমেদ ক্যাম্পাসে বহিরাগত নিয়ন্ত্রণের জন্য মোবাইল কোর্ট পরিচালনার ঘোষণা দেন।
ঘোষণার পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। বিষয়টাকে ‘ক্যান্টনমেন্টের আচরণ’ ও ‘অপ্রয়োজনীয় মাতব্বরি’ বলে আখ্যা দিয়েছেন শিক্ষকরা, ‘অযৌক্তিক’ বলছেন ছাত্রনেতারা ও বিষয়টি ‘অসম্ভব ও অনুচিত’ বলছেন উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জোবাইদা নাসরীন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, অতীতে আমরা দেখেছি দলীয় সরকার যখন এসেছে, জনপ্রশাসনের তত্ত্বাবধানে একটা সার্ভেইলেন্স তৈরি করা হয়, আবার একটা ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করা হয়। আমি মনে করি, আসলেই সেটির ধারাবাহিকতায় এটি হচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিনিয়তই বিভিন্ন সভা-সেমিনার হচ্ছে, প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার আছে সেগুলোতে অংশ নেওয়ার। এগুলোতে নলেজ শেয়ারিংয়ের বিষয় আছে, কালচারাল অ্যাক্টিভিটি শেয়ারিংয়ের বিষয় আছে, এটা তো আর ক্যান্টনমেন্ট না যে আপনাকে এভাবে বন্ধ রাখতে হবে।
বহিরাগত নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগকে ‘অপ্রয়োজনীয় মাতব্বরি’ আখ্যা দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সামিনা লুৎফা। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, অপ্রয়োজনীয় মাতব্বরি বন্ধ করেন। বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দিন। পড়াশোনা নামক একটা কাজের জন্য আপনারা প্রশাসকের চেয়ারে বসেন, সে কথা ভুলে গিয়ে চৌকিদারিতে সময় দিয়েন না!
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একটা জনপরিসর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সারা দেশের, খালি বিশ্ববিদ্যালয়ের না! আগে ক্লাস, পরীক্ষা শুরু ও হলের বহিরাগতদের বের করতে হবে উল্লেখ করে তিনি আরও লেখেন, আমার ক্লাসে আমি যে কাউকে অ্যালাউ করি, তার শিক্ষার্থী হওয়ার প্রয়োজন নেই। ক্যাম্পাসে প্রতিদিন একটা না একটা সেমিনার হচ্ছে, সেখানে উপচে পড়া ভিড়! এরা সবাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের? হবেই বা কেন? কী আশ্চর্য কথা এগুলো! দেশ নিয়ে আলাপ হচ্ছে- সেখানে মানুষ আসবে না? টিএসসিতে ত্রাণ দিতে যে সাধারণ মানুষ জড়ো হলো, সেগুলা ভুলে গেছেন এত তাড়াতাড়ি!
তিনি আরও লেখেন, স্বৈরাচারের শেষ প্রক্টর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কের সমাবেশে ঢুকতে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং নাগরিকদের বাধা দিয়েছিল। সেদিন শাহবাগে আমার আর আসিফ শাহানের সঙ্গে পুলিশ এবং সহকারী প্রক্টরের বাগবিতণ্ডার ভিডিও ভাইরাল হয়েছিল। আপনারা একই কাজ করতে চান? একই পথে হাঁটবেন? কেন?
বিশ্ববিদ্যালয়ে বহিরাগত নিয়ন্ত্রণ উচিত নয় বলে দাবি করেছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম। এক ফেসবুক পোস্টে তিনি লেখেন, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢালাওভাবে 'বহিরাগত' নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়, উচিতও নয়। সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রয়োজন, যাতে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অ্যাকাডেমিক পরিবেশ বিঘ্ন না ঘটে। একসঙ্গে রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক পরিসর যাতে উন্মুক্ত থাকে এবং জনগণের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের মিথস্ক্রিয়ারও সুযোগ থাকে৷ 'বহিরাগত' জনগণের থেকে ঢাবি ক্যাম্পাসে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ অতি জরুরি।
ছাত্রদল ঢাবি শাখার সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন বলেন, বিষয়টি নিয়ে আসলে এখন ঠিক ওভাবে মন্তব্য করতে চাচ্ছি না। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনিকভাবে ক্যাম্পাসে বহিরাগত নিয়োগ করবে, কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস বলতে তারা আসলে কতটুকু জায়গা বোঝাচ্ছে সেটা এখনও ক্লিয়ার না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রয়েছে শত বছরের রাজনৈতিক চরিত্র। এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বলতে শহীদ মিনার, শাহবাগ এসব এলাকাকেও আমরা বুঝি। কিন্তু এসব এলাকায় তো বহিরাগত নিয়ন্ত্রণ সম্ভব না। আর যদি তারা অ্যাকাডেমিক এরিয়াগুলো বুঝিয়ে থাকেন, যেমন কলা অনুষদসহ বিভিন্ন বিভাগের ইনস্টিটিউট; তাহলে সেটা ভিন্ন কথা। যেহেতু তারা স্পষ্ট করেনি, তাই আমিও বিষয়টা নিয়ে স্পষ্ট বক্তব্য দিতে পারছি না।
সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সভাপতি সাদিকুল ইসলাম সাদিক বলেন, বিষয়টিকে আমরা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক মনে করি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আসলে একটি জনপরিসর। এখানে নিয়ন্ত্রণ কোনোভাবেই কাম্য নয়। বিভিন্ন জাতীয় ইস্যু নিয়ে, জাতীয় স্বার্থ নিয়ে যখন কোনও আন্দোলন-সংগ্রাম হয়, দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে মানুষ এসে তাতে অংশগ্রহণ করে। সেই জায়গা থেকে আমরা মনে করি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বহিরাগত নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।









